ড. মুহাম্মদ ইবন আব্দুল্লাহ ইবন সালেহ আস-সুহাইম

অনুবাদক : জাকেরুল্লাহ আবুল খায়ের  সম্পাদনা : প্রফেসর ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

কাফিররা আল্লাহকে বাদ দিয়ে তাদের বানানো উপাস্য ও সৃষ্টি অর্থাৎ গাছ-পালা, পাথর এবং মানুষের উপাসনা করে থাকে। আর এজন্যই ইয়াহূদী ও মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহ তা‘আলার গুণাবলি বিষয়ে জিজ্ঞেস করে এবং তিনি কোত্থেকে আসলেন তাও জিজ্ঞেস করে তখন আল্লাহ তা‘আলা তাঁর পরিচয় জানিয়ে নিচের আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন।

﴿قُلۡ هُوَ ٱللَّهُ أَحَدٌ ١ ٱللَّهُ ٱلصَّمَدُ ٢ لَمۡ يَلِدۡ وَلَمۡ يُولَدۡ ٣ وَلَمۡ يَكُن لَّهُۥ كُفُوًا أَحَدُۢ ٤﴾ [الاخلاص: ١،  ٥]

“(হে মুহাম্মাদ) আপনি বলুন, তিনি আল্লাহ এক-অদ্বিতীয়। আল্লাহ কারো মুখাপেক্ষী নন, সকলেই তাঁর মুখাপেক্ষী। তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তাঁকেও জন্ম দেয়া হয়নি। আর তাঁর কোনো সমকক্ষও নেই।” [সূরা আল-ইখলাস, আয়াত: ১-৪] আর তিনি তাঁর নিজের পরিচয় দিয়ে বলেন,

﴿إِنَّ رَبَّكُمُ ٱللَّهُ ٱلَّذِي خَلَقَ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٖ ثُمَّ ٱسۡتَوَىٰ عَلَى ٱلۡعَرۡشِۖ يُغۡشِي ٱلَّيۡلَ ٱلنَّهَارَ يَطۡلُبُهُۥ حَثِيثٗا وَٱلشَّمۡسَ وَٱلۡقَمَرَ وَٱلنُّجُومَ مُسَخَّرَٰتِۢ بِأَمۡرِهِۦٓۗ أَلَا لَهُ ٱلۡخَلۡقُ وَٱلۡأَمۡرُۗ تَبَارَكَ ٱللَّهُ رَبُّ ٱلۡعَٰلَمِينَ ٥٤﴾ [الاعراف: ٥٣]

“নিশ্চয় তোমাদের রব আল্লাহ, যিনি আসমানসমূহ ও যমীন ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন; তারপর তিনি ‘আরশের উপর উঠেছেন। তিনিই দিনকে রাত দিয়ে ঢেকে দেন, তাদের একে অন্যকে দ্রুতগতিতে অনুসরণ করে। আর সূর্য, চাঁদ ও নক্ষত্ররাজি, যা তাঁরই হুকুমের অনুগত, তা তিনিই সৃষ্টি করেছেন। জেনে রাখ, সৃজন ও আদেশ তাঁরই। সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহ কত বরকতময়!” [সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ৫৪] মহান আল্লাহ  অন্য আয়াতে বলেন,

﴿ٱللَّهُ ٱلَّذِي رَفَعَ ٱلسَّمَٰوَٰتِ بِغَيۡرِ عَمَدٖ تَرَوۡنَهَاۖ ثُمَّ ٱسۡتَوَىٰ عَلَى ٱلۡعَرۡشِۖ وَسَخَّرَ ٱلشَّمۡسَ وَٱلۡقَمَرَۖ كُلّٞ يَجۡرِي لِأَجَلٖ مُّسَمّٗىۚ يُدَبِّرُ ٱلۡأَمۡرَ يُفَصِّلُ ٱلۡأٓيَٰتِ لَعَلَّكُم بِلِقَآءِ رَبِّكُمۡ تُوقِنُونَ ٢ وَهُوَ ٱلَّذِي مَدَّ ٱلۡأَرۡضَ وَجَعَلَ فِيهَا رَوَٰسِيَ وَأَنۡهَٰرٗاۖ وَمِن كُلِّ ٱلثَّمَرَٰتِ جَعَلَ فِيهَا زَوۡجَيۡنِ ٱثۡنَيۡنِۖ يُغۡشِي ٱلَّيۡلَ ٱلنَّهَارَۚ إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَأٓيَٰتٖ لِّقَوۡمٖ يَتَفَكَّرُونَ ٣﴾ [الرعد: ٢،  ٣]

“আল্লাহ, যিনি আসমানসমূহ উপরে স্থাপন করেছেন খুঁটি ছাড়া, তোমরা তা দেখছ। তারপর তিনি ‘আরশের উপর উঠেছেন এবং সূর্য ও চাঁদকে নিয়মাধীন করেছেন; প্রত্যেকটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত চলবে। তিনি সব বিষয় পরিচালনা করেন, আয়াতসমূহ বিশদভাবে বর্ণনা করেন, যাতে তোমরা তোমাদের রবের সঙ্গে সাক্ষাত সম্পর্কে নিশ্চিত বিশ্বাস করতে পার। আর তিনিই যমীনকে বিস্তৃত করেছেন এবং তাতে সুদৃঢ়পর্বত ও নদী সৃষ্টি করেছেন এবং সব রকমের ফল সৃষ্টি করেছেন জোড়ায় জোড়ায়। তিনি দিনকে রাত দ্বারা আচ্ছাদিত করেন। নিশ্চয় এতে নিদর্শন রয়েছে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য।” [সূরা আর-রা‘দ, আয়াত: ২, ৩] অবশেষে আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন,

﴿ٱللَّهُ يَعۡلَمُ مَا تَحۡمِلُ كُلُّ أُنثَىٰ وَمَا تَغِيضُ ٱلۡأَرۡحَامُ وَمَا تَزۡدَادُۚ وَكُلُّ شَيۡءٍ عِندَهُۥ بِمِقۡدَارٍ ٨ عَٰلِمُ ٱلۡغَيۡبِ وَٱلشَّهَٰدَةِ ٱلۡكَبِيرُ ٱلۡمُتَعَالِ ٩﴾ [الرعد: ٨،  ٩]

“প্রত্যেক নারী যা গর্ভে ধারণ করে এবং গর্ভাশয়ে যা কিছু কমে ও বাড়ে আল্লাহ তা জানেন এবং তাঁর নিকট প্রত্যেক বস্তুরই এক নির্দিষ্ট পরিমাণ আছে। তিনি গায়েব ও প্রকাশ্যের জ্ঞানী, মহান, সর্বোচ্চ।” [সূরা আর-রা‘দ, আয়াত: ৮, ৯]

তিনি আরও বলেন,

﴿قُلۡ مَن رَّبُّ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِ قُلِ ٱللَّهُۚ قُلۡ أَفَٱتَّخَذۡتُم مِّن دُونِهِۦٓ أَوۡلِيَآءَ لَا يَمۡلِكُونَ لِأَنفُسِهِمۡ نَفۡعٗا وَلَا ضَرّٗاۚ قُلۡ هَلۡ يَسۡتَوِي ٱلۡأَعۡمَىٰ وَٱلۡبَصِيرُ أَمۡ هَلۡ تَسۡتَوِي ٱلظُّلُمَٰتُ وَٱلنُّورُۗ أَمۡ جَعَلُواْ لِلَّهِ شُرَكَآءَ خَلَقُواْ كَخَلۡقِهِۦ فَتَشَٰبَهَ ٱلۡخَلۡقُ عَلَيۡهِمۡۚ قُلِ ٱللَّهُ خَٰلِقُ كُلِّ شَيۡءٖ وَهُوَ ٱلۡوَٰحِدُ ٱلۡقَهَّٰرُ ١٦﴾ [الرعد: ١٦]

“বলুন, ‘কে আসমানসমূহ ও যমীনের রব?’ বলুন, ‘আল্লাহ্।’ বলুন, ‘তবে কি তোমরা অভিভাবকরূপে গ্রহণ করেছ আল্লাহর পরিবর্তে অন্যকে যারা নিজেদের লাভ বা ক্ষতি সাধনে সক্ষম নয়?’ বলুন, ‘অন্ধ ও চক্ষুষ্মান কি সমান হতে পারে? নাকি অন্ধকার ও আলো সমান হতে পারে?’ তবে কি তারা আল্লাহর এমন শরীক করেছে, যারা আল্লাহর সৃষ্টির মতো সৃষ্টি করেছে, যে কারণে সৃষ্টি তাদের কাছে সদৃশ মনে হয়েছে? বলুন, ‘আল্লাহ্ সকল বস্তুর স্রষ্টা; আর তিনি এক, মহা প্রতাপশালী’।” [সূরা আর-রা‘দ, আয়াত: ১৬]

আল্লাহ তা‘আলা তাদের জন্য তাঁর প্রাকৃতিক নিদর্শনসমূহকে সাক্ষী ও প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন,

﴿وَمِنۡ ءَايَٰتِهِ ٱلَّيۡلُ وَٱلنَّهَارُ وَٱلشَّمۡسُ وَٱلۡقَمَرُۚ لَا تَسۡجُدُواْ لِلشَّمۡسِ وَلَا لِلۡقَمَرِ وَٱسۡجُدُواْۤ لِلَّهِۤ ٱلَّذِي خَلَقَهُنَّ إِن كُنتُمۡ إِيَّاهُ تَعۡبُدُونَ ٣٧ فَإِنِ ٱسۡتَكۡبَرُواْ فَٱلَّذِينَ عِندَ رَبِّكَ يُسَبِّحُونَ لَهُۥ بِٱلَّيۡلِ وَٱلنَّهَارِ وَهُمۡ لَا يَسۡ‍َٔمُونَ۩ ٣٨ وَمِنۡ ءَايَٰتِهِۦٓ أَنَّكَ تَرَى ٱلۡأَرۡضَ خَٰشِعَةٗ فَإِذَآ أَنزَلۡنَا عَلَيۡهَا ٱلۡمَآءَ ٱهۡتَزَّتۡ وَرَبَتۡۚ إِنَّ ٱلَّذِيٓ أَحۡيَاهَا لَمُحۡيِ ٱلۡمَوۡتَىٰٓۚ إِنَّهُۥ عَلَىٰ كُلِّ شَيۡءٖ قَدِيرٌ ٣٩﴾ [فصلت: ٣٧،  ٣٩]

“আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে রাত ও দিন, সূর্য ও চাঁদ। তোমরা সূর্যকে সাজদাহ করো না, চাঁদকেও নয়; আর সাজদাহ কর আল্লাহকে, যিনি এগুলো সৃষ্টি করেছেন, যদি তোমরা কেবল তাঁরই ইবাদাত কর। আর তাঁর একটি নিদর্শন এই যে, আপনি ভূমিকে দেখতে পান শুষ্ক ও ঊষর, অতঃপর যখন আমরা তাতে পানি বর্ষণ করি তখন তা আন্দোলিত ও স্ফীত হয়। নিশ্চয় যিনি যমীনকে জীবিত করেন তিনি অবশ্যই মৃতদের জীবনদানকারী। নিশ্চয় তিনি সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান।” [সূরা ফুসসিলাত, আয়াত: ৩৭-৩৯]

তিনি আরও বলেন,

﴿وَمِنۡ ءَايَٰتِهِۦ خَلۡقُ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِ وَٱخۡتِلَٰفُ أَلۡسِنَتِكُمۡ وَأَلۡوَٰنِكُمۡۚ إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَأٓيَٰتٖ لِّلۡعَٰلِمِينَ ٢٢ وَمِنۡ ءَايَٰتِهِۦ مَنَامُكُم بِٱلَّيۡلِ وَٱلنَّهَارِ وَٱبۡتِغَآؤُكُم مِّن فَضۡلِهِۦٓۚ إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَأٓيَٰتٖ لِّقَوۡمٖ يَسۡمَعُونَ ٢٣﴾ [الروم: ٢٢،  ٢٣]

“আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে আসমান ও যমীনের সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও তোমাদের বর্ণের ভিন্নতা। নিশ্চয় এর মধ্যে নিদর্শনাবলি রয়েছে জ্ঞানীদের জন্য। আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে রাতে ও দিনে তোমাদের নিদ্রা এবং তাঁর অনুগ্রহ থেকে তোমাদের (জীবিকা) অন্বেষণ। নিশ্চয় এর মধ্যে নিদর্শনাবলি রয়েছে সে কাওমের জন্য যারা শুনে। সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য। এতে জ্ঞানীদের জন্য অবশ্যই নিদর্শন রয়েছে।” [সূরা আর-রূম, আয়াত: ২২, ২৩]

মহান আল্লাহ  নিজের সৌন্দর্য ও পরিপূর্ণতা বর্ণনা করে বলেছেন,

﴿ٱللَّهُ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ٱلۡحَيُّ ٱلۡقَيُّومُۚ لَا تَأۡخُذُهُۥ سِنَةٞ وَلَا نَوۡمٞۚ لَّهُۥ مَا فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَمَا فِي ٱلۡأَرۡضِۗ مَن ذَا ٱلَّذِي يَشۡفَعُ عِندَهُۥٓ إِلَّا بِإِذۡنِهِۦۚ يَعۡلَمُ مَا بَيۡنَ أَيۡدِيهِمۡ وَمَا خَلۡفَهُمۡۖ وَلَا يُحِيطُونَ بِشَيۡءٖ مِّنۡ عِلۡمِهِۦٓ إِلَّا بِمَا شَآءَۚ وَسِعَ كُرۡسِيُّهُ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضَۖ وَلَا يَ‍ُٔودُهُۥ حِفۡظُهُمَاۚ وَهُوَ ٱلۡعَلِيُّ ٱلۡعَظِيمُ ٢٥٥﴾ [البقرة: ٢٥٥]

“আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই। তিনি চিরঞ্জীব, সর্বসত্তার ধারক। তাঁকে তন্দ্রাও স্পর্শ করতে পারে না, নিদ্রাও নয়। আসমানসমূহে যা রয়েছে ও যমীনে যা রয়েছে সবই তাঁর। কে সে, যে তাঁর অনুমতি ব্যতীত তাঁর কাছে সুপারিশ করবে? তাদের সামনে ও পিছনে যা কিছু আছে তা তিনি জানেন। আর যা তিনি ইচ্ছে করেন তা ছাড়া তাঁর জ্ঞানের কোনো কিছুকেই তারা পরিবেষ্টন করতে পারে না। তাঁর ‘কুরসী’ আসমানসমূহ ও যমীনকে পরিব্যাপ্ত করে আছে; আর এ দু’টোর রক্ষণাবেক্ষণ তাঁর জন্য বোঝা হয় না। আর তিনি সুউচ্চ সুমহান।” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ২৫৫]

তিনি অন্য আয়াতে আরও বলেন,

﴿غَافِرِ ٱلذَّنۢبِ وَقَابِلِ ٱلتَّوۡبِ شَدِيدِ ٱلۡعِقَابِ ذِي ٱلطَّوۡلِۖ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَۖ إِلَيۡهِ ٱلۡمَصِيرُ ٣﴾ [غافر:٣]

“তিনি পাপ ক্ষমাকারী, তাওবা কবুলকারী, কঠোর শাস্তিদাতা, অনুগ্রহ বর্ষণকারী। তিনি ছাড়া কোনো (সত্য) ইলাহ নেই। একমাত্র তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তন।” [সূরা গাফির, আয়াত: ৩]

তিনি আরও বলেন,

﴿هُوَ ٱللَّهُ ٱلَّذِي لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ٱلۡمَلِكُ ٱلۡقُدُّوسُ ٱلسَّلَٰمُ ٱلۡمُؤۡمِنُ ٱلۡمُهَيۡمِنُ ٱلۡعَزِيزُ ٱلۡجَبَّارُ ٱلۡمُتَكَبِّرُۚ سُبۡحَٰنَ ٱللَّهِ عَمَّا يُشۡرِكُونَ ٢٣﴾ [الحشر: ٢٣]

“তিনিই আল্লাহ; যিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তিনিই বাদশাহ, মহা পবিত্র, ত্রুটিমুক্ত, নিরাপত্তা দানকারী, রক্ষক, মহা পরাক্রমশালী, মহা প্রতাপশালী, অতীব মহিমান্বিত, তারা যা শরীক করে তা থেকে পবিত্র, মহান।” [সূরা আল-হাশর, আয়াত: ২৩]

এই মহান উপাস্য, প্রজ্ঞাবান, ক্ষমতাশালী রব যিনি তাঁর বান্দাদেরকে নিজের পরিচয় সম্পর্কে অবগত করলেন এবং তাদের জন্য তাঁর নিদর্শনসমূহকে সাক্ষী ও প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করলেন। আর তিনি নিজে তার পরিপূর্ণতার গুণে গুণান্বিত হওয়ার বিষয়টি বর্ণনা ঘোষণা করলেন। এসবই হলো তাঁর অস্তিত্ব, রুবুবিয়্যাত ও উলুহিয়্যাতের প্রমাণ ও সাক্ষ্য। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনীত শরী‘আত এমনকি বিবেক শক্তি ও সৃষ্টিগত ফিতরাত বা স্বভাবিক মানব প্রকৃতিও এর সাক্ষ্য দেয়। সমগ্র জাতিগোষ্ঠীও এ বিষয়ে একমত। আমি এখন এর সামান্য কিছু দলীল-প্রমাণ আপনার সামনে তুলে ধরবো। প্রথমে তার অস্তিত্ব ও রুবুবিয়্যাতের প্রমাণ যা নিম্নে আলোচনা করা হবে:

এক- সৃষ্টিজগত ও তার মাঝে যা কিছু রয়েছে, যা অভিনব হিসেবে স্বীকৃত:

হে মানব! বিশাল সৃষ্টিজগত আপনাকে পরিবেষ্টন করে রেখেছে। আকাশমণ্ডলী, নক্ষত্ররাজি, ছায়াপথ ও বিস্তৃত যমীন নিয়ে এই সৃষ্টিজগত। আর এই যমীনের পাশাপাশি অসংখ্য ভূখণ্ড রয়েছে এবং প্রত্যেক ভূখণ্ডের উৎপাদন অন্যের চেয়ে ভিন্ন। এতে রয়েছে নানা জাতের ফল ফলাদি। দেখতে পাবেন এখানে প্রত্যেক সৃষ্টিকে জোড়া জোড়া করে সৃষ্টি করা হয়েছে। সুতরাং এই বিশ্বজগত নিজে নিজেই সৃজিত হয়নি। এর জন্য একজন সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব অবশ্যই প্রয়োজন। কেননা, কেউ নিজেকে নিজে সৃজন করতে পারে না। সুতরাং অভিনব পদ্ধতিতে কে এই বিশ্বজগত সৃষ্টি করেছেন? কে এটিকে এত সুন্দর পূর্ণতা দান করেছেন? এবং কে দর্শকদের জন্য তা নিদর্শন করেছেন? উত্তরে যার নাম উঠে আসবে তা হচ্ছে, তিনি হলেন মহা পরাক্রমশালী, একক ক্ষমতার অধিকারী আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা। যিনি ছাড়া অন্য কোনো রব নেই, আর প্রকৃত কোনো উপাস্যও নেই। মহান আল্লাহ বলেন,

﴿أَمۡ خُلِقُواْ مِنۡ غَيۡرِ شَيۡءٍ أَمۡ هُمُ ٱلۡخَٰلِقُونَ ٣٥ أَمۡ خَلَقُواْ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضَۚ بَل لَّا يُوقِنُونَ ٣٦﴾ [الطور: ٣٤،  ٣٥]

“তারা কি স্রষ্টা ছাড়া সৃষ্টি হয়েছে, না তারাই স্রষ্টা? তারা কি আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছে? বরং তারা দৃঢ় বিশ্বাস করে না।” [সূরা আত-তূর, আয়াত: ৩৫, ৩৬]

উল্লিখিত দু’টি আয়াত তিনটি বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করে:

১- তারা কি অস্তিত্বহীন কারো মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে?

২- নাকি তারা নিজেরাই তাদের নিজেদের সৃষ্টি করেছে?

৩­- তারা নিজেরাই কি আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছে?

যদি কোনো অস্তিত্বহীনতা তাদেরকে সৃষ্টি না করে থাকে, আর তারা নিজেরাই নিজেদেরকে সৃষ্টি না করে থাকে , আবার আসমান ও যমীনের সৃষ্টিকর্তাও তারা না হয়, তবে একজন সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব স্বীকার করা আবশ্যক হয়ে পড়ে; যিনি তাদের এবং আসমানসমূহ ও যমীনের সৃষ্টিকর্তা। আর সেই সৃষ্টিকর্তা হলেন একক ক্ষমতার অধিকারী আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা।

দুই- ফিতরাত (বা সুস্থ মানব প্রকৃতি):

সৃষ্টিকুল স্বভাবগতভাবে সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বকে স্বীকার করে নেয়। আরও স্বীকৃতি দেয় যে, তিনি সকলের চেয়ে সুমহান, সর্ববৃহৎ, মহত্তর ও শ্রেষ্ঠতম। এই ব্যাপারটি মানব ফিতরাতের মধ্যে গাণিতিক বিষয়ের শক্ত ভিত্তির চেয়ে মজবুতভাবে গেড়ে দেয়া হয়েছে। বস্তুত তাঁর অস্তিত্ব প্রমাণের জন্য কোনো দলীল উপস্থাপনের প্রয়োজন পড়ে না; কিন্তু যার সুস্থ মানব প্রকৃতির পরিবর্তন ঘটেছে এবং এমন কিছু পরিবেশ-পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে, যা তার মধ্যে এ চিরন্তন সত্যটিকে মেনে নেয়ার বিপরীতে অবস্থান তৈরী করে দিয়েছে। (তার ক্ষেত্রে দলীল প্রয়োজন।)[1] আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿فَأَقِمۡ وَجۡهَكَ لِلدِّينِ حَنِيفٗاۚ فِطۡرَتَ ٱللَّهِ ٱلَّتِي فَطَرَ ٱلنَّاسَ عَلَيۡهَاۚ لَا تَبۡدِيلَ لِخَلۡقِ ٱللَّهِۚ ذَٰلِكَ ٱلدِّينُ ٱلۡقَيِّمُ وَلَٰكِنَّ أَكۡثَرَ ٱلنَّاسِ لَا يَعۡلَمُونَ ٣٠﴾ [الروم: ٣٠]

“কাজেই আপনি একনিষ্ঠ হয়ে নিজ চেহারাকে দীনে প্রতিষ্ঠিত রাখুন। আল্লাহর ফিতরাত (স্বাভাবিক রীতি বা দীন ইসলাম), যার ওপর (চলার যোগ্য করে) তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন; আল্লাহর সৃষ্টির কোনো পরিবর্তন নেই। এটাই প্রতিষ্ঠিত দীন; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না।” [সূরা আর-রূম, আয়াত: ৩০] রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«مَا مِنْ مَوْلُودٍ إِلَّا يُولَدُ عَلَى الفِطْرَةِ، فَأَبَوَاهُ يُهَوِّدَانِهِ أَوْ يُنَصِّرَانِهِ، أَوْ يُمَجِّسَانِهِ، كَمَا تُنْتَجُ البَهِيمَةُ بَهِيمَةً جَمْعَاءَ، هَلْ تُحِسُّونَ فِيهَا مِنْ جَدْعَاءَ»، ثُمَّ يَقُولُ أَبُو هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ: ﴿فِطۡرَتَ ٱللَّهِ ٱلَّتِي فَطَرَ ٱلنَّاسَ عَلَيۡهَاۚ لَا تَبۡدِيلَ لِخَلۡقِ ٱللَّهِۚ﴾ [الروم: 30] الآيَةَ

“প্রতিটি নবজাত সন্তান ফিতরাতের ওপর (দীন ইসলাম নিয়েই) জন্মগ্রহণ করে। কিন্তু পরবর্তীতে তার পিতা-মাতাই তাকে ইয়াহূদী, খৃষ্টান বা অগ্নিপূজক বানিয়ে ফেলে। যেমন জীবজন্তু নিখুঁত শাবক প্রসব করে, তুমি কি সেখানে কোনো ত্রুটিযুক্ত শাবক দেখতে পাও?” তারপর আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, তোমরা ইচ্ছা করলে এই আয়াতটি পাঠ করতে পার-﴿فِطۡرَتَ ٱللَّهِ ٱلَّتِي فَطَرَ ٱلنَّاسَ عَلَيۡهَاۚ لَا تَبۡدِيلَ لِخَلۡقِ ٱللَّهِ﴾ۚ “আল্লাহর ফিতরাত (স্বাভাবিক রীতি বা দীন ইসলাম), যার ওপর (চলার যোগ্য করে) তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন; আল্লাহর সৃষ্টির কোনো পরিবর্তন নেই।”[2]

নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন,

«أَلَا إِنَّ رَبِّي أَمَرَنِي أَنْ أُعَلِّمَكُمْ مَا جَهِلْتُمْ، مِمَّا عَلَّمَنِي يَوْمِي هَذَا، كُلُّ مَالٍ نَحَلْتُهُ عَبْدًا حَلَالٌ، وَإِنِّي خَلَقْتُ عِبَادِي حُنَفَاءَ كُلَّهُمْ، وَإِنَّهُمْ أَتَتْهُمُ الشَّيَاطِينُ فَاجْتَالَتْهُمْ عَنْ دِينِهِمْ، وَحَرَّمَتْ عَلَيْهِمْ مَا أَحْلَلْتُ لَهُمْ، وَأَمَرَتْهُمْ أَنْ يُشْرِكُوا بِي مَا لَمْ أُنْزِلْ بِهِ سُلْطَانًا».

“জেনে রাখ, আমার রব আমাকে যে সব তথ্য প্রদান করেছেন তন্মধ্যে যা তোমরা জান না, তা তোমাদেরকে জানানোর নির্দেশ তিনি আমাকে দিয়েছেন। তিনি আমাকে আজকে যা জানিয়েছেন তার অন্তর্ভুক্ত বিষয় হচ্ছে, ‘আমি কোনো বান্দাকে যে সম্পদ দান করেছি তা তার জন্য হালাল আর আমি আমার সকল বান্দাকেই শির্ক-কুফুরীবিমুখ হয়ে একনিষ্ঠ তাওহীদমুখী করে সৃষ্টি করেছি। অতঃপর তাদের কাছে শয়তান এসে তাদেরকে দীন থেকে দূরে নিক্ষেপ করল। আমি যা তাদের জন্য হালাল করেছি তা তারা তাদের ওপর হারাম করল এবং কোনো প্রমাণ ব্যতিরেকেই আমার সাথে অংশীদার করতে নির্দেশ দিল।”[3]

তিন- সকল জাতির ইজমা বা ঐকমত্য:

প্রাচীন ও আধুনিক কালের সকল উম্মত একমত যে, এই বিশ্ব পরিমণ্ডলের একজন সৃষ্টিকর্তা আছেন। তিনি হলেন এ জগতের একমাত্র আল্লাহ সমগ্র জগতের রব। তিনি নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের সৃষ্টিকর্তা। তাঁর সৃষ্টিতে কারো অংশীদারীত্ব নেই, যেমন তাঁর রাজত্বে কোনো ভাগীদার নেই।

পূর্বের কোনো জাতি (যারা বিভিন্ন উপাস্যের ইবাদাত করত) এই বিশ্বাস পোষণ করত না যে, তাদের উপাস্যগুলো আসমানসমূহ ও যমীনের সৃষ্টিতে আল্লাহর সঙ্গে অংশীদার ছিল। বরং তারা বিশ্বাস করত যে, একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাই তাদের এবং তাদের উপাস্যদের সৃষ্টিকর্তা। তিনি ব্যতীত অন্য কোনো সৃষ্টিকর্তা ও রিযিকদাতা নেই। কল্যাণ ও অকল্যাণ কেবল তাঁরই হাতে।[4] আল্লাহ তা‘আলার রুবুবিয়্যাতকে মুশরিকরা যে স্বীকার করে নিয়েছিল তার বর্ণনা দিয়ে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَلَئِن سَأَلۡتَهُم مَّنۡ خَلَقَ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضَ وَسَخَّرَ ٱلشَّمۡسَ وَٱلۡقَمَرَ لَيَقُولُنَّ ٱللَّهُۖ فَأَنَّىٰ يُؤۡفَكُونَ ٦١ ٱللَّهُ يَبۡسُطُ ٱلرِّزۡقَ لِمَن يَشَآءُ مِنۡ عِبَادِهِۦ وَيَقۡدِرُ لَهُۥٓۚ إِنَّ ٱللَّهَ بِكُلِّ شَيۡءٍ عَلِيمٞ ٦٢ وَلَئِن سَأَلۡتَهُم مَّن نَّزَّلَ مِنَ ٱلسَّمَآءِ مَآءٗ فَأَحۡيَا بِهِ ٱلۡأَرۡضَ مِنۢ بَعۡدِ مَوۡتِهَا لَيَقُولُنَّ ٱللَّهُۚ قُلِ ٱلۡحَمۡدُ لِلَّهِۚ بَلۡ أَكۡثَرُهُمۡ لَا يَعۡقِلُونَ ٦٣﴾ [العنكبوت: ٦١،  ٦٣]

“আর যদি আপনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, ‘কে আসমানসমূহ ও যমীনকে সৃষ্টি করেছেন এবং চন্দ্র-সূর্যকে নিয়ন্ত্রিত করেছেন?’ তারা অবশ্যই বলবে, ‘আল্লাহ্’। তাহলে কোথায় তাদের ফিরানো হচ্ছে! আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্যে যার জন্য ইচ্ছে তার রিযিক বাড়িয়ে দেন এবং যার জন্য ইচ্ছে সীমিত করেন। নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছু সম্পর্কে সম্যক অবগত। আর যদি আপনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, ‘আকাশ থেকে বারি বর্ষণ করে কে ভূমিকে সঞ্জীবিত করেন তার মৃত্যুর পর?’ তারা অবশ্যই বলবে, ‘আল্লাহ’। বলুন, ‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই’। কিন্তু তাদের অধিকাংশই এটা অনুধাবন করে না।” [সূরা আল-‘আনকাবূত, আয়াত: ৬১-৬৩]

তিনি আরও বলেন,

﴿وَلَئِن سَأَلۡتَهُم مَّنۡ خَلَقَ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضَ لَيَقُولُنَّ خَلَقَهُنَّ ٱلۡعَزِيزُ ٱلۡعَلِيمُ ٩﴾ [الزخرف:٩]

“আর (হে নবী) আপনি যদি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, ‘কে আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছে?’ তারা অবশ্যই বলবে, ‘এগুলো তো সৃষ্টি করেছেন পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞই’।” [সূরা আয-যুখরুফ, আয়াত: ৯]

চার- বিবেকের অপরিহার্য দাবি:

সব বিবেক শক্তি এক যোগে স্বীকৃতি দেয় যে, এই জগতের একজন মহান সৃষ্টিকর্তা আছেন। কারণ, বিবেক এই জগতকে একটি সৃষ্ট ও নতুন জিনিস মনে করে। আরও বিশ্বাস করে যে, সৃষ্টিকুল নিজেকে নিজে অস্তিত্ব আনয়ন করেনি। আর এটা সর্বজন বিদিত যে, প্রত্যেক সৃষ্টির একজন সৃষ্টিকর্তা থাকেন।

মানুষ জানে যে, সে বিভিন্ন সময়ে নানা বিপদ ও জটিলতার সম্মুখীন হয়। আর যখন সে তা নিজে সমাধান করতে পারে না, তখন একনিষ্ঠভাবে আকাশের দিকে মুখ ফিরিয়ে তার রবের কাছে সাহায্য চায়, তা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য; যদিও সে আজীবন তার রবকে অস্বীকার করুক এবং মূর্তির উপাসনা করে যাক। কারণ, এটা এমন এক অত্যাবশ্যক বিষয় যা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। এটাকে স্বীকার করতেই হয়। এমনকি জীব-জন্তুর ওপরও কোনো বিপদ আসলে তারা আকাশের দিকে মাথা উঠিয়ে অপলক দৃষ্টিতে তাকায়। নিচের আয়াতগুলোতে মহান আল্লাহ এ ধরনের বিপদগ্রস্ত মানুষের বর্ণনা দিয়েছেন, যাতে বলা হয়েছে যখন সে তার রবের কাছে দ্রুত মুক্তির জন্য সাহায্য চায়, তখন সে আল্লাহকেই ডাকে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَإِذَا مَسَّ ٱلۡإِنسَٰنَ ضُرّٞ دَعَا رَبَّهُۥ مُنِيبًا إِلَيۡهِ ثُمَّ إِذَا خَوَّلَهُۥ نِعۡمَةٗ مِّنۡهُ نَسِيَ مَا كَانَ يَدۡعُوٓاْ إِلَيۡهِ مِن قَبۡلُ وَجَعَلَ لِلَّهِ أَندَادٗا لِّيُضِلَّ عَن سَبِيلِهِۦۚ قُلۡ تَمَتَّعۡ بِكُفۡرِكَ قَلِيلًا إِنَّكَ مِنۡ أَصۡحَٰبِ ٱلنَّارِ ٨﴾ [الزمر: ٨]

“আর মানুষকে যখন দুঃখ-দৈন্য স্পর্শ করে তখন সে একাগ্রচিত্তে তার রবকে ডাকে। তারপর যখন তিনি নিজের পক্ষ থেকে তার প্রতি অনুগ্রহ করেন তখন সে ভুলে যায় তার আগে যার জন্য সে ডেকেছিল তাঁকে এবং সে আল্লাহর সমকক্ষ দাঁড় করায়, অন্যকে তাঁর পথ থেকে বিভ্রান্ত করার জন্য। বলুন, ‘কুফুরীর জীবন তুমি কিছুকাল উপভোগ করে নাও। নিশ্চয় তুমি আগুনের অধিবাসীদের অন্তর্ভুক্ত’।” [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৮]

মহান আল্লাহ মুশরিকদের অবস্থা তুলে ধরে বলেন,

﴿هُوَ ٱلَّذِي يُسَيِّرُكُمۡ فِي ٱلۡبَرِّ وَٱلۡبَحۡرِۖ حَتَّىٰٓ إِذَا كُنتُمۡ فِي ٱلۡفُلۡكِ وَجَرَيۡنَ بِهِم بِرِيحٖ طَيِّبَةٖ وَفَرِحُواْ بِهَا جَآءَتۡهَا رِيحٌ عَاصِفٞ وَجَآءَهُمُ ٱلۡمَوۡجُ مِن كُلِّ مَكَانٖ وَظَنُّوٓاْ أَنَّهُمۡ أُحِيطَ بِهِمۡ دَعَوُاْ ٱللَّهَ مُخۡلِصِينَ لَهُ ٱلدِّينَ لَئِنۡ أَنجَيۡتَنَا مِنۡ هَٰذِهِۦ لَنَكُونَنَّ مِنَ ٱلشَّٰكِرِينَ ٢٢ فَلَمَّآ أَنجَىٰهُمۡ إِذَا هُمۡ يَبۡغُونَ فِي ٱلۡأَرۡضِ بِغَيۡرِ ٱلۡحَقِّۗ يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ إِنَّمَا بَغۡيُكُمۡ عَلَىٰٓ أَنفُسِكُمۖ مَّتَٰعَ ٱلۡحَيَوٰةِ ٱلدُّنۡيَاۖ ثُمَّ إِلَيۡنَا مَرۡجِعُكُمۡ فَنُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمۡ تَعۡمَلُونَ ٢٣﴾ [يونس : ٢٢،  ٢٣]

“তিনিই তোমাদেরকে জলে-স্থলে ভ্রমণ করান। এমনকি তোমরা যখন নৌযানে আরোহন কর এবং সেগুলো আরোহী নিয়ে অনুকূল বাতাসে বেরিয়ে যায় এবং তারা তাতে আনন্দিত হয়, তারপর যখন দমকা হাওয়া বইতে শুরু করে এবং চারদিক থেকে উত্তাল তরঙ্গমালা ধেয়ে আসে, আর তারা নিশ্চিত ধারণা করে যে, এবার তারা ঘেরাও হয়ে পড়েছে, তখন তারা আল্লাহকে তাঁর জন্য দীনকে একনিষ্ঠ করে ডেকে বলে: ‘আপনি আমাদেরকে এ থেকে বাঁচালে আমরা অবশ্যই কৃতজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হব’। অতঃপর তিনি যখন তাদেরকে বিপদমুক্ত করেন তখন তারা যমীনে অন্যায়ভাবে সীমালঙ্ঘন করতে থাকে। হে মানুষ! তোমাদের সীমালঙ্ঘন কেবল তোমাদের নিজেদের প্রতিই হয়ে থাকে; দুনিয়ার জীবনের সুখ ভোগ করে নাও, পরে আমাদেরই কাছে তোমাদের প্রত্যাবর্তন। তখন আমরা তোমাদেরকে জানিয়ে দিব তোমরা যা করতে।” [সূরা ইউনুস, আয়াত: ২২, ২৩]

তিনি আরও বলেন,

﴿وَإِذَا غَشِيَهُم مَّوۡجٞ كَٱلظُّلَلِ دَعَوُاْ ٱللَّهَ مُخۡلِصِينَ لَهُ ٱلدِّينَ فَلَمَّا نَجَّىٰهُمۡ إِلَى ٱلۡبَرِّ فَمِنۡهُم مُّقۡتَصِدٞۚ وَمَا يَجۡحَدُ بِ‍َٔايَٰتِنَآ إِلَّا كُلُّ خَتَّارٖ كَفُورٖ ٣٢﴾ [لقمان: ٣٢]

“আর যখন তরঙ্গ তাদেরকে আচ্ছন্ন করে ছায়ার মতো, তখন তারা আল্লাহকে ডাকে তাঁর আনুগত্যে একনিষ্ঠ হয়ে। অতঃপর যখন তিনি তাদেরকে উদ্ধার করে স্থলে পৌঁছান তখন তাদের কেউ কেউ মাঝামাঝি পথে থাকে; আর শুধু বিশ্বাসঘাতক, কাফির ব্যক্তিই আমাদের নিদর্শনাবলিকে অস্বীকার করে।” [সূরা লোকমান, আয়াত: ৩২]

[ইলাহ বা উপাস্যও একজনই হবেন]

মহান রব যিনি এ পৃথিবীকে সৃষ্টি করেছেন অস্তিত্বহীন থেকে, আর মানুষকে তৈরি করেছেন সর্বাধিক সুন্দর গঠন দিয়ে এবং তার ফিতরাত তথা প্রকৃতিতে গেথে দিয়েছেন তাঁর দাসত্ব ও আত্মসমর্পণ করার প্রবণতা। সকল বিবেক তাঁর রুবুবিয়্যাত ও উলুহিয়্যাতের আনুগত্য করেছে এবং সমস্ত উম্মত তাঁর রুবুবিয়্যাতকে এক বাক্যে মেনে নিতে একমত পোষণ করেছে। সুতরাং রুবুবিয়্যাত ও উলুহিয়্যাতের ক্ষেত্রে একজনই সত্তা হওয়াই যুক্তিযুক্ত। যেমনিভাবে তাঁর সৃষ্টিতে কোনো অংশীদার নেই, তেমনিভাবে তাঁর ইবাদতেও কোনো ভাগীদার নেই। এ ব্যাপারে অসংখ্য প্রমাণাদি বিদ্যমান[5]। নিম্নে গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রমাণ উল্লেখ করা হলো:

এক- এই জগতে প্রকৃত মা‘বুদ শুধুমাত্র একজনই আছেন। তিনি ছাড়া সত্যিকার কোনো মা‘বুদ নেই। তিনিই সৃষ্টিকর্তা ও রিযিকদাতা। উপকার ও অপকার করার ক্ষমতা তাঁরই হাতে। তিনি ছাড়া কেউ উপকার করতে পারে না এবং তিনি ছাড়া কেউ ক্ষতিকে প্রতিহত করতে পারে না। যদি এই পৃথিবীতে অন্য আরেকজন মা‘বুদ থাকত তবে তারও কাজ, সৃষ্টি ও নির্দেশাবলি থাকত। এতে করে একজন অন্যজনের অংশগ্রহণকে মেনে নিতে পারতো না।[6] তদুপরি একজনের শক্তি ও ক্ষমতা অন্যজনের চেয়ে বেশি থাকত। অক্ষম, পরাস্ত কখনও মা‘বুদ হতে পারে না। তিনিই প্রকৃত মা‘বুদ যিনি ক্ষমতাবান ও প্রভাবশালী; যার ইবাদাতে অপর কোনো মা‘বুদ অংশীদার হতে পারে না যেমনিভাবে তাঁর রুবুবিয়্যাত তথা প্রভুত্বে কোনো মা‘বুদ অংশীদার নেই। মহান আল্লাহ  বলেন,

﴿مَا ٱتَّخَذَ ٱللَّهُ مِن وَلَدٖ وَمَا كَانَ مَعَهُۥ مِنۡ إِلَٰهٍۚ إِذٗا لَّذَهَبَ كُلُّ إِلَٰهِۢ بِمَا خَلَقَ وَلَعَلَا بَعۡضُهُمۡ عَلَىٰ بَعۡضٖۚ سُبۡحَٰنَ ٱللَّهِ عَمَّا يَصِفُونَ ٩١﴾ [المؤمنون : ٩١]

“আল্লাহ কোনো সন্তান গ্রহণ করেননি এবং তাঁর সাথে অন্য কোনো ইলাহও নেই; যদি থাকত তবে প্রত্যেক ইলাহ স্বীয় সৃষ্টি নিয়ে পৃথক হয়ে যেত এবং একে অন্যের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করত। তারা যে গুণে তাকে গুণান্বিত করে তা থেকে আল্লাহ কত পবিত্র-মহান!” [সূরা আল-মুমিনূন, আয়াত: ৯১ ]

দুই- ইবাদাতের হকদার কেবল আল্লাহ তা‘আলা, যার জন্য আসমানসমূহ ও যমীনের মালিকানা ও কর্তৃত্ব। কেননা মানুষ এমন মা‘বুদের নৈকট্য অর্জন করতে চায়, যিনি তার সার্বিক কল্যাণ সাধন করতে পারেন এবং যাবতীয় দুঃখ, দুর্দশা ও অনিষ্ট দূরীভূত করার ক্ষমতা রাখেন। আর এটা সেই মহান সত্তার পক্ষেই সম্ভব যিনি আসমানসমূহ ও যমীন এবং এতদুভয়ের মাঝে যা আছে তার সবকিছুর মালিক। যদি তাঁর সঙ্গে একাধিক মা‘বুদ থাকতো, যেমনটি মুশরিকদের ধারণা, তাহলে সেসব বান্দারা কেবল সত্য রব আল্লাহর ইবাদাত করার জন্য বিবিধ উপায় খুঁজে বেড়াত; কারণ এ সকল মা‘বুদ শুধুমাত্র এক আল্লাহরই ইবাদাত করত ও তাঁরই নৈকট্য অর্জনে সচেষ্ট থাকত। সুতরাং যার হাতে কল্যাণ ও অকল্যাণের চাবিকাঠি, এমন সত্য সত্তার যে নৈকট্য লাভ করতে চায়, তাকে সত্য মা‘বুদ আল্লাহরই ইবাদাত করতে হবে। যার ইবাদাত করে থাকে আসমানসমূহ, যমীন এবং এতদুভয়ের সকল মাখলুকাত। আর এসব অসত্য মা‘বুদগুলো তাঁর দাসদেরই অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿قُل لَّوۡ كَانَ مَعَهُۥٓ ءَالِهَةٞ كَمَا يَقُولُونَ إِذٗا لَّٱبۡتَغَوۡاْ إِلَىٰ ذِي ٱلۡعَرۡشِ سَبِيلٗا ٤٢﴾ [الاسراء: ٤٢]

“(হে নবী) আপনি বলুন: তাদের কথামত যদি তাঁর সাথে আরও মা‘বুদ থাকতো তবে তারা ‘আরশের অধিপতি পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়ার উপায় অন্বেষণ করতো।” [সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ৪২] সত্য অনুসন্ধানকারীর জন্য উচিত সে যেন নীচের আয়াতগুলো পড়ে- আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿قُلِ ٱدۡعُواْ ٱلَّذِينَ زَعَمۡتُم مِّن دُونِ ٱللَّهِ لَا يَمۡلِكُونَ مِثۡقَالَ ذَرَّةٖ فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَلَا فِي ٱلۡأَرۡضِ وَمَا لَهُمۡ فِيهِمَا مِن شِرۡكٖ وَمَا لَهُۥ مِنۡهُم مِّن ظَهِيرٖ ٢٢ وَلَا تَنفَعُ ٱلشَّفَٰعَةُ عِندَهُۥٓ إِلَّا لِمَنۡ أَذِنَ لَهُۥۚ﴾ [سبا: ٢٢،  ٢٣]

“(হে নবী আপনি) বলুন, ‘তোমরা আল্লাহ ছাড়া যাদেরকে ইলাহ মনে করতে তাদেরকে ডাক। তারা আসমানসমূহে অণু পরিমাণ কিছুরও মালিক নয়, যমীনেও নয়। আর এ দু’টিতে তাদের কোনো অংশও নেই এবং তাদের মধ্য থেকে কেউ তাঁর সহায়কও নয়’। আর আল্লাহ যাকে অনুমতি দিবেন, সে ছাড়া তাঁর কাছে কারো সুপারিশ ফলপ্রসূ হবে না।” [সূরা সাবা, আয়াত: ২২, ২৩ ]

উপরোক্ত আয়াতগুলোতে গাইরুল্লাহ’র সাথে অন্তরের সম্পর্ককে চারটি বিষয় দ্বারা খণ্ডন করা হয়েছে। আর তা নিম্নরূপ:

প্রথমত: এসব অংশীদারগণ আল্লাহর সাথে বিন্দু পরিমাণ বস্তুর মালিক না। আর যে কেউ বিন্দু পরিমাণ বস্তুর মালিক না, সে কোনো উপকার করতে পারে না এবং অপকারও করতে পারে না। সে মা‘বুদ হওয়ার যোগ্য নয় এবং আল্লাহর সঙ্গে কোনো কাজে অংশীদার হওয়ারও যোগ্য নয়; বরং মহান আল্লাহই তাদের মালিক এবং তাদের দেখাশুনা করেন।

দ্বিতীয়ত: তারা আসমানসমূহ ও যমীনের কোনো অংশের মালিক নয় এবং উভয়ের মাঝে তাদের তিল পরিমাণ অংশীদারিত্বও নেই।

তৃতীয়ত: সৃষ্টির কেউ মহান আল্লাহর সাহায্যকারী নয়। বরং তিনিই তাদেরকে বিভিন্নভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করে থাকেন। যেমন, তিনি তাদের যাবতীয় কল্যাণ সাধন করেন এবং সব অকল্যাণ দূরীভূত করেন। তিনি অমুখাপেক্ষী এবং সৃষ্টির সবাই তাঁর মুখাপেক্ষী।

চতুর্থত: এসব অংশীদারগণ তাদের অনুসারীদের জন্য আল্লাহর কাছে শাফা‘আত বা সুপারিশের অধিকার রাখে না। আর তাদেরকে সুপারিশ করার অনুমতিও দেয়া হবে না। সুপারিশের অনুমতি কেবল আল্লাহ তা‘আলার ওলীদের[7] জন্য নির্ধারিত। তবে ওলীগণ তাদের জন্যই সুপারিশ করতে পারবে, যাদের কথা, কাজ ও আকীদা বিশ্বাসে আল্লাহ তা‘আলা সন্তুষ্ট।[8]

তিন- জগতের সবকিছুর শৃঙ্খলা এবং তার সুষ্ঠু পরিচালনাই সর্বোচ্চ প্রমাণ যে, এ জগতের পরিচালক এক ইলাহ, এক মালিক ও এক রব। তিনি ছাড়া সৃষ্টির আর কোনো মা‘বুদও নেই এবং তিনি ছাড়া তাদের আর কোনো রব নেই। সুতরাং যেমনিভাবে জগতের দু’জন সৃষ্টিকর্তা কল্পনা করা যায় না, তেমনিভাবে দুই বা ততোধিক মা‘বুদের অস্তিত্বও ভাবা অমূলক। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿لَوۡ كَانَ فِيهِمَآ ءَالِهَةٌ إِلَّا ٱللَّهُ لَفَسَدَتَاۚ﴾ [الانبياء: ٢٢]

“যদি এতদুভয়ের (আসমান ও যমীনের) মধ্যে আল্লাহ ব্যতীত আরো অনেক ইলাহ থাকত, তাহলে উভয়ই বিশৃঙ্খল হত।” [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ২২]

সুতরাং যদি মেনে নেয়া হয় যে, আসমানসমূহ ও যমীনে আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো মা‘বুদ আছে, তবে অবশ্যই বিশৃঙ্খলা দেখা দিত।[9] আর এই বিশৃঙ্খলার প্রধান কারণ হলো: যদি আল্লাহর সঙ্গে অন্য অন্য কোনো মা‘বুদ থাকতো, তবে অবশ্যই স্বেচ্ছাচারিতা ও হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রে একজন অন্যজনের চেয়ে শক্তিশালী হতো। আর এতে ঝগড়া ও মতভেদ তৈরি হতো এবং ফেতনা-ফ্যাসাদের আবির্ভাব ঘটত।[10]

যদি একটি দেহ বা শরীরের পরিচালনার দায়িত্ব একই রকম দু’টি আত্মার থাকতো, তবে দেহ ধ্বংস হয়ে যেত। যদি এটা অসম্ভব হয়, তাহলে এই বিশাল পৃথিবীর ক্ষেত্রে দু’জন বা ততোধিক পরিচালক কীভাবে কল্পনা করা যায়![11]

চার- এ বিষয়ের ওপর সমগ্র নবী ও রাসূলগণের ইজমা‘:

উম্মতগণ এ বিষয়ে একমত পোষণ করেছেন যে, নবী ও রাসূলগণ হলেন পূর্ণ বিবেকবান মানুষ, পাক-পবিত্র, সর্বোৎকৃষ্ট চরিত্রের অধিকারী, তাদের অধীনস্থদের কল্যাণকামী, আল্লাহ তা‘আলার ইচ্ছা সম্পর্কে তারা সবচেয়ে বেশি জ্ঞাত এবং সঠিক ও সরল পথের সন্ধান দানকারী। কেননা তারা সরাসরি মহান আল্লাহর নিকট থেকে অহী প্রাপ্ত হন, তারপর তা মানুষের মাঝে প্রচার করেন। প্রথম নবী আদম ‘আলাইহিস সালাম থেকে শুরু করে সর্বশেষ নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত সবাই আল্লাহর প্রতি ঈমান স্থাপন করেছেন এবং তিনি ছাড়া অন্যের ইবাদাত পরিত্যাগ করার দা‘ওয়াত দিয়েছিলেন। আর তিনিই প্রকৃত মা‘বুদ। মহান আল্লাহ  বলেন,

﴿وَمَآ أَرۡسَلۡنَا مِن قَبۡلِكَ مِن رَّسُولٍ إِلَّا نُوحِيٓ إِلَيۡهِ أَنَّهُۥ لَآ إِلَٰهَ إِلَّآ أَنَا۠ فَٱعۡبُدُونِ ٢٥﴾ [الانبياء:٢٥]

“আর আপনার পূর্বে আমরা যে রাসূলই প্রেরণ করেছি তার কাছে এ অহীই পাঠিয়েছি যে, আমি ব্যতীত অন্য কোনো সত্য ইলাহ নেই। সুতরাং তোমরা আমারই ইবাদাত কর।” [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ২৫]

আল্লাহ তা‘আলা নূহ ‘আলাইহিস সালামের তাওহীদের প্রতি দাও‘য়াত দেয়ার কথা উল্লেখ করেন; তিনি তার উম্মতকে বলেছিলেন যে,

﴿أَن لَّا تَعۡبُدُوٓاْ إِلَّا ٱللَّهَۖ إِنِّيٓ أَخَافُ عَلَيۡكُمۡ عَذَابَ يَوۡمٍ أَلِيمٖ ٢٦﴾ [هود: ٢٦]

“তোমরা আল্লাহ ছাড়া আর কারো ইবাদাত করো না, আমি তোমাদের ওপর এক ভীষণ যন্ত্রণাদায়ক দিনের শাস্তির আশঙ্কা করছি।” [সূরা হূদ, আয়াত: ২৬]

শেষ নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে উল্লেখ করেন যে, তিনি তাঁর উম্মতকে বলেছিলেন,

﴿قُلۡ إِنَّمَا يُوحَىٰٓ إِلَيَّ أَنَّمَآ إِلَٰهُكُمۡ إِلَٰهٞ وَٰحِدٞۖ فَهَلۡ أَنتُم مُّسۡلِمُونَ ١٠٨﴾ [الانبياء: ١٠٨]

“(হে নবী আপনি) বলুন, আমার প্রতি অহী হয় যে, নিশ্চয় তোমাদের মা‘বুদ শুধুমাত্র একজনই। সুতরাং তোমরা কি আত্মসমর্পণকারী হবে?” [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ১০৮]

এই মহান মা‘বুদ, যিনি এই জগতকে অস্তিত্বহীন থেকে অস্তিত্ব দান করে অসাধারণ রূপ দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। মানুষকে সুন্দর গঠন দিয়ে তৈরি করে সম্মানিত করেছেন এবং তার ফিতরাতে প্রভূত্ব (রুবুবিয়্যাত)কে মেনে নেওয়া ও উলুহিয়্যাত তথা ইবাদতকে একান্তভাবে আল্লাহর জন্য করাকে স্বীকৃতি দেয়ার যোগ্যতা স্থাপন করেছেন। তিনি তার আত্মাকে এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন যে, সে তার মহান সৃষ্টিকর্তা-আল্লাহর অনুগত না হলে, তাঁর নির্দেশ মতো না চললে তা স্থির থাকে না। আর তার রূহের জন্য ধার্য করেছেন যে, সে কখনও প্রশান্তি লাভ করবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত সে তার সৃষ্টিকর্তার নিকট আশ্রয় না নিবে এবং তাঁর সাথে যোগাযোগ রক্ষা না করবে। আর তাঁর সাথে যোগাযোগ রক্ষা কেবল তাঁর সঠিক পথ গ্রহণের মাধ্যমেই সম্ভব, যার প্রচার ও প্রসার করেছিলেন সম্মানিত রাসূলগণ। আর তিনি মানুষকে আরেকটি মূল্যবান সম্পদ দান করেছেন, তা হলো: বিবেক-শক্তি; যে বিবেকের যাবতীয় কার্য তখনই পরিপূর্ণ স্থির থাকবে, স্বীয় দায়িত্ব পালনে কার্যকর হবে, যখন সে বিবেক তার রবের প্রতি পূর্ণ ঈমান পোষণ করবে।

সুতরাং যখনই কারো ফিতরাত বা স্বাভাবিক প্রকৃতি সঠিক হবে, রূহ (আত্মা) প্রশান্তচিত্ত হবে, মন স্থির হবে আর বিবেক আল্লাহর ওপর ঈমান আনবে, তখনই কেবল একজন মানুষ দুনিয়া ও আখেরাতের সফলতা, নিরাপত্তা ও প্রশান্তি অর্জন করতে সক্ষম হবে। আর মানুষ যদি এগুলো অস্বীকার করে, তবে পৃথিবীর অলিতে-গলিতে পাগলের মতো উন্মাদ হয়ে জীবন-যাপন করবে, অনেক উপাস্যের মাঝে নিজেকে বণ্টন করে নিতে বাধ্য হবে, তখন সে জানতে পারবে না যে, কে তার উপকার সাধন করবে আর কে তার বিপদাপদ দূর করবে। আত্মার মধ্যে ঈমানকে স্থির করতে এবং কুফরের নোংরামি প্রকাশ করার জন্য মহান আল্লাহ দৃষ্টান্ত পেশ করেছেন। কেননা উদাহরণের মাধ্যমে অস্পষ্ট বিষয় স্পষ্ট হয়। এর মধ্যে দু’জন লোকের মাঝে তুলনা করা হয়েছে; একজন তার কাজ কর্ম বহু প্রভুর মাঝে বণ্টন করে (বহু প্রভুর ইবাদাত করে) আর অন্যজন শুধুমাত্র এক প্রভুর ইবাদাত করে তারা কি সমান? কখনই না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ضَرَبَ ٱللَّهُ مَثَلٗا رَّجُلٗا فِيهِ شُرَكَآءُ مُتَشَٰكِسُونَ وَرَجُلٗا سَلَمٗا لِّرَجُلٍ هَلۡ يَسۡتَوِيَانِ مَثَلًاۚ ٱلۡحَمۡدُ لِلَّهِۚ بَلۡ أَكۡثَرُهُمۡ لَا يَعۡلَمُونَ ٢٩﴾ [الزمر: ٢٩]

“আল্লাহ একটি দৃষ্টান্ত পেশ করছেন: এক ব্যক্তির প্রভু অনেক, যারা পরস্পর বিরুদ্ধভাবাপন্ন এবং আরেক ব্যক্তি, যে এক প্রভুর অনুগত; এ দু‘জনের অবস্থা কি সমান? সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই; কিন্তু তাদের অধিকাংশই জানে না।” [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ২৯ ]

আল্লাহ তা‘আলা অত্র আয়াতে তাওহীদপন্থী বান্দা ও মুশরিক বান্দার দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেন; এক ব্যক্তির মালিক অনেকগুলো। সবাই তাকে নিয়ে টানা হেঁচড়া করে, নিজের অনুগত বলে দাবী করে, সে তাদের মাঝে বিভক্ত, তাদের প্রত্যেকেই তার ওপর নিজের দিক-নির্দেশনা ও দায়িত্ব অর্পণ করতে চায়। এমতাবস্থায় সে দিশেহারা হয়ে পড়ে এবং এক পথ বা মতের ওপর চলতে পারে না। ফলে সে তাদের ঝগড়াটে, বিতর্কপূর্ণ ও স্ববিরোধী প্রবৃত্তিকে সন্তুষ্ট করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। এতে তার দৃষ্টিভঙ্গি ও শক্তি সামর্থ্য ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায়। অপর পক্ষে অন্য একজন বান্দা যার মালিক শুধুমাত্র একজন, সে জানে যে তার মালিক তার থেকে কি চায় এবং কি দায়িত্ব তার ওপর অর্পণ করে। এতে করে সে সুস্পষ্ট এক নীতির ওপর স্থির থাকতে পারে। সুতরাং আলোচিত দু’জন বান্দা এক সমান নয়। একজন এক মালিকের অনুগত হয়ে সততা, জ্ঞান ও নিশ্চয়তার প্রশান্তি লাভ করে। আর অপরজন পরস্পর বিরোধী অনেকগুলো মালিকের ইবাদাত করে অতিষ্ঠপূর্ণ জীবন-যাপন করে। কোনো অবস্থায়-ই সে স্থির থাকতে পারে না। তাদের সবাইকে সন্তুষ্ট করা তো দূরের কথা বরং তাদের একজনকেও সে সন্তুষ্ট করতে পারে না।

মহান আল্লাহর অস্তিত্ব, একমাত্র তাঁরই প্রভুত্ব (রুবুবিয়্যাত) ও তাঁরই দাসত্বের (উলুহিয়্যাতের) বিষয়টি যখন প্রমাণিত হলো, তখন আমাদের জানা দরকার এই বিশ্বপরিমণ্ডল ও মানবের সৃষ্টি সম্পর্কে এবং সৃষ্টির অজানা কারণ ও রহস্য কী তা অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।

[1]. শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ রচিত ‘মাজমুআয়ে ফাতাওয়া’ ১ম খণ্ড; ৪৭-৪৯ এবং ৭৩ নং পৃষ্ঠা।

[2] সহীহ বুখারী, তাকদীর অধ্যায়; পরিচ্ছেদ ৩, হাদীস নং ১৩৫৮ এবং সহীহ মুসলিম, তাকদীর অধ্যায়; হাদীস নং ২৬৫৮, হাদীসের শব্দগুলো তাঁরই।

[3] মুসনাদ ইমাম আহমাদ; ৪র্থ খণ্ড, ১৬২ নং পৃষ্ঠা এবং সহীহ মুসলিম; জান্নাত এবং তার সুখ ও তার বাসিন্দাদের বর্ণনা অধ্যায়, হাদীস নং ২৮৬৫, হাদীসের শব্দগুলো তারই।

[4] মাজমূ‘ ফাতাওয়া, শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ, ১৪ তম খণ্ড; ৩৮০-৩৮৩, এবং ৭ম খণ্ড; ৭৫ নং পৃষ্ঠা।

[5]. বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন: শাইখুল ইসলাম মুহাম্মাদ ইবন আব্দুল ওয়াহহাব রচিত ‘কিতাবুত তাওহীদ’।

[6]. শারহু ‘আকীদাহ আত-ত্বহাবিয়্যাহ, পৃ. ৩৯।

[7]. এখানে ওলী বলতে যারা মুত্তাকী, পারহেযগার বান্দা এবং শরী‘আতের যাবতীয় হুকুম আহকাম ও হালাল-হারাম মেনে চলেন তারাই উদ্দেশ্য, বর্তমান সমাজে শির্ক-বিদ‘আতের কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত এক শ্রেণির নামধারী কিছু ধর্ম ব্যবসায়ী ও কবর পূজারী পীর-মাশায়েখ উদ্দেশ্য নয়। -অনুবাদক।

[8]. শাইখ আব্দুর রহমান ইবন হাসান রাহিমাহুল্লাহ প্রণীত “কুররাতু ‘উয়ুনুল মুওয়াহহিদীন”, পৃ. ১০০। অর্থাৎ যার মধ্যে বড় শির্ক নেই, বড় কুফুরী নেই, বড় নিফাকী নেই। শির্ক, কুফর ও নিফাকের চেয়ে নিম্ন পর্যায়ের গুনাহ আছে, জাহান্নামে পড়ে আছে, তাহলে তার জন্য সুপারিশ করা হবে। সে হিসেবে আখেরাতে আল্লাহর দরবারে সুপারিশের জন্য দু’টি শর্ত নির্ধারিত হলো:

১- অবশ্যই আল্লাহর অনুমতিতে হতে হবে। তিনি দয়াপরবশ হয়ে যার জন্য অনুমতি দিবেন তিনিই শুধু সুপারিশ করবেন।

২- যার জন্য সুপারিশ করা হবে তাকে অবশ্যই বড় শির্ক, বড় কুফুরী এবং বড় নিফাকী থেকে মুক্ত থাকতে হবে। [সম্পাদক]

[9] যেহেতু এখন কোনো বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় না তাতে প্রমাণিত হয় যে, তিনি একক এবং এককভাবে সমগ্র জগত পরিচালনা করেন। অন্যথায় বিশৃঙ্খলা দেখা দিত। —অনুবাদক।

[10] শাওকানী, ফাতহুল কাদীর, ৩য় খণ্ড, ৪০৩ পৃষ্ঠা।

[11] ইবনুল কাইয়্যেম, মিফতাহু দারিস সা‘আদাহ (১/২৬০)।

ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে। তাহলে আপনিও ব্লগের কার্যক্রম কে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার লেখণী পাঠাতে পারেন।আপনার লেখনী পাঠিয়ে আমাদের ফেচবুক পেজের ম্যাসেঞ্জারে গিয়ে দয়াকরে নক করুন।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন