মূল:নারীর হজ ও উমরাহ

ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

সম্পাদনা: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

(১) মসজিদে নববীর যিয়ারত এবং তাতে সালাত আদায়ের উদ্দেশ্যে যেকোনো সময় আপনার জন্য মদিনায় যাত্রা করা সুন্নাত। কারণ, মসজিদে নববীতে এক ওয়াক্ত সালাত আদায় করা, মসজিদে হারাম ছাড়া অন্য যে কোনো মসজিদে হাজার ওয়াক্ত সালাত আদায় করা অপেক্ষা শ্রেয়।

(২) মসজিদে নববীর যিয়ারতের জন্য ইহরাম বাঁধা বা তালবিয়া পড়ার কোনো প্রয়োজন নেই। মসজিদে নববীর যিয়ারতের সঙ্গে হজের কোনো রকম সম্পর্ক নেই।

(৩) মসজিদে নববীতে প্রবেশের সময় প্রথম ডান পা রাখবেন এবং বিসমিল্লাহ বলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লামের ওপর দরুদ পাঠ করবেন। আর আল্লাহর নিকট এ প্রার্থনা করবেন যে, তিনি যেন তাঁর রহমতের দ্বারসমূহ আপনার জন্য উন্মুক্ত করে দেন। এরপর নিম্নোক্ত দো‘আ পড়বেন:

«أَعُوْذُ بِاللهِ الْعَظِيْمِ وَوَجْهِهِِ الْكَرِِيْمِِ وَسُلْطَانِهِ الْقَدِيْمِِ مِنَ الشَّيْطَانِِ الرَّجِيْمِِ ، اللّهُمَّ افْتَحْ لِيْ أَبْوَابَ رَحْمَتِكَ»

অর্থাৎ বিতাড়িত শয়তানের প্ররোচনা হতে মহান আল্লাহ, তাঁর সম্মানিত সত্তা ও প্রাচীন বাদশাহির নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি। হে আল্লাহ! তুমি আমার জন্য তোমার রহমতের দ্বারসমূহ উন্মুক্ত করে দাও।

এ দো‘আ যে কোনো মসজিদে প্রবেশের সময়ও পাঠ করা যায়।

মসজিদে প্রবেশ করেই তাহিয়্যাতুল মসজিদের দু’রাকাত সালাত পড়বেন।

(৫) তারপর যখন মহিলাগণ ‘রাওদাহ’ নামক জান্নাতের বাগানে যাবেন তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উদ্দেশ্যে দুরুদ ও সালাম পেশ করতে পারেন।

(৬) পবিত্রতা অর্জন করতঃ মসজিদে কোবা যিয়ারত করে সেখানে সালাত পড়া আপনার জন্য সুন্নাত। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম নিজে তা করেছেন এবং অন্যদেরকেও উদ্বুদ্ধ করেছেন।

উল্লিখিত স্থানগুলো ছাড়া মদিনার আর কোনো মসজিদ বা অন্য কোনো জায়গা যিয়ারত করা শরী‘আত সম্মত নয়। অতএব, বিনা কারণে নিজেকে কষ্ট দেওয়া ও নিজের ওপর এমন বোঝা চাপিয়ে নেওয়া যাতে কোনই সাওয়াব নেই, বরং উল্টো পাপের সম্ভাবনা রয়েছে, এমন কাজ করা কারো উচিৎ নয়। আল্লাহ তা’লা আমাদের সবাইকে এগুলো মেনে চলার তাওফীক দান করুন।

আল্লাহর দরবারে কবুল না হওয়ার ভয় থাকা

প্রিয় বোন!

মহান আল্লাহ আপনাকে এ হজ আদায়ের মত গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য কবুল করেছেন এবং তাওফীক দিয়েছেন আর আপনাকে হজের সফরে এ পবিত্র ভূমিতে, উত্তম দিনগুলোতে যিকির, দো‘আ করার মতো সৌভাগ্যের অধিকারী করেছে এটাই তো একটি বিরাট নেয়ামত। এ নেয়ামতের কথা স্মরণ করে অন্য ধরনের ভয়ও আপনার মনে আসা উচিৎ আর তা হলো, আমার আমলগুলো কি আল্লাহর দরবারে কবুল হয়েছে?

কত মানুষ এমনও আছে যারা হজ থেকে শুধু কষ্ট ও মুসিবতই কুড়িয়েছে। তাদের অনেক আবার এমনও আছে তারা যখন বলেছে, “লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক” হে আল্লাহ! আমি আপনার দরবারে হাযির, তখন তাকে বলা হয়েছে, না তোমার হাজিরা গ্রহণ করা হয়নি। তোমার হজ সওয়াবের পরিবর্তে গুনাহের জন্ম দিয়েছে।

এ জন্য সালফে সালেহীন সব সময় নেক আমল করার ব্যাপারে সচেষ্ট থাকতেন। আমল করার পর তাদের ভয় হতো যে, আমলটি আল্লাহর দরবারে কবুল হয়েছে কি না? আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলতেন: “তোমরা নেক কাজ করার চেয়ে কাজটি কবুল হয়েছে কি না এ দিকে বেশি গুরুত্ব দাও, তোমরা কি শোন না মহান আল্লাহর কথা, তিনি বলেছেন: “আল্লাহ তো কেবল মুত্তাকীদের থেকে কবুল করে থাকেন।”[1]

প্রিয় বোন!

আল্লাহর নিকট কোনো আমল কবুল হওয়ার বড় প্রমাণ হলো:

যাবতীয় গুনাহের কাজ থেকে খাঁটি তাওবাহ করার তাওফীক হওয়া এবং ভবিষ্যতে আল্লাহর দীন ও রাসূলের আনুগত্যের ওপর দৃঢ় থাকতে পারা। গুনাহ করার পর সৎকাজ করা কতই না উত্তম তার থেকে উত্তম হলো সৎকাজের পর সৎকাজ করতে সক্ষম হওয়া এবং এর ওপর দৃঢ় থাকা। অপরদিকে সবচেকে দুঃখ ও দুর্ভাগ্যজনক কাজ হলো, সৎ কাজের পর অসৎ কাজের মাধ্যমে সে সৎকাজকে নিশ্চি‎হ্ন‎‎ করে দেওয়া।

সম্মানিতা বোন!

আজ আপনি আল্লাহর আনুগত্যে অবগাহন করে সম্মানিত হচ্ছেন সুতরাং এ ব্যাপারে সদা সতর্ক থাকা প্রয়োজন যেন কাল সে আনুগত্যের সম্মানকে অপরাধ ও অলসতা দ্বারা অপমানিত না করেন।

প্রিয় বোন!

আপনার মনে করা উচিৎ যে, আপনি নবী স্ত্রী আয়েশার গোষ্ঠীভুক্ত। আপনার সম্মান ও প্রতিপত্তি নবী পত্নীদের মত। আপনি সামান্য নাটক ও খারাপ পত্রিকার খপ্পরে পড়ে নিজেকে, নিজের আত্মসম্মানকে কোনো ক্রমেই নীচু হতে দেবেন না। আপনার কান আজ আজানের ধ্বনিতে কুহরিত, মুখ কুরআনের বাণীতে মুখরিত। আপনি আপনার এ কান ও মুখকে গান-বাদ্যের মত শয়তানি কর্মকাণ্ডের মধ্যে রেখে বিষাক্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত করবেন না।

প্রিয় বোন!

আপনার সন্তানগুলো আপনার কাঁধে আমানতস্বরূপ। তাদেরকে দ্বীনের ওপর পরিচালনা করা এবং তাদের মধ্যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল এবং দীনের মহব্বত জাগ্রত করা ও তাতে বলীয়ান করা আপনার ঈমানী দায়িত্ব। তাদেরকে কখনো অন্যায় করার সুযোগ করে দেওয়া। খারাপ বন্ধু-বান্ধব, সঙ্গীদের সংশ্রব থেকে তাদের মুক্ত রাখুন।

আপনি নিজেকে তাদের জন্য আল্লাহর ইবাদত, আনুগত্য ও সচ্চরিত্রতার ক্ষেত্রে অনুসরণীয় ও অনুকরণীয় ব্যক্তিত্বরূপে পেশ করুন।

প্রিয় বোন!

আপনার স্বামী আপনাকে একজন নেক স্ত্রী রূপে দেখতে চায়। যার দিকে তাকালে তার অন্তর খুশিতে ভরে যায়। যাকে কোনো নির্দেশ দিলে সে তা খুশি মনে করতে সদা প্রস্ত্তত থাকে। সুতরাং সে রকম হওয়ার চেষ্টা করুন। তাকে সৎকাজের আদেশ দিন এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করুন আর এর কুফল থেকে সাবধান করুন।

প্রিয় দীনি বোন!

আপনি নিজে ব্যক্তিত্বসম্পন্না হোন। সৎ বান্ধবীদেরকে আপনার সাথী বানান। যাদেরকে সাথী বানালে আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং আখিরাতের কথা আপনার স্মরণ হবে তাদেরকে বন্ধু বানান। খারাপ মহিলা ও দুষ্ট প্রকৃতির মেয়েদের সাথে মিশে নিজেকে অপমানিত করবেন না।

সবশেষে, এ দো‘আ করব যে, আল্লাহ আপনাকে হিফাযত করুন। তিনি তো হিফাযতকারী। দয়াশীল। তিনি আপনার হজ, উমরাহ ও যিয়ারত কবুল করুন। আমীন। আমীন।


[1] সূরা আল-মায়েদাহ, আয়াত; ২৭; হিলইয়াতুল আওলিয়াহ ১/৭৫।