মূল: বাতাস সমাচার । লেখক:আব্দুল্লাহ আল মাসুদ । ওয়েব সম্পাদনা: আবু বক্কার ওয়াইস বিন আমর

বাতাস মানবজীবনে বেঁচে থাকার অন্যতম মাধ্যম। সেহিসেবে এটি অনেক বড় নিয়ামত। তবে মাঝেমাঝে তিনি নিয়ামতকে নিক্বামে (শাস্তি) পরিণত করেন। যেমন পানিকে জীবনের অপর নাম বলা হলেও পানি দিয়েই তিনি ফিরআউন ও দলবলের জীবনাবসান ঘটিয়েছেন। নূহ আ. এর কওমকেও পাকড়াও করেছেন পানির মাধ্যমে। এমনই বাতাসকেও অনেক সময় তিনি রহমতের পরিবর্তে আযাবের উপকরণে রূপান্তরিত করেন। কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে বাতাসের ‘নিয়াম-নিক্বাম’ দুই রূপই আমরা দেখতে পাই। তবে এই ক্ষেত্রে কুরআনের শব্দচয়ন ও এর পেছনে লুকায়িত গূঢ়ার্থ জানতে পারলে এটি আমাদের যেমন আমোদিত করবে, তেমনি বিমোহিতও করবে। কুরআনের প্রতিটি শব্দচয়ন অত্যন্ত সুচিন্তিত ও হেকমতপূর্ণ। এমন না যে, ঘটনাক্রমে তা চয়িত হয়েছে। আমরা আলাপচারিতার মধ্যে শব্দের খুব বেশি গভীরতায় না যেয়ে খুব স্বাভাবিক গতিতে মনের ভাব প্রকাশের স্বার্থে বিভিন্ন শব্দ চয়ন করে বাক্যে তা ব্যবহার করি। কুরআনের ক্ষেত্রে এমনটি হয় না। বরং এর সামান্য থেকে সামান্যতম বিষয়ও কোন না কোন হেকমত ও ফায়দা প্রদান করে থাকে। কুরআনের একটা অক্ষরও অযথা বা বাহুল্যের দোষে দূষণীয় নয়। আরবীভাষায় বাতাসকে সাধারনভাবে বলা হয় ‘রীহ’ [الريح]। এর বহুবচন হলো ‘রিয়াহ’ [الرياح]। পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে উভয় শব্দই ব্যবহৃত হয়েছে। বাতাসের আরবী শব্দটি কোথাও একবচন ও কোথাও বহুবচন ব্যবহার হওয়ার বিষয়ে কুরআনবিদগণ নানামুখী আলোচনা করেছেন। তারা দেখিয়েছেন, এই দ্বিমুখী ব্যবহার কাকতালীয় কোন বিষয় নয়; বরং এর পেছনে লুকিয়ে আছে বেশ কিছু হেকমত ও ইশারা। বাস্তব জগতে বাতাসের দুইটি রূপ আমরা দেখতে পাই। আল্লাহর নিয়ামত হিসেবে এটি মানুষের সেবা করে। অক্সিজেনের প্রয়োজন পূরণ করে। সমুদ্রে নৌযান চলাচলে সহায়তা করে। সমুদ্রের বুক থেকে মেঘমালাকে উড়িয়ে নিয়ে এসে জনপদে বৃষ্টিপাতের ব্যবস্থা করে। এতে করে বাগানগুলো হয়ে ওঠে ফুলেফলে সুশোভিত। খেতখামার হয়ে যায় সতেজ-শ্যামল আর শস্যাদিতে ভরপুর। বিরান মরুতে ফিরে আসে নতুন প্রাণের স্পন্দন। বালুকণার বুক ফেড়ে জেগে ওঠে সবুজের সমারোহ। আবার এই বাতাসই যখন আযাব হিসেবে আসে, তখন রূপ পাল্টে বিক্ষুব্ধ ঝড়-ঝঞ্ঝা ও টর্নেডো-সাইক্লোনে পরণত হয়ে জনপদের পর জনপদ মিসমার করে দেয়। চালাশুদ্ধ আস্ত ঘর তুলে নিয়ে দূরে কোথাও ফেলে আসে। হৃষ্টপুষ্ট মাঠে ফসলহানি ঘটায়। বাগানের পর বাগানকে বিধ্বস্ত করে দেয়। মানুষের জান ও মাল হয় ক্ষতিগ্রস্ত। পবিত্র কুরআনের যেসব জায়গায় আল্লাহ তাআলা বাতাসের জন্য এককভাবে ‘রীহ’ তথা একবচনের শব্দ ব্যবহার করেছেন, লক্ষ্য করলে দেখা যায় সেটা অকল্যাণ ও আযাবের জায়গা। আর যেসব জায়গায় এককভাবে বহুবচনের শব্দ ‘রিয়াহ’ ব্যবহার করেছেন, সেটা নিয়ামত, রহমত ও কল্যাণের জায়গা। বিখ্যাত মুফাসসির আল্লামা কুরতুবী রাহ. বলেছেন, ‘যেখানেই রহমত উদ্দেশ্য সেখানে বহুবচন (রিয়াহ) ব্যবহার করা হয়েছে। আর যেখানে আযাব উদ্দেশ্য সেখানে একবচন (রীহ) ব্যবহার করা হয়েছে।’ আল্লামা রাগিব ইস্ফাহানি রাহ.-ও অনুরূপ মত প্রদান করেছেন। (আল-জামি লি আহকামিল কুরআন, কুরতুবী : ৭/৩৩; মুফরাদাতু আলফাজিল কুরআন, রাগিব ইস্ফাহানী : ২০৪)

এর পেছনে হেকমত কী? কোন সে ইশারা লুকিয়ে আছে এই ব্যতিক্রমী ব্যবহারের আড়ালে? এবার আমরা সেই বিষয়টিই জানব। রহমতের বাতাসের বৈশিষ্ট্য হলো এটি হেলেদুলে প্রবাহিত হয়। ধানের মাঠ যখন সোনালী শীষে ছেয়ে যায়, পুরো মাঠ হয়ে পড়ে স্বর্ণালী, তখন মৃদুমন্দ বাতাসে ধানের শীষগুলোর দোলনায় দোলার মত ঢেউ খেলা দেখে এই হেলেদুলে প্রবহমান বাতাসের একটা ধারণা নেওয়া যেতে পারে। খুব শান্ত-সমাহিত আর ভদ্রতাপূর্ণ সন্তর্পণ তার চলাচল। বাগানের গাছগুলোর সবুজ পাতা তিরতির করে নড়তে থাকে। আমরা ‘গা ছাড়া ভাব’ বলতে যেই ব্যাপারটা বুঝে থাকি সেটা রহমতের বাতাসের মধ্যে পুরোপুরি বিদ্যমান থাকে। কখনও এদিক থেকে, কখনও ওদিক থেকে বিক্ষিপ্তাকারে ছড়িয়েছিটিয়ে বাতাসগুলো বইতে থাকে আপন মনে। যার কারণে কেমন যেন সেখানে অনেকগুলো বাতাস থাকে। আল্লামা তুসী রাহ. বলেন, ‘রহমতের ক্ষেত্রে ‘রিয়াহ’ (বহুবচন) আসার কারণ হলো, এটি উত্তুরে, পুবালি ও দক্ষিণা হাওয়াকে অন্তর্ভুক্ত করে। পক্ষান্তরে আযাবের ক্ষেত্রে ‘রীহ’ (একবচন) আসার কারণ হলো, এটি কেবল পশ্চিমা হাওয়াকে অন্তর্ভুক্ত করে।’ (আত-তিবয়ান ফী তাফসীরিল কুরআন, তূসী : ১০/৪৯৬)

কুরআনুল কারীমের দুই একটি আয়াত দেখে নেওয়া যাক, যেখানে এককভাবে ‘রিয়াহ’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। সূরা আল-ফুরকানের ৪৮ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন,

وَهُوَ الَّذِىٓ أَرْسَلَ الرِّيٰحَ بُشْرًۢا بَيْنَ يَدَىْ رَحْمَتِهِۦ ۚ وَأَنزَلْنَا مِنَ السَّمَآءِ مَآءً طَهُورًا

“তিনিই তাঁর রহমতের (বৃষ্টির) পূর্বাভাসস্বরূপ বাতাস পাঠান। আর আসমান থেকে আমি বিশুদ্ধ পানি বর্ষণ করি।” (আল-ফুরকান : 48)

সূরা রূমের ৪৬ নং আয়াতে বলা হয়েছে, وَمِنْ ءَايٰتِهِۦٓ أَن يُرْسِلَ الرِّيَاحَ مُبَشِّرٰتٍ وَلِيُذِيقَكُم مِّن رَّحْمَتِهِۦ وَلِتَجْرِىَ الْفُلْكُ بِأَمْرِهِۦ وَلِتَبْتَغُوا مِن فَضْلِهِۦ وَلَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ

“তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে আরেকটি এই যে, তিনি সুসংবাদবাহী বাতাস পাঠান; যাতে তোমাদেরকে তাঁর দয়া আস্বাদন করাতে পারেন, যাতে তাঁর আদেশে জাহাজ চলে এবং যাতে তোমরা তাঁর অনুগ্রহ সন্ধান করো ও (তাঁর প্রতি) কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।” (আর-রূম : ৪৬)

এই একই সূরার ৪৮ নং আয়াতে এসেছে,

اللَّهُ الَّذِى يُرْسِلُ الرِّيٰحَ فَتُثِيرُ سَحَابًا فَيَبْسُطُهُۥ فِى السَّمَآءِ كَيْفَ يَشَآءُ وَيَجْعَلُهُۥ كِسَفًا فَتَرَى الْوَدْقَ يَخْرُجُ مِنْ خِلٰلِهِۦ ۖ فَإِذَآ أَصَابَ بِهِۦ مَن يَشَآءُ مِنْ عِبَادِهِۦٓ إِذَا هُمْ يَسْتَبْشِرُونَ

“আল্লাহ সেই মহান সত্তা যিনি বাতাস পাঠান। অতঃপর এই বাতাস মেঘ উঠিয়ে আনে। তারপর তিনি যেভাবে ইচ্ছা এই মেঘ আকাশে ছড়িয়ে দেন এবং তা খণ্ড খণ্ড করেন। এরপর তুমি দেখতে পাও, এই মেঘের মধ্য থেকে বৃষ্টি নির্গত হয়। তিনি যখন তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা এই বৃষ্টি পৌঁছে দেন তখনি তারা আনন্দিত হয়।” (আর-রূম : ৪৮)

এই তিনটি আয়াতের প্রতিটিতেই বাতাসকে রহমতের নিদর্শন হিসেবে ব্যক্ত করা হয়েছে এবং সবখানেই একবচন পরিহার করে বহুবচনকে ব্যবহার করা হয়েছে। পেছনে এর রহস্য আমরা বলে এসেছি। আরো যেসব আয়াতে এর দৃষ্টান্ত খুঁজে পাবেন তা হলো, ১. সূরা বাকারা : ১৬৪ ২. সূরা আরাফ : ৫৭ ৩. সূরা হিজর : ২২ ৪. সূরা কাহাফ : ৪৫ ৫. সূরা নামল : ৬৩ ৬. সূরা ফাতির : ০৯ ৭. সূরা জাসিয়া : ০৫ আযাবের জন্য যে বাতাস আল্লাহ প্রেরণ করেন তা রহমতের বাতাসের মতো এতটা বিক্ষিপ্ত ও হালকা চলনের হয় না। বরং সেটি হয় বজ্রকঠিন ও একে অন্যের সাথে লাগোয়া। অনেক বেশি জমাটবাঁধা, ঘনীভূত ও সংহত। ফলে কেমন যেন আযাবের বাতাস একটা বাতাস। এটি নানামুখী বাতাসের মিলনমেলা নয়। তাই এর জন্য এক বচনের শব্দই অধিকতর যথাযথ ও উপযুক্ত। পবিত্র কুরআনুল কারীমে তাই এককভাবে যেখানেই বাতাসকে আযাব বা মন্দ ক্ষেত্রে উল্লেখ করা হয়েছে সেখানেই শব্দটি ‘রীহ’ তথা একবচনে এসেছে।

এমন কয়েকটি জায়গা দেখে নেওয়া যেতে পারে। সূরা আল-ইমরানের ১১৭ নং আয়াতে বলা হয়েছে,

مَثَلُ مَا يُنفِقُونَ فِى هٰذِهِ الْحَيٰوةِ الدُّنْيَا كَمَثَلِ رِيحٍ فِيهَا صِرٌّ أَصَابَتْ حَرْثَ قَوْمٍ ظَلَمُوٓا أَنفُسَهُمْ فَأَهْلَكَتْهُ ۚ وَمَا ظَلَمَهُمُ اللَّهُ وَلٰكِنْ أَنفُسَهُمْ يَظْلِمُونَ

“এই পার্থিব জীবনে তারা যা ব্যয় করে তার উদাহরণ হলো এমন একটি বাতাস, যার মধ্যে রয়েছে কনকনে ঠাণ্ডা। সেটি এমন একদল লোকের শস্যক্ষেতে আঘাত হেনে তা ধ্বংস করে দিয়েছে, যারা নিজেদের প্রতি জুলুম করেছে। আল্লাহ তাদের প্রতি জুলুম করেননি, বরং তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতি জুলুম করছে।” (আল-ইমরান : ১১৭)

সূরা আল-আহযাবে আল্লাহ তাআলা বলেন,

يٰٓأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا اذْكُرُوا نِعْمَةَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ جَآءَتْكُمْ جُنُودٌ فَأَرْسَلْنَا عَلَيْهِمْ رِيحًا وَجُنُودًا لَّمْ تَرَوْهَا ۚ وَكَانَ اللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرًا

“হে মুমিনগণ, তোমরা তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহের কথা স্মরণ করো। যখন সৈন্যবাহিনী তোমাদের বিরুদ্ধে নিকটবর্তী হয়েছিল, অতঃপর আমি তাদের বিরুদ্ধে পাঠিয়েছিলাম বাতাস এবং এক (ফেরেশতারূপী) সৈন্যবাহিনী যা তোমরা দেখনি। তোমরা যা করো আল্লাহ তা প্রত্যক্ষকারী।” (আল-আহযাব : ০৯)

এই আয়াতে বাতাস পাঠানোর কথা বলে খন্দকের যুদ্ধের ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। কাফেররা যখন চারদিকে মুসলিমদের ঘেরাও করে রেখেছিল তখন এক পর্যায়ে আল্লাহ তাআলা প্রবল বাতাস পাঠিয়ে তাদের ছাউনিগুলো লণ্ডভণ্ড করে দেন এবং এরপরই তারা মদীনা থেকে অবরোধ উঠিয়ে লেজ গুটিয়ে পলায়ন করে। এই বাতাস ছিল মক্কার কাফেরদের উপর প্রেরণকৃত আল্লাহর আযাব।

সূরা আহকাফের ২৪ নং আয়াতে আল্লাহ তাআলা নাফরমান আদ সম্প্রদায়কে শাস্তি দেওয়ার কাহিনী বিধৃত করে বলেন,

فَلَمَّا رَأَوْهُ عَارِضًا مُّسْتَقْبِلَ أَوْدِيَتِهِمْ قَالُوا هٰذَا عَارِضٌ مُّمْطِرُنَا ۚ بَلْ هُوَ مَا اسْتَعْجَلْتُم بِهِۦ ۖ رِيحٌ فِيهَا عَذَابٌ أَلِيمٌ

“অতঃপর তারা যখন তাদের উপত্যকার দিকে মেঘ আসতে দেখল তখন তারা বলল- ‘এ তো মেঘ, আমাদেরকে বৃষ্টি দিবে।’ না, তা হল সেই জিনিস তোমরা যা তাড়াতাড়ি নিয়ে আসতে চেয়েছিলে। এ হল এমন বাতাস, যাতে আছে ভয়াবহ আযাব।” (আল-আহকাফ : ২৪)

এই বিষয়ে আরো যেসব আয়াত দেখা যেতে পারে তা হলো, ১. ইবরাহীম : ১৮ ২. ইসরা : ৬৯ ৩. হাজ্জ : ৩১ ৪. রূম : ৫১ ৫. শুরা : ৩৩ আপনি হয়ত লক্ষ্য করেছেন, একবচন ও বহুবচনের উল্লেখের বিষয়টা আমরা শর্তহীনভাবে উল্লেখ করিনি। বরং ‘এককভাবে’ হতে হবে বলেছি। অর্থাৎ এর সাথে অন্যকোন গুণবাচক শব্দ থাকবে না। যদি থাকে তাহলে সেক্ষেত্রে কোথাও কোথাও এই নিয়মের ব্যতিক্রম হতে পারে। এবং এর পেছনেও যথেষ্ট কারণ রয়েছে। সূরা ইউনুসে আল্লাহ তাআলা ‘রীহ’ তথা এক বচনের শব্দটি কল্যাণের ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছেন। কিন্তু তা এককভাবে নয়; বরং এর সাথে আরেকটি গুণবাচন শব্দ জুড়ে দিয়েছেন।

আয়াতটি লক্ষ্য করুন- هُوَ الَّذِى يُسَيِّرُكُمْ فِى الْبَرِّ وَالْبَحْرِ ۖ حَتّٰىٓ إِذَا كُنتُمْ فِى الْفُلْكِ وَجَرَيْنَ بِهِم بِرِيحٍ طَيِّبَةٍ وَفَرِحُوا بِهَا جَآءَتْهَا رِيحٌ عَاصِفٌ وَجَآءَهُمُ الْمَوْجُ مِن كُلِّ مَكَانٍ وَظَنُّوٓا أَنَّهُمْ أُحِيطَ بِهِمْ ۙ دَعَوُا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ لَئِنْ أَنجَيْتَنَا مِنْ هٰذِهِۦ لَنَكُونَنَّ مِنَ الشّٰكِرِينَ

“তিনি সেই সত্তা, যিনি তোমাদেরকে জলে ও স্থলে ভ্রমণ করান। এমনকি যখন তোমরা নৌকায় আরোহণ করে অনুকূল হাওয়ার তালে আমোদ-আহলাদে সফর করতে থাকো, তখন ঝড়ো হাওয়া আঘাত হানে আর চারদিক থেকে তরঙ্গ ধেয়ে আসে, আর তারা মনে করে যে, তারা তরঙ্গমালায় পরিবেষ্টিত হয়ে পড়েছে। তখন তারা বিশুদ্ধ আনুগত্যে আল্লাহকে ডেকে বলে, তুমি যদি এত্থেকে আমাদেরকে পরিত্রাণ দাও তাহলে অবশ্য অবশ্যই আমরা শুকরগুজার বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব।” (সূরা ইউনুস : ২২)

এই আয়াতে ‘রীহ’ শব্দটি দুইবার এসেছে। প্রথমটা কল্যাণকর বাতাসের জন্য, যা জলযানে চড়া মানুষকে নিয়ে সমুদ্রপথে চলতে থাকে। এটি নিঃন্দেহে কল্যাণকর বাতাস। কারণ এর মাধ্যমেই মানুষ দূর-দূরান্তে ও দেশ-বিদেশে সফর করে এবং খুব সহজে পণ্যসামগ্রী আনা-নেওয়া করে। কিন্তু সামুদ্রিক বাতাস হতে হয় একমূখী। তাহলে জলযান সুন্দরভাবে সামনের দিকে অগ্রসর হতে পারে। সেই বাতাস যদি হয় নানামুখী, তাহলে জলযানের গতি বাধাগ্রস্ত হয়। বহুবচনের শব্দ ব্যবহার করলে এক্ষেত্রে তাই বরং অকল্যাণকর হয়ে যাবারই কথা। তাই আল্লাহ তাআলা একবচনের শব্দই এনেছেন। কিন্তু যেহেতু সাধারণ নিয়ম হলো, একবচনের শব্দকে অকল্যাণকর ও আযাবের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয় তাই এখানে ‘রীহ’ এর পরে একটি গুণবাচক শব্দ জুড়ে দিয়ে সেই সংশয়টা দূর করে দেওয়া হলো। বলা হলো, এটি রীহ তাইয়িব—কল্যাণকর বাতাস, ভাল বাতাস, উত্তম বাতাস। এ-তো গেল বাতাসের প্রত্যক্ষ্য শব্দের সমাচার। এবার একটু বাতাসের পরোক্ষ শব্দের সমাচার তুলে ধরা যাক। পবিত্র কুরআনুল কারীমে বাতাসের জন্য বেশকিছু পরোক্ষ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। বিশিষ্ট সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনু উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু এই প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছেন, ‘বাতাসের জন্য ব্যবহৃত শব্দ আটটি। তারমধ্যে চারটি হলো রহমতের, বাকি চারটি আযাবের। রহমতের বাতাসগুলোর নাম হলো নাশিরাত, মুবাশশিরাত, মুরসালাত এবং যারিয়াত। আর শাস্তির বাতাসগুলোর নাম হলো জলভাগে আকীম ও সরসর এবং স্থলভাগে আসিফ ও ক্বসিফ। যখন আল্লাহ তাআলা রহমতের বাতাস প্রবাহিত করার ইচ্ছা করেন তখন তিনি একে মোলায়েম, তাঁর রহমতের সুসংবাদদাতা এবং মেঘবহনকারীর আকার দেন। আর যখন এর মাধ্যমে শাস্তি দেওয়ার ইচ্ছা করে তখন একে নিস্ফল ও কঠিন যন্ত্রণাদায়ক বানিয়ে দেন।’ (তাফসীরুল কুরআন, সামআনী : ৪/২১৮; তাফসীরুল কুরআন, আল-ইয ইবনু আব্দিস সালাম : ২/৫৩২)

বাতাসের জন্য ব্যবহৃত এই পরোক্ষ শব্দগুলো আমরা কুরআন থেকে দেখে নিতে পারি।

১. নাশিরাত [الناشرات] আল্লাহ তাআলা বলেন, و الناشِراتِ نَشراً‌ “মেঘবিস্তৃতকারী বাতাসের শপথ।” (সূরা মুরসালাত : ০৩) এই নাশিরাত শব্দের অর্থ নিয়ে মুফাসসিরদের মধ্যে দ্বিমত আছে। এক পক্ষের মত হলো এর দ্বারা বৃষ্টি আনয়নকারী মেঘমালাকে তাড়িয়ে আনা বাতাস উদ্দেশ্য।

২. মুবাশশিরাত [المبشرات] আল্লাহ তাআলা বলেন, وَمِنْ ءَايَاتِهِ أَنْ يُرسِلَ الرِياحَ مُبَشِرَاتٍ وَ لِيُذِيقَكُم مِنْ رَحْمَتِهِ وَلِتَجْرِيَ الفُلْكُ بِأَمْرِه وَلِتَبْتَغُوا مِنْ فَضْلِهِ وَلَعَلكُمْ تَشْكُرُنَ

“তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে আরেকটি এই যে, তিনি সুসংবাদবাহী বাতাস পাঠান; যাতে তোমাদেরকে তাঁর দয়া আস্বাদন করাতে পারেন, যাতে তাঁর আদেশে জাহাজ চলে এবং যাতে তোমরা তাঁর অনুগ্রহ সন্ধান করো ও (তাঁর প্রতি) কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।” (আর-রূম : ৪৬)

৩. মুরসালাত [المرسلات] আল্লাহ তাআলা বলেন, والمُرسَلاتِ عُرفاً “কল্যাণের জন্যে একের পর এক প্রেরিত বায়ুর শপথ” (সূরা আল-মুরসালাত : ০১) উক্ত আয়াতে উল্লেখিত মুরসালাত শব্দের ব্যাখ্যা নিয়ে মুফাসসিরদের দ্বিমত আছে। তবে সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ ও আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস এবং বিখ্যাত তাবেয়ী মুজাহিদ ও কাতাদা থেকে বর্ণিত আছে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো বাতাস। (আত-তিবইয়ান ফী তাফসীরিল কুরআন : ১০/২২৩)

৪. যারিয়াত [الذاريات] আল্লাহ তাআলা বলেন, و الذَّارِياتِ ذَرواً “শপথ সেই বাতাসের, যা ধুলোবালি উড়ায়।” (সূরা আযযারিয়াত : ০১) যারিয়াত এমন বাতাসকে বলে, যা সাধারণ গতিতে প্রবাহিত হয় এবং নিজের সাথে ধুলোবালিকে উড়িয়ে নিয়ে চলে। এটি ক্ষতিকর নয়।

৫. আকীম [العقيم] আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَفِي عَادٍ إِذْ أَرْسَلْنَا عَلَيْهِمُ الرِّيحَ الْعَقِيمَ *مَا تَذَرُ مِن شَيْءٍ أَتَتْ عَلَيْهِ إِلَّا جَعَلَتْهُ كَالرَّمِيمِ

“এবং আদ-এর ঘটনাতেও নিদর্শন রয়েছে। যখন আমি তাদের ওপর প্রেরণ করেছিলাম বন্ধ্যা-বাতাস। এই বাতাস যার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছিল, তাকেই চুর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছিল।” (সূরা আযযারিয়াত : ৪১-৪২) আকীম শব্দটি এসেছে ‘উকম’ থেকে। যার অর্থ হলো বন্ধ্যাত্ব ও অনুর্বরতা। এই বাতাস মেঘকে প্রবাহিত করে এনে বৃষ্টিপাতের ব্যবস্থা করে না। ফলে গাছপালা ও তৃণলতা জন্মদানেরর ক্ষেত্রে এর কোন ভূমিকা নেই। তাই একে আকীম বা বন্ধ্যা বলা হয়।

৬. সরসর [الصرصر] আল্লাহ তাআলা বলেন,

فَأَرْسَلْنَا عَلَیْهِمْ رِيحًا صَرْصَرًا فِي أَيَّامٍ نَحِسَاتٍ لِنُذِيقَهُمْ عَذَابَ الْخِزْيِ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَلَعَذَابُ الْآخِرَةِ أَخْزَىٰ وَهُمْ لَا يُنْصَرُونَ

“অতঃপর আমি অশুভ দিনগুলোতে তাদেরকে পার্থিব জীবনে লাঞ্ছনার আযাব আস্বাদন করানোর জন্যে তাদের উপর প্রেরণ করলাম ঝঞ্ঝাবায়ু। পরকালের আযাব তো আরও লাঞ্ছনাকর। আর তারা সাহায্যপ্রাপ্ত হবে না।” সরসর মানে হলো এমন বাতাস, যা প্রচণ্ড শব্দে প্রবল বেগে প্রবাহিত হয় এবং গাছপালা মূলকাণ্ড থেকে উপড়ে ফেলে। এই শব্দটির উৎপত্তি মূলত ‘সররাহ’ [صرة] শব্দ থেকে। যার অর্থ হলো প্রচণ্ড চিৎকার। যেহেতু প্রবলবেগে বাতাস ছুটতে থাকলে চিৎকার করার মত শব্দ হতে থাকে তাই একে এমন নাম প্রদান করা হয়েছ।

৭. আসিফ [العاصف] আল্লাহ তাআলা বলেন, فالعاصفاتِ عَصفاً আসিফ বলা হয় এমন বাতাসকে, যা প্রবল বেগে প্রবাহিত হয়। যেমন এর দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় অন্য একটি আয়াতে, যাতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

مَثَلُ الّذِينَ كَفَرُوا بِرَبِّهِمْ أعْمَالُهُمْ كَرَمَادٍ اشْتَدَّتْ بِهِ الرِّيحُ فِي يَوْمٍ عَاصِفٍ لا يَقْدِرُونَ مِمَّا كَسَبُواْ عَلَى شَيْءٍ ذلِكَ هُوَ الضَّلَالُ الْبَعِيدُ

“যারা স্বীয় পালনকর্তার সত্তার অবিশ্বাসী তাদের অবস্থা এই যে, তাদের কর্মসমূহ ছাইভস্মের মত যার উপর দিয়ে প্রবল বাতাস বয়ে যায় ধূলিঝড়ের দিন। তাদের উপার্জনের কোন অংশই তাদের করতলগত হবে না। এটাই দুরবর্তী পথভ্রষ্টতা।” (সূরা ইবরাহীম : ১৮)

৮. ক্বসিফ [القاصف] আল্লাহ তাআলা বলেন,

أَمْ أَمِنتُمْ أَن يُعِيدَكُمْ فِيهِ تَارَةً أخْرَى فَيُرْسِلَ عَلَيْكُمْ قَاصِفا مِّنَ الرِّيحِ فَيُغْرِقَكُم بِمَا كَفَرْتُمْ ثُمَّ لاَ تَجِدُواْ لَكُمْ عَلَيْنَا بِهِ تَبِيعًا

“অথবা তোমরা কি এ বিষয়ে ভয়হীন হয়ে গেছ যে, তিনি তোমাদেরকে আরেকবার সমুদ্রে নিয়ে যাবেন না, অতঃপর তোমাদের ওপর প্রচণ্ড ঝড়ো বাতাস প্রেরণ করবেন না এবং অকৃতজ্ঞতার শাস্তিস্বরূপ তোমাদেরকে ডুবিয়ে দিবেন না? তখন তোমরা আমার বিরুদ্ধে এ বিষয়ে সাহায্যকারী কাউকে পাবে না।” (সূরা বনী ইসরাইল : ৬৯)

এগুলোর বাইরেও কুরআনে বাতাসের জন্য আরও কিছু পরোক্ষ শব্দ আছে। যেমন হাসিব, ই’সার, সুমুম, তুফান ইত্যাদি। আবার কিছু আছে যেগুলোর অর্থ নির্ণয়ে মুফাসসিরদের মধ্যে দ্বিমত আছে। কেউ বাতাসের অর্থে বললেও অন্যরা এর বিপরীত অর্থ বলেছেন। বাতাস যেহেতু দুই ধরণেরই হতে পারে, তাই আমাদের প্রিয়নবী মহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাতাসের বিষয়ে আমাদেরকে যে নির্দেশনা দিয়েছেন তা হলো, ‘বাতাস আল্লাহর অন্যতম রহমত। (তবে) এটি অনেক সময় রহমত নিয়ে আসে আবার অনেক সময় আযাব। সুতরাং বাতাস প্রবাহিত হতে দেখলে তোমরা তাকে গালি দিও না। বরং আল্লাহর কাছে এর কল্যাণ চাও এবং অকল্যাণ থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করো।’ (আস-সুনান, আবূ দাউদ : ৫০৯৭)

সমাপ্ত

লেখক পরিচিত:
আবদুল্লাহ আল মাসউদ এই পৃথিবীতে চোখ মেলেছেন ১৯৯২ সাল ১৬ জানুয়ারি। জন্মস্থান নোয়াখালি জেলার সোনাইমুড়ি উপজেলার আমিশাপাড়া ইউনিয়নের কেশারখিল গ্রামে। মক্তব গমনের মধ্য দিয়ে তার পড়ালেখার হাতেখড়ি। এরপর ক’বছর নিজ গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা। তারপর ঢাকার টিকাটুলি জামে মসজিদে অবস্থিত ‘তাহফীজুল কুরআন মাদরাসায়’ ভর্তি হন এবং সেখান থেকেই হিফজ সমাপন করেন। এরপর ভর্তি হন ঢাকার বিখ্যাত ধর্মীয় বিদ্যাপীঠ যাত্রাবাড়ি বড় মাদরাসায়। সেখান থেকেই অত্যন্ত কৃতিত্বের সঙ্গে তাকমীলে হাদীস সমাপন করেন এবং মাদরাসাসমূহের সম্মিলিত শিক্ষাবোর্ড ‘আলহাইআতুল উলইয়া’ এর কেন্দ্রিয় পরীক্ষায় মেধাতালিকায় ১২তম স্থান অর্জন করেন। বর্তমানে উক্ত প্রতিষ্ঠানেই তিনি উচ্চতর ইসলামী আইন ও গবেষণা বিভাগে অধ্যয়নরত আছেন। লেখালেখির সাথে যুক্ত আছেন অনেকদিন ধরে। অনুবাদের পাশাপাশি প্রবন্ধ ও গবেষণাধর্মী মৌলিক রচনাতেও তিনি মনোযোগী। মৌলিক, অনূদিত ও সম্পাদিত─ সব মিলিয়ে তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা বিশেরও অধিক। লেখালেখির মাধ্যমে ইসলাম ও মুসলিমদের খেদমতে তিনি বদ্ধপরিকর।

এই ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে তাহলে দয়া করে ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ একে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন