ইলমী গবেষণা ডীনশীপ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, মদিনা মুনাওয়ারা

অনুবাদ: মোহাম্মাদ ইবরাহীম আবদুল হালীম সম্পাদনা: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

(১) ঈমানের বাস্তবায়ন

নিম্নে বর্ণিত বিষয়সমূহ বাস্তবায়নের মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি পূর্ণ ঈমান আনা হয়।

প্রথমত: এ বিশ্বাস পোষণ করা যে, এ বিশ্ব জগতের একজন প্রভু প্রতিপালক রয়েছেন। যিনি স্বীয় সৃষ্টি রাজত্ব, পরিচালনা ও কর্ম ব্যাবস্থাপনায় রুযীদাতা, জীবন দাতা, মৃত্যুদাতা, ক্ষমতাশীল এবং কল্যাণ ও অকল্যাণ সাধনকারী হিসেবে এক ও অদ্বিতীয়। তিনি ব্যতীত কোনো রব্ব প্রতিপালক নেই।

তিনি একাই যা ইচ্ছা তা করেন এবং যা চান তার হুকুম করেন। যাকে ইচ্ছা সম্মানিত করেন, আবার যাকে ইচ্ছা অপমানিত করেন। তাঁরই হাতে আসমান জমিনের রাজত্ব। তিনি সর্ব বিষয়ে ক্ষমতাশীল ও জ্ঞাত রয়েছেন। তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন।

সকল আদেশ তাঁরই এবং সর্বপ্রকার কল্যাণ তাঁরই হাতে, তাঁর কর্মসমূহে কোনো শরীক নেই। তাঁর কর্মে তাঁকে কেউ পরাজয়কারী নেই; বরং মানব জাতি, জিন্ন জাতি ও ফিরিশতামণ্ডলীসহ সকল সৃষ্টজীব তাঁরই দাস বা বান্দা। তারা তাঁর রাজত্ব, শক্তি ও ইচ্ছা হতে বের হতে পারেন না।

তাঁর কর্মসমূহ অগণিত; কোনো সংখ্যাই তা সীমাবদ্ধ করতে পারে না। এ সকল বৈশিষ্টের তিনিই একমাত্র অধিকারী, তাঁর কোনো শরীক নেই। তিনি ব্যতীত কেউ এ (বৈশিষ্ট্য)সমূহের অধিকার রাখে না। এসব আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো সাথে সম্পর্কিত ও সাব্যস্ত করা হারাম।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ ٱعۡبُدُواْ رَبَّكُمُ ٱلَّذِي خَلَقَكُمۡ وَٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِكُمۡ لَعَلَّكُمۡ تَتَّقُونَ ٢١ ٱلَّذِي جَعَلَ لَكُمُ ٱلۡأَرۡضَ فِرَٰشٗا وَٱلسَّمَآءَ بِنَآءٗ وَأَنزَلَ مِنَ ٱلسَّمَآءِ مَآءٗ فَأَخۡرَجَ بِهِۦ مِنَ ٱلثَّمَرَٰتِ رِزۡقٗا لَّكُمۡۖ﴾ [البقرة: ٢١، ٢٢]

“হে মানব সমাজ! তোমরা তোমাদের রবের ইবাদত কর, যিনি তোমাদিগকে এবং তোমাদের পূর্ববর্তীদিগকে সৃষ্টি করেছেন। তাতে আশা করা যায়, তোমরা তাকওয়ার অধিকারী হতে পারবে। যে পবিত্রসত্তা তোমাদের জন্য যমীনকে বিছানা, আকাশকে ছাদস্বরূপ স্থাপন করে দিয়েছেন, আর আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করে তোমাদের জন্য ফল-ফসল উৎপাদন করেছেন তোমাদের খাদ্য হিসাবে।” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ২১-২২]

তিনি আরো বলেন,

﴿قُلِ ٱللَّهُمَّ مَٰلِكَ ٱلۡمُلۡكِ تُؤۡتِي ٱلۡمُلۡكَ مَن تَشَآءُ وَتَنزِعُ ٱلۡمُلۡكَ مِمَّن تَشَآءُ وَتُعِزُّ مَن تَشَآءُ وَتُذِلُّ مَن تَشَآءُۖ بِيَدِكَ ٱلۡخَيۡرُۖ إِنَّكَ عَلَىٰ كُلِّ شَيۡءٖ قَدِيرٞ ٢٦﴾ [ال عمران: ٢٦]

“বলুন হে আল্লাহ! তুমিই সার্বভৌম শক্তির অধিকারী। তুমি যাকে ইচ্ছা রাজ্য দান কর এবং যার কাছ থেকে ইচ্ছা রাজ্য ছিনিয়ে নাও এবং যাকে ইচ্ছা সম্মানিত কর, আর যাকে ইচ্ছা অপমানিত কর। তোমারই হাতে রয়েছে যাবতীয় কল্যাণ। নিশ্চয় তুমি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান। [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ২৬]

তিনি আরো বলেন,

﴿وَمَا مِن دَآبَّةٖ فِي ٱلۡأَرۡضِ إِلَّا عَلَى ٱللَّهِ رِزۡقُهَا وَيَعۡلَمُ ُسۡتَقَرَّهَا وَمُسۡتَوۡدَعَهَاۚ كُلّٞ فِي كِتَٰبٖ مُّبِينٖ ٦﴾ [هود: ٦]

“আর পৃথিবীতে বিচরণশীল মাত্রই সকলের জীবিকার দায়িত্ব আল্লাহ তা‘আলা নিয়েছেন, তিনি জানেন তারা কোথায় থাকে এবং কোথায় সমাপিত হয়। সব কিছুই এক সুস্পষ্ট গ্রন্থে রয়েছে।” [সূরা হূদ, আয়াত: ৬]

তিনি আরো বলেন,

﴿أَلَا لَهُ ٱلۡخَلۡقُ وَٱلۡأَمۡرُۗ تَبَارَكَ ٱللَّهُ رَبُّ ٱلۡعَٰلَمِينَ ٥٤ ﴾ [الاعراف: ٥٤]

“জেনে রেখ তাঁরই সৃষ্টি ও তাঁরই বিধান, আল্লাহ বরকতময় যিনি বিশ্ব জগতের রব।” [সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ৫৪]

দ্বিতীয়ত: এ বিশ্বাস পোষণ করা যে, আল্লাহ তা‘আলা তাঁর সুন্দর নামসমূহ ও পবিত্র পূর্ণ গুণাবলীর ক্ষেত্রে এক ও অদ্বিতীয়। যে নাম ও গুণের কিছু কিছু তিনি তাঁর বান্দাদের জন্য তাঁর পবিত্র গ্রন্থ ও শেষ নবী ও নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসে বর্ণনা করা হয়েছে।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَلِلَّهِ ٱلۡأَسۡمَآءُ ٱلۡحُسۡنَىٰ فَٱدۡعُوهُ بِهَاۖ وَذَرُواْ ٱلَّذِينَ يُلۡحِدُونَ فِيٓ أَسۡمَٰٓئِهِۦۚ سَيُجۡزَوۡنَ مَا كَانُواْ يَعۡمَلُونَ ١٨٠﴾ [الاعراف: ١٨٠]

“আর আল্লাহর জন্য রয়েছে সর্বউত্তম নামসমূহ। তাই সে নামসমূহ ধরেই তাঁকে ডাক। আর তাদেরকে বর্জন কর যারা তাঁর নামের ব্যাপারে বাঁকা পথে চলে। তারা নিজেদের কৃত কর্মের ফল শীঘ্রই পাবে।” [সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ১৮০]

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«إن لله تسعة وتسعين اسماً من أحصاها دخل الجنة، وهو وتر يحب الوتر»

“আল্লাহর নিরানবব-ইটি নাম রয়েছে। যে ব্যক্তি তা যথাযথ বাস্তবায়ণ তথা সংরক্ষন করবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আল্লাহ বেজোড়, তিনি বেজোড়কে ভালবাসেন।” (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)

আর এই আকীদা-বিশ্বাস দু’টি বড় মূলনীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত:

প্রথম: নিশ্চয় আল্লাহর সুন্দর নাম ও মহান গুণ রয়েছে, যা পরিপূর্ণ গুণাবলীর প্রমাণ করে, তাতে কোনো প্রকারের অপরিপূর্ণতা ও ত্রুটি নেই। সৃষ্টিজীবের কোনো কিছুই তার মতো ও তার অংশীদার হতে পারে না।

 الحيّ (আল-হাইয়ু) তাঁর (আল্লাহর) নামসমূহের একটি নাম। الحياة (আল-হায়াত) তাঁর সিফাত বা গুণ যা মহান আল্লাহর জন্য সমুচিত সঠিক পন্থায় সাব্যস্ত করা ওয়াজিব। আর এ জীবন এক চিরস্থায়ী পরিপূর্ণ জীবন। তাতে জ্ঞান, শক্তি ইত্যাদি সর্বপ্রকার পূর্ণতার সমাবেশ রয়েছে। আল্লাহ চিরঞ্জীব তাঁর লয়

ও ক্ষয় নাই।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ٱللَّهُ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ٱلۡحَيُّ ٱلۡقَيُّومُۚ لَا تَأۡخُذُهُۥ سِنَةٞ وَلَا نَوۡمٞۚ ﴾ [البقرة: ٢٥٥]

“আল্লাহ ছাড়া কোনো সঠিক উপাস্য নেই, তিনি চিরঞ্জীব ও সব কিছুর ধারক। তাঁকে তন্দ্রা স্পর্শ করতে পারেনা এবং নিদ্রাও নয়।” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৫৫]

দ্বিতীয়: নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা সকল দোষ ও ত্রুটি যুক্ত গুণ থেকে সম্পুর্ণভাবে পবিত্র। যেমন, নিদ্রা, অপারগতা, মূর্খতা ও যুলুম-অত্যাচার ইত্যাদি।

তিনি আরো পবিত্র সৃষ্টিজীবের সাথে সাদৃশ্য রাখা হতে। আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর (আল্লাহর) জন্য যে সকল গুণ অস্বীকার করেছেন, তা অস্বীকার করা অপরিহার্য।

আল্লাহ তা‘আলা যে সকল গুণকে নিজের জন্য অস্বীকার করেছেন সে গুণের বিপরীত গুণে পরিপূর্ণভাবে গুণাম্বিত, এই বিশ্বাস রাখা।

সুতরাং যখন আল্লাহকে তন্দ্রা ও নিদ্রা থেকে মুক্ত করব, তখন তন্দ্রার বিপরীত চির জাগ্রত এবং নিদ্রার বিপরীত চিরঞ্জীব পরিপূর্ণ দু’টি গুণকে সাব্যস্ত করা হবে।

অনুরূপভাবে আল্লাহকে প্রতিটি অপরিপূর্ণ গুণ থেকে মুক্ত করলে সাথে সাথে তার বিপরীত পরিপূর্ণ গুণ সাব্যস্ত হয়ে যায়। তিনিই একমাত্র পরিপূর্ণ আর তিনি ব্যতীত সবই অপরিপূর্ণ।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿لَيۡسَ كَمِثۡلِهِۦ شَيۡءٞۖ وَهُوَ ٱلسَّمِيعُ ٱلۡبَصِيرُ ١١﴾ [الشورى: ١١]

“(সৃষ্টিজীবের) কোনো কিছুই তাঁর অনুরূপ নয়। আর তিনি সব শুনেন এবং সব দেখেন।” [সূরা আশ-শূরা, আয়াত: ১১]

তিনি আরো বলেন,

﴿وَمَا رَبُّكَ بِظَلَّٰمٖ لِّلۡعَبِيدِ ٤٦﴾ [فصلت: ٤٦]

“আর আপনার রব বান্দাদের প্রতি সামান্যতমও যুলুম করেন না। [সূরা ফুসসিলাত, আয়াত: ৪৬]

তিনি আরো বলেন,

﴿وَمَا كَانَ ٱللَّهُ لِيُعۡجِزَهُۥ مِن شَيۡءٖ فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَلَا فِي ٱلۡأَرۡضِۚ﴾ [فاطر: ٤٤]

“আকাশ ও পৃথিবীতে কোনো কিছুই আল্লাহকে অপারগ করতে পারে না।” [সূরা ফাতির, আয়াত: ৪৪]

তিনি আরো বলেন,

﴿وَمَا كَانَ رَبُّكَ نَسِيّٗا ٦٤ ﴾ [مريم: ٦٤]

“আর আপনার রব বিস্মৃত হওয়ার নন।” [সূরা মারইয়াম, আয়াত: ৬৪]

আল্লাহর নাম, তাঁর গুণ ও কর্মসমূহের ওপর ঈমান আনয়ন করাই মূলত আল্লাহ ও তাঁর ইবাদতকে জানার একমাত্র পথ।

কারণ আল্লাহ তা‘আলা এই পার্থিব জগতে তাঁর সরাসরি দর্শনকে সৃষ্টিজীব হতে গোপন রেখেছেন এবং তাদের জন্য এমন জ্ঞানের পথ খুলে দিয়েছেন, যার দ্বারা তারা তাদের প্রভু ইলাহ্-মা‘বুদকে জানবে এবং সঠিক জ্ঞান অনুযায়ী তাঁর ইবাদত করবে।

সুতরাং (আল্লাহর নাম ও গুণাবলী সাব্যস্তকারী) বান্দা তার গুণময় মা‘বুদের ইবাদত করে, পক্ষান্তরে মু‘আত্তিল (আল্লাহর নাম ও গুণাবলী অস্বীকারকারী) মূলত অস্তিত্বহীনের ইবাদত করে, আর মুমাচ্ছিল (আল্লাহর সাথে উপমা স্থাপনকারী) প্রতিমার ইবাদত করে। আর মুসলিম ব্যক্তি এক ও অমুখাপেক্ষী আল্লাহর ইবাদত করে, যিনি কাউকে জন্ম দেন নি এবং কেউ তাকে জন্ম দেয় নি এবং তাঁর সমকক্ষও কেউ নয়।

আল্লাহর সুন্দর নামসমূহ সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে নিম্নে বর্ণিত বিষয়গুলোর লক্ষ্য রাখা উচিৎ:

(১) সংযোজন ও বিয়োজন ব্যতীত কুরআন ও হাদীসে বর্ণিত সকল সুন্দর নামসমূহ আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত রয়েছে তার ওপর ঈমান আনা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿هُوَ ٱللَّهُ ٱلَّذِي لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ٱلۡمَلِكُ ٱلۡقُدُّوسُ ٱلسَّلَٰمُ ٱلۡمُؤۡمِنُ ٱلۡمُهَيۡمِنُ ٱلۡعَزِيزُ ٱلۡجَبَّارُ ٱلۡمُتَكَبِّرُۚ سُبۡحَٰنَ ٱللَّهِ عَمَّا يُشۡرِكُونَ ٢٣﴾ [الحشر: ٢٣]

“তিনিই আল্লাহ তিনি ব্যতীত সত্যিকার কোনো উপাস্য নেই। তিনি একমাত্র সব কিছুর মালিক, যাবতীয় দোষ-ত্রুটি হতে পবিত্র, শান্তি ও নিরাপত্তাদাতা, পর্যবেক্ষক, পরাক্রান্ত, প্রতাপাম্বিত, মাহাত্ম্যশীল। তারা যাকে অংশীদার করে আল্লাহ তা‘আলা তা থেকে পবিত্র।” [সূরা আল-হাশর, আয়াত: ২৩]

হাদীসে এসেছে:

«وثبت في السنة أن النبي- r- سمع رجلاً يقول: اللهم إني أسألك بأن لك الحمد لا إله إلا أنت المنان بديع السموات، والأرض يا ذا الجلال ،والإكرام يا الحي يا القيوم. فقال النبي – r -: تدرون بما دعا الله؟ قالوا: الله، ورسوله أعلم، قال:والذي نفسي بيده لقد دعا الله باسمه الأعظم الذي إذا دعي به أجاب، وإذا سئل به أعطى».

“নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ব্যক্তিকে বলতে শুনলেন। হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে প্রার্থনা করছি, কারণ সকল প্রশংসা তোমারই জন্য। তুমি ছাড়া কোনো সত্যিকার মা‘বুদ নেই। তুমি (মান্নান) অনুগ্রহকারী, আসমান জমিনের সৃষ্টিকারী। হে সম্মানিত ও মর্যাদাবান! হে চিরঞ্জীব ও সব কিছুর ধারক বাহক!

অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (সাহাবীদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা কি জান? সে কিসের (অসিলায়) আল্লাহকে আহ্বান করেছে? তারা বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই অধিক জানেন। তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, শপথ সেই সত্তার যার হাতে আমার প্রাণ, নিশ্চয় সে আল্লাহকে তাঁর এমন ইসমে আজমের (মহান নামের) অসিলায় আহ্বান করেছে, যার দ্বারা আল্লাহকে আহ্বান করলে আল্লাহ আহ্বানে সাড়া দেন এবং আবেদন করলে তিনি দান করেন।” (ইমাম আবূ দাউদ ও আহমাদ হাদীসটি বর্ণনা করেন)

(২) আল্লাহ নিজেই নিজের নাম রেখেছেন। সৃষ্টি জীবের কেউ তাঁর নাম রাখে নি এবং তিনি নিজেই এ সকল নাম দ্বারা স্বীয় প্রশংসা করেছেন। এগুলো সৃজিত ও নতুন নয়। এর ওপর ঈমান আনা।

(৩) আল্লাহর সুন্দর নামসমূহ এমন পরিপূর্ণ অর্থবোধক যাতে কোনো প্রকারের কোনো ত্রুটি নেই। তাই এ নামসমূহের ওপর ঈমান আনা যেমন ওয়াজিব, তেমনি এর অর্থের ওপর ঈমান আনাও ওয়াজিব।

(৪) এ সমস্ত নামের অর্থ অস্বীকার ও অপব্যাখ্যা না করে সম্মানের সাথে গ্রহণ করা ওয়াজিব।

(৫) প্রতিটি নাম হতে সাব্যস্ত বিধি-বিধান ও ফলাফল এবং এর প্রভাবের ওপর ঈমান আনা।

এ পাঁচটি বিষয়কে আরো স্পষ্ট করার জন্য আমরা আল্লাহর নাম السميع আস-সামী‘ (শ্রবণকারী) দ্বারা উদাহরণ পেশ করবো।

السميع এতে নিম্নবর্ণিত বিষয়গুলো লক্ষ্য রাখা প্রত্যেকেরই কর্তব্য:

(ক) السميع (আস-সামী‘) আল্লাহর নামসমূহের একটি নাম। এ কথার ওপর ঈমান আনা। কারণ এর বর্ণনা কুরআন ও হাদীসে এসেছে।

(খ) আরো ঈমান আনা যে,আল্লাহ তা‘আলা নিজেই নিজেকে এ নামে নামকরণ করেছেন, এ নামে কথা বলেন এবং তা কুরআনে অবতীর্ণ করেছেন।

(গ) السميع (আস-সামী‘) আস-সাম‘উ বা (শোনা) অর্থকে শামিল করে। যা আল্লাহর গুণসমূহের একটি গুণ।

(ঘ) السميع (আস-সামী‘) নাম হতে উদ্ভূত ‘‘শ্রবণ করা বা শোনা’’ গুণটি অস্বীকার ও অপব্যাখা না করে সম্মানের সাথে গ্রহণ করা ওয়াজিব।

(ঙ) নিশ্চয় আল্লাহ সব কিছু শুনেন এবং তাঁর শুনা সকল ধনিকে পরিবেষ্টন করে রেখেছে, এই বিশ্বাস রাখা। এ ঈমানের ফলাফল ও প্রভাব হলো আল্লাহর পর্যবেক্ষণ ও তাঁর ভয়-ভীতি আবশ্যক হয়ে যায় এবং এ দৃঢ় বিশ্বাস সৃষ্টি হয় যে,আল্লাহর কাছে কোনো কিছু গোপন থাকে না।

এমনিভাবে আল্লাহর গুণ العلي (আল-‘আলী) সাব্যস্ত করার সময় নিম্নের বিষয়গুলো লক্ষ্য রাখা উচিৎ:

(১) কুরআন ও হাদীসে বর্ণিত সকল সিফাত বা গুণ কোনো প্রকার অপব্যাখা ও সঠিক অর্থ ত্যাগ না করে প্রকৃতার্থে আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করা।

(২) দৃঢ় বিশ্বাস রাখা যে, আল্লাহ তা‘আলা যাবতীয় দোষ অসম্পূর্ণ গুণ থেকে মূক্ত, বরং তিনি সূ-পরিপূর্ণ গুণে গুণান্বিত।

(৩) আল্লাহর গুণাবলীর সাথে সৃষ্টিজীবের গুণসমূহের সাদৃশ্য না করা। কারণ আল্লাহর অনুরূপ কোনো কিছু নেই। না তাঁর গুণে এবং না তাঁর কর্মে।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿لَيۡسَ كَمِثۡلِهِۦ شَيۡءٞۖ وَهُوَ ٱلسَّمِيعُ ٱلۡبَصِيرُ ١١﴾ [الشورى: ١١]

“(সৃষ্টিজীবের) কোনো কিছুই তাঁর অনুরূপ নয়। আর তিনি সব শুনেন এবং সব দেখেন।” [সূরা আশ-শূরা, আয়াত: ১১]

(৪) এসব গুণের রূপ ও ধরণ-গঠন জানার কোনো প্রকার আশা আকাঙ্খা না করা। কেননা আল্লাহর গুণের রূপ ও ধরণ-গঠন তিনি ব্যতীত অন্য কেউ জানে না। ফলে সৃষ্টিজীবের তা জানার কোনো পথ নেই।

(৫) এসব গুণাবলী হতে সাব্যস্ত বিধি-বিধান এবং এর প্রভাব ও দাবীর ওপর ঈমান আনা। সুতরাং প্রতিটি গুণের সাথে ইবাদত সম্পৃক্ত।

এখন পাঁচটি বিষয় আরো স্পষ্ট হওয়ার জন্য ইস্তিওয়া (الاستواء) গুণটির উদাহরণ পেশ করব।

আল-ইস্তিওয়া (الاستواء) গুণটি সাব্যস্ত করতে নিম্নবর্ণিত বিষয়গুলো লক্ষ্য রাখা অপরিহার্য: (১) আল-ইস্তিওয়া (আল্লাহ তা‘আলা আরশের উপরে রয়েছেন) এ গুণটি আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করা এবং এর ওপর ঈমান আনা; কেননা তা কুরআন ও হাদীসে

একাধিকবার প্রমাণিত হয়েছে।

 আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ٱلرَّحۡمَٰنُ عَلَى ٱلۡعَرۡشِ ٱسۡتَوَىٰ ٥﴾ [طه: ٥]

“পরম দয়াময় (আল্লাহ তা‘আলা) ‘আরশের উপর রয়েছেন।” [সূরা ত্ব-হা, আয়াত: ৫]

(২) আল-ইস্তিওয়া (الاستواء) গুণটিকে যথাযোগ্য ও পরিপূর্ণরূপে আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করা। আর এর প্রকৃত অর্থ হলো, আল্লাহ তা‘আলা স্বীয় ‘আরশের উপরে রয়েছেন, যেমন তাঁর মহত্বের ও শ্রেষ্ঠত্বের জন্য শোভা পায়।

এর অর্থ আল্লাহ তা‘আলা প্রকৃতই তাঁর ‘আরশের উপরে রয়েছেন; তাঁর মর্যাদার জন্য যেভাবে শোভা পায়।

(৩) আল্লাহ তা‘আলার ‘আরশের উপর থাকাকে সৃষ্টজীবের আসন গ্রহণের সাথে উপমা না দেওয়া। কেননা আল্লাহ ‘আরশের মুখাপেক্ষী নন। তিনি ‘আরশের মুখাপেক্ষী নন; কিন্তু সৃষ্টজীবের কোনো কিছুর উপরে উঠা সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র, সৃষ্টজীব এর মুখাপেক্ষী।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿لَيۡسَ كَمِثۡلِهِۦ شَيۡءٞۖ وَهُوَ ٱلسَّمِيعُ ٱلۡبَصِيرُ ١١ ﴾ [الشورى: ١١]

“(সৃষ্টজীবের) কোনো কিছুই তাঁর অনুরূপ নয়। আর তিনি সব শুনেন এবং সব দেখেন।” [সূরা আশ-শূরা, আয়াত: ১১]

(৪) আল্লাহ তা‘আলার ‘আরশের উপর উঠার ধরণ ও পদ্ধতি নিয়ে তর্কে লিপ্ত না হওয়া। কেননা এটা গায়েবী বিষয়, যা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া কেউ জানে না।

(৫) এ গুণটি হতে সাব্যস্ত বিধি-বিধান ও ফলাফল এবং এর প্রভাবের ওপর ঈমান আনা, আর তা হলো আল্লাহ তা‘আলার যথাযোগ্য মহত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব সাব্যস্ত করা, যা সমগ্র সৃষ্টি হতে তাঁর উর্ধ্বে ও সু-উচ্চে (‘আরশের উপর) থাকাই প্রমাণ করে।

আরো প্রমাণ করে, সকল আত্মার তাঁরই দিকে ঊর্ধ্বমূখী হওয়া, যেমন সাজদাকারী সাজদাহ’য় বলে, (سبحان ربي الأعلى) আমি আমার রবের পবিত্রতা বর্ণনা করি, যিনি সু-উচ্চ ও ঊর্ধ্বে।

তৃতীয়ত: এ বিশ্বাস পোষণ করা যে, আল্লাহ তা‘আলাই একমাত্র সত্যিকার মা‘বুদ বা উপাস্য এবং প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য যাবতীয় ইবাদত পাওয়ার অধিকার রাখেন। তিনি এক ও অদ্বিতীয়, তাঁর কোনো শরীক নেই।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَلَقَدۡ بَعَثۡنَا فِي كُلِّ أُمَّةٖ رَّسُولًا أَنِ ٱعۡبُدُواْ ٱللَّهَ وَٱجۡتَنِبُواْ ٱلطَّٰغُوتَ﴾ [النحل: ٣٦]

“আমরা প্রত্যেক উম্মতের মধ্যেই রাসূল প্রেরণ করেছি এই মর্মে যে, তোমরা একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করবে এবং তাগুত (আল্লাহ ব্যতীত অন্যের ইবাদত করা অর্থাৎ শির্ক করা) থেকে নিরাপদ ও বিরত থাকবে।” [সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৩৬]

আর প্রত্যেক রাসূলই স্বীয় উম্মাতকে বলতেন,

﴿ٱعۡبُدُواْ ٱللَّهَ مَا لَكُم مِّنۡ إِلَٰهٍ غَيۡرُهُ﴾ [الاعراف: ٥٩]

“তোমরা একমাত্র আল্লাহর ইবাদত কর। তিনি ব্যতীত তোমাদের কোনো সত্য উপাস্য নেই।” [সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ৫৯]

তিনি আরো বলেন,

﴿وَمَآ أُمِرُوٓاْ إِلَّا لِيَعۡبُدُواْ ٱللَّهَ مُخۡلِصِينَ لَهُ ٱلدِّينَ حُنَفَآءَ﴾ [البينة: ٥]

“আর তাদেরকে এ ছাড়া কোনো নির্দেশ করা হয়নি যে, তারা খাঁটি মনে একনিষ্ঠভাবে (শির্কমুক্ত থেকে) একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করবে।” [সূরা আল-বাইয়্যেনাহ, আয়াত: ৫]

সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে যে,

«أتدري ما حق الله على العباد وما حق العباد على الله؟. قلت: الله ورسوله أعلم.قال:حق الله على العباد أن يعبدوه ولا يشركوا به شيئاً، وحق العباد على الله ألا يعذب من لا يشرك به شيئاً».

“তুমি কি জান? বান্দার ওপর আল্লাহর হক্ব বা অধিকার কি? আর আল্লাহর ওপর বান্দার অধিকার কি?

আমি (মু‘আয) বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই অধিক জ্ঞাত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, বান্দার ওপর আল্লাহর হক্ব হলো: তাঁর (আল্লাহর) ইবাদত করা এবং তাঁর সাথে কাউকে অংশীদার না করা। আল্লাহর ওপর বান্দার হক্ব হলো: যারা তাওহীদের ওপর সুদৃঢ় থেকে শির্কমুক্ত থাকে তাদেরকে শাস্তি না দেওয়া।

সত্য মাবুদ: তিনিই সত্য মা‘বুদ, অন্তর যার ইবাদত করে, যার ভালোবাসায় অন্তর ভরে যায়, অন্যের ভালোবাসার প্রয়োজন পড়ে না। যার আশা আকাঙ্খাই অন্তরের জন্য যথেষ্ট, অন্যের কাছে আশা ও আকাংখার প্রয়োজন হয় না। যার নিকট চাওয়া পাওয়া, সাহায্য প্রার্থনা ও তাঁকে ভয়-ভীতি করাই অন্তরের জন্য যথেষ্ট। অন্য কারো কাছে চাওয়া পাওয়ার প্রার্থনা করা, কাউকে ভয়-ভীতি করার প্রয়োজন নেই।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ذَٰلِكَ بِأَنَّ ٱللَّهَ هُوَ ٱلۡحَقُّ وَأَنَّ مَا يَدۡعُونَ مِن دُونِهِۦ هُوَ ٱلۡبَٰطِلُ وَأَنَّ ٱللَّهَ هُوَ ٱلۡعَلِيُّ ٱلۡكَبِيرُ ٦٢﴾ [الحج: ٦٢]

“এটা একারণেও যে, আল্লাহই সত্য, আর তাঁর পরিবর্তে তারা যাকে ডাকে, তা অসত্য এবং আল্লাহই সবার উচ্চে, মহান।” [সূরা আল-হাজ, আয়াত: ৬২]

আর এটাই বান্দার কর্মের দ্বারা আল্লাহর একত্ববাদ ঘোষণা করা। আর এটাই তাওহীদুল উলুহীয়্যাহ বা ইবাদতে একত্ববাদ।

এ তাওহীদের গুরুত্ব

নিম্নের বিষয়গুলোর মাধ্যমে এ তাওহীদের গুরুত্ব ফুটে উঠে:

(১) এ তাওহীদই দীন ইসলামের শুরু ও শেষ, জাহেরী-বাতেনী এবং মুখ্য উদ্দেশ্য। আর তাই সকল রাসূল আলাইহিমুস সালামের দাওয়াত ছিল। (২) এ তাওহীদ (কায়েম) এর লক্ষ্যে আল্লাহ তা‘আলা মাখলুকাত সৃষ্টি করেছেন, সকল নবী রাসূলদের প্রেরণ

করেছেন এবং সব আসমানী কিতাব অবতীর্ণ করেছেন। আর এ তাওহীদের কারণেই মানুষ মুমিন-কাফির, সৌভাগ্য দূর্ভাগ্যে বিভক্ত হয়েছে।

(৩) আর এ তাওহীদই বান্দাদের ওপর সর্বপ্রথম ফরয। সর্বপ্রথম এর মাধ্যমেই ইসলামে প্রবেশ করে এবং এ তাওহীদ নিয়েই দুনিয়া ত্যাগ করে।

তাওহীদ বাস্তবায়ন বা তাওহীদ প্রতিষ্ঠা:

তাওহীদের বাস্তবায়ন হলো, তাওহীদকে শির্ক, বিদ‘আত ও পাপাচার মুক্ত করা।

তাওহীদকে কলুষমুক্ত করা দু’রকম:

(১) ফরয ও

(২) মুস্তাহাব।

তন্মধ্যে ফরয তাওহীদ তিন বিষয়ের মাধ্যমে হয়:

(১) তাওহীদকে এমন শির্ক থেকে মুক্ত করা, যা মূল তাওহীদের পরিপন্থী।

(২) তাওহীদকে এমন বিদ‘আত থেকে মুক্ত করা যা তাওহীদের পরিপূর্ণতার পরিপন্থী, অথবা মূল তাওহীদের পরিপন্থী সে বিদ‘আত যদি কুফুরী পর্যায়ের হয়ে থাকে।

(৩) তাওহীদকে এমন পাপকর্ম থেকে মুক্ত করা যা তাওহীদের (অর্জিত) পূণ্য হ্রাস করে এবং তাওহীদে কু-প্রভাব ফেলে।

আর মান্দুব (তাওহীদ) তা হলো সকল মুস্তাহাব কাজ। যেমন:

(ক) ইহসানের (ইখলাসের) পূর্ণ বাস্তবায়ন।

(খ) ইয়াকীনের পূর্ণ বাস্তবায়ন করা।

(গ) আল্লাহ ছাড়া কারো নিকট অভিযোগ না করে পূর্ণ ধৈর্য ধারণ করা।

(ঘ) সৃষ্টজীব থেকে মুক্ত হয়ে শুধুমাত্র আল্লাহর কাছে চাওয়াই যথেষ্ট মনে করা।

(চ) কিছু বৈধ উপকরণ ত্যাগের মাধ্যমে আল্লাহর ওপর পূর্ণ তাওয়াক্কুলের প্রকাশ। যেমন, ঝাড় ফুঁক ও দাগ (রোগ নিরাময়ের জন্য ছেঁক লাগানো) ছেড়ে দেওয়া।

(ছ) নফল ইবাদত করে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের মাধ্যমে পূর্ণ ভালোবাসা লাভ করা।

অতঃপর যারা তাওহীদকে বাস্তবায়ন করবে উপরের বর্ণনানুপাতে এবং বড় শির্ক থেকে বেঁচে থাকবে, তারা জাহান্নামে চিরস্থায়ী বসবাস করা থেকে পরিত্রান লাভ করবে।

আর যারা বড় ও ছোট শির্ক করা থেকে বেঁচে থাকবে এবং বড় ও ছোট পাপ থেকে দূরে থাকবে, তাদের জন্য দুনিয়াতে ও আখিরাতে পূর্ণ নিরাপত্তা রয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَغۡفِرُ أَن يُشۡرَكَ بِهِۦ وَيَغۡفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَآءُۚ وَمَن يُشۡرِكۡ بِٱللَّهِ فَقَدِ ٱفۡتَرَىٰٓ إِثۡمًا عَظِيمًا ٤٨﴾ [النساء: ٤٨]

“নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা তাঁর সাথে শির্কের অপরাধ ক্ষমা করবেন না। আর তা ব্যতীত যাকে ইচ্ছা করেন (তার অন্যান্য অপরাধ) তিনি ক্ষমা করে দেন।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৪৮]

তিনি আরো বলেন,

﴿ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَلَمۡ يَلۡبِسُوٓاْ إِيمَٰنَهُم بِظُلۡمٍ أُوْلَٰٓئِكَ لَهُمُ ٱلۡأَمۡنُ وَهُم مُّهۡتَدُونَ ٨٢﴾ [الانعام: ٨٢]

“যারা ঈমান আনে এবং স্বীয় বিশ্বাসকে শির্কের সাথে মিশ্রিত করেনা,তাদের জন্যই শান্তি এবং তারাই সুপথগামী।” [সূরা আল- আন‘আম, আয়াত: ৮২]

তাওহীদের বিপরীত শির্ক, আর তা তিন প্রকার:

(১) বড় শির্ক, যা মূল তাওহীদের পরিপন্থী, আল্লাহ শির্কের গোনাহ্ তাওবাহ্ ছাড়া মাফ করেন না। যে ব্যক্তি শির্কের ওপর মারা যাবে, সে চিরস্থায়ী জাহান্নামী হবে।

শির্ক হল, আল্লাহর ইবাদতে কাউকে তাঁর সমকক্ষ নির্ধারণ করে যেমনিভাবে আল্লাহকে ডাকে তেমনিভাবে সে সমকক্ষ নির্ধারণকৃতকে ডাকা, তাকে উদ্দেশ্য করে কাজ করা, তার ওপর ভরসা করা, তার কাছে কোনো কিছুর আশা করা। তাকে সে রূপ ভালোবাসা ও সে রূপ ভয় করা যেরূপ আল্লাহকে ভালোবাসে ও ভয় করে।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿إِنَّهُۥ مَن يُشۡرِكۡ بِٱللَّهِ فَقَدۡ حَرَّمَ ٱللَّهُ عَلَيۡهِ ٱلۡجَنَّةَ وَمَأۡوَىٰهُ ٱلنَّارُۖ وَمَا لِلظَّٰلِمِينَ مِنۡ أَنصَارٖ ٧٢﴾ [المائ‍دة: ٧٢]

“নিশ্চয় যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে আংশিদার স্থির করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করেছেন এবং তার বাসস্থান হবে জাহান্নাম। আর অত্যাচারীদের (মুশরিকদের) কোনো সাহায্যকারী নেই।” [সূরা আল-মায়েদাহ, আয়াত: ৭২]

(২) ছোট শির্ক তাওহীদের পূর্ণতার পরিপন্থী। আর তা হচ্ছে, এমন প্রত্যেক মাধ্যম যা বড় শির্কের দিকে নিয়ে যায়। যেমন আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে শপথ করা। রিয়া বা লোক দেখানো কাজ।

(৩) গোপনীয় শির্ক, যা নিয়্যাত ও উদ্দেশ্যের সাথে সম্পৃক্ত থাকে। তা কখনো ছোট, আবার কখনো বড় শির্কে পরিণত হয়।

সাহাবী মাহমুদ ইবন লবীদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«إن أخوف ما أخاف عليكم الشرك الأصغر، قالوا وماالشرك الأصغر يارسول الله ؟ قال:الرياء».

“আমি তোমাদের ওপর সব চেয়েবেশী ভয় পাই ছোট শির্কের। সাহাবারা জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! ছোট শির্ক কি? তিনি বললেন, তা হল রিয়া বা লোক দেখানো কাজ।” (আহমদ)

(২) ইবাদতের সংজ্ঞা

ইবাদত হচ্ছে, ঐ সব আকীদা-বিশ্বাস, অন্তর ও অঙ্গ-প্রতঙ্গের কর্ম যা আল্লাহ তা‘আলা ভালোবাসেন ও পছন্দ করেন। অনুরূপভাবে কোনো কিছু সম্পাদন করা বা বর্জন করা যা আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করায় তাও ইবাদত।

অনুরূপভাবে কুরআন ও হাদীসে বিধিবদ্ধ প্রতিটি কর্ম ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত।

ইবাদত বিভিন্ন প্রকার রয়েছে:

অন্তরের ইবাদত: যেমন, ঈমানের ছয়টি রুকন, ভয়, আশা, ভরসা, আগ্রহ ও ভীতি ইত্যাদি।

প্রকাশ্য ইবাদত: যেমন, সালাত, যাকাত, সাওম ও হজ।

ইবাদত ততক্ষণ পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য হবে না যতক্ষণ না তা দু’টি মূলনীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়।

প্রথম: সকল ইবাদত একমাত্র আল্লাহর জন্য খালেস করা এবং তার সাথে শির্ক না করা। আর তাই (شهادة أن لا إله إلا الله) ‘‘আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য মা‘বুদ নেই’’ এ সাক্ষ্য প্রদানের অর্থ।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿أَلَا لِلَّهِ ٱلدِّينُ ٱلۡخَالِصُۚ وَٱلَّذِينَ ٱتَّخَذُواْ مِن دُونِهِۦٓ أَوۡلِيَآءَ مَا نَعۡبُدُهُمۡ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَآ إِلَى ٱللَّهِ زُلۡفَىٰٓ إِنَّ ٱللَّهَ يَحۡكُمُ بَيۡنَهُمۡ فِي مَا هُمۡ فِيهِ يَخۡتَلِفُونَۗ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَهۡدِي مَنۡ هُوَ كَٰذِبٞ كَفَّارٞ ٣﴾ [الزمر: ٣]

“জেনে রাখুন, নিষ্ঠাপূর্ণ ইবাদত আল্লাহরই নিমিত্তে। যারা আল্লাহ ব্যতীত অপরকে উপাস্য রূপে গ্রহণ করে রেখেছে এবং বলে যে, আমরা তাদের ইবাদত এজন্যই করি, যেন তারা আমাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেয়। নিশ্চয় আল্লাহ তাদের মধ্যে তাদের পারস্পরিক বিরোধপূর্ণ বিষয়ের ফায়সালা করে দেবেন। আল্লাহ মিথ্যাবাদী কাফিরকে সৎপথে পরিচালিত করেন না।” [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ২-৩]

তিনি আরো বলেন,

﴿وَمَآ أُمِرُوٓاْ إِلَّا لِيَعۡبُدُواْ ٱللَّهَ مُخۡلِصِينَ لَهُ ٱلدِّينَ حُنَفَآءَ﴾ [البينة: ٥]

“আর তাদেরকে এছাড়া কোনো নির্দেশ করা হয় নি যে, তারা খাঁটি মনে একনিষ্ঠভাবে (শির্কমুক্ত থেকে) একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করবে।” [সূরা আল-বাইয়্যেনাহ, আয়াত: ৫]

দ্বিতীয়: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে শরী‘আত নিয়ে এসেছেন তার অনুসরণ করা।

এর অর্থ, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যে কাজ যেভাবে করেছেন সে কাজ সেই নিয়মে করা, কোনো প্রকার কম বেশি না করা।

আর তাই (شهادة أن محمدًا رسول الله) ‘‘মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর প্রেরিত রাসূল’’ এ সাক্ষ্য প্রদানের অর্থ।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿قُلۡ إِن كُنتُمۡ تُحِبُّونَ ٱللَّهَ فَٱتَّبِعُونِي يُحۡبِبۡكُمُ ٱللَّهُ وَيَغۡفِرۡ لَكُمۡ ذُنُوبَكُمۡۚ وَٱللَّهُ غَفُورٞ رَّحِيمٞ ٣١﴾ [ال عمران: ٣١]

“বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাস, তাহলে আমাকে অনুসরণ কর, যাতে আল্লাহও তোমাদিগকে ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপ মার্জনা করে দেন, আর আল্লাহ হলেন ক্ষমাকারী দয়ালু।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৩১]

তিনি আরো বলেন,

﴿وَمَآ ءَاتَىٰكُمُ ٱلرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَىٰكُمۡ عَنۡهُ فَٱنتَهُواْۚ﴾ [الحشر: ٧]

“আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাদেরকে যা দিয়েছেন তা গ্রহণ কর এবং যা থেকে বারণ করেছেন তা থেকে বিরত থাক।” [সূরা আল-হাশর, আয়াত: ৭]

তিনি আরো বলেন,

﴿فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤۡمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيۡنَهُمۡ ثُمَّ لَا يَجِدُواْ فِيٓ أَنفُسِهِمۡ حَرَجٗا مِّمَّا قَضَيۡتَ وَيُسَلِّمُواْ تَسۡلِيمٗا ٦٥﴾ [النساء: ٦٥]

“অতএব, তোমার রবের কসম, তারা ঈমানদার হবে না, যতক্ষণ পযর্ন্ত তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে আপনাকে বিচারক বলে গ্রহণ না করে। অতঃপর আপনার মীমাংসার ব্যাপারে নিজের মনে কোনোরকম সংকীর্ণতা পাবে না এবং হৃষ্টচিত্তে কবুল করে নিবে।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৬৫]

দুটি বিষয় ছাড়া ইবাদত (দাসত্ব) পরিপূর্ণতা লাভ করে না:

প্রথম: আল্লাহকে পূর্ণ ভালোবাসা, অর্থাৎ আল্লাহর ভালোবাসা ও আল্লাহ যা ভালোবাসেন তাঁর ভালোবাসাকে অন্য সকল বস্তুর ভালোবাসার ওপর প্রাধান্য দেওয়া।

দ্বিতীয়: আল্লাহর নিকট পূর্ণ বিনয়-নম্রতা ও আনুগত্য প্রকাশ করা। অর্থাৎ বান্দা আল্লাহ তা‘আলার আদেশসমূহ পালনের ও নিষেধাজ্ঞা থেকে বেঁচে থাকার মাধ্যমে বিনয়-নম্রতা প্রকাশ করবে।

সুতরাং পূর্ণ বশ্যতা, বিনয়-নম্রতা, আশা-আকাঙ্খা ও ভয়-ভীতির সাথে পূর্ণ ভালোবাসাকে ইবাদত বলা হয়। এর মাধ্যমেই বান্দার ইবাদত স্বীয় প্রভু সৃষ্টিকর্তার জন্য বাস্তবায়িত হয়। আল্লাহর জন্য ইবাদত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর ভালোবাসা ও সন্তুষ্টি অর্জন করতে সক্ষম হয়।

অতএব, বান্দার ফরয বিধান পালন করার মাধ্যমে তাঁর (আল্লাহর) নৈকট্য অর্জন করাকে আল্লাহ ভালোবাসেন।

বান্দার নফল ইবাদত যতই বৃদ্ধি পাবে ততই তাঁর নৈকট্য ও মর্যাদা আল্লাহর নিকট বৃদ্ধি পাবে। আর আল্লাহর অনুগ্রহ ও করুণায় তা জান্নাতে প্রবেশ করার উপায় হবে।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ٱدۡعُواْ رَبَّكُمۡ تَضَرُّعٗا وَخُفۡيَةًۚ إِنَّهُۥ لَا يُحِبُّ ٱلۡمُعۡتَدِينَ ٥٥﴾ [الاعراف: ٥٥]

“তোমরা স্বীয় রককে ডাক, কাকুতি-মিনতি করে এবং সংগোপনে। তিনি সীমা অতিক্রমকারীদেরকে পছন্দ করেন না।” [সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ৫৫]

(৩) আল্লাহর তাওহীদ (একত্ববাদ) এর দলীল ও প্রমাণপঞ্জী:

আল্লাহ তা‘আলার একত্ববাদের স্বপক্ষে অজস্র সাক্ষ্য ও প্রমাণপঞ্জী রয়েছে। যারা এ প্রমাণপঞ্জীকে নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করবে, তাদের জ্ঞান ও বিশ্বাস আল্লাহ তা‘আলার কর্ম, নাম ও গুণাবলী এবং ইবাদতের ক্ষেত্রে একত্ববাদকে আরো বৃদ্ধি ও দৃঢ় করবে।

নিম্নে সে সকল সাক্ষ্য ও প্রমাণপঞ্জীর কিছু নমুনা পেশ করা হলো:

(ক) এ পৃথিবী সৃষ্টির বিশালতা, সূক্ষ্ণকারীগরী, রকমারী সৃষ্টি এবং এসব পরিচালনার সুদক্ষ নিয়ম-নীতি।

যে ব্যক্তি এ সমস্ত বিষয়ে চিন্তা-গবেষণা করবে আল্লাহ তা‘আলার একত্ববাদ সম্পর্কে তার বিশ্বাস আরো দৃঢ় হবে।

তেমনি যে নভোমণ্ডল-ভূমণ্ডল, সূর্য-চন্দ্র, মানুষ-পশু, উদ্ভিদ-লতাপাতা ও জড় পদার্থ সম্পর্কে চিন্তা করবে, সে নিশ্চিতভাবে জানতে পারবে যে, এসবের একজন স্রষ্টা রয়েছেন, যিনি স্বীয় নামসমূহ, গুণাবলী ও উপাস্য পরিপূর্ণ, আর তাই প্রমাণ করে যে, তিনিই একমাত্র যাবতীয় ইবাদত পাওয়ার প্রকৃত অধিকার রাখেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَجَعَلۡنَا فِي ٱلۡأَرۡضِ رَوَٰسِيَ أَن تَمِيدَ بِهِمۡ وَجَعَلۡنَا فِيهَا فِجَاجٗا سُبُلٗا لَّعَلَّهُمۡ يَهۡتَدُونَ ٣١ وَجَعَلۡنَا ٱلسَّمَآءَ سَقۡفٗا مَّحۡفُوظٗاۖ وَهُمۡ عَنۡ ءَايَٰتِهَا مُعۡرِضُونَ ٣٢ وَهُوَ ٱلَّذِي خَلَقَ ٱلَّيۡلَ وَٱلنَّهَارَ وَٱلشَّمۡسَ وَٱلۡقَمَرَۖ كُلّٞ فِي فَلَكٖ يَسۡبَحُونَ ٣٣﴾ [الانبياء: ٣١، ٣٣]

“আমরা পৃথিবীতে ভারী বোঝা রেখে দিয়েছি যাতে তাদেরকে নিয়ে পৃথিবী ঝুঁকে না পড়ে এবং তাতে প্রশস্ত পথ রেখেছি, যাতে তারা পথপ্রাপ্ত হয়। আমি আকাশকে সুরক্ষিত ছাদ করেছি, অথচ তারা আমার আকাশস্ত নিদর্শনাবলী থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখে। তিনিই সৃষ্টি করেছেন রাত্রি ও দিন এবং সূর্য ও চন্দ্র। সবই আপন কক্ষপথে বিচরণ করে। [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ৩১-৩৩]

তিনি আরো বলেন,

﴿وَمِنۡ ءَايَٰتِهِۦ خَلۡقُ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِ وَٱخۡتِلَٰفُ أَلۡسِنَتِكُمۡ وَأَلۡوَٰنِكُمۡۚ إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَأٓيَٰتٖ لِّلۡعَٰلِمِينَ ٢٢﴾ [الروم: ٢٢] “তাঁর (আল্লাহর) আরও এক নিদর্শন হচ্ছে নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের সৃজন এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের

বৈচিত্র!

নিশ্চয় এতে জ্ঞানীদের জন্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে।” [সূরা আর-রূম, আয়াত: ২২]

(খ) আল্লাহ তা‘আলা রাসূলদের যে শরী‘আত দিয়ে প্রেরণ করেছেন এবং তাদেরকে বিভিন্ন নিদর্শন ও অকাট্য প্রমাণাদি দিয়ে সহযোগিতা করেছেন। এসব প্রমাণ করে যে, আল্লাহ তা‘আলা এক ও অদ্বিতীয়। তিনি একমাত্র যাবতীয় ইবাদত পাওয়ার যোগ্য।

আর আল্লাহ তা‘আলা সৃষ্টিজীবের জন্য যে সব নিয়ম-বিধান প্রনয়ণ করেছে, তা প্রমাণ করে যে, এসব সেই বিজ্ঞ ও প্রজ্ঞাময় থেকে এসেছে যিনি সৃষ্টিজীবের যাবতীয় কল্যাণ সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিফহাল। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿لَقَدۡ أَرۡسَلۡنَا رُسُلَنَا بِٱلۡبَيِّنَٰتِ وَأَنزَلۡنَا مَعَهُمُ ٱلۡكِتَٰبَ وَٱلۡمِيزَانَ لِيَقُومَ ٱلنَّاسُ بِٱلۡقِسۡطِۖ﴾ [الحديد: ٢٥]

“আমরা আমাদের রাসূলগণকে সুস্পষ্ট নিদর্শসহ প্রেরণ করেছি এবং তাদের সাথে অবতীর্ণ করেছি কিতাব ও মীযান বা মানদণ্ড; যাতে মানুষ ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করে।” [সূরা আল-হাদীদ, আয়াত: ২৫]

তিনি আরো বলেন,

﴿قُل لَّئِنِ ٱجۡتَمَعَتِ ٱلۡإِنسُ وَٱلۡجِنُّ عَلَىٰٓ أَن يَأۡتُواْ بِمِثۡلِ هَٰذَا ٱلۡقُرۡءَانِ لَا يَأۡتُونَ بِمِثۡلِهِۦ وَلَوۡ كَانَ بَعۡضُهُمۡ لِبَعۡضٖ ظَهِيرٗا ٨٨﴾ [الاسراء: ٨٨]

“বলুন, যদি মানব ও জিন্ন এ কুরআনের অনুরূপ রচনা করে আনয়নের জন্য এক হয় এবং তারা পরস্পরের সাহায্যকারী হয়, তবুও তারা কখনও এর অনুরূপ রচনা করে আনতে পারবে না।” [সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ৮৮]

(গ) ফিৎরাত (সৃষ্টিগত স্বভাব বা প্রকৃতি) যার ওপর আল্লাহ তা‘আলা বান্দাদের আত্মাসমূহকে সৃষ্টি করেছেন, তা আল্লাহর একত্ববাদকে স্বীকার করে। ফিৎরাত অন্তরের স্থায়ী জিনিস, তাই যখন কোনো মানুষ কষ্ট পায় তখন তা অনুভব করতে পারে এবং আল্লাহর দিকে ফিরে যায়। মানুষ যদি সন্দেহ ও প্রবৃত্তির অনুসরণমুক্ত হয়, যা ফিৎরাতকে পরির্বতন করে দেয়, তবে সে অন্তরস্থল থেকে নাম, গুণ ও ইবাদত প্রাপ্য একমাত্র আল্লাহর একত্ববাদের স্বীকৃতি দিবে এবং আল্লাহ তা‘আলা রাসূলদেরকে যে শরী‘আত দিয়ে প্রেরণ করেছে তাতে আত্মসমর্পন করবে।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿فَأَقِمۡ وَجۡهَكَ لِلدِّينِ حَنِيفٗاۚ فِطۡرَتَ ٱللَّهِ ٱلَّتِي فَطَرَ ٱلنَّاسَ عَلَيۡهَاۚ لَا تَبۡدِيلَ لِخَلۡقِ ٱللَّهِۚ ذَٰلِكَ ٱلدِّينُ ٱلۡقَيِّمُ وَلَٰكِنَّ أَكۡثَرَ ٱلنَّاسِ لَا يَعۡلَمُونَ ٣٠ ۞مُنِيبِينَ إِلَيۡهِ وَٱتَّقُوهُ وَأَقِيمُواْ ٱلصَّلَوٰةَ وَلَا تَكُونُواْ مِنَ ٱلۡمُشۡرِكِينَ ٣١﴾ [الروم: ٣٠، ٣١]

“তুমি একনিষ্ঠভাবে নিজেকে ধর্মের ওপর প্রতিষ্ঠিত রাখ। এটাই আল্লাহর প্রকৃতি, যার ওপর তিনি মানব সৃষ্টি করেছেন, আল্লাহর সৃষ্টির কোনো পরিবর্তন নেই। এটাই সঠিক ধর্ম। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না। সকলেই তাঁর অভিমুখী হও এবং ভয় কর, সালাত কায়েম কর এবং মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।” [সূরা আর-রূম, আয়াত: ৩০-৩১]

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«كل مو لد يولد على الفطرة، فأبواه يهودانه، أو ينصرانه، أو يمجسانه، كما تنتج البهيمة بهيمة جمعاء هل تحسنون فيها من جدعاء»

“প্রত্যেক শিশুই ফিৎরাতের ওপর জন্মগ্রহণ করে। অতঃপর তার পিতা-মাতা তাকে ইয়াহূদী, খৃষ্টান অথবা অগ্নীপূজক বানায়। যেমন, নিখুঁত জানোয়ার নিখুঁত বাঁচ্চা জন্ম দেয়। তাতে কোনো প্রকার ত্রুটি থাকে না।

অতঃপর এই আয়াত পাঠ করলেন,

﴿فِطۡرَتَ ٱللَّهِ ٱلَّتِي فَطَرَ ٱلنَّاسَ عَلَيۡهَاۚ﴾ [الروم: ٣٠]

“এটাই আল্লাহর প্রকৃতি, যার ওপর তিনি মানব সৃষ্টি করেছেন।” [সূরা আর-রূম, আয়াত: ৩০]

এই বইটির সকল আর্টিকেল পড়তে নিচের লিংক গুলো ক্লিক করুন

প্রথম রুকন: মহান আল্লাহর ওপর ঈমান

দ্বিতীয় রুকন: ফিরিশতাদের ওপর ঈমান

তৃতীয় রুকন: আসমানী গ্রন্থসমূহের ওপর ঈমান

চতুর্থ রুকন: রাসূলদের ওপর ঈমান

পঞ্চম রুকন: শেষ দিবসের ওপর ঈমান

ষষ্ঠ রুকন: তাকদীরের ওপর ঈমান