ইলমী গবেষণা ডীনশীপ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, মদিনা মুনাওয়ারা

অনুবাদ: মোহাম্মাদ ইবরাহীম আবদুল হালীম সম্পাদনা: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

(১) ফিরিশতাদের পরিচয়

ফিরিশতাদের ওপর ঈমান হচ্ছে এ দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করা যে, আল্লাহ তা‘আলার অনেক ফিরিশতা রয়েছেন। তিনি তাদেরকে নূর (জ্যোতি) থেকে সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টিগতভাবে তারা আল্লাহর অনুগত। তারা কখনও আল্লাহর আদেশের অবাধ্য হন না, বরং যা আদিষ্ট হন তা পালন করেন। তারা দিবা-রাত্রি আল্লাহর তাসবীহ্ (পবিত্রতা) বর্ণনায় রত, কখনও ক্লান্ত হন না। তাদের সংখ্যা আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত কেউ জানে না। আর আল্লাহ তাদেরকে বিভিন্ন প্রকার (কর্মের) দায়িত্ব অর্পণ করেছেন।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَلَٰكِنَّ ٱلۡبِرَّ مَنۡ ءَامَنَ بِٱللَّهِ وَٱلۡيَوۡمِ ٱلۡأٓخِرِ وَٱلۡمَلَٰٓئِكَةِ﴾ [البقرة: ١٧٧]

“বরং বড় সৎকাজ হলো এই যে, ঈমান আনবে আল্লাহর ওপর , শেষ দিবসের ওপর এবং ফিরিশতাদের ওপর।” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৭৭

তিনি আরো বলেন,

﴿كُلٌّ ءَامَنَ بِٱللَّهِ وَمَلَٰٓئِكَتِهِۦ وَكُتُبِهِۦ وَرُسُلِهِۦ﴾ [البقرة: ٢٨٥]

“সকলেই ঈমান রাখেন আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফিরিশতাদের প্রতি, তাঁর গ্রন্থসমূহের প্রতি এবং তাঁর রাসূলগণের প্রতি।” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৮৫]

জিবরীল ‘আলাইহিস সালামের প্রসিদ্ধ হাদীসে এসেছে, যখন জিবরীল ‘আলাইহিস সালাম আল্লাহর রাসূলকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন- ঈমান, ইসলাম ও ইহসান সম্পর্কে তখন জিবরীল ‘আলাইহিস সালাম বলেন, আমাকে ঈমান সম্পর্কে অবগত করুন, আর আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন,

«أن تؤمن بالله وملائكته وكتبه ورسله واليوم الآخر وأن تؤمن بالقدر خيره وشره»

“ঈমান হলো, আল্লাহ, তাঁর ফিরিশতাদের, তাঁর কিতাবসমূহ, তাঁর রাসূলগণ ও শেষ দিবসের ওপর ঈমান আনা এবং তাকদীরের ভালো-মন্দের ওপর ঈমান আনা।”

ইসলামে ফিরিশতাদের প্রতি ঈমানের স্থান ও তার বিধান:

ফিরিশতাদের ওপর ঈমান আনা, ঈমানের ছয়টি রুকনের দ্বিতীয় রুকন বা স্তম্ভ।

ফিরিশতাদের ওপর ঈমান আনা ছাড়া কোনো ব্যক্তির ঈমান সঠিক ও গ্রহণযোগ্য হবে না।

সম্মানিত ফিরিশতাদের ওপর ঈমান আনা ওয়াজিব হওয়ার ওপর সকল মুসলিম একমত। যারা সকল ফিরিশতাদের অথবা তাদের আংশিকের অস্তিত্বকে, যাদের কথা আল্লাহ উল্লেখ করেছেন, তাদের কাউকে অস্বীকার করবে তারা কুফুরী করলো এবং কুরআন, হাদীস ও ইজমার বিরোধিতা করলো। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَمَن يَكۡفُرۡ بِٱللَّهِ وَمَلَٰٓئِكَتِهِۦ وَكُتُبِهِۦ وَرُسُلِهِۦ وَٱلۡيَوۡمِ ٱلۡأٓخِرِ فَقَدۡ ضَلَّ ضَلَٰلَۢا بَعِيدًا ١٣٦﴾ [النساء: ١٣٦]

“যে আল্লাহ তা‘আলাকে, তাঁর ফিরিশতাদেরকে, তাঁর কিতাবসমূহকে এবং তাঁর রাসূলগণকে ও শেষ দিবসকে অস্বীকার করবে, সে পথভ্রষ্ট হয়ে বহুদূরে গিয়ে পড়বে।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১৩৬]

(২) ফিরিশতাদের ওপর ঈমান আনার পদ্ধতি

ফিরিশতাদের প্রতি সংক্ষিপ্ত ও বিস্তারিতভাবে ঈমান আনা।

সংক্ষিপ্ত ঈমান নিম্নের বিষয়গুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে:

প্রথম: তাদের অস্তিত্ব স্বীকার করা, তারা আল্লাহর সৃষ্টজীব, আল্লাহ তাদেরকে তাঁর ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছেন। তাদের অস্তিত্ব প্রকৃত, তাদেরকে আমাদের না দেখা, তাদের অনুস্তিত্বের অর্থে নয়, কারণ পৃথিবীতে অনেক সুক্ষ্ম সৃষ্টজীব রয়েছে, তাদেরকে আমরা দেখতে পাই না, অথচ তারা প্রকৃতপক্ষে অস্তিত্ব নিয়ে রয়েছে।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিবরীল আলাইহিস সালামকে তাঁর প্রকৃত আকৃতিতে দু’বার দেখেছেন।

কতিপয় সাহাবী কিছু ফিরিশতাদেরকে মানুষের আকৃতিতে দেখেছেন।

ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বাল তার মুসনাদে আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিবরীল আলাইহিস্ সালামকে তার নিজস্ব আকৃতিতে ছয় শত পাখা বিশিষ্ট অবস্থায় দেখেছেন। প্রত্যেক পাখা একেক প্রান্ত ঢেকে রেখেছে। জিবরীলের প্রসিদ্ধ হাদীস, যা ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেন, তাতে প্রমাণিত হয় যে, জিবরীল আলাইহিস সালাম মানুষের আকৃতিতে ধবধবে সাদা পোষাকে, মিশ মিশ কালো চুলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসেছিলেন। তাঁর উপর ভ্রমণের কোনো নিদর্শন ছিল না। সাহাবাদের কেউ তাঁকে চিনতে পারে নি।

দ্বিতীয়: আল্লাহ তাদেরকে যে সম্মান দিয়েছেন, তাদেরকে সেই সম্মান দেওয়া। তারা আল্লাহর বান্দা বা দাস। আল্লাহ তাদেরকে সম্মানিত করেছেন, তাদের মর্যাদাকে উঁচু করেছেন এবং তাদেরকে নৈকট্য দান করেছেন। তাদের কেউ কেউ আল্লাহর ওহি ইত্যাদির রাসূল বা দূত। আল্লাহ তাদেরকে যতটুকু ক্ষমতার মালিক করেছেন, তারা ততটুকু ক্ষমতারই মালিক। তারপরও তারা তাদের নিজেদের ও অন্যদের লাভ-ক্ষতির মালিক নয়। এই জন্য আল্লাহ ছাড়া তাদেরকে এ রুবুবিয়াতের বা প্রভুত্বের গুণে গুণান্বিত করা তো দূরের কথা, যেমন- নাসারারা রূহুল কুদ্দুস সম্পর্কে ধারণা করেছে, বরং তাদের জন্যে ইবাদতের কোনো অংশ প্রদান করা বৈধ নয়।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَقَالُواْ ٱتَّخَذَ ٱلرَّحۡمَٰنُ وَلَدٗاۗ سُبۡحَٰنَهُۥۚ بَلۡ عِبَادٞ مُّكۡرَمُونَ ٢٦ لَا يَسۡبِقُونَهُۥ بِٱلۡقَوۡلِ وَهُم بِأَمۡرِهِۦ يَعۡمَلُونَ ٢٧﴾ [الانبياء: ٢٦، ٢٧]

“তারা বলল, দয়াময় আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করেছে। তাঁর জন্য কখনও তা উচিৎ নয়। বরং তারা (ফিরিশতারা) তো তাঁর সম্মানিত বান্দা। তারা আগে বেড়ে কথা বলে না এবং তারা তাঁর আদেশেই কাজ করে।” [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ২৬-২৭]

তিনি আরো বলেন,

﴿لَّا يَعۡصُونَ ٱللَّهَ مَآ أَمَرَهُمۡ وَيَفۡعَلُونَ مَا يُؤۡمَرُونَ ٦ ﴾ [التحريم: ٦]

“তারা আল্লাহ তা‘আলা যা আদেশ করেন, তা অমান্য করে না এবং যা করতে আদেশ করা হয় তাই করে।” [সূরা আত-তাহরীম, আয়াত: ৬]

প্রত্যেক মুসলিম নর ও নারীর ওপর এতটুকু ঈমান আনা ওয়াজিব। তাদের ওপর অপরিহার্য যে, তা জানবে ও বিশ্বাস করবে। কেননা এ বিষয়ে অজ্ঞতা কোনো গ্রহণযোগ্য ওযর বা কারণ নয়।

আর ফিরিশতাদের প্রতি বিস্তারিত ঈমান আনা নিম্নবর্ণিত বিষয়গুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে।

প্রথমত: ফিরিশতাদের সৃষ্টির মূল উৎস

আল্লাহ তা‘আলা ফিরিশতাদেরকে নূর থেকে সৃষ্টি করেছেন। যেমন, জিন্ন জাতিকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং আদম সন্তানদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন আর তাদের সৃষ্টি হলো আদম আলাইহিস্ সালাম এর সৃষ্টির পূর্বে।

হাদীসে এসেছে,

«خلقت الملائكة من نور، وخلق الجان من مارج من نار، وخلق آدم مما وصف لكم».

“ফিরিশতারা নূর থেকে, জিন্নেরা অগ্নি স্ফুলিঙ্গ থেকে, আর আদম আলাইহিস সালাম মাটি থেকে সৃষ্ট। (সহীহ মুসলিম)

দ্বিতীয়ত: ফিরিশতাদের সংখ্যা

ফিরিশতারা সৃষ্টজীব, তাদের আধিক্যের জন্যে আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া তাদের সংখ্যা কেউ জানে না। আকাশে প্রতি চার আংগুল পরিমাণ জায়গায় একেক জন ফিরিশতা সাজদারত অথবা দণ্ডায়মান অবস্থায় রয়েছেন। সপ্তম আকাশে বায়তুল মা‘মুরে সত্তর হাজার ফিরিশতা প্রত্যহ প্রবেশ করছেন। তাদের আধিক্যতার জন্যে দ্বিতীয় বার ফিরে আসার সুযোগ পাবেন না।

কিয়ামত দিবসে জাহান্নাম উপস্থিত করা হবে, তার সত্তর হাজার লাগাম হবে। প্রত্যেক লাগামে সত্তর হাজার ফিরিশতা হবে, তারা জাহান্নামকে টেনে নিয়ে আসবে।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَمَا يَعۡلَمُ جُنُودَ رَبِّكَ إِلَّا هُوَۚ﴾ [المدثر: ٣١]

“আর আপনার রবের বাহিনী সম্পর্কে একমাত্র তিনিই জানেন।” [সূরা আল-মুদ্দাসসির, আয়াত: ৩১]

হাদীসে এসেছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«أطَّت السماء وحق أن تئطَّ، ما فيها موضع قدم إلا وفيه ملك ساجد وراكع»

“আকাশ গর্জন করছে, আর গর্জন করারই কথা। কারণ, প্রত্যেক জায়গায় সাজদাহকারী ও রুকুকারী ফিরিশতা রয়েছে।

তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বাইতুল মা‘মুর সম্পর্কে বলেন,

«يدخله في كل يوم سبعون ألف ملك لا يعودون إليه».

“বাইতুল মা‘মুরে প্রত্যহ সত্তর হাজার ফিরিশতা প্রবেশ করেন, তারা দ্বিতীয়বার ফিরে আসার সুযোগ পাবেন না।” (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)

তিনি আরো বলেন,

«يؤتي بجهنم يومئذٍ لها سبعون ألف زمام، مع كل زمام سبعون ألف ملك».

“জাহান্নামকে নিয়ে আসা হবে, সে দিন তার সত্তর হাজার লাগাম হবে। আর প্রত্যেক লাগামে সত্তর হাজার ফিরিশতা হবে।” (সহীহ মুসলিম)

এখানে ফিরিশতাদের এক বিরাট সংখ্যা প্রকাশিত হল। যারা প্রায় (৭০০০০´৭০০০০=) ৪৯০ কোটি জন ফিরিশতা। তবে বাকী ফিরিশতাদের সংখ্যা কত হতে পারে? পবিত্রতা সেই সত্তার; যিনি তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। তিনি তাদেরকে পরিচালনা করেন। তাদের সংখ্যা পরিসংখ্যান করে রেখেছেন।

তৃতীয়ত: ফিরিশতাদের নাম

কুরআন ও হাদীসে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের জন্যে যে সকল ফিরিশতাদের নাম উল্লেখ করেছেন, তাদের ওপর ঈমান আনা ওয়াজিব। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন তিনজন:

(১) জিবরীল: তাকে জিবরাঈলও বলা হয়। তিনিই রুহুল কুদুস, যিনি ওয়াহী- যা অন্তরের সুধা-নিয়ে রাসূলগণের নিকট অবতরণ হন।

(২) মিকাঈল: তাকে প্রশান্তি বলা হয়। বৃষ্টি বর্ষণের দায়িত্বে নিয়োজিত, যা জমির জীবিকাস্বরূপ। আল্লাহ যেখানে বর্ষণের আদেশ দেন সেখানে বর্ষণ পরিচালনা করেন।

(৩) ইসরাফীল: তিনি শিংগায় ফুৎকার দেওয়ার দায়িত্বে রয়েছেন। যা পার্থিব জীবন শেষে পারলৌকিক জীবন শুরু হওয়ার ঘোষণাস্বরূপ এবং এর দ্বারাই (মৃত) দেহসমূহের পুনরুজ্জীবন ঘটবে।

চতুর্থত: ফিরিশতাদের সিফাত বা বৈশিষ্ট্য

ফিরিশতারা প্রকৃতপক্ষে সৃষ্টজীব। তাদের প্রকৃত শরীর রয়েছে যা সৃষ্টিগত ও চরিত্রগত গুণে গুণান্বিত, নিম্নে তাদের কিছু গুণ বর্ণনা করা হলো:

(ক) তাদের সৃষ্টি মহান এবং তাদের শরীর হলো বিশাল আকৃতির:

আল্লাহ তা‘আলা ফিরিশতাদেরকে শক্তিশালী ও বড় আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন। ফলে আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে আসমান ও জমিনে যে বড় বড় কাজের দায়িত্ব দিয়েছেন তারা তার উপযোগী।

(খ) তাদের ডানা রয়েছে:

আল্লাহ তা‘আলা ফিরিশতাদের জন্যে দুই, তিন ও চার বা ততোধিক পাখা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। যেমন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিবরীল আলাইহিস সালামকে দেখেছিলেন, তার নিজস্ব আকৃতি ছয়শত পাখা বিশিষ্ট অবস্থায়। যা আকাশের প্রান্তভাগ ঢেকে রেখেছিল।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ٱلۡحَمۡدُ لِلَّهِ فَاطِرِ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِ جَاعِلِ ٱلۡمَلَٰٓئِكَةِ رُسُلًا أُوْلِيٓ أَجۡنِحَةٖ مَّثۡنَىٰ وَثُلَٰثَ وَرُبَٰعَۚ يَزِيدُ فِي ٱلۡخَلۡقِ مَا يَشَآءُۚ ﴾ [فاطر: ١]

“সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আসমান ও জমিনের স্রষ্টা এবং ফিরিশতাদেরকে করেছেন কর্তা বাহক-তারা দুই দুই, তিন তিন ও চার চার পাখা বিশিষ্ট। তিনি সৃষ্টির মধ্যে যা ইচ্ছা বৃদ্ধি করেন।” [সূরা ফাত্বির, আয়াত: ১]

(গ) তাদের পানাহার প্রয়োজন হয় না:

আল্লাহ তা‘আলা ফিরিশতাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। তারা পানাহারের মুখাপেক্ষী নন। তারা বিবাহ করেন না, সন্তানও হয় না।

(ঘ) ফিরিশতারা অন্তরবিশিষ্ট ও জ্ঞানী:

তাঁরা আল্লাহর সাথে কথা বলেছেন এবং আল্লাহ তাদের সাথে কথা বলেছেন। তারা আদম ও অন্যান্য নবীদের সাথেও কথা বলেছেন।

(ঙ) তাদের নিজস্ব আকৃতি ছাড়া অন্য আকৃতি ধারণ করার ক্ষমতা রয়েছে:

আল্লাহ স্বীয় ফিরিশতাদেরকে পুরুষ মানুষের আকৃতি ধারণ করার ক্ষমতা দিয়েছেন। এতে রয়েছে মূর্তিপূজকদের ভ্রান্ত ধারণার খণ্ডন। যারা ধারণা করে যে ফিরিশতারা আল্লাহর মেয়ে বা কন্যা। তাদের আকৃতি ধারনের পদ্ধতি আমাদের জানা নেই। তবে তারা এমন সুক্ষ্ম আকৃতি ধারণ করে যে তাদের ও মানুষের মাঝে পার্থক্য করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে।

(চ) ফিরিশতাদের মৃত্যু:

মালাকুল মাউত বা জান কবজকারী ফিরিশতা সহ সকল ফিরিশতা কিয়ামত দিবসে মারা যাবে। অতঃপর আল্লাহ তাদেরকে যে যে দায়িত্ব দিয়েছিলেন, সে দায়িত্ব পালন করার জন্য পুনরুথ্যান করা হবে।

(ছ) ফিরিশতাদের ইবাদত:

ফিরিশতারা আল্লাহর অনেক ধরণের ইবাদত করেন। সালাত, দো‘আ, তাসবীহ, রুকু, সাজদাহ, ভয়-ভীতি ও ভালোবাসা ইত্যাদি। তাদের ইবাদতের বর্ণনা নিম্নরূপ:

(১) তারা ক্লান্তহীনভাবে আল্লাহর ইবাদতে সর্বদা রত থাকেন।

(২) তারা একনিষ্টতার সাথে আল্লাহ তা‘আলার জন্যে ইবাদত করেন।

(৩) তারা নাফারমানী বর্জন করে সর্বদা আনুগত্যে মাশগুল থাকেন; কেননা তারা মা‘সুম অর্থাৎ নাফারমানী ও পাপাচার থেকে মুক্ত।

(৪) অধিক ইবাদত করার সাথে সাথে আল্লাহর জন্য বিনয়-নম্রতা প্রকাশ করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿يُسَبِّحُونَ ٱلَّيۡلَ وَٱلنَّهَارَ لَا يَفۡتُرُونَ ٢٠﴾ [الانبياء: ٢٠]

“তারা রাত্রি-দিন তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা বর্ণনা করে, তারা ক্লান্ত হয় না।” [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ২০]

পঞ্চমত: ফিরিশতাদের কর্মসমূহ:

ফিরিশতারা অনেক বড় বড় কাজ সম্পাদন করেন, যার দায়িত্ব আল্লাহ তাদেরকে দিয়েছেন। সে কাজগুলো নিম্নরূপ:

(১) ‘আরশ বহন করা।

(২) রাসূলগণের ওপর অহী অবতীর্ণের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফিরিশতা।

(৩) জান্নাত ও জাহান্নামের পাহারাদার।

(৪) উদ্ভিদ, বৃষ্টি বর্ষণ ও বাদল পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত।

(৫) পাহাড়-পর্বতের দায়িত্বপ্রাপ্ত।

(৬) শিংগায় ফুৎকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফিরিশতা।

(৭) আদম সন্তানের কর্ম লিপিবদ্ধ করার দায়িত্বপ্রাপ্ত।

(৮) আদম সন্তানকে হিফাযত করার দায়িত্বপ্রাপ্ত। আল্লাহ যখন আদম সন্তানের ওপর কোনো কাজ নির্ধারণ করেন, তখন তারা তাকে পরিত্যাগ করেন, অতঃপর আল্লাহ তাদের জন্য যা নির্ধারণ করেছিলেন তা সংঘটিত হয়।

(৯) মানুষের সাথে থাকার ও তাদেরকে কল্যাণের দিকে আহ্বানের দায়িত্বপ্রাপ্ত।

(১০) জরায়ুতে বীর্য সঞ্চার, মানুষের (দেহে) অন্তরে আত্মা প্রক্ষেপ, তার রিযিক, কর্ম ও সৌভাগ্য বা দূর্ভাগ্য লিপিবদ্ধে দায়িত্বপ্রাপ্ত ফিরিশতা।

(১১) মৃত্যুর সময় আদম সন্তানের আত্মা কবজ করার দায়িত্বপ্রাপ্ত ফিরিশতা।

(১২) মানুষকে কবরে জিজ্ঞাসাবাদ এবং উত্তর অনুযায়ী শান্তি বা শাস্তি প্রদানে দায়িত্বপ্রাপ্ত।

(১৩) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর তাঁর উম্মতের সালাম পৌঁছানোর দায়িত্ব প্রাপ্ত। তাই মুসলিম ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর তার সালাম প্রেরণের জন্য তাঁর কাছে (তাঁর কবরের কাছে) ভ্রমণের প্রয়োজন হয় না; বরং পৃথিবীর যে কোনো স্থান থেকে তাঁর ওপর সালাম ও দুরুদ পাঠ করাই যথেষ্ট। কারণ, ফিরিশতারা তার সালাম পৌঁছিয়ে দেন। মসজিদে নববীতে একমাত্র সালাত আদায়ের উদ্দেশে ভ্রমণ করা বৈধ রয়েছে।

উল্লিখিত প্রসিদ্ধ কাজসমূহ ব্যতীত তাদের (ফিরিশতাদের) আরো অনেক কাজ রয়েছে। নিম্নে এর প্রমাণ বর্ণিত হলো:

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ٱلَّذِينَ يَحۡمِلُونَ ٱلۡعَرۡشَ وَمَنۡ حَوۡلَهُۥ يُسَبِّحُونَ بِحَمۡدِ رَبِّهِمۡ وَيُؤۡمِنُونَ بِهِۦ وَيَسۡتَغۡفِرُونَ لِلَّذِينَ ءَامَنُواْۖ﴾ [غافر: ٧]

“যারা ‘আরশ বহন করে এবং যারা তার চার পাশে আছে, তারা তাদের রবের স-প্রশংসা পবিত্রতা বর্ণনা করে, তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে এবং মুমিনদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে।” [সূরা গাফির, আয়াত: ৭]

তিনি আরো বলেন,

﴿قُلۡ مَن كَانَ عَدُوّٗا لِّـجِبۡرِيلَ فَإِنَّهُۥ نَزَّلَهُۥ عَلَىٰ قَلۡبِكَ بِإِذۡنِ ٱللَّهِ﴾ [البقرة: ٩٧]

“আপনি বলে দিন, যে কেউ জিবরীলের শত্রু হয়; যেহেতু তিনি আল্লাহর আদেশে এ কালাম আপনার অন্তরে নাযিল করেছেন।” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ৯৭]

তিনি আরো বলেন,

﴿وَلَوۡ تَرَىٰٓ إِذِ ٱلظَّٰلِمُونَ فِي غَمَرَٰتِ ٱلۡمَوۡتِ وَٱلۡمَلَٰٓئِكَةُ بَاسِطُوٓاْ أَيۡدِيهِمۡ أَخۡرِجُوٓاْ أَنفُسَكُمُۖ﴾ [الانعام: ٩٣]

“যদি আপনি দেখেন যখন যালিমরা মৃত্যু-যন্ত্রনায় থাকে এবং ফিরিশতারা স্বীয় হস্ত প্রসারিত করে বলে, বের কর স্বীয় আত্মা।” [সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ৯৩]

ষষ্ঠত: আদম সন্তানের ওপর ফিরিশতাদের অধিকার

(ক) তাদের ওপর ঈমান আনা।

(খ) তাদেরকে ভালোবাসা, সম্মান করা ও তাদের মর্যাদা বর্ণনা করা।

(গ) তাদেরকে গালি দেওয়া, মর্যাদা ক্ষুণ্য করা ও তাদেরকে নিয়ে হাস্যরস করা হারাম।

(ঘ) ফিরিশতারা যা অপছন্দ করেন তা থেকে দূরে থাকা। কারণ, আদম সন্তানরা যাতে কষ্ট পায়, তারাও তাতে কষ্ট পায়।

সপ্তমত: ফিরিশতাদের ওপর ঈমান আনার শুভ-ফলাফল

(ক) ঈমান পরিপূর্ণ হয়; কারণ তাদের ওপর ঈমান আনা ছাড়া কারো ঈমান পরিপূর্ণ হবে না।

(খ) তাদের সৃষ্টিকর্তার মহত্ব বা শ্রেষ্ঠত্ব ও তাঁর শক্তি ও রাজত্বে জ্ঞান অর্জন। কারণ, সৃষ্টিকর্তার, শ্রেষ্ঠত্ব হতে সৃষ্টি জীবের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ পায়।

(গ) তাদের গুণাগুণ, তাদের অবস্থা ও কর্ম জানার মাধ্যমে মুসলিম ব্যক্তির ঈমান বৃদ্ধি পায়।

(ঘ) আল্লাহ তা‘আলা যখন মুমিনদেরকে ফিরিশতা দিয়ে হিফাযত করেন, তখন মুমিনদের শান্তি ও তৃপ্তি অর্জন হয়।

(ঙ) ফিরিশতাদেরকে ভালোবাসা: তাদের ইবাদত সঠিক পন্থায় হওয়ায় ও মুমিনদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার কারণে।

(চ) খারাপ ও নাফরমানীপূর্ণ কাজকে অপছন্দ করা।

(ছ) আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বান্দাদের গুরুত্ব দেন এ জন্য তাঁর প্রশংসা করা। যেমন, আল্লাহ ঐ সকল ফিরিশতাদের কাউকে বান্দাদেরকে হিফাযতের ও কর্ম লিখার ইত্যাদি কল্যাণজনক কাজের দায়িত্ব দিয়েছেন।

এই বইটির সকল আর্টিকেল পড়তে নিচের লিংক গুলো ক্লিক করুন

প্রথম রুকন: মহান আল্লাহর ওপর ঈমান

দ্বিতীয় রুকন: ফিরিশতাদের ওপর ঈমান

তৃতীয় রুকন: আসমানী গ্রন্থসমূহের ওপর ঈমান

চতুর্থ রুকন: রাসূলদের ওপর ঈমান

পঞ্চম রুকন: শেষ দিবসের ওপর ঈমান

ষষ্ঠ রুকন: তাকদীরের ওপর ঈমান