মূল: প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ ২ । লেখক: আরিফ আজাদ । ওয়েব সম্পাদনা: আবু বক্কার ওয়াইস বিন আমর

বাংলাদেশে আজ ডেভিডের তৃতীয় দিন। সে এতদিন ক্যান্টিনে খাওয়ার বায়না করে যাচ্ছিল; কিন্তু গতরাতে আমার কাছে ক্যান্টিনের বিখ্যাত-সব গল্প শুনে পারলে তো সে বমি করে বসে। তাকে বলছিলাম ক্যান্টিন গুলোর ঐতিহ্যবাহী গল্পগুলো। গল্প বলা শেষ হলে সে খক খক করে বলে উঠল, ‘আসলেই কি তরকারিতে মশা-মাছি পাওয়া যায়?

আমি জোর দিয়ে বললাম, “শুধুই কি মশা-মাছি? কপাল ভালো হলে জুট মিলের রশিও পাওয়া যেতে পারে। কপাল আরেকটু ভালো হলে নেংটি ইদুরের বাচ্চা, এমনকি তেলাপোকার সন্ধান লাভেও বিস্ময়ের কিছু নেই।

আমার কথা শুনে সে আবার খক খক করে ওয়াশ রুমের দিকে দৌড় দিল। সাদা চামড়ার আমেরিকানের কাছে এসব বিদঘুটে লাগতেই পারে; কিন্তু বাঙালি ছাত্রদের কাছে এই ব্যাপারগুলো এখন একপ্রকার ঐতিহ্যের মতো হয়ে গেছে। ক্যান্টিনে খেতে এসেছে অথচ কোনোদিন এরকম ঘটনার সাক্ষী হয়নি, এমন ছাত্র খুজে পাওয়াই ঢের মুশকিল হবে। আর আমাদের ক্যান্টিনের বিখ্যাত ‘ডাল-কাহিনির কথা তো বাদই দিলাম।

নীলনদের পানিকেই সবচেয়ে স্বচ্ছ পানি বলে জানতাম; কিন্তু যেদিন প্রথম ক্যান্টিরে ডালের চেহারা দেখেছি, সেদিনই ভুলটি ভেঙে গেছে। আমাদের ক্যান্টিনের ডালের পানির চেয়ে স্বচ্ছ আর কোনোকিছু থাকতেই পারে না।

এসব গল্প শোনার পরে ক্যান্টিনে খাওয়ার সব-আশা ডেভিড জলাঞ্জলি দিয়ে দিল। কিচেন থেকে তিন কাপ চা নিয়ে আমাদের মাঝে উপস্থিত হলো সাজিদ। ডেভিড আর আমার হাতে চা দিয়ে নিজের চেয়ারে গিয়ে বসল সে। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে ডেভিডের উদ্দেশ্যে সাজিদ বলল, “আচ্ছা ডেভিড, ড্যান ব্রাউনের লেখা তোমার কেমন লাগে?

ড্যান ব্রাউনের কথা শুনেই ডেভিড মুখ খিচিয়ে বলল, “জঘন্য লাগে।

ডেভিড মুখের যে এক্সপ্রেশন নিয়ে জঘন্য লাগে’ শব্দদ্বয় উচ্চারণ করল তা ছিল দেখার মতো। সাজিদ বলল, ‘জঘন্য লাগার কারণ? ভদ্রলোক তো খুব ভালো লেখে। নিউ ইয়র্ক টাইমস কি বলল শোনোনি তাকে নিয়ে? হ্যারি পটারের একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী কেবল ড্যান ব্রাউন। ভাবা যায়? কেউ কেউ তো আরও কয়েক কাঠি সরেস তার ব্যাপারে। একজন তো বলেই ফেলেছিল যে ড্যান ব্রাউন হচ্ছে ইতিহাসের সেই রাজপুত্রের মতো যে এলো, দেখল এবং জয় করে নিল।

ডেভিড তার মুখের অবস্থার কোনোরকম পরিবর্তন না করেই বলল, ‘আই সী…! লোকটি যতখানি না লেখক তারচেয়ে বেশি হলো ধর্মবিদ্বেষী। ক্রিশ্চিয়ানিটি নিয়ে তার মধ্যে বেশ ভালো রকমের এলার্জি আছে। আমার কী মনে হয় জানো সাজিদ? আমার মনে হয় লোকটি নিজেই একজন ইলুমিনাতির সদস্য।

হেসে উঠল সাজিদ। বলল, “হতেও পারে। দুনিয়ার কে যে কোনদিকে ইলুমিনাতি হয়ে বসে আছে তা আমরা কেউই টের পাই না। এমনও হতে পারে, তুমি নিজেই একজন ইলুমিনাতির সদস্য এবং আমাদের চোখে ধুলো দিয়ে বেড়াচ্ছ।

সাজিদের কথা শুনে ডেভিড তার মুখটি আরও শক্ত করে বলল, “আর ইউ কিডিং? হোয়াই শুড আই বি অ্যা মেম্বার অফ দ্যাট বুলশিট ইলুমিনাতি?

এই আমেরিকান যে কেবল ড্যান ব্রাউনের ওপরেই খেপে আছে তা নয়, গুপ্ত সংস্থা ইলুমিনাতির ওপরেও সে দেখছি ভীষণরকম বিরক্ত! সাজিদ বলল, ‘তা, ড্যান ব্রাউনকে তোমার ধর্মবিদ্বেষী বলে মনে হয় কেন?

‘ধর্মবিদ্বেষী নয় তো কী? লোকটি জোর করে প্রমাণ করতে চায় যে ক্রিশ্চিয়ানিটি হলো বিজ্ঞানবিরোধী ধর্ম। আদিকাল থেকেই চার্চ নাকি বিজ্ঞানের বিরুদ্ধে অবস্থান

নিয়ে এসেছে। তুমিই বলো সাজিদ, এসব কথার কি কোনোভিত্তি আছে আদৌ? পৃথিবীর সেরা বিজ্ঞানীরা খ্রিষ্টান ছিলেন। বিজ্ঞানী নিউটনের কথাই ধরো। তিনি তো আগাগোড়া একজন ধার্মিক খ্রিষ্টান লোক ছিলেন। কই, চার্চ কি কখনোতার বিজ্ঞানচর্চায় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে? আধুনিক বিজ্ঞানের ভিত্তিই যার হাতে গড়া, আজীবন তিনি নিজেই ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ খ্রিষ্টান। ক্রিশ্চিয়ানিটি যে বিজ্ঞানবিরুদ্ধ কোনোধর্ম নয়, এই প্রমাণ তো স্বয়ং নিউটনই, তাই না?

ডেভিডের লজিক শুনে সাজিদ বলল, ‘তা বেশ বলেছ তুমি। নিউটন অবশ্যই একজন খাঁটি খ্রিষ্টান ছিলেন বটে।

সাজিদের মুখে ‘খাঁটি খ্রিষ্টান’ কথাটি শুনে ডেভিড সন্দেহের চোখে তার দিকে তাকাল। বলল, ‘হোয়্যাট ডু ইউ মিন বাই খাঁটি খ্রিষ্টান?’

‘খাঁটি খ্রিষ্টান মানে তিনি একচুয়াল খ্রিষ্টধর্মে বিশ্বাস করতেন যে—ধর্মের প্রচার করেছিলেন জিসাস ক্রাইস্ট। আরও সহজ করে বলতে গেলে, নিউটন মনেপ্রাণে অবিকৃত খ্রিষ্টধর্মকেই অন্তরে লালন করতেন। বিকৃত হয়ে যাওয়া ক্রিশ্চিয়ানিটিতে তার বিন্দু পরিমাণও বিশ্বাস ছিল না। বলতে গেলে, বিকৃত ক্রিশ্চিয়ানিটির বিরুদ্ধে নিউটন একপ্রকার কলমযুদ্ধ চালিয়েছিলেন।

সাজিদের কথা শুনে আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। নিউটনকে তো আমরা স্রেফ একজন পদার্থবিজ্ঞানী বলেই চিনি। তিনি আবার ক্রিশ্চিয়ানিটির বিরুদ্ধে লড়াইতে কবে অংশ নিয়েছিলেন? সাজিদের কথা শুনে ডেভিডও অবাক হলো। বলল, ‘তোমার কথা আমি বুঝতে পারিনি সাজিদ। তুমি কি বলতে চাচ্ছ যে—ক্রিশ্চিয়ানিটি একটি বিকৃত ধর্ম?

সাজিদ বলল, “অনেকটাই।

‘তোমার এরকম মনে হবার কারণ?

‘তোমাকে তো সেদিন দেখিয়েছিলাম যে—প্যাগানদের উৎসব কীভাবে ক্রিসমাস ডে হিশেবে পালন হয়। এটি কি বিকৃতি নয়, ডেভিড?’

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ডেভিড বলল, কিন্তু এটি তো নির্দিষ্ট কিছু খ্রিস্টানের দোষ, তাই না? ক্রিশ্চিয়ানিটি বা বাইবেলের দোষ তো নয়।

‘শুধু তো ক্রিসমাস ডে নয়, এরকম আরও অনেক কিছু খ্রিষ্টধর্মে ঢুকে পড়েছে, যা আদৌ ক্রিশ্চিয়ানিটিতে ছিল না, এবং সেগুলোর বিরুদ্ধেই মূলত বিজ্ঞানী নিউটনের অবস্থান ছিল।

‘যেমন?’, প্রশ্ন করল ডেভিড।

সাজিদ বলল, এই যেমন ধরো ত্রিত্ববাদ।

ত্রিত্ববাদের কথা শুনে ডেভিডের পুরো চেহারা মুহূর্তেই গুমোট আকার ধারণ করল। সে বলল, তুমি কি বলতে চাচ্ছ যে—ট্রিনিটির ধারণাও ক্রিসমাস ডের মতো প্যাগানদের কাছ থেকে ধার করা?’ ‘আমি তা বলছি না। আমি বলতে চাইছি যে—ট্রিনিটির সাথে মূল ক্রিশ্চিয়ানিটির কোনোসম্পর্ক নেই। ট্রিনিটি বলে ঈশ্বর হলো তিনজন; কিন্তু আদি ক্রিশ্চিয়ানিটিতে ঈশ্বর ছিলেন কেবলই একজন। আদি ক্রিশ্চিয়ানিটিতে জিসাস ক্রাইস্টকে কখনোই ঈশ্বর হিশেবে দেখানো হতো না; বরং তাকে ঈশ্বরের দূত হিশেবে দেখানো হতো; কিন্তু কালের পরিক্রমায় ক্রিশ্চিয়ানিটিতে ‘ট্রিনিটি তত্ত্ব’ ঢুকে পড়ে এবং একজন ঈশ্বরের জায়গা দখল করে বসে তিন তিনজন ঈশ্বর; কিন্তু বিজ্ঞানী নিউটন এই ট্রিনিটি তত্ত্বে বিশ্বাস করতেন না। তিনি একজনকেই ঈশ্বর হিশেবে বিশ্বাস করতেন।

ডেভিড বলল, তার মানে নিউটন জিসাস ক্রাইস্টকে স্বীকার করত না?

‘অবশ্যই স্বীকার করত। নিউটন জিসাস ক্রাইস্টকে কেবল ঈশ্বরের একজন দূত হিশেবে বিশ্বাস করত, ঈশ্বর হিশেবে নয়। নিউটন ঈশ্বর হিশেবে তাকেই বিশ্বাস করত, যিনি জিসাস ক্রাইস্টকে দূত বানিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছিলেন।

তাদের আলোচনায় আমি বেশ মজা পাচ্ছি। ড্যান ব্রাউন ইলুমিনাতির গোপন কোনো সদস্য কি না এই রহস্যের চেয়ে বিজ্ঞানী নিউটন ট্রিনিটিতে বিশ্বাস করত কি না সেই রহস্যই এখন বেশি জমে উঠেছে। ডেভিড জানতে চাইল, ‘নিউটন যে-ট্রিনিটিতে বিশ্বাস করত না তার প্রমাণ কী?

সাজিদ হাসল। হেসে বলল, আমার এই দাবির প্রমাণ রয়েছে নিউটনের সেই বারোটি সূত্রে।

‘নিউটনের বারোটি সূত্র?’, মুখে বিড়বিড় করে বলল ডেভিড। নিউটনের গতির তিন সূত্রের কথা জানি এবং বইতে পড়েছি; কিন্তু নিউটনের বারো সূত্র’ নামে তো কোনোকিছু পড়িনি কখন না। সাজিদকে উদ্দেশ্য করে বললাম, “নিউটনের বারো সূত্র আবার কী জিনিস?

এবার সে আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। আজকে তাকে এতবার হাসতে দেখে আমি হালকা অবাক হচ্ছি। আমার প্রশ্নের উত্তর হিশেবে সে বলল, “আমরা বেশির ভাগই বিজ্ঞানী নিউটনকে চিনি; কিন্তু আমরা অধিকাংশই ধর্মীয় স্কলার নিউটনকে চিনি না।

সাজিদের কথার আগামাথা কিছুই বুঝতে পারলাম না আমি। বললাম, ধর্মীয় স্কলার। নিউটন মানে কী? নিউটন নামে কোনো ধর্মীয় স্কলার ছিলেন নাকি?

‘বিজ্ঞানী নিউটনই হলো ধর্মীয় স্কলার নিউটন।

অবাক হলো ডেভিড। অবাক হলাম আমিও। বললাম, ‘আশ্চর্য! এমন কঠিন করে কথা বলছিস কেন তুই? যা বলতে চাচ্ছিস সহজ করে বলে ফেল। একেবারে জলবৎ তরলং করে। বিজ্ঞানী নিউটন আর ধর্মীয় স্কলার নিউটন, এসব টার্ম ব্যবহার করে ধোঁয়াশা তৈরি করবি না একদম।

সাজিদের একটা বদভ্যাস হচ্ছে সে সবকিছুতেই দার্শনিকতা কপচাতে শুরু করে। সহজ ব্যাপারকে কঠিন কঠিন শব্দ ব্যবহার করে জটিল করে তোলে। আমার কথাকে সে আমলে নিয়েছে বলে মনে হল না। সে আগের মতোই বলে যেতে লাগল, “স্যার আইজ্যাক নিউটনকে আমরা বিজ্ঞানী হিশেবেই চিনি তার বৈজ্ঞানিক কর্মকাণ্ডগুলোর জন্যে। কিন্ত বিজ্ঞানী পরিচয়ের বাইরেও তার বিশাল একটি পরিচয় আছে। সেটি হলো তিনি ছিলেন একজন ধর্মীয় পণ্ডিত। সারা জীবন তিনি বিজ্ঞান নিয়ে যত কাজ করেছেন, ধর্ম নিয়ে কাজ করেছেন তার তিন গুণ। বিজ্ঞানের জন্য সারা জীবনে তিনি যত শব্দ লিখেছেন, ধর্মের জন্য লিখেছেন তার পাঁচ গুণ; কিন্তু কোনো এক আশ্চর্য কারণে নিউটনের ধার্মিকতা আর ধর্ম নিয়ে তার গবেষণার ব্যাপারটি আমাদের কাছ থেকে গোপন রাখা হয়।

‘স্যার আইজ্যাক নিউটন একজন ধর্মীয় পণ্ডিত ছিলেন এই কথা শুনে মনে হলো আমি আকাশ থেকে ধপাস করে মাটিতে এসে পড়লাম।

পরের অংশ টুকু পড়তে[এখানে ক্লিক করুন]

এই ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে তাহলে দয়া করে ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ একে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন