Quran Translation to Bangla

বিপদ-বালাই, দূর্যোগ, মহামারী হলো মহান স্রষ্টা আল্লাহর মহাজাগতিক অদৃষ্টবাদের বিধান। তিনি বলেছেন,

“নিশ্চয় আমি তোমাদেরকে ভয়, ক্ষুধা, ধন, প্রাণ এবং ফল-শস্যের কোনো একটির অভাবের দ্বারা পরীক্ষা করবো এবং আপনি ঐসব দৈর্যশীলদেরকে সুসংবাদ প্রদান করুন”।[1]

আলাই-বালাই আল্লাহর পক্ষ থেকে মুমিন-কাফির উভয়ের ওপর আসে। তবে সেটা মুমিন বান্দার জন্য শাস্তির সাথে সাথে রহমতও। কারণ, এর দ্বারা তর আখেরাতের শাস্তি হালকা করা হয় অথবা তার পাপের প্রায়শ্চিত্ত হয়। অথবা তার মর্যাদা বৃদ্ধি পায় অথবা তার ঈমান ও সবরের পরীক্ষা হয়। অপরদিকে কাফেরের জন্য তার কুফুরী ও নাফরমানির সাজা হয়ে থাকে।

যাই হোক বুদ্ধিমানের পরিচয় হলো, এর পরিণাম আল্লাহর তাকদীরের ওপর সোপর্দ করা। কখনো তিনি এক সম্প্রদায়কে বিপদে ফেলেন, অথচ অন্য সম্প্রদয় আরো বেশি অপরাধে লিপ্ত। কখনো আবার মুমিনকে পরীক্ষায় ফেলেন, কাফিরকে ঢিল দেন অথবা কাফিরদেরকে তাদের সৎ কাজের প্রতিদান হিসেবে দুনিয়াতে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য দান করেন। কাজেই আমাদের সসীম জ্ঞান দিয়ে আল্লাহর অসীম কুদরতের হিকমত জানা অসম্ভব।

সারকথা হলো, আপদ-বালাইয়ের মূল কারণ বান্দার পাপ, অবাধ্যতা ও কুফুরী। এর ওপর কুরআন-হাদীসের অসংখ্য দলীল রয়েছে। কুরআন মাজীদে এসেছে,

“মানুষের কৃতকর্মের কারণে জলে ও স্থলে বিপর্যয় ছড়িয়ে পেড়েছে, তিনি তাদেরকে কোনো কোনো কর্মের শাস্তি আস্বাদান করান, যাতে তারা ফিরে আসে’’। [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ৫৫]

উরস ইবন আমীরাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তা‘আলা কিছু লোকের ভুলের কারণে সকলকে ‘আযাব দেন না। অবশ্য ঐ অবস্থায় সকলকে ‘আযাব দেন, যখন হুকুম পালনকারীগণ শক্তি থাকা সত্ত্বেও অমান্যকারীদেরকে বাধা না দেয়। [সূরা আর-রূম, আয়াত: ৪১]

মুমিন ও সৎ লোকদের বিপদে পতিত হওয়ার ভিতর হিকমত ও কল্যাণ নিহিত

এক. তার ঈমানদারীর আলামত

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হলো, কোন ব্যক্তি সবচেয়ে বেশি কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হয়? তিনি উত্তর দিলেন: নবীগণ, এরপর নেককারগণ, এরপর যারা তাদের নিকটবর্তী। এভাবে তাদের পর যারা, আক্রান্ত হয় তারা। দীনের মজবুতী হিসেবেই মানুষ পরীক্ষার সম্মুখীন হয়। যদি দীনের ওপর বেশি মজবুত থাকে তাহলে সে হিসেবে পরীক্ষাও কঠিন আসে, আর যদি দীনের ওপর শিথিল থাকে। তাহলে পরীক্ষাও হালকা হয়।[2]

দুই. বান্দা আল্লাহর প্রিয় হওয়ার নির্দশন

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তা‘আলা যখন কোনো সম্প্রদায়কে ভালোবাসেন, তখন তাদেরকে পরীক্ষা করেন।[3]

তিন. আল্লাহ বান্দার কল্যাণ কামনার নির্দশন

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তা‘আলা যখন বান্দার মঙ্গল চান, তখন দুনিয়াতেই তাকে শাস্তি দিয়ে দেন, আর তিনি যখন বান্দার অমঙ্গল চান, তখন তাকে দুনিয়াতে শাস্তি দেন না। যাতে আখিরাতে তার শাস্তি কঠিন হয়।[4]

চার. বান্দার প্রায়শ্চিত্ত হয়, যদিও সেটা হালকা হয়

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা বর্ণনা করেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, যখন কোনো মুসলিম কাঁটাবিদ্ধ হয়, অথবা তার চেয়েও কম কষ্ট পায়, এর দ্বারা আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে তার জন্য একটি মর্যাদা লিখে দেওয়া হয় এবং একটি গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।[5]

পরীক্ষা কখনো ভালোর মাধ্যমে হয়। যেমন সম্পদ বৃদ্ধি। কখনো আবার হয় মন্দের মাধ্যমে হয়। যেমন, ক্ষুধা, অসুস্থতা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আমি তোমাদেরকে মন্দ ও ভালো দ্বারা বিশেষভাবে পরীক্ষা করে থাকি”।[6]

আল্লাহর তাকদীর অনুযায়ী পরীক্ষা আসলে সে সময় মুসলিমের করণীয়:

এক. সবর করা, কোনো অসমত্তষ্টি প্রকাশ বা অভিযোগ না করা, সেই সাথে নিম্নোক্ত দো‘আ পড়া।

إِنَّا لِلّهِ وَإِنَّاإِلَيْهِ رَاجِعُوْنَ، اَلَّلهُمَّ أَجُرْنِيْ فِيْ مُصِيْبَتِيْ وَاَخْلِفْ لِيْ خَيْرًا مِّنْهَا.

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রী উম্মে সালামাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, কোনো বান্দা যখন বিপদে পতিত হয় আর এ দো‘আ পড়ে, আল্লাহ তা‘আলা তাকে উক্ত মুসীবতের ওপর সাওয়াব দান করেন এবং হারানো জিনিসের বিনিময়ে তা অপেক্ষা উত্তম জিনিস দান করেন। উম্মে সালামাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা বলেন, যখন আমার স্বামী আবু সালামাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর ইন্তেকাল হয়ে গেলো, তখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে যেভাবে দো‘আ পড়ার হুকুম দিয়েছিলেন, এভাবে দো‘আ পড়লাম। ফলে আল্লাহ আমাকে আবু সামাহ থেকে উত্তম বদলা দান করলেন। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহকে স্বামী হিসেবে পেলাম। [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ৩৫]

দুই. রেজাবিল কাযা, অর্থাৎ আল্লাহর ফয়সালার ওপর সন্তুষ্ট থাকা। কারণ, কোনো হিকমত ও মঙ্গলের উদ্দেশ্যেই তিনি পরীক্ষায় ফেলেছেন। এর ওপর শুরুতেই আলোচনা করা হয়েছে।

তিন. শোকর আদায় করা। এটা হলো আল্লাহর কাছে বান্দার আত্মসমর্পনের সর্বোত্তম স্তর। কারণ, এ অবস্থায় সে একমাত্র আল্লাহর জন্যই প্রশংসা করেছেন।

আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সর্বপ্রথম যাদেরকে জান্নাতের দিকে আহ্বান করা হবে, তারা ঐ সকল লোক, যারা সুখে-দুঃখে সর্বাবস্থায় আল্লাহর প্রশংসা করেছে।[7]

সবর, রেজাবিল কাযা এবং শোকর এগুলো হলো তাকদীরের ভালো-মন্দ ও আল্লাহর হিকমতের ওপর পরিপক্ক ও মজবুত ঈমানের নিদর্শন। কেননা হাদীসে এসেছে, “প্রত্যেক বস্তুর একটি হাকীকত আছে। কোনো বান্দা ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমানের হাকীকত পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তার অন্তরে এরূপ দৃঢ় বিশ্বাস না হবে যে, যেসব অবস্থা তার ওপর এসেছে, তা আসতই আর যেসব অবস্থা তার ওপর আসে নি, তা কখনোই আসত না।[8]

চার. শরী‘আত নির্দেশিত পন্থায় বিপদ মুক্তির জন্য চেষ্টা-তদবীর করা। যেমন, আল্লাহর নিকট তওবা করা। করণ, যেমন গুনাহের ফলে বিপদ আসে, তেমনি আল্লাহর নিকট কৃত গুনাহ থেকে তওবা করলে বিপদ কেটে যায়।

কবুলের আত্মবিশ্বাস নিয়ে আল্লাহর কাছে দো‘আ ও কান্নাকাটি করা, তাড়াহুড়া না করা। তাড়াহুড়ার মানে হলো এরূপ কথা বলা যে, আমি অনেক দো‘আ করেছি; কিন্তু আল্লাহ আমার ডাক শোনেন নি।

সকাল-সন্ধ্যার নিয়মিত যিকির ও দো‘আগুলো পড়া। এর দ্বারা হয়তো বিপদ পুরো কেটে যাবে অথবা হালকা হবে।

আমাকে খুব ভালো করে স্মরণ রাখতে হবে যে, আল্লাহর হুকুমে এসব যিকির-আযকার ও দো‘আর ফলাফল কম-বেশি হবে দুই কারণে।

এক. এ কথার ওপর স্থির বিশ্বাস রাখা যে, এটা হক ও সত্য এবং আল্লাহর হুকুমে উপকারী।

দুই. খুব মনোযোগ দিয়ে পড়া। কারণ, এগুলো দো‘আ, আর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, উদাসীন মনের দো‘আ আল্লাহ কবুল করেন না। বিপদ মুক্তির জন্য সবচেয়ে উত্তম মাধ্যম হলো অসুখ থেকে সুস্থতা অর্জনের নিয়তে কুরআন তিলাওয়াত করা। কুরআনের প্রতিটি আয়াতই শিফা।


[1] জামেউস সহীহ, হাদীস নং ৩৩০৪

[2] মাজমায়ে যাওয়ায়েদ ৩/১১

[3] তিরমিযী, হাদীস নং ২৩৩৮

[4] মাজমায়ে যাওয়ায়েদ ৩/১১

[5] তিরমিযী, হাদীস নং ২৩৪০

[6] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৬৫৬১

[7] মাজমায়ে যাওয়ায়েদ ৭/৪০৪

[8] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২১২৭