মূল: আরজ আলী সমীপে । লেখক: আরিফ আজাদ । ওয়েব সম্পাদনা: আবু বক্কার ওয়াইস বিন আমর

পরকাল বিষয়ে আরজ আলী সাহেবের প্রশ্নগুলো নিয়ে আলোচনা করার আগে একটি বিষয় বলা জরুরী মনে করছি । উনার প্রশ্নগুলোকে হুবহু উল্লেখ করে কলেবর বৃদ্ধি না করে এখন থেকে আমরা ওনার প্রশ্নের মূল পয়েন্ট নিয়ে আগাব, ইনশাআল্লাহ । এই অধ্যায়ের শুরুতেই আরজ আলী মাতুব্বর প্রশ্ন করেছেন, ‘জীব সৃষ্টির উদ্দেশ্য কি?’

তিনি বলেছেন,

“মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্যই যদি হয় আল্লাহর নাম ও গুনকীর্তন করা, তাহলে জীব সৃষ্টির কারণ কি ?”

আরজ আলী সাহেব ঠিক বলেছেন । মানব সৃষ্টির উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর ইবাদত করা, আর অন্য সব কিছু সৃষ্টি করা হয়েছে মানুষের জন্য । যেমন কুরআন ঘোষণা দেয়,

“পৃথিবীর সবকিছু তিনি তোমাদের জন্যই সৃষ্টি করেছেন”

তাহলে মানুষ সৃষ্টির পাশাপাশি জীবজগৎ কেন সৃষ্টি করা হয়েছে তা কুরআন সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে । এক্ষেত্রে অভিযোগ তোলার আর কোন দরকার আছে বলে মনে করি না । প্রশ্ন তোলার আগে আরজ আলী সাহেব কোরআনটাকে একটু নেড়েচেড়ে দেখলে উত্তর পেয়ে যেতেন বলে মনে করি । এছাড়াও প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার জন্য জীবজগতের রয়েছে ব্যাপক অবদান । ‘খাদ্য শৃংখল’ নামের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জীবজগৎ থেকে উদ্ভিদজগত সবার রয়েছে কোন না কোন অবদান । প্রকৃতির সকল জীবজগৎ এবং উদ্ভিদজগত কোন না কোন ভাবে একে অন্যের উপর নির্ভরশীল । সুতরাং প্রকৃতিতে মানুষ এবং জীব জগতের টিকে থাকার উপরও পরস্পরকে দরকার । এটা ভাবার কোন উপায় নেই যে, জীবজগতের সৃষ্টি নিরর্থক । আরজ আলী সাহেবের এরপর প্রশ্ন করছেন,

“পাপ পুণ্যের ডায়েরি থাকতে হবে কেন ? আল্লাহ যদি সর্বদর্শী ও সর্বশক্তিমান হন, তাহলে মানুষের পাপ পুণ্য তিনি দেখলেই তো পারেন । ফেরেশতা দিয়ে সংরক্ষণ করার কি দরকার ?”

এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার জন্য আমরা একটি দৃশ্যের অবতারণা করতে পারি । ধরা যাক, আরজ আলী সাহেবকে পরকালে তার হিসাব নিকাশসহ ডাকা হলো । আরো ধরা যাক যে, ফেরেশতারা আমাদের পাপ পুণ্যের হিসাব রাখে না । এমতাবস্থায়, আরজ আলী সাহেবকে ডেকে আল্লাহ যদি বলেন, আরজ আলী, তুমিঃ ইহকালে এই পাপ করেছ, ওই পাপ করেছ । সে জন্য তোমার এই এই শাস্তি । আরজ আলী সাহেব যদি তখন বলে বসে, ‘না তো ! আমি এইসব করিনি ! আমি আবার এসব কবে করলাম ? কোন প্রমাণ আছে ? প্রমাণ চাই ।’

মানুষ যে পাপ পুণ্য করে ফেরেশতারা তা লিপিবদ্ধ করেন । এটা তার একটা ডকুমেন্ট, একটা ভিডিওচিত্র, একটা প্রমান । আল্লাহ বলেছেন,

“অতএব কেউ অণু পরিমাণ সৎকাজ করলে তাও সে হাশরের ময়দানে দেখবে এবং কেউ অণু পরিমাণ অসৎকর্ম করলে তাও সে সেদিন দেখবে”

১. সূরা যিলযাল (৯৯) ০৭-০৮

সেদিন যখন আরজ আলী সাহেব তার কৃতকর্মের কথা অস্বীকার করতে চাইবে, তখন আল্লাহ এই ডকুমেন্টস, এই ভিডিওচিত্র প্লে করে বলবেন, ‘এই দেখো তো । এসব কে করেছে ?’

আরজ আলী সাহেবের তখন মনে পড়বে সব । তিনি বলবেন, ‘তাই তো ! তাই তো !’ আরজ আলী সাহেবেরা যে অস্বীকার করবে সেটা আল্লাহ তা’আলা জানেন । তাই তিনি ফেরেশতাদের মাধ্যমেও ডকুমেন্ট সংরক্ষণ করছেন যাতে এসব অবিশ্বাসীদের প্রশ্নের আর কোন জায়গা না থাকে ।

একটা প্রশ্ন থেকেই যায় । আল্লাহ তো চাইলেই ভিডিও কাটুন সংগ্রহ করতে পারতেন । তিনি কেন ফেরেশতাদের মাধ্যমে সংরক্ষণ করতে গেলেন ? বলে রাখা ভাল, এখানে একটি ‘থ্রি স্টেপ ভেরিফিকেশন’ পদ্ধতি আছে । যেমন, প্রথমে আল্লাহ নিজেই তার কৃতকর্মের বর্ণনা শোনাবেন । তারা যদি বলে, ‘মানি না’, তখন ফেরেশতাদের সংরক্ষণ করা রেকর্ড আনা হবে তাদের সামনে । এটা দেখেও যদি তারা সন্দেহে ভোগে, বিশ্বাস করতে না চায়, তখন আল্লাহ তাদের অঙ্গ প্রতঙ্গের জবান খুলে দেবেন । তখন তাদের অঙ্গ-প্রতঙ্গ তাদের কৃতকর্মের সাক্ষ্য দেবে । কুরআন বলছে,

“সেদিন আমি তাদের মুখে সিলমোহর লাগিয়ে দেব । তাদের হাত আমার সঙ্গে কথা বলবে । আর তারা যা করত, সে সম্পর্কে তাদের পাগুলো সাক্ষ্য দেবে”

এই থ্রি স্টেপ  ভেরিফিকেশনের একটা মধ্যবর্তী স্টেপে ফেরেশতাদের কাজ আছে । এটার মানে কি এটাই বোঝায় যে, আল্লাহ তাআলা এসব সংরক্ষণ করতে অপারগ ?

আরজ আলী সাহেব বলেছেন,

“পরকালের সুখ দুঃখ কি শারীরিক না আধ্যাত্মিক ? পরকালের শাস্তি-পুরস্কার সম্পর্কে যে বর্ণনাগুলো ধর্মীয় কিতাবাদী এবং ধর্মযাজকগন বলে থাকেন, যেমন শাস্তি হিসেবে পুজ, গরম পানি ইত্যাদি এবং পুরস্কার হিসেবে নানান কিছু পাওয়ার কথা জানতে পারি, তাহলে ধরে নেওয়া যায় যে পরকালের সুখ-দুঃখ আধ্যাত্মিক নয়, শারীরিক । কিন্তু মানুষ মরার পর তো পচে-গলে মাটির সাথে মিশে যায় । এমতাবস্থায়, পচে-গলে মাটিতে মিশে যাওয়া মানুষকে কিভাবে সারিবদ্ধভাবে শাস্তি দেবেন ?”

মজার প্রশ্ন । আচ্ছা ধরুন, আপনার হাতে একটি স্মার্টফোন আছে । সেই স্মার্টফোন দিয়ে আপনার ফেসবুকে লগইন করা আছে । ধরুন, আপনি মনের আনন্দে রিকশায় বসে ফেসবুক চালাচ্ছেন । এমতাবস্তায়, আপনার রিক্সাটা গর্তে পড়ল, আর আপনার ফোনটা হাত থেকে পড়ে টুকরো টুকরো হয়ে গেল । এখন আপনার ফোনটা তো ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল । এই ফোনে তো আপনার ফেসবুক আইডি লগইন করা ছিল । এখন ফোন ভেঙে যাওয়ার সাথে সাথে কি আপনার শখের ফেসবুক আইডি নষ্ট হয়ে গেল ? আপনার এতদিনের ভার্চুয়াল লাইফ, এতো এতো ফ্রেন্ড, ফলোয়ার এসব কি ফোন ভেঙে যাওয়ার সাথে সাথে নষ্ট হয়ে গেল ? না, আপনি যখন বাসায় এসে আপনার ল্যাপটপে ইমেইল আর পাসওয়ার্ড দিয়ে লগইন করবেন, দেখবেন আপনার সকল পার্সোনাল তথ্য আবার চলে এসেছে আপনার কাছে । এই কাজটা যদি মার্ক জাকারবার্গ পারে, আল্লাহ পারবেন না কেন ? মানুষের শরীরটাকে ফোনের সাথে তুলনা করুন আর রূহটাকে তুলনা করুন ফেসবুক আইডির সাথে । এখন আপনার দৈহিক শরীর নষ্ট হয়ে গেলেও পরকালে যখন আপনার এই রূহটাকে আপনারই প্রতিকপিতে লগইন করানো হবে, তখন কি আপনার শরীরকে ফিরে পাওয়া যাবে না ? কাজটা কি আল্লাহর জন্য খুব কঠিন ?

নাহ, এটা আল্লাহর জন্যে খুবই সহজ । আল্লাহ বলেছেন,

“তিনি সৃষ্টির সূচনা করেন, পরে তিনিই আবার সৃষ্টি করবেন”

১. সূরা ইউনুস (১০) ০৪

আরজ আলী সাহেব এবং তার অনুসারীদের আমরা এটা জানিয়ে রাখতে চাই যে, পরকালের সুখ দুঃখ অবশ্যই শরীরের উপর হবে । মানুষের শরীর মরার পরে পচে-গলে মাটির সাথে মিশে গেলেও সেখান থেকে পুনরায় সৃষ্টি করার ক্ষমতা আল্লাহ অবশ্যই রাখেন । আরজ আলী সাহেব প্রশ্ন করেছেন এরকম,

“ ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলমান জাতিরাই লাশ মাটিতে পুতে রাখে, অন্যান্য জাতিরা ইহা করে না । তাহারা কেউ লাল জলে ভাসাইয়া দেয়, কেহ মাঠে ফেলিয়া রাখে, কেউ পর্বতের চূড়ায় রাখিয়া দেয়, কেহ গাছের শাখায় ঝুলিয়া রাখে”

আরজ আলী সাহেব মৃতদেহ কবরস্থ করার প্রক্রিয়ার কথা এবং পরকালের শাস্তির কথা উল্লেখ করে বলেছেন, সবাই তো মৃতদেহ কবরস্থ করে না । বরং কেহ-বা আগুনের জ্বালাইয়া দেয় । এই ভাবে যে সকল মানুষ পরজগতের যাত্রী হয় তাহাদের গোর আজাব হয় কি না ?  যদি হয়, তবে কিরূপে ? আর যদি না হয়, তবে লাশকে কবরে রাখিয়া লাভ কি ?

গোটা ইসলামের কোথাও কিন্তু এই কথা বলা নেই যে, পরকালের শাস্তি-পুরষ্কার, জান্নাত-জাহান্নাম বিচারকার্য ইত্যাদি সম্পন্ন করার জন্য মৃতদেহকে কবরস্থ করা আবশ্যক । কেউ যদি সাগরে ডুবে মারা যায় এবং তার লাশকে যদি সাগরের মাছেরা খুবলে খায়, তাহলে কি পরকালের বিচার হবে না ?

আগেই বলেছি পরকালের শাস্তি-পুরস্কার, আজাব ইত্যাদি মানুষের দুনিয়াবী শরীরের উপর নির্ভর করে না । কারণ কবরস্থ করার পরে ব্যক্তিমাত্রেরই লাস পচে গলে  মাটিতে মিশে যায় । কিন্তু পরকালের হিসাব নিকাশ কার্যাবলী সম্পন্নের জন্য যা দরকার তা হল মানুষের আত্মা বা রুহের । মানুষ পানিতে ডুবে মারা যাক বা আগুনে পুড়ে, তার রুহের কোনই ক্ষতি হয় না । সেই রূহটাই দরকার পরকালের হিসাব নিকাশের জন্য । পরকালে আল্লাহ তা’আলা তাঁর ক্ষমতা বলে সেই রুহটাতে আকৃতি দান করবেন । কাজটা আল্লাহর জন্য খুবই সহজ ।

সুতরাং একজন লোক কিভাবে মারা গেল বা তাকে কিভাবে কবরস্থ করা হলো সেটার উপর পরকালের হিসাব নিকাশ মোটেই নির্ভরশীল নয় । আরজ আলী সাহেবের এই ক্ষুদ্র জিনিসটি বোঝা উচিত ছিল বৈকি ।

আরজ আলী সাহেব ‘পরলোকের স্বরূপ কি’ এবং ‘স্বর্গ নরক কোথায়?’ শিরোনামে প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন । এই শিরোনামের প্রশ্নে উনার মূল বক্তব্য এরকম -মানুষ যেহেতু জ্ঞান-বিজ্ঞানে অনেক এগিয়ে গেছে, পদার্থের অণু-পরমাণু পর্যন্ত ভেঙে  এখন তার শক্তি পরিক্ষা করতে পারছে, সেহেতু পরকাল বা পরজগত যদি থেকেই থাকে, তাহলে বিজ্ঞান বা বৈজ্ঞানিকগণ পরকালকে দেখতে পায় না কেন ?

উনি আরও বলেছেন, পরকাল যদি থেকেই থাকে, তাহলে সেটা অবশ্যই যেকোনো এক সৌরজগতের অধীন । এখন পরকালের বর্ণনা থেকে যেহেতু জানা যায় যে, কেয়ামতের ময়দানে সূর্যের প্রখর তাপে পাপীদের মস্তিস্ক বিগলিত হবে, তাহলে পরকালেও একটি বা একাধিক সূর্য থাকবে । যদি সূর্য থেকে থাকে, তাহলে সেই সূর্য কি ঘুরবে ? সেখানেও কি দিনরাত্রি হবে ?

আরজ আলী সাহেবের প্রতি যথাযথ সম্মান রেখেই বলতে হয়, মানুষ জ্ঞানের দিক  থেকে কতটুকু এগিয়েছে বলতে পারি না কিন্তু বিজ্ঞানের দিক থেকে যে খুব একটা মানুষ এগোতে পারিনি এখনো, বিজ্ঞান এখন সেটা অকুণ্ঠচিত্তে স্বীকার করে  ।

কোয়ান্টাম মেকানিক্স আবিষ্কার হওয়ার পরে এই সত্য আরও সহজ হয়ে ফুতে ওঠে । এতদিন মানুষ ভাবতো, তারা মনে হয় মহাবিশ্বের সকল রহস্য জেনে বসে আছে । বিশাল মহাবিশ্বের আনাচে কানাচে এমন কোন জায়গা হয়তো নেই যেখানে বিজ্ঞানীদের টর্চ লাইটের আলো কিংবা হাবলের টেলিস্কোপ গিয়ে হানা দিয়ে আসে নি । প্রকৃতির এমন কোন রহস্য হয়তো বা নেই যেটার পেছনের রহস্য মানুষ উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয় নি । এ রকম অবস্থায় বিজ্ঞান বা বিজ্ঞানীদের নিয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে থাকা মানুষকে বিশাল একটি শোকের সংবাদ শুনাল আমেরিকাভিত্তিক বিজ্ঞানী সংস্থা ‘নাসা’ ।

তারা জানাচ্ছে, এই সুবিশাল মহাবিশ্ব সম্পর্কে মানুষ আদতে খুব অল্পই জানতে পেরেছে । সমগ্র মহাবিশ্বের তুলনায় মানুষের জানার পরিমান অত্যন্ত ক্ষুদ্র । নাসা জানাচ্ছে, এই মহাবিশ্ব সম্পর্কে মানুষ এখন পর্যন্ত কেবল ৫% জানতে পেরেছে । বাকি ৯৫% সম্পর্কে মানুষ কিছু জানে না, কিছুই না ।

আরজ আলী সাহেব যখন বিজ্ঞানকে আশ্রয় করে হাবলের টেলিস্কোপ দিয়ে কোন এক সৌরজগতে জান্নাত-জাহান্নামের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ খুঁজতে ব্যস্ত, তখন বিজ্ঞান আমাদের জানাচ্ছে যে, মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের জানার পরিধি নিত্যান্ত সীমিত । তারা জানাচ্ছে, এত এত প্রযুক্তি, এত এত উন্নত বিজ্ঞান, কলা-কৌশল প্রয়োগ করেও আমরা এখন পর্যন্ত মাত্র ৫% মহাবিশ্বকে জানতে পেরেছি । বাকি ৯৫% সম্পর্কে আমরা নাকি কিছুই জানি না । আমাদের মহাবিশ্ব, আমাদের পৃথিবী, আমাদের চারপাশের জগত, পদার্থের অনু-পরমানু ইত্যাদি সবকিছু মিলে মাত্র ৫% । বাকি ৯৫% তাহলে কি ? এই বাকি ৯৫% হলো অদৃশ্য বস্তু । আমাদের বিজ্ঞান এর নাম দিয়েছে ‘ডার্ক ম্যাটার’ । এই ডার্ক ম্যাটারের অস্তিত্ব সম্পর্কে আমরা সম্প্রতি জানতে পেরেছি । কিন্তু এখানে কি আছে, এখানে আসলে কি হয়, এটা কোন জগৎ, এটা যদি কোন জগৎ হয়ে থাকে তাহলে সেই জগতের রহস্য কি  তার কোন কিছুই আমাদের কাছে পরিষ্কার নয় ।

এই ডার্ক ম্যাটার সম্পর্কে নাসা বলছে, ‘ More is  unknown than is known. No one expected this, no one knew how to explain it. But something was causing it. It is a complete mystery. But it is an important mystery.

অর্থাৎ সেই জগতটা কেমন, সেখানে কি হয় তা নিয়ে আমাদের কোনো ধারণা নেই । পুরো মহাবিশ্ব সম্পর্কে মাত্র ৫% জ্ঞান নিয়ে, বাকি ৯৫% ডার্ক ম্যাটারের জগত নিয়ে আরজ আলী সাহেবরা যদি ‘জান্নাত জাহান্নাম নাই, থাকলে দেখিনা কেন’ বলে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে, তখন সত্যিকার অর্থেই হাসি পায় !

তাছাড়া আরজ আলী সাহেবরা ধরেই নিয়েছেন যে, জান্নাত-জাহান্নাম, পরকাল বলে কিছু থেকে থাকলে প্রকৃতি তা আমাদের সামনে মেলে ধরবে, আর আমরা বিজ্ঞানের রঙিন চশমা চোখে লাগিয়ে তা দিব্যি দেখে ফেলতে পারব । কিন্তু বিজ্ঞান কি আমাদের প্রকৃতি সব রহস্য জানাতে পারবে ? এর সোজাসাপ্টা উত্তর হচ্ছে, ‘না’ । কোয়ান্টাম মেকানিক্স এসে বিজ্ঞানের এই ধ্রুব সত্যটা আমাদের সকলের কাছে পরিষ্কার করে দিয়েছে । বাংলাদেশের একজন প্রথম সারির বিজ্ঞানমনস্ক ব্যক্তি, বিজ্ঞান লেখক অধ্যাপক জাফর ইকবাল  স্যার উনার কোয়ান্টাম মেকানিক্স বইয়ের শুরুতে এই সত্যটা অকপটে স্বীকার করেছেন । তিনি তার বইতে লিখেছেন,

‘কাজেই যারা বিজ্ঞান চর্চা করে তারা ধরেই নিয়েছে  আমরা যখন বিজ্ঞান দিয়ে পুরো প্রকৃতিটাকে বুঝে ফেলবো, তখন আমরা সবসময় সবকিছু সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারব । যদি কখনো দেখি কোন একটা কিছু ব্যাখ্যা করতে পারছি না, তখন বুঝতে হবে এর পেছনের বিজ্ঞানটা তখনো জানা হয়নি । যখন জানা হবে, তখন সেটা চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করতে পারবো । এককথায়, বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা বা ভবিষ্যদ্বাণী সবসময়ই নিখুঁত এবং সুনিশ্চিত । কোয়ান্টাম মেকানিক্স বিজ্ঞানের এই ধারণাটাকে পুরোপুরি পাল্টে দিয়েছে । বিজ্ঞানীরা সবিস্ময়ে আবিষ্কার করেছেন যে, প্রকৃতি আসলে কখনোই সবকিছু জানতে দেবে না । সে তার ভেতরে কিছু কিছু জিনিস মানুষের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখে । মানুষ কখনই সেটা জানতে পারবে না । সবচেয়ে চমকপ্রদ ব্যাপার হচ্ছে, এটা কিন্তু বিজ্ঞানের অক্ষমতা বা অসম্পূর্ণতা নয় । এটাই হচ্ছে বিজ্ঞান । বিজ্ঞানীরা একটা পর্যায়ে গিয়ে কখনোই আর জোর গলায় বলবে না ‘হবে’, তারা মাথা নেড়ে বলবে ‘হতে পারে’ ।

জাফর ইকবাল কোয়ান্টাম মেকানিক্স এর দোহাই দিয়ে বলেছেন, ‘বিজ্ঞান দিয়ে কখনোই আমরা প্রকৃতির সকল রহস্য উদঘাটন করতে পারব না । কিছু কিছু রহস্য আমাদের কাছে অধরাই থেকে যাবে ।’

এই যখন বিজ্ঞানের হাল, তখন সেই বিজ্ঞানের ঘাড়ে সওয়ার হয়ে বৈজ্ঞানিক ফিতা দিয়ে বাস্তব দুনিয়া রেখে ‘পরাবাস্তব’ দুনিয়ার জান্নাত-জাহান্নামের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ মাপতে নামাটা নিতান্তই নির্বুদ্ধির পরিচায়ক নয় কি ? তা ছাড়া, বিজ্ঞান পরকাল সম্পর্কে আমাদের কোন ধারনাই দিচ্ছে না তাও কিন্তু নয় । সাইন্টিফিক ওয়াল্ডে এখন After Life নিয়ে ব্যাপক কাজ হচ্ছে ।

অনেক বিজ্ঞানী এখন এই ‘After Life’ তথা ‘পরকাল’ নিয়ে গবেষণা করছেন । এক্ষেত্রে, মেডিকেল সাইন্সে ব্যাপক জনপ্রিয়তা এবং পরিচিত পাওয়া ‘Near Death Experience’ ফিল্ডের কথা উল্লেখ করা যায় । ‘Near Death Experience’ কি ? ‘Near Death Experience’ হচ্ছে মৃত্যুর খুব কাছাকাছি গিয়ে সেখান থেকে যে অভিজ্ঞতা হয়, তার উপর একটি পরীক্ষামূলক গবেষণা ।

অ্যাক্সিডেন্ট, হার্ট অ্যাটাক বা অন্য কোন কারণে যখন মানুষের হার্ট এবং ব্রেইন নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়, তখন মেডিকেলীয় ভাষায় সেটাকে ‘ক্লিনিক্যালি ডেড’ বলা হয় । ডাক্তারগণ ঘোষণা করেন যে ব্যক্তিটা মৃত । ‘ক্লিনিক্যালি ডেড’ ঘোষণা করার পরেও অনেক সময় কিছু কিছু লোক আল্লাহর ইচ্ছাতে প্রাণ ফিরে পায় । তারা বেঁচে ওঠে । বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন জায়গায় এরকম কোন রকম অহরহ ঘটনা ঘটে থাকে । ক্লিনিক্যালি ডেড ঘোষিত হবার পরও মৃত ব্যক্তির প্রাণ ফিরে পাওয়া ।

এরকম ক্লিনিক্যালি ডেথ অবস্থা থেকে বেঁচে আসা লোকদের নিয়ে কাজ করে ‘Near Death Experience’ । এই ফাউন্ডেশনের কাজ হলো বিশ্বের যে প্রান্তেই এরকম ‘ক্লিনিক্যালি ডেথ’ মানুষের সন্ধান পাওয়া যাবে, সেখান থেকে তথ্য সংগ্রহ করা ।

এখন পর্যন্ত এ ফাউন্ডেশন প্রায় ৫০০০ ক্লিনিক্যালি ডেড মানুষের তথ্য সংগ্রহ করেছে । পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা গেছে, প্রায় সবার এক্সপেরিয়েন্স এক্ষেত্রে একই রকম হয় ।

ক্লিনিক্যাল ডেথ অবস্থা থেকে ফিরে আসা মানুষ জানায়, তাদের হার্ট ব্রেন নিষ্ক্রিয় দেখে তাদের যখন ক্লিনিক্যালি ডেড ঘোষণা করা হয়, তারপরও তারা তাদের চারপাশের সবকিছু দেখতে পায়, শুনতে ও বুঝতে পারে । তারা বিচিত্র কিছু আলো দেখতে পায় । কারো কারো অভিজ্ঞতা এক গভীর নিকষ অন্ধকারের মধ্যে তাদের ছুটতে হচ্ছে, আবার কারো কারো অভিজ্ঞতা তারা ধবধবে সাদা শুভ্র আলোর ঝলকানি দেখতে পায় । তারা জানায়, এই অবস্থায় তারা (মেইনলি তাদের আত্মা) বাধাহীনভাবে চলাফেরা করতে পারে । এমনকি তখন তাদের জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে ।

এই পাচ হাজার লোকের এরকম ‘Near Death Experience’ কে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বিজ্ঞানী Jeffery Long একটি বই লেখেন । বইটির নাম ‘Evidence of the Afterlife’

মৃত্যু পরবর্তী জীবন নিয়ে গবেষণা করছে এরকম আরো অনেক বিজ্ঞানী আছে । যেমন, Dr. Marry Neal, Dr. Kevin Nelson, Dr. Sam Parnia, Dr. Jeffery Long, Dr. Mario Beauregard, Dr. Peter Fenwick প্রমুখ ।

আফসোস করতে হয়, বিজ্ঞানের ফিতা দিয়ে পরকালের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ মাপতে চাওয়া আরজ আলী সাহেবেরা যদি আজকে বেঁচে থাকতেন, তাহলে হয়তো দেখতে পেতেন যে, পরকালও এখন বিজ্ঞানের গবেষণার অন্যতম বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে । যে বিজ্ঞানের দোহাই দিয়ে তারা বালুর মধ্যে মুখ গুঁজে পরকালের অস্বীকার করতো, সেই বিজ্ঞানই যে এক সময় তাদের দিকে বুমেরাং হয়ে ফেরত আসবে তা যদি তারা জানত !

উনি জানতে চেয়েছেন, কিয়ামতের মাঠে সূর্যটা আসলে কীরূপ হবে, সেটা কি ঘুরবে না স্থির থাকবে ?

উনি যখন কিয়ামতের মাঠ অব্দি ধরে নিয়ে এগিয়েছেন, তাহলে তিনি ‘স্রষ্টা’ বলে কেউ একজনকে আপাতত স্বীকার করেই এগিয়েছেন । এখন যেই স্রষ্টা এই সুবিশাল সুনিপুণ পরিচালনাধীন মহাবিশ্ব ধ্বংস করতে সক্ষম, যিনি সূর্যকে তার নিজস্ব কক্ষপথ থেকে বিচ্যুত করে ধ্বংস করে দিতে সক্ষম, তিনি কি চাইলেই সূর্যের মতো কোনো কিছুকে কিয়ামতের মাঠে পুনর্বার সৃষ্টি করতে সক্ষম নন ? তিনি অবশ্যই সক্ষম ।পরকাল

“তিনি যখন কোন কিছু সৃষ্টি করার ইচ্ছা করেন, তিনি কেবল বলেন ‘হও’ আর তা হয়ে যায়”

উনি প্রশ্ন করেছেন, পরকালের বিষয়াদ যেমন- কবরের সওয়াল-জবাব, মিজান, বিচারদিবস ইত্যাদি দুনিয়ার বিষয়বস্তুর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ কেন ? যেমন- এখানে হাইকোর্টে অপরাধীর বিচার হয়, সওয়াল-জবাব হয়, তার বিচার কার্য সম্পাদিত হয় । পরকালের বিষয়গুলো ঠিক এরকম কেন ? অভিনব কিছু নেই কেন ?

পরকালের বিষয়গুলো দুনিয়াবী ব্যাপারাদির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ । এর কারণ হল এই যে, দুনিয়ায় যখন আমাদের সামনে এসব ব্যাপার নিয়ে আলাপ করা হবে, তখন আমরা যেন সেগুলোকে ভাল মতই অনুধাবন করতে পারি । যদি জিনিসগুলো এমনই হতো যে আমরা সেসব সম্পর্কে কিছুই জানিনা, সে সম্পর্কে কোন ধারনাই রাখি না, তাহলে আমরা পরকাল, জান্নাত-জাহান্নাম কিভাবে অনুধাবন করবো ? যদি অনুধাবনই না করতে পারি, তাহলে সেই জগত সম্পর্কে আমরা বুঝবো কিভাবে ? আমরা যাতে খুব সহজেই বুঝতে পারি, অনুধাবন করতে পারি, সে মোতাবেক নিজেদের জীবন পরিচালনা করতে পারি, সে জন্যই তিনি সেগুলো এভাবে আমাদের পরিচিত বিষয়টির মত করেই সাজিয়েছেন । আমরা যখন কোন কিছু কাউকে বুঝাই, তখন আমরা সেই উদাহরণটাই টেনে আনি যেটা আমাদের কাছে সবচাইতে পরিচিত, যেটা দিয়ে বোঝালে যাকে বোঝানো হচ্ছে সে খুব সহজে পুরো ব্যাপারটা বুঝতে পারবে । এতে করে কি এটা প্রমাণ হয় যে আমি যাকে বুঝাচ্ছি, তার কাছে থেকে আইডিয়াটা চুরি করেছি? নাহ, সে রকম কিছু বোঝায় না । বরং, এটা আমার জ্ঞান, কৌশল এবং বুদ্ধিমত্তার পরিচয় বহন করে । ঠিক সেভাবে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের এমন উপমা এমন বর্ণনা দিয়ে বুঝিয়েছেন, যাতে করে আমরা সেগুলোকে খুব ভালো করে অনুধাবন করতে পারি, বুঝতে পারি ।

আরজ আলী সমীপে–বইটির সকল লেখনী পড়তে নিন্মের লিঙ্ক সমূহে ভিজিট করুনঃ

এই ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে তাহলে দয়া করে ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ একে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন