বনু কুরাইজা হত্যাকাণ্ড—ঘটনার পেছনের ঘটনা (টু)

এবার প্রশ্ন করল শাবির। সে বলল, কিন্তু সাজিদ, তুই হঠাৎ এরকম আইন-আদালত নিয়ে বসলি কেন এখানে?

‘আগে আমার কথা শেষ হোক’ বলে সাজিদ আবার বলতে আরম্ভ করল, আচ্ছা বিমল দা, তুমি এখন আমাদের রাষ্ট্রপতি, ঠিক আছে?

মাথা নাড়ল বিমল দা।

‘ধরো, যদি আমি এবং আরিফ তোমার বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্লট আঁকি? যদি আমরা তোমাকে মান্য করার, তোমার তৈরি সংবিধান মান্য করার জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েও তোমার বিরুদ্ধে, তোমার আইনের বিরুদ্ধে যাই? যদি তোমার শত্রুদের সাহায্য করি? অস্ত্র দিই? সৈন্য দিই? তাহলে তুমি তোমার সংবিধান-মতে আমাদের কী বিচার করবে?’

বিমল দা কিছুক্ষণ ভাবল। এরপর বলল, “হয়তো তোদের দুজনকে মৃত্যুদণ্ড দেবো, নয়তো যাবজ্জীবন কারাদণ্ড…।’

‘এক্সাক্টলি! তুমি ঠিক এটাই করবে এবং রাষ্ট্রনেতা হিশেবে, সংবিধান-মতে, তোমার ঠিক এটাই করা উচিত। সাজিদ বলল। সে আরও বলতে লাগল, এবার একই চিত্রপটে আরেকটি ঘটনায় আসো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন হিজরত করে মদীনায় আসলেন, তখন মদীনায় ইহুদী সম্প্রদায় ছিল তিনটি। বনু নাযীর, বনু কায়নুকা এবং বনু কুরাইজা। মদীনায় এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনার নেতা হলেন এবং মদীনার ইহুদী সম্প্রদায়সহ অন্যান্য সম্প্রদায় নিয়ে তিনি একটি রাষ্ট্রীয় সংবিধান তৈরি করলেন। সেই সংবিধানের নাম : মদীনা সনদ। এটুকু তো সবাই জানি, তাই না?

‘হু’, বিমল দার সম্মতি।

‘সেই মদীনা সনদের অনেকগুলো ধারা ছিল। ধারাগুলোতে বলা ছিল : মদীনায় মুসলিম, ইহুদী এবং অন্যান্যরা পরস্পর সহাবস্থান করবে এবং কেউ মদীনা আক্রমণ করলে সবাই একযোগে যুদ্ধ করবে। মদীনার কেউ কখনোই কুরাইশদের সাহায্যসহযোগিতা করবে না ইত্যাদি।

‘হু।

‘এখন, সীরাত থেকে আমরা জানতে পারি, মদীনায় ইহুদী গোষ্ঠী বনু নাযীর এবং বনু কায়নুকা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে প্লট আঁকে। তাকে উৎখাতের ষড়যন্ত্র করে। কুরাইশদের সাথেও গোপনে যোগাযোগ রাখে, যা ছিল স্পষ্ট সনদবিরুদ্ধ। এমতাবস্থায়, এই দুই সম্প্রদায়কে মদীনা থেকে বহিষ্কার করলে কি তা সংবিধানবিরুদ্ধ হবে? আমাদের ‘পেনাল কোড- ১৮৬০’ অনুসারে এদের কী শাস্তি হওয়া উচিত?

বিমল দা চুপ করে আছে। সাজিদ কেন এত লম্বা গল্প ফাঁদল এতক্ষণে বুঝলাম। বিমল দা যে বলেছিল, ‘দয়ার নবী কেবল বনু কুরাইজা নয়, বনু নাযীর আর বনু কায়নুকা গোত্রও স্বদেশ ছাড়া করেছিল, এর জবাব দেওয়ার জন্যই সে এতদূর কাহিনি সাজিয়েছে।

সাজিদ আবার বলতে লাগল, “আমাদের পেনাল কোড অনুযায়ী-ই তো এটি সৃতঃসিদ্ধ। তাহলে একজন রাষ্ট্রনায়ক হয়ে, মদীনার সর্বোচ্চ নেতা হয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যদি আইনের প্রয়োগ করে, তাতে কেন অসুবিধা হবে বিমল দা?’

কারও মুখে কোনো কথা নেই। বিমল দা একদম চুপসে গেছে। আলম ভাই চায়ের কেতলি চুলোয় তুলে দিচ্ছেন আর মুচকি মুচকি হাসছেন। একটু থেমে সাজিদ এবার শাবিরকে উদ্দেশ্য করে বলল, এবার তোর পয়েন্টে আসি, শাবির। তুই বলতে চাস যে, বনু কুরাইজা গোত্র নিরপরাধ ছিল, তাই তো?’

‘হ্যাঁ, শাবির বলল।

‘তোর দাবির পক্ষে প্রমাণ আছে?

শাবির বলল, সীরাতে ইবনে ইসহাক-এ বর্ণনা করা আছে, মুহাম্মদ যখন খন্দকের যুদ্ধের জন্য পরিখা খনন করে ঘরে এসে অস্ত্র ত্যাগ করে গোসলের উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই জিবরাঈল এসে তাকে কুরাইজা গোত্রের বিরুদ্ধে ফুসলিয়ে দেয়। ব্যস, মুহাম্মদ তার সৈন্যবাহিনী পাঠিয়ে তাদের হত্যা করে আসে। অথচ, বনু কুরাইজা ছিল নিরপরাধ। একটি নিরপরাধ গোত্রের সকলকে নির্বিচারে হত্যা করে ফেলা কি অমানবিক নয়?

সাজিদ একটু গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, সীরাতে ইবনে ইসহাক-এর কত পৃষ্ঠায় এটি আছে?

‘৮২ পৃষ্ঠায়’, শাবিরের উত্তর।

‘তার মানে, তুই সীরাতে ইবনে ইসহাক-এর বর্ণনা টেনে প্রমাণ করতে চাইছিস যে, বনু কুরাইজা কোনো অপরাধ করেনি।

‘হ্যাঁ। সীরাতে ইবনে ইসহাক-এর এই বর্ণনাতে তাদের অপরাধের কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না। এটাই প্রমাণ করে বনু কুরাইজা গোষ্ঠী নিরপরাধ ছিল।

সাজিদ বলল, “তুই সীরাতে ইবনে ইসহাক পুরোপুরি পড়েছিস কখন?’ এই প্রশ্ন শুনে বিমল দা, শাবির এবং আমি সাজিদের দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকালাম। সাজিদ বলল, “তুই সীরাতে ইবনে ইসহাক-এর ৮২ পৃষ্ঠার বর্ণনা টেনে প্রমাণ করতে চাইছিস যে, বনু কুরাইজা নিরপরাধ। অথচ সীরাতে ইবনে ইসহাক-এর

And news came that the Jewish tribe of Banu Qurayza had broken their treaty with Muhammad

অর্থাৎ জিবরাঈল আলাইহিস সালাম এসে খবর দেওয়ার আগেই মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে খবর চলে আসে যে, বনু কুরাইজা গোত্র চুক্তিভঙ্গ করেছে। সীরাতে ইবনে ইসহাক-এর এই লাইনগুলো মনে হয় তোর চোখ এড়িয়ে গেছে, তাই না?

সাজিদের কথা শুনে শাবির চুপ করে আছে। সাজিদ বলে যেতে লাগল, ‘বনু কুরাইজা যে অপরাধী ছিল, তার অনেক ঐতিহাসিক প্রমাণ বিদ্যমান আছে। সহীহ বুখারী-তে ইবনু উমারের বরাতে বলা হয়েছে, ‘Bani An-Nadir and Bani Quraiza fought (against the Prophet violating their peace treaty), so the Prophet exiled Bani An-Nadir and allowed Bani Quraiza to remain at their places (in Medina) taking nothing from them till THEY FOUGHT AGAINST THE PROPHET AGAIN”[১]

এখান থেকে স্পষ্ট যে, বনু কুরাইজা চুক্তি ভঙ্গ করে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল। সুনানু আবি দাউদে ইবনু উমারের বরাতে বলা হচ্ছে, ‘The Jews Al Nadir and Quraizah fought with the Apostle of Allah, so the Apostle of Allah expelled Banu Al Nadir and allowed the Quraizah to stay and favored them. The Quraizah thereafter fought (with the Prophet).'[২]

এখান থেকেও স্পষ্ট যে, বনু কুরাইজা সম্প্রদায় নিরপরাধ ছিল না। তারা চুক্তি ভঙ্গ করেছিল এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধও করেছিল। তাহলে, তুই যে বলছিলি— নিরপরাধ বনু কুরাইজা-নিরপরাধ বনু কুরাইজা, এটা একটা ডাহা মিথ্যা কথা। তারা নিরপরাধ ছিল না, অপরাধী ছিল। সংবিধান লঙ্ন করে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার মতো অপরাধ।

তাহলে রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রনেতার বিরুদ্ধে গিয়ে, তাকে উৎখাত করে নিজেদের স্বায়ত্তশাসন চালু করতে বা অন্য কোনো শত্রুপক্ষকে বিজয়ী করতে যখন কেউ রাষ্ট্রদ্রোহ করে, পেনাল কোড- ১৮৬০ অনুযায়ী তার কী শাস্তি হওয়া উচিত?

আমি বললাম, ‘মৃত্যুদণ্ড…। ‘এক্সাক্টলি’, সাজিদের জবাব।

এতক্ষণ পরে বিমল দা বলে উঠল, ‘তা বুঝলাম; কিন্তু মৃত্যুদণ্ড না দিয়ে যাবজ্জীবন দণ্ড দিলেও তো পারত, তাই না?

সাজিদ হাসল। তারপরে বলল, ‘মজার ব্যাপার হলো কী জানো, হত্যার এই নির্দেশ কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দেননি।

অদ্ভুত কিছু শুনলে মানুষ যেরকম চমকে ওঠে, আমিও সেরকম চমকে উঠলাম অনেকটা। চোখ বড় বড় করে সাজিদের দিকে তাকিয়ে রইলাম। শাবির বলল, ‘মানে কী? হত্যার নির্দেশ নবী মুহাম্মাদ না দিলে তাহলে দিল কে?

আগের অংশ টুকু পড়তে[এখানে ক্লিক করুন]পরের অংশ টুকু পড়তে[এখানে ক্লিক করুন]

রিফারেন্স

১ সহীহ বুখারী, খণ্ড : ৫; হাদীস : ৩৬২

২ সুনানু আবি দাউদ, ২২৯৯

ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে। তাহলে আপনিও ব্লগের কার্যক্রম কে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার লেখণী পাঠাতে পারেন।আপনার লেখনী পাঠিয়ে আমাদের ফেচবুক পেজের ম্যাসেঞ্জারে গিয়ে দয়াকরে নক করুন।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন