বনু কুরাইজা হত্যাকাণ্ড—ঘটনার পেছনের ঘটনা (ওয়ান)

সাজিদ বলল, ‘একদমই না। এটি একেবারে মেনে নেওয়া যায় না।

হঠাৎ, পেছন থেকে এসে আমার কাঁধে হাত রাখল কেউ একজন। পাশ ঘুরতেই দেখলাম বিমল দা।

বিমল দা হচ্ছে আমাদের ডিবেট ক্লাবের সেক্রেটারি। তিনি খুবই ভালো মানুষ; কিন্তু একটাই দোষ। ধর্মবিরোধী। এজন্য বিমল দাকে আমি কিছুটা অপছন্দ করি। আমি কেন যেন ধর্মবিরোধী লোকগুলোকে একদম সহ্য করতে পারি না। এই যেমন শাবির, আমার ক্লাসমেট। অথচ ওর কাছ থেকে পালিয়ে থাকতে পারলেই যেন বাঁচি; কিন্তু সাজিদের ওঠা-বসা, মেলামেশা সব এদের সাথেই। ওর কথা হচ্ছে, জগতের সবার মতামতকে শুনতে হয়, বুঝতে হয়। আমি বাপু এত মতামত শোনার পক্ষে না।

বিমল দা আমার পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলল

‘ইচ্ছে করে শালিক হতে নীল আকাশের কোলে ইচ্ছে করে ধুলোয় লুটাই আমার মায়ের বোলে।

ইচ্ছে করে মেঘের দেশে বৃষ্টি হতে ফের যখন তখন হারিয়ে যাবার ইচ্ছে আমার ঢের!’

এটি আমার লেখা কবিতার একটি অংশ। বিমল দার মুখে এটি প্রায়ই শুনি। বিপ্লব দা এবং বিমল দা আমার কবিতার একনিষ্ঠ ভক্ত। কবিতার এই লাইনগুলো আবৃত্তি করে বিমল দা বলল, “কী ব্যাপার! কবিদের সভা হচ্ছে নাকি এখানে? আমাকে ছাড়া টিএসসিতে কোনো কবিতার আজ্ঞা হতে দেওয়া চলবে না। এ জন্য আজকে হরতাল!

তার কথা শুনে আমরা সবাই হেসে উঠলাম। আমাদের সাথে সাথে আলম ভাইও হেসে ফেললেন। বিমল দা খুবই মজার লোক। মানুষকে হাসাতে পারার এক অদ্ভুত ক্ষমতা নিয়ে জন্মেছে। শাবির বলল, “না দাদা, এখানে কবিতার সভা হচ্ছে না, ধর্ম নিয়ে আলাপ হচ্ছে…।

বিমল দা বলে উঠল, “ওম শান্তি ওম শান্তি!!

বিমল দা এটি টিটকারি করে বলল নাকি মজা করে বলল ঠিক বুঝলাম না। বিমল দা আবার বলল, ‘তা ধর্মের কোন অংশটি নিয়ে আলাপ হচ্ছে?

রামের লঙ্কা জয়,নাকি যিশু খ্রিষ্টের মরেও বেঁচে যাওয়া? অথবা, মুহাম্মাদের ধর্মযুদ্ধ? কোনটা?’

আমি আর সাজিদ চুপ করে আছি। শাবির বলল, “দাদা, ইসলামের নবী শান্তি প্রতিষ্ঠার নাম করে যে নিরপরাধ বনু কুরাইজা সম্প্রদায়কে হত্যা করেছিল, এটি নিয়েই বলছি…।

‘ও আচ্ছা। বনু কুরাইজা নিরপরাধ তো ছিলই, তাদের গোত্রের সকল পুরুষকেই হত্যা করেছিলেন দয়ার নবী। শুধু তা-ই না, বনু কুরাইজা সম্প্রদায়কে হত্যা করার আগে দয়ার নবীকে মদীনায় আশ্রয় দেওয়া আরও দুই ইহুদী সম্প্রদায় বনু কায়নুকা এবং বনু নাযীরকেও তিনি মদীনা থেকে বের করে দেন। অথচ, তিনি নাকি স্রষ্টার কাছ থেকে রহমতস্বরূপ এই ধরাধামে অবতরণ করেছেন। What an irony…!!

আর চুপ করে থাকা যাচ্ছে না। দুজনের টিটকারি আর উপহাসে আমার গা ঘিনঘিন করছে। কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলাম, সাজিদ আমাকে ইশারা করে চুপ করতে বলল। ইতোমধ্যেই বিমল দা তার হাতে থাকা চায়ের কাপে শেষ চুমুকটুকু দিয়ে সিগারেট ধরাল। সিগারেটের ধোঁয়া ভোলা আকাশে ফু দিয়ে বিলীন করে দিতে দিতে বলল, কই, আলাপ কি থেমে গেল নাকি?’

বিমল দার কথা শুনে শাবির সাজিদের দিকে ফিরে বলল, “সাজিদ, তোর কী মনে হয়, এগুলো মানবতাবিরোধী অপরাধ নয়?’ ‘অবশ্যই মানবতাবিরোধী অপরাধ’, সাজিদের সরল স্বীকারোক্তি। ‘এরপরেও কি বলবি তোদের নবী ঠিক কাজ করেছে?

এবার সাজিদ চুপ করে গেল। বিমল দা বলল, He’ll be back with his witty logics now, Ha-ha-ha…’

সাজিদ বিমল দার কথায় কর্ণপাত করল বলে মনে হলো না। সে শাবিরের দিকে তাকিয়ে বলল, “শাবির, দেখা যাচ্ছে তুই আমার মতামত শুনতে বেশ আগ্রহ দেখাচ্ছিস। যদি ধৈর্য ধরে শোনার মতো অবস্থায় থাকিস, তাহলে আমি আমার মতামত তুলে ধরতে পারি।

বিমল দা সিগারেটে শেষ-টান দিয়ে দূরে ছুড়ে মারল শেষ অংশটুকু। এরপর বিদ্রুপের সুরে বলল, “শুধু শাবির কেন ব্রো? আমরাও তোমার বক্তব্য শোনার অপেক্ষায় আছি।

শাবির বলল, “অবশ্যই, আমরা শুনতে আগ্রহী।

দুজনের আগ্রহ দেখে সাজিদ বলতে আরম্ভ করল, “আচ্ছা বিমল দা, খুব সংক্ষেপে কিছু কথা বলব। একটু মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে। বিমল দা বলল, “হুম। ‘ধরো, তুমি, আমি, আরিফ আর শাবির, আমরা চারজন মিলে একটি রাষ্ট্র গঠন করলাম।

‘হুম।

‘আরও ধরো, আমরা এই রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান হিশেবে তোমাকে নির্বাচিত করলাম। ঠিক আছে?

বিমল দা মাথা নেড়ে বললেন, ‘কিয়া বাত হ্যায়! আমি রাষ্ট্রপতিও হয়ে গেলাম? সে যা-ই হোক, ধরে নিলাম—আমি এখন রাষ্ট্রপতি। তারপর?

সাজিদ বলল, এখন তুমি যেহেতু আমাদের ভূখণ্ডের রাষ্ট্রনায়ক, তাহলে আমাদের করণীয় কী?

বিমল দার উত্তর, ‘তোদের করণীয় হচ্ছে, তোরা যেহেতু আমাকে নেতা নির্বাচন করেছিস, সেহেতু আমার সিদ্ধান্ত মেনে চলা। আমার তৈরি আইনের প্রতি শ্রদ্ধা করা এবং তা মেনে চলা।

‘তোমার তৈরি আইন মানে?’ সাজিদের প্রশ্ন।

‘আমার তৈরি আইন মানে হচ্ছে রাষ্ট্রের তৈরি আইন।

“ও আচ্ছা, সে আইনে রাষ্ট্রদ্রোহিতার কোনো ধারা থাকবে?’ সাজিদের পাল্টা প্রশ্ন।

বিমল দার উত্তর, “অবশ্যই থাকবে। থাকতে হবে।

‘কীরকম?

‘কেউ যখন যে-রাষ্ট্রে বাস করে সেই রাষ্ট্র, রাষ্ট্রের আইন ও সরকার ইত্যাদির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করলে তার বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

‘সেগুলো কেমন হতে পারে?

বিমল দা ভাবতে লাগল। সাজিদ আবারও বলল, ‘বিমল দা, তুমি চাইলে বাংলাদেশ সংবিধানের সাহায্য নিতে পারো।

সাজিদের কথা শুনে হাসি দিল বিমল দা। ঝটপট সমাধান পেয়ে হয়তো-বা খুশি হয়েছে। সাথে সাথেই গুগল সার্চ করে বিমল দা বাংলাদেশ সংবিধানের দণ্ডবিধির ধারাগুলো পড়া শুরু করল। দুবার আগাগোড়া চোখ বুলিয়ে এবার রাষ্ট্রদ্রোহিতার বিধান খুঁজে পেল। বিমল দা সরাসরি বাংলাদেশ সংবিধানের ‘পেনাল কোড১৮৬০’ এর ১২১ ধারা থেকে পড়া শুরু করল : ১২১ ধারায় আছে, ‘Whoever wages war against Bangladesh, or attempts to wage such war, or abets the waging of such war, shall be punished with death, or (imprisonment] for life, and shall also be liable to fine’

‘অর্থাৎ বাংলাদেশ দণ্ডবিধি আইনের ১২১ ধারায় বলা হচ্ছে, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কেউ যদি যুদ্ধ পরিচালনা করে অথবা যুদ্ধ পরিচালনার চেষ্টা করে, নতুবা এরকম যুদ্ধ পরিচালনায় যদি অন্যপক্ষকে সাহায্যও করে, তাহলে সে (বা তারা ) মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবে, সাথে অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হবে।

১২১ ধারার (ক) নম্বর ধারায় আছে, “Whoever within or without Bangladesh conspires to commit any of the offences punishable by section 121, or to deprive Bangladesh of the sovereignty of her territories or of any part thereof, or conspires to overawe, by means of criminal force or the show of criminal force, the Government, shall be punished with imprisonment for life) or with imprisonment of either description which may extend to ten years, and shall also be liable to fine’

আগের অংশ টুকু পড়তে[এখানে ক্লিক করুন]পরের অংশ টুকু পড়তে[এখানে ক্লিক করুন]

ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে। তাহলে আপনিও ব্লগের কার্যক্রম কে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার লেখণী পাঠাতে পারেন।আপনার লেখনী পাঠিয়ে আমাদের ফেচবুক পেজের ম্যাসেঞ্জারে গিয়ে দয়াকরে নক করুন।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন