Quran Translation to Bangla

চার্চের বিকৃতির এক ঐতিহাসিক আলেখ্য

মুহাম্মাদ আতাউর- রহীম

অনুবাদ: হোসেন মাহমুদ

সম্পাদনা: আবদুল্লাহ শহীদ আবদুর রহমান

বার্নাবাসের গসপেল যীশু খৃষ্টের একজন ঘনিষ্ঠ শিষ্যের লেখা এবং কাল পরিক্রমায় রক্ষাপ্রাপ্ত একমাত্র গসপেল। এর রচয়িতা বার্নাবাস ছিলেন যীশুর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহচর এবং যীশুর তিন বছর ব্যাপী ধর্ম প্রচারকালে তিনি অধিকাংশ সময়ই তার বিশ্বস্ত সহচর হিসেবে ছিলেন। এর ফলে তিনি যীশুর ধর্মপ্রচার স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করে সরাসরি অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান লাভ করেন যা চারটি স্বীকৃত গসপেলের রচয়িতাদের কারও ছিল না। যীশু এবং তার শিক্ষা ও নির্দেশ সম্পর্কে তিনি কখন এ গসপেল রচনা করেন তা জানা যায় না। সুতরাং যখন যে ঘটনা বা কথোপকথন সংঘটিত হয়েছিল তখনি অথবা যীশুর ঊর্ধ্বারোহণের পরপরই তার কিছু শিক্ষা পরিবর্তিত বা হারিয়ে যেতে পারে ভেবে তিনি এ গসপেল রচনা করেন, তা সুস্পষ্ট নয়। সম্ভবত জন মার্কের (John Mark) সাথে তিনি সাইপ্রাস প্রত্যাবর্তন করার পূর্বে কিছুই রচনা করেন নি। যীশুর ঊর্ধ্বারোহণের কিছু দিন পর টারসসের পল (Paul of Tarsus) এর সাথে সম্পর্কচ্ছেদের পর দু’জন সাইপ্রাস যাত্রা করেছিলেন। উক্ত ব্যক্তি বার্নাবাসের সাথে পুনরায় ভ্রমণে অস্বীকৃতি জানালেও মার্ক তার সহযাত্রী হন। তবে বার্নাবাসের গসপেল কখন লেখা হয়েছিল তা ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। এ গসপেলটিও অন্য চারটি গসপেলের ন্যায় বিভিন্ন ভাষায় অনুদিত ও পরিশোধিত হয়েছে। তবে এ গ্রন্থের বিশেষত্ব হলো যে, এটি যীশুর জীবন ও কর্ম বিষয়ে একজন প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ।

৩২৫ সন পর্যন্ত আলেকজান্দ্রিয়ার চার্চগুলোতে বার্নাবাসের গসপেল একটি গির্জা অনুমোদিত গসপেল (Canonical Gospel) হিসেবেই স্বীকৃত ছিল। এটা সুবিদিত যে, যীশুর জন্মলাভের পর প্রথম ও দ্বিতীয় শতাব্দীতে তা প্রচারিত হতে শুরু করে। ইরানিয়াসের (Iraneus, ১৩০-২০০ সন) লেখার কারণেই এটা ঘটেছিল। কারণ তিনি একত্ববাদের সমর্থনে লেখালেখি করতেন। তিনি পলের (পৌলের) বিরোধী ছিলেন এবং যীশুর প্রকৃত শিক্ষার মধ্যে পৌত্তলিক, রোমান ধর্ম ও প্লাটোনিক দর্শনের মিশ্রণ ঘটানোর দায়ে পলকে অভিযুক্ত করেছিলেন। তিনি তার মতের সমর্থনে বার্নাবাসের বাইবেল থেকে ব্যাপকভাবে উদ্ধৃতি দিতেন। ৩২৫ সনে নিসিয়ার (Nicea) বিখ্যাত কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। এতে ত্রিত্ববাদকে পলীয় চার্চের আনুষ্ঠানিক ধর্মমত হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এই সিদ্ধান্তের একটি ফল হয় এই যে, সে সময় যে ৩শ’র মতো গসপেল বিদ্যমান ছিল, সেগুলোর মধ্য থেকে চারটিকে চার্চের অনুমোদিত গসপেল হিসেবে মনোনীত করা হয়। অন্যান্য গসপেলেগুলো যার মধ্যে বার্নাবাসের গসপেলও ছিল, সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়। এছাড়া হিব্রু ভাষায় লিখিত সকল গসফেলও ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ফরমান জারি করা হয় যে, কারো কাছে অননুমোদিত গসপেল পাওয়া গেলে তাকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করা হবে। এটি ছিল ত্রিত্ববাদের বিরোধী যীশুর মূল শিক্ষা বিলুপ্ত করার প্রথম সুসংগঠিত চেষ্টা। তা সে মানুষই হোক আর গ্রন্থই হোক। তবে বার্নাবাসের গসপলের ক্ষেত্রে এ চেষ্টা সম্পূর্ণ ফলপ্রসূ হয় নি।

আজকের দিনেও এ গ্রন্থের অস্তিত্ব বজায় থাকা থেকেই তার প্রমাণ পাওয়া যায়।

ডামাসাস (Damasus, ৩০৪-৩৮৪ সন) ৩৬৬ সনে পোপ হন। তিনি ফরমান জারি করেন যে, বার্নাবাসের গসপেল পাঠ করা উচিৎ নয়। কায়সারিয়ার বিশপ গেলাসাস (Gelasus)- এ ফরমান সমর্থন করেন। গেলাসাস ৩৯৫ সনে পরলোক গমন করেন। তিনি ‘এপোক্রাইফাল’ (apocryphal) গ্রন্থগুলোর যে তালিকা তৈরি করেন তার মধ্যে এ গসপেলটিও ছিল। এপোক্রাইফা অর্থ “জনসাধারণের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখা”। ফলে এ গসপেলটি তখন সহজলভ্য ছিল না। তবে চার্চ নেতারা তাদের কথায় গসপেলের প্রসঙ্গ উল্লেখ করতেন। বাস্তবে জানা যায় যে, পোপ ৩৮৩ সনে বার্নাবাসের বাইবেলের একটি কপি সংগ্রহ করেছিলেন ও তা তার ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারে রেখেছিলেন।

এ গসপেল সংক্রান্ত বিষয়ে আরো বেশ কিছু ফরমান জারি করা হয়। ৩৮২ সনে পাশ্চাত্যের চার্চগুলো এবং ৪৫৬ সনে পোপ ইনোসেন্ট কর্তৃক (Innocent) এ গসপেল নিষিদ্ধ করে ফরমান জারি করা হয়। ৪৯৬ সনে গ্লাসিয়ান ফরমানে নিষিদ্ধ গ্রন্থের তালিকায় ‘Evangelium Barnabe’ ও অন্তর্ভুক্ত হয়। হরমিসডাস (Hormisdas) এর ফরমানেও (যিনি ৫১৪ সন থেকে ৫২৩ সন পর্যন্ত পোপ ছিলেন) এ নিষেধাজ্ঞা পুনর্ব্যক্ত করা হয়। বি দ্য মন্টফাকো (B.de. Montfaucon, ১৬৫৫-১৭৪১) কর্তৃক প্রণীত চ্যান্সেলর সেগাইয়ার (Chancellor Seguier, ১৫৫৮-১৬৭২)-এর গ্রন্থাগারের গ্রীক পাণ্ডুলিপির ক্যাটালগে এ সকল ফরমানের উল্লেখ করা হয়েছে।

নাইসেফোরাসের (Nicephorus) Stichometry তে ও নিম্নরূপে বার্নাবাসের গসপেলের উল্লেখ করা হয়েছে:

ক্রমিক নং ৩, বার্নাবাসের পত্রাবলী (Epistle of Bernabas) … ১,৩০০ পঙক্তি।

আবার Sixty Books-এর তালিকাতে বার্নাবাসের গসপেলের নিম্নরূপ উল্লেখ রয়েছে:

      ক্রমিক নং ১৭। প্রেরিত দূতদের ভ্রমণ ও শিক্ষা।

      ক্রমিক নং ১৮। বার্নাবাসের পত্রাবলি।

      ক্রমিক নং ২৪। বার্নাবাসের গসপেল।

এই বিখ্যাত তালিকা Index নামে পরিচিত। খৃষ্টানরা পরকালের চিরস্থায়ী শাস্তির ভয়ে এ গ্রন্থগুলোর কোনোটিই পাঠ করত না বলে ধারণা করা হয়।

ফ্রান্সের রাজার গ্রন্থাগারের পাণ্ডুলিপি সমূহের ক্যাটালগ প্রস্তুতকারী কোটেলেরিয়াস (Cotelerius) ১৭৮৯ সনে প্রণীত Index of Scriptures-এ বার্নাবাসের গসপেলকে তালিকাভূক্ত করেন। অক্সফোর্ড বোদলেইয়ান লাইব্রেরির বারো সিয়ান (Baroccian) সংগ্রহের ২০৬তম পাণ্ডুলিপিতে এই গসপেলের বর্ণনা রয়েছে। এথেন্সের একটি যাদুঘরে বার্নাবাসের গসপেলের একটি খন্ডিত কপি রয়েছে। গ্রীক ভাষায় অনুদিত এ কপিটি পুড়িয়ে ফেলা একটি গসপেলের রক্ষাপ্রাপ্ত অংশ।

সম্রাট জেনোর (Zeno) শাসনামলের চতুর্থ বছরে ৪৭৮ সনে বার্নাবাসের দেহাবশেষ আবিষ্কৃত হয় এবং তার নিজের হাতে লেখা গসপেলের একটি কপি তার বুকের ওপর রাখা অবস্থায় পাওয়া যায়। ১৬৯৮ সনে অ্যান্টওয়ার্প (Antwarp) থেকে প্রকাশিত (Acta Sanctorum (Boland Junii, Tome II)-এর ৪২২-৪৫০ পৃষ্ঠায় এর উল্লেখ রয়েছে। রোমান ক্যাথলিক চার্চ দাবি করেছিল যে, বার্নাবাসের কবরে প্রাপ্ত গসপেলটি মথির রচিত। কিন্তু এ কপিটি প্রদর্শনের কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় নি। ভ্যাটিকানের “২৫ মাইল লম্বা লাইব্রেরি” অভ্যন্তরেই এর বিষয়বস্তু অজ্ঞাত রয়ে গেল।

বার্নাবাসের গসপেলের যে পাণ্ডুলিপি থেকে ইংরেজি অনুবাদ করা হয়েছে সেটি আদতে ছিল পোপ সেক্সটাস (Sextus) ১৫৮৯-৯০) এর কাছে। ফ্রা মারিনো (Fra Marino) নামে তার এক যাজক বন্ধু ছিলেন। তিনি ইরানিয়াসের লেখা পাঠ করে বার্নাবাসের বাইবেলের ব্যাপারে অত্যন্ত আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ইরানিয়াস তার লেখায় বার্নাবাসের বাইবেল ব্যাপকভাবে উদ্ধৃত করতেন। একদিন মারিনো পোপের সাথে সাক্ষাৎ করতে যান। তারা একসাথে দুপুরের আহারের পর কথাবার্তা বলতে থাকেন। এ সময় পোপ ঘুমিয়ে পড়েন। ফাদার মারিনো তখন পোপের ব্যক্তিগত লাইব্রেরির বইগুলো ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকেন। এক পর্যায়ে তিনি বার্নাবাসের গসপেলের একটি ইতালীয় পাণ্ডুলিপি আবিষ্কার করেন। সেটি নিজের আলখেল্লার আস্তিনে লুকিয়ে মারিনো পোপের বাড়ি ত্যাগ করেন এবং ভ্যাটিক্যান থেকে চলে যান। বিভিন্ন লোকের হাত ঘুরে পাণ্ডুলিপিটি অবশেষে Amsterdam এ এমন এক ব্যক্তির হাতে পৌঁছে যিনি ছিলেন ‘স্বনাম খ্যাত ও ক্ষমতাশালী’। তিনি গসপেলটিকে অত্যন্ত মূল্যবান বলে মনে করতেন। তার মৃত্যুর পর গসপেলটি প্রুশিয়ার রাজার এক সভাসদ জে, ই, ক্রেমারের (J.E. Cremer) হাতে পড়ে। ১৭১৩ সনে ক্রেমার বিখ্যাত গ্রন্থপ্রেমী স্যাভয় এর যুবরাজ ইউজিনকে (Prince Eugene of Savoy) পাণ্ডুলিপিটি উপহার দেন। ১৭৩৮ সনে প্রিন্সের সম্পূর্ণ গ্রন্থাগারের সাথে পাণ্ডুলিপিটি ভিয়েনার হফবিবলিওথেক (Hofbibliothek)- এ পৌঁছে এবং এখনও তা সেখানেই আছে।

গোড়ার দিকের চার্চের বিশিষ্ট ঐতিহাসিক টোলান্ড (Toland) এ পাণ্ডুলিপিটি পাঠ করেছিলেন এবং তিনি তার Miscellaneous Works-এ এর উল্লেখ করেছেন। ১৭৪৭ সনে তার মৃত্যুর পর গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। এ গসপেল সম্পর্কে তিনি বলেন, “এটি আগাগোড়া যথার্থই এক ধর্মগ্রন্থ” (This is in Scripture Style to a hair)। তিনি বলেন,

“এ পর্যন্ত প্রাপ্ত গসপেল সমূহে যীশুর কাহিনি বিভিন্নভাবে বর্ণিত হয়েছে। বিশেষ করে এ গসপেলটিতে এই ভিন্নতা আরো বেশি লক্ষণীয়। মূল থেকে নিকটতর ছিল বিধায় কেউ কেউ এর প্রতি অধিকতর অনুকূল ধারণা পোষণ করবে। কারণ কোনো একটি ঘটনা সংঘটিত হওয়ার পরই শুধু সে সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করা যায়। তাই মূল ঘটনা থেকে যতই দূরে সরে যাওয়া হয় ততই তার আবেদন হ্রাস পায়।”

এ পাণ্ডুলিপির ব্যাপারে টোলান্ড (Toland) যে প্রচারণা চালান তাতে সবচেয়ে বড় যে লাভ হয় তা হলো এই যে, এ পাণ্ডুলিপিকে অন্যগুলোর ভাগ্য বরণ করতে হয় নি। উল্লেখ্য, স্প্যানিশ ভাষায় আরেকটি গসপেল এক সময় ছিল। গসপেলের ইতালীয় পাণ্ডুলিপিটি যে সময় হফবিবলিও থেকে দেওয়া হয় সেই একই সময়ে স্প্যানিশ গসপেলটিও ইংল্যান্ডের একটি কলেজ লাইব্রেরিকে উপহার দেওয়া হয়েছিল। রহস্যজনকভাবে সে পাণ্ডুলিপিটি অন্তর্হিত হওয়ার অনেক আগে থেকেই সেটিকে ইংল্যান্ডে খুঁজে পাওয়া যায় নি।

ক্যানন (Canon) ও মিসেস র‌্যাগ (Mrs. Ragg) ইতালীয় পাণ্ডুলিপিটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। ১৯০৭ সালে অক্সফোর্ড ইউনিভারসিটি প্রেস কর্তৃক তা মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয়। রহস্যজনকভাবে এর প্রায় সকল কপিই বাজার থেকে উধাও হয়ে যায়। এর মাত্র ২টি কপি এখন টিকে আছে। একটি রয়েছে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে এবং অন্যটি ওয়াশিংটনের লাইব্রেরি অব কংগ্রেস-এ। লাইব্রেরি অব কংগ্রেসের কপিটির একটি মাইক্রোফিল্ম কপি সংগ্রহ করা হয় এবং তা পাকিস্তানে মুদ্রিত হয়। বার্নাবাসের গসপেলের সংশোধিত সংস্করণ পুনর্মুদ্রণের লক্ষে এই সংস্করণেরই কপি ব্যবহার করা হয়।

এটা এখন সাধারণভাবে স্বীকৃত যে (Synoptic Gospels) নামে পরিচিত প্রথম দিকের ৩টি স্বীকৃত গসপেল পূর্বের অপরিচিত এক গসপেল থেকে নকল করা হয়। এই অপরিচিত গসপেলটিকে এ কালের গবেষকরা ভালো কোনো নাম খুঁজে না পেয়ে ‘Q’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। প্রশ্ন জাগে যে, নিষিদ্ধকৃত বার্নাবাসের গসপেল আসলে এই হারানো গসপেল কিনা। স্মরণযোগ্য যে ৪টি স্বীকৃত গসপেলের মধ্যে প্রথমটি যিনি রচনা করেন সেই জন মার্ক ছিলেন বার্নাবাসের বোনের পুত্র। যীশুর সাথে তার কখনোই সাক্ষাৎ হয় নি। সুতরাং তিনি তার গসপেলে যীশুর জীবন ও শিক্ষা সম্পর্কে যা বর্ণনা করেছেন তা তিনি অবশ্যই অন্য কারো কাছ থেকে শুনেছেন বা জেনেছেন। নিউ টেস্টামেন্টের গ্রন্থসমূহ থেকে জানা যায় যে, পল ও বার্নাবাসের সাথে বহু ধর্মপ্রচার বিষয়ক সফরে তিনি সঙ্গী হয়েছিলেন। পল ও বার্নাবাসের মধ্যে তীব্র বিরোধ সৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত তা অব্যাহত ছিল। বিরোধ দেখা দেয়ার পর বার্নাবাস ও মার্ক এক সাথে সাইপ্রাস গমন করেন। পলও কখনো যীশুকে দেখেন নি। সুতরাং তথ্যের জন্য মার্ক পলের ওপর নির্ভর করেছিলেন, এটা হতেই পারে না। এখানে একমাত্র যুক্তিসংগত সিদ্ধান্ত এটাই যে, মামা বার্নাবাস যীশু সম্পর্কে তাকে যা বলেছিলেন, মার্ক তার গসপেলে সেভাবেই পুনরাবৃত্তি করেছেন। কেউ কেউ বলেন যে, মার্ক পিটার এর দোভাষী হিসেবে কাজ করেছিলেন এবং তিনি পিটারের কাছ থেকে যা শুনেছেন তাই লিখেছেন। এটা সত্য হতে পারে। বার্নাবাস ও পলের সাথে মার্ক যখন সফর করতেন সে সময় অন্যান্য ধর্ম প্রচারকারীদের সাথে মার্কের অবশ্যই সাক্ষাৎ ঘটে থাকবে। যাহোক, গুডস্পীড (Goodspeed) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, পিটারের কাছ থেকে মার্ক যা শুনেছিলেন তা কোনোক্রমেই সম্পূর্ণ বা সমন্বিত ছিল না।

তিনি ছিলেন পিটার এর একজন দোভাষী। যীশু যা বলেছেন বা করেছেন বলে তিনি শুনেছিলেন সেগুলো সঠিকভাবে তিনি লিখেছেন যদিও তা সুশৃঙ্খল হয় নি। কারণ তিনি কখনোই যীশুকে দেখেননি বা তার অনুগমন করেন নি, কিন্তু পরে তিনি, আমি যেমনটি বলেছি, পিটারের সন্নিধানে আসেন। পিটার যীশুর বক্তব্য শ্রোতাদের উপযোগী করে প্রকাশ করতেন, কিন্তু যীশুর জ্ঞানগর্ভ বাণী ও উপদেশের সুসমন্বিত সুসমন্বিত বিবরণ প্রদানের কোনো পরিকল্পনা তার ছিল না।

লূক, যিনি প্রেরিতদের কার্য সম্পর্কে লিখেছেন তিনিও কখনোই যীশুখৃষ্টকে দেখেননি। তিনি ছিলেন পলের ব্যক্তিগত চিকিৎসক। যীশুর সাতে মথিরও কখনো সাক্ষাৎ হয় নি। মথি ছিলেন একজন কর আদায়কারী।

বলা হয়ে থাকে যে, মার্কের গসপেলই ‘Q’ গসপেল। মথি ও লূক তার গসপেল ব্যবহার করেই নিজেদের গসপেল রচনা করেন। যা হোক, মথি ও লুকের বর্ণনা অনেক বিশদ যা মার্ক করেন নি। এ থেকে মনে হয়, মার্কের গসপেলই তাদের গসপেলের একমাত্র উৎস বা অবলম্বন হতে পারে না। কেউ কেউ বলেন যে, এটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, যেহেতু মার্কের গসপেল রচিত হয়েছিল হিব্রুতে, পরে তা অনুদিত হয় গ্রীক ভাষায় এবং গ্রীক থেকে ল্যাটিনে। মার্কের গসপেলের হিব্রু ভাষায় রচিত কপি এবং গ্রীক ভাষায় অনূদিত কপি ধ্বংস হয়ে গেছে। ফলে এ গসপেল এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় অনূদিত হওয়ার সময় কতটা পরিবর্তিত বা সংশোধিত হয়েছিল তা শুধু অনুমান সাপেক্ষ।

এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, গসপেলগুলোর মধ্যকার স্ব-বিরোধিতার ব্যাপারটি প্রতিষ্ঠিত চার্চের জন্য কিছুটা বিব্রতকর প্রমাণিত হওয়ায় গসপেলগুলো সমন্বয় করে মূলের কাছে প্রত্যাবর্তনের প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল। পলীয় চার্চ সেগুলোকে দ্বিতীয় শতকেই তাদের প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মগ্রন্থ বলে স্বীকৃতি দিয়েছিল সেই ৪টি গসপেলকেই সমন্বয় করার চেষ্টা করেছিলেন টাইশিয়ান (Titian)। এই গসপেলে টাইশিয়ান জনের গসপেলের শতকরা ৯৬ ভাগ, মথির গসপেলের শতকরা ৭৫ ভাগ, লূকের গসপেলের শতকরা ৬৬ ভাগ এবং মার্কের গসপেলের শতকরা ৫০ ভাগ, ব্যবহার করেন। বাকি অংশ তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। এটা তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় যে, তিনি পুরাতন গসপেল গুলোর ওপর সামান্যই আস্থা রেখেছিলেন এবং রচিতব্য গসপেলের ওপর বিপুলভাবে নির্ভর করেছিলেন। কিন্তু তার সমন্বয়কৃত গসপেল সফল হয় নি।

সুতরাং মার্কের গসপেল অন্য ৩টি গসপেলের অভিন্ন উৎস হতে পারে কিনা তা বিতর্কের বিষয়। পক্ষান্তরে এই ৩টি গসপেলে যেসব ঘটনা বর্ণিত হয়েছে, বার্নাবাসের গসপেলে সেগুলো রয়েছে।

এ ধরনের বিতর্কিত প্রেক্ষাপটে এই ৩ ব্যক্তি একই উৎস থেকে তাদের জ্ঞান আহরণ করে থাকুন আর নাই থাকুন, বার্নাবাস সম্পর্কে এ ঐশী নির্দেশের কথা স্মরণ করা যায়:

যদি সে তোমাদের কাছে আসে, তাকে স্বাগত জানাও।

[কলেসিয়ানদের কাছে পত্র (Epistle to the Colossians, ৪ : ১০)]