মূল: ড. মাজহার কাজি । অনুবাদ: মাওলানা ফয়জুলাহ− মুজহিরী। সম্পাদনা: এম মুসলেহ উদ্দিন

কুরআন মাজিদ- জ্যোতিষশাস্ত্রের যে কোনো গ্রন্থের বিপরীতে, কোনো বিশেষ ঘটনা কিংবা তারিখের পরিভাষায় ভবিষ্যৎবাণী করে না। পক্ষান্তরে কুরআন মাজিদের অসংখ্য আয়াত বিভিন্ন ব্যক্তি কিংবা গোত্র সম্পর্কে সুখবর কিংবা আযাবের ভবিষ্যৎবাণী প্রদান করে। যেমনটি তা ভবিষ্যৎবাণী প্রদান করে বিভিন্ন ব্যক্তি, স্থান কিংবা বস্তুর স্থায়ী চরিত্র বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে। যখন এই আয়াতগুলি নাজিল হয় তখন মনে হচ্ছিল যেন এসব ভবিষ্যৎবাণী একেবারেই অসম্ভব পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করে, তার সবগুলিই ছিল সন্দেহাতীতভাবে সত্য। এই আয়াতসমূহের বাস্তবতাকে কাকতালীয় ব্যাপার, সম্ভাব্যতা কিংবা সুচিন্তিত ধারণা বলে আখ্যা দেয়া যায় না।

প্রত্যেক সম্ভাব্যতাই সঠিক কিংবা ভ্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা ধারণ করে। অনুরূপভাবে, একটি সুচিন্তিত ধারণা ও প্রকৃতার্থে  সত্য কিংবা মিথ্যা হতে পারে। এভাবে তা কুরআন মাজিদের অন্য একটি মুজিজা যে, তার সকল ভবিষ্যৎবাণীই সত্য হিসেবে দেখা দিয়েছে। বলাবাহুল্য, কেবল আল্লাহ তাআলারই ভূত-ভবিষ্যৎ সবকিছুর যথার্থ  জ্ঞান রয়েছে। বাস্তবতা হল, কুরআন মাজিদের সবকটি ভবিষ্যৎবাণীই সত্য হিসেবে দেখা দিয়েছে। অতএব তা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে যে, কুরআন মাজিদ সর্বশক্তিমান, সর্বজ্ঞাতা আল্লাহ তাআলারই পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। নিম্নে কুরআন মাজিদের কিছু আয়াত তুলে ধরা হয়েছে, যা কিছু বিশেষ বিশেষ ভবিষ্যৎবাণী ধারণ করে।

এসব ভবিষ্যৎবাণীর অধিকাংশই ইসলামের প্রথম দিককার ইতিহাসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যে ব্যক্তি ইসলামের ইতিহাসের সঙ্গে সবিশেষ পরিচিত নয় সে এসব ঘটনা উপলব্ধি করতে পারবে না, যদিও চক্ষুষ্মান ও বিবেচক ব্যক্তি মাত্রেই এসব ভবিষ্যৎবাণী এখনও হৃদয়ঙ্গম করতে পারে।

মুজিজা নং– ১১৯

রোমানদের বিজয়

রোমানরা পরাজিত হয়েছে। নিকটবর্তী অঞ্চলে। আর তারা তাদের এ পরাজয়ের পরে অচিরেই বিজয়ী হবে। কয়েক বছরের মধ্যেই। ভূত ও ভবিষ্যতের সব ফয়সালা আলাহরই।− আর সেদিন মুমিনরাও আনন্দিত হবে। (রুম, ৩০ : ০২-০৪)

এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের ৬ বছর পূর্বে, মোতাবেক ৬১৫-১৬ খৃস্টাব্দে। এই সময় পারসিয়ানরা রোমানদের পরাজিত করে এবং তাদেরকে জেরুজালেমসহ তাদের অধিকাংশ ভূখণ্ড থেকে উচ্ছেদ করে। এটি সম্পূর্ণ কল্পনাতীত ছিল যে, অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই দৃশ্যপট সম্পূর্ণ পাল্টে যাবে। আর রোমানরা আক্রমণ করে পারসিয়ানদেরকে একই ধরনের পরাজয়ের স্বাদ আস্বাদন করাবে। যদিও কুরআন মাজিদ তেমনটি ভবিষ্যৎবাণী প্রদান করে। মক্কার কাফিররা একথা শুনে এতই বিস্মিত হয় যে, তারা আবু বকর রা.- যিনি সর্বপ্রথম পুরুষ হিসেবে ইসলাম গ্রহণে ধন্য হন-এর সঙ্গে একথার সত্যতার বিরুদ্ধে বড় ধরনের বাজি ধরে বসে। ঠিক আট বছরের মাথায় এই ভবিষ্যৎবাণী বাস্তব রূপ লাভ করে। রোমানরা কেবল তাদের হারানো এলাকাগুলি ফিরেই পায় নি, বরং পারস্য সম্রাজ্যকে সংকুচিত করে পতনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেয়।

যেহেতু রোমানরা ছিল খৃস্টান এবং পারসিকরা অগ্নিপূজারী, তাই মুসলমানদের সহানুভূতি ছিল রোমানদের প্রতি এবং মক্কার কাফেরদের সহানুভূতি ছিল পারসিকদের প্রতি। অতএব পারসিকদের কাছে রোমানদের পরাজয় মুসলমানদের ব্যথিত করল। কুরআন মাজিদ এই আয়াতগুলিতে এও ভবিষ্যৎবাণী প্রদান করে যে, মুসলমানরা অচিরেই আনন্দিত হবে। এই ভবিষ্যৎবাণীর বাস্তবায়ন ঘটে একটি বিস্ময়কর পন্থায়। দ্বিতীয় হিজরিতে বদর যুদ্ধ ছিল এক হাজার (১,০০০) সশস্ত্র কাফিরদের সঙ্গে ৩১৩ জনের একটি দুর্বল নিরস্ত্র মুসলিম বাহিনীর প্রথম মুখোমুখি সংঘর্ষ। মুসলমানরা সব ধরনের প্রতিকুলতার বিরুদ্ধে, কাফিরদের পরাজিত করে। এই বিজয় প্রকৃতই মুসলমানদের জন্য আনন্দ ও খুশি বয়ে এনেছিল। এটি একটি বিস্ময়কর কাকতালীয় ব্যাপার যে, মুসলমানদের কাছে রোমানদের বিজয়ের সংবাদ ঠিক সেদিনই এসে পৌঁছেছিল যেদিন মক্কার মুশরিকদেরকে বদর প্রান্তরে তারা পরাজিত করেছিল। কুরআন মাজিদের উভয় ভবিষ্যৎবাণীই, এভাবে, বাস্তব ক্ষেত্রে প্রয়োগ পায়।

মুজিজা নং– ১২০

আবু লাহাবের ধ্বংস

 ‘ধ্বংস হোক আবু লাহাবের দু’হাত এবং সে নিজেও ধ্বংস হোক। তার ধন-সম্পদ এবং যা সে অর্জন করেছে তা তার কাজে আসবে না। অচিরেই সে দগ্ধ হবে লেলিহান আগুনে।’ (লাহাব, ১১১ : ০১-০৩)

এটিই কুরআন মাজিদের একমাত্র স্থান যেখানে ইসলামের একজন শক্রকে তার নাম ধরে তিরস্কৃত করা হয়েছে। আবু লাহাব ছিল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চাচা এবং তার সবচেয়ে কঠিন শত্রু। সে ছিল খুব ধনী এবং মক্কার অন্যতম প্রভাবশালী নেতা। সে তার সকল সহায়-সম্পত্তি ও ক্ষমতা নিযুক্ত করে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে কষ্ট ও নির্যাতন পৌঁছাতে এবং তাঁকে ইসলাম প্রচার থেকে নিবৃত করতে। সে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকটবর্তী প্রতিবেশী হওয়ায় প্রায় প্রতি রাতেই তাঁর নিদ্রায় ব্যাঘাত ঘটাত। এও বর্ণিত আছে যে, সে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পরিবারের সদস্যদেরকে প্রাত্যহিক খাবার প্রস্তুত করার ক্ষেত্রেও সে ব্যাঘাত ঘটাত। উপরোল্লিখিত আয়াতগুলি আবু লাহাব সম্পর্কে কিছু বিশেষ ভবিষ্যৎবাণী প্রদান করে।

কুরআন মাজিদের বর্ণনা, ‘অচিরেই সে দগ্ধ হবে লেলিহান আগুনে।’ ভবিষ্যৎবাণী প্রদান করে যে, সে কাফির হিসেবেই মৃত্যুবরণ করবে। আবু লাহাব যদি তার ন্যুনতম জ্ঞানকে ব্যবহার করত, সে লৌকিকভাবে (মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে হলেও) ইসলাম গ্রহণ করতে পারত এবং এই দাবি করতে পারত যে, কুরআন মাজিদের এই বর্ণনা ‘সে দগ্ধ হবে লেলিহান আগুনে’ মিথ্যা। তবে, বাস্তবতা হল, সে কাফির হিসেবেই মৃত্যুবরণ করেছে। তার চূড়ান্ত আবাস হবে জাহান্নামের তেমন একটি স্থান, যাকে কুরআন মাজিদ ‘একটি লেলিহান অগ্নিকুণ্ড’ বলে আখ্যা দিয়েছে। কুরআন মাজিদের বর্ণনা, ‘ধ্বংস হোক আবু লাহাবের দুই হাত এবং সে নিজেও ধ্বংস হোক।’ এটিও একটি ভবিষ্যৎবাণী। এখানে যা ভবিষ্যতে সংঘটিত হবে এমন ঘটনাকে কুরআন মাজিদে অতীতকালীন শব্দে ব্যক্ত করা হয়েছে, যা ছয় বছর পরে বাস্তব রূপ লাভ করে, যখন মক্কার মুশরিকরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে লাঞ্ছনাদায়ক পরাজয়ের মনোকষ্টে ভুগছিল।

কুরআন মাজিদের ভাষ্য, ‘তার ধন-সম্পদ এবং যা সে উপার্জন করেছে তা তার কাজে আসবে না।’- বাস্তবরূপ লাভ করেছে ধিক্কারজনক ও বীভৎস মৃত্যুর মাধ্যমে। সে সংক্রামক ফুঁসকুড়ি রোগে আক্রান্ত হয়েছিল এবং পরিবারের সকল সদস্য থেকে বিতাড়িত হয়েছিল। এমনকি তার মৃত্যুর পরও কেউ তিনদিন যাবৎ তার মৃতদেহের কাছে আসে নি। যখন মৃতদেহ থেকে দুর্গন্ধ ছড়াতে শুরু করে, মক্কাবাসীরা তার সন্তানদের ধিক্কার দিতে শুরু করল। তখন তারা কিছু লোক ভাড়া করে। তারা তার মৃতদেহটিকে কাঠ দিয়ে ঠেলে ঠেলে একটি গর্তে ফেলে দেয়। তার সম্পদ তাকে কোনো সাহায্য করতে পারে নি, এমনকি সাধারণ দাফনকার্য পর্যন্ত তার ভাগ্যে জোটে নি। কুরআন মাজিদের এই তিন ভবিষ্যৎবাণীই শব্দে শব্দে বাস্তব রূপ লাভ করেছে।

মুজিজা নং– ১২১

অবিশ্বাসী কাফিরদের পরাজয়

(হে মুহাম্মদ) তুমি কাফিরদেরকে বল, তোমরা অচিরেই পরাজিত হবে এবং তোমাদেরকে জাহান্নামের দিকে সমবেত করা হবে। আর সেটি কতইনা নিকৃষ্ট আবাসস্থল। (আলে-ইমরান, ০৩ : ১২)

তোমরা (মক্কার) কাফিররা কি তাদের (নূহ, সালিহ, লূত প্রমুখের কওম) থেকে ভাল? না কি তোমাদের জন্য মুক্তির কোনো ঘোষণা রয়েছে (আসমানি) কিতাবসমূহে? না কি তারা বলে, ‘আমরা সংঘবদ্ধ বিজয়ী দল’? (হে মুহাম্মদ) তাদের সংঘবদ্ধ দলটি শীঘ্রই পরাজিত হবে এবং পিঠ দেখিয়ে পালাবে। (ক্বামার, ৫৪ : ৪৩-৪৫)

সুরা ক্বামারের আয়াতসমূহ অবতীর্ণ হয়েছিল মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের পাঁচ বছর পূর্বে। তখন মুসলমানরা এতই নিপীড়িত ও দুর্বল ছিল যে, তাদের একদলকে ইথিওপিয়ায় হিজরত করতে হয়েছে। অপরদিকে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর পরিবারবর্গসহ মক্কার বাইরে একটি ঊষর উপত্যকায় নির্বাসিত ও বয়কটের স্বীকার হন। এমন পেক্ষাপটে এই আয়াতসমূহ মক্কার কাফিরদের পরাজয়ের ভবিষ্যৎবাণী প্রদান করে। সুরা আলে ইমরানের আয়াতগুলি অবতীর্ণ হয় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মাদানী জীবনের প্রথম দিকে। এসময় মুসলমানরা ছিল সর্বদা উৎকণ্ঠা ও ভীতির মধ্যে। মক্কার কাফিররা তখন মদিনার ওপর একটি বড় ধরনের আক্রমণ অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। একই সময়ে মদিনার ইহুদিরা মক্কাবাসীদের সঙ্গে মিলে মুসলমানদের সমূলে ধ্বংস করার জন্য ফন্দি আঁটছিল। অধিকন্তু মুহাজির মুসলিমরা তাদের সকল সহায়-সম্পত্তি মক্কায় ফেলে এসেছিল এবং মদিনার মুসলিম অধিবাসীদের ওপর তারা অর্থনৈতিক ও বস্তুগতভাবে অতিরিক্ত ভার হিসেবে আপতিত হয়েছিল। এমনতর পরিস্থিতিতে কুরআন মাজিদ ভবিষ্যৎবাণী করে যে, কেবল মদিনার ইহুদি এবং মক্কার কাফিররা নয় বরং যারা ইসলামকে প্রত্যাখ্যান করেছে শীঘ্রই তারা পরাজিত হবে। ইতিহাস সাক্ষ্য বহন করে, এই ভবিষ্যৎবাণী বাস্তব রূপ লাভ করে হিজরতের দ্বিতীয় বছর, যখন কাফির বাহিনী বদর প্রান্তরে পরাজিত হয়।

মুজিজা নং– ১২২

মক্কা থেকে অমুসলিমদের বিতাড়ন

আর তাদের (অমুসলিমদের) অবস্থা এমন ছিল যে, তারা তোমাকে (মক্কার) জমিন থেকে উৎখাত করে দিবে যাতে তোমাকে সেখান থেকে বের করে দিতে পারে এবং তখন তারা তোমার পরে স্বল্প সময়ই (মক্কায়) টিকে থাকতে পারত। (বনী ইসরাইল, ১৭ : ৭৬)

এসব আয়াত অবতরণের এক বছর পর মক্কার মুশরিকরা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালামকে− মক্কা থেকে বহিষ্কার করে এবং তাকে মদিনায় হিজরত করতে বাধ্য করে। সে সময় কেউ এ কথা বিশ্বাস করতে পারে নি যে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পরবর্তীতে মক্কা থেকে মুশরিকদের বহিষ্কার করবেন। ইতিহাস সাক্ষ্য বহন করে, হিজরী অষ্টম বর্ষে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একজন বিজেতার বেশে মক্কায় প্রবেশ করেন। অধিকন্তু, দুই বছর পর, কুরআন মাজিদের নবম সূরায় বর্ণিত আল্লাহ তাআলার নির্দেশ অনুসারে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা থেকে সকল মুশরিক ও অমুসলিমদের বহিষ্কার করেন। কুরআন মাজিদের এই ভবিষ্যৎবাণী তার পূর্ণ মর্ম সহকারে বাস্তবতার রূপ পরিগ্রহ করে এবঙ এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার প্রাক্কালে কোনো কাফিরই মক্কায় বসবাস করত না।

মুজিজা নং– ১২৩

মদিনা থেকে মুনাফিকদের বহিষ্কার

যদি মুনাফিকরা ও যাদের অন্তরে ব্যধি রয়েছে তারা এবং (মদিনা) শহরে মিথ্যা সংবাদ প্রচারকারীরা বিরত না হয়, তবে আমি অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে তোমাকে ক্ষমতাবান করে দেব। অতঃপর তারা সেখানে তোমার প্রতিবেশি হয়ে অল্প সময়ই থাকবে। (আহযাব, ৩৩ : ৬০)

মদিনায় মুসলমানদের শক্তি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মুনাফিকদের সংখ্যা দিন দিন ভারি হতে থাকে। তাদের কেউ কেউ যোগ দেয় ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের জন্য। অন্যরা যোগ দেয় মুসলমানদের ঐক্য ও শক্তিকে বিনষ্ট করার জন্য। ৩য় হিজরি সনে উহুদ যুদ্ধে ৩,০০০ সৈন্যের একটি মুসলিম বাহিনী মক্কা থেকে আক্রমণ করতে আসা ১০,০০০ সশস্ত্র কাফির দলের মুকাবিলায় মদিনা থেকে রওনা করে। পরবর্তীতে ৭০০ জনের একটি দল মুসলিম বাহিনী থেকে একটি খোঁড়া অজুহাতে মদিনায় ফিরে আসে। তাদের সকলেই ছিল মুনাফিক। এটি পাঠককে মদিনায় মুনাফিকদের সংখ্যা ও শক্তি সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পেতে সাহায্য করবে। এই আয়াতে কুরআন মাজিদ মুনাফিকদের সম্পর্কে ভবিষ্যৎবাণী প্রদান করে যে, তারা মদিনায় থাকতে পারবে না। ইতিহাস সাক্ষ্য বহন করে যে, মুনাফিকদের প্রতিপত্তি সেখানে ধুলিস্যাৎ হয়ে গিয়েছিল এবং মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জীবদ্দশাতেই মদিনা একটি নির্ভেজাল আদর্শ মুসলিম সমাজে পরিণত হয়েছিল।

মুজিজা নং– ১২৪

মুমিনদের বিজয়

তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে আল্লাহ তাদেরকে এই মর্মে ওয়াদা দিয়েছেন যে, তিনি নিশ্চিতভাবে তাদেরকে জমিনে প্রতিনিধিনত্ব দান করবেন, যেমন তিনি প্রতিনিধিত্ব দান করেছিলেন তাদের পূর্ববর্তীদের এবং তিনি অবশ্যই তাদের জন্য শক্তিশালী ও সুপ্রতিষ্ঠিত করবেন তাদের দীনকে, যা তিনি তাদের জন্য পছন্দ করেছেন এবং তিনি তাদের ভয়-ভীতি (এর অবস্থা) শান্তি-নিরাপত্তায় পরিবর্তিত করে দেবেন। (নূর, ২৪ : ৫৫)

এই আয়াত অবতীর্ণ হয় যখন সবেমাত্র মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদিনায় হিজরত করেছেন। এটি অবশ্যই লক্ষ্যণীয় বিষয় যে, তখন মুসলমানরা নিত্য ভয়-ভীতি ও শংকায় কালাতিপাত করতেন। মক্কার কাফিরদের পক্ষ থেকে আক্রমণের শংকা সদা বিরাজ করত এবং মদিনার ইহুদিদের বিরুদ্ধাচারণের ভয়ও ছিল। পরিস্থিতি এতই সঙ্কটাপন্ন ছিল যে, কিছু কিছু সাহাবি কেঁদে উঠে বলেন, ‘এমন কোনো দিন ছিল না যখন আমরা আমাদের শরীর থেকে রণসজ্জা ত্যাগ করতে পারি এবং শক্রদের পক্ষ থেকে আক্রমণের ভয় ব্যতিরেকে কোনো সকাল কিংবা সন্ধ্যা অতিক্রম করতে পারি।’ এই ছিল অবস্থা যখন কুরআন মাজিদ তিনটি বিশেষ ভবিষ্যৎবাণী প্রদান করে। প্রথমত. আল্লাহ তাআলা মুমিনদেরকে তাদের জমিনে শক্তিশালী করবেন। দ্বিতীয়ত. তিনি তাদের দীনকে (ইসলামকে) সুপ্রতিষ্ঠিত করবেন। আর তৃতীয়ত. তিনি তাদের ভয়-ভীতির অবস্থাকে শান্তি ও নিরাপত্তায় বদলে দেবেন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, খায়বার, যা ছিল ইহুদিদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী যুদ্ধ, যা সংগঠিত হয় হিজরি সপ্তম শতাব্দীতে-এতে ইহুদিরা মুসলমানদের কাছে আত্মসমর্পণ করে। দেশের রাজধানী শহর মক্কার কাফিররা মুসলমানদের কাছে আত্মসমর্পণ করে হিজরি অষ্টম শতাব্দীতে। ইসলাম তখন রাষ্ট্রীয় ধর্মে পরিণত হয় এবং মুসলমানরা একটি শান্তিময় ও নিরাপদ রাষ্ট্র লাভ করে। এভাবে দশ বছরের সংক্ষিপ্ত পরিসরে কুরআন মাজিদের ভবিষ্যৎবাণীসমূহ বাস্তবরূপ লাভ করে।

মুজিজা নং– ১২৫

মুহাজিরদের জন্য একটি উত্তম আবাসভূমি

আর যারা হিজরত করেছে আল্লাহর রাস্তায় অত্যাচারিত হওয়ার পর, আমি অবশ্যই তাদেরকে দুনিয়াতে উত্তম আবাস দান করব। আর আখিরাতের প্রতিদান তো বিশাল, যদি তারা (তা) জানত। (নাহল, ১৬ : ৪১)

ইসলামের সূচনালগ্নে কাফেরদের অত্যাচারে অতীষ্ঠ হয়ে মক্কা থেকে মুসলমানদেরকে তাদের বাড়ি-ঘর ছেড়ে হিজরত করতে হয়। প্রথমে তারা হিজরত করে আবিসিনিয়ায় (বর্তমান ইথিওপিয়ায়) এবং পরবর্তীতে মদিনায়। উভয় সময়েই হিজরতকালে তাদের সকল সহায়-সম্পত্তি মক্কায় ফেলে যায়। ইতিহাস বলে, যখন তারা আবিসিনিয়ায় হিজরত করে তখন আবিসিনিয়ার বাদশা তাদেরকে পূর্ণ নিরাপত্তা প্রদান করে। পরবর্তীতে যখন তারা মদিনায় হিজরত করে, মদিনার মুসলমানরা তাদের জন্যে তাদের গৃহ ও অন্তরের দরজা উন্মোচিত করে দেয়। তারা কেবল তাদেরকে আশ্রয়ই প্রদান করে নি, বরং তাদের অর্ধেক সম্পত্তির অধিকারীও বানিয়ে দেয়। এমনকি যাদের দু’জন স্ত্রী ছিল একজনকে তালাক দিয়ে তার মুহাজির মুসলিম ভাইকে দিয়ে দেয়। আল্লাহ তাআলা এভাবে ইহজগতে তাদের উত্তম আবাস প্রদানের ভবিষ্যৎবাণীকে বাস্তবায়ন করেন।

মুজিজা নং– ১২৬

একটি বিস্ময়কর ও চূড়ান্ত বিজয়ের প্রতিশ্রুতি

‘নিশ্চয় আমি তোমার জন্য মঞ্জুর করেছি একটি সুস্পষ্ট বিজয়। (ফাত্হ, ৪৮ : ০১)

এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় একটি অনন্য সাধারণ পরিস্থিতিতে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হিজরতের ছয় বছর পর ১৪০০ সাহাবিকে সঙ্গে নিয়ে ওমরাহ করার উদ্দেশে মদিনা থেকে মক্কার দিকে রওনা হন। মক্কাবাসীরা মুসলামনদের ওমরাহ পালন প্রতিহত করতে তাঁকে শহরে প্রবেশে বাধা দেয়। অবস্থা এতই নাজুক হয়ে ওঠে যে, মুসলমান ও মক্কাবাসীদের মধ্যে যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী হয়ে দাঁড়ায়। মক্কাবাসীরা তখন একটি শান্তিচুক্তি সম্পাদনের জন্য একটি প্রতিনিধি দল পাঠায়। চুক্তির পুরো প্রক্রিয়া এবং তার অধিকাংশ ধারা বাহ্যত মুসলামানদের জন্য পরাজয় ও অবমাননাকর ছিল। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লেখককে লিখতে বললেন, ‘এটি আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদ ও মক্কাবাসীদের মধ্যে সন্ধিপত্র।’ তখন মক্কার প্রতিনিধি দলের প্রধান বলল, সে তাঁকে আল্লাহর রাসূল মনে করে না। তখন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লেখককে ‘আল্লাহর রাসূল’ কথাটি মুছে ফেলতে বললেন এবং লিখতে বললেন, এটি আব্দুলাহর− পুত্র মুহাম্মদ ও মক্কাবাসীদের মধ্যে একটি চুক্তিপত্র।’ এটি মুসলমানদেরকে খুব বেশি মনঃক্ষুন্ন করে।

চুক্তিপত্রে আরও বলা হয়, যদি কোনো মুসলমান মক্কা থেকে মদিনায় পালিয়ে যায় তবে তাকে মক্কার কাফিরদের হাতে ফিরিয়ে দিতে হবে। পক্ষান্তরে, যদি কোনো মুসলমান মদিনা থেকে মক্কায় পালিয়ে আসে তবে তাকে মদিনার মুসলামদের কাছে ফিরিয়ে দেয়া হবে না। এটি মুসলমানদের আরও বেশি পীড়িত করে। যখন সন্ধিচুক্তি লিখিত হচ্ছিল এমন সময় একজন পলাতক মুসলিম মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে আসলেন এবং তাকে মুসলমানদের সঙ্গে থাকতে দিতে অনুমতি প্রার্থনা করলেন। সাহাবায়ে কেরাম দেখতে পেলেন, লোকটি শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং তার শরীরে দৈহিক নির্যাতনের চি হ্ন সুস্পষ্ট। যেহেতু সন্ধিচুক্তিতে এখনও সই করা হয় নি, তাই মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লোকটিকে মুসলমানদের সঙ্গে অবস্থানের অনুমতি দিতে চাইলেন। মক্কার লোকেরা যুক্তি পেশ করল, এটিও সন্ধির একটি ধারা এবং লোকটিকে মক্কাবাসীদের হাতে ফিরিয়ে দিতে হবে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই পরিস্থিতিতে তা মেনে নিলেন। মুসলমানরা এতে সাংঘাতিকভাবে মর্মাহত হল এবং এতে তারা পরাজয় ও অবমাননা বোধ করল। এহেন পরিস্থিতিতে এই বার্তা নিয়ে ওহি অবতীর্ণ হয় যে, আল্লাহ তাআলা মুসলমানদেরকে একটি সুস্পষ্ট বিজয় দান করেছেন।

পরবর্তী ইতিহাস প্রমাণ করে, এই চুক্তি ছিল মুমিনদের জন্য সুস্পষ্ট বিজয়। এই চুক্তি মদিনার মুসলমানদের অধিক নিরাপত্তা ও শান্তি প্রদান করে। তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। এবং চারপাশের সকল গোত্র ও তাদের এলাকাগুলো জয় করে নেয়। দুই বছরের সংক্ষিপ্ত সময়ে তারা এতই শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে, অষ্টম হিজরি সনে তাঁরা ১০,০০০ সৈন্যের একটি শক্তিশালী বাহিনী নিয়ে মক্কা অভিমুখে যাত্রা করে এবং কোনো যুদ্ধ-বিগ্রহ ছাড়াই শহরটি অধিকার করে নেয়। যখন মক্কা মুসলমানদের অধীনে এল আরব উপদ্বীপের সকল প্রান্ত থেকে বিভিন্ন গোত্র মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে এসে ইসলামে দীক্ষিত হতে লাগল। অল্প সময়ের মধ্যে পুরো দেশ ইসলামের পতাকাতলে চলে এল। মুসলমানরা তখন বুঝতে পারল, সন্ধিচুক্তি তাদের জন্য একটি সুস্পষ্ট বিজয় হিসেবেই প্রমাণিত হয়েছে।

মুজিজা নং– ১২৭

ইহুদিদের সঙ্গে মুনাফিকদের বিশ্বাসঘাতকতা

তুমি কি মুনাফিকদের দেখনি যারা আহলে কিতাবদের মধ্য থেকে তাদের ভাইদেরকে (ইহুদিদের) বলে, ‘তোমাদের বের করে দেয়া হলে  আমরাও অবশ্যই তোমাদের সঙ্গে বেরিয়ে যাব এবং তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করা হলে আমরা অবশ্যই তোমাদেরকে সাহায্য করব।’ আর আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, তারা মিথ্যাবাদী। তারা (ইহুদিরা) যদি বহিষ্কৃত হয় এরা (মুনাফিকরা) কখনো তাদের সঙ্গে বেরিয়ে যাবে না। আর তাদের সঙ্গে যদি যুদ্ধ করা হয় এরা কখনো তাদের সাহায্য করবে না। (হাশর, ৫৯ : ১১-১২)

আয়াতদ্বয় ইহুদি গোত্র বনু নাযিরকে নির্দেশ করছে। তারা মুসলমানদের সঙ্গে একটি সন্ধিচুক্তি সই করেছিল। যেহেতু তারা বারবার তাদের চুক্তি ভঙ্গ করে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে চতুর্থ হিজরি সনে দশ দিনের মধ্যে মদিনা ছেড়ে অনত্র চলে যেতে আল্টিমেটাম (সময়সীমা বেঁধে) দেন। মদিনার মুনাফিক সর্দার আব্দুলাহ− ইবনে উবাই তাদেরকে এই বলে বার্তা পাঠায় যে, সে তাদের সাহায্যে ২,০০০ সৈন্যের একটি দল নিয়ে আসছে এবং সে তাদেরকে মদিনা ছেড়ে যেতে বারণ করে। সে এও নিশ্চয়তা দেয় যে, তারা যদি মদিনা ছেড়ে চলে যায়, সেও তাদের অনুগামী হবে। ইতিহাস বলে, বনু নাযির দশ দিনের মধ্যে মদিনা থেকে বহিষ্কৃত হয়। মুনাফিকরা না তাদেরকে সাহায্য করতে আসে, আর না মদিনা থেকে চলে যাওয়ার সময় তাদের অনুগামী হয়।

মুজিজা নং– ১২৮

শত্রুদের ইসলাম গ্রহণ

যাদের সঙ্গে তোমরা (এখন) শত্রুতা করছ, আশা করা যায় আল্লাহ তোমাদের ও তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব সৃষ্টি করে দেবেন। আর আল্লাহ তাআলা (সবকিছুর ওপর) সর্বশক্তিমান এবং আল্লাহ অতিশয় ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (মুমতাহিনা, ৬০ : ০৭)

মুসলমানরা পৌত্তলিক কাফেরদেরকে ঘৃণা করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। তাদের হাতে তারা অকথ্য নির্যাতন ভোগ করেছে। এই মূর্তিপুজকরা কেবল তাদেরকে মক্কা থেকে বহিষ্কার করেই ক্ষান্ত হয় নি, বরং তারা মদিনায় তাদের ছোট্ট কমিউনিটিকেও ধ্বংস করতে সচেষ্ট ছিল। এটি একটি সম্পূর্ণ অসম্ভব বিষয় যে, মুসলমানরা তাদেরকে কখনো ভালোবসবে। কিন্তু ইতিহাস বলে, মূর্তিপূজারীদের অধিকাংশ নেতাই পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করে। আবু সুফিয়ান, সাহল ইবনে উমর, হাকীম ইবনে হাজাম, ইকরামা ইবনে আবু জেহেলের মত ব্যক্তিগণ, যারা ছিল ইসলামের ঘোর দুশমন, তারা পরবর্তীতে ইসলামের ছায়াতলে প্রবেশ করে এবং সকল মুসলমানের ভালবাসা ও বন্ধুত্ব লাভ করে।

মুজিজা নং– ১২৯

কিবলা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ইহুদিদের আপত্তি

অচিরেই নির্বোধ লোকেরা (ইহুদি ও মুনাফিকরা) বলবে, কী সে তাদেরকে (মুসলমানদেরকে) তাদের কিবলা (মসজিদে আকসার দিকে ফিরে ইবাদত করা) থেকে ফিরাল, যার ওপর তারা ছিল? (বাকারা, ০২ : ১৪২)

যখন নামাজ ফরজ হয়, মুসলমানরা প্রথমদিকে ১৬-১৭ মাস যাবৎ জেরুজেলেমের (বায়তুল মুকাদ্দাসের) দিকে মুখ করে নামাজ আদায় করে। পরবর্তীতে নামাজের দিক মক্কার কাবা শরিফের দিকে পরিবর্তিত হয়। এই আয়াতটি মুনাফিক ও মদিনার ইহুদিদেরকে কুরআন মাজিদকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার জন্যে একটি সহজ যুক্তি সরবরাহ করে। তারা সকলে মুসলমানদের নতুন কিবলাকে মেনে নিতে পারত এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে অভিযুক্ত করতে পারত যে, তাদের ব্যাপারে যে ভবিষ্যৎবাণী করা হয়েছে তা ছিল ভুল। তবে বাস্তবতা হল, তারা কিবলা পরিবর্তনে আপত্তি জানায় এবং কুরআন মাজিদের ভবিষ্যৎবাণী পূর্ণতা লাভ করে।

মুজিজা নং– ১৩০

শত্রুদের ইসলাম গ্রহণ

পেছনে পড়ে থাকা বেদুঈনদেরকে বল, এক কঠোর যোদ্ধা জাতির বিরুদ্ধে শীঘ্রই তোমাদেরকে ডাকা হবে। তোমরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে অথবা তারা আত্মসমর্পণ করবে। (ফাতাহ, ৪৮ : ১৬)

এই আয়াত দু’টি খুব সুস্পষ্ট ও বিশেষ ভবিষ্যৎবাণী প্রদান করে। প্রথমত. মরুর আরব বেদুঈনদেরকে ডাকা হবে শক্তিধর জাতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে। দ্বিতীয়ত. যুদ্ধ চলতে থাকবে মুসলমানরা বিজয় লাভের পূর্ব পর্যন্ত। আরব উপদ্বীপকে ঘিরে যে দুটি শক্তিধর জাতি ছিল তারা হল, রোম সাম্রাজ্য ও পারস্য সাম্রাজ্য। ইতিহাস বলে, মুসলমানরা দ্বিতীয় খলিফা ওমর রা.-এর সময়কালে (১৩-২৩ হিজরি) পারস্য ও রোম সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বহু যুদ্ধ করে। পারস্য সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত যুদ্ধ সংঘটিত হয় হিজরি ১৪ সালে কাদিসিয়া নামক স্থানে। এটি ছিল সেই স্থান যেখানে পারস্য বাহিনী পূর্ণ শক্তি নিয়ে মুসলিম বাহিনীর মুখোমুখি হয়। যুদ্ধ চারদিন স্থায়ী হয় এবং পারস্য বাহিনীর শোচনীয় পরাজয়ের মাধ্যমে তার সমাপ্তি ঘটে। হিজরি ১৫ সালে ইয়ারমুকের যুদ্ধ ছিল মুসলিম বাহিনী ও রোমান বাহিনীর মধ্যে চূড়ান্ত মুকাবেলা। মুসলমানরা রোমানদের বিরুদ্ধে এক ঐতিহাসিক বিজয় লাভ করে এবং রোমান সম্রাট হিরাক্লিয়াস কনস্টান্টিনোপলে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। এভাবে কুরআন মাজিদের উভয় ভবিষ্যৎবাণীই অতি অল্প সময়ের মধ্যে সত্যে পরিণত হয়।

মুজিজা নং– ১৩১

ইহুদি ও খৃস্টানদের ভূমিকা

তুমি অবশ্যই মুমিনদের জন্য মানুষের মধ্যে শত্রুতায় অধিক কঠোর পাবে ইহুদিদেরকে ও মুশরিকদেরকে। আর মুমিনদের জন্যে বন্ধুত্বে তাদের জন্যে নিকটতর পাবে তাদেরকে যারা বলে, ‘আমরা নাসারা (খ্রিস্টান)’। (মায়েদা, ০৫ : ৮২)

এটি আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে একটি সুস্পষ্ট ঘোষণা, সর্ববিষয়ে যার জ্ঞান অগাধ ও অসীম। বিগত চৌদ্দশত বছর যাবৎ এই ভবিষ্যৎবাণীর সত্যতা প্রত্যক্ষ করা গেছে। আমাদের বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে তা আরও অধিক পরিষ্কারভাবে দেখা যেতে পারে। ইহুদিরা ফিলিস্তিন সমস্যাকে একটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক সমস্যা থেকে বিশ্বের সকল মুসলমানের বিরুদ্ধে একটি যুদ্ধের পরিস্থিতিতে পরিণত করেছে। যদি ইহুদিরা তাদের ন্যূনতম বিবেচনা শক্তি কাজে লাগাত, তারা ভাণ করে হলেও মুসলমানদের প্রতি তাদের ভালবাসা ও দয়া দেখাত এবং এ কথা দাবি করতে পারত যে, কুরআন মাজিদ তাদের সম্পর্কে মিথ্যা ভবিষ্যৎবাণী প্রদান করেছে। এটি কুরআন মাজিদের এখনো মুজিজা যে, আল্লাহ তাআলা তাদেরকে এই বিবেচনা বোধ থেকে বঞ্চিত রেখেছেন।

মুজিজা নং– ১৩২

ইহুদিদের ওপর খৃস্টানদের আধিপত্য

হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর সাহায্যকারী। যেমন মরিয়ম পুত্র ঈসা হাওয়ারিদেরকে বলেছিলেন, আল্লাহর পথে কারা আমার সাহায্যকারী হবে? হাওয়ারিগণ বলল, আমরাই আল্লাহর সাহায্যকারী। তারপর বনি ইসরাইলের মধ্য থেকে একদল ঈমান আনল এবং অপর একদল প্রত্যাখ্যান করল। অতঃপর যারা ঈমান আনল আমি তাদেরকে তাদের শত্রুবাহিনীর ওপর শক্তিশালী করলাম। ফলে তারা বিজয়ী হল। (সা’ফ, ৬১ : ১৪)

খৃস্টানরা বর্তমানে ইহুদিদের ওপর সংখ্যা, এলাকা ও ক্ষমতার বিচারে বিস্ময়করভাবে প্রাধান্য বিস্তার করে আছে। তারা সকল আন্তর্জাতিক বিষয়ে ইহুদিদের ওপর প্রবল। লক্ষণীয় বিষয় হল, ইসরাইল রাষ্ট্র যে সকল ক্ষমতা ও মর্যাদা ভোগ করে তা পুরোপুরি খৃস্টান বিশ্বের ওপর নির্ভরশীল। কুরআন মাজিদের শত শত বছর পূর্বেরকৃত এই ভবিষ্যৎবাণী ইহুদিদের পুরো ইতিহাসে সর্বদা বাস্তব বলে প্রতীয়মান হয়েছে এবং চিরকালই এই বাস্তবতা অক্ষুন্ন  থাকবে।

মুজিজা নং– ১৩৩

খৃস্টান ও ইহুদিদের পারস্পরিক সম্পর্ক

হে মুমিনগণ, ইহুদি ও নাসারাকে তোমরা বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তারা একে অপরের বন্ধু। আর তোমাদের মধ্যে যে তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করবে সে নিশ্চয় তাদেরই একজন। নিশ্চয় আল্লাহ যালিম কওমকে হেদায়েত দেন না। (মায়েদা, ০৫ : ৫১)

চারপাশে ইহুদি ও খৃস্টানদের বর্তমানের পারস্পরিক ঘটনা-প্রবাহের দিকে তাকিয়ে একজন সাধারণ পাঠক এই আয়াতে কুরআন মাজিদের মুজিজা খুঁজে পাবে না। একজন পাঠক কেবল তখনই এই আয়াতের মর্ম উপলব্ধি করতে সক্ষম হবে যখন সে এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার প্রাক্কালে ইহুদি ও খৃস্টানদের পারস্পরিক সম্পর্কের কথা স্মরণ করবেন।

ইহুদিরা বহু শতাব্দী পর্যন্ত আরবে বসবাস করত। দু’টি প্রধান শহরে তাদের শক্তিশালী বসতি ছিল। একটি মদিনা এবং অপরটি খায়বার। তারা ছিল ব্যবসায়ী ও পুঁজিপতি। তারা মাত্রাতিরিক্ত সুদের ওপর টাকা ঋণ দিত এবং এই শহরদ্বয়ের অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করত। তারা এতই শক্তিশালী ছিল যে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মদিনায় হিজরত করেন, তিনি তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার জন্য একটি বিশেষ চুক্তি স্বাক্ষর করেন। আরবে কোনো খৃস্টানপল্লী ছিল বলে ইতিহাসে নজির নেই। অধিকন্তু ইতিহাসে ইহুদি কিংবা খৃস্টানদের কোনো ধরনের পারস্পরিক সম্পর্ক কিংবা মুসলামান ও খৃস্টানদের মধ্যে সম্পর্কের কোনো নজিরও নেই।

এই আয়াত অবতীর্ণ হয়েছিল মদিনায় ৬ষ্ঠ হিজরির দিকে। সে সময় কেউ একথা ধারণা করতে পারে নি যে, মানব ইতিহাসে এমন একটি সময় আসবে যখন ইহুদি ও খৃস্টানরা পরস্পর বন্ধুতে পরিণত হবে। কুরআন মাজিদ এই ভবিষ্যৎবাণী প্রদান করে শত শত বছর পূর্বে।

মুজিজা নং– ১৩৪

মুশরিকদের মাধ্যমে তাদের ধর্মকে বিভিন্ন দলে বিভক্ত করা

আর মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না। যারা নিজেদের দীনকে বিভক্ত করেছে এবং যারা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে (তাদেরও অন্তর্ভুক্ত হয়ো না)। প্রত্যেক দলই নিজেদের যা আছে তা নিয়ে আনন্দিত। (রুম, ৩০ : ৩১-৩২)

এই আয়াতে কুরআন মাজিদ তাদের অবস্থার বর্ণনা দেয় যারা আল্লাহর সঙ্গে অন্য উপাস্যকে শরীক করে। বলাবাহুল্য, বর্তমান বিশ্বে সর্বাধিক প্রভাবশালী ধর্ম হল খৃস্টান ধর্ম, যারা ত্রিত্ববাদে বিশ্বাস করে এবং আল্লাহর সঙ্গে অন্য প্রভুকে শরীক করে। এই আয়াত বলে, এ সকল লোক তাদের ধর্মকে বিভিন্ন দলে বিভক্ত করবে এবং প্রত্যেক দলই নিজেদের বিশেষ বিশ্বাস নিয়ে আনন্দিত হবে। এই আয়াত যখন অবতীর্ণ হয় তখন মক্কায় কোনো খৃস্টান ছিল না। মক্কার অধিকাংশ লোকই ছিল মূর্তিপুজারী।

এই আয়াতে কুরআন মাজিদ ভবিষ্যৎবাণী প্রদান করে যে, খৃস্টানরা অবশেষে বিভিন্ন দলে বিভক্ত হবে। এখন যে কেউ এই ভবিষ্যৎবাণীর সত্যতা প্রত্যক্ষ করতে পারে। পুরো খৃস্টান বিশ্ব বর্তমানে বহুভাগে বিভক্ত, যেখানে একদল অন্যদলকে ভ্রান্ত বলে মনে করে। এভাবে পুরো ধর্মটি বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। এদের প্রত্যেকেই নিজকে একটি ভিন্নধমের্র অনুসারী বলে মনে করে। এটি কুরআন মাজিদের অন্য একটি মুজিজা যে, কুরআন মাজিদ এই ভবিষ্যৎবাণীটি প্রদান করেছে শত শত বছর পূর্বে।

মুজিজা নং– ১৩৫

কুরআন মাজিদকে কেউ চ্যালেঞ্জ করতে পারে নি

বাতিল এতে (কুরআন মাজিদে) অনুপ্রবেশ করতে পারে না, না পেছন থেকে, না সামনে থেকে, এটি প্রজ্ঞাময়, সপ্রশংসিতের পক্ষ থেকে নাজিলকৃত (ফুসসিলাত, ৪১ : ৪২)

কুরআন মাজিদের ভাষ্যকারগণ বলেন, বাতিল এতে ‘সামনে থেকে’ বক্তব্যটির উদ্দেশ্য, কেউ কুরআন মাজিদের একটি সাধারণ আয়াতকে সরাসরি আক্রমণ কিংবা চ্যালেঞ্জ করতে পারবে না। প্রমাণ করতে পারবে না তা অযথার্থ, মিথ্যা বা মেয়াদোত্তীর্ণ। আর ‘পেছন থেকে বাতিল’ দ্বারা উদ্দেশ্য, কেউ কোনো ধরনের জ্ঞান-বিজ্ঞানের মাধ্যমে কখনো এমন কিছু আবিষ্কার করতে পারবে না এবং এই চ্যালেঞ্জ জানাতে সক্ষম হবে না যে, কুরআন মাজিদের একটি সাধারণ আয়াতও বাস্তবিকভাবে ত্রুটিপূর্ণ। বিগত চৌদ্দশ বছরের বিস্ততৃ কাল পর্বে কুরআন মাজিদের এতদুভয় মুজিজা সত্য বলে প্রতীয়মান হয়েছে।

মুজিজা নং– ১৩৬

হজ্জের উদ্দেশ্যে সফর

আর (হে ইবরাহিম,) মানুষের নিকট হজ্জের ঘোষণা দাও; তারা তোমার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে এবং কশকায়ৃ উটে চড়ে দূর-দূরান্তের পথ পাড়ি দিয়ে। (হজ্জ, ২২ : ২৭)

এখানে কিছু ঐতিহাসিক ঘটনার অবতারণা করা প্রাসঙ্গিক মনে করছি। প্রথমত, আল্লাহ তাআলা হযরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামকে হজ্জের এই ঘোষণা দিতে বলেন যখন তিনি কাবা শরিফের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করেন-আজ থেকে প্রায় চার হাজার বছর পূর্বে। দ্বিতীয়ত, তিনি কাবা শরিফ নির্মাণ করেন একটি নিতান্ত ঊষর ও জনমানবহীন স্থানে। আমাদের আরও স্মর্তব্য যে, যখন তিনি কাবা শরিফ নির্মাণ করেন তখন মক্কা শরিফে কোনো শহর ছিল না। তৃতীয়ত, কাবা শরিফ এমন এক অঞ্চলে নির্মিত হয় যাতে কোনো ধরনের সফর ও ভ্রমণের সুবিধাদি ছিল না। রাস্তা ও সরাইখানা তো দূরের কথা, বিস্তীর্ণ মরুভূমিতে ভ্রমণকারীদের জন্যে কোথাও পানির ব্যবস্থা পর্যন্ত ছিল না। তথাপি কুরআন মাজিদ ভবিষ্যৎবাণী প্রদান করে যে, ভ্রমণকারীরা এই কষ্টকর ভ্রমণের ক্লান্তি সহ্য করবেন এবং দূর-দূরান্তের স্থান থেকে কাবা শরিফে এসে সমাগত হবেন। এটি একটি বাস্তব সত্য যে, এই ভবিষ্যৎবাণী বিগত চার হাজার বছর ধরে নিরন্তর বাস্তবায়িত হয়ে আসছে। প্রতি বছর অসংখ্য মানুষ কাবা শরিফে পৃথিবীর বিভিন্ন অংশ থেকে হজ্জের সফরে আসে।

মুজিজা নং– ১৩৭

মক্কার প্রতিরক্ষা

তারা কি দেখে না যে, আমি (মক্কার) ‘হারাম’কে নিরাপদ বানিয়েছি। অথচ তাদের আশপাশ থেকে মানুষদেরকে ছিনিয়ে নেয়া হয়? তাহলে কি তারা অসত্যেই বিশ্বাস করবে এবং আল্লাহর নিয়ামতকে অস্বীকার করবে? (আনকাবুত, ২৯ : ৬৭)

এই আয়াত এবং কুরআন মাজিদের অন্য কিছু আয়াত মক্কাকে একটি শান্তি ও নিরাপত্তার শহর বলে ঘোষণা করেছে। ইতিহাস সাক্ষ্য বহন করে, মক্কা কখনো বৈদেশিক বাহিনী দ্বারা আক্রান্ত হয় নি। আর না তাতে কখনো কোনো আভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছে। এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর থেকে মক্কা নিরন্তর শান্তি ও নিরাপত্তার যুগ প্রত্যক্ষ করেছে।

মুজিজা নং– ১৩৮

মক্কার জন্য ফল-ফলাদির যোগান

আমি কি তাদের জন্য (মক্কায়) এক নিরাপদ ‘হারাম’-এর সুব্যবস্থা করি নি? যেখানে সব ধরনের ফলমূল আনিত হয় আমার পক্ষ থেকে রিজিক স্বরূপ। কিন্তু তাদের অধিকাংশই তা জানে না। (কাসাস, ২৮ : ৫৭)

মক্কা কঠিন কঠিন শিলা ও বালিয়াড়ি বেষ্টিত একটি সম্পূর্ণ ঊষর ভূমি। শহরটিতে পানির কোনো প্রাকৃতিক উৎস নেই এবং তাতে বার্ষিক বৃষ্টির পরিমাণ ৫ ইঞ্চিরও কম। পক্ষান্তরে বছরের প্রতিটি দিন মক্কায় অসংখ্য মানুষ ভ্রমণে আসে। কেবল এক হজ্জ মৌসুমে মক্কায় ভ্রমণকারীদের সংখ্যা দুই মিলিয়ন (২০ লক্ষ) ছাড়িয়ে যায়। মক্কায় পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহ থেকে ফলমূল ও শাক-সবজি আমদানির সর্বদা পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রয়েছে। মক্কায় ভ্রমণকারী মাত্রেই দুটি বিষয়ে বিস্মিত হবেন। প্রথমত, মক্কায় ভ্রমণকারীর পরিমাণ যত বেশিই হোক না কেন তাতে ফলমূল ও শাক-সবজির কোনো ঘাটতি পড়ে না। দ্বিতীয়ত, সব ঋতুর ফলমূল ও শাক-সবজি মক্কায় সব সময় পাওয়া যায়।

মুজিজা নং– ১৩৯

দলে দলে মানুষের ইসলামে প্রবেশ

যখন আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় আসবে আর তুমি লোকদেরকে দলে দলে আল্লাহর দীনে দাখিল হতে দেখবে, তখন তুমি তোমার রবের সপ্রশংস তাসবিহ পাঠ কর এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর। নিশ্চয় তিনি তাওবা কবুলকারী। (নাসর, ১১০ : ০১-০৩)

এই আয়াতসমূহ দু’টি ভিন্ন ভিন্ন ভবিষ্যৎবাণী প্রদান করে, যা কিছুটা ব্যাখ্যার দাবি রাখে। প্রথম : কুরআন মাজিদের বর্ণনা, ‘যখন আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় আসবে’ এটি মুসলমানদের একটি সুস্পষ্ট বিজয়ের আগাম বার্তা। কুরআন মাজিদের টীকাকারগণ বলেন, এই আয়াত অবতীর্ণ হয়

খায়বার যুদ্ধের পর ৭ম হিজরিতে। আর এই ভবিষ্যৎবাণীর বাস্তবায়ন ঘটে মক্কা বিজয় রূপে, ৮ম হিজরিতে। দ্বিতীয় ভবিষ্যৎবাণী পাওয়া যায় কুরআন মাজিদের এই বর্ণনায়- ‘তুমি লোকদেরকে দলে দলে আল্লাহর দীনে দাখিল হতে দেখবে।’ ইতিহাস বলে, যখন মুসলমানদের হাতে মক্কার পতন হয়, আরব উপদ্বীপের চতুর্দিক থেকে অসংখ্য আরব গোত্র মক্কায় আগমন করে এবং মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- এর হাতে বায়আত হয়ে ইসলামের ছায়াতলে প্রবেশ করে। বস্তুত এত অধিক গোত্র মক্কায় আগমন করে ইসলাম গ্রহণ করে যে, ইসলামের ইতিহাসে হিজরি ৯ম সালকে ‘প্রতিনিধি আগমনের বছর’ নামে আখ্যায়িত করা হয়। বাস্তবতা হল, কুরআন মাজিদের উপরোক্ত ভবিষ্যৎবাণী দুই বছরের সংক্ষিপ্ত সময়ের ভেতরে বাস্তবায়িত হয়। যা কুরআন মাজিদের মুজিজা বা বিস্ময়কর প্রকৃতির অন্য একটি সাক্ষ্য।

মুজিজা নং– ১৪০

মানব-জাতির রিযিকের বন্দোবস্ত

দারিদ্রের ভয়ে তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা কর না। আমিই তোমাদেরকে রিজিক দেই এবং তাদেরকেও। (আনআম, ০৬ : ১৫১)

অভাব-অনটনের ভয়ে তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা কর না। আমিই তাদেরকে রিজিক দেই এবং তোমাদেরকেও। নিশ্চয় তাদের হত্যা করা মহাপাপ। (ইসরা, ১৭ : ৩১)

১৭৯৮ ঈসায়ি সালে ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ রবার্ট ম্যালথাস জনসংখ্যানীতির ওপর তার প্রসিদ্ধ প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। তিনি যুক্তি দেখান যে, মানুষ বৃদ্ধি পায় গাণিতিক হারে, কিন্তু সম্পদ বৃদ্ধি পায় জ্যামিতিক হারে। অর্থাৎ জনসংখ্যা বাড়ে ১, ২, ৪ ও ৮ হারে। কিন্তু সম্পদ বাড়ে শতকরা ৩, ৫ কিংবা ১০ হারে। তিনি বলেন, অল্প কয়েক বছরের মধ্যে জনসংখ্যা দাঁড়াবে দ্বিগুণ কিংবা তিনগুণ। কিন্তু সম্পদ বৃদ্ধি পাবে কেবল একটি নির্দিষ্ট মাত্রার শতকরা হারে। এই অনুমানের ওপর ভিত্তি করে তিনি ভবিষ্যৎবাণী করেন যে, যদি জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে পৃথিবীতে প্রবল খাদ্যাভাব দেখা দিবে। সকল শিল্পোন্নত দেশই বর্তমানে ম্যালথাসের তত্ত্বকে অনুসরণ করছে এবং তাদের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। এই অবস্থা ঠিক তেমনি যেমনটি কুরআন মাজিদ অবতীর্ণ হওয়ার প্রাক্কালে আরব সমাজে ছিল। আরবরা তাদের কন্যা সন্তানদের হত্যা করত। মানুষ বর্তমানে হত্যা করছে না, কিন্তু দারিদ্রের ভয়ে শিশুর জন্ম নিয়ন্ত্রণ করছে। ম্যালথাসের তত্ত্ব ও মানুষের ভয়ের বিপরীতে আল্লাহ তাআলা আছেন এবং মানুষের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য সরবরাহ করছেন। সন্দেহ নেই আফ্রিকার কোনো কোনো অঞ্চলে দুর্ভিক্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব কিছুই ঘটেছে কিছু দায়িত্ব-জ্ঞানহীন মানুষের অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কারণে। পুরো মানব সমাজ কোনো গণদুর্ভিক্ষে পতিত হয় নি কিংবা প্রত্যক্ষ করে নি, যা কুরআন মাজিদের একটি ভবিষ্যৎবাণী।

মুজিজা নং– ১৪১

মহানবী সা.- এর মক্কা প্রত্যাবর্তন

নিশ্চয় যিনি তোমার প্রতি কুরআনকে বিধান স্বরূপ দিয়েছেন, অবশ্যই তিনি তোমাকে প্রত্যাবর্তনস্থলে ফিরিয়ে নেবেন। বল, আমার রব বেশি জানেন কে হিদায়েত নিয়ে এসেছে আর কে রয়েছে স্পষ্ট পথভ্রষ্টতায়। (কাসাস, ২৮ : ৮৫)

আব্দুলাহ− ইউসুফ আলী তার কুরআনের তাফসিরে লিখেছেন, প্রত্যাবর্তন স্থলের দু’টি অর্থ রয়েছে। প্রথমত, এটি মক্কা শহরের একটি উপাধি। দ্বিতীয়ত, এটি সেই উপলক্ষকে নির্দেশ করে যখন আমরা সকলে আমাদের পালনকর্তার সামনে সমবেত হব। তিনি আরও বলেন, এই আয়াত অবতীর্ণ হয়েছিল মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের প্রাক্কালে ‘যুহফা’ নামক স্থানে। যা মক্কা থেকে সামান্য দূরে অবস্থিত মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রকতিগতভাবেইৃ মাতৃভূমি মক্কা ছেড়ে যেতে কষ্ট অনুভব করছিলেন। এই আয়াত অবতীর্ণ হয়েছিল তাকে মক্কায় প্রত্যাবর্তনের প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে সান্ত্বনা দিতে। এই ভবিষ্যৎবাণী বাস্তবায়িত হয় আট বছরের মধ্যে এবং মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিজেতার বেশে মক্কা প্রত্যাবর্তন সম্পন্ন করেন।

মুজিজা নং– ১৪২

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর খ্যাতি ও মর্যাদা

আমি কি তোমার জন্য তোমার বক্ষ প্রশস্ত করি নি? আর আমি নামিয়ে দিয়েছি তোমার থেকে তোমার বোঝা, যা তোমার পিঠ ভেঙ্গে দিচ্ছিল। আর আমি তোমার (মর্যাদার) জন্য তোমার স্মরণকে সমুন্নত করেছি। (ইনশিরাহ ০৯ : ১-৪)

এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়েছিল মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর মাক্কি জীবনের প্রথম দিকে, যখন তিনি ছিলেন এমন দুর্বল ও কঠিন পরিস্থিতিতে যে, তিনি শহরের মধ্যে স্বাধীনভাবে চলাফেরা, ইসলাম প্রচার কিংবা নামাজ আদায় পর্যন্ত করতে পারতেন না। এমন প্রেক্ষাপটে কুরআন মাজিদ বলে, তার নাম সমুন্নত হয়েছে মহা সম্মানে। এই ভবিষ্যৎবাণী কিভাবে পূর্ণতা লাভ করেছিল তা দেখার জন্যে আবশ্যক হল, সেসব উপায়-উপকরণের প্রতি লক্ষ করা, যার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যশ-খ্যাতি ও মর্যাদাকে সমুন্নত করেছেন।

প্রথমত. ‘মুহাম্মদ’ হল বিশ্বের সর্বাধিক জনপ্রিয় নাম। মুসলমানদের নামের শুরুতে, মাঝখানে কিংবা শেষে মুহাম্মদ শব্দ থাকাটা তাদের একটি অতি সাধারণ রীতি। এটি একটি অনুপম মর্যাদা যা আল্লাহ তাআলা কেবল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে প্রদান করেছেন। লক্ষ লক্ষ মুসলমান সর্বদা এই নামটি বহন করে চলে। যা সারা বিশ্বে এই নামটিকে সর্বাধিক পরিচিতি ও সর্বাপেক্ষা পুনরাবৃত নামের মর্যাদা দান করেছে।

দ্বিতীয়ত. মুসলমানরা জ্ঞানের একটি নতুন শাখার সূচনা করেছে, যা ছিল মানুষের অজ্ঞাত। এ শাখাটি সিরাত নামে পরিচিত। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জীবন বৃত্তান্ত রচনার সঙ্গে এটি সম্পর্কিত। মুসলমানদের প্রতিটি প্রজন্ম ‘সিরাত’ রচনার ক্ষেত্রে একেকটি নতুন নতুন পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং মহানবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালাম)− জীবনী লেখার ধারা অব্যাহত রাখে।

তৃতীয়ত.  মুসলমানরা  সাহিত্যের  একটি  নতুন  ধারাও  শুরু  করেছে,  যা অদ্যাবধি মানুষের অজানা, এটি না’ত নামে পরিচিত। এটি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে কবিতা রচনার সঙ্গে সম্পৃক্ত। প্রতি বছরই পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে না’ত সম্পর্কিত অসংখ্য বই প্রকাশিত হয়।

চতুর্থত. আল্লাহ তাআলা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামকে ইসলামের মূল কালিমার একটি সম্পূর্ণ অংশ করেছেন। অর্থাৎ ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুলাহ’− (আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর রাসুল)। প্রত্যেক আমলদার মুসলমানই এই কালিমা তাদের জীবনের প্রাত্যহিক রুটিন হিসেবে বারবার উচ্চারণ করে। এভাবে অসংখ্য মানুষ তাদের জীবনের প্রতিটি দিন অসংখ্যবার মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নাম উচ্চারণ করে থাকে।

পঞ্চমত. আল্লাহ তাআলা মুসলমানদেরকে তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালামের− ওপর দরুদ পাঠ করার আদেশ দিয়েছেন। অসংখ্য মানুষ তা সম্পাদন করে এবং এভাবে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নাম উচ্চারণ করে এবং তাদের প্রাত্যহিক জীবনে তাঁর গুণগান করে।

ষষ্ঠত. আল্লাহ তাআলা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামকে আযানের অবিচ্ছেদ্য অংশ করেছেন, যা প্রতিদিন পাঁচবার করে পৃথিবীর প্রতিটি মসজিদ থেকে ধ্বনিত হয়। সেহেতু মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামও সারা বিশ্বে দৈনিক পাঁচবার উচ্চারিত হয়। অধিকন্তু যদি কেউ ভূগোলকের দিকে লক্ষ করে তবে দেখতে পাবে, পৃথিবীর কোথাও না কোথাও সবসময় কোনো না কোনো নামাজের ও আযানের সময় বিরাজ করে। এভাবে দিন-রাতের চক্রাবর্তের চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে এমন কোনো ঘণ্টা অতিক্রান্ত হয় না, যখন পৃথিবীর কোথাও না কোথাও মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নাম উচ্চারিত হয় না। এ-কথাকেই কুরআন মাজিদে এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে- ‘আর আমি তোমার (মর্যাদার) জন্য তোমার স্মরণকে সমুন্নত করেছি।’

পূর্বোক্ত পৃষ্ঠাসমূহ কুরআন মাজিদের বহু ভবিষ্যৎবাণীর বর্ণনা দেয়। এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায়, কোনো মানুষই এমন জ্ঞানের অধিকারী হতে পারে না যা কুরআন মাজিদের এসব ভবিষ্যৎবাণী ধারণ করবে। একজন মানুষ কিছু সঠিক অনুমান তৈরি করতে পারে। কিন্তু কুরআন মাজিদের ভবিষ্যৎবাণীর বৈচিত্র্যময়তা ও গুণগত মান পরিষ্কার সাক্ষ্য বহন করে যে, একমাত্র আল্লাহ তাআলাই কুরআন মাজিদের জ্ঞানের উৎস।

এটা লক্ষ করা ও পর্যবেক্ষণ করা খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ যে, কুরআন মাজিদ দুই ধরণের ভবিষ্যৎবাণী প্রদান করে। কিছু ভবিষ্যৎবাণী নির্দিষ্ট ও স্বল্পস্থায়ী। কিন্তু অধিকাংশই সাধারণ ও দীর্ঘস্থায়ী। যদি কুরআন মাজিদ কেবল বিশেষ ও স্বল্পস্থায়ী ভবিষ্যৎবাণীসমূহ উল্লেখ করত, যেমন- আবু লাহাবের ধ্বংস সাধন, রোমকদের বিজয়, মদিনা থেকে ইহুদিদের উচ্ছেদ- তবে অবিশ্বাসী ও কাফিররা এগুলোকে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ধারণা-অনুমান বলে আখ্যা দিতে পারত। যাহোক, কুরআন মাজিদ বহু সাধারণ ও দীর্ঘ মেয়াদী ভবিষ্যৎবাণীর উল্লেখ করে, যেমন-মক্কার নিরাপত্তা, হজ্জের জন্য সফর, ইহুদি ও খৃস্টানদের ভূমিকা ইত্যাদি।

একজন সচেতন মানুষ ধারণা করতে পারে না যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সময় থেকে এত অগ্রসর হয়ে এসব বিষয় অনুমান করেছেন। আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজিদে এসব ভবিষ্যৎবাণী তাঁর নিদর্শন হিসেবে রেখেছেন যাতে মানুষ এসব বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে পারে এবং তাঁর এই কিতাবকে তাদের জীবন পরিচালনার জন্য আসমানি নির্দেশিকা হিসেবে গ্রহণ করে।

‘নিশ্চয় এটি মহিমান্বিত কুরআন। যা আছে সুরক্ষিত কিতাবে। কেউ তা স্পর্শ করবে না পবিত্রগণ ছাড়া। তা সৃষ্টিকুলের রবের কাছ থেকে নাজিলকৃত তবে কি তোমরা এই বাণীকে তুচ্ছ জ্ঞান করছ? আর তোমরা তোমাদের রিজিক বানিয়ে নিয়েছ যে, তোমরা মিথ্যা আরোপ করবে? সুতরাং কেন নয়, যখন রুহ কণ্ঠদেশে পৌঁছে যায়। আর তোমরা তখন কেবল চেয়ে থাক। আর তোমাদের চাইতে আমি তার খুব কাছে; কিন্তু তোমরা দেখতে পাও না। তোমাদের যদি প্রতিফল দেয়া না হয়, তাহলে তোমরা কেন ফিরিয়ে আনছ না রুহকে, যদি তোমরা (তোমাদের স্বাধীনতা ও কুরআন অমান্য করার ক্ষেত্রে) সত্যবাদী হও? (ওয়াকিয়া, ৫৬ : ৭৭-৮৭)

আল কুরআনের ১৬০ মুজিজা ও রহস্য বইটির সকল লেখনী পড়তে নিন্মের লিঙ্ক সমূহে ভিজিট করুনঃ

এই ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে তাহলে দয়া করে ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ একে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন