মূল: আরজ আলী সমীপে । লেখক: আরিফ আজাদ । ওয়েব সম্পাদনা: আবু বক্কার ওয়াইস বিন আমর

আরজ আলী মাতুব্বর উনার লেখা সত্যের সন্ধান বইয়ের শুরুর দিকে বলেছেন,

“জগতে এমন অনেক বিষয় আছে যেসব বিষয়ে দর্শন বিজ্ঞান ও ধর্ম এক কথা বলে না ।”

প্রথমত জগতের কোন কোন বিষয়ে দর্শন বিজ্ঞান ও ধর্ম এক কথা বলে না তা আরজ আলী সাহেব উল্লেখ করেন নি । দ্বিতীয়ত, জগতের কিছু কিছু বিষয়ে যে দর্শন, বিজ্ঞান আর ধর্ম এক কথা বলে না তা আসলে সত্য । সত্য এ কারণে যে জগতের সকল বিষয়ে সমানভাবে দর্শন বিজ্ঞান ও ধর্ম কথা বলতে হয় না । আরজ আলী সাহেব যে ভুলটা শুরুতেই করে বসেছেন তাহলো, তিনি দর্শন, বিজ্ঞান ও ধর্মকে এক করে ফেলেছেন । অথচ, একথা স্বীকার্য যে, এই তিনটি বিষয়ের আলোচ্য বস্তু ভিন্ন ভিন্ন ।

পদার্থ কি কি দিয়ে গঠিত তা বিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয় । ধর্মে পদার্থের গঠন এর সরাসরি কোন পাঠ নেই । আবার ব্যভিচার করলে কেন শাস্তি পাওয়া উচিত সে পাঠ ধর্মের, কোন কোন দর্শনে কিছু বলা থাকলেও, বিজ্ঞানে এটার উত্তর নেই । তাহলে দেখা যাচ্ছে, ধর্ম-দর্শন আর বিজ্ঞানের বিষয়টি এক নয় । এমতাবস্তায় ভিন্ন ভিন্ন আলোচনার জিনিসকে একই বাটখারা রেখে পরিমাপ করাটা নিতান্তই বোকামি ।

একই পৃষ্ঠায় আরজ আলী সাহেব লিখেছেনঃ

“সাধারণত আমরা যাকে ধর্ম বলি, তাহা হইলো মানুষের কল্পিত ধর্ম । যুগে যুগে মহানজ্ঞানীগণ এই বিশ্বের স্রষ্টা ঈশ্বরের প্রতি মানুষের কর্তব্য কি তাহা নির্ধারণ করিবার প্রয়াস পাইয়াছেন । ‘স্রষ্টার প্রতি মানুষের কি কোনো কর্তব্য নাই ? নিশ্চয়ই আছে’ -এরূপ চিন্তা করিয়া তাহারা ঈশ্বরের প্রতি মানুষের কর্তব্য কি তা নির্ধারণ করিয়া দিলেন । অধিকন্ত, মানুষের সমাজ ও কর্ম জীবনের গতিপথও দেখাইয়া দিলেন সেই মহাজ্ঞানীগণ । এ রূপে হইল কল্পিত ধর্মের আবির্ভাব”

আরজ আলী সাহেব উনার পুরো বই জুড়ে দর্শন, বিজ্ঞান আর যুক্তিবোধের জয় গান গাইলেও, বইয়ের শুরুতে কোন রকম তথ্য, উপাত্ত, পরিক্ষালদ্ধ প্রমাণাদি ছাড়াই দাবি করে বসলেন যে, ধর্মগুলো কথিত ধর্মগুরুদের বানানো । মূল আলোচনায় যাওয়ার পূর্বেই যিনি নিজ বিশ্বাসের উপর রায় দিয়ে ফলাফল জানিয়ে বসেন, তিনি আমাদের ঠিক কতটুকু ‘সত্যের সন্ধান’ দিতে পারেন ? ব্যাপারটা অনেকটা দুর্নীতিগ্রস্ত সরকার এর মতো, যে প্রশাসন, মিডিয়া সব কিছু নিজের আয়ত্বে রেখে জনগণের উদ্দেশ্যে ঘোষণা দেয় –‘আসো, আজ আমি তোমাদের শিখাবো সুষ্ঠু নির্বাচন কাকে বলে ।’ আরজ আলী সাহেবের অবস্থাও ঠিক দুর্নীতিগ্রস্ত সেই সরকারের মত নয় কি ?

মাতুব্বর সাহেব বলেছেন,

“হিন্দুদের নিকট গোময় (গোবর) পবিত্র । অথচ অহিন্দু মানুষ মাত্রই অপবিত্র । পক্ষান্তরে মুসলমানদের নিকট কবুতরের বিষ্ঠাও পাক, অথচ মুসলমান মাত্রই নাপাক । পুকুরের সাপ, ব্যাঙ পচিলেও উহার জল নষ্ট হয় না, কিন্তু বিধর্মী মানুষ উহা ছুঁইলেই অপবিত্র । কেহ একথা বলেন যে, অমুসলমানি পর্ব উপলক্ষে কলা, কচু, পাঠা বিক্রিও মহাপাপ । এমন কি মুসলমানের দোকান থাকিতে হিন্দুদের দোকানে কোন কিছু ক্রয় করাও পাপ । এই কি মানুষের ধর্ম ? নাকি ধর্মের নামে সাম্প্রদায়িকতা ?”

আরজ আলী সাহেব শুরুতেই হিন্দু ধর্মের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ টেনেছেন তা কতটুকু সত্য আমি জানি না, তবে হিন্দুধর্মের বর্ণপ্রথা সম্পর্কে কিছু ধারণা আছে বৈকি ! সে মতে উচ্চবর্ণের কোন হিন্দু নিম্নবর্ণের কোন হিন্দুর পাশ কাটিয়ে যাওয়াটাকে পাপ মনে করে । এমনকি একটা সময় নিম্নবর্ণের হিন্দুদের তাদের পবিত্র ধর্ম গ্রন্থ পড়া দূরে থা,ক ছোঁয়াটাও নিষিদ্ধ ছিল পুরোহিত কর্তৃক । পুরোহিত-তন্ত্রের এ বিধান এখনো হিন্দুধর্মে বলবৎ আছে কিনা জানিনা, তবে ভারতের অনেক জায়গায় এই রীতির এখনো চর্চা হতে পারে ।

আরজ আলী সাহেব যে ভুলটা করেছেন তা হলো, তিনি হিন্দু ধর্মের এই কলাচারের সাথে ইসলামও গুলিয়ে ফেলেছেন । উনি বলেছেন, মুসলমানদের কাছে অমুসলমানমাত্রই নাপাক । কিন্তু ইসলামের দিকে তাকালে আমরা ঠিক এর বিপরীত চিত্রটাই দেখতে পাই । আমরা সকলেই জানি রাসুল সাঃ ছোটবেলাতেই মা-বাবা দুজনকে হারিয়েছিলেন । তখন থেকেই তিনি তার আপন চাচা আবু তালিবের গৃহেই বড় হন । চাচা আবু তালিব রাসুলুল্লাহ সাঃ কে নিজের আপন ছেলের মতই দেখাশোনা করেন, বড় করেন ।

উল্লেখযোগ্য বিষয়, রাসূল সাঃ এর চাচা আবু তালিব কিন্তু মুশফিক ছিলেন । এমনকি মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি ঈমান আনেনি । আরজ আলী সাহেবের মতে, ইসলামে অমুসলিম মাত্রই যদি অপবিত্র হবে, তাহলে ইসলামের সর্বশেষ নবীকে আল্লাহ তাআলা চাচা আবু তালিবের বাসায় রেখে কেন বড় করে তুলবেন ? একজন অপবিত্র লোকের সোহবতে ? আশ্চর্য না ব্যাপারটা ?

এমনও প্রমাণ পাওয়া যায়, চাচা আবু তালিবের মৃত্যু শয্যায় উনার পাশে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপস্থিত ছিলেন এবং উনাকে কালেমা পাঠ করার জন্য অনুরোধ করেন । এখন, ইসলামে অমুসলিম ব্যক্তি মাত্রই যদি অপবিত্র হয়, নাপাক হয়, তাহলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিভাবে উনার চাচা, যিনি একজন মুশরিক ছিলেন, তার নিকট অবস্থান করেন ?

মূলত আরজ আলী সাহেব এই জায়গায় এসে যে ভুলটা করেছেন সেটা হলো, ইসলামের পাক-নাপাকের যে কনসেপ্ট, সেই কনসেপ্ট ভদ্রলোক গুলিয়ে ফেলেছেন ।

পবিত্র কুরআনের যদিও অপবিত্র ঘোষণা করা হয়েছে । বলা হচ্ছে,

“হে মুমিনগণ, মুশরিকরা অপবিত্র । কাজেই তারা যেন এ বছরের পর আর কখনই মসজিদুল হারামের কাছে না আসতে পারে ।”

আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, এখানে মুশরিকরা অপবিত্র বলতে তাদের শারীরিক অপবিত্রতা কথা বোঝানো হচ্ছে । কিন্তু ব্যাপারটা আসলে তা নয় । এখানে যে ‘অপবিত্রতা’ –এর কথা বলা হয়েছে তা শারীরিক নয়; বরং আত্মিক । এবং সকল প্রসিদ্ধ তাফসীরে এই কথাটাই জোরালোভাবে বলা হয়েছে । যেমন- তাফসীরে মা’রেফুল কুরআনের এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হচ্ছে,

“আসলে এখানে দৈহিক নয়; বরং আর্থিক অপবিত্রতার কথাই বলা হচ্ছে । তাদের শরীর নোংরা, এ কথা বলা হয়নি । এটা কুরআনের বিশেষ বাচনভঙ্গি ।

প্রশ্ন আসতে পারে, আত্মিক অপবিত্রটাই আবার কি রকম ? আর মুশফিকরা কেন আত্মিকভাবে অপবিত্র ? এই প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে আমাদের জানতে হবে ইসলামের একেবারে গোড়ার কনসেপ্ট । ইসলামের মূল ভিত্তির উপরে দাঁড়িয়ে আছে সেটা হল তাওহীদ । ‘তাওহীদ’ শব্দের অর্থ ‘একত্ববাদ’ ।

ইসলামের একমাত্র উপাস্য আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা । এর বাইরে আর কোন উপাস্য ইসলামে নেই । আল্লাহর বাইরে অন্য কারো ইবাদত করা ইসলামে সর্বোচ্চ পর্যায়ের পাপ । এটা এমন পর্যায়ের পাপ, যার কোন ক্ষমা নেই । ইসলামে আল্লাহকে একমাত্র উপাস্য সত্তা, কুরআনের বহু জায়গায় তার উল্লেখ আছে । যেমনঃ

“তার কোন শরিক নেই”

১. সূরা আত-তাওবা (০৯):২৮

২. তাফসীরে মা’রেফুল কুরআন, সূরা আত-তাওবা (০৯):২৮

৩. সূরা আল-আনআম (০৬):১৬৩

“তার সমকক্ষ কেউ নেই”

ইসলামই একমাত্র আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে সাহায্য চাওয়াও শির্কের পর্যায়ভুক্ত । যেমন- সূরা ফাতিহায় বলা হচ্ছে,

“আমরা তোমারই ইবাদত করি আর কেবল তোমার কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করি”

তাহলে আমরা দেখতে পাচ্ছি ইসলামের একমাত্র উপাস্য কেবল আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা । তার বাইরে অন্য কারো পূজা, ইবাদত করা ইসলামে হারাম । কিন্তু মুশরিকদের ধর্মীয় নিয়ম তার উল্টো । মুশফিকরা একই সাথে অনেক দেব-দেবীর পূজা করে । তাওহীদের যে কনসেপ্ট, তার একেবারে বিপরীত তাদের অবস্থান ।

ইসলামের দৃষ্টিতে যারা তাওহীদবাদী, যারা কেবল আল্লাহকেই একমাত্র উপাস্য হিসাবে মানে, যারা কেবল আল্লাহর ইবাদত করে, তারা মনের দিক থেকে পবিত্র । আর যারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য অনেকগুলো দেব-দেবীর পূজা করে, উপাস্য জ্ঞান করে, তারা মনের দিক থেকে অপবিত্র । এমতাবস্থায় হারাম শরীফের মতো মুসলিমদের পবিত্র জায়গায় একই সাথে তাওহীদবাদী এবং মুশরিকদের অবস্থান থাকতে পারে না । তাই আত্মিক দিক থেকে অপবিত্র ঘোষণা করে বায়তুল হারামের তাদের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ করেছেন । কিন্তু এটাকে আরজ আলী সাহেব শারীরিক অপবিত্রতার সাথে গুলিয়ে বলেছেন, ‘অমুসলমান ছুইলেই ইহা অপবিত্র হয় ।’

মুশরিকদের যদি শারীরিকভাবে অপবিত্র ঘোষণা করা হতো, তাহলে রাসুলুল্লাহ সাঃ অবশ্যই চাচা আবু তালিবের সাথী রকম মেলামেশা করতেন না । তিনি অবশ্যই অমুসলিমদের সাথে চুক্তি করতেন না । এছাড়াও, ইসলামের ইতিহাস ঘাঁটলে প্রমাণ পাওয়া যাবে , যেখানে মুসলিমরা অমুসলিমদের সাথে বসবাস করত, ব্যবসা-বাণিজ্য করত । এমনকি ইসলামের ইতিহাসে অন্যতম যে ঘটনা ‘মদিনা সনদ’ই তো করা হয়েছে ইহুদীদের সাথে ।

আরজ আলী সাহেব বলেছেন, ইসলামে নাকি মুসলমানদের দোকান থাকতে হিন্দুদের দোকান থেকে কোন কিছু ক্রয় করাও পাপ । এই ফতুয়াটাও আরজ আলী সাহেব কোথায় পেয়েছেন বা কার কাছ থেকে শুনেছেন আমি জানি না । তবে, ইমাম বুখারি তার সহিহ আল-বুখারীতে উল্লেখ করেছেন,

আব্দুর রহমান ইবনে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু বলেন, ‘আমরা রাসূল সাঃ  এর সাথে ছিলাম । তখন এক মুশরিক ব্যক্তি তার কিছু ভেড়াসহ আমাদের কাছে এলো । রাসুল সাঃ তাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, এগুলো কি বিক্রির জন্য, নাকি হাদিয়ার জন্য ? এরপর রাসূল সাঃ তার নিজের জন্য ওই ব্যক্তির কাছ থেকে একটি ভেড়া ক্রয় করে নিলেন ।

তাহলে আমরা দেখতে পাচ্ছি, আরজ আলী সাহেব ‘অমুসলিম ব্যক্তি মাত্রই নাপাক’, তাদের কাছ থেকে কিছু কেনাও যাবে না’ মর্মে ইসলামের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ দাঁড় করিয়েছেন তা সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন । বরং আমরা জানলাম, রাসুলুল্লাহ সাঃ ব্যক্তি জীবনে অমুসলিম পরিবারে বড় হয়েছেন, অমুসলিমদের সাথে ব্যবসা করেছেন, চুক্তি করেছেন, ক্রয়-বিক্রয় করেছেন, এতদসত্ত্বেও, ইসলামের বিরুদ্ধ এরকম ভিত্তিহীন, বানোয়াট, মনগড়া অভিযোগ আনার হেতু কি আরজ আলী সাহেবের ভক্তকুল আমাদের জানিয়ে বাধিত করবেন ?

আরজ আলী মাতব্বরের অভিযোগ তুলেছেন এই মর্মে যে, ধর্ম নাকি জ্ঞান অর্জনে বাঁধা প্রয়োগ করে । তিনি বলেছেন,

“এই যে জ্ঞানের অগ্রগতিতে বাধা, মনের অদম্য স্পৃহায় আঘাত, আত্মার অতৃপ্তি, ইহারই প্রতিক্রিয়া- মানুষের ধর্মকর্মে শৈথিল্য । এক কথায় -মন যা চায়, ধর্মের কাছে তাহা পায়না । মানুষের মনের ক্ষুধা অতৃপ্তই থাকিয়া যায় । ক্ষুধার্ত বলদ যেমন রশি ছিড়িয়া অন্যের ক্ষেতের ফসল এ উদরপূর্তি করে, মানুষের মনও তেমন কর্মক্ষেত্রে সীমা অতিক্রম করিয়া ক্ষুধা নিবৃত্তের জন্য ছুটিয়া যায় দর্শন আর বিজ্ঞান এর কাছে ।”

আরজ আলী সাহেবের এই কথাগুলো মোটাদাগে অন্য ধর্মের সাথে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ বলতে পারিনা, কিন্তু ইসলামের সাথে  ছিটেফোঁটা সম্পর্কও নেই ।

হিন্দু ধর্মে একটা সময় নিম্নবর্ণের হিন্দুরা তাদের ধর্মগ্রন্থ স্পর্শ করতে পারতো না । শুধু ব্রাহ্মণরাই পূজার্চনা, উপাসনা করতে পারত । খ্রিস্টধর্মের চার্চ কর্তৃক বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানের উপর খড়গহস্তে নেমে পড়ার কাহিনীও সবার জানা । কিন্তু ইসলামের ইতিহাসে এরকম কোনো ঘটনা নেই, যেখানে ইসলামের জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চায় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে । বরং, ইসলাম বারবারই জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় উদ্ধুদ্ধ করে এসেছে । বিজ্ঞানে মুসলিমদের অবদান সর্বজনবিদিত । চিকিৎসা বিজ্ঞান, রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান মুসলিম বিজ্ঞানীদের রয়েছে অভূতপূর্ব অবদান । অন্ধকার ইউরোপ সর্বপ্রথম আলোকবর্তিকা হাতে ইসলাম প্রবেশ করেছে । বিজ্ঞান, দর্শন, সাহিত্য- সবখানে মুসলিমদের ছিল জযজয়কার ।

আল কুরআনে জ্ঞানার্জনের প্রতি বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে । আল কুরআন নাযিলের প্রথম যে শব্দ, সেই শব্দ ছিল-পড়ো । যে জানে এবং সে জানেনা তাদের মধ্যকার পার্থক্য নির্ণয় করতে গিয়ে কুরআন বলেছেঃ-

“যারা জানে, আর যারা জানে না, তারা কি কখনো সমান হতে পারে?”

সুন্দর একটি পার্থক্য টেনে কুরআন বুঝিয়ে দিল যে, যারা জানে তারা উত্তম তাদের চেয়ে, যারা জানেনা । রাসুল সাঃ বলেছেন,

“প্রত্যেক মুসলিমের জন্য জ্ঞান অর্জন করা ফরজ ।”

১. সূরা আয-যুমার

২. ইবনে মাজাহ, হাদিস-২২৪; মিশকাত, হাদিস-২১৮

ইসলামের ইতিহাসের দিকে তাকালে এমন বহু মুসলিম বিজ্ঞানীদের নাম আমরা দেখতে পাই যারা তাদের কর্মের মাধ্যমে বিজ্ঞান, দর্শনজগতে অবদান রেখেছিলেন । তাদের নাম সারা বিশ্বের মানুষ স্মরণ রেখেছে । জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় মুসলিমদের অবদানের কথা স্বীকার করতে গিয়ে বর্তমান সময়ের বিখ্যাত নাস্তিক রিচার্ড ডকিন্স একবার টুইট করেছিলেন এই বলে- 1000 years ago, the Islamic golden age embraced all the world’s learning, books and Science. Can we have a new islamic golden age, please ?

নাস্তিকরাও একথা অকপটে স্বীকার করে যে, ইসলাম কখনই জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার বিরুদ্ধে ছিল না; বরং জ্ঞান-বিজ্ঞানকে সম্প্রসারিত করার জন্য ইসলাম যা করেছে, পৃথিবীর অন্য কোন ধর্ম তা করেনি । তাছাড়া ধর্মের সাথে বিজ্ঞানের যে দ্বন্দ্বের কথা আরজ আলী সাহেব উল্লেখ করেছেন, তা কতটুকু সত্য, যেখানে ফ্রান্সিস বেকন, কোপার্নিকাস, গ্যালিলিও, আইনস্টাইন এবং নিউটনের মত বিজ্ঞানীরা ধর্ম এবং ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস করতেন ?

আরজ আলী সাহেব লিখেছেন,

“অধিকাংশ ধর্ম এবং ধর্মের অধিকাংশ তথ্য অন্ধবিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত ।”

এবার অবশ্য আরজ আলী সাহেব ঠিক কথা বলেছেন । ধর্মের কিছু তথ্য অবশ্যই বিশ্বাসের উপর নির্ভর করে, যেমন- আল্লাহকে বিশ্বাস, জান্নাত-জাহান্নামের বিশ্বাস, আখেরাত, ফেরেশতা ইত্যাদিতে বিশ্বাস । একজন মুসলিম এ সব কিছু না দেখেই বিশ্বাস করে । পবিত্র কুরআনের শুরুতেই বলা হয়েছে,

“যারা অদৃশ্যে বিশ্বাস করে”

ঈমানের মুল বিষয় হচ্ছে গায়েবে বিশ্বাস । এমন কিছুতে বিশ্বাস করা যা দেখা যাচ্ছে না, ধরা যাচ্ছে না, ছোঁয়া যাচ্ছে না । মানুষ চাইলেই প্রিতিবিতে বসে আল্লাহ্‌কে দেখেতে পারবে না । সে চাইলেই জান্নাত জাহান্নাম অবলকন করতে পারবে না । ফেরেশতাদের সাথে মতবিনিময় করতে পারবে না । সে পারবে না, কারন সে কিছু সীমাবদ্ধতার মধ্যে বন্দী । সেটা কি রকম ?

সেটা হচ্ছে মানুষ সময়ের বাইরে কল্পনা করতে পারে না । সে সময়ের ফ্রেমে বন্দী । সে অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ এই তিন ফ্রেমের মধ্যে বন্দী পাখির মতো ।  সে চিন্তা করতে পারে অতীতে কি হয়েছিল তা নিয়ে । সে চিন্তা করতে পারে আর কি হচ্ছে তা নিয়ে । চিন্তা করতে পারে আগামীকাল কি হতে পারে তা নিয়ে । কিন্তু এই অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎের বাইরে এসে কোন কিছুই সে কল্পনা করতে পারেনা । কারণ সে টাইম ফ্রেমের মধ্যে বন্দী । কিন্তু বাই ডেফিনিশন স্রস্টা কোন টাইম ফ্রেমে বন্দী নন ।  তিনি ভূত বর্তমান ভবিষ্যৎ সব কিছুর উর্ধে ।

মানুষের সীমাবদ্ধতার দরুন সে বাহ্যিক জগতেও অনেক কিছু দেখতে পায় না, অনেক কিছু শুনতে পায় না । যেমন ধরুন মানুষের চোখ । সাধারণত ৩৯০ থেকে ৭০০ ন্যানোমিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো মানুষ দেখতে পায় । এর চেয়ে কম বা এর চেয়ে বেশি আলো মানুষ দেখতে পারে না । কেন পারে না ? এটা মানুষের সীমাবদ্ধতা ।

আবার ধরুন মানুষের কান সাধারণত 20Hz-20,2000Hz এর মধ্যে থাকলেই কেবল আমরা শব্দ শুনতে পাই । এর চেয়ে কম বা বেশি হলে সেই শব্দ আমরা শুনতে পাই না । কেন শুনতে পাই না ? আমাদের সীমাবদ্ধতা ।

এত এত সীমাবদ্ধতা নিয়ে আমরা কিভাবে আশা করি যে স্রষ্টা আমাদের ল্যাবের অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে এসে ধরা দেবেন ? মানুষকে স্রষ্টা এ ক্ষমতা দেননি । এর জন্য তিনি বলেছেন তাকে না দেখে বিশ্বাস করতে হবে । তবে কি মানুষ কখনো স্রষ্টাকে দেখবে না ? অবশ্যই দেখবেন । তবে সেটা নির্দিষ্ট সময়ে । সেটি কোন সময় ? আখেরাত ।

কড়া বা হালকা বিজ্ঞানমনস্করা এতটুকু পড়ে হয়তো বা আমাকে দু-চারবার মনে মনে গালমন্দ করে ফেলেছেন । বলছেন, -‘না দেখে আবার বিশ্বাস কি?’

বিজ্ঞানকে যারা দেখে বিশ্বাস করতে অভ্যস্ত অথবা যারা যারা Seeing is believing তত্ত্বনুরাগী, তাদের জন্য আমাদের কাছে রয়েছে মহা দুঃসংবাদ । দুঃসংবাদটি হলো, বিজ্ঞান নিজেও এখন আর Seeing is believing তত্ত্বে বিশ্বাস করে না । কারণ, এতদিন ধরে যারা মহাবিশ্বকে জেনে ফেলেছি, বুঝে ফেলেছি, বলতে বলতে তৃপ্তির ঢেকুর তুলতেন, তাদের জন্য ভয়ঙ্কর দুঃসংবাদ শোনাচ্ছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ‘নাসা’ ।

তারা বলছে, এতদিন ধরে এতো বছর সাধনা করে আমার মহাবিশ্বের যতটুকু জেনেছি, সেটার পরিমান খুবই ক্ষুদ্র । নাসা স্পষ্ট করে জানাচ্ছে, আমাদের এই জানার পরিমাণ মাত্র ৫% এরও কম । বাকি ৯৫% তাহলে কি ? বাকি ৯৫% হলো ডার্ক ম্যাটার বা অদৃশ্য বস্তু । এই ৯৫% অদৃশ্য বস্তু নিয়ে আমাদের সমগ্র মহাবিশ্ব পরিবেষ্টিত । কিন্তু অদৃশ্যবস্তু গুলোকে আমরা বুঝতে পারছি না, দেখতে পাচ্ছি না । আমাদের শত শত বছরের উন্নত প্রযুক্তি প্রয়োগ করেও আমরা জানতে পারছি না যে, অদৃশ্য বস্তু আসলে কি আর এখানে কি হয় ।

NASA এর বিজ্ঞানীরা বলছে, ‘More is unknown than is known. No one expected this, no one knew how to explain it. But something was causing it . It is complete mystery. But it is an important mystery.’

তাদের মতে, ‘এটা যতটুকু না জানা গেছে, তার চেয়ে বেশি অজানা ।’

তাহলে এই অজানা বস্তুকে আমরা কি করবো ? বিজ্ঞানীরা কি করবেন ? পদার্থবিজ্ঞানীরা কি করবেন ? এগুলোকে অস্বীকার করবেন ? ‘নাই, নাই’ বলে পাশ’ কাটাবেন ? একদম না । বিজ্ঞানকে এগিয়ে নিতে হলে তাদের এ বিশাল পরিমাণ অদৃশ্য বস্তুকে বিশ্বাস করে আগাতে হবে । ধরে নিতে হবে যে, ‘আছে’ । এরা আছে ।

ব্যাপারটা খুব সুন্দর ভাবে তুলে ধরেছেন ডঃ জাফর ইকবাল । মানুষ যে আদতে প্রকৃতির সব রহস্যভেদ করতে পারবে না, তা এখনকার বিজ্ঞান অকপটে স্বীকার করে । অধ্যাপক জাফর ইকবাল, তাঁর লেখা ‘কোয়ান্টাম মেকানিক্স’ বইতে লিখেছেন,

“কাজেই যারা বিজ্ঞান চর্চা করে তারা ধরেই নিয়েছে আমরা যখন বিজ্ঞান এর পুরো প্রকৃতিটাকে বুঝে ফেলবো, তখন আমরা সবকিছু সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারবো । যদি কখনো দেখি, কোন একটা কিছু ব্যাখ্যা করতে পারছি না, তখন বুঝতে হবে এর পেছনের বিজ্ঞানটা তখনো জানা হয়নি । যখন জানা হবে তখন চমৎকার ব্যাখ্যা করতে পারবে । এক কথায় বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা বা ভবিষ্যৎবাণী সব সময় নিখুঁত এবং সুনিশ্চিত, কোয়ান্টাম মেকানিক্স বিজ্ঞানের এই ধারণাটি পুরোপুরি পাল্টে দিয়েছে । বিজ্ঞানীরা সবিস্ময়য়ে আবিষ্কার করেছেন যে, প্রকৃত আসলে কখনোই সবকিছু জানতে দেবে না । সে তার ভেতরের কিছু কিছু জিনিস মানুষের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখে । মানুষ কখনো সেটা জানতে পারবে না । সবচেয়ে চমকপ্রদ ব্যাপার হচ্ছে, এটা কিন্তু বিজ্ঞানের অক্ষমতা বা অসম্পূর্ণতা নয় । এটাই হচ্ছে বিজ্ঞান । বিজ্ঞানীরা একটা পর্যায়ে গিয়ে কখনোই আর জোর গলায় বলবে না ‘হবে’, তারা মাথা নেড়ে বলবে ‘হতে পারে’ ।”

অধ্যাপক জাফর ইকবালের কথার সারমর্ম এই যে, বিজ্ঞানীরা কোনদিনও প্রকৃতির সকল রহস্য উদঘাটন করতে পারবে না । এই না পারাটা কি বিজ্ঞান এবং বিজ্ঞানীদের অক্ষমতা ? জাফর ইকবাল বলেছেন, ‘না’ । এটা বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতা নয়; বরং এটাই বিজ্ঞানের ধর্ম । বিজ্ঞানীরা আর উঁচু গলায় বলতে পারবে না যে- ‘হবে’, তাদের বলতে হবে –‘হতে পারে’ ।

এই হচ্ছে বিজ্ঞানের অবস্থা । এই যে প্রকৃতির রহস্য উদঘাটন করতে পারছে না বা পারবে না, তার মানে কি আমাদের ধরে নিতে হবে যে এগুলোর অস্তিত্ব নেই ? নাহ । বিজ্ঞান মোটেও তা বলে না । বিজ্ঞান সেই না জানা, না দেখা, না বুঝতে পারা রহস্যতেও ঈমান আনে, বিশ্বাস করে । বিজ্ঞান এভাবেই আগায় । বিজ্ঞানকে এভাবেই আগাতে হয় । সুতরাং, আরজ আলী সাহেবের মতে শুধু ধর্মই ‘বিশ্বাস’ নিয়ে আগায় না, তাদের পরম পরিচিত বিজ্ঞানও আধুনিক কালে এতগুলো ঈমান নিয়ে চলে । এই ঈমান ছাড়া তারা এগুতে পারে না ।

এই অধ্যায়ের শেষের দিকে আরজ আলী সাহেব আরও মজার বিষয়ের অবতারণা করেছেন । তিনি লিখেছেন,

“আজকাল যেখানে সেখানে শোনা যাইতেছে যে, সংসারের নানা জিনিসপত্র হইতে ‘বরকত’ উঠিয়া গিয়াছে । কারন লোকের আর পূর্বের মতো ঈমান অর্থাৎ বিশ্বাস নেই । পূর্বের লোকের ঈমান ছিল, ফলে তারা সুখ-সাচ্ছন্দে বাস করিতো । আর আজ কাল মানুষের ঈমান নাই । তাই তাহাদের অভাব ঘোচে না । ঈমান নাই বলিয়াই ক্ষেতে আর সাবেক ফসল জন্মে না । ফলের গাছে ফল ধরে না । পুকুরে-নদীতে মাছ পড়ে না । ঈমান নাই বলিয়াই মানুষের উপর গজব রূপে কলেরা, বসন্ত, বন্যা-বাদল, অনাবৃষ্টি ইত্যাদি নানা প্রকার বালা মুসিবত নাজেল হয় । অথচ মানুষের হুশ হয় না । এইরূপ যে নানা প্রকার অভাব অভিযোগের জন্য ঈমানের অভাবকেই দায়ী করা হয়, তাহা কতটুকু সত্য ?”

আরজ আলী সাহেবের বক্তব্য হলো, মুসলিমগন বিশ্বাস কর যে, ঈমান কমে গেলে আয় রোজগার, সাংসারিক জিনিসপত্রাদি থেকে ‘বরকত’ উঠে যায় । আরজ আলী সাহেবের এই কথা শুনে আমার দাদির কথা মনে পড়ে গেল । আমার দাদী ছিলেন অশিক্ষিত, অর্থাৎ, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাবিহীন এক গ্রাম্য মহিলা । প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তো ছিলই না, আমার দাদি যে অন্ততপক্ষে স্বশিক্ষিত ছিলেন, এমনটাও নয় । ছোট বেলায় দাদির কাছে ঠিক এরকম গল্পই শুনতাম । মানুষের ঈমান চলে যাচ্ছে বলেই সংসারের আয় রোজগারে ভাটা পড়েছে, রোগে-শোকে ধরেছে । দাদির মতে, এসবের পিছনে একটাই কারণ -ইমানের ঘাটতি ।

কিন্তু বড় হয়ে যখন আমি ধর্মতত্ত্ব পড়াশোনা শুরু করলাম, ধর্মীয় বই পত্র অধ্যায়ন শুরু করলাম,সবিস্ময়য়ে লক্ষ করলাম, এতদিন দুঃখ দুর্দশা আর আয় রোজগার থেকে বরকত উঠে যাওয়ার জন্যই ঈমানের যে ঘাটতি দায়ী করা হচ্ছিল, তা সম্পূর্ণ বিপরীত ।

আমি যতদূর জানি, আরজ আলী মাতুব্বর সাহেবেরও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না । কিন্তু তিনি ছিলেন স্বশিক্ষিত । নিজে নিজে অনেক দূর পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন । শোনা যায়, বরিশাল বিএম কলেজের পাঠাগারে থাকা মোটা মোটা দর্শন, বিজ্ঞান, যুক্তিবিদ্যার ধর্মশাস্ত্র অধ্যয়ন করেছেন । ভদ্রলোক এতদসত্ত্বেও কেন তিনি মফস্বলে অশিক্ষিত মানুষগুলোর লোকমুখে প্রচলিত কিছু কুসংস্কারকে ইসলামের সাথে বেঁধে দিয়ে প্রশ্ন ছুড়েছেন, সেটাই আমি বুঝতে পারছি না ।

তার মতে, মুসলিমদের বিশ্বাস হলো, ঈমান দুর্বল হলে সংসারে আয় বরকত কমে যায় । আমার প্রশ্ন, এই জগত সংসারে মুহাম্মদ সাঃ এর চেয়ে বেশি ইমানদার, বেশি পরহেজগার, বেশি তাকওয়াবান, বেশি আমলকারী আর কেউ ছিল কি ? যদি না থাকে, তাহলে এই সর্বোচ্চ ইমানদার, সর্বোচ্চ পরহেজগার, সর্বোচ্চ তাকওয়াবান, সর্বোচ্চ আমলকারী ব্যক্তির ঘরে কেন একদিন চুলায় আগুন জ্বললে, চার দিন জ্বলত না ? কেন তাকে খেজুর পাতার চাটাই এ শুতে হতো, যার ফলে তার পিঠে, ঘাড়ে, দাগ পড়তো ? তিনি কি ইমানের ঘাটতি ছিল ? যদি না থাকে তাহলে কেন তাকে অনাহারে থাকতে হতো ? কেন নবী নন্দিনী ফাতেমা রাযিআল্লাহু আনহা তার পুত্রদের খেতে দিতে পারতেন না ?

তাহলে দেখা যাচ্ছে, রুজি-রোজগার বৃদ্ধি-ঘাটতি সব সময় ঈমানের উপর নির্ভর করে না, আর অভাব অনটন, দুর্দশা ইত্যাদিও সর্বদা দুর্বল ঈমানের ফল নয় । বরং অভাব অনটন, দুঃখ-দুর্দশা ইত্যাদি হল মজবুত ঈমানের ফল । যার ঈমান যত পাকাপোক্ত, তার জন্য পরীক্ষাও তত বেশী, ততো কঠিন । যার জ্বলন্ত উদাহরণ মোহাম্মদ সাঃ । রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

“দুনিয়া মুমিনদের জন্য জেলখানা এবং কাফেরদের জন্য জান্নাতের মতো”

জেলখানা কেমন ? খুব কি আরামের জায়গা, নাকি কষ্টের ? অবশ্যই জেল খানা কষ্টের জায়গা । রাসুল সাঃ মুমিনদের জন্য দুনিয়াকে সেই কষ্টের জায়গা, জেলখানার সাথে তুলনা করেছেন । আর জান্নাত কেমন ? জান্নাত হচ্ছে আরামদায়ক জায়গা । যেখানে কষ্ট নেই, দুঃখ নেই, ক্লান্তি নেই, অভাব অনটন কিচ্ছু নেই । রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাফেরদের জন্য দুনিয়াকে জান্নাতের সাথে তুলনা করেছেন ।

তাহলে বোঝা যাচ্ছে, দুনিয়ায় যে যত বেশী ঈমানদার, সে তত বেশি পরীক্ষার মধ্যে থাকবে, দুঃখ-কষ্টের পরীক্ষা, রোগ-শোকের পরীক্ষা ইত্যাদি । আর যার ঈমান নেই, তার পরীক্ষা কম । সে সুখে থাকবে, শান্তিতে থাকবে । তাহলে এখান থেকে আমরা দেখতে পেলাম, ইসলামী বিশ্বাস হিসেবে, ‘ঈমান দুর্বল থাকলে বা কমে গেলে বরকত উঠে যায়’ মর্মে যে তত্ত্ব আরজ আলী সাহেব আমাদের গিলাতে চেয়েছেন, তার সাথে মূল ইসলামের ছিটেফোঁটা সম্পর্কও নাই; বরং আসল কাহিনী আরজ আলী যা বলেছেন, তার বিপরীত ।

এ জন্য দুনিয়ার সামগ্রী সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে, তা ধোকার সামগ্রী । এটা দিয়েও আল্লাহ কাউকে পরীক্ষা করেন, আবার না দিয়েও পরীক্ষা করেন । ভালো-মন্দ উভয় অবস্থাই ঈমানদারের জন্য পরীক্ষায় বিষয় । যেমন কুরআনে বলা হচ্ছে,

‘আর আমি পরীক্ষা করি সুখ এবং দুঃখ দিয়ে যাতে তারা ফিরে আসে’

১. সহিহ মুসলিম, ২৯৫৬

২. সূরা আল আ’রাফ (০৭) ১৬৮

বরং আল্লাহ জানিয়ে দিয়েছেন যে যদি সব মানুষ কাফের হওয়ার আশংকা না থাকত তাহলে তিনি কাফেরদের ঘর-বাড়ি স্বর্ণ-রৌপ্য দিয়ে মুড়িয়ে দিতেন । কিন্তু দুনিয়াতেও তাদের পরিমিত প্রদান করেন । তবে কখনো কখনো ঈমান ও তাকওয়া থাকলে আল্লাহ তার আকাশস্থিত বরকত ও জমিনস্থ প্রভূত কল্যাণের দ্বার উন্মোচন করেন বলে ঘোষণা করেছেন । সেটাও মূলত পরীক্ষা । সেটাও ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি এসবকে ঈমানদার পরীক্ষার সামগ্রী হিসেবে গ্রহণ করে । কাউকে ধন-সম্পদ দিলে তাকে ভালোবাসার প্রমান যেমন নয়, তেমনি না দিলে ভালো না বাসার প্রমাণও তা নয় । কাফের-মুশরিকরাই শুধু দুনিয়ার জীবনের প্রাচুর্যকে স্রষ্ঠার ভালোবাসার নমুনা হিসেবে গ্রহণ করে থাকে ।

ইমানদারের দৃষ্টি আখিরাতের দিকে হওয়ার কারণে সে প্রাচুর্য দেখলে সর্বদা ভয়ে সন্ত্রস্ত থাকে, না জানি তার আখিরাতের হিসাব শূন্য হয়ে গেল । পবিত্র কুরআনে ঘোষিত হচ্ছে,

“কেউ পার্থিব সুখ সম্ভোগ কামনা করলে আমি যাকে ইচ্ছা সত্ত্বর দিয়ে থাকি; পরে তার জন্য জাহান্নাম নির্ধারিত করি যেখানে সে প্রবেশ করবে নিন্দিত এবং অনুগ্রহ হতে বঞ্চিত অবস্থায়”

রাসুল সাঃ এবং আমাদের পূর্বসূরী সাহাবায়ে কিরামও এমনটি বলেছেন ।

ইসলামের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ টানার পরে তিনি চীন, রাশিয়াসহ প্রভৃতি উন্নত দেশের উদাহরণ টেনে বোঝাতে চাইলেন, এই সমস্ত দেশের মানুষের কোন ধর্ম নেই । থাকলেও তারা আল্লা-বিল্লা করে না । তথাপি তাদের সংসার সোনায় সোহাগা । তাদের ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স ভর্তি টাকা পয়সা, ইয়া বড় বড় অট্টালিকা । তাদের দেশে রোগ-শোক কম । টাইফয়েড, কলেরা মহামারী অনেক আগেই সেখান থেকে তল্পি তল্পা নিয়ে বিদেয় হয়েছে । অথচ আমাদের দেশের মতো যে সকল গরিব দেশের মানুষ আল্লা-বিল্লা করে, তারা কেন গরীব হবে ? তাদের কেন না খেয়ে মরতে হবে ? তাদের কেন বাড়ি নেই, গাড়ি নেই ? এই সকল দেশে কেন কলেরা, টাইফয়েড এর মত রোগ মহামারী রূপে দেখা দিবে ?

আরজ আলী উনার সেই আগের ভুলের বৃত্তেই ঘুরপাক খাচ্ছেন । উনি মনে করছেন আল্লা-বিল্লা করলে আর পাক্কা মুমিন হলেই বুঝি আকাশ থেকে টাকার বস্তা ধপাস করে উঠোনে এসে পড়ে ।

আরজ আলী সাহেবদের এসব অভিযোগ পুরনো । আজ থেকে ১৪০০ বছর আগের কাফেররাও এই প্রশ্নগুলো করতো । তাদের প্রশ্নের জবাবে আল্লাহ বলেন,

“কাফেরদের নিকট পার্থিব জীবনকে মোহনীয় করা হয়েছে । ফলে তারা মুমিনদের বিদ্রুপ করে থাকে । বস্তুত কিয়ামতের দিন মুত্তাকীগণ তাদের চেয়ে উন্নত অবস্থায় থাকবে । আল্লাহ যাকে ইচ্ছা অপরিমিত রিযিক দিয়ে থাকেন ।”

আল্লাহ বলছেন, যারা কাফের, তাদের সামনে তিনি দুনিয়াকে মোহনীয় করে দিয়েছেন । ফলে দুনিয়া লাভের প্রতিযোগিতায় তারা বিভোর । এতই বিভোর যে, মুত্তাকীদের উদ্দেশ্যে তারা এই আরজ আলী সাহেবের মত বিদ্রুপমাত্মক প্রশ্ন করে, ‘তোমরা তো খুব আল্লা-বিল্লা কর, কই তোমাদের কষ্ট তো লাঘব হয় না? অথচ আমরা কিছু করি না, দেখো, আমরা কত সুখে আছি ।’

আল্লাহ পরিষ্কার করে বলে দিচ্ছেন, ‘বস্তুত কিয়ামতের দিন মুত্তাকীগণ তাদের চেয়ে উন্নত অবস্থায় থাকবে’ । অন্য আরেকটি আয়াতে আল্লাহ তা’আলা আরও সুস্পষ্ট করে বলেছেন,

“নিশ্চয়ই আমি তোমাদের পরীক্ষা করব ভয়, ক্ষুধা, ধন-সম্পদ, জীবন ও ফসলাদির ক্ষয়ক্ষতি মাধ্যমে । অতএব, (হে রাসুল), আপনি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ প্রদান করুন”

১. সূরা বাকারা (০২):১১২

২. সূরা বাকারা (০২):১৫৫

সুতরাং এই আয়াত থেকেও এটা সুস্পষ্ট যে, ভয়-ক্ষুধা-মৃত্যু-জীবন আর ফসলের ক্ষয়ক্ষতি কখনোই দুর্বল ঈমানের কারণ নয়; বরং তা আল্লাহর কাছ থেকে ঈমানদারদের জন্যে পরীক্ষাস্বরূপ । আরজ আলী সাহেবেরা যে ইসলামকে রিপ্রেজেন্ট করে ইসলামকে একহাত নেওয়ার চেষ্টা করে, সেই ইসলাম গ্রামের কুসংস্কার বৈ কিছু নয় । আসল ইসলামের সাথে দূরতম কোন সম্পর্ক নেই । কিছু সেই কুসংস্কারকে লক্ষ্যবস্তু ধরে আরজ আলী সাহেবেরা যতক্ষণ ধর্মতর্কে আসেন, তখন আমরা সেটাকে নিছক ছেলেমানুষি ছাড়া কিই-বা বলতে পারি ?

এরকম আরো অনেক হাস্যকর যুক্তি তর্ক আমরা সামনে দেখতে পাব । এই অধ্যায় শেষে উনি আরো যে কয়েকটি হাস্যকর তথ্য ইসলামের নামে ছুড়ে দিয়েছেন তা সংক্ষেপে আলোচনা করছি ।

তিনি লিখেছেন,

“বলা হয় যে, আল্লাহর অসাধ্য কোন কাজ নাই । বিশেষ বিশ্বাসী ভক্তদের অনুরোধে তিনি অসম্ভবকে সম্ভব করেন । সোলায়মান নবী নাকি সিংহাসনে বসিয়া সপরিষদ শুন্যে ভ্রমণ করতেন । তাই বলিয়া ‘আল্লাহতালা ইচ্ছা করলে জায়নামাজশুদ্ধ আমাকে নিমেষের মধ্যে মক্কায় পৌঁছে দিতে পারেন’ –এইরূপ বিশ্বাস কোন পীর সাহেবের আছে কি ? থাকিলে একবারও তা পরীক্ষা করিয়া দেখিয়াছেন কি ? না দেখিয়াই বা উড়োজাহাজে চড়িবার কারণ কি ? উড়োজাহাজে চড়িবার বিপদ আছে, ভাড়া আছে, আর সময়ও লাগে যথেষ্ট । তবুও উহার উপর জন্মিয়াছে বিশ্বাস ।”

মজার ব্যাপার হলো, আরজ আলী সাহেব আল্লাহর নবী রাসুলদের সাথে পীর সাহেবদের গুলিয়ে একাকার করে ফেলেছেন । ইব্রাহিম ‘আলাইহিস সাল্লাম আল্লাহর নবী ছিলেন । উনাকে তিনি আগুনের হাত থেকে বাচিয়েঁছেন । ইউনুস ‘আলাইহিস সালাম আল্লাহর নবী ছিলেন । উনাকে আল্লাহতালা মাছের পেট থেকে উদ্ধার করেছেন । সুলাইমান আঃ ছিলেন আল্লাহর নবী । তিনি পশু পাখির ভাষা বুঝতেন এবং জীনরা হাওয়ায় উড়ে তার সিংহাসন বহন করত । মুসা ‘আলাই সাল্লাম আল্লাহর নবী ছিলেন । উনি হাত থেকে লাঠি রাখলেই তা সাপ হয়ে যেত এবং মুসা ‘আলাই সাল্লাম আল্লাহর সাথে বিনা মাধ্যমে কথা বলার সুযোগ পেয়েছিলেন । ঈসা আঃ পেয়েছিলেন মৃতকে জীবন দান করার ক্ষমতা এবং কুষ্ঠ রোগীকে আরোগ্য দানের ক্ষমতা ।

আর মোহাম্মদ সাঃ ছিলেন আল্লাহর সর্বশেষ নবী ও রাসূল । তিনি মি’রাজের মাধ্যমে সরাসরি আল্লাহর সাথে সাক্ষাত ও কথা বলার সুযোগ লাভ করেছেন । তারা এই সব কিছু সুযোগ পেয়েছিলেন, কারণ- তারা আল্লাহর নবী, আল্লাহর রাসূল, আল্লাহর দূত ছিলেন ।

আরজ আলী সাহেব পীর সাহেবানদেরও এ রকম সুযোগ এর জন্য ‘ট্রাই’ করার উপদেশ দিচ্ছেন । কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই পীর সাহেব কি আল্লাহ প্রেরিত কোন নবী ? কোন রাসুল ? বা বিশেষ কোনো দূত ? যদি না হয়, তাহলে তারা কিভাবে এরকম সুযোগ লাভ করতে পারে ? তার কোনো সেন্স থেকেই বা আরজ আলী পীর সাহেবের কাছ থেকে এরকম প্রস্তাব রাখে যেখানে মুহাম্মদ সাঃ এর পরে দুনিয়ার বুকে শ্রেষ্ঠ মানব আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু এবং ওমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু আনহুরা এই সুযোগ পাননি ?

তিনি আরো লিখেছেন,

“অতীতে কোন কোন বোর্জগান হাঁটিয়ায় নদী পার হইতে পারিতেন । যেহেতু তাহাদের বিশ্বাস ছিল যে, নদী পার করিবেন আল্লাহ তাআলা । নৌকা বা জলযানের দরকার নাই । আর বর্তমানে খোদার উপর বিশ্বাস নাই, নদী পার হইতে সাহায্য লইতে হয় নৌকার ।”

পাঠক নিশ্চয় এতক্ষণে হাসা শুরু করেছেন । ভাবছেন আরে লোকটা কিসের সাথে কি মেলায় । আসলেই তা-ই । উনার জানা ইসলাম আর মূল ইসলাম এক নয় । উনি বিকৃত যে ইসলামকে চিনতেন বা জানতেন, সেটাকে পুঁজি করে এগিয়েছেন । খুব ভালো করতেন যদি কোনো ভালো আলমের সান্নিধ্য লাভের চেষ্টা করতেন । বোর্জগানের হেঁটে নদী পার হওয়া উনার কাছে যদি সঠিক ইসলাম হয়, তাহলে রাসুল সাঃ এর গাধার পিঠে চড়ে ব্যবসা-বাণিজ্যকে আমরা কি বলতে পারি ? উনি আরো লিখেছেন,

“সূফীগণ ধ্যানমগ্ন অবস্থায় পৃথিবীর কোথায় কী ঘটেছে তা জানিতে ও দেখিতে পাইতেন । এখন কয়টি লোকে উহা বিশ্বাস করে”

আবারও হাস্যকর কিছু কথাবার্তার ফুলঝুরি । একথা শরীয়তসম্মত যে, ভবিষ্যৎ বা গায়েবের জ্ঞান একমাত্র আল্লাহরই হাতে । এমনকি স্বয়ং রাসূল সাঃ পর্যন্ত গায়েব জানতেন না । ঠিক ততটুকুই জানতে, যতটুকু আল্লাহ তাকে জানাতেন । কুরআনুল কারীমে বলা হচ্ছে,

“আপনি বলুন, (হে রাসুল) আমি তোমাদের বলি না যে আমার কাছে আল্লাহর ভান্ডার রয়েছে । তাছাড়া, আমি গায়েবের ব্যাপারেও অবগত নই । আমি এমনও বলি না যে, আমি ফেরেশতা । আমি তো শুধু সে ওহীর অনুসরণ করি যা আমার কাছে আসে ।”

আরো বলা হচ্ছে,

“আপনি বলে দিন, (হে রাসুল) আমি আমার নিজের কল্যাণ সাধনের এবং অকল্যাণ সাধনের মালিক নই কেবল যা আল্লাহ চান (তাছাড়া) । আর আমি যদি গায়েবের খবর জানতাম, তাহলে বহু মঙ্গল অর্জন করে নিতে পারতাম । ফলে আমার কোন অমঙ্গল কখনও হতে পারত না ।”

যেখানে স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গায়েবের খবর রাখতেন না, সেখানে কোন সে পীরানে পীর যে রাসুলের চেয়েও অ্যাডভান্স ?

এসব কথা আমরা ইসলামের নামে প্রচলিত কুসংস্কারগুলোতে দেখতে পাই । কিন্তু আরজ আলী সাহেবের মত একজন দায়িত্ববান, স্বশিক্ষিত লোক যদি এসব কুসংস্কারকে হাতিয়ার করে ধর্মকে আক্রমণ করে বসে, তখন ব্যথিত হওয়া ছাড়া আমাদের আর কি-ই বা করার থাকে ?

১. সূরা আল আন’আম (০৬):৫০

২. সূরা আল আরাফা (০৭):১৮৮

আরজ আলী সমীপে–বইটির সকল লেখনী পড়তে নিন্মের লিঙ্ক সমূহে ভিজিট করুনঃ

এই ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে তাহলে দয়া করে ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ একে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন