মূল:নারীর হজ ও উমরাহ

ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

সম্পাদনা: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

হজে যদি আপনার হায়েয বা নেফাস এসে যায় তবে তা নিয়ে মন খারাপ করার কিছু নেই। কারণ, এটা আল্লাহ্ তা‘আলা প্রত্যেক নারীর জন্যই নির্ধারণ করে দিয়েছেন। আমাদের দ্বীনে কঠিন ও সমস্যাসংকুল কিছু নেই। সব ধরনের সমস্যার সমাধান এতে রয়েছে। এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু মাসলা-মাসায়েল জেনে নেওয়া আবশ্যক।

এখানে একটি সাধারণ নিয়ম হলো: সাধারণ হাজী সাহেবরা যা যা করেন হায়েয বা নেফাস ওয়ালী মহিলাও সেগুলো করবেন। তবে হায়েয ও নেফাস-ওয়ালী মহিলাগণ পবিত্রতা অর্জন পর্যন্ত আল্লাহর ঘরের তাওয়াফ করবেন না। এর প্রমাণ, আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহার হাদীস। হজের সফরে বের হওয়ার পর তার হায়েয এসেছিল। তিনি বলেন,

«فدخل علي النبي صلى الله عليه وسلم وأنا أبكي فقال: ما يبكيك قلت لوددت أني لم أحج هذا العام قال: لعلك نفست (أي حضت ) قلت: نعم قال: فان ذلك شئ كتبه الله على بنات آدم . فافعلي ما يفعل الحاج، غير ألا تطوفي بالبيت حتى تطهري)».

“তখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার কাছে প্রবেশ করে দেখলেন আমি কাঁদছি। তিনি বললেন: তুমি কাঁদছ কেন? আমি বললাম: হায়! আমি যদি এ বছর হজ না করতাম। তিনি বললেন: তোমার বোধ হয় হায়েয হয়েছে। আমি বললাম: হাঁ। তিনি বললেন: এটা তো মহান আল্লাহ আদমের প্রতিটি কন্যার ওপর লিখে রেখেছেন। সুতরাং তুমি পবিত্র হওয়া ব্যতীত তাওয়াফ না করে অপরাপর হাজীদের মত হজের যাবতীয় কাজ করে যাও”[1] সুতরাং হায়েয ও নেফাস হলে মহিলাদের হজ আদায়ে বড় ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হয় না। তাদের জ্ঞাতার্থে নিম্নোক্ত মাসআলাগুলোকে স্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হলো:

হায়েয বা নেফাস অবস্থায় একজন মহিলা উমরাহ বা হজের ইহরাম বাঁধতে পারবে।

ইহরামের সময় হায়েয ও নেফাসওয়ালী মহিলা গোসল করবে। কারণ হজের সফরে আসমা বিনতে উমাইসের সন্তান হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে গোসল করা এবং কাপড় বেঁধে নেয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

হায়েয ও নেফাস ওয়ালী মহিলা তালবিয়াহ পাঠ করতে কোনো বাধা নেই। অনুরূপভাবে যাবতীয় দো‘আও করতে পারবে। এমনকি কুরআন স্পর্শ না করে মুখস্থ পড়ার অনুমতিও কোনো কোনো ইমাম দিয়েছেন। কারণ, হায়েয বা নেফাস অবস্থায় কুরআন পড়তে নিষেধ করার ব্যাপারে সহীহ কোনো হাদীস নেই।

যদি তামাত্তু হজ আদায়কারী হয় আর উমরাহ অবস্থায় কোনো মহিলার হায়েয আসে তাহলে সে উমরার ইহরাম নিয়েই ৯ তারিখ অর্থাৎ, আরাফার দিন পর্যন্ত কাটিয়ে দেবে। তারপর যদি ৯ তারিখ সে পবিত্র হয়ে যায় তবে দেখতে হবে যে সে উমরাহ আদায় করার পর আরাফার মাঠে হাযির হওয়া সম্ভব হবে তাহলে উমরাহ পুরা করে নেবে। আর যদি ৯ তারিখ পর্যন্ত পবিত্র না হয় বা ৯ তারিখে এমন সময় পবিত্র হয়েছে যে, তার আর উমরাহ আদায় করার সময় নেই তখন তিনি উমরাকে হজে রূপান্তরিত করে ফেলবেন এবং বলবেন: হে আল্লাহ! আমি আমার উমরার সাথেই হজ করার জন্য ইহরাম করছি। এভাবে তিনি কিরান হজ আদায়কারী রূপে গণ্য হবেন এবং মানুষের সাথে আরাফাহর ময়দানে অবস্থান করবেন এবং অন্যান্য হাজীদের মত হজের বাকি কাজ সম্পন্ন করবেন। তবে তিনি তাওয়াফ ও সা‘ঈকে পবিত্র হওয়া পর্যন্ত দেরি করে আদায় করবেন। পবিত্র হওয়ার পর তিনি হজের তাওয়াফ ও সা‘ঈ আদায় করলেই তার উমরার তাওয়াফ ও উমরার সা‘ঈ করার প্রয়োজন পড়বে না। তবে তার ওপর হাদী জবাই করা ওয়াজিব হবে।

যদি বিদায়ি তাওয়াফ করার পূর্বে কোনো মহিলার হায়েয আসে এবং তাকে মক্কা ছাড়তে হয় তবে তার জন্য বিদায়ি তাওয়াফ করার আবশ্যকতা থাকবে না। তিনি বিদায়ি তাওয়াফ না করেই মক্কা ছেড়ে যেতে পারবেন। কিন্তু হজের তাওয়াফ না করলে হজ সম্পন্ন হবে না।

যদি হজের তাওয়াফ অর্থাৎ তাওয়াফে ইফাযা বা তাওয়াফে যিয়ারাহ করার পূর্বে কারও হায়েয বা নেফাস আসে তাহলে তিনি পবিত্র হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন। আর যদি মক্কায় অপেক্ষা করা তার জন্য দুষ্কর হয়ে পড়ে তবে তিনি তার এলাকায় চলে গেলেও যে পর্যন্ত পবিত্র হওয়ার পর আবার মক্কায় এসে তাওয়াফ না করবেন সে পর্যন্ত তার হজ পূর্ণ হবে না। আর এ সময়ে তিনি তার স্বামীর সাথে সহবাসও করতে পারবেন না। তারপর যখন তিনি মক্কায় এসে হজের তাওয়াফ সম্পন্ন করবেন তখন তার হজ পূর্ণ হবে। কিন্তু যদি অবস্থা এমন হয় যে, তার জন্য আবার মক্কায় আসা কষ্টসাধ্য বা মক্কায় অবস্থান করা অসম্ভব। যেমন, দূর দেশের লোক হয়, মাহরাম সফর সঙ্গী না পাওয়ার ভয় থাকে তাহলে তিনি উম্মতের বিজ্ঞ আলিমদের মতে, হায়েয বা নেফাসের স্থানে কাপড় বেঁধে তাওয়াফ করে ফেলবেন। অথবা যদি এমন কোনো ইঞ্জেকশন পাওয়া যায় যার মাধ্যমে তার রক্ত বন্ধ করা যাবে তাহলে সেটাও গ্রহণ করতে পারেন।

মহিলা হাজী সাহেবানরা হায়েয বন্ধ করার জন্য যদি কোনো ঔষধ গ্রহণ করতে চায় তবে তাও জায়েয হবে। কেননা এতে তার জন্য প্রভূত কল্যাণ ও সমস্যা থেকে উত্তরণের উপায় রয়েছে। তবে কোনো শারীরিক ক্ষতিকারক কিছু করা যাবে না।

হায়েয বা নেফাস ওয়ালী মহিলা সা‘ঈ করার স্থানে বসে কারও জন্য অপেক্ষা করতে কোনো দোষ নেই। কারণ, সা‘ঈ করার স্থানটি মসজিদুল হারামের বাইরের অংশ।

হজে মহিলাদের সৌন্দর্যচর্চা সংক্রান্ত বিভিন্ন হুকুম আহকাম

সৌন্দর্যচর্চা মেয়েদের একটি প্রাকৃতিক রীতি। কিন্তু ইহরাম অবস্থায় মহিলাদের মূল অবস্থা কেমন হওয়া উচিৎ তা সহজেই অনুমেয়। কারণ, মক্কা-মদিনার মত পবিত্র স্থানে সবাই হজ, যিয়ারত ও ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভে সদা সচেষ্ট থাকে। সেখানে সৌন্দর্যচর্চার সুযোগ কোথায়? পবিত্র কুরআনে হাজীদেরকে হজের তাওয়াফের পূর্বে নিজেদের যাবতীয় ধুলি-মলিনতা ও ময়লা অবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে হজের তাওয়াফ করতে বলা হয়েছে,

﴿ثُمَّ لۡيَقۡضُواْ تَفَثَهُمۡ وَلۡيُوفُواْ نُذُورَهُمۡ وَلۡيَطَّوَّفُواْ بِٱلۡبَيۡتِ ٱلۡعَتِيقِ ٢٩﴾ [الحج: ٢٩]

“তারপর তারা যেন তাদের অপরিচ্ছন্নতা দূর করে এবং তাদের মানত পূর্ণ করে এবং তাওয়াফ করে প্রাচীন ঘরের।” [সূরা আল-হজ, আয়াত: ২৯]

তাছাড়া হাদীসে এসেছে,

«إن الله يباهي بأهل عرفات أهل السماء فيقول لهم انظروا إلى عبادي جاءوني شعثاً غبراً».

“মহান আল্লাহ আরাফাতে অবস্থানকারীদের নিয়ে আসমানের অধিবাসী (ফেরেশতা) দের নিকট গর্ব করে বলেন, দেখ, আমার বান্দাগণ আমার নিকট উস্কাখুস্কু ধুলি-মলিন অবস্থায় এসে হাযির হয়েছে।”[1]

আলিমগণ কুরআনের উপরোক্ত আয়াত ও হাদীস থেকে এটাই বুঝেছেন যে, হজের সফর সৌন্দর্যচর্চার জন্য নয়।

তবে সৌন্দর্য চর্চার শ্রেণিভেদে হুকুমেরও পার্থক্য হয়ে থাকে। মূলতঃ ইসলাম এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট বেশ কিছু দিক-নির্দেশনা দিয়েছে:

ইহরাম অবস্থায় কোনো মহিলা হাজী সাহেবার জন্য তার নিজের চুল কাটা হারাম। চাই সেটা মাথার হোক, কিংবা শরীরের অন্য কোনো অংশের চুল।

ইহরাম অবস্থায় কোনো মহিলা হাজী সাহেবার জন্য শরীরে কিংবা কাপড়ে সুগন্ধি ব্যবহার করা হারাম। তাছাড়া কোনো মহিলার জন্য শরীরে কিংবা কাপড়ে সুগন্ধি বা আতর লাগিয়ে বেগানা পুরুষের সাথে মেলা-মেশা করা হারাম। চাই তা ইহরাম অবস্থায় হোক অথবা না হোক, আবার তা হজের স্থানে হোক কিংবা অন্য কোনো স্থানে হোক। কেননা, এটি খুব বড় অন্যায় এবং এতে রয়েছে বড় ফেতনা। আর যদি মহিলাদের জন্য মসজিদে সুগন্ধি লাগিয়ে যাওয়া হারাম হয়, তবে অন্যান্য স্থানে কী হবে? কিন্তু যখন ইহরাম অবস্থায় না থাকে, তখন ঘরের মধ্যে সুগন্ধি ব্যবহার করা যাবে। যেমনটি করেছিলেন ‘আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা।

ইহরামকারী মহিলা ইহরাম অবস্থায় শরীরে এমন তেল লাগাতে পারে, যাতে কোনো সুগন্ধি নেই।

মহিলা হাজী সাহেবা হাতের চুড়ি, আংটি ইত্যাদি পরে ইহরাম বাঁধতে পারেন। তবে সে যেন তা মাহরাম নয় এমন পুরুষ অর্থাৎ, বেগানা পুরুষের সামনে প্রকাশ না করে।

ইহরাম অবস্থায় মহিলা হাজী সাহেবা আয়নার দিকে তাকাতে পারবেন।

ইহরামকারী মহিলা ইহরাম অবস্থায় মেহেদি ব্যবহার করতে পারবেন।

ইহরাম অবস্থায় মহিলাদের জন্য সুর্মা লাগানো মাকরূহ।

হজে মহিলা ও তার সন্তান-সন্ততি

অনেক মহিলারাই হজে তাদের ছোট সন্তান-সন্ততিদের নিয়ে আসেন। তাই এখানে ছোট সন্তান সন্ততিদের হজের হুকুম-আহকাম তুলে ধরা হল।

ছোট সন্তান ছেলে হোক বা মেয়ে হোক, তাদের হজ শুদ্ধ হবে। কিন্তু তা দ্বারা ইসলামের ফরয হজ আদায় হবে না। অর্থাৎ যদি প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগে হজ করে, তবে সে হজ আদায় হবে। তবে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর ইসলামের ফরয হজ আদায় করতে হবে। ইবন আববাস থেকে বর্ণিত, “জনৈক মহিলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এক সন্তানকে দেখিয়ে বলল, ‘এর জন্য কি হজ আছে?’ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: ‘হ্যাঁ, এবং তোমার জন্য সওয়াব রয়েছে।”[2]

ইহরাম বাধার সময় বড় হাজীরা যা করে, ছোটদেরকেও তাই করাতে হবে। সন্তান ছেলে হলে পুরুষদের জন্য যা পরা যাবে না ছোট ছেলের জন্যও তা পরা যাবে না, আর সন্তান মেয়ে হলে মহিলাদের জন্য যা পরা যাবে না তা ছোট মেয়ের জন্যও পরা যাবে না।

অভিভাবকরা যদি ইহরাম অবস্থায় থাকে তবে ছোটদের পক্ষে ইহরাম বাঁধতে পারবেন। চাই সন্তান ছেলে হোক বা মেয়ে হোক।

ছোট সন্তানের পক্ষে হজের যেসব কাজ করা সম্ভব হবে, তা সন্তানকে করতে হবে। এসব কাজ তার অভিভাবক তার পক্ষে আদায় করতে পারবে না। যেমন, ‘আরাফাতে অবস্থান করা, মুযদালিফায় রাত্রি যাপন করা ইত্যাদি। আর ছোট সন্তান যেসব কাজ করতে পারবে না, তার অভিভাবক তার পক্ষ হতে সেগুলো করতে পারবে। যেমন, তালবিয়া পাঠ, পাথর নিক্ষেপ ইত্যাদি।

কিন্তু যে অভিভাবকগণ তাদের সন্তানের পক্ষ হতে পাথর নিক্ষেপ করবেন, তাদেরকে প্রতি জামরাতে প্রথমে নিজের পক্ষ থেকে পাথর নিক্ষেপ করে পরে তাদের সন্তানের পক্ষ থেকে নিক্ষেপ করতে হবে।

তাওয়াফের সময় যদি সন্তান হাঁটতে সক্ষম হয়, তবে সে নিজে নিজে হেঁটে তাওয়াফ করবে। নইলে তাকে বহন করে বা সাওয়ার করে তাওয়াফ করানো যাবে। এ অবস্থায় বহনকারীর জন্য ইহরাম অবস্থা হওয়া শর্ত নয়।

কোনো ক্রমেই ছোট ছেলে-মেয়েদেরকে হারাম শরীফের বারান্দায় খেলা-ধুলার জন্য ছেড়ে দেওয়া যাবে না। কেননা এতে অন্যান্য মুসল্লিদের অসুবিধা হয়, যা অভিভাবকের গুনাহের কারণ হতে পারে।

অনুরূপভাবে যে সমস্ত সন্তান-সন্ততি নিজেরা নিজেদের পায়খানা-প্রস্রাব থেকে পবিত্র হতে শিখেনি, তাদেরকে তাদের অভিভাবক পবিত্র রাখবেন। যাতে করে মসজিদের পবিত্রতা রক্ষা হয়।

একনজরে মহিলা ও পুরুষ হাজীদের মধ্যে পার্থক্যসমূহ

মহান আল্লাহ মহিলা পুরুষের মাঝে সৃষ্টিগত যেমন কিছু পার্থক্য রেখেছেন তেমনিভাবে তাদের সৃষ্টি ও শক্তি-সামর্থ্যের সাথে সামঞ্জস্য রেখে এবাদতের ক্ষেত্রেও কিছু বিষয়ে পার্থক্য করেছেন।

আমরা যদি হজের আহকামসমূহের প্রতি তাকাই তাহলে দেখতে পাব যে, এ পার্থক্যের মূল ভিত্তি হচ্ছে তিনটি বিষয়:

মহিলাদের ওপর পুরুষদের দায়িত্বশীলতা।

মহিলাদের হায়েয ও নেফাস জনিত সমস্যা।

মহিলাদের পর্দা ও অবাধ বিচরণ নিয়ন্ত্রণ।

 

মহিলাদের ওপর পুরুষদেরকে মহান আল্লাহ দায়িত্বশীল ঘোষণা করেছেন। আর সে কারণে যে যে বিষয়ে মহিলারা পুরুষদের থেকে ভিন্ন তা হচ্ছে:

নফল হজের জন্য মহিলাদেরকে তাদের স্বামীর অনুমতি নিতে হবে।

ফরয হজের জন্য মহিলাদেরকে তাদের স্বামীর অনুমতি নেওয়া মুস্তাহাব।

কোনো মহিলা ইদ্দতে থাকলে সে হজের সফরে যেতে পারবে না।

 

মহিলাদের হায়েয ও নেফাসজনিত সমস্যার কারণে যে যে বিষয়ে মহিলারা পুরুষদের থেকে ভিন্ন তা হচ্ছে:

হায়েয-নেফাস অবস্থায় মসজিদুল হারামে প্রবেশ করতে পারবে না।

হায়েয-নেফাস অবস্থায় বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করতে পারবে না। (তবে যে অবস্থা সম্পর্কে পূর্বে আলোচিত হয়েছে সেটা ভিন্ন)

মক্কা ছাড়ার সময় কোনো মহিলা হায়েয-নেফাস অবস্থায় থাকলে তার আর বিদায়ি তাওয়াফ করা লাগবে না।

মহিলাদের পর্দা, ইজ্জত আব্রুর সংরক্ষণের ক্ষেত্রে তারা পুরুষদের থেকে যে যে বিষয়ে ভিন্ন তা হচ্ছে:

মাহরাম ব্যতীত সফর করা মহিলাদের জন্য জায়েয নয়।

যদি হজের কর্মকাণ্ড শুরু করার পর কারও মাহরাম মারা যায় তবে তিনি তার হজ কমপ্লিট করে নেবেন।

মহিলাগণ হাত মোজা ব্যবহার করতে পারবেন না।

এমন বোরকা ব্যবহার করা যাবে না যাতে মুখ ঢাকা পড়ে যায়।

মহিলাগণ হজে স্বাভাবিক অবস্থায় মুখ ঢাকতে পারবেন না।

যদি গায়রে মাহরাম তাদের সামনে এসে যায় তখন তারা মুখ ঢেকে ফেলবেন।

মাথার ওপর থেকে ঢেকে রাখার মত কাপড় রাখা যাবে যা প্রয়োজনের সময় নীচে নামিয়ে ফেলা যায়।

নেকাব পরতে পারবে না।

মহিলাগণ অলংকার ব্যবহার করতে পারবেন।

সুগন্ধি নেই এমন সৌন্দর্যমূলক কিছু পরতে পারবেন। তবে না পরা ভালো।

মেহেদি ও খেজাব ব্যবহার করতে পারবেন। তবে সুগন্ধি মিশ্রিত হতে পারবে না।

বড় ও উঁচু স্বরে তালবিয়া পাঠ করবে না।

অনুরূপভাবে তাওয়াফ, সা‘ঈ ও অন্যান্য দো‘আর সময়ও তার স্বর উঁচু হবে না।

মহিলাগণ রমল করবে না।

মহিলাগণের ওপর ‘ইযতেবা’ নেই।

মহিলাগণ পুরুষদের ভিড় থেকে বাঁচার জন্য প্রান্তদিক থেকে তাওয়াফ করবেন।

ভিড় থাকলে হাজরে আসওয়াদ এবং রুকনে ইয়ামানী ধরার চেষ্টা না করাই ভালো।

সা‘ঈর সময় মহিলাগণ দুই সবুজ গম্বুজের মাঝখানে দৌড়াবেন না।

সা‘ঈর সময় মহিলাগণ সাফা পাহাড়ের উপরে বেয়ে উঠার চেষ্টা করবেন না।

মহিলা হাজী সাহেবা নিজের ‘হাদী’ নিজে জবাই করার চেয়ে অন্যের মাধ্যমে তা করানো উত্তম।

মহিলা চুল খাট করবে, যার পরিমাণ পূর্বে বর্ণনা করা হয়েছে। তারা মাথা কামাতে পারবে না। এটা জায়েয নেই।

শরী‘আত নিষিদ্ধ কিছু কর্মকাণ্ড থেকে সাবধানকরণ

সাবধান! কোনো ক্রমেই বেপর্দা হওয়া যাবে না, যে কাপড় শরীর ঢাকে না সে কাপড় পরা যাবে না। ইহরাম অবস্থায় থাকলেও কোনো বেগানা পুরুষের সামনে মুখ খোলা রাখা যাবে না।

সাবধান! যতটুকু সম্ভব নারী-পুরুষের অবাধ মিলন হয় এমন অবস্থা থেকে দূরে থাকতে হবে। আর যে সময়গুলোতে ভিড় বেশি হয় না, সে সময়গুলোতে হজের কাজ সম্পন্ন করার চেষ্টা করতে হবে। যেমন: রাতের বেলায় পাথর নিক্ষেপ।

সাবধান! শির্ক ও বিদ‘আত থেকে নিজেকে দূরে রাখতে হবে। অনুরূপভাবে না জেনে কারও অন্ধ অনুকরণ থেকে বিরত থাকুন এবং হজের আহকামসমূহ সঠিক পদ্ধতিতে জেনে নিন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “তোমরা আমার থেকে তোমাদের হজের নিয়ম-কানুন শিখে নাও।”[3] তাই কোনো একটি গ্রহণযোগ্য হজের বই সাথে নেয়ার জন্য নসীহত করছি।

সাবধান! গিবত, পরনিন্দা, পরচর্চা, ঝগড়া ও দুনিয়াবী ব্যাপারে অধিক কথাবার্তা বলা থেকে নিজেকে হেফাযত করতে হবে। বিশেষ করে এ পবিত্র ভূমির দাবি হচ্ছে যিকির এবং দো‘আ, তাই এখানে এ সমস্ত কাজে সময় নষ্ট করার মত গুনাহ আর হতে পারে না।

সাবধান! সাধারণ লোকদেরকে দীনি ব্যাপারে প্রশ্ন করা থেকে দূরে থাকতে হবে। প্রশ্ন করতে হবে আলিমদেরকে। মহান আল্লাহ বলেন, “তোমরা যদি না জান তবে জ্ঞানীদেরকে জিজ্ঞেস কর।”[4]

সাবধান! অপবিত্র অবস্থায় আল্লাহর ঘরের তাওয়াফ যেন না হয়। অনুরূপভাবে হায়েয, নেফাস অবস্থায় মসজিদেও প্রবেশ করবেন না। এ ব্যাপারে লজ্জা যেন আপনাকে সঠিক পথে চলতে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়।

সাবধান! যে সমস্ত কর্মকাণ্ডে কোনো উপকার নেই তা পরিত্যাগ করুন। অকারণে বাজারে বাজারে ঘোরা-ফেরা ত্যাগ করুন। যদি যেতেও হয় খুব সামান্য সময়ের জন্য এবং নিজ মাহরামকে সাথে নিয়ে যান।

সাবধান: অপর মুসলিম বোনদের ওপর অহংকার করে থাকবেন না। তাদের নিয়ে ঠাট্টা করা থেকে বিরত থাকুন। দীনদার মুসলিম বোনদের সাথী হওয়ার চেষ্টা করুন।

সাবধান! হজের সফর এমনিতেই কষ্টের সফর। এতে ধৈর্য ধরে রাখা একটি বিরাট গুণ। তাই অতি সামান্যতেই রাগান্বিত হওয়া, বিরক্ত হওয়া, অভিযোগ দেওয়া থেকে নিজেকে সংযত রাখুন। আর মনে রাখুন, হজের সফরে কষ্ট হবেই। কষ্টের কারণে সাওয়াব পাওয়া যাবে এবং গুনাহ মাফ হবে। তবে যদি ধৈর্য রাখতে না পারেন তবে তাতে  গুনাহগার, হতে পারেন। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা তার উমরাহর সফরে কষ্ট হচ্ছে জানালে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “তোমার কষ্ট ও খরচ অনুপাতে তোমার সওয়াব রয়েছে”।[5]

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্য হাদীসে আরো বলেছেন: “মুসলিম কোনো কষ্ট, ব্যথা, চিন্তা, পেরেশান ইত্যাদি যাতেই নিপতিত হোক না কেন আল্লাহ এর দ্বারা তার গুনাহের কাফফারা করে থাকেন”।[6]

সাবধান! নিজের নেক আমলের ব্যাপারে খুব বেশি আশাবাদী হয়ে গর্ববোধ করবেন না। তাছাড়া লোক দেখানো বা লোকরা জানতে পারুক এমন প্রবণতা যেন আপনার মনে না থাকে। কেননা, সামান্য লোক দেখানোর প্রবণতাও ছোট শির্ক। যা অপরাপর কবিরা গুনাহ থেকে বড় ধরনের গুনাহ। যারা এ ধরনের কাজ করে হা শরের মাঠে তাদের বলা হবে “যাদেরকে তোমরা দুনিয়ায় দেখানোর জন্য কাজ করেছিলে তাদের কাছে যাও এবং দেখ সেখানে তোমাদের কর্মকাণ্ডের প্রতিদান পাও কি না?”[7]


[1] মুসনাদে আহমাদ: ২/২২৪, ৩০৫।

[2] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৩৩৬

[3] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১২৯৭।

[4] সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ৭

[5] মুস্তাদরাকে হাকিম, হাদীস নং ১৭৩৩, ১৭৩৪্

[6] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫৩১৮; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৪৭৩।

[7] মুসনাদে আহমাদ ৪/৪২৯।


[1] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৯০, ২৯৯; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১২১১।