bangla natok online free watch

মূল: আরজ আলী সমীপে । লেখক: আরিফ আজাদ । ওয়েব সম্পাদনা: আবু বক্কার ওয়াইস বিন আমর

‘বিবিধ’ অংশটি আরজ আলী মাতুব্বর সাহেবের সত্যের সন্ধান বইয়ের সর্বশেষ অধ্যায় । এই অধ্যায়ে মাতুব্বর সাহেব প্রথমে যে প্রশ্নটি করেছেন, সেটি নিয়ে লিখতে গেলে ভলিউমের পর ভলিউম লেখা যাবে, কিন্তু শেষ হবে না । অংশটির নাম- ‘বিবর্তনবাদ’ । বলা হয়, আধুনিক বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় ধোঁকা এবং প্রতারণার নাম হলো ‘বিবর্তনবাদ’ । তিনি লিখেছেন, ‘আদম কি আদিমানব?’

আদম (আঃ) আদিমানব কি না এই প্রশ্নের ব্যাখ্যায় তিনি জীববিজ্ঞানীদের কথা উল্লেখ করেছেন । পৃথিবীর প্রথম প্রাণী কখন এলো, কিভাবে এলো ইত্যাদি আলোচনা নিয়ে হাজির হয়েছেন । উনি বলেছেন, জীবতত্ত্ববিদদের মতে, সৃষ্টির শুরুতে অতিক্ষুদ্র এক কোষবিশিষ্ট ‘অ্যামিবা’ থেকে ক্রমবিবর্তন ও ক্রমবিবর্তনের ফলে প্রথমে ব্যাকটেরিয়া, সেখান থেকে স্পঞ্জ, মৎস্য, সরীসৃপ, পশুপাখি, ইত্যাদি বহু জীবে রূপান্তরিত হয়ে শেষে ‘বনমানুষ’ তথা ‘Anthorpoidape’ এবং তাদের ক্রমোন্নতির ফলে বর্তমান সভ্য মানুষ এসেছে আজ থেকে প্রায় ৩০ হাজার বছর পূর্বে ।

বিবর্তনবাদের আলোচনায় যাওয়ার আগে কিছু খুচরা আলাপ সেরে নেওয়া জরুরী মনে করছি ।

বিবর্তনবাদীরা, বিশেষ করে বিবর্তনবাদকে যারা ‘সৃষ্টিতত্ত্বের’ বিপরীতে দাঁড় করাতে চায়, তারা ‘বিবর্তনবাদ’ শব্দটাকে এমন ভাবে বলে, যেন এটা একেবারে গাছ থেকে আপেল পাড়ার মত সত্য কোন জিনিস ।

‘বিবর্তন’ শব্দটা অন্যান্য সাধারন দশটি শব্দের মত খুব সাধারণ একটি শব্দ । ধর্ম বলতে যেমন যেকোন ধর্মকে বুঝাতে পারে, প্রাণী বলতে যেমন যেকোন প্রাণীকে বোঝাতে পারে, মানুষ বলতে পৃথিবীতে যেকোন ধর্মের যেকোন গোত্রের, যে কোন বর্ণের মানুষকে বোঝাতে পারে, ঠিক তেমনি ‘বিবর্তন’ বলতেও সব ধরনের বিবর্তনকে বোঝাতে পারে । এখন যে কেউ প্রশ্ন করতে পারে, বিবর্তন কত প্রকারের হতে পারে ? এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার জন্য আপনাকে আগে ‘বিবর্তন’ শব্দের অর্থটা ভালোভাবে বুঝতে হবে । বিবর্তন বলতে আসলে কি বোঝায় ?

বিবর্তন অর্থ পরিবর্তন বা ক্রমবিকাশ । অর্থাৎ এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় উত্তরণ হওয়াকেই মূলত বিবর্তন বলা হয় । এই বিবর্তন শব্দটাকে বিভিন্ন অর্থে প্রয়োগ করা হয় । এর অর্থ নির্ভর করছে আপনি আসলে এই শব্দটাকে কোন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছেন এর উপর । যেমন, শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর মিলন এর ফলে মাতৃগর্ভে একটি পূর্ণাঙ্গ মানব ভ্রূণের জন্ম, ক্ষুদ্র একটি বীজ থেকে মহীরুহ বৃক্ষের আবির্ভাব, ইট, বালি, সিমেন্ট ইত্যাদি মিশেলের ফলে দৃষ্টিনন্দন দালানকোঠা তৈরিকে আপনি বিবর্তন বলতে পারেন । কারণ, এখানে বিভিন্ন উপাদানের মিশেলের ফলে এক অবস্থা থেকে আরেক অবস্থায় উত্তরণ ঘটেছে । মজার ব্যাপার হচ্ছে, এ সমস্ত বিবর্তন একদম দিনের মতোই সত্য । এসবের ব্যাপারে কারো কোন প্রশ্ন নেই, আপত্তি নেই, কেউ কখনো এসব এর পক্ষে প্রমাণও দেখতে চায় না ।

অন্যদিকে চার্লস ডারউইন প্রস্তাবিত বিবর্তনবাদ তত্ত্ব (Theory of Evolution) হচ্ছে এমন একটি তত্ত্ব, যেখানে বিবর্তন অর্থ হল বিলিয়ন বছর আগে একটি মাত্র অণুজীব থেকে এলোমেলো পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে ধাপে ধাপে পুরো প্রাণীজগত এবং উদ্ভিদজগৎ বিবর্তিত হয়েছে ।

একটিমাত্র এককোষী অণুজীব থেকে এলোমেলো পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে উদ্ভিদজগত এবং প্রাণীজগতের বিবর্তন এবং উপরে আলোচ্য বিবর্তন কখনোই এক নয় । উপরের আলোচ্য বিবর্তনের পক্ষে কোন প্রমাণাদির দরকার পড়ে না, অন্যদিকে ডারউইন প্রস্তাবিত বিবর্তনের পক্ষে কোন প্রমাণ নেই । কেউ কেউ প্রশ্ন করতে পারে, বিবর্তনবাদের পক্ষে কোন প্রমাণ না থাকলে পৃথিবীর এতগুলো বিজ্ঞানী তাহলে বিবর্তনবাদে বিশ্বাস করে কেন ? তারা কি বিজ্ঞান বোঝে না ? তারা কি ঘাস খান ?

জি । আবারও জোরালোভাবে দাবি করছি, বিবর্তনবাদের পক্ষে বিবর্তনবাদীরা কোন প্রত্যক্ষ প্রমাণ হাজির করতে পারে না । তারা আজ পর্যন্ত যে সমস্ত পরোক্ষ প্রমান আমাদের সামনে তার মিডিয়ার সামনে হাজির করেছে, তাও গোঁজামিল এবং কপটতায় ভরপুর । মিসিং লিঙ্ক (Missing Link), জাঙ্ক ডিএনএ(Junk DNA) সহ বিভিন্ন ইস্যুতে তাদের ভণ্ডামি বারবার আমাদের সামনে এসেছে । তবুও বীরদর্পে বিবর্তনবাদ বিজ্ঞান মহলে টিকে আছে । কেন টিকে আছে ? সেটা জানতে হলে, আপনাকে এর পিছনের পলিটিক্সটা জানতে হবে । বস্তুবাদকে পৃথিবীতে সু-প্রতিষ্ঠিত করার একমাত্র মোক্ষম অস্ত্র এই ‘বিবর্তনবাদ’ । ধর্মগুলো মানুষকে অন্যান্য প্রাণী থেকে আলাদা, অনন্য হিসেবে দাবি করে থাকে । ধর্মের দাবি, পৃথিবীর সমস্ত কিছু মানুষের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, আর এই পৃথিবী মানুষের জন্য শেষ সময় নয় । পৃথিবীর পাঠ চুকিয়ে তাকে চলে যেতে হবে অনন্ত, অসীম এক সময়ের অধীনে । অন্য একটি জগতে । সেমেটিক ধর্মগুলোর মতে, এটি হলো পারলৌকিক জগত । সেই জগতে তার পাপ-পুণ্যের হিসাব দিতে হবে ।

কিন্তু বস্তুবাদ তথা ডারউইনবাদ যা ধারণা দেয়, তা থেকে বোঝা যায় যে, মানুষ আসলে বিশেষ কোনো সৃষ্টি নয় । সে একটি ক্ষুদ্র এককোষী ব্যাকটেরিয়া থেকে সময়ের সাথে সাথে বিবর্তিত হতে হতে আজকের আধুনিক মানুষ বা উন্নত পশুমাত্র । এই বস্তুবাদের আরো ধারণা হলো এই যে, পরকাল বলতে আসলে কিছু নেই । এই পৃথিবীই শেষ । আর কোন জীবন বা সময় নেই ।

এ বস্তুবাদকে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে, প্রতিটি স্তরে পৌঁছে দিতে বিবর্তনবাদই হতে পারে এখানে মোক্ষম অস্ত্র । এজন্য বস্তুবাদের দখলে থাকা বিজ্ঞানীমহল এবং তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন চক্র খুব সুকৌশলে পাঠ্যবইয়ে, ম্যাগাজিন, পত্রিকায় বিবর্তনবাদকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছে, যেন এটা একেবারে গাছ থেকে আপেল পড়ার মতো সত্য । উল্লেখ্য, বিজ্ঞানী আইজ্যাক নিউটন দেখিয়েছে যে গাছ থেকে আপেল ভূমিতে পড়েছে পৃথিবীর মধ্যাকর্ষণ শক্তির জন্য । পুনঃপুন পরীক্ষার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা তার সত্যতা প্রত্যক্ষ করেছে । প্রতিদিন শত শত মানুষ প্রত্যক্ষ করেছেন যে, গাছ থেকে আপেল সব সময় ভুমিতে পড়ছে, উপরের দিকে উঠছে না । কিন্তু এখন পর্যন্ত কোন বিজ্ঞানী দেখাতে পারেনি যে, চোখের সামনে এক ধরনের শারীরিক গঠনবিশিষ্ট প্রাণী আরেক ধরনের গঠনে বিবর্তিত হয়েছে । অথচ যখনই কোন বিজ্ঞানী গবেষক বিবর্তনবাদের সমালোচনা করেন, ঠিক তখনই সেই বিজ্ঞানী, গবেষক হয়ে পড়ে অন্ধবিশ্বাসী, ক্রিয়েশনিস্ট, গোড়া, মূর্খ ইত্যাদি । মোদ্দাকথা, বিবর্তনবাদের সমালোচনা করলে তাকে আর বিজ্ঞানীমহলে কোন রকম পাত্তা দেওয়া হয় না । সে যত বড় বিজ্ঞানী হোক, তার যত গবেষণা-কাজ থাকুক না কেন, তাকে বিজ্ঞানমহলে তখন আবর্জনা জ্ঞান করা হয় । বিবর্তনবাদ বিরোধীদের সাথে বস্তুবাদী বিজ্ঞানমহল কি রকম আচরণ করে, সেটা নিয়ে একটা বিখ্যাত ডকুমেন্টারি করা হয়েছিল একবার । ইউটিউবে ‘Expelled: No intelligence allowed’ লিখে সার্চ দিলেই দেখতে পাবেন ।

পশ্চিমা দেশগুলোতে পদোন্নতি পেতে হলে, প্রাতিষ্ঠানিক সম্মান পেতে হলে এবং বিজ্ঞান-সাময়িকীতে লেখা ছাপাতে হলে, বেশ কিছু নিয়ম নীতিমালার মধ্যে দিয়ে যেতে হয় । সেগুলোর মধ্যে অন্যতম নিয়ম হল, চোখ-মুখ বন্ধ করে বিবর্তনবাদকে বিশ্বাস করে নেওয়া । এ প্রসঙ্গে বিখ্যাত জীবাশ্মবিদ গুনটার বেকলির সাথে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ প্রাণিধানযোগ্য । তিনি জার্মানির স্টার্টগার্ডে অবস্থিত স্টেট মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্ট্রি-তে হিসেবে কিউরেটর হিসেবে কর্মরত ছিলেন । গুনটার বেকলি ছিলেন ড্রাগন ফ্লাই এর বিষয়ে বিশেষজ্ঞ । তিনি অনেকগুলো ফসিল ড্রাগন ফ্লাই প্রাজাতি আবিষ্কার করেন এবং তার নামে একাধিক প্রজাতির নামকরণও করা হয়েছে । তিনি ছিলেন বিবর্তনবাদী এবং উক্ত মিউজিয়ামে বিবর্তনবাদ সম্পর্কে নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতেন । কিন্তু গত কয়েক বছর তিনি তার পড়ালেখার আলোকে বিবর্তনবাদের কথিত প্রমাণাদির উপর সন্দেহ করতে শুরু করেন এবং শেষ পর্যন্ত এ সিদ্ধান্ত এসে পৌছান যে, এলোপাতাড়ি বিবর্তনের প্রস্তাবিত কোন পদ্ধতিই প্রজাতির বিবর্তনের প্রমাণের জন্য যথেষ্ট নয় । প্রথম প্রথম তিনি তার সিদ্ধান্তের বিষয়টি গোপন রাখলেও গত বছর তা প্রকাশ করেন । যার ফলে, তাকে মিউজিয়ামে কিউরেটর পদ থেকে কোন উপযুক্ত কারন প্রদর্শন না করে অপসারণ করা হয় । উইকিপিডিয়ার মতো তথাকথিত নিরপেক্ষ অনলাইন বিশ্বকোষ থেকে তার পেজটিকে এমনভাবে নিশ্চিহ্ন করা, যেন জীববিদ্যায় তার কোন অবদানই নেই ।একজন বিজ্ঞানী বিবর্তনবাদ সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করলেও সেটা প্রকাশ করতে পারেন না তার সম্মান, মর্যাদা ইত্যাদি হারানোর ভয়ে । বলা চলে, অনেকটা জোর করে বিবর্তনবাদ বিশ্বাস করানো হয় ।

আমেরিকান অণুজীববিজ্ঞানী জোনাথান ওয়েলস ২০০০ সালে প্রকাশিত উনার বই Icons of Evolution এ লিখেছেন,

“গোড়া ডারউইনবাদীদের প্রথমে ডারউইনবাদের সংকীর্ণ ব্যাখ্যা চাপিয়ে দিয়ে ঘোষণা করে বসে যে বিজ্ঞানচর্চার এটাই একমাত্র রাস্তা । তখন সমালোচনাকারীরা হয়ে গেল পরে অবৈজ্ঞানিক । সমালোচকদের নিবন্ধসমূহ গোড়াবাদি বিজ্ঞান-সাময়িকীগুলো প্রত্যাখ্যান করে । সরকারি সংস্থাগুলো সমালোচকদের অর্থায়নের অস্বীকৃতি জানায় । সবশেষে সমালোচককে বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায় থেকে বহিষ্কার করা হয় । এভাবেই, ডারউইনবাদী মতবাদের বিপক্ষে সকল প্রমাণ আস্তে আস্তে অদৃশ্য হয়ে যায়, যেভাবে পুলিশ বাহিনীর বিপক্ষের সাক্ষী অদৃশ্য হয়ে যায় । অথবা প্রমাণগুলোকে কবরস্থ করা হয় বিশেষায়িত প্রকাশনাগুলোতে, যার সন্ধান পান এবং অতি কৌতূহলোদ্দীপক গবেষকরাই । আর যখনই সমালোচকদের মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং প্রমাণগুলো গায়েব করে দেওয়া হয়, ঠিক তখনই ডারউইনবাদীরা প্রচার করে বেড়ায় যে, বিবর্তনবাদের বিপক্ষে বিতর্ক আছে, কিন্তু কোন প্রমাণ নেই ।

এই হচ্ছে বিজ্ঞানমহলকে টুটি চেপে ধরা বস্তুবাদীদের ভেতরের খবর । এভাবেই তারা চায় দুনিয়া থেকে ধর্ম উঠে যাক । স্রষ্টাতত্ত্বকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করে দিতে পারলেই তারা তাদের ভোগবাদী দুনিয়া নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হবে । আর এই কাজে তাদের একমাত্র তুরুপের তাস হলো, বিবর্তনবাদ ।

সালটা ১৮৩২ । ইংল্যান্ড থেকে ছেড়ে যায় H.M.S Beagle নামের একটি জাহাজ । জাহাজে বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন শ্রেণীর যাত্রী । কেউ সাগর ভবন করবে । মিতালী গড়ে তুলবে দুমড়ে পড়া প্রতিটা ঢেউয়ের সাথে । কেউ উপভোগ করবে প্রকৃতির নিশ্চুপ নৈস্বর্গিকতা । জাহাজের পাটাতনে শুয়ে কেউ-বা সখ্য গড়ে তুলবে রাতের আকাশের সাথে । এরকম বিভিন্ন জনের বিভিন্ন উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে যাত্রা করে এই জাহাজ । সেই জাহাজে একজন তরুন লোক ছিল । চেহারায় কাঠিন্যের কোন ভাব নেই । প্রকৃতি তার বেশ পছন্দের । প্রকৃতির টানে সেও ছুটে এসেছিল সেদিন । লোকটার নাম চার্লস ডারউইন । শখের বিষয় প্রকৃতি হলেও ভদ্রলোককে পড়তে হচ্ছিল প্রাণিবিজ্ঞান । অনেকটা বাধ্য হয়ে পড়া যাকে বলে ।

এভাবে জাহাজে জাহাজে কেটে গেল পাঁচ পাঁচটা বছর । বিভিন্ন দ্বীপ, অঞ্চলে গিয়ে জাহাজে নোঙ্গর করত, আর সবাই হুড়মুড় করে নেমে সেই দ্বীপ অঞ্চলে বিচরনে ব্যস্ত হয়ে পড়তো । এভাবে ঘুরতে ঘুরতে বিভিন্ন প্রাণীদের বিভিন্ন গঠন, বিভিন্ন প্রজাতি দেখে অবাক হয়ে চার্লস ডারউইন । বিশেষ করে, গ্যালাপাগাস নামের এক দ্বীপে এক ধরনের ছোট ছোট পাখি দেখে খুবই আশ্চর্য হয়ে পড়েন । এই পাখিগুলোর ঠোঁটের ভিন্নতা দেখে মনে করলেন, পাখিগুলোর বাসস্থানের অভিযোজনের ফলে তাদের ঠোঁটে এরকম ভিন্নতা এসেছে । অর্থাৎ প্রতিকূল পরিবেশের সাথে নিজেদের মানিয়ে নিতে নিতে সময়ের পরিক্রমায় এসব পাখিদের ঠোঁটে ভিন্নতা চলে এসেছে ।

এই ধারণার উপর ভিত্তি করে যে, প্রকৃতিতে প্রানের ও বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীর উৎপত্তি ঘটেছে এ রকম অভিযোজনের ফলে । চার্লস ডারউইন এটাকে ‘প্রাকৃতিক নির্বাচন’ বলে উল্লেখ করেছেন ।

চার্লস ডারউইনের মতে, প্রকৃতিতে একটি অবিরাম সংগ্রাম চলেছে । সেটা হল  টিকে থাকার সংগ্রাম । এ টিকে থাকার সংগ্রামে যে সব প্রাণীরা নিজেদের প্রতিকূল পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারে তারা টিকে থাকে । আর যারা এই সংগ্রামে টিকতে ব্যর্থ হয় তারা বিলুপ্ত হয়ে যায় । এখন প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার এই সংগ্রামে অভিযোজনের ফলে তাদের মধ্যে নানা রকম বৈশিষ্ট্য যোগ-বিয়োগ হয় । এভাবে, একসময় একটা প্রাণীর ভিন্ন একটা প্রজাতির প্রাণীতে রূপান্তরিত হয় । সংক্ষেপে এটাই হলো ‘প্রাকৃতিক নির্বাচন’ ।

একটা উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা আরো সহজে বোঝা যাবে । ধরুন, একটি জঙ্গলে দশটি হরিণ আছে এবং একটি বাঘ আছে । এখন ওই এলাকায় যদি নতুন করে আরও দুটি বাঘের আগমন ঘটে, তাহলে হরিণগুলোর জন্য পরিবেশটা প্রতিকূল হয়ে উঠবে । এখন এরকম প্রতিকূল পরিবেশে কেবল সেই সব হরিণগুলো শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে যেগুলো বেশি দৌড়াতে পারবে । যেগুলো কম দৌড়াতে পারবে, সেগুলো বাঘের পেটে চলে যাবে ।

ঘটনা সত্য । কিন্তু চার্লস ডারউইন বলেছেন, এই ঘটনা যদি চলমান থাকে, একটা সময়ে হরিণগুলো প্রতিকূল পরিবেশের সাথে নিজেদের খাপ খাওয়াতে খাওয়াতে ভিন্ন প্রজাতিতে রূপান্তরিত হবে ।

মজার ব্যাপার হলো, এই রকম প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে কোনোভাবেই এক প্রজাতি থেকে ভিন্ন প্রজাতির প্রাণীর উদ্ভব সম্ভব নয় । এটা যে সম্ভব নয়, এ কথা হাল আমলের বিবর্তনবাদীরাই এখন অকপটে স্বীকার করে নিয়েছে । অর্থাৎ প্রাকৃতিক নির্বাচন কোনোভাবেই নতুন প্রজাতি সৃষ্টি করতে পারে না । কিন্তু চার্লস ডারউইন মনে করতেন, প্রাকৃতিক নির্বাচনের ফলেই প্রকৃতিতে এক প্রজাতি থেকে আরেক প্রজাতির উদ্ভব ঘটে । তিনি নিজের বইয়ের নাম করনটাই করেছিলেন Origin of species by means of natural selection ।

তবে চার্লস ডারউইনের এই ধরনের তত্ত্বের প্রথম প্রবক্তা নয় । তার আগে এই ধরনের একটি প্রকল্প (Hypothesis) দিয়েছিলেন ফ্রেঞ্চ জীববিজ্ঞানী লামার্ক । লামার্কের মতে, একটি প্রাণী তার অর্জিত বৈশিষ্ট্যগুলো পরবর্তী প্রজন্মের মাঝে পৌঁছে দেয় । এভাবেই আস্তে আস্তে একটা প্রাণী ভিন্ন একটা প্রাণীতে বিবর্তিত হয় । উদাহরণ হিসেবে তারা জিরাফের কথা বলে । তাদের মতে হরিণ জাতীয় এক প্রকার প্রাণী প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গলা উচিয়ে উঁচু থেকে উঁচুতর ডাল থেকে পাতা খেতে খেতে একসময় তাদের গলা লম্বা হয় এবং এভাবে তারা ভিন্ন একটা প্রজাতিতে বিবর্তিত হয় । এভাবেই জিরাফের আবির্ভাব বলে প্রচার করা হয় । কিন্তু আধুনিক জীনতত্ত্ববিদ্যার গবেষণার মাধ্যমে বিংশ শতাব্দীতে এর পক্ষে কোন প্রমাণ না পাওয়ায় ল্যামার্কিজম পরিত্যক্ত হয় । একবিংশ শতাব্দীতে এসে এপিজেনেটিক্সের আবিষ্কারের মধ্যে দিয়ে দেখা যাচ্ছে যে একটি প্রজাতি তার অর্জিত বৈশিষ্ট্য পরবর্তী প্রজম্মে পৌঁছে দিতে পারে । এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে Eva Joblanka এবং Massimo Pigliucci লামার্কিজম পুনর্জীবিত করার চেষ্টা করেছেন নিউ লামার্কিসম নামে । কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, পরিবর্তনের প্রক্রিয়াটি হয় প্রজাতির গাঠনিক তথ্যের কোন গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে না । অথবা যে পরিবর্তন আনে তা পরবর্তী অল্প কয়েক প্রজন্ম পর্যন্ত পৌঁছে পূর্বাবস্থায় ফিরে আসে । অর্থাৎ নিও-ল্যামার্কিজমও প্রজাতিতে নতুন বৈশিষ্ট্যের আগমন দেখা করতে পারে না ।

প্রাকৃতিক নির্বাচন যেকোনভাবেই নতুন প্রজাতি সৃষ্টি করে না, সেটা অকপটে স্বীকার করে British Museum of natural history এর একজন সিনিয়র জীবাশ্মবিদ, যিনি নিজেই একজন বিবর্তনবাদে বিশ্বাসী, Colin Patterson বলেছিলেন,

‘প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে কেউ কখনো নতুন প্রজাতি উদ্ভব করতে পারেনি । কেউ কখন এটার ধারেকাছেও ঘেষতে পারেনি । নব্য ডারউইনবাদের বেশিরভাগ আলোচনাই এ সম্পর্কে’

বিবর্তনবাদীরা তাদের বিবর্তনবাদের বইগুলোতে ‘প্রাকৃতিক নির্বাচনকে’ জায়েজ করতে একটি ঘটনা বর্ণনা করে থাকে । এই ঘটনা প্রথম বর্ণনা করেন বিবর্তনবাদী বিজ্ঞানী Douglas Futuyma ১৯৮৬ সালে লেখা উনার The biology of evolution বইতে । এই ঘটনা Industrial  Melanis নামে পরিচিত ।

তিনি লেখেন, ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লবের শুরুর দিকে, ম্যানচেস্টারের আশেপাশের গাছগুলোর বাকলের রং বেশ হালকা বা ফিকে ধরনের ছিল । বাকলের রং ফিকে হওয়ার ফলে কালচে বর্ণের মথগুলো (একধরনের পোকা) সহজে ধরা পড়ত এবং পাখিদের শিকারে পরিণত হতো । কিন্তু ৫০ বছর পরে, দূষণের কারণে ভুঁইফোড় বা একজাতীয় ছত্রাক নিঃশেষ হয়ে গেলে ফিকে হওয়া গাছের বাকলের রং আস্তে আস্তে কালচে বর্ণ ধারণ করে । বাকলের রং কালচে হয়ে যাওয়ার ফলে কালচে রঙের মথগুলো সহজে ধরা পড়ে না । কিন্তু এবার পাখিদের শিকারে পরিণত হতে শুরু করল ফিকে বা হালকা রঙের মথগুলো । যেহেতু দূষণের কারণ এর রং পরিবর্তন হয়ে কালচে হয়ে গেল, সেহেতু ফিকে ধরনের মথগুলো ধরা পড়তে লাগল ।

তো বিবর্তনবাদীরা মনে করে, এই ঘটনা তাদের বিবর্তনবাদের প্রমাণ । তারা খুব আনন্দের সাথে এই ঘটনা মানুষকে বলে বেড়ায় । কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, এই ঘটনা কোনভাবে বিবর্তনবাদের পক্ষে প্রমাণ নয় । এই ঘটনা কি প্রমান করে যে মথগুলো বিবর্তিত হয়ে ভিন্ন কোন প্রজাতির উদ্ভব ঘটিয়েছে ? না, বরং কালচে এবং ফিকে রঙের মথ যেমন শিল্প বিপ্লবের পূর্বে ছিল, তেমনই শিল্প বিপ্লবের পরেও তাদের অস্তিত্ব ছিল । দূষণের কারণে কেবল তাদের পরিবর্তন ঘটেছে মাত্র । এটা কোনভাবেই বিবর্তন বা প্রাকৃতিক নির্বাচনের পক্ষে প্রমাণ হতে পারে না ।

যদি মথগুলোর নতুন অঙ্গ-প্রতঙ্গ গজাত, তাদের জিনে নতুন তথ্য যোগ হতো, কেবল তখনই এটা বিবর্তনবাদের পক্ষে প্রমাণ বলে চালানো যেত । কিন্তু বিবর্তনবাদীরা এই ঘটনাকে বিবর্তনবাদ এবং প্রাকৃতিক নির্বাচনের পক্ষে জোরালো প্রমাণ হিসেবে চালায় । সাধারণ মানুষকে দিনে দুপুরে তারা ঘোল খাওয়ানোর চেষ্টা করে ।

তাহলে দেখা গেল ডারউইন প্রস্তাবিত পদ্ধতি ‘প্রাকৃতিক নির্বাচন’ প্রজাতিতে নতুন ও সম্পূর্ণ ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের আগমন ব্যাখ্যা করতে ব্যর্থ । অর্থাৎ ভুল প্রমাণিত হলো । প্রাকৃতিক নির্বাচন যেকোনোভাবেই নতুন প্রজাতির উদ্ভব করতে পারে না, সেটা প্রমাণিত হবার পরেই তো বিবর্তনবাদ তত্ত্বের তল্পিতল্পা সহ জাদুঘরে চলে যাবার কথা । কিন্তু না । বিবর্তনবাদের প্রাথমিক প্রস্তাবনা ভুল প্রমাণিত হবার পরেও বিবর্তনবাদ বহাল তবিয়তেই বিজ্ঞানমহলে বর্তমান । কিন্তু কেন ? ওই যে, বস্তুবাদ । বস্তুবাদকে বাঁচাতে হলে বিবর্তনবাদের চেয়ে ভালো কোন দাবার চাল আর কিছুই নেই । সেজন্য যেভাবেই হোক এই বিবর্তনবাদকে বাঁচাতেই হবে । নাস্তিক জিনতত্ত্ববিদ Richard C. Lewontin -এর ভাষায়,

“বিজ্ঞান ও অতিপ্রকৃতির মাঝে আসল দ্বন্দ্বকে বোঝার চাবি হলো কমনসেন্সবিরোধী বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা মেনে নিতে আমাদের সদিচ্ছার দিকে তাকানো । যদিও বিজ্ঞানের কিছু মতবাদ সুস্পষ্টভাবে হাস্যকর, যদিও এটি জীবন ও সাস্থ্যের ব্যাপারে নানা উচ্চাভিলাষী প্রতিশ্রুতি রক্ষায় ব্যর্থ হয়, যদিও বৈজ্ঞানিক মহল অপ্রমানযোগ্য কেবলই (শিশুতোষ) গল্প (যেমন প্রাকৃতিক বিষয়ের কিছু বিষয়) মেনে নিতে সহিষ্ণু তবুও আমরা বিজ্ঞানের পক্ষ নেই । কারণ আমরা আগে থেকে বস্তুবাদের নিকট প্রতিশ্রুতিবদ্ধ । ব্যাপারটা এমন নয় যে, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিও প্রতিষ্ঠানগুলো বিস্ময়কর জগৎ সম্পর্কে একটি বস্তুবাদী ব্যাখ্যা গ্রহনে কোন না কোনভাবে আমাদের বাধ্য করে । বরং, পক্ষান্তরে (বস্তুবাদের প্রতি) পূর্ব থেকে আনুগত্যের কারণে আমরা বাধ্য হই (জগত অনুসন্ধানের) এমন উপকরণ ও কিছু ধারনা তৈরিতে যা বস্তুবাদী ব্যাখ্যায় জন্ম দেয় । সে ব্যাখ্যা যতই কাণ্ডজ্ঞানহীন হোক না কেন, অনভিজ্ঞদের জন্য যতই দুর্বল হোক না কেন । উপরন্তু, বস্তুবাদই হল কারন অকাট্য কারন আমরা (আমাদের চিন্তার) দরজায় ঐশ্বরিক পদক্ষেপকে অনুমোদন করতে পারি না ।

১. রাফান আহাম্মেদ, বিশ্বাসের যৌক্তিকতা, পৃষ্ঠা ৫১

এ কারণে বিবর্তনবাদকে বাঁচাতে পরে বিবর্তনবাদী আরো নতুন নতুন কিছু ফর্মুলা পেশ করেছে । এরকম কয়েকটি ফর্মুলাগুলো নিয়ে আমরা এখন আলোচনা করব, ইনশাল্লাহ ।

‘প্রাকৃতিক নির্বাচন’ পদ্ধতির অসারতা এবং বিংশ শতাব্দীতে বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব কল্যাণে ডিএনএ আরএনএ এর আবিষ্কার, মলিকুলার লেভেলে ব্যাপক অগ্রগতির ফলে ডারউইনের ‘প্রাকৃতিক নির্বাচন’ পদ্ধতি যখন অসহায় হয়ে ওঠে, তখন বিবর্তনবাদকে বাঁচাতে মরিয়া হয়ে ওঠে বিবর্তনবাদীরা । বিবর্তনবাদকে কিভাবে রক্ষা করা যায় এ ব্যাপারে তারা শলাপরামর্শের আয়োজন করে । ১৯৪১ সালে Geological society of America কর্তৃক আয়োজিত এক সভায় বিবর্তনবাদী বিজ্ঞানীরা একত্র হলেন । তাদের মধ্যে ছিলেন Ernst Myar, Julian Huxley, George Gaylord simpson, Glenn L. Jepsen , Ronald Fisher, Sewall Right সহ প্রমুখ । উদ্দেশ্য ছিল, বিবর্তনবাদকে মেরামত করা ।

তারা সবাই মিলে নতুন একটি পদ্ধতি দাঁড় করালেন । তারা প্রাকৃতিক নির্বাচনকে তো বেশ রাখলেনই, সাথে বললেন Random Mutation তথা এলোমেলো পরিবর্তনের ফলে একটি প্রাণীর জিনে নতুন নতুন তথ্য যোগ হয় । এসব নতুন তথ্যকে তারা নাম দিয়েছে Advantageous Mutation বা ‘লাভজনক পরিবর্তন’ । অর্থাৎ প্রাণীদের জিনে মিউটেশনের ফলে নতুন নতুন তথ্য যোগ হওয়ার ফলে একসময় দেখা যায় যে, ওই প্রাণীর মধ্যে নতুন নতুন বৈশিষ্ট্য চলে আসে । তখন সেই প্রাণীটা অন্য নতুন কোনো প্রজাতিতে রূপান্তরিত হয় ।

আরেকটু ক্লিয়ার করি । ধরুন, একটি পাখি । এই পাখির জিনের পাখিটার উড়ার, খাওয়ার, তাকানোর সবরকম জেনেটিক তথ্য আছে । পাখিটা সে মতেই উড়ে, খায়, দেখে । এখন যদি পাখিটার জিনের মিউটেশন (পরিবর্তন) ঘটে, তাহলে সেই পাখিটার জিনোমে তথ্যের পরিবর্তন ঘটবে । দেখা যাবে পাখিটার মধ্যে জলচর কোন প্রাণীর বৈশিষ্ট্য যোগ হয়ে গেছে । তখন পাখিটা তখন পাখি থেকে জলচর কোন প্রাণীতে পরিণত হবে । মোটামুটি বিবর্তনবাদীদের প্রস্তাবিত Random Mutation বা এলোমেলো পরিবর্তনের এটাই সারমর্ম । এটাকে বলা হয়, The moderation synthetic evolution theory । আর এটার প্রবক্তাদের বলা হয় Neo-Darwinist ।

কিন্তু তাদের প্রস্তাবিত সেই Random Mutation বা এলোমেলো পরিবর্তনের পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই । এ যাবতকালে গবেষনালব্ধ সকল তথ্য-উপাত্ত এটাই প্রমাণ করে যে, লাভজনক মিউটেশন বা Advantageous Mutation বলতে কিছু আসলে নেই । মিউটেশন কখনোই লাভজনক হয় না । প্রাণীর জিনের মিউটেশন ঘটলে তা কখনোই কোনো উপকার করে না; বরং ক্ষতি করে । মিউটেশনকে একটি দুর্ঘটনার সাথে তুলনা করা যায় । দুর্ঘটনা যেমন কখনোই নতুন কিছু সৃষ্টি করতে পারে না ধ্বংস ছাড়া, মিউটেশনও কোন ক্ষতি ছাড়া নতুন কোন কিছুই সৃষ্টি করতে পারে না ধ্বংস ছাড়া । ভূমিকম্পের ফলে বিল্ডিং যেভাবে ধসে যায়, মিউটেশনও সেরকম ভাঙ্গার কাজ করে প্রাণীর জিনে । আর এর প্রভাব পড়ে প্রানির শরীরে ।

এলোমেলো পরিবর্তন কখনোই সুশৃঙ্খল কোন কিছু সৃষ্টি করতে পারে না । B.G Ranganathan এটাকে উল্লেখ করেছেন এভাবে,

“প্রথমত, খাঁটি মিউটেশন প্রকৃতিতে খুব বিরল । দ্বিতীয়ত, প্রায় সমস্ত মিউটেশনই ক্ষতিকর, যেহেতু তা নিজের জিনের গঠনের সুনিয়ন্ত্রিত পরিবর্তনের এলোমেলো পরিবর্তন । অত্যন্ত সুসজ্জিত কোনো সিস্টেমের মধ্যে এলোমেলো পরিবর্তন ভালো করার পরিবর্তে সব সময় খারাপটাই করে । উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, অত্যন্ত সুবিন্যস্তভাবে তৈরি দালানে যদি ভূমিকম্প আঘাত করে, তাহলে দালানটির কাঠামোতে একটি এলোমেলো পরিবর্তন ঘটে যাবে, যাতে দালানটির উন্নয়ন সাধিত হবার কোন সম্ভাবনাই নাই ।”

এখন পর্যন্ত উপকারী মিউটেশনের কোন প্রমাণ কেউ দেখাতে পারেনি । বরং, একথা প্রমাণিত হয়েছে যে সব ধরনের মিউটিশনই ক্ষতিকর । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহৃত পারমাণবিক অস্ত্রের ঘটিত সম্ভাব্য মিউটেশন সম্পর্কে তদন্ত করতে গিয়ে Committee on genetic effects of Atomic radiation একটি রিপোর্ট তৈরি করে । এ রিপোর্ট সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বিবর্তনবাদী বিজ্ঞানী Warren Weaver বলেছেন,

“অনেকেই এ কথা শুনে আশ্চর্য হয়ে যাবে যে, বাস্তবে আজ পর্যন্ত জানা মিউটেশনের শিকার সকল জিনই ক্ষতিকর । অথচ মিউটেশন হচ্ছে বিবর্তন প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ । তাহলে মিউটেশনের মাধ্যমে কিভাবে ভাল ফলাফল বা প্রাণী উন্নতর অবস্থা প্রাপ্ত হবে, যখন সকল মিউটেশনই ক্ষতিকর”

বিগত কয়েক দশক ধরে বিবর্তনবাদীরা ‘সফল মিউটেশন’ ঘটানোর জন্য প্রাণপণে চেষ্টা করে যাচ্ছে । তারা বছরের পর বছর ধরে গবেষণাগারে মাছির উপর মিউটেশন চালিয়ে যাচ্ছে । মাছির উপর মিউটেশন চালানোর কারন এটাই যে, মাছি খুব দ্রুত বংশ বিস্তার করতে পারে । প্রতি ১১ দিনে মাসি নতুন প্রজন্মের জন্ম দিতে পারে । দীর্ঘ সময় ধরে বিবর্তনবাদীরা মাছির উপরে মিউটেশনের কাজ চালিয়ে মাছির একটি নতুন প্রজাতি তো দূরের কথা, এখন পর্যন্ত একটা নতুন এনজাইমও এখন পর্যন্ত তৈরি করে দেখাতে পারেনি ।

মাছির উপর গবেষণা করে মিউটেশনের মাধ্যমে নতুন প্রজাতি সৃষ্টিতে ব্যর্থ হয়ে গবেষক Michel Pitman বলেছেন,

“মর্গান, গোল্ডসচিমিডট, মুলারসহ আরো অনেক প্রজনন-শাস্ত্রবিদ মাছির বিভিন্ন প্রজাতির উপরে পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়েছেন । তারা মাছের বিভিন্ন প্রজাতিকে খুব গরম, ঠান্ডা, আলো, অন্ধকার, রাসায়নিক বিকিরনের মধ্যে রেখেছেন । সকল প্রকারের মিউটেশন সংঘটিত হয়েছে, যার সবই বস্তুত ক্ষতিকারক । এটাকে কি মানব সৃষ্ট বিবর্তনের প্রমাণ বলা যাবে ? একদম না । উৎপাদিত (মিউটেশনের ফলে বিকৃত) প্রাণীগুলোর অল্পই হয়তো বোতলের বাইরে বেঁচে থাকতে পারবে । কিন্তু বাস্তবতা এই যে, মিউটেশনের ফলে উৎপাদিত প্রয়োজনীয় মারা যায়, বংশবিস্তারে অক্ষম হয়ে পড়ে অথবা বংশানুক্রমে পূর্বের অবস্থায় ফিরে যায় ।”

মাছির মধ্যে মিউটেশনের যে প্রভাব, মানুষের মধ্যেও ঠিক একই রকম প্রভাব দেখা গেছে । মানুষের মধ্যেও আজ পর্যন্ত উপকারী মিউটেশনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি । মানুষের মধ্যে ঘটা মিউটেশনের ফলাফল হিসেবে যা পাওয়া গেছে আজ পর্যন্ত তাহলো বিকলাঙ্গতা, বৈকল্য বা জন্মগত মানসিক সমস্যা, ডাউন সিন্ড্রোম (একটি জিনগত রোগ), আলবিনিজম (ধবলজাতীয় রোগবিশেষ), বামনত্ব অথবা ক্যান্সার ।

১. Warren Weber, “genetic effects of atomic radiation”, science, vol-123, June 29 1956

২. Gordon R. Taylor, The great evolution mystery, P-48

৩. Michael Pitman, Adam and evolution London: river publishing, 1984, P-70

মিউটেশনের ফলে মানুষকে এরকম ভয়াবহ রোগগুলো পেয়ে বসেছে । কিন্তু এই মিউটেশনকে বিবর্তনবাদীরা বিবর্তনের পক্ষে প্রমাণ বলে চালিয়ে দেয় । কিন্তু এ কথা বলে নেওয়া জরুরি যে, যা-ই ক্ষতিকর বা ক্ষতির কারণ, তা কখনোই বিবর্তনের পক্ষে প্রমাণ হতে পারে না । কেননা, বিবর্তনের মূল সারমর্মই হল বেঁচে থাকার উপযুক্ততা লাভ করা । অর্থাৎ বেঁচে থাকার জন্য আগের অবস্থার চেয়ে ভাল অবস্থায় যাওয়া । কিন্তু আমরা দেখতে পেলাম যে বাস্তবে ঘটনা ভিন্ন । মিউটেশন কখনোই উপকারী কোন কিছু ঘটাতে পারে না । মিউটেশন যা ঘটায় তার সবটাই ক্ষতিকর বলে প্রমাণিত হয়েছে । সুতরাং, বিবর্তনবাদীরা প্রথম প্রজাতির উদ্ভবের জন্য যে মিউটেশনের কথা বলে, তাও ভুল প্রমাণিত হলো ।

এরপর বিবর্তনবাদীরা যখন বুঝতে পারল যে কথিত ধীর এবং ক্রমবিবর্তন অসম্ভব এবং এই প্রক্রিয়ার মিউটেশন কখনোই নতুন প্রজাতির উদ্ভাবনে সক্ষম নয়, তখন বিবর্তনবাদী বিবর্তনবাদকে আরো ঢেলে সাজাবার প্রয়োজন অনুভব করলো । বিবর্তনবাদকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করতে এবার এগিয়ে আসেন দুই প্রথিতযশা বিজ্ঞানী, আমেরিকান জীবাশ্মবিদ Niles Elredge এবং Stephen Jay Gould । তারা খুব ভালোভাবে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে, নব্য ডারউইনবাদিরা যে ধীর এবং ক্রমবিবর্তনের কথা বলে, সেটা আদতে অসম্ভব । তারা ফসিল রেকর্ড ঘেটে বুঝতে পারলেন, প্রকৃতিতে প্রাণীর আগমন ধীরগতিতে নয়, বরং আকস্মিকভাবে । অর্থাৎ প্রাণীর জিনে মিউটেশনের ফলে আস্তে আস্তে এক প্রজাতি থেকে অন্য প্রজাতির উদ্ভবের যে কল্পকাহিনী বিবর্তনবাদীরা আমাদের গেলানোর চেষ্টা করেন, সেটাও ভুল । তারা মনে করেন, প্রকৃতিতে প্রাণীর আগমন কোন ধীর প্রক্রিয়া নয়, বরং হঠাৎ করেই । এখন যদি হঠাৎ করে প্রাণীর আগমন হয়, তাহলে এতদিন ধরে বিবর্তনবাদীদের আনিত, প্রস্তাবিত সকল প্রস্তাবনাই বাতিল হয়ে যায় । প্রাণীর হঠাৎ আগমনের পেছনে তখন কেবল একটাই যুক্তিযুক্ত, বিজ্ঞানসম্মত উত্তর থাকতে পারে । সেটা হলো, কোনো ডিজাইনারের উপস্থিতি । সেই ডিজাইনার নিঃসন্দেহে স্রষ্টা । কিন্তু বস্তুবাদী বিজ্ঞান আর তার ধারকবাহকেরা যখন হলফ করেই ফেলেছে যে, কোনভাবেই তারা স্রষ্টাতত্ত্বকে বিজ্ঞানের অন্দরমহলে প্রবেশ করতে দেবে না, তখন কিভাবে তারা প্রাণীর আকস্মিক আগমনের জন্য স্রষ্টাকে স্বীকার করে নেবে ?

না । তারা যখন সেবারও ব্যর্থ হলো, তখন তারা নতুন আরও একটি প্রস্তাব নিয়ে হাজির হল আমাদের সামনে । বিজ্ঞানী Niles Elredge এবং Stephen Jay Gould কর্তৃক প্রস্তাবিত সেই পদ্ধতির নাম, Punctuated Equilibrium । এই পদ্ধতি আগের The moderation synthetic evolution theory থেকে কিছুটা আলাদা ।Moderation synthetic evolution theory মতে, প্রাণীর জিনে মিউটেশনের ফলে আস্তে আস্তে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের প্রকাশ পায় । যেমন, একটি মাছের জিনে মিউটেশনের ফলে আস্তে আস্তে উভচর বা স্থলচর প্রাণীর বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য লাভ করে । এভাবে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য লাভ করার ফলে একটা সময় পরে সেটা ভিন্ন একটা প্রজাতিতে রূপান্তরিত হয় ।

কিন্তু Punctuated Equilibrium এরচেয়ে একটু আলাদা । তারা প্রাণীর জিনে মিউটেশনের ফলে আস্তে আস্তে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য আসার ব্যাপারটাকে স্বীকার করে না । তাদের মতে, প্রাণীর জিনে আকস্মিক বড় ধরনের মিউটেশনের ফলে খুব অল্প সময়ে সম্পূর্ণ নতুন প্রজাতির উদ্ভব ঘটে । অর্থাৎ, একটি প্রজাতির জিনে অল্প কয়েক প্রজন্মের অসংখ্য ‘সুনির্দিষ্ট’ মিউটেশন এলোমেলোভাবে হয় । ফলে উক্ত প্রজাতি থেকে স্বল্প সময়ে অনেকগুলো ভিন্ন প্রজাতির আবির্ভাব ঘটে । অতঃপর উক্ত নতুন প্রজাতিগুলো অনেকদিন টিকে থাকে ।

অর্থাৎ, তাদের দাবি অনুযায়ী, সরীসৃপ থেকে পাখি এসেছে অসংখ্য রেনডম মিউটেশন তথা এলোপাথাড়ি পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে, অল্প কয়েক প্রজন্মে । চিন্তা করে দেখুন, মাছি যেহেতু অল্প সময়ে বংশবৃদ্ধি করতে পারে, এ পদ্ধতি অনুযায়ী মাছি একটি প্রজাতিতে মিউটেশন ঘটাতে ঘটাতে অল্প কিছু প্রজম্মেই নতুন পোকার জন্ম নেওয়ার কথা । অথচ মাছির ওপর বছরের পর বছর এলোপাতাড়ি মিউটেশন পরীক্ষা চালিয়ে উপকারী কোনো পরিবর্তন লক্ষ করা যায়নি, নতুন বৈশিষ্ট্যযুক্ত প্রজাতি আগমন তো অনেক পরের বিষয় ।

এ যেন ঠিক রূপকথার সেই গল্পের মত যেখানে গল্পের ব্যাঙ একদিন হঠাৎ করে রাজকুমারের পরিণত হয় । আসলে বিবর্তনবাদীদের প্রস্তাবিত গল্প আর রূপকথার গল্পের মধ্যে তেমন একটা পার্থক্য নেই । কোন কোন জায়গায় তাদের গল্পগুলো রূপকথার গল্পকেও হার মানায়  ।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, সময়ের বিবর্তনে বিবর্তনবাদীদের গল্পগুলোও বিবর্তিত হয় ।

তারা আজকে এক পদ্ধতির কথা বলে তো, আগামীকাল আরেক পদ্ধতি । তাদের নিজেদের মধ্যেই তাদের প্রস্তাবিত, আনীত পদ্ধতি নিয়ে ঐক্যমত্য নেই । তারা যখন দেখে যে, আধুনিক বিজ্ঞানের নতুন নতুন আবিষ্কার, মলেকুলার লেভেলের বিস্ময়কর সব উদ্ভাবন তাদের প্রস্তাবিত গল্পগুলোর বিরোধী হয়ে দাঁড়ায়, ঠিক তখনই তারা এক পদ্ধতি থেকে আরেক পদ্ধতিতে লাফ দেয়।

আরজ আলী সমীপে–বইটির সকল লেখনী পড়তে নিন্মের লিঙ্ক সমূহে ভিজিট করুনঃ

এই ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে তাহলে দয়া করে ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ একে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন