মূল: ড. মাজহার কাজি । অনুবাদ: মাওলানা ফয়জুলাহ− মুজহিরী। সম্পাদনা: এম মুসলেহ উদ্দিন

জ্যোতির্বস্তুবিদ্যা (Astrophysics) আপেক্ষিকভাবে বিজ্ঞানের একটি নতুন ক্ষেত্র। জ্যোতির্বিদ্যা ও পদার্থবিদ্যার ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক উৎকর্ষ সাধনের ফলে মহাবিশ্বের রহস্যসমূহের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। মহাবিশ্বের উৎপত্তি সম্পর্কে প্রচুর গবেষণা সম্পাদিত হয়েছে। বিজ্ঞানীরা এখন মহাবিশ্বের পরিসমাপ্তি সম্পর্কে উদ্বিগ্ন। জ্যোতির্বস্তুবিদ্যার জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে বিজ্ঞানীরা এখন এই সিদ্ধান্তে আসার চেষ্টা করছেন যে, যদি এই মহাবিশ্বের কখনো পরিসমাপ্তি ঘটে তবে এই পরিসমাপ্তির প্রক্রিয়া ও পরিণতি কী দাঁড়াবে?

অনেক আয়াতে কুরআন মাজিদ বলে যে, এই মহাবিশ্বের একদিন পরিসমাপ্তি ঘটবে, যেদিনকে বলা হয়েছে বিচার দিবস। আর কুরআন মাজিদ এই দিবস সম্পর্কে আরও বিভিন্ন বিস্তারিত বিবরণও পেশ করেছে। এগুলিকে সংক্ষেপে চারটি প্রধান ধাপে ব্যক্ত করা যেতে পারে-

১. একটি বিপর্যয় সৃষ্টিকারী ভূকম্প এবং ভূগর্ভস্থ বস্তুসমূহ বের হয়ে পড়া।

২. কবর থেকে মানুষের উত্থান।

৩. এমন এক সময় যখন সকলের আমলনামা প্রকাশ করা হবে।

৪. আকাশের দরজাসমূহের উন্মোচন এবং প্রত্যেকের একটি উচ্চ মাত্রার জীবনে উত্তরণ অর্থাৎ বেহেশত কিংবা দোযখে।

জ্যোতির্বস্তুবিদ্যা ও সৃষ্টিতত্ত্বের ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক গবেষণাসমূহ কুরআন মাজিদে বর্ণিত বিচার দিবস সংক্রান্ত বর্ণনাসমূহকে সমর্থন করে। এই আয়াতগুলো কুরআন মাজিদের মুজিজার ক্ষেত্রে একটি নতুন মাত্রা যোগ করে। কুরআন মাজিদ বিচার দিবস সম্পর্কে যা কিছু বর্ণনা করেছে তা এখন ‘Reversal  of  Time  and  Gravity’ (সময় ও অভিকর্ষের বিপর্যাস) সূত্রের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে, জ্যোতির্বস্তুবিদ্যা অনুসারে যা ঘটবে খুব শীঘ্রই কিংবা কিছু বিলম্বে। কিছু মৌলিক জ্ঞান পাঠকদেরকে ‘Reversal  of  Time  and  Gravity’ তত্ত্ব এবং কুরআন মাজিদে বর্ণিত বিচার দিবসের মধ্যে সম্পর্ক বুঝতে সাহায্য করবে।

আমাদের ছায়াপথ ‘আকাশ গঙ্গায়’ সূর্যসহ ২০০ বিলিয়ন নক্ষত্র রয়েছে। মহাবিশ্ব এতই প্রকাণ্ড যে, তার দূরত্ব পরিমাপ করা হয় আলোকবর্ষ দ্বারা। আলো এক বছরে যে পরিমাণ দূরত্ব অতিক্রম করে তাকে বলা হয় এক আলোকবর্ষ। আলোর গতি প্রতি সেকেন্ডে তিন লক্ষ কিলোমিটার। আলোর এই গতির ওপর ভিত্তি করে আমাদের পৃথিবী ও সূর্যের মধ্যে দূরত্ব হল ৮ মিনিট। এর তুলনায় পৃথিবীর নিকটতম নক্ষত্রটি পৃথিবী থেকে চার আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। ‘আকাশগঙ্গার’ এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তের দূরত্ব এক লক্ষ ৫০ হাজার আলোকবর্ষ। ছায়াপথগুলো একটি থেকে আরেকটি গড়ে ১০ মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। এই তথ্যগুলি আমাদের মহাবিশ্বের বিস্ততিৃ এবং তার সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তাআলার অপরিসীম ক্ষমতা সম্পর্কে কিছুটা ধারণা দেয়।

মহাবিশ্বের উৎপত্তি হয় আজ থেকে প্রায় ১৫-২০ বিলিয়ন বছর আগে এক মহা বিস্ফোরণের মাধ্যমে, যাকে বলা হয় Big Bang । সূচনালগ্ন থেকে এটি নিয়ত সম্প্রসারণশীল অবস্থায় রয়েছে। এতদুভয় ঘটনাই অর্থাৎ Big Bang-এর মাধ্যমে মহাবিশ্বের উৎপত্তি ও তার সম্প্রসারণ- এই বইয়ের মধ্যে ইতোপূর্বে কুরআন মাজিদের মুজিজা হিসেবে আলোচিত হয়েছে। বিজ্ঞানীরা জানেন না, এই সম্প্রসারণ অনন্তকাল ধরে চলতে থাকবে কি-না, যদি এই সম্প্রসারণ চলতে থাকে, বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন, এমন এক সময় আসবে যখন সূর্য ও অন্যান্য নক্ষত্রের শক্তি ফুরিয়ে আসবে, ফলে এই সম্প্রসারণ থেমে যাবে। ফলে মহাবিশ্ব সংকোচনের একটি প্রক্রিয়া শুরু হবে। পরবর্তীতে এটি ‘Reversal  of  Time  and  Gravity’-র প্রক্রিয়া শুরু করবে। এই সংকোচনশীল মহাবিশ্ব চূড়ান্তরূপে একটি খুব উষ্ণ ও সংকোচিত অবস্থায় উপনীত হবে, যাকে বলা হয় ‘Big Crunch’। এটিই হবে বিচার দিবসের সূচনা। এই ধারণার ওপর ভিত্তি করে আমরা এখন কুরআন মাজিদে উল্লেখিত বিচার দিবসের কিছু বিশেষ বিষয় সম্পর্কে আলোচনা করব।

এই তথ্যগুলি নেওয়া হয়েছে ডক্টর মুহাম্মদ হুমায়ুন খানের একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ থেকে, যা নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত ‘The message international’-এর জানুয়ারি ২০০১ সংখ্যায় ছাপা হয়ছে। আরও বিস্তারিত জানার জন্য পাঠক মূল প্রবন্ধটি পড়ে নিতে পারেন।

মুজিজা : ১৫২

নক্ষত্রের পতন

(তখন তোমরা কী করবে) যখন আকাশ বিদীর্ণ হয়ে যাবে, অতঃপর তা রক্তিম গোলাপের ন্যায় লাল চামড়ার মত হবে। (রহমান, ৫৫ : ৩৭)

‘নাসা’ সম্প্রতি আসমানসমূহের একটি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ছবি প্রকাশ করেছে। আগ্রহী ব্যক্তিগণ ‘নাসা’ থেকে এই ছবিটি সংগ্রহ করতে পারেন। এর নামকরণ করা হয়েছে Cats  Eye  Nebula (বিড়াল চক্ষু নীহারিকা)। নাসা এই চিত্রটি ধারণ করে ১৮ সেপ্টেম্বর ১৯৯৪ তারিখে। এর অফিসিয়াল সংকেত হল ‘NGC 6543’। এই ছবিটি দেখতে লাল গোলাপের পাপড়ির মত। এই আয়াতে কুরআন মাজিদ বলে, এমন একদিন আসবে যখন আকাশ বিদীর্ণ হয়ে যাবে। এবং তা গোলাপের মত লাল বস্তুতে পরিণত হবে। নাসা’র মহাকাশ বিজ্ঞানীরা বলেন, এই চিত্রটি একটি নক্ষত্রের মুত্যৃ ও ধ্বংসের চিত্র প্রদর্শন কিংবা প্রতিনিধিত্ব করে যা আসমানে সংগঠিত হয়েছে তিন হাজার আলোক বর্ষের দূরত্বে। কুরআন মাজিদ কিভাবে আজ থেকে শত শত বছর পূর্বে একথা বলতে পারল যে, যখন মহাবিশ্বে একটি নক্ষত্র সশব্দে বিদীর্ণ হবে, যা দেখতে একটি গোলাপের লাল পাপড়ির মত দেখাবে- তা সর্বজ্ঞাতা, জ্ঞানময় প্রভু আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে অবতরণ ব্যতিরেকে হতে পারে না।

তার সঙ্গে যোগ করা যেতে পারে যে, মহাবিশ্ব নিয়ত সম্প্রসারণশীল অবস্থায় রয়েছে। একদল বিজ্ঞানী অসংখ্য প্রমাণের ভিত্তিতে ধারণা পোষণ করেন যে, এই সম্প্রসারণ একদিন থেমে যাবে এবং সংকোচনের প্রক্রিয়া শুরু হবে। মহাবিশ্ব তখন একটি বেলুনের মত সংকুচিত হবে এবং কুঁচকে যাবে। সকল গ্রহ-উপগ্রহ যা বর্তমানে মহাকাশে পরস্পর বহুদূরে এবং ইতস্তত বিক্ষিপ্ত অবস্থায় রয়েছে সেগুলি খুব নিকটে চলে আসবে একটি বেলুনের উপরিভাগের বিন্দুসমূহের মত করে। যেহেতু সংকোচন প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে, ফলে গ্রহ-উপগ্রহের বিভিন্ন দল পরস্পর সংযুক্ত হয়ে যাবে এবং একটির সঙ্গে আরেকটির ধাক্কা লেগে সশব্দে বিস্ফোরিত হয়ে আরো অধিক লাল গোলাপী চিহ্নের সৃষ্টি করবে। শেষের দিকে পুরো মহাবিশ্বই লাল গোলাপের পাপড়ির মত দেখাবে। (আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন) এটি হতে পারে কিয়ামত দিবস এবং পৃথিবীর সমাপ্তি। তবে এই আয়াতে মহাকাশে নক্ষত্রের বিস্ফোরণ ও মুত্যৃর একটি স্বচ্ছ বৈজ্ঞানিক উদ্ধৃতি প্রদান করা হয়েছে এবং তেমনিভাবে কিয়ামতের দিবসে এই পৃথিবীর পরিসমাপ্তির বিষয়টিও পরিষ্কার হয়েছে। আরো উল্লেখ্য যে, জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা মহাকাশে অসংখ্য লাল গোলাপী চিহ্নের প্রমাণ পেয়েছেন, এসব কিছু পূর্বেকার নক্ষত্রসমূহের মৃত্যুর কথাই ব্যক্ত করে।

মুজিজা : ১৫৩

কিয়ামত দিবসের সুনির্দিষ্ট সময়

তারা তোমাকে কিয়ামত সম্পর্কে প্রশ্ন করে, ‘তা কখন ঘটবে?’ তুমি বল, ‘এর জ্ঞান তো রয়েছে আমার রবের নিকট। তিনিই এর নির্ধারিত সময়ে তা প্রকাশ করবেন। (আরাফ, ০৭ : ১৮৭)

কিয়ামত নিকটবর্তী। আল্লাহ ছাড়া কেউ তা প্রকাশ করতে সক্ষম নয়। (নাজম, ৫৩ : ৫৭-৫৮)

মহাবিশ্ব বর্তমানে সম্প্রসারণশীল অবস্থায় আছে। কেউ জানে না কিংবা ধারণা করতে পারে না কখন এই সম্প্রসারণ ও বিস্ততিৃ বন্ধ হবে এবং সংকোচন শুরু হবে। এর অর্থ  হল, কেউ কখনো ভবিষ্যৎবাণী করতে পারবে না কিংবা জানতে পারবে না, কিয়ামত দিবস কখন শুরু হবে। কেবল সৃষ্টিকর্তা ও এই মহাবিশ্বের প্রভু আল্লাহ তাআলাই এই মহাবিশ্বের সংকোচনের সময় সম্পর্কে জানেন এবং কিয়ামত দিবসের নির্দিষ্ট সময় সম্পর্কে অবহিত আছেন। এটি মানবজাতির জন্যে একটি চ্যালেঞ্জ যা কুরআন মাজিদ এই আয়াতে ঘোষণা করেছে।

মুজিজা : ১৫৪

কবরে অবস্থানের সময়কাল

আর যেদিন তিনি তাদেরকে একত্র করবেন। যেন তারা দিবসের মুহূর্তকালমাত্র অবস্থান করেছে (কবরের মধ্যে)। (ইউনুস, ১০ : ৪৬)

আর যেদিন কিয়ামত অনুষ্ঠিত হবে সেদিন অপরাধীরা কসম করে বলবে যে, তারা (কবরে) মুহূর্তকালের বেশি অবস্থান করে নি। এভাবেই তারা সত্যবিমুখ থেকেছে। (রুম, ৩০ : ৫৫-৫৬)

কুরআন মাজিদ জীবনকে চৈতন্য এবং মৃত্যুকে নিদ্রা বলে ব্যক্ত করেছে। মৃত্যু যখন আমাদেরকে একবার গ্রাস করে, তখন কিয়ামত দিবসে পুনরুত্থান পর্যন্ত আমাদের কোনো সময়-জ্ঞান থাকবে না। এ থেকে বুঝা যায়, যখন মানুষ কবর থেকে উত্থিত হবে তখন তাদের কবরে অবস্থানের সময়কাল সম্পর্কে কোনো ধারণা থাকবে না। যদিও তারা সেখানে শত শত বছর অবস্থান করবে, তথাপি তারা চিন্তা করবে, তারা সেখানে এক ঘন্টা কিংবা সেরকম কিছু সময় অবস্থান করেছে।

মুজিজা : ১৫৫

বিপর্যয়কারী ভূমিকম্প

যখন পৃথিবী প্রকম্পিত হবে (চূড়ান্ত) প্রচণ্ড কম্পনে। (যিলযাল, ৯৯ : ০১)

হে মানুষ, তোমরা তোমাদের রবকে ভয় কর। নিশ্চয় কিয়ামতের প্রকম্পন এক ভয়ঙ্কর ব্যাপার। (হজ, ২২ : ০১)

কুরআন মাজিদ আরও কিছু আয়াতে বলে, পৃথিবীর সমাপ্তি ঘটবে একটি প্রলঙ্করী ভূমিকম্পের মাধ্যমে। যার ফলে পৃথিবীর উপরিভাগের সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাবে। আমরা মধ্যাকর্ষণশক্তির জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে এ ধরনের একটি প্রলয়ঙ্করী ধ্বংসযজ্ঞের ব্যাখ্যা দিতে পারি এবং তার অনুমানও করতে পারি। এটি সর্বজনস্বীকতৃ বিষয় যে, সময় ও উচ্চতার সামান্য ব্যবধানের কারণে মধ্যাকর্ষণশক্তি ভিন্ন ভিন্ন হয়। সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে উপরে উঠার সঙ্গে সঙ্গে সময়ও কিছুটা দ্রুততার সঙ্গে অতিক্রান্ত হতে থাকে। সময়ের এই ব্যবধান চাই তা যত সূক্ষ্মই হোক না কেন, আণবিক ঘড়ির সহায়তায় পরিমাপ করা যায়। যখন অবশেষে এই মহাবিশ্ব সংকোচনের পর্যায়ে পৌঁছে যাবে, জ্যোতির্বস্তুবিদদের মতে, আগে হোক কিংবা পরে, একটা ঘটনা সংঘটিত হবে। সময়ের আবর্তনও উল্টে যাবে। তা মধ্যাকর্ষণশক্তিকে একটি বিপরীত অবস্থায় নিয়ে যাবে। ফলে ভূপৃষ্ঠের সকল বস্তু লণ্ডভণ্ড হয়ে যাবে, এমন একটি ভূমিকম্প সৃষ্টির মাধ্যমে, যা ইতোপূর্বে দৃষ্টিগোচর হয় নি। এটি পৃথিবীপৃষ্ঠের সবকিছুকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দিবে, যেমনটি কুরআন মাজিদে কিয়ামত দিবস সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে।

মুজিজা : ১৫৬

পর্বতমালার অন্তর্ধান

যখন শিঙ্গায় ফুঁক দেয়া হবে-একটি ফুঁক। আর জমিন ও পর্বতমালাকে সরিয়ে নেয়া হবে এবং মাত্র একটি আঘাতে এগুলি চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে। (আলহাক্কা, ৬৯ : ১৩-১৪)

আর তারা তোমাকে পাহাড় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবে। বল, ‘আমার রব এগুলিকে সমূলে উৎপাটন করে বিক্ষিপ্ত করে দেবেন। তারপর তিনি তাকে (পৃথিবীকে) মসৃণ সমতলভূমি করে দিবেন। তাতে তুমি কোনো বগতা ও উচ্চতা দেখবে না। (ত্ব-হা, ২০ : ১০৫-১০৭)

মধ্যাকর্ষণশক্তি পর্বতমালাকে বর্তমানে পৃথিবীপৃষ্ঠের সঙ্গে ধারণ করে আছে এবং সেগুলিকে বর্তমান রূপ দান করেছে। এক সময় মধ্যাকর্ষণশক্তি পরিবর্তিত হয়ে যাবে। এটি অবশ্যম্ভাবী যে, পর্বতগুলি তাদের স্বরূপ হারিয়ে ফেলবে এবং বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়বে। বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন, শেষ বিচারের দিনে মধ্যার্ষণশক্তির রূপান্তরিত অবস্থা আক্ষরিক অর্থে  ভূপৃষ্ঠের সবকিছুকে বিদীর্ণ করে দিবে। ভূমি ও পর্বতমালা হঠাৎ করেই উপরের দিকে অপসারিত হবে এবং একটি মাত্র আঘাতে নিচে নেমে আসবে। পর্বতসমূহ তখন ধুলিকণায় পরিণত হবে এবং অদৃশ্য হয়ে যাবে। এই ঘটনা দু’টিই কুরআন মাজিদের আয়াতে পৃথক পৃথকভাবে বর্ণিত হয়েছে। সকল প্রশংসা ও মহিমা জ্ঞানময় আল্লাহ তাআলার জন্য। কুরআন মাজিদ যা চৌদ্দশ বছর পূর্বে বর্ণনা করেছে, বিজ্ঞানীরা এখন তারই ভবিষ্যৎবাণী করছেন।

মুজিজা : ১৫৭

ভূগর্ভ শূন্য হয়ে যাওয়া

আর যখন জমিনকে সম্প্রসারিত করা হবে। আর তার মধ্যে যা রয়েছে তা নিক্ষেপ করবে এবং খালি হয়ে যাবে। (ইনশিকাক, ৮৪ : ০৩-০৪)

যখন প্রচণ্ড কম্পনে জমিন প্রকম্পিত হবে। আর জমিন তার বোঝা বের করে দেবে। আর মানুষ বলবে, ‘এর কী হল?’ সেদিন জমিন তার বৃত্তান্ত বর্ণনা করবে। (যিলযাল, ৯৯ : ০১-০৪)

এটি কেবল তখনই সম্ভব যখন মধ্যাকর্ষণশক্তির প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ উল্টে যাবে। যেমনটি ইতোপূর্বে বর্ণিত হয়েছে, জ্যোতির্বস্তুবিদরা বিশ্বাস করেন, মধ্যাকর্ষণশক্তির এমন একটি পরিবর্তন আসা সুনিশ্চিত, তা কিছু আগে হোক বা পরে। মধ্যাকর্ষণশক্তির এই পরিবর্তনের ফলে পৃথিবী তার অভ্যন্তরস্থ সকল বস্তু বাইরে নিক্ষেপ করে বহির্দিকে সম্প্রসারিত হবে। এটি যেমনটি কুরআন মাজিদে বর্ণিত হয়েছে, পৃথিবীকে তার অভ্যন্তরস্থ অংশকে খালি করে দেয়ার দিকে পরিচালিত করবে। যখন পৃথিবী তার উদরকে খালি করে দেবে, তখন তা তার মধ্যে দাফনকৃত সব বস্তুকেও বাইরে নিক্ষেপ করবে। এটা হবে কবর থেকে মৃতদের পুনরুত্থান, যেমনটি কুরআন মাজিদে বর্ণিত হয়েছে।

মুজিজা : ১৫৮

কবর থেকে মৃতদের উত্থান

সেদিন আমি আসমানসমূহকে গুটিয়ে নেব, যেভাবে গুটিয়ে রাখা হয় লিখিত দলিল-পত্রাদি। যেভাবে আমি প্রথম সৃষ্টির সূচনা করেছিলাম সেভাবেই পুনরায় সৃষ্টি করব। (আম্বিয়া, ২১ : ১০৪)

লিখিত কাগজ গুটানোর মত করে আসমানসমূহকে গুটানোর বিষয়টি হবে বিচার দিবসে সময়ের সংকোচনের প্রভাব। প্রকৃতিতে সকল বস্তুই পশ্চাত দিকে আবর্তিত হবে, একটি বইয়ের পৃষ্ঠাগুলি পশ্চাত দিকে গুটিয়ে যাওয়ার মত করে। অধিকন্তু সময়ের চক্রাবর্তের ফলে মানুষেরা তাদের কবর থেকে উত্থিত হবে এবং পুনরুজ্জীবন লাভ করবে। সম্ভবত এটিই আয়াতে উল্লিখিত সৃষ্টির পুনরাবৃত্তি।

মুজিজা : ১৫৯

আমলনামা উন্মোচন

আর আমি প্রত্যেক মানুষের কর্মকে তার ঘাড়ে সংযুক্ত করে দিয়েছি এবং কিয়ামতের দিন তার জন্য আমি বের করব একটি কিতাব, যা সে পাবে উন্মুক্ত। (ইসরা, ১৭ : ১৩)

যেদিন তাদের জিহ্বাগুলো তাদের হাতগুলো ও তাদের পাগুলো তারা যা করত, সে ব্যাপারে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে। (নুর, ২৪ : ২৪)

সময়ের ক্রীড়াচক্রে বিচার দিবসে লোকেরা দেখতে পাবে অতীতে তারা কী করেছে। তাদের হাত, পা, মুখ ও চোখের ওপর তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। সকল ভাল ও মন্দ কর্ম যা তারা সম্পাদন করেছিল তাদের সামনে একটি চলচ্চিত্রের পুনরাভিনয়ের মত উপস্থাপন করা হবে। এই বিস্ততৃ বিশ্বে মানুষকে ভাল-মন্দ কাজ নির্বাচনের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি দান করা হয়েছে এবং সময়ের মাধ্যমে তার সকল কর্মকে রেকর্ড করে রাখা হয়েছে। বিচার দিবসে সংকুচিত বিশ্বে কারো কোনো স্বাধীন ইচ্ছা থাকবে না। যখন সময় ধীরে ধীরে পুনরাবর্তিত হবে, প্রত্যেক মানুষই একটি বইয়ের পৃষ্ঠা খোলার মত করে নিজের সকল ভাল-মন্দের রেকর্ড প্রত্যক্ষ করবে।

একজন নাস্তিকের বিশ্বাস হতে পারে, সময়ের উল্টোচক্রের ফলে মানুষ তার শৈশবে ফিরে যাবে, অতঃপর মাতৃগর্ভে, আর তা থেকে অস্তিত্বহীনতায়। পক্ষান্তরে একজন মুমিন জানে, এ সকল ঘটনা সময় ও মহাবিশ্বের স্রষ্টা আল্লাহ তাআলার নিয়ন্ত্রিত। তিনি তার ইচ্ছামতো এই সংকোচনকে থামিয়ে দেবেন। অতঃপর প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার কর্ম অনুসারে পুরস্কার, তিরস্কার বা ক্ষমা করে দেবেন।

মুজিজা : ১৬০

আকাশ উন্মোচন

সেদিন শিঙ্গায় ফুঁক দেয়া হবে, তখন তোমরা দলে দলে আসবে। আর আসমান খুলে দেয়া হবে, ফলে তা হবে বহু দ্বার বিশিষ্ট। (নাবা, ৭৮ : ১৮-১৯)

আর আসমান বিদীর্ণ হয়ে যাবে। ফলে সেদিন তা হয়ে যাবে দুর্বল বিক্ষিপ্ত। (হাক্কা, ৬৯ : ১৬)

আসমানের দ্বার উন্মোচনের বিষয়টি এমন একটি ধারণা যা ‘Black Holes’ বা কৃষ্ণগহ্বরের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে। এধরনের দরজা উন্মোচন হতে পারে অন্যজগত যেমন- জান্নাত কিংবা জাহান্নামের প্রবেশপথ হিসেবে।

কৃষ্ণগহ্বর বলতে আকাশের সেসব অবস্থানসমূহকে নির্দেশ করে যা নক্ষত্রসমূহের মৃত্যুর ফলে শূন্য পড়ে পড়ে। একটি নক্ষত্রের মৃত্যু অর্থ, তার মাত্রা নিয়ন্ত্রণকারী শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেছে। যখন নক্ষত্রের মৃত্যু হয় তা স্বীয় মধ্যাকর্ষণশক্তির প্রভাবে ঘনীভূত হতে থাকে, যে পর্যন্ত না অণুসমূহের নিউক্লিয়াস অবশিষ্ট থাকে। একটি মৃত নক্ষত্র তার প্রকতৃ আকার থেকে কয়েক মিলিয়ন গুণ কুঁচকে ছোট হয়ে যায়। যদি মৃত নক্ষত্রটি আমাদের সূর্যের মত একটি ছোট নক্ষত্র হয়, তবে তা একটি পালসার (এমন ছোট নক্ষত্র যাকে কেবল এক্সরে থেকে আসা বেতার সংকেত দিয়ে চিহ্নিত করা সম্ভব) হয়ে যায় এবং প্রতি ০.০৩ সেকেন্ডে রঞ্জনরশ্মি (X-Ray) নির্গত করে। যদি মৃত নক্ষত্রটি বড় হয়, তবে তার মধ্যাকর্ষণশক্তিজনিত ভাঙ্গন এতই তীব্র হয় যে, তা কেবল নিউক্লিয়ার স্তরে গিয়েই থামে না, বরং তা চলতে থাকে যতক্ষণ না তার সকল পদার্থ  ও শক্তি একটি বিন্দুতে গিয়ে ঘনীভূত হয়- যাকে বলা হয় ‘Singularity’। এই Singularity মহা জাগতিক কৃষ্ণগহ্বর গঠন করে। এমন বস্তু কণিকায় মধ্যাকর্ষণশক্তি এতই তীব্র যে, এমনকি আলো পর্যন্ত তা থেকে বিচ্ছুরিত হতে পারে না এবং সেগুলি অদৃশ্য হয়ে যায়। এ কারণে এগুলিকে বলা হয় কৃষ্ণগহ্বর

জ্যোতির্বস্তুবিদরা বিশ্বাস করেন, মহাশূন্য সময় সম্পর্ক কৃষ্ণগহ্বরে এই মহাবিশ্বের পেছনে প্রবেশপথ তৈরি করে বিভক্ত হয়ে যেতে পারে। মহাবিশ্বের বিস্ততিরৃ বর্তমান অবস্থায় কৃষ্ণগহ্বরে অবস্থিত বস্তুকণাসমূহ এই দরজা উন্মোচনে বাধার সৃষ্টি করে। মহাবিশ্বের সংকোচনের ধাপে এই সমস্যা আর থাকবে না। বিচার দিবসে মধ্যাকর্ষণশক্তির উল্টোচক্র পৃথিবী ও তার চারপাশে বেষ্টিত সকল মহাকাশীয় বস্তুসমূহকে পরিবর্তিত করে দেবে। সময় তখন মহাশূন্যেও সংকোচন কিংবা মধ্যাকর্ষণের উল্টোবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত হবে। মহাশূন্যের এই স্বীয় অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংকোচন পরিণামে মহাশূন্য ও সময়ের কাঠামোকে ভেঙ্গে দেবে এবং অবশেষে এই মহাবিশ্বেও পেছনে প্রবেশ দ্বারের আকারে মহাশূন্য বিদীর্ণ হবে। এই আয়াতে (৬৯ : ২৬) আমাদের বিশেষ মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। তা বলে, আসমান শেষ বিচারের দিন বিদীর্ণ হয়ে যাবে এবং তা হবে ভঙ্গুর। তার অনিবার্য অর্থ এই দাঁড়ায় যে, বর্তমান মহাবিশ্বের এই সম্প্রসারণশীল অবস্থায় আসমান ভঙ্গুর নয়। এটি একটি মনোমুগ্ধকর বিষয় যে, কুরআন মাজিদের বর্ণনা খুবই সংক্ষিপ্ত, অথচ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

অতিক্রান্ত পৃষ্ঠাগুলি কুরআন মাজিদের মুজিজার ক্ষেত্রে একটি নতুন মাত্রা যোগ করে। জ্যোতির্বস্তুবিদ্যার সাম্প্রতিক অগ্রগতি বিষয়ক কুরআন মাজিদের আয়াতসমূহ খুব কমই অধ্যয়ন করা হয়েছে। বিজ্ঞানীরা বর্তমানে এমন একটি অবস্থানে পৌঁছেছেন যে, তারা কেবল এই মহাবিশ্বের পরিসমাপ্তি সম্পর্কেই ভবিষ্যৎবাণী করেন না, বরং তার বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কেও মতামত ব্যক্ত করেন। এটি কুরআন মাজিদের একটি অনুপম মুজিজা যে, জ্যোতির্বস্তুবিদদের কোনো ভবিষ্যৎবাণী কিংবা কোনো তথ্যই কুরআন মাজিদের একটি সাধারণ বর্ণনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়। পক্ষান্তরে এটি প্রমাণ করে যে, সকল আধুনিক বিজ্ঞানই অনুসন্ধান করে এবং ভবিষ্যৎবাণী প্রদান করে। বাস্তবতা হল, কুরআন মাজিদ মানব জ্ঞানের ওপর সর্বদা শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী ছিল, আছে এবং ভবিষ্যতেও মানবজ্ঞানের ওপর তার শ্রেষ্ঠত্ব বজায় থাকবে। সকল যুগের মানুষই কুরআন মাজিদে নতুন নতুন মুজিজা আবিষ্কার করেছে এবং এই আবিষ্কারের ধারা অব্যাহত থাকবে।

‘যখন সূর্য (অন্ধকারে) গুটিয়ে নেয়া হবে। আর নক্ষত্ররাজি যখন পতিত হবে। আর পর্বতগুলোকে যখন সঞ্চালিত করা হবে। আর যখন দশমাসের গর্ভবতী উষ্ট্রীগুলো উপেক্ষিত হবে। আর যখন বন্য পশুগুলোকে একত্র করা হবে। আর যখন সমুদ্রগুলিকে অগ্নিউত্তাল করা হবে। আর যখন আত্মাগুলোকে (সমগোত্রীয়দের সঙ্গে) মিলিয়ে দেয়া হবে। আর যখন জীবন্ত কবরস্থ কন্যাকে জিজ্ঞাসা করা হবে। কী অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছে? আর যখন আসমানকে আবরণমুক্ত করা হবে। আর জাহান্নামকে যখন প্রজ্বলিত করা হবে। আর জান্নাতকে যখন নিকটবর্তী করা হবে। তখন প্রত্যেক ব্যক্তিই জানতে পারবে সে কী উপস্থিত করেছে? (তাকবির, ৮১ : ০১-১৪)

আল কুরআনের ১৬০ মুজিজা ও রহস্য বইটির সকল লেখনী পড়তে নিন্মের লিঙ্ক সমূহে ভিজিট করুনঃ

ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে। তাহলে আপনিও ব্লগের কার্যক্রম কে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার লেখণী পাঠাতে পারেন।আপনার লেখনী পাঠিয়ে আমাদের ফেচবুক পেজের ম্যাসেঞ্জারে গিয়ে দয়াকরে নক করুন।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন