মূল: আরজ আলী সমীপে । লেখক: আরিফ আজাদ । ওয়েব সম্পাদনা: আবু বক্কার ওয়াইস বিন আমর

আরজ আলী মাতুব্বর তার ‘সত্যের সন্ধান’ বইয়ের পঞ্চম অধ্যায় নামকরণ করেছেন ‘প্রকৃতি বিষয়ক’ । খুব সংক্ষিপ্ত এই অধ্যায়ে আরজ আলী সাহেব কিছু প্রশ্নের অবতারণা করেছেন । এই প্রশ্ন গুলোর মধ্যে হিন্দুধর্মের কিছু কিছু পৌরাণিক এবং খ্রিস্টধর্মের ধর্মীয় কিতাবাদির ওপর । যেহেতু আমি একজন মুসলিম এবং হিন্দুধর্ম ও খ্রিস্টধর্ম আমার আলোচনার বিষয়বস্তু নয়, তাই আমি এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার দরকার মনে করি নি ।

‘প্রকৃতি বিষয়ক’ অধ্যায়ের প্রথম প্রশ্নটি ছিল-

“মানুষ ও পশুতে সাদৃশ্য কেন”

অধ্যায়টির অবতারণা করতে গিয়ে আরজ আলী সাহেব তিন লাইনে দুটি ভুল তথ্য দিয়েছেন । তিনি লিখেছেন,

“পবিত্র মক্কার মাটি দ্বারা বেহেশতের মধ্যে আদমের মূর্তি গঠিত হয়”

অথচ কুরআন এবং হাদীসের কোথাও এর কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আদম আলাইহিস সাল্লামকে মক্কা শরীফের মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন । কুরআনে আদম আলাই সাল্লাম এর গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে অনেকগুলো আয়াত আছে । যেমনঃ

“নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে ঈসার সাদৃশ্য হচ্ছে আদমের মতোই । তাকে তিনি কাদামাটি থেকেই সৃষ্টি করেন”

সহিহ বুখারির হাদিসে বলা আছে,

আবু মুসা আল আশ’আরী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত,

“পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রাপ্ত মাটি দ্বারাই আদমকে সৃষ্টি করা হয় । তাই আদমের সন্তানেরা ঠিক মাটির অনুপাতে কেউ (দেখতে) সাদা, কেউ গৌরবর্ণ, কেউ কালো এবং কেউ হয় মাঝারি রকমের”

উপরিউক্ত হাদিস থেকে আদম আলাইহিস সালাম মক্কা শরীফের মাটি নয়; বরং পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গার মাটি থেকে সৃষ্ট এটাই প্রতীয়মান হয় । এই হাদীসের কোথাও কিন্তু আমরা মক্কা শরীফের নাম দেখতে পাই না । পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানের মাটি থেকেই যে আদম আলাইহিস সালাম সৃষ্ট, সে ব্যাপারে স্পষ্ট ধারণা পাই । তাহলে দেখা যাচ্ছে, অধ্যায়ের শুরুতে আরজ আলী সাহেব এমন একটি তথ্য দিয়ে ইসলামধর্মকে আক্রমণ শুরু করলেন যা আদতে ইসলামের সাথে কোনভাবেই সম্পর্কিত নয় ।

একই অধ্যায়ে আরজ আলী মাতব্বর বলেছেন,

“ধর্মযাজকগন বলেন, জগতের যাবতীয় জীব নাকি একই সময় সৃষ্টি হয়েছিল !”

প্রথমত, ইসলাম ধর্ম যে জিনিস দুটোর উপর ভর করে দাঁড়িয়ে আছে তা হল কুরআন এবং সুন্নাহ । ইসলাম কোন ধর্ম যাজক এর মুখের বুলির উপর নির্ভর করে চলে না । একজন ধর্মযাজক কি বলেছেন বা বললেন তা কখনো ইসলাম ধর্মের পক্ষে যুক্তি নয় । দেখতে হবে কোরআন এবং সুন্নাহের মধ্যে কি বলা আছে । পবিত্র কুরআন কিংবা হাদীসের কোথাও এমনটি বলা নেই যে, জগতের সকল প্রাণী একই সময়ে সৃষ্ট ।

১. সূরা আলে ইমরান (০৩) ৫৯

২. তিরমিজি, হাদিস নং ২৯৫৫

অধ্যায়ের শুরুতেই এরকম দুটি ভুল তথ্য দিয়ে আরজ আলী সাহেব এগিয়েছেন । আমরা দেখবো তিনি আরও কি রকম তথ্য আমাদের সামনে হাজির করেন ।

মানুষ ও পশুতে সাদৃশ্য নিয়ে আরজ আলী সাহেব প্রশ্ন তুলেছেন । তিনি বলেছেন,

“মানুষের রক্তের প্রধান উপাদান শ্বেত রক্ত কণিকা, লোহিত রক্ত কণিকা, জল ও লবণ জাতীয় কিছু পদার্থ এবং দেহ বিশ্লেষণ করলে পাওয়া যায়- লৌহ, কার্বন, ফসফরাস ও গন্ধকাদি জাতীয় মৌলিক পদার্থ । অন্যান্য জিবের রক্তের উপাদানই উহাই কেন?”

মজার প্রশ্ন বটে । মানুষ এবং প্রানিদের শরীরের গাঠনিক উপাদান এক হওয়াটা কেনই বা ধর্মকে একহাত নেওয়া টাইপ প্রশ্নের মধ্যে পড়লো বুঝলাম না । পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা নিজেই ঘোষণা দিয়েছেন যে, সকল প্রাণীর গাঠনিক উপাদান একই । তিনি বলেন,

‘প্রাণ সম্পন্ন সবকিছুকে আমি পানি থেকেই সৃষ্টি করেছি’

লক্ষ্য করুন, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেছেন, প্রান আছে এমন সবকিছুকেই তিনি পানি থেকে সৃষ্টি করেছেন । মানুষের প্রাণ আছে । জীবজন্তুরও প্রাণ আছে । তাহলে উভয়েই প্রাণী । এখন উভয়েই প্রাণী হলে, কোরআন মতে উভয়ের সৃষ্ট উপাদান একই । সেটি হলো পানি । যা তাদের মৌলিক উপাদান । তাই তাদের অন্যান্য গাঠনিক উপাদানও একই হবে । এতে আশ্চর্য হবার কিংবা প্রশ্ন তোলার কিছু আদৌ আছে কি ?

পবিত্র কুরআন আলাদা আলাদাভাবে উল্লেখ করেছে যে, মানুষ এবং প্রাণী পানি থেকেই সৃষ্ট । যেমনঃ

“তিনিই আল্লাহ যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন পানি থেকে”

১. সূরা আল আম্বিয়া (২১) ৩০

২. সূরা আল ফুরকান (২৫) ৫৪

আবার বলা হচ্ছে,

“এবং আল্লাহ প্রত্যেক প্রাণীকে পানি থেকেই সৃষ্টি করেছেন”

তাহলে দেখা যাচ্ছে, কুরআনের ভাষ্যমতেই মানুষ এবং প্রাণীদের শরীরের একেবারে গাঠনিক উপাদান এক । সেটা হল পানি । আর গাঠনিক উপাদান যেখানে একই, সেখানে অন্যান্য উপাদানও একই হবে, এটাই স্বাভাবিক ।

একটি ছোট উদাহরণের মাধ্যমে ব্যাপারটা বোঝা যাক । ধরুন, একজন ইঞ্জিনিয়ারকে পাশাপাশি দুটি বাড়ি বানাতে দেওয়া হল । ইঞ্জিনিয়ার কি একই রকম, একই স্টাইলে, একই ডিজাইনের বাড়ি দুটিকে বানাবে ? নিশ্চয়ই না । তিনি দুটি ভিন্ন আকার-আকৃতি ডিজাইনের বাড়ি দুটি বানাবে । এখন একই ইঞ্জিনিয়ারের বানানো বাড়ি দুটি দেখে কেউ যদি প্রশ্ন করে, ‘আরে আরে ! এ বাড়িতে ইট ব্যবহার করেছেন, ওই বাড়িতেও ইট কেন ? এই বাড়িতে সিমেন্ট, রড ব্যবহার করেছেন, ওই বাড়িতেও একই জিনিস কেন ব্যবহার করেছেন ? ভিন্ন কিছু ব্যবহার করলেন না কেন ?

পাঠক, আপনার কমনসেন্স কি বলে ? প্রশ্নটি কি আদৌ যৌক্তিক ? আপনার কাছে এই প্রশ্নটিকে যদি যৌক্তিক মনে না হয়, তাহলে আরজ আলী সাহেবের প্রশ্নটা কতটুকু যৌক্তিক ভাবুনতো ! যে সকল জীববিজ্ঞানীরা নিজেদের বিবর্তনবাদী বলে পরিচয় দেয়, তাদের কেউই কখনোই এ প্রশ্ন উত্থাপন করে নি বা করে না এ জন্যই, কারণ এই প্রশ্নটা আদৌ প্রশ্ন হবার যোগ্যতা রাখে না ।

এটাতো গেল মানুষ এবং পশু বা প্রাণীর শরীর এর মধ্যকার গাঠনিক উপাদান নিয়ে আরজ আলী সাহেবের বিভ্রান্তিমূলক যুক্তি । এর একটু পরে তিনি ‘আকাশ কি’ শিরোনামে লিখেছেন,

“আকাশ বলিতে সাধারনতো শূন্যস্থান বোঝায়”

আরজ আলী সাহেবের প্রতি যথাযথ সম্মান রেখে বলতে চাই, বিজ্ঞান বা বিজ্ঞানবিষয়ক কোন ব্যাপারেই উনার সঠিক কোন জানাশোনা ছিল না । এজন্যই উনি নানান সময়ে বৈজ্ঞানিক ব্যাপারগুলোকে নিজের মতো করে বলেছেন এবং সে বুঝ অনুসারে যুক্তি সাজিয়েছেন । তিনি লিখেছেন, ‘আকাশ বলিতে সাধারনত শূন্যস্থান বোঝায়’ । কিন্তু, আকাশ বলতে কখনোই শূন্যস্থান বোঝায় না । জ্যোতিবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করে বা এই সম্পর্কে ধারনা রাখে এমন যে কেউ জানে আকাশ মানে কখনো শূন্যস্থান নয় । উইকিপিডিয়াতে ‘Sky’ বা ‘আকাশ’ সম্পর্কে বলা আছে,  ‘The sky (or celestial dome) is everything that lies above the surface of the earth, including the atmosphere and outer space.’

অর্থাৎ আকাশ হচ্ছে এমন কিছু যা আমাদের পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠ থেকে উপরের দিকে অবস্থিত । আরো একটু আগালে উইকিপিডিয়া আরো জানাচ্ছে,  ‘In the field of astronomy, the sky is also called the celestial sphere. This is viewed from Earth’s surface as an abstract dome on which the sun, stars, planets and moon appear to be travelling’

অর্থাৎ সূর্য, গ্রহ-নক্ষত্র সবকিছুকেই নিয়েই হচ্ছে আকাশ । এমতাবস্তায়, আমরা যদি  আরজ আলী সাহেবের মত ধরেই নিই যে, আকাশ মানে শূন্যস্থান, তাহলে এসব গ্রহ-নক্ষত্রাদি, যা আকাশেরই অংশ, সেসবও কি শূন্য বা শুন্যস্থান ? নাহ । সূর্য, গ্রহ, নক্ষত্র ইত্যাদি মিলে যদি আকাশ হয়, তাহলে আকাশ কখনোই শূন্যস্থান বলে কিছু নয় । আর বর্তমান দুনিয়ার বাগা বাগা পদার্থবিজ্ঞানীরা প্রায় একটি সুন্দর বুলি আউড়িয়ে থাকেন । সেটা হচ্ছে, ‘প্রকৃতি শূন্যস্থান পছন্দ করে না’ । প্রকৃতি শূন্যস্থান পছন্দ করে না বলেই প্রকৃতি কখনোই কোনো কিছু শূন্য রাখে না । এমতাবস্থায়, প্রকৃতিরই অংশ ‘আকাশ’ কিভাবে শূন্য হতে পারে ?

এরপরেই আরজ আলী সাহেব লিখেছেন,

“কেহ কেহ সপ্তাকাশকে পদার্থের তৈয়ারী বলিয়া মনে করেন । তারা বলেন যে আকাশ প্রথমটি জলের, দ্বিতীয় লৌহের, তৃতীয় তাম্রের, চতুর্থ স্বর্ণের তৈয়ারি । উহারা আরো বলেন যে, ছাদে ঝুলান আলোর মতো চন্দ্র, সূর্য, নক্ষত্রাদি আকাশে ঝোলানো আছে ।”

প্রথমত, ইসলামের কোথাও কোন আকাশ কোন পদার্থের তৈরি তা নির্ধারণ করে বলা হয়নি । কিন্তু বিভিন্ন গ্রহ, নক্ষত্রাদি ইত্যাদিকে যদি আকাশে অন্তর্ভুক্ত বলে ধরে নেওয়া যায়, তাহলে বলতে হয় যে আকাশ অবশ্যই কোনো নির্দিষ্ট পদার্থের তৈরি । কারণ, গ্রহ, নক্ষত্রগুলো বিভিন্ন রকম পদার্থ যেমনঃ পাথর, কপার, পটাশিয়াম, সালফার, ম্যাগনেসিয়াম ইত্যাদি দ্বারা তৈরি ।

এরপর আলী সাহেব প্রথম আকাশ জলের, দ্বিতীয় আকাশ লোহার, তৃতীয় আকাশ তাম্রের, চতুর্থ আকাশ স্বর্ণের বলে যে মতবাদ ধর্মের বলে ব্যক্ত করেছেন, তার সাথে ইসলামের অর্থাৎ কুরআন বা হাদীসের ছিটেফোঁটা সম্পর্কও নেই । এগুলো তার এলাকার কোন পুথি বা ওয়াজের বাণী হলে হতে পারে, সেটার সাথে ইসলামের সম্পর্ক নেই ।

একই অভিযোগের শেষে আরজ আলী সাহেব বলেছেন, ধর্মে নাকি বলা হয়েছে চন্দ্র, সূর্য, নক্ষত্রাদি আকাশে ঝোলানো আছে । এই অভিযোগটি পুরোপুরিই মিথ্যা । অন্যান্য ধর্মের ব্যাপারে জানা নেই । ইসলাম ধর্মের কথাও উল্লেখ নেই যে, চন্দ্র, সূর্য, নক্ষাত্রাদি আকাশে ঝোলানো আছে । প্রাচীনকালে মানুষ যখন মনে করত যে সূর্য, চন্দ্র ইত্যাদি গ্রহ, নক্ষত্র স্থির, ঠিক সে সময় বসে কুরআন একেবারে আধুনিক বিজ্ঞানের সুরেই কথা বলছে সূর্য, চন্দ্রের ব্যাপারে । কুরআন বলছে,

“সূর্যের পক্ষে সম্ভব নয় চন্দ্রের নাগল পাওয়া এবং রাতের পক্ষে সম্ভব নয় দিনের নাগাল পাওয়া । প্রত্যেকে আপন আপন কক্ষপথে পরিভ্রমণ করে”

অধুনা আধুনিক বিজ্ঞানও আমাদের জানাচ্ছে, সূর্য, চাঁদসহ প্রত্যেকটি গ্রহ নক্ষত্রের রয়েছে আলাদা আলাদা কক্ষপথ এবং এ কক্ষপথ ধরেই তারা আবর্তিত হয় । পবিত্র কুরআনুল কারীম সূর্য, চন্দ্রকে আকাশে ঝোলানো বলে উল্লেখিত করেনি, তারা যে নিজেদের কক্ষপথে আবর্তিত, সেটাই উল্লেখ করা হয়েছে ।

কিন্তু সূর্য অবশ্যই তার নিজের কক্ষপথের বাইরে যেতে পারে না । চাঁদও তার নিজের কক্ষপথের বাইরে যেতে পারে না । মোদ্দাকথা, কোন গ্রহ নক্ষত্রই তার নিজের কক্ষপথ  ছেড়ে বাইরে আসতে পারে না । অর্থাৎ তারা তাদের নির্দিষ্ট একটা বিন্দু বা কেন্দ্রকে ঘিরে আবর্তিত হয় । এখন, তারা যেহেতু একই কেন্দ্রকে ঘিরেই আবর্তিত হয়, নিজেদের জায়গা পরিবর্তন করে না, সেহেতু এই ব্যাপারটাকে যদি আরজ আলী সাহেব ‘আকাশে ঝুলানো’ ধরে নিয়ে ধর্মের সমালোচনায় নেমে পড়েন, তাহলে এটা নেহাত তার জ্ঞান, জানা, বা বোঝার স্বল্পতা । ধর্মেরই বা কি দোষ ?

আরজ আলী সাহেব বলেছেন,

“কোন কোন ধর্মাচার্য বলে থাকেন যে, আকাশ সাতটি । ইহা কিরূপে হয় ? যাহা শূন্য তাহা সংখ্যা দ্বারা সূচিত হয় কিরূপে ? যাহারা আকাশকে সংখ্যা দ্বারা বিভক্ত করেন, তাহারা কি আকাশ বলিতে গ্রহকে বুঝেন?”

প্রথমত, আমরা আগেই দেখিয়েছি, আকাশ বলতে কখনোই কোনো শূন্যস্থানকে বোঝায় না । তাহলে আরজ আলী সাহেবের বক্তব্য ‘যাহা শূন্য তাহা সংখ্যা দ্বারা সূচিত হয় কিরূপে’ এই কথাটি একটি ভুল কথা । ভুল তথ্য । আকাশ শূন্যজাতীয় কিছু নয় । যদি শূন্য জাতীয় কিছু না হয়, তাহলে আরজ আলী সাহেবের যুক্তিকে উল্টিয়ে দিয়ে বলা যায় যে, যেহেতু আকাশ আকাশ শূন্যজাতীয় কিছু নয়, সেহেতু আকাশকে সংখ্যা দ্বারা সূচিত করা যাবে ।

এখন, কোরআন ‘সাত আকাশ’ জাতীয় কোন কিছুর কথা বলছে কি না ? হ্যাঁ, বলছে । কোরআন বলছে,

“বস্তুত তিনি তৈরি করেছেন সপ্তাকাশ”

আলোচ্য আয়াতের অর্থ আসমান সাতটি, আর তা-ই সত্যকথন । রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিস থেকেও আমরা অনুরূপ স্পষ্ট ভাষ্য পেয়ে থাকি । যতক্ষণ পর্যন্ত বিজ্ঞান আকাশের রহস্য ভেদ না করবে, আকাশের সঠিক সংখ্যা কুরআন ও হাদীসের বিপরীত সংখ্যার প্রমাণ করতে পারছে, ততক্ষণ পর্যন্ত কুরআন ও সুন্নাহের দেওয়া সংখ্যা অস্বীকার করার পক্ষে আরজ আলী সাহেবের কোন প্রমাণ নেই । সুতরাং, আমরা বিশ্বাস করছি যে, আকাশ সাতটি ।

এখন আসুন, আসলেই অসংখ্য আকাশ আছে কি না ? কোরআন থেকে আকাশের সংজ্ঞা এবং এর সম্পূর্ণ বর্ণনা পাওয়া যায় না আসলে । আমরা ধরে নিই যে, এসব গায়েবের ব্যাপার । এসব ব্যাপার আল্লাহ ভালো জানেন । তবে বর্তমান বিজ্ঞান ‘মাল্টি ইউনিভার্স’ নামে একটি থিওরির কথা আমাদের জানাচ্ছে । তাদের কথা অনুসারে, আমাদের মহাবিশ্বের বাইরে, আমাদের মহাবিশ্বের মতো, অসংখ্য মহাবিশ্ব রয়েছে । আমাদের মহাবিশ্বের বাইরে সব কিছু যেহেতু আকাশের অন্তর্গত এ কথাটিও আমরা বলি না । তাছাড়া মাল্টি ইউনিভার্স মানে কি সে অসংখ্য অসংখ্য মহাবিশ্ব ? সেটাও আমাদের কাছে প্রমাণিত কথা নয় । এসবই ধারণা মাত্র । ধারণা করা কথাকে আমরা কোরানের বাণীর মতো মহাসত্য বাণীর বিপরীতে দাঁড় করাতে পারি না । সুতরাং আমি এ কথা বলছি না যে, কুরআনের ‘সপ্তাকাশ’ তথা ‘অসংখ্য আকাশ’ ধারণার সাথে বিজ্ঞানের ‘মাল্টি ইউনিভার্স’ তত্ত্বের মিল রয়েছে । আমি শুধু এটুকু বলছি, বিজ্ঞানীদের দেওয়া আকাশের সংজ্ঞা অনুসারে ধরে নিয়ে আগালে দেখা যায়, অসংখ্য আকাশের অস্তিত্ব খোদ বিজ্ঞান মহলের আলোচ্য বিষয় । তাহলে আরজ আলী সাহেবরা বিজ্ঞান না জেনে, না বুঝে, ধর্মকে সব সময় একহাত নেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকেন কেন ?

এই অধ্যায়ে আরজ আলী সাহেব ‘দিবা রাত্রির কারণ কি’, ‘পৃথিবী কিসের উপর প্রতিষ্ঠিত’ এবং ‘ভূমিকম্পের কারণ কি’ শিরোনামে তিনটি প্রশ্ন করেছেন ।

প্রথম প্রশ্নে তিনি বলেছেন,

“কেহ কেহ বলিয়া থাকেন যে, চতুর্থ আসমান একখানা সোনার নৌকায় সূর্যকে রাখিয়া ৭০ হাজার ফেরেশতা সূর্যসহ নৌকাখানা টানিয়া পূর্ব দিক হইতে পশ্চিম দিকে লইয়া যায় ও সারারাত আরশের নিচে বসিয়া আল্লাহর এবাদত করে এবং প্রাতে সূর্য পুনরায় পূর্ব দিকে হাজির হয় ।”

দ্বিতীয় প্রশ্নে বলেন,

“কেহ কেহ বলেন, পৃথিবী একটি বলদের শৃঙ্গের উপরে আছে । কেহ বলেন, পৃথিবী মাছের উপরে এবং কেহ বলেন, পৃথিবীর জলের উপরে অবস্থিত । তাই যদি হয়, তবে সেই মাছ, বলদ, জল কিসের উপর অবস্থিত”

তৃতীয় প্রশ্নে আরজ আলী সাহেব বলেছেন,

“কেহ কেহ বলেন যে, পৃথিবীধারী বলদ ভারাক্রান্ত হইয়া কখনো কখনো শৃঙ্গ পরিবর্তনের চেষ্টা করে এবং তাহার ফলে পৃথিবী প্রকম্পিত হয় । যদি ইহাই হয়, তবে একই সময়ে পৃথিবীর সকল অঞ্চলে ভূমিকম্প হয় না কেন ?’

বিজ্ঞ পাঠক, উপরে আরজ আলী সাহেবের প্রশ্ন তিনটি পড়ে নিশ্চয় হাসছেন । আমার বুঝে আসে না, এরকম কৌতুকময় জিনিসকে, যার সাথে ইসলামের নুন্যতম কোন সম্পর্ক নেই, সেই সব বিষয়কে ইসলামের সাথে জুড়ে দিয়ে তিনি কিভাবে ইসলামের সমালোচনায় নামলেন ? কোন কিছু সমালোচনা করার আগে তো সেই বিষয়গুলো সম্পর্কে ভালোভাবে জানা লাগে । সেই বিষয়ের অথেনটিক সোর্স থেকে জেনে নিয়ে, এরপরে কোন কিছু যদি সমালোচনা করার মতন হয়, তবেই না সমালোচনা করা যায় । সেসবের কোন কিছুই না করে, কিছু পৌরাণিক মুখরোচক গল্পকে বিষয়বস্তু বানিয়ে বিশাল সাইজের বই লিখে ফেলা কি কোন জ্ঞানী মানুষের কাজ ?

আরজ আলী সাহেব এরপর আরো বলেছেন,

“কেহ কেহ বলিয়া থাকেন যে, পৃথিবীধারী বলদ যখন শ্বাস ত্যাগ করে তখন জোয়ার হয় এবং যখন শ্বাস গ্রহণ করে, তখন ভাটা হয় । তাই যদি হয়, তাহলে পৃথিবীর সব অঞ্চল একই সময়ে জোয়ার ভাটা হয় না কেন ?”

আরো একটি মজাদার প্রশ্ন । মানুষ যখন জ্ঞান-বিজ্ঞানের কিছু জানতো না, ঠিক তখন এরকম কল্পকাহিনী বলে শুনে তারা দিন পার করত । এমন নয় যে, এ সমস্ত কিছু ধর্মগ্রন্থের কথা । পবিত্র কুরআনুল কারীম এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীস তন্ন তন্ন করে খুঁজে কোথাও এ ধরনের আজগুবি কিচ্ছা কাহিনী পাওয়া যায় না । বরং কোরআনে পৃথিবী, আকাশ এবং মহাকাশ সম্পর্কিত এমন সব তথ্য জানানো হয়েছে, যা হাল আমলের বিজ্ঞান আমাদের মাত্র সেদিন জানিয়েছে । পৌরাণিক কিচ্ছা-কাহিনী টেনে আরজ আলী সাহেবেরা যেভাবে ধর্মের সমালোচনা করেছেন, তাতে আমরা বিবেকবান যে কেউই অবাক হতে বাধ্য ।

‘উত্তাপবিহীন অগ্নি কীরূপ’ শিরোনামে আরজ আলী মাতুব্বর আরেকটি প্রশ্ন করেছেন । তিনি বলতে চেয়েছেন,

“ইব্রাহীম আলাইহিস সালামকে যখন অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপ করা হয়, তখন তিনি আগুনে পুড়লেন না কেন ? এর কারন কি এটাই যে, তখন প্রকৃতির নিয়মের ব্যাতিক্রম ঘটেছিল । যার ফলে আগুনের দাহ্যশক্তি লোপ পেয়েছে ? অথবা অগ্নিকুন্ডের মধ্যকার অক্সিজেন লোপ পেয়েছিল ?”

প্রথমত ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম আল্লাহর একজন নবী ছিলেন।  একজন দূত । ইব্রাহিম আলাই সাল্লাম সেসব মনোনীত বান্দাদের অন্তর্গত, যাদের আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা মানুষকে হেদায়েতের পথ, সিরাতুল মুস্তাকিমের পথে ডাকার জন্যই মনোনীত করেছেন । আল্লাহর এ সমস্ত বান্দাদের উপর পৃথিবীতে নেমে এসেছিল নানান বিপদ, পরীক্ষা । এই পরীক্ষাগুলো থেকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তার প্রিয় বান্দাদের রক্ষা করেছিলেন । এই পরীক্ষাগুলোও এসেছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে । আবার রক্ষাও করেছিলেন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা । তাহলে, প্রশ্ন আসতে পারে, তিনি যদি রক্ষা করবেনই, তাহলে পরীক্ষাটাই বা কেন নিলেন ?

উত্তর হচ্ছে, আল্লাহ পরীক্ষাটা এ জন্যই করেন যে, তিনি দেখতে চান তার প্রিয় বান্দারা চরম বিপদের মুখে, দুর্যোগঘণ মুহূর্তে কার উপর ভরসা করে । তারা কি তাগুতের সাথে আপোস করে, নাকি মাথা বাতিলের কাছে নত না করে শাস্তিকে বরণ করে নেয় । যখনই বান্দা তার সেই ধৈর্যের পরীক্ষায় শতভাগ উন্নীত হয়ে যান, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বান্দাকে তখন অন্য একটি উসিলা দিয়ে বাঁচিয়ে নেন ।

এখন ইব্রাহিম আলাই সাল্লাম কে আল্লাহতালা অগ্নিকুন্ডে আগুনের স্পর্শ থেকে রক্ষা করেছেন, নিরাপদ করেছেন । এটা আল্লাহর জন্যে খুবই সোজা । এটি একটি মিরাকল । মিরাকল শব্দটিকে আরেকটি সুন্দর শব্দ দিয়ে বোঝানো যায় । সেটি হলো, ‘সুপার ন্যাচারাল’ । সুপার ন্যাচারাল মানে হচ্ছে অতিপ্রাকৃত । অতিপ্রাকৃত অর্থ যে ঘটনাগুলো প্রকৃতিতে ঘটে, তার ব্যতিক্রম । যেমন কেউ আগুনে হাত দিলে হাত পুড়ে যাবে । এখন আগুনে হাত দেওয়ার পরেও যদি কারো হাত না পুড়ে, তাহলে ঘটনাটা অতিপ্রাকৃত ঘটনা । ইব্রাহিম আলাই সাল্লাম এর সাথে ঘটা ঘটনাটিও ঠিক সেরকম । অতিপ্রাকৃত । এটা আল্লাহ্‌র জন্য সহজ এজন্যই যে আল্লাহ যখন কোন কিছু করার ইচ্ছা করেন, তিনি কেবল বলেন ‘হও’ আর তা হয়ে যায় । ইব্রাহিম আলাই সাল্লামকে যখন নম্রুদের রক্ষীবাহিনীরা অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপ করছিল, তখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সেই অগ্নিকে শান্ত অর্থাৎ আরামদায়ক ঠান্ডা হয়ে যেতে বলেন । আর তা শান্ত ও আরামদায়ক হয়ে যায় ।

এরকম মিরাকল’ যে কেবল ইব্রাহিম আলাই সালাম এর সাথে ঘটেছে তা নয়; আল্লাহ সুবাহানা ওয়া’তালা ইউনুস আলাইহিস সালামকে মাছের পেট থেকে উদ্ধার করেছিলেন । মূসা আলাইহিস সালাম এর জন্য সাগরের পানির উপরে রাস্তা তৈরি করেছিলেন যাতে তিনি ফেরাউনের বাহিনীর অলক্ষ্যে চলে যেতে পারেন । ঈসা আলাইহিস সালামকে তিনি পিতা ছাড়াই সৃষ্টি করেছেন । এর প্রত্যেকটাই প্রকৃতির ব্যতিক্রম ।

কেউ আগুনে হাত দিলে পুড়ে যাবে । ইব্রাহিম আলাইহিস সালামকে আগুনে নিক্ষেপ করার পরও তার কিছুই হয়নি । কারণ, এটাই ছিল মিরাকল ।

কেউ সামুদ্রিক মাছের পেটে চলে গেলে বাঁচতে পারে না । কিন্তু, ইউনুস আলাইহিস সালাম বেঁচে ছিলেন । কারণ, এটা ছিল মিরাকল । কেউ পিতা ছাড়া জন্ম লাভ করতে পারে না । কিন্তু, ঈসা আলাইহিস সালাম পিতা ছাড়াই জন্ম লাভ করেছেন । এটাই মিরাকল । সুপার ন্যাচারাল মানেই অতিপ্রাকৃত । যা প্রাকৃতিক ব্যাখ্যার বাইরে ।

এখন যা কিছুই অতিপ্রাকৃত অর্থাৎ, প্রাকৃতিক ব্যাখ্যা ঊর্ধ্বে, সেগুলোকে প্রাকৃতিক ব্যাখ্যা দিয়ে বোঝার চেষ্টা করলে বিভ্রান্তি ছড়ানোই স্বাভাবিক ।

আপনি যখন একজন ‘স্রষ্টা’ কে ধরে নিয়ে এই ঘটনাগুলো ব্যাখ্যা জানতে চাইবেন, তখন আপনি কিন্তু আলটিমেটলি ধরে নিচ্ছেন যে ‘স্রষ্টা’ বলে কেউ একজন আছে । এখন এরপরের প্রশ্ন, ‘স্রষ্টা’ এরকম ঘটনা কীভাবে ঘটান, তাই না ? তাহলে আপনার কাছে আমার প্রশ্ন, ‘এসব প্রাকৃতিক নিয়মের সৃষ্টিকর্তা কে ?’

-‘স্রষ্টা’

-‘স্রষ্টা কি এসব নিয়মের অধীন?’

-‘না ।’

-‘নিয়ম কি স্রষ্টার নিয়ন্ত্রক, নাকি স্রষ্টাই নিয়মের নিয়ন্ত্রক?’

-‘স্রষ্টাই নিয়মের নিয়ন্ত্রক’

-‘তাহলে যিনি নিয়ন্ত্রক, তিনি কি চাইলে যেকোনো সময় তার নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটাতে পারেন না?’

-‘পারেন ।’

-‘তাহলে এটা কি স্রষ্টার জন্য খুব কঠিন যে প্রকৃতির নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটিয়ে ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে অগ্নিকুণ্ড থেকে বাঁচিয়ে নেওয়া?’

উপরের সমীকরণ আরো একবার পড়ে আসুন । যদি উপরের সমীকরণ যৌক্তিক হয়, তাহলে এটা আল্লাহর জন্যে খুবই সহজ যে প্রাকৃতিক নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটানো ।

এই অধ্যায়ে আরজ আলী সাহেবের একেবারে শেষ প্রশ্ন ছিল,

“নুহ আলাই সাল্লাম এর সময়কার মহাপ্লাবন কি পুরো পৃথিবীজুড়েই হয়েছিল?”

এই প্রশ্নের অবতারণা করতে গিয়ে আরজ আলী সাহেব বেশ কিছু যুক্তি দেখিয়েছেন । তিনি দেখিয়েছেন আদম আলাই সাল্লাম কত খ্রিষ্টপূর্ব সালে পৃথিবীতে আগমন করেছিলেন  । পৃথিবীতে আগমন করেই তিনি কোন উদ্যানে নেমেছিলেন । আদম আলাই সাল্লাম থেকে ঠিক কত বছর পরে নুহ আলাই সাল্লাম এসেছিলেন । এর ঠিক কত বছর পরে সেই মহাপ্লাবন হয়েছিল । মহাপ্লাবন থেকে বাঁচতে নুহ আলাই সাল্লাম আল্লাহর হুকুমে যে নৌকা তৈরি করেছিলেন, সে নৌকার আয়তন কত, দৈর্ঘ্য-প্রস্থ কত এসবও উল্লেখ করেছেন আরজ আলী সাহেব ।

পাঠক মজার ব্যাপার হলো, আরজ আলী সাহেব এই তথ্যগুলো প্রত্যেকটাই নিয়েছেন খ্রিস্টানদের বাইবেল থেকে । ইসলামিক অথেনটিক সোর্স, কুরআন, হাদীসের কোথাও এই কথাটি বলা নেই যে, আদম আলাইহিস সালাম কত সালে পৃথিবীতে এসেছেন, নূহ আলাইহিস সালাম কত সালে এসেছেন, মহা প্লাবন কত সালে হয়েছে ইত্যাদি ।

এখন বাইবেলের হিসাব ধরে নিয়ে এসে কোরআন বা হাদিসকে আক্রমণ করার কোন যৌক্তিকতা নেই । কুরআন হাদিসে এই সমস্ত ব্যাপারে নির্দিষ্ট কোন টাইম ফ্রেমের উল্লেখ করেনি, সেহেতু ঠিক কত বছর বা কত বিলিয়ন বছর আগে আদম আলাইহিস সালাম এসেছিলেন তা নিশ্চিত করে বলা যায় না ।

আবার টাইম ফ্রেম উল্লেখ করে আরজ আলী সাহেব ধর্মীয় কিতাবাদির অসঙ্গতি দেখানোর চেষ্টা করেছেন, সেটা একান্তই বাইবেলের সাথে যায়, যেহেতু বাইবেলে সব ব্যাপারে নির্দিষ্ট টাইম ফ্রেম উল্লেখ করে দিয়েছে । কোরান যেহেতু সেটা করেনি, তাই এই যুক্তি দিয়ে কোরআনের সমালোচনা করার যথেষ্ট যৌক্তিকতা নেই ।

এখন নুহ আলাইহিস সাল্লাম এর সময়কার সেই মহাপ্লাবন কি পৃথিবীর সর্বত্র হয়েছিল ?

আরজ আলী সাহেব এই জায়গায় বাইবেলের টাইম ফ্রেম ধরে দেখিয়েছেন, এই মহাপ্লাবন পৃথিবীর সর্বত্র হওয়া সম্ভব নয়, কারণ এই টাইম ফ্রেমেই যদি সেই মহা প্লাবন হয়ে থাকে, তাহলে ঐতিহাসিক প্রমাণ থেকে দেখা যায় ঠিক এই সময়টাতে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন সভ্যতা বহাল তবিয়তে বর্তমান ছিল । সেই মহা প্লাবন সারা পৃথিবীব্যাপী হলে তো এসব সভ্যতা থাকার কোন প্রশ্নই আসে না । তাহলে কি সারা দুনিয়াব্যাপী সেই মহাপ্লাবনের ঘটনা মিথ্যা ?

এখানে প্রথমত যে জিনিসটা আমাদের স্মরণে রাখা উচিত তা হলো, নুহ আলাই সাল্লাম এর সময়কার সেই মহাপ্লাবন ঠিক কোন সময়টাতে হয়েছিল তার কোন নির্দিষ্ট দিন-তারিখ কোন কিছুই কোরআন হাদীসে উল্লেখ নেই । যেহেতু এসবের কোনো ইঙ্গিত কোরান-হাদিস দেয় না, সেহেতু বাইবেলের টাইমফ্রেমে কুরআনকে বসিয়ে বিচার করাটা ভুল ।

দ্বিতীয়ত, কোরআন কিন্তু স্পষ্ট করে কথাও বলেনি যে, এই মহাপ্লাবন পৃথিবীর সর্বত্র হয়েছিল । কোরআন যেহেতু স্পষ্ট করে এটাও উল্লেখ করে না, তাই এই সমালোচনাটাও কুরআনের সাথে যায় না । কিন্তু কোন কোন তাফসীরকারক বলেছেন যে, মহাপ্লাবন পৃথিবীর সর্বত্র হয়েছে । অর্থাৎ এই মহাপ্লাবনে পুরো পৃথিবী তলিয়ে গিয়েছিল । এখন যদি ধরেও নেই যে, সেই মহাপ্লাবনে পুরো পৃথিবীর তলিয়ে গিয়েছিল, তাতেও কোনো সমস্যা নেই । কারণ, কোরান তো নির্দিষ্ট করে বলছে না যে অমুক সালে নূহের প্লাবন হয়েছে । যেহেতু কোরআন সেটা বলছে না, তাই হতে পারে এই মহাপ্লাবন এমন সময় হয়েছিল, যখন সভ্যতার অবশিষ্ট থাকেনি । বাইবেলের টাইমফ্রেম ধরে আগালে বৈজ্ঞানিক প্রমাণাদির সাথে যে দ্বন্দ্ব দেখা দিচ্ছে, কোরআনের বর্ণনায় সেটা নেই । কারন, কোরআন নির্দিষ্ট সময়ের কথা উল্লেখ করেনি ।

সুতরাং,

১. বাইবেলের টাইম ফ্রেম দিয়ে কোরআনকে বিচার করাটা অযৌক্তিক

২. কোরআন স্পষ্ট করে উল্লেখ করে না যে এই মহা পৃথিবীর সর্বত্র হয়েছিল

৩.  যদি হয়েও থাকে, তাতেও কোনো সমস্যা নেই । কারণ, কোরান নির্দিষ্ট টাইম এর কথা উল্লেখ করেনি । হতে পারে এটা মিলিয়ন বা বিলিয়ন বছর আগের কথা ঘটনা । এবং আল্লাহর সর্বজ্ঞাত ।

আরজ আলী সাহেবরা করছেন কি, ধর্মের নামে প্রচলিত নানান রকম কুসংস্কার বিভিন্ন ধর্মে প্রচলিত নানা রীতিনীতিকে ইসলাম এবং দ্বীন ইসলাম ভেবে সমালোচনায় নেমে পড়েছিলেন । আফসোস ! তারা এমন কোন কিছু বা এমন কারো কাছে যায় না, যারা সত্য ইসলাম জানে এবং সঠিক ইসলাম মানে ।

আরজ আলী সমীপে–বইটির সকল লেখনী পড়তে নিন্মের লিঙ্ক সমূহে ভিজিট করুনঃ

ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে। তাহলে আপনিও ব্লগের কার্যক্রম কে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার লেখণী পাঠাতে পারেন।আপনার লেখনী পাঠিয়ে আমাদের ফেচবুক পেজের ম্যাসেঞ্জারে গিয়ে দয়াকরে নক করুন।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন