মূল:বিশ্বনবী প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের আদর্শ

সিরাজুল ইসলাম আলী আকবর

সম্পাদনা: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ

যাকারিয়া আলী হাসান তৈয়ব

এ পর্যায়ে কুরআন মজিদ থেকে কিছু আয়াত  উদ্ধৃত করার প্রয়াস পাব, যা থেকে অকাট্যভাবে প্রমাণিত হবে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের রিসালাত ছিল বিশ্বজনীন, ছিল সমগ্র বিশ্বের সকল শ্রেণির সকল পেশার মানুষের জন্য। তা যেমন কোনো বিশেষ দেশ বা অঞ্চল কিংবা ভাষা, বর্ণ ও বংশের লোকদের জন্য ছিল না, তেমনি কেবল এক কালের লোকদের জন্যও ছিল না। তা ছিল সারা পৃথিবীর সকল কালের, সকল মানুষের জন্য সমানভাবে গ্রহণীয় ও অনুসরণীয়। তিনি সকল মানুষের সার্বিক কল্যাণ বিধানের জন্যই প্রেরিত হয়েছিলেন। এ পর্যায়ে নিম্নে কুরআন মজীদের আয়াতসমূহ কয়েকটি ভাগে উদ্ধৃত করা হচ্ছে:

প্রথমত: বহু সংখ্যক আয়াত স্পষ্ট ভাষায় বলছে যে, তাঁর রিসালাতের পরিধি সারা বিশ্বব্যাপী। তিনি সর্ব শ্রেণীর মানুষের প্রতিই প্রেরিত রাসূল। আল্লাহ তাঁকে সমগ্র বিশ্বলোকের রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছেন।

﴿قُلۡ يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ إِنِّي رَسُولُ ٱللَّهِ إِلَيۡكُمۡ جَمِيعًا﴾ [الاعراف: ١٥٨] 

‘বল, হে মানুষ আমি তোমাদের সবার প্রতি আল্লাহর রাসূল। [সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ১৫৮]

﴿وَمَآ أَرۡسَلۡنَٰكَ إِلَّا كَآفَّةٗ لِّلنَّاسِ بَشِيرٗا وَنَذِيرٗا﴾ [سبا: ٢٨] 

‘আর, আমি তো কেবল তোমাকে সমগ্র মানব জাতির জন্য সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে প্রেরণ করেছি”। [সূরা সাবা, আয়াত: ২৮]

﴿وَأَرۡسَلۡنَٰكَ لِلنَّاسِ رَسُولٗاۚ وَكَفَىٰ بِٱللَّهِ شَهِيدٗا ٧٩﴾ [النساء: ٧٩] 

‘আর আমরা তোমাকে মানুষের জন্য রাসূলরূপে প্রেরণ করেছি আর সাক্ষী হিসেবে আল্লাহ যথেষ্ট”। [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৭৯]

﴿وَمَآ أَرۡسَلۡنَٰكَ إِلَّا رَحۡمَةٗ لِّلۡعَٰلَمِينَ ١٠٧﴾ [الانبياء: ١٠٧] 

‘আর আমি তো তোমাকে বিশ্ববাসীর জন্য রহমত হিসেবেই প্রেরণ করেছি”। [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ১০৭]

﴿تَبَارَكَ ٱلَّذِي نَزَّلَ ٱلۡفُرۡقَانَ عَلَىٰ عَبۡدِهِۦ لِيَكُونَ لِلۡعَٰلَمِينَ نَذِيرًا ١﴾ [الفرقان: ١] 

“তিনি বরকতময় যিনি তার বান্দার ওপর ফুরকান নাযিল করেছেন, যেন সে জগতবাসীর জন্য সতর্ককারী হতে পারে”। [সূরা আল-ফুরকান, আয়াত: ১]

﴿وَأُوحِيَ إِلَيَّ هَٰذَا ٱلۡقُرۡءَانُ لِأُنذِرَكُم بِهِۦ وَمَنۢ بَلَغَۚ﴾ [الانعام: ١٩] 

‘আর এ কুরআন আমার কাছে ওহী করে পাঠানো হয়েছে যেন তোমাদেরকে এবং যার কাছে এটা পৌঁছবে তাদেরকে এর মাধ্যমে আমি সতর্ক করি”। [সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ১৯]

﴿ هُوَ ٱلَّذِيٓ أَرۡسَلَ رَسُولَهُۥ بِٱلۡهُدَىٰ وَدِينِ ٱلۡحَقِّ لِيُظۡهِرَهُۥ عَلَى ٱلدِّينِ كُلِّهِۦ وَلَوۡ كَرِهَ ٱلۡمُشۡرِكُونَ ٩ ﴾ [الصف: ٩] 

“তিনিই তাঁর রাসূলকে হিদায়াত ও সত্য দীন দিয়ে প্রেরণ করেছেন, যাতে তিনি সকল দীনের ওপর তা বিজয়ী করে দেন। যদিও মুশরিকরা তা অপছন্দ করে”। [সূরা আস-সাফ, আয়াত: ৯]

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ قَدۡ جَآءَكُمُ ٱلرَّسُولُ بِٱلۡحَقِّ مِن رَّبِّكُمۡ فَ‍َٔامِنُواْ خَيۡرٗا لَّكُمۡۚ﴾ [النساء: ١٧٠] 

