Quran Translation to Bangla

মূল:নারীর হজ ও উমরাহ

ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

সম্পাদনা: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

এরপর মহিলা তার স্বাভাবিক সংযত পোশাক পরে নেবে। শরী‘আত সমর্থিত যে কোনো পোশাকই পরে সে ইহরাম করতে পারে। আলিমগণ এ ব্যাপারে একমত হয়েছেন যে, মহিলা তার কামিজ, ওড়না এবং সেলোয়ার, পা মোজা সহ ইহরাম করতে পারে।[1]

তবে সে তার চেহারা ঢাকার জন্য নেকাব বা ওড়না অথবা অন্য কোনো কাপড় পরতে পারবে না। অনুরূপভাবে সে হাত মোজা পরতে পারবে না। কিন্তু যখন মাহরাম ছাড়া অন্য কেউ তার দিকে তাকানোর সম্ভাবনা থাকবে তখন সে মাথার ওপর থেকে টেনে তার চেহারাকে ঢেকে রাখবে। যেমনটি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা ও রাসূলের স্ত্রী-গণ এবং সালফে সালেহীনের স্ত্রী-গণ করেছিলেন।

পুরুষের মতো মহিলাও শরী‘আত নির্ধারিত স্থান থেকে ইহরাম বাঁধবে। হজ ও উমরার জন্য সে এ সমস্ত মীকাত অতিক্রম কালেই ইহরাম বাঁধতে হবে। এ স্থানগুলো হচ্ছে: মদীনাবাসীদের জন্য জিল-হুলাইফাহ, (আবইয়ারে আলী), সিরিয়াবাসীদের জন্য জুহফা (রাবেগ) ইয়ামনবাসীদের জন্য ইয়ালমলম, নাজদবাসীদের জন্য ক্বারনুল মানাযেল আর ইরাকিদের জন্য যাতে ইরক নামক স্থানসমূহ।[2] আমরা পূর্বাঞ্চলের অধিবাসীরা যদি সরাসরি মক্কায় যাওয়ার নিয়ত করি তবে ইয়ামনের মীকাত অনুসরণ করে আমাদেরকে ‘ইয়ালমলম’ থেকে ইহরাম বাঁধতে হবে। কিন্তু এ স্থানটি যেহেতু জেদ্দার একটু আগে এবং এখানে বিমান অপেক্ষা করার মত অবস্থা থাকে না তাই আমাদেরকে আমাদের বিমানবন্দরেই ইহরাম বেঁধে উঠতে হবে। আর যদি আমরা সরাসরি মক্কায় না গিয়ে মদিনা শরীফে আগে যাই তবে আমাদেরকে মদিনায় গিয়ে সেখানকার অধিবাসীদের ন্যায় ‘জিলহুলাইফা’ তথা আবইয়ারে আলী থেকে ইহরাম বাঁধতে হবে।

আর যদি কোনো মহিলা এ সমস্ত মীকাত-এর ভিতরে অবস্থান করে তবে সে তার ঘর থেকেই হজের ইহরাম বাঁধবে। যেমন, মক্কা ও জেদ্দার অধিবাসীরা তারা তাদের ঘর থেকেই হজের ইহরাম বাঁধবে। কিন্তু মক্কাবাসীরা যদি উমরার ইহরাম করে তবে তাদেরকে কমপক্ষে সবচেয়ে কাছের হালাল এলাকায় যেতে হবে যাকে আমরা ‘মসজিদে আয়েশা’ বা তান‘য়ীম বলে থাকি।

মনে রাখা আবশ্যক যে, মীকাত থেকে ইহরাম বাঁধা সুন্নাত। যদি কেউ তার পূর্বেই ইহরাম বাঁধে তবে তার ইহরাম শুদ্ধ হবে যদিও তার একটি সুন্নাত বাদ পড়ে গেল।

কেউ ইহরাম ব্যতীত মীকাত অতিক্রম করলে তাকে মীকাতে ফিরে যেতে হবে এবং পুনরায় ইহরাম বাঁধতে হবে। আর যদি মীকাত অতিক্রম করার পর ইহরাম বাঁধে তাহলে তাকে একটি ছাগল পশু সাদকা করতে হবে। যা সে নিজে খেতে পারবে না। হারাম এলাকার ফকিরদের মাঝে বিলিয়ে দিতে হবে।

ইহরাম বাধার জন্য বিশেষ কোনো সালাত নেই, তবে কোনো ফরয বা নফল সালাতের পরে ইহরামটি হওয়া মুস্তাহাব। যেমন, তাহিয়্যাতুল অযু, বা তাহিয়্যাতুল মসজিদ বা চাশতের সালাত বা বিতরের সালাত-এর পরে ইহরাম বাঁধা। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

أتاني الليلة آت من ربي، فقال: صل في هذا الوادي المبارك، وقل عمرة في حجة.

“এ রাত্রিতে আমার নিকটি এক আগন্তুক (ফিরিশতা) এসে আমাকে বলেছে, এ উপত্যকায় সালাত পড়ুন এবং বলুন: হজের সাথে উমরার নিয়ত করছি”।[3]

সালাতের পরে ইহরাম বাধার জন্য মনে মনে নিয়ত বা দৃঢ় সংকল্প করে নিতে হবে। তারপর কোনো ধরনের হজ আদায় করছে তা মুখে বলা সুন্নাত। যেমনটি উপরোক্ত হাদীসে এসেছে।

যদি তামাত্তু হজ করার ইচ্ছা করে তবে সে যেন বলে, لبَّيْكَ عُمْرَةً “লাববাইকা ওমরাতান” বা “আমি উমরাহ আদায়ের জন্য হাযির হচ্ছি”। তারপর তালবিয়া পাঠ করতে হবে। তালবিয়া হলো:

«لَبَّيْكَ اَللَّهُمَّ لَبَّيْكَ ، لَبَّيْكَ لَا شَرِيْكَ لَكَ لَبَّيْكَ ، إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ لَا شَرِيْكَ لَكَ».

“লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারীকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান-নি‘মাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা শারীকা লাকা”।[4]

অর্থাৎ হে আল্লাহ! আপনি যে জন্য আমাকে আসার আহবান জানিয়েছেন আমি সে জন্য হাযির, সদা হাযির। আমি সদা উপস্থিত, আমি ঘোষণা করছি যে, আপনার কোনো শরীক নেই। আমি এও ঘোষণা করছি যে, যাবতীয় হামদ তথা সগুণে প্রশংসার অধিকারী হিসেবে প্রাপ্য প্রশংসা শুধু আপনারই, অনুরূপভাবে যাবতীয় নিয়ামাতও আপনার। যেমনিভাবে সব ধরনের ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি আপনারই। আপনার কোনো শরীক নেই। আপনি ব্যতীত আর কেউ এগুলো পেতে পারে না।

এ তালবিয়া পাঠ করা অত্যন্ত জরুরি। বেশি বেশি করে তালবিয়া পাঠ করুন। তবে উচ্চ স্বরে নয়। মহিলারা তালবিয়া পাঠের সময় তাদের স্বর উচ্চ করবে না।

ইহরাম করার পর-পরই তার ওপর কিছু বিষয় পরিত্যাজ্য হয়ে পড়ে। যা আমরা ইতিপূর্বে আলোচনা করেছি।

তারপর যখন ইহরামকারী হাজী সাহেবা মসজিদে হারামে পৌঁছাবেন তখন আপনার ডান পা দিয়ে মসজিদে প্রবেশ করুন এবং নিম্নোক্ত দো‘আ পাঠ করুন:

«بِسْمِ اللهِ، والصَّلاّةُ وَالسَّلامُ عَلَى رَسُولِ اللهِ، اللَّهُمَّ اغْفِرْلِيْ ذُنُوْبِي، وافْتَحْ لِيْ أبْوَابَ رَحْمَتِكَ، أعُوْذُ بِاللهِ العَظِيْمِ وبِوَجْهِهِ الْكَرِيْمِ، وَبِسُلْطَانِهِ القَدِيْمِ، مِنَ الشَّيْطَانِ الرَجيْمِ»

উচ্চারণ: “বিসমিল্লাহ, ওয়স্-সালাতু ওয়াস্-সালামু ‘আলা রাসূলিল্লাহ্, আল্লাহুম্মাগফির লী যুনূবী, ওয়াফ্তাহ্ লী আব্ওয়াবা রাহমাতিকা, আ‘ঊযু বিল্লাহিল ‘আযীম ওয়া বি ওয়াজহিহিল কারীম, ওয়াবি সুলত্বানিহিল ক্বাদীম, মিনাশ্ শাইত্বানির রাজীম।”

তারপর যখন কা‘বার কাছে পৌঁছবেন তখন তাওয়াফ শুরু করার আগে তালবিয়া পাঠ করা বন্ধ করে দিতে হবে।

তারপর হাজারে আসওয়াদের কাছে এসে সম্ভব হলে তা স্পর্শ করুন, আর যদি সম্ভব না হয় তবে হাজারে আসওয়াদের সোজা হয়ে সেদিকে হাত দিয়ে ইশারা করে বলবেন:

بسْمِ اللهِ وَاللهُ أَكْبَرُ

উচ্চারণ: “বিসমিল্লাহি ওয়াল্লাহু আকবার।” তারপর কা‘বাকে বাম পাশে রেখে সাত বার তাওয়াফ করুন।

আর যদি তাওয়াফের সময় রুকনে ইয়ামানীর কাছে যাওয়া সম্ভব হয়, তবে তা স্পর্শ করুন, নইলে হাত দ্বারা ইশারা করা ব্যতীত এগিয়ে যান। তারপর রুকনে ইয়া মানী এবং হাজারে আস্ওয়াদের মাঝখান দিয়ে পার হওয়ার সময় এই আয়াতটি পাঠ করুন:

﴿رَبَّنَآ ءَاتِنَا فِي ٱلدُّنۡيَا حَسَنَةٗ وَفِي ٱلۡأٓخِرَةِ حَسَنَةٗ وَقِنَا عَذَابَ ٱلنَّارِ﴾ [البقرة: ٢٠١]

উচ্চারণ: “রাব্বানা আতিনা ফিদ্ দুনিয়া হাসানাতান, ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাতান, ওয়া ক্বিনা ‘আযাবান নার।”

অর্থাৎ “হে আমাদের রব! আমাদেরকে দুনিয়াতে কল্যাণ দান করুন এবং আখিরাতে কল্যাণ দান করুন এবং আমাদেরকে আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন।” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ২০১]

এ দো‘আ ব্যতীত তাওয়াফের সময় সুনির্দিষ্ট কোনো দো‘আ নেই। অনেকে প্রতি তাওয়াফের জন্য বিভিন্ন দো‘আ তৈরি করে নিয়েছে, সেগুলোর কোনো অস্তিত্ব নেই। এগুলো পড়া বাদ দিয়ে আপনি আপনার ভাষায় যত বেশি পারেন দো‘আ করুন। আর যদি কুরআন পাঠ করেন অথবা অন্য কোনো দো‘আ পাঠ করেন তবে কোনো ক্ষতি নেই।

যখন তাওয়াফ সমাপ্ত হবে, তখন মাকামে ইবরাহীমকে সামনে নিয়ে কিবলার দিক হয়ে দুই রাকাত সালাত আদায় করুন। প্রথম রাকাতে সূরা আল-ফাতিহার পরে সূরা কাফিরূন বা কুল ইয়া আইয়ুহাল কাফিরূন এবং দ্বিতীয় রাকাতে সূরা আল-ফাতিহার পর সূরা আল-ইখলাস বা কুল হুওয়াল্লাহু আহাদ দ্বারা পড়া সুন্নাত। তবে অন্য সূরা দ্বারাও পড়া যাবে। আর যদি মাকামে ইব্রাহীমের কাছে সালাত পড়তে না পারেন, তবে হারাম শরীফের যে কোনো স্থানে এই সালাত পড়া যেতে পারে।


[1] ইবনুল মুনযির: আল-ইজমা‘ পৃ. ১৮

[2] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১১৮৩।

[3] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৪৬১; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৩৪৬।

[4] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৪৭৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১১৮৪।