মূল:নারীর হজ ও উমরাহ

ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

সম্পাদনা: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

ইহরামের আগে ও পরে সর্বাবস্থায় বর্জনীয় বিষয়সমূহ:

কিছু কিছু জিনিস এমন আছে যেগুলো ইহরাম অবস্থা ছাড়াও হারাম। তারপর যদি সেগুলো ইহরাম অবস্থায় করা হয় তখন সেটা গুরুতর অপরাধ বলে বিবেচিত হয়। সুতরাং হজের ইহরাম বাধা বা সংকল্প করার সাথে সাথে প্রত্যেকে হাজী সাহেবার উচিৎ এগুলো থেকে নিজেকে হেফাজত করা। যেমন, গিবত, চোগলখোরী, পরনিন্দা, পর-চর্চা, মিথ্যা কথা, মিথ্যা সাক্ষী, হারাম গান-বাজনা শোনা, হারাম বস্ত্তর দিকে তাকানো, গালি-গালাজ অন্যায় আচরণ ও ঝগড়া ইত্যাদি থেকে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে দূরে রাখতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন,

﴿ٱلۡحَجُّ أَشۡهُرٞ مَّعۡلُومَٰتٞۚ فَمَن فَرَضَ فِيهِنَّ ٱلۡحَجَّ فَلَا رَفَثَ وَلَا فُسُوقَ وَلَا جِدَالَ فِي ٱلۡحَجِّۗ وَمَا تَفۡعَلُواْ مِنۡ خَيۡرٖ يَعۡلَمۡهُ ٱللَّهُۗ وَتَزَوَّدُواْ فَإِنَّ خَيۡرَ ٱلزَّادِ ٱلتَّقۡوَىٰۖ وَٱتَّقُونِ يَٰٓأُوْلِي ٱلۡأَلۡبَٰبِ ١٩٧﴾ [البقرة: ١٩٧]

“হজ হয় সুবিদিত মাসগুলোতে। তারপর যে কেউ এ মাসগুলোতে হজ করা স্থির করে তার জন্য হজের সময় স্ত্রী-সম্ভোগ, অন্যায় আচরণ ও কলহ-বিবাদ করা যাবে না। তোমরা উত্তম কাজের যা কিছু কর আল্লাহ তা জানেন আর তোমরা পাথেয় সংগ্রহ কর, অবশ্য তাকওয়াই শ্রেষ্ঠ পাথেয়। হে বোধসম্পন্ন ব্যক্তিগণ! তোমরা আমাকে ভয় কর।” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৯৭]

এ জন্য মহিলা হাজী সাহেবাদের উচিৎ যে সমস্ত কথাবার্তায় কোনো উপকার নেই সে সমস্ত কথা ত্যাগ করে চলা। এতে করে তিনি অনেক পাপাচার থেকে নিজেকে হিফায়ত করতে পারবেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

من كان يؤمن بالله واليوم الآخر فليقل خيراً أو ليصمت

“তোমাদের মধ্যে যে কেউ আল্লাহ ও আখিরাত দিনের ওপর ঈমান রাখে সে যেন কল্যাণের কথা বলে অথবা চুপ থাকে”।[1]

সুতরাং আপনার উচিৎ কাজ হবে অবসর সময়টুকু তালবিয়া, আল্লাহর যিকির, কুরআন তিলাওয়াত, সৎ কাজের আদেশ অসৎ কাজ থেকে নিষেধ অথবা কোনো মূর্খকে কিছু শেখানোর মাধ্যমে কাটানো। যে সমস্ত কথা-বার্তায় গুনাহ নেই তা বলা জায়েয হলেও কম বলা উচিৎ।

ইহরাম অবস্থায় নিষিদ্ধ কাজসমূহ:

মাথার চুল কামানো বা উঠানো অথবা যে কোনোভাবে তা দূর করা যাবে না। মহান আল্লাহ বলেন,

﴿وَلَا تَحۡلِقُواْ رُءُوسَكُمۡ حَتَّىٰ يَبۡلُغَ ٱلۡهَدۡيُ مَحِلَّهُ﴾ [البقرة: ١٩٦]

“আর যতক্ষণ পর্যন্ত হাদী তার স্থানে না পৌঁছাবে ততক্ষণ পর্যন্ত তোমরা তোমাদের মাথা মুণ্ডন করো না”। [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৯৬]

অধিকাংশ আলিমের মতে, শরীরের অন্যান্য অংশের চুলের বিধানও একই প্রকার। সুতরাং ইহরাম অবস্থায় শরীরের কোনো অংশের চুলই কাটতে বা ছাঁটতে পারবে না।

নখ কাটা:

আলিমগণ এ ব্যাপারে একমত হয়েছেন যে, ইহরাম অবস্থায় চুল কাটা যেমন হারাম তেমনি নখ কাটাও হারাম। তবে যদি কোনো কারণে নখ ভেঙে যায় তবে সেটা ফেলে দেওয়ায় কোনো দোষ নেই।[1]

গায়ে বা কাপড়ে সুগন্ধি লাগানো:

ইহরাম অবস্থায় গায়ে বা কাপড়ে সুগন্ধি লাগানো যাবে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«لا تلبسوا من الثياب شيئا مسه الزعفران. ولا الورس»

“তোমরা এমন কাপড় পরিধান করো না যাতে জাফরান বা ওয়ারস সুগন্ধি লেগেছে।”[2]

অনুরূপভাবে এক সাহাবি হজের সময় তার বাহন থেকে পড়ে মারা যায় তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে কাফন দেওয়ার নিয়ম বলে দেওয়ার সময় বলেছিলেন:

«ولا تقربوه طيبا»

“তোমরা একে আতর বা সুগন্ধি লাগিও না”।[3] তাই সুগন্ধিযুক্ত বস্তু পরিত্যাগ করতে হবে। যেমন, সুগন্ধিযুক্ত সাবান, সুগন্ধিযুক্ত পানীয় ও খাবার ইত্যাদিও পরিত্যাজ্য।

নেকাব ও হাত মোজা পরিধান করা পরিত্যাগ করতে হবে। কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«لا تتنقب المرأة الحرم (أي المحرمة ) ولا تلبس القفازين»

“ইহরাম অবস্থায় কোনো মহিলা নেকাব পরবে না, অনুরূপভাবে হাত মোজাও লাগাবে না”।[4]

বিয়ে-শাদি করা বা করানো কোনটাই করা যাবে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«لا ينكح المحرم ولا ينكح ولا يخطب »

“ইহরাম অবস্থায় কেউ বিয়ে করবে না, বিয়ে দেবে না, বিয়ের প্রস্তাবও করবে না”।[5] যদি কেউ এ ধরনের কাজ করে তবে তা ফাসেদ/বাতিল বলে পরিগণিত হবে।

 সহবাস বা এর সাথে সংশ্লিষ্ট প্রাথমিক কর্মকাণ্ড যেমন প্রবল আকাংখা জনিত স্পর্শ, চুমু ইত্যাদি থেকেও দূরে থাকতে হবে। যদি কেউ প্রাথমিক হালাল হওয়ার (পাথর মারার) পূর্বে সহবাস করে তবে স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই হজ বাতিল হয়ে যাবে।

স্থল ভূমির শিকার করা বা শিকারে সহায়তা করাও নিষিদ্ধ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَا تَقۡتُلُواْ ٱلصَّيۡدَ وَأَنتُمۡ حُرُمٞۚ﴾ [المائ‍دة: ٩٥]

“হে ঈমানদারগণ! তোমরা ইহরাম অবস্থায় শিকার করো না”। [সূরা আল-মায়েদাহ, আয়াত: ৯৫] পুরুষ ও মহিলা উভয়ই এ ধরনের শিকার থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখতে হবে। তবে যে সমস্ত প্রাণী কষ্টদায়ক সেগুলো মারতে কোনো দোষ নেই। ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন,

«أمر الرسول صلى الله عليه وسلم بقتل خمس فواسق في الحل والحرم: الحدأة والغراب والفأرة والعقرب والكلب العقور»

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাঁচ ধরনের প্রাণীকে হালাল এলাকা এবং হারাম এলাকা উভয় স্থানেই হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছেন, তা হলো: চিল, কাক, ইঁদুর, সাপ-বিচ্ছু এবং হিংস্র কুকুর”।[6]


[1] ইবন মুনযির কৃত আল-ইজমা‘

[2] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৩৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১১৭৭।

[3] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৭৪২; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১২০৬।

[4] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৭৪১।

[5] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৪০৯।

[6] মুসনাদে আহমাদ ২/৬৫


[1] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫৬৭২; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৪৭।