“হে মানুষ! এই রাসূল তোমাদের নিকট তোমাদের রবের নিকট থেকে সত্য বিধান নিয়ে এসেছে। অতএব, তোমরা (তার প্রতি) ঈমান আন, তা তোমাদের জন্য অতীব কল্যাণকর”। [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১৭০]

﴿الٓرۚ كِتَٰبٌ أَنزَلۡنَٰهُ إِلَيۡكَ لِتُخۡرِجَ ٱلنَّاسَ مِنَ ٱلظُّلُمَٰتِ إِلَى ٱلنُّورِ بِإِذۡنِ رَبِّهِمۡ إِلَىٰ ٰطِ ۡعَزِيزِ ۡحَمِيدِ ١﴾ [ابراهيم: ١] 

“আলিফ লাম রা। এই কিতাব, যা আমরা তোমার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে তুমি মানুষকে তাদের রবের অনুমতিক্রমে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আন, পরাক্রমশালী সর্বপ্রশংসিতের পথের দিকে”। [সূরা ইবরাহীম, আয়াত: ১]

﴿هَٰذَا بَيَانٞ لِّلنَّاسِ وَهُدٗى وَمَوۡعِظَةٞ لِّلۡمُتَّقِينَ ١٣٨ ﴾ [ال عمران: ١٣٨] 

“এই কিতাব সমগ্র মানুষের জন্য বর্ণনা, হিদায়াতের বিধান এবং তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য উপদেশ”। [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৩৮]

কেবল এই ক’টি আয়াতই নয়, আরও বহু সংখ্যক আয়াত রয়েছে, যা সুষ্পষ্ট ও অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, এই কুরআন যেমন সকল মানুষের জন্য, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়াতও তেমনি সকল মানুষের জন্য। এ পর্যায়ের কিছু আয়াত এখানে উদ্ধৃত করছি,

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ ٱعۡبُدُواْ رَبَّكُمُ ٱلَّذِي خَلَقَكُمۡ وَٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِكُمۡ لَعَلَّكُمۡ تَتَّقُونَ ٢١﴾ [البقرة: ٢١] 

“হে মানুষ, তোমরা সকলে তোমাদের সেই রবের দাসত্ব কবুল কর (ইবাদত কর)। যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এবং সৃষ্টি করেছেন তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে। যাতে তোমরা মুত্তাকী হতে পার”। [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২১]

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ كُلُواْ مِمَّا فِي ٱلۡأَرۡضِ حَلَٰلٗا طَيِّبٗا وَلَا تَتَّبِعُواْ خُطُوَٰتِ ٱلشَّيۡطَٰنِۚ إِنَّهُۥ لَكُمۡ عَدُوّٞ مُّبِينٌ ١٦٨﴾ [البقرة: ١٦٨] 

“হে মানুষ! তোমরা আহার কর পৃথিবীতে যা কিছু আছে তা থেকে পবিত্র হালাল, আর শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য প্রকাশ্য শত্রু”। [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৬৮]

উদ্ধৃত আয়াতদ্বয়ে সুস্পষ্ট ভাষায়: ‘হে মানুষ’ বলে সম্বোধন করা হয়েছে। ফলে এ সম্বোধনের আহ্বান মানুষ বলে পদবাচ্য সকলেরই জন্য, সকলের প্রতি। বিশেষ কোনো অংশের মানুষের জন্য নয়। এতে এ কথা প্রমাণিত হয়, কুরআন ও মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে দীন পেশ করেছেন তা সকল মানুষের জন্য যেমন, তেমনি তার নবুওয়াতও সর্বকালের সকল মানুষের জন্য। ইসলাম বিশ্বজনীন দীন। যদি তা না হত, তাহলে কুরআনে এরূপ সম্বোধন উদ্ধৃত হওয়ার কোনো তাৎপর্যই থাকত না। অথচ কুরআনের ষোলটি আয়াতে ‘হে মানুষ’ বলে সম্বোধন করা হয়েছে।

তাছাড়া ‘আহলে কিতাব’ অর্থাৎ ইয়াহূদী ও খৃষ্টানদেরও সম্বোধন করা হয়েছে কুরআন মাজীদের মোট বারটি আয়াতে। ওরা তো কোনো না কোনো ধর্মের প্রতি বিশ্বাসী ছিল; আসমানী কিতাবের ধারক হিসেবে পরিচিতও ছিল ওরা। ওদেরকে সরাসরি সম্বোধন করে রাসূলের প্রতি ঈমান আনার আহ্বান জানানোর কি অর্থ হতে পারে? তাতে এটাই বুঝা যায় যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবী রাসূল হিসেবে প্রেরিত হওয়ার পর নির্বিশেষে সকল মানুষেকে তারই প্রতি ঈমান আনতে হবে, কেননা পূর্বের সব নবী ও রাসূলের নবুওয়াত ও রিসালাতের মিয়াদ শেষ হয়ে গেছে। অতপর অন্য কারোর নবুওয়াত বা রিসালাত চলতে পারে না।

উপরন্তু কুরআনের বহু সংখ্যক আয়াতে সাধারণ বিষয়ের অবতারণা করে বহু সংখ্যক বিধান পেশ করা হয়েছে; সে বিধান বিশেষ কোনো বর্ণ, বংশ বা দেশের লোকদের জন্য নয়। এ থেকেও প্রমাণিত হয় যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত বসবাসকারী সকল মানব সমাজের সংশোধন ও পুনর্গঠনের দায়িত্ব নিয়ে এসেছিলেন এবং তাঁর রিসালাত কোনো বিশেষ সীমার মধ্যে সীমিত বা সংকুচিত ছিল না। এ পর্যায়ের কতিপয় আয়াত:

﴿وَلِلَّهِ عَلَى ٱلنَّاسِ حِجُّ ٱلۡبَيۡتِ مَنِ ٱسۡتَطَاعَ إِلَيۡهِ سَبِيلٗاۚ﴾ [ال عمران: ٩٧] 

“আল্লাহর জন্য (আল্লাহর) ঘরের হজ করা সাধারণভাবে সব মানুষেরই কর্তব্য- যারা সেই পর্যন্ত যাতায়াতে সামর্থ্যবান”। [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৯৭]

এ আয়াতের বক্তব্য হলো, যে মানুষ আল্লাহর ঘর পর্যন্ত যাতায়াতের জন্য প্রয়োজনীয় শারীরিক ও অর্থনৈতিক সামর্থ্যের অধিকারী হবে, তাকেই এই ঘরের হজ করতে হবে। আল্লাহর জন্য তা একান্তই কর্তব্য এবং এ কর্তব্য উক্ত গুণের অধিকারী প্রতিটি মানুষেরই ক্ষেত্রে প্রযোজ্য-সে মানুষ যে দেশের, যে বংশের ও যে কালেরই হোক না কেন। কুরআনের আয়াতে এই কর্তব্য কেবল আরবদের জন্য বা সে কালের লোকদের জন্য, এমন কথা বলা হয় নি।

﴿وَٱلۡمَسۡجِدِ ٱلۡحَرَامِ ٱلَّذِي جَعَلۡنَٰهُ لِلنَّاسِ سَوَآءً ٱلۡعَٰكِفُ فِيهِ وَٱلۡبَادِۚ﴾ [الحج: ٢٥] 

“মসজিদে হারাম, যা আমরা সমস্ত মানুষের জন্য বানিয়েছি, তথায় স্থানীয় বাসিন্দা ও বহিরাগতদের অধিকার সম্পূর্ণরূপে সমান”। [সূরা আল-হাজ, আয়াত: ২৫]

﴿وَمِنَ ٱلنَّاسِ مَن يَشۡتَرِي لَهۡوَ ٱلۡحَدِيثِ لِيُضِلَّ عَن سَبِيلِ ٱللَّهِ بِغَيۡرِ عِلۡمٖ﴾ [لقمان: ٦] 

“লোকদের মধ্যে এমন অনেকেই আছে যারা মন ভুলানো কথা খরিদ করে আনে, যেন সঠিক জ্ঞান ব্যাতিরেকেই আল্লাহর পথ থেকে লোকদের ভ্রষ্ট করা যায়”। [সূরা লুকমান, আয়াত: ৬]

এখানে কথার ধরন যাই হোক, সমস্ত মানুষের জন্য আল্লাহর পথ থেকে গুমরাহকারী যে কোনো মনভুলানো কালাম বা কথা ক্রয় করা বা তার ব্যবহার করা ইসলামী শরী‘আতে সম্পূর্ণ হারাম এবং এ হারাম সকল মানুষের জন্য। গায়ক-গায়িকা, নৃত্যশিল্পী বা যৌন সুরসুরি দানকারী নাটক থেকে শুরু করে সকল প্রকারের অশ্লীল কাজ এ আয়াত অনুযায়ী নিষিদ্ধতার অন্তর্ভুক্ত।

কেননা আয়াতে আল্লাহর দিক থেকে মন ভুলানো যে কোনো জিনিসকে সকল মানুষের জন্যই সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

চতুর্থত: কুরআন সুস্পষ্ট ভাষায় বলছে যে, তার হিদায়াত বিশেষভাবে কোনো সমাজ বা জনসমষ্টির জন্য নয়, বিশেষ কোনো কাল বা সময়ের লোকদের জন্য নয়, বরং আসমানের নিচে জমিনে অবস্থানকারী সমস্ত মানুষের জন্য। এ প্রসঙ্গের কতিপয় আয়াত:

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ قَدۡ جَآءَكُم بُرۡهَٰنٞ مِّن رَّبِّكُمۡ وَأَنزَلۡنَآ إِلَيۡكُمۡ نُورٗا مُّبِينٗا ١٧٤﴾ [النساء: ١٧٤] 

“হে মানুষ, তোমাদের নিকট তোমাদের রবের নিকট থেকে অকাট্য দলিল এসে গেছে এবং আমরা তোমাদের প্রতি সুস্পষ্ট (আলোকবর্তিকা) নূর অবতীর্ণ করেছি”। [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১৭৪]

﴿شَهۡرُ رَمَضَانَ ٱلَّذِيٓ أُنزِلَ فِيهِ ٱلۡقُرۡءَانُ هُدٗى لِّلنَّاسِ﴾ [البقرة: ١٨٥]

“রমযান মাস যাতে নির্বিশেষে সমস্ত মানুষের জন্য হিদায়াতের বিধান হিসেবে কুরআন নাযিল হয়েছে”। [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৮৫]

﴿وَلَقَدۡ ضَرَبۡنَا لِلنَّاسِ فِي هَٰذَا ٱلۡقُرۡءَانِ مِن كُلِّ مَثَلٖ لَّعَلَّهُمۡ يَتَذَكَّرُونَ ٢٧﴾ [الزمر: ٢٧] 

“আমরা এই কুরআনে মানুষের জন্য নানা রকম ও নানা প্রকারের দৃষ্টান্ত পেশ করেছি এই আশায় যে, তারা তা থেকে উপদেশ গ্রহণ করবে”। [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ২৭]

﴿الٓرۚ كِتَٰبٌ أَنزَلۡنَٰهُ إِلَيۡكَ لِتُخۡرِجَ ٱلنَّاسَ مِنَ ٱلظُّلُمَٰتِ إِلَى ٱلنُّورِ بِإِذۡنِ رَبِّهِمۡ إِلَىٰ ٰطِ ۡعَزِيزِ ۡحَمِيدِ ١﴾ [ابراهيم: ١] 

“আলিফ লাম রা। এই গ্রন্থ তোমাদের প্রতি আমরা এ জন্যে নাযিল করেছি, যেন তুমি লোকদেরকে পুঞ্জীভুত অন্ধকারের মধ্যে থেকে আলোকের দিকে বের করে নিয়ে আসতে পার”। [সূরা ইবরাহীম, আয়াত: ১]

এ ক’টি আয়াতই জানাচ্ছে যে, কুরআন সকল মানুষের জন্য অবতীর্ণ হয়েছে। এটি সকলের জন্য আলো; অজ্ঞানতা ও পাপ পঙ্কিলতার অন্ধকার থেকে মুক্তিলাভের একমাত্র উপায় হচ্ছে এই কুরআন এবং তা বিশেষভাবে কারো জন্য নির্দিষ্ট নয়, বরং নির্বিশেষে সকল মানুষের জন্যই। এই প্রেক্ষিতে নিম্নোক্ত আয়াতাংশটি বিশেষভাবে প্রনিধানযোগ্য।

﴿وَءَاخَرِينَ مِنۡهُمۡ لَمَّا يَلۡحَقُواْ بِهِمۡۚ وَهُوَ ٱلۡعَزِيزُ ٱلۡحَكِيمُ ٣﴾ [الجمعة: ٣] 

“আর এই রাসূলের আগমন অন্যান্য সেই লোকদের জন্যও, যারা এখনো তাদের সঙ্গে এসে মিলিত হয় নি”। [সূরা আল-জুমু‘আ, আয়াত: ৩]

এই ‘অন্যান্য লোক’ বলতে কাদের বুঝানো হয়েছে? নিশ্চয় সেই সব লোক যারা উত্তরকালে কিয়ামত পর্যন্ত আরব–অনারব নির্বিশেষে এসে এই মুসলিমদের সঙ্গে ঈমানের ভিত্তিতে মিলিত হবে। ফলে এই আয়াতাংশও রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিশ্বজনীন ও চিরন্তন নবুওয়াত ও রিসালাতের কথাই প্রমাণ করছে। সেই সঙ্গে এই কথাও প্রকারান্তরে প্রমাণিত হয় যে, তার এই নবুওয়াত ও রিসালাত পৃথিবীর শেষ দিন পর্যন্ত দীর্ঘায়িত ও সম্প্রসারিত। তাঁর পর আর কোনো নবী  বা রাসূলের আগমনের কোনো সম্ভাবনাই নেই। আসার কোনো অবকাশ নেই।

এসব আলোচনার সারকথা দাঁড়াল, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের রিসালাত ও নবুওয়াতের বিশ্বজনীনতা ও সার্বজনীনতা অবশ্য স্বীকৃত। এটি না কোনো জাতীয়তা ও আঞ্চলিকতার গন্ডির মধ্যে আবদ্ধ, না কাল ও যুগের সীমা দ্বারা পরিবেষ্টিত। উপরের যে চার পর্যায়ের আয়াত উদ্ধৃত করা হয়েছে, তার প্রথম পর্যায়ের আয়াত প্রমাণ করছে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের রিসালাতের সার্বজনীনতা, দ্বিত্বীয় পর্যায়ের আয়াত প্রমাণ করছে মৌলিক ও খুটিনাটি সব ব্যাপারেই কুরআনী সম্বোধনের সাধারণত্ব, তৃতীয় পর্যায়ের আয়াত স্পষ্ট করে যে, বিভিন্ন শিরোনামের অধীনে প্রদত্ত হুকুম-আহকাম নির্বিশেষে সমস্ত মানুষের জন্য প্রযোজ্য। আর চতুর্থ পর্যায়ের আয়াত দেখাচ্ছে যে, কুরআনের হিদায়াত ও সতর্কীকরণ বিশেষ কোনো জাতি বা জনগোষ্ঠির জন্য নয়, বরং সকল মানুষের জন্য ব্যাপকভাবে।

ভিন্নতর দৃষ্টিকোণে রাসূলের সর্বজনীনতা, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের রিসালাতের সার্বজনীনতা ভিন্নতর দৃষ্টিকোণেও বিবেচ্য। এই দৃষ্টিকোণটিও ইসলামের প্রকৃতির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যশীল। বিশ্বলোক, জীবন ও মানুষ এবং আইন প্রণয়ন ও শরী‘আতের বিধান রচনার দিক দিয়েও ইসলামী দৃষ্টিকোণের ব্যাপক বিশালতা লক্ষণীয়।

বস্তুত ইসলাম তার আইন নির্ধারণ এবং মানুষের ইহকালীন ও পরকালীন কল্যাণ চিন্তায় মানবতার সেই সাধারণ প্রকৃতির ওপর সমস্ত মানব বংশের সৃষ্টি ও সঙ্ঘটন বাস্তবায়িত হয়েছে, যা মানুষের সমস্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে একেবারে অতি সাধারণ ও সকলের মধ্যেই পরিব্যাপ্ত। কেউই তার বাইরে নয়। এ দিক দিয়ে দুনিয়ার কোনো অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে অপর অঞ্চলের বা কোনো সময়কালের মানুষের সঙ্গে অপর সময়কালের মানুষের বিন্দুমাত্র পার্থক্য নেই। আর ইসলাম যখন সকল মানুষের এই অভিন্ন প্রকৃতি ও জন্মগত স্বভাবের প্রতি লক্ষ্য রেখেই বিধান পেশ করেছে, তখন সেই বিধান গ্রহণ বা পালনের দায়িত্বের দিক দিয়ে বিভিন্ন অঞ্চলে বা বিভিন্ন সময়কালের মানুষের মধ্যে পার্থক্য করা হবে কেন? কেন বলা হবে, ইসলাম কেবল অমুক এলাকার বা অমুক সময়ের লোকদের জন্য আর অমুক অমুক এলাকার অমুক অমুক লোকদের জন্য নয়? ইসলামের ব্যাপারে এই ধরনের কথা নিতান্তই যুক্তিহীন।

কেননা নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপস্থাপিত জীবন বিধান দীন ইসলামের ব্যাপক ভিত্তিকতা ও দিক বৈচিত্রের প্রতি লক্ষ্য করলেই বুঝতে পারা যায় যে, মানুষের জীবনে যত দিক, যত বিভাগ ও যত সমস্যা থাকতে পারে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কোনো একটি দিক, বিভাগ বা সমস্যাই বাদ দিয়ে কথা বলেন নি, বরং সকল দিক, বিভাগ ও সমস্যা সম্পর্কেই কথা বলেছেন। এ দিকটাও অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সার্বজনীন- সকল মানুষের জন্যই নবী ও রাসূল ছিলেন। কোনো বিশেষ শ্রেণির বা বিশেষ সমস্যায় জর্জরিত জনগণের সমস্যা সমাধানের জন্য তাঁর আগমন হয়নি।

এ বিষয়ে যত চিন্তাই করা হবে, নিঃসন্দেহে দেখা যাবে যে, ইসলাম এক পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। তার মহামূল্যবান শিক্ষা, সূক্ষ্ম তত্ত্ব এবং আইনগত রীতিনীতি বারবার বিবেচনা করলেও কিছুতেই বুঝা যাবে না যে, তা বিশেষ কোনো যুগের বা এলাকার জন্য নির্দিষ্ট। কারণ, বিশেষ বা নির্দিষ্ট শরী‘আতের রচিত বিধানের বিশেষ কতগুলো চিহ্ন বা নিদর্শন থাকে। প্রথমত: তাতে থাকবে বিশেষ পরিবেশগত বিশেষত্ব কিংবা স্থানীয় পরিবেশগত বিশেষত্ব- এভাবে যে, সেই পরিবেশ বদলে গেলে কিংবা সেই বিশেষত্ব না থাকলে বা সেই বৈশিষ্ট্য তিরোহিত হলে সেই জীবন বিধান কার্যকর হবে না, তদনুযায়ী জীবন যাপন করাও সম্ভব হবে না। তখন তা মরীচিকায় পরিণত হয়। তার কল্যাণকর ব্যাবস্থাদিও ক্ষতিকর প্রমাণিত হয়। কিন্তু ইসলামে সে রকম চিহ্ন বা নিদর্শন পাওয়া যায় কি?

এ পর্যায়ে আমরা অনায়াসেই জ্ঞান ও আমলের ক্ষেত্রে ইসলামের উপস্থাপিত কতিপয় বিষয় পর্যালোচনার জন্য গ্রহণ করতে পারি। তাহলে এ বিষয়ে আমাদের বক্তব্য আরো সুস্পষ্টরূপে প্রতিভাত হয়ে উঠবে। সর্বাগ্রে আমরা আল্লাহর কিতাব কুরআন মজিদকে এই পর্যালোচনার কষ্টিপাথরে যাচাই করতে পারি। বস্তুতঃ কুরআন হচ্ছে এক চিরন্তন মুজিজা। চৌদ্দশ বছর ধরে তা এই দুনিয়ায় জ্ঞানের আলো বিতরণ করে আসছে। দুনিয়ার মানুষ যখন অজ্ঞতার অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল, তখনই কুরআন তার দিকপ্লাবী আলোকচ্ছটা বিকিরণ করেছে। মানুষ হারিয়েছিল তার মনুষ্যত্ব, মানবিক মর্যাদা, তার মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতা। মানুষের পরস্পরের মধ্যে ছিল প্রচণ্ড দ্বন্দ্ব-সংঘাত, মারামারি ও রক্তপাত। চতুর্দিকে ছিল জংলী ব্যবস্থা। মানুষ ছিল ভীত সন্ত্রস্ত।

এ পরিস্থিতিতেই কুরআন অবতীর্ণ হতে শুরু করে। এবং তুলে ধরে বিশ্ব উজ্জ্বলকারী আলোকছটা। মানুষকে ফিরিয়ে দেয় তার মনুষ্যত্ব, মানবিক মর্যাদা ও অধিকার। সামাজিক ন্যায়বিচার ও ইনসাফের ভিত্তিতে গড়ে তোলে মানুষের এক একটি সমাজ- কেবল আরব উপদ্বীপেই নয়, তার বাইরে প্রায় সকল দেশে। ইসলামের শিক্ষা আইন বিধান আদেশ নিষেধ রীতি নীতি ও কর্তব্য সকল সমাজের জন্যই নির্বিশেষে মানবীয় কল্যাণের বিধায়ক। সে কল্যাণ লাভে কোনো এক অঞ্চলের লোকদের অপর অঞ্চলের লোকদের চেয়ে অধিক সুবিধাভোগী এবং অপর কোনো অঞ্চলের লোকদের অসুবিধার সম্মুখীন হতে দেখা যায়নি। কোনো এলাকার লোক ইসলাম গ্রহণ করে সভ্যতা ও সংস্কৃতিতে উন্নতির উচ্চ শিরে আরোহন করতে পেরেছে আর অপর জন সমষ্টি গুমরাহকারী অন্ধকারে নিমজ্জিত রয়েছে, এমনটাও কখনো ঘটে নি।

তার কারণ, ইসলাম এক নির্ভুল জীবন দর্শন উপস্থাপন করেছে; খালেস তাওহীদি আকীদাই হচ্ছে তার মৌল ভাবধারা আর তা-ই হচ্ছে সমস্ত মানব সমাজের সংশোধনের নির্ভুল উপায়।

ইসলাম সকল প্রকারের শির্ক ও শির্কী আক্বীদার ওপর আঘাত হেনেছে। মূর্তিপূজা বা আকাশ গমনের অবয়বের আরাধনা ও উপাসনা বন্ধ করেছে। আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো শক্তির সঙ্গে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করিয়েছে। আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো শক্তির নিকট নতি বা আনুগত্য স্বীকারের সমস্ত রীতি-ব্যবস্থাকে খতম করেছে, শিরক এর সমস্ত বন্ধন ও প্রভাব থেকে মানব সমাজকে নিষ্কৃতি দিয়েছে। গুমরাহকারীর সমস্ত ফাঁদ থেকে মানুষকে রক্ষা করেছে। প্রস্তরপূজা, অগ্নিপূজা ও পশুপূজার অর্থহীনতাকে সুস্পষ্ট করে তুলেছে। কেননা এগুলোর ভালো বা মন্দ–ক্ষতি বা উপকার কিছুই করার একবিন্দু ক্ষমতা নেই। পশুগুলো এতই অক্ষম যে, ওরা নিজেদেরকে রক্ষা করতে পারে না। মানুষ পূজার মানুষের গোলামী করার এবং বলবান মানুষের মনগড়া আইন পালনের অন্তসারঃশূন্যতাকেও সুস্পষ্ট করে তুলেছে। ফলে মানুষ ফিরে পেয়েছে তার মর্যাদা ও মাহাত্ম। এ ক্ষেত্রে আরব উপদ্বীপ ও তার বাইরের মানুষের মধ্যে বিন্দুমাত্র তারতম্য দেখা যায়নি। তা ছিল নির্বিশেষে সকল মানুষের প্রতিই ইসলামের উদার অবদান।

ইসলামের এই জ্ঞান পরিচিতি এই তওহীদি আকীদা তো এমন নয় যে, তা কোনো বিশেষ এলাকার মানুষ গ্রহণ করতে পারে আর অপর এলাকার মানুষেরা পারে না।

সূরা আল-হাদীদের শুরুর আয়াত ক’টি গভীর ও সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে পাঠ করলে যে কেউ অনুভব ও স্বীকার করতে বাধ্য হবে যে, এ আয়াত ক’টির শিক্ষা অতীব উন্নতমানের এবং অত্যন্ত জ্ঞানগর্ভ। তা কখনই বিশেষ কোনো এলাকার লোকদের জন্য বিশেষভাবে নির্দেশিত হতে পারে না। অন্য এলাকায় তা বাস্তবায়িত হওয়ার অযোগ্যও নয় কোনো একটি দিক দিয়েও।

আয়াত ক’টির বাংলা অনুবাদ হচ্ছে : মহান আল্লাহর প্রশংসা করছে প্রত্যেকটি জিনিসই যা ভূ-মণ্ডলে ও আকাশমণ্ডলে রয়েছে। ভূ-মণ্ডল ও আকাশমণ্ডলের রাজত্ব ও সার্বভৌমত্বের নিরঙ্কুশ মালিক একমাত্র তিনিই। জীবন দান করেন ‌ও মৃত্যু দেন কেবল তিনিই এবং সব কিছুর ওপর তিনিই শক্তিমান।

ইসলামের যাবতীয় হুকুম-আহকাম, ইবাদত ব্যবস্থা, পারস্পরিক লেনদেন, নৈতিকতা প্রভৃতি পর্যায়ের আদর্শ ও আইন বিধানের কোনো একটি সম্পর্কেও কি একথা বলা যায় যে, তা কোনো কোনো ক্ষেত্রে পালনযোগ্য আর অপরাপর ক্ষেত্রে পালনযোগ্য নয়? না কখনোই নয়।

ইসলাম পারিবারিক ও সামাজিক পর্যায়ের যে সব বিধি-বিধান পেশ করেছে- বিয়ে, সন্তান লালন-পালন, তালাক, স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক অধিকার ও কর্তব্য, এতিমদের সামাজিক নিরাপত্তা বিধান, অসিয়ত কার্যকর করণ, মানুষের পারস্পরিক মিলমিশ, আমানত সংরক্ষণ, সকলের প্রতি উত্তম ব্যবহার প্রদর্শন, ন্যায় কাজে পারস্পরিক সহযোগিতা এবং পাপ কাজে অসহযোগিতা পর্যায়ের আইন বিধান, এর মধ্যে কোনটি এমন যা পৃথিবীর সকল দেশে, সকল অঞ্চলে ও সকল সমাজে বাস্তবায়ন করা যায় না?

ইসলামের নৈতিক আদর্শ ও তদসংক্রান্ত বিধি বিধান দীন ইসলামের গৌরবের বিষয়। তার বৈশিষ্ট্য পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকল নৈতিক বিধানকে অতিক্রম করে গেছে। ইসলাম সত্য ও সততার নীতি, আমানত  রক্ষার নীতি, ধৈর্য্য ও সহিঞ্চুতা প্রদর্শন, পরস্পরের প্রতি ভালো ধারণা পোষণ, ক্ষমাশীলতা, ত্যাগ তিতিক্ষা, মেহমানদারী, বিনয়, শোকর, তাওয়াক্কুল, নিষ্ঠা প্রভৃতি নৈতিক ভাবধারাসম্পন্ন আদর্শ উপস্থাপন করেছে। পক্ষান্তরে মিথ্যা, কার্পণ্য, বিশ্বাসঘাতকতা, শঠটা, কপটতা, অন্যায় দোষারোপ, ক্রোশ, আক্রোশ, হিংসা-দ্বেষ, পরশ্রীকাতরতা, ধোকা-প্রতারণা, অহংকার প্রভৃতি হীন ও জঘন্য কার্যকলাপ পরিহার করার উপদেশ দিয়েছে।

ইসলাম এক অপূর্ব রাজনৈতিক দর্শন ও ব্যবস্থা পেশ করেছে, যাতে সার্বভৌমত্ব ও আইন রচনার মৌলিক ও নিরঙ্কুশ অধিকার কেবল জাহানের স্রষ্টা ও মালিক আল্লাহর জন্য সংরক্ষিত। মানুষ তা গ্রহণ করে তারই মত মানুষের গোলামি করার ঘৃণ্য লাঞ্চনা থেকে মুক্তি পেতে পারে। ইসলাম যুদ্ধ নীতি সংস্কার করেছে। যুদ্ধের কারণসমূহ বন্ধ করার কার্যকর ব্যবস্থা অবলম্বন করেছে। জাতীয় সম্পদের অপচয় বন্ধ করেছে। তাতে জনগণের ন্যায্য অধিকার স্বীকার করেছে, ব্যবসা বাণিজ্যকে হালাল ঘোষণা করেছে, সুদ ও সর্বপ্রকার শোষণকে হারাম করেছে। এসব ক্ষেত্রে কি কোনো গোত্র বা আঞ্চলিকতার গন্ধ পাওয়া যায়? এই পর্যায়ে কুরআনুল কারীমের নিম্নোক্ত আয়াতসমূহ সূক্ষ্মদৃষ্টিতে বিবেচনা করে দেখা যাক:

﴿إِنَّ ٱللَّهَ يَأۡمُرُ بِٱلۡعَدۡلِ وَٱلۡإِحۡسَٰنِ وَإِيتَآيِٕ ذِي ٱلۡقُرۡبَىٰ وَيَنۡهَىٰ عَنِ ٱلۡفَحۡشَآءِ وَٱلۡمُنكَرِ وَٱلۡبَغۡيِۚ يَعِظُكُمۡ لَعَلَّكُمۡ تَذَكَّرُونَ ٩٠﴾ [النحل: ٩٠] 

“নিশ্চয় আল্লাহ সুবিচার, ইনসাফ, অনুগ্রহ ও আত্মীয় স্বজনকে দান করার নির্দেশ দিচ্ছেন এবং অন্যায়, পাপ, নির্লজ্জতা ও জুলুম অত্যাচার করতে নিষেধ করেছেন। তিনি তোমাদেরকে এ সব উপদেশ দিচ্ছেন শুধু এই আশায় যে, তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে”। [সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৯০]

কুরআনের এই বিধানসমূহ কি সাধারণভাবে সর্বজনগ্রাহ্য নয়? নয় কি তা সকল মানুষের জন্য পরম কল্যাণের ধারক? এ ব্যাপারে কি দেশ, মহাদেশ আর উপমহাদেশ জনিত কোনো ভৌগলিক পার্থক্য ও তারতম্যের এক বিন্দু প্রভাব আছে?

﴿إِنَّ ٱللَّهَ يَأۡمُرُكُمۡ أَن تُؤَدُّواْ ٱلۡأَمَٰنَٰتِ إِلَىٰٓ أَهۡلِهَا وَإِذَا حَكَمۡتُم بَيۡنَ ٱلنَّاسِ أَن تَحۡكُمُواْ بِٱلۡعَدۡلِ﴾ [النساء: ٥٨] 

“নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তোমরা  আমানতসমূহ সে সবের প্রকৃত পাওনাদার বা সেসব পাওয়ার উপযুক্তদের নিকট পৌঁছিয়ে দাও। আর তোমরা যখন লোকদের মধ্যে ফয়সালা করবে তখন অবশ্যই ন্যায়পরায়ণতা ও ইনসাফের সঙ্গে করবে”। [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৫৮]

কুরআন প্রদত্ত ন্যায়পরায়ণতা ও সু-বিচারের নির্দেশ ছিল একান্তভাবে নৈব্যক্তিক, সর্বতোভাবে নিরপেক্ষ এবং তা এমন প্রেক্ষিতে দেওয়া হয়েছিল যখন প্রভাবশালী ইয়াহূদী সমাজ এমন পক্ষপাতদুষ্ট নীতির ওপর অবিচল ছিল যে, আরবের উম্মি জনগণ তথা মুসলমান এবং অ-ইয়াহুদী লোকদের প্রতি ন্যায়বিচারের কোনো বাধ্যবাধকতা তাদের উপরে নেই। তা কেবল ইহাহুদিদের জন্যই আবশ্যিক অন্যদের প্রতি নয়। তাদের এইরূপ নীতি গ্রহণের মূল কারণ ছিল এই যে, তাদের ধারণা ছিল, তাদের ধর্ম গোত্র ভিত্তিক ও কেবল তাদেরই জন্য। অন্য কারোর কোনো অধিকার তাতে নেই। কিন্তু ইসলাম সার্বজনীন দীন। নির্বিশেষে সকল মানুষের  পক্ষে অনুসরণীয় ও প্রয়োগযোগ্য বিধানই ইসলাম দিয়েছে। মুসলিম ও অমুসলিমের ব্যাপারে তাতে কোনো পার্থক্য করা হয় নি।

﴿وَلۡتَكُن مِّنكُمۡ أُمَّةٞ يَدۡعُونَ إِلَى ٱلۡخَيۡرِ وَيَأۡمُرُونَ بِٱلۡمَعۡرُوفِ وَيَنۡهَوۡنَ عَنِ ٱلۡمُنكَرِۚ وَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡمُفۡلِحُونَ ١٠٤﴾ [ال عمران: ١٠٤] 

“তোমাদের মধ্যে একটি এমন জনগোষ্ঠী অবশ্যই থাকতে হবে, যারা সার্বিক কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে, আদেশ দিবে ন্যায়ের এবং নিষেধ করবে সকল অন্যায় কাজ থেকে। আর তারাই প্রকৃত সফলকাম”। [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১০৪]

কেবল নমুনাস্বরূপ এই ক’টি আয়াত এখানে উদ্ধৃত করা হলো, যদিও বিষয়টি শুধু এই ক’টি আয়াতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের ব্যাক্তিগত ও সমষ্টিগত ক্ষেত্রে অনুসরণীয় আরও অনেক উন্নতমানের নৈতিক বিধান উপস্থাপন করেছে কুরআন। সেই সবগুলোকে তো আর এখানে উদ্ধৃত করা সম্ভব নয়।

ইতিবাচকভাবে কেবল ভালো ভালো  চরিত্রের কথাই নয়, চরিত্রের মন্দ দিকগুলিকেও কুরআনুল কারীম তুলে ধরেছে এবং তা পরিহার করে চলতে নির্দেশ দিয়েছে। এই জন্য যে, তা করলে আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ ঘটে এবং স্বয়ং ব্যক্তি ও সমষ্টিরও ঘটে নৈতিক পতন ও বিপর্যয়। আর এই উভয় ধরনের আদেশ উপদেশ পালন করে কেবল মুসলিমরাই উপকৃত হয় নি, অমুসলিমরাও এসব কল্যাণ থেকে বঞ্চিত থাকে নি। অতএব, ইসলাম যদি আঞ্চলিক ধর্ম বা জীবন বিধান হত কিংবা হত বিশেষকাল ও শতাব্দির জন্য নির্দিষ্ট, তাহলে তা দ্বারা সকল দেশের, সকল সময়ের, সকল মানুষের কল্যাণ সাধন করা সম্ভবপর হত না।