আব্দুল্লাহ ইবন মুহাম্মাদ আল-সাদহান

অনুবাদক: জাকেরুল্লাহ আবুল খায়ের সম্পাদক: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

ভূমিকা

আমার কয়েকজন সুহৃদ বন্ধু নিত্য প্রয়োজনীয় দো‘আর ওপর একটি বই লেখার পরামর্শ দিলো। কলেবর বুদ্ধির ফলে পাঠক বিরক্তিকরভাবে যাতে বইটিকে গ্রহণ না করেন -সাথে এ পরামর্শ দিতেও তারা ভুল করে নি। বিজ্ঞ উলামায়ে কিরাম এ বিষয়ে হাদীসের সনদসহ অনেক কিতাব রচনা করেছেন বৃহৎ কলেবরের দরুন পিপাসুরা স্বভাবতই সেগুলো পড়তে হিম্মত হারিয়ে ফেলে। ইমাম বুখারী রহ. রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন: “আমি যখন তোমাদেরকে কোনো কিছু করার আদেশ দেই, তখন তোমরা সাধ্যানুসারে তা করার চেষ্টা কর”।

শাইখ ইমাম আবু আমর ইবনুস সালাহ রহ.-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল, কী পরিমাণ যিকির করলে মুমিন নর-নারী আল্লাহর কাছে অধিক যিকিরকারী সাব্যস্ত হবে? তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, যদি সে সকাল-সন্ধ্যা, দিন-রাত ও বিভিন্ন অবস্থায় পঠিত দো‘আগুলো নিয়মিত আদায় করে, তবেই আল্লাহর দরবারে অধিক যিকিরকারীদের অন্তর্ভুক্ত হবে।

আব্দুল্লাহ ইবন বুসর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, জনৈক সাহাবী রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে আরয করল, ইয়া রাসূলুল্লাহ! শরী‘আতের হুকুম তো অনেক রয়েছে, আমাকে এমন কোনো আমল বলে দিন, যা আমি নিজের জন্য অযীফা বানিয়ে নিবো। তিনি উত্তরে বললেন: “তোমার জিহ্বা যেন সর্বদা আল্লাহর যিকির দ্বারা সিক্ত থাকে’’।

সন্দেহ নেই, নিয়মিত স্বল্প আমল অনিয়মিত অধিক আমলের তুলনায় অনেক উত্তম। রাসূলের হাদীসে এর প্রমাণ আমরা দেখতে পাই, ‘‘সর্বোত্তম আমল তাই, যা নিয়মিত করা হয়।’’

এ পুস্তকের ভিতর আমি সহীহ হাদীসের আলোকে বাস্তব অভিজ্ঞতাসহ সংক্ষিপ্তাকারে নিত্য প্রয়োজনীয় দো‘আগুলো একত্র করেছি। আল্লাহর কসম দিয়ে বলতে পারি, এ দো‘আগুলো অনুসারে নিয়মিত আমলকারীকে আল্লাহ তা‘আলা সন্তান-সন্তুতি, ধন-সম্পদসহ শয়তানের যাবতীয় ধোকা এবং যমানার সব রকমের আপদ-বিপদ থেকে হিফাযত করবেন।

পরিশেষে আল্লাহর কাছে সাহায্য কামনা করছি, তিনি যেন এ পুস্তক লেখার উদ্দেশ্য পূর্ণ করে দেন এবং আমাদের সকলকে উপকৃত হওয়ার তাওফীক দান করেন।

 

০১/০৯/১৪২২ হিজরী 

বিনীত গ্রন্থকার

একবার, তিনবার, সাতবার অথবা তার চেয়ে বেশি, সর্ব রোগের নিরাময়ের জন্য।

ফযীলত:

এক. বিষাক্ত প্রাণীর দংশনের চিকিৎসা।

আবু সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণের একদল সফরে বের হলেন। সফরকালে তারা আরবের কোনো এক এলাকায় যাত্রা বিরতি দিলেন। সে এলাকার লোকদের কাছে তারা মহেমানদারীর আবেদন করলেন, কিন্তু তার মেহমানদারী করতে অস্বীকার করলো। ঘটনাক্রমে সাহাবীগণের কাফেলা সেখানে অবস্থানকালেই তাদের গোত্রপতিকে বিচ্ছু দংশন করে। তার চিকিৎসার জন্য তারা অনেক চেষ্টা-তদবীর করে বিফল হয়। তখন তাদের একজন বললো, তোমরা যদি এ নবাগত পথিকদের কাছে যেতে, হতে পারে তাদের কেউ কিছু জানে।

লোকটির কথা অনুযায়ী এলাকার লোকজন সাহাবীগণের কাছে এসে বললো, হে কাফেলার যাত্রীদল! আমাদের সরদারকে বিচ্ছু দংশন করেছে, আমরা তার চিকিৎসার জন্য বহু চেষ্টা করে বিফল হয়েছি। তোমাদের মধ্যকার কেউ কি এ বিষয়ে কিছু জানো?

সাহাবীগণের একজন তখন বললেন, হ্যাঁ, আমি জানি। আল্লাহর কসম! আমি ঝাড়ফুঁক জানি। কিন্তু আগে চুক্তি কর, আমাদেরকে কী দেবে? কারণ আমরা তোমাদের নিকট মেহমানদারী চেয়েছিলাম, তা কর নি। তখন তাদের সঙ্গে একপাল বকরির চুক্তি হলো।

অতঃপর সে সাহাবী তাদের সঙ্গে গিয়ে সূরা আল-ফাতিহা অর্থাৎ الحمد لله পড়তে থাকলেন এবং রোগীর গায়ে ফুঁক দিতে লাগলেন। এভাবে কিছুক্ষণ পড়ার পর সরদার সুস্থ হয়ে উঠলো। কেমন যেনো এখন-ই তাকে শৃঙ্খল মুক্ত করা হলো।[1]

দুই. পাগলামির সফল চিকিৎসা

খারেজা স্বীয় চাচা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন: আমরা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবার থেকে ফিরে আসার পথে আরবের এক গ্রামে পৌঁছলে তারা আমাদের বললো, আমরা জানতে পেরেছি আপনারা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছ থেকে কল্যাণ নিয়ে এসেছেন। অতএব, আপনাদের নিকট কী কোনো রোগ নিরাময়কারী কিছু আছে? কারণ আমাদের এখানে শৃংখলাবদ্ধ এক পাগল আছে।

আমরা উত্তর দিলাম, হ্যাঁ, আছে। তখন তারা শৃংখলাবদ্ধ এক পাগলকে নিয়ে এলো। তিনি বলেন, আমিই তখন লাগাতার তিনদিন সকাল-বিকাল সূরা আল-ফাতিহা পড়ে ওকে ঝাড়লাম। ঝাড়ার নিয়ম ছিলো যতবার সূরা আল-ফাতিহা শেষ করেছি, ততবার ওর গায়ে হালকা থুথু দিয়েছি। এ নিয়মে ঝাড়ার পর সে সম্পূর্ণরূপে সুস্থ হয়ে উঠলো। তখন তারা আমাকে এর পারিশ্রমিক দিতে চাইলো, কিন্তু আমি নিতে অস্বীকার করলাম এবং বললাম, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস না করে নিবো না।

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তর দিলেন: হ্যাঁ, তা গ্রহণ করে খাও। কতজন মিথ্যা ঝাড়ফুঁক করে সে পারিশ্রমিক খায়, আর তুমি সত্যভাবে ঝাড়ফুঁকের মাধ্যমে খাচ্ছো।[2]

তিন. টিউমার জাতীয় রোগের চিকিৎসা

আল্লামা ইবন হাজার রহ. ইরাকের এক শাইখের ঘটনা বর্ণনা করেন। শাইখ বলেন, শৈশবে আমার চোখের ভ্রুর উপরে ছোট্র মেজের মতো ছিলো। ফলে আমার চোখের ভ্রু ঝুলে পড়লো। যে কারণে ভালো করে তাকানো আমার পক্ষে কষ্টকর হয়ে দাঁড়ালো। সেময় একজন আমাকে বললো, বাগদাদে এক ইয়াহূদী আছে সে ভ্রু ফেঁড়ে টিউমার বের করে দেয়। কিন্তু ইয়াহূদী হওয়ায় তার কাছে যেতে মন বেশি সায় দিলো না। এর কিছু দিন পরের ঘটনা। একরাতে আমি স্বপ্নে দেখি কেউ আমাকে বলছে, অযুর সময় এর উপর সূরা আল-ফাতিহা পড়। আমি তাই করলাম। এভাবে কয়েক দিন যাওয়ার পর হঠাৎ একদিন চেহারা ধোয়ার সময় মেঝটা এমনিতেই পড়ে গেলো এবং দাগও মুছে গেলো। তখন আমি বুঝতে পারলাম, এটা সূরা আল-ফাতিহারই বরকত।

তারপর থেকে আমি নিজের জন্য সূরা আল-ফাতিহাকে জ্বরসহ বিভিন্ন রোগের ঔষধ বানিয়ে নিলাম। আল-হামদুলিল্লাহ! অধিকাংশ রোগই আল্লাহর হুকুমেই সেরে গেছে।[3]

চার. আব্দুল মালেক ইবন উমায়ের রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “সূরা আল-ফাতিহা সকল রোগের শিফা।[4]

ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম রহ. বলেন, আমি মক্কায় দীর্ঘ সময় অবস্থান করেছি। সে সময় আমার নানা রোগ-ব্যধি দেখা দিতো; কিন্তু এর চিকিৎসার কোনো ডাক্তার বা ঔষধ পেতাম না। আমি তখন সূরা আল-ফাতিহার মাধ্যমে নিজের চিকিৎসা করেছি এবং এর আশ্চর্য তাছির দেখেছি। শুধু নিজে করেছি তাই না; বরং কেউ আমার নিকট ব্যাথার অভিযোগ করলে, তাকেও সূরা আল-ফাতিহার ওপর আমল করার কথা বলতাম। তাদের অনেকেই খুব দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠতো।

এতক্ষণ তো হাদীসে বর্ণিত ঘটনা এবং সলফে সালেহীনদের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করলাম।

বর্তমানকালেও আল্লাহর ফযলে এ সূরার মাধ্যমে অনেক দৈহিক ও মানসিক রোগের চিকিৎসা সু-সম্পন্ন হয়েছে এবং তারা সম্পূর্ণরূপে সুস্থতা অর্জন করেছে। এর জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সূরার নামকরণ করেছেন ‘রুকুইয়া’ অর্থাৎ নিরাময়কারী এবং তিনি কোনো রোগ নির্ধারিত করেন নি।


[1] হাকেম ১/৫০২

[2] সহীহ বুখারী ১০/১৯৮

[3] আল আছার ফিল আযকার, পৃ: ২০

[4] দারেমী