মূল: ড. মাজহার কাজি । অনুবাদ: মাওলানা ফয়জুলাহ− মুজহিরী। সম্পাদনা: এম মুসলেহ উদ্দিন

মানব ভ্রুণবিদ্যা একটি চমৎকার আধুনিক বিজ্ঞান। ১৯৪০ খৃস্টাব্দে ইলেক্ট্রন মাইক্রোস্কোপ আবিষ্কারের পর এটি প্রাণ-বিজ্ঞানের একটি স্বতন্ত্র ক্ষেত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এই আবিষ্কারের পূর্বে মানব ভ্রুণ বিকাশের বিভিন্ন ধাপ সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা সম্ভব ছিল না। ভ্রুণের আকৃতির ক্ষুদ্রতাই ছিল তার কারণ। কুরআন মাজিদ-যা মাইক্রোস্কোপ আবিষ্কারের ১,০০০ বছরেরও অধিককাল পূর্বে এবং ইলেক্ট্রন মাইক্রোস্কোপ আবিষ্কারের ১৪০০ বছরেরও অধিককাল পূর্বে অবতীর্ণ হয়েছে- তাতে মানব ভ্রুণ বিকাশের বিভিন্ন ধাপ সম্পর্কে প্রথম সচরাচর বর্ণনা পাওয়া যায়। এটি গর্ভধারণ থেকে নিয়ে মানব ভ্রুণের বিকাশের বিভিন্ন স্তর, পূর্ণ গর্ভধারণ, এমনকি সন্তান জন্মদান পর্যন্ত প্রতিটি বিষয়ের সর্বাপেক্ষা যথাযথ ও সঠিক বর্ণনা প্রদান করে। অধিকন্তু কুরআন মাজিদ ভ্রুণ বিকাশের বিভিন্ন স্তরকে বর্ণনার জন্য সুনির্দিষ্ট পরিভাষা ব্যবহার করেছে।
ভ্রুণবিদ্যার আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে, এই ক্রমবিকাশ প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে কুরআনি পরিভাষাই সর্বাপেক্ষা যথার্থ  ও সার্বজনীন বর্ণনা এবং তা ভ্রুণ বিকাশের প্রতিটি ধাপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিকাশধর্মী উপাত্তসমূহেরও বর্ণনা প্রদান করে। যেমনটি ইতোপূর্বে বর্ণিত হয়েছে, কানাডার টরেন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক প্রসিদ্ধ ভ্রুণবিজ্ঞানী কিথ মুর মানব ভ্রুণবিজ্ঞানের ওপর রচিত তার বইয়ের দ্বিতীয় সংস্করণে বইয়ের পরিভাষাগুলিকে কুরআন মাজিদে ব্যবহৃত পরিভাষাগুলির অনুসরণে পরিবর্তন করে নেন। তিনি এই সুমহান গ্রন্থের ব্যবহৃত পরিভাষা ও ক্রমবিকাশের স্তরগুলোর ক্রমধারার ওপর ভিত্তি করে একটি নতুন বর্ণনা পদ্ধতির প্রস্তাব করেন।
আরও উল্লেখ্য যে, কুরআন মাজিদ কেবল ভ্রুণ বিকাশের ধারা ও সঠিক ক্রমেরই বর্ণনা দেয় না, বরং তা ভ্রুণ বিকাশের বিভিন্ন স্তরের আপেক্ষিক সময়ও নির্দেশ করে। কুরআন মাজিদ এ ক্ষেত্রে দু’টি বিশেষ অব্যয় ব্যবহার করে ‘ফা’- যা আশু পরিবর্তন নির্দেশ করে এবং ‘ছুম্মা’- যা বিলম্বিত পরিবর্তন নির্দেশ করে। এভাবে কুরআন মাজিদ এই বিষয় নির্দেশ করে যে, ভ্রুণবিকাশের ক্ষেত্রে দু’ধরনের পরিবর্তন সাধিত হয়। এসব পরিবর্তনের কিছু তাৎক্ষণিক এবং অন্যগুলি হয় সময় সাপেক্ষে। এটি এমন একটি বিষয় যা আধুনিক ভ্রুণবিজ্ঞানীগণ ইলেক্ট্রন মাইক্রোস্কোপ ব্যবহার করে অল্প কয়েক বছর পূর্বে প্রতিষ্ঠিত করেছে। নিঃসন্দেহে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পক্ষে মানব ভ্রুণ বিকাশের পরিবর্তনের সামান্যতম জ্ঞান অর্জনেরও কোনো উপায় ছিল না। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বর্তমানেই বা কয়জনের এই জ্ঞান আছে? একথা পরিষ্কার যে, সুস্পষ্ট মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে এই জ্ঞান এসেছে সর্বজ্ঞ জ্ঞানময় আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে।

মুজিজা : ৬৫
মানুষের উৎস

সে (মানুষ) কি মায়ের গর্ভে বীর্যের শুক্রবিন্দু ছিল না, যা স্খলিত হয়? (কিয়ামাহ, ৭৫ : ৩৭)

বহু বছর পর্যন্ত বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস ছিল, রজঃস্রাবের রক্তই হল মানব জীবনের উৎস। এমনকি মাইক্রোস্কোপ আবিষ্কারের পরও অনেক বিজ্ঞানীর মধ্যে এই ধারণা প্রবল ছিল। তাদের বিশ্বাস ছিল, রজঃস্রাবের রক্তে পূর্ণ গঠিত ভ্রুণ বিদ্যমান রয়েছে এবং একটি শিশুর জন্মের ক্ষেত্রে পুরুষের বীর্যের এছাড়া কোনো ভূমিকা নেই যে, তা রজঃস্রাবের রক্তকে গাঢ় হতে সহযোগিতা করে। কুরআন মাজিদ এই আয়াতে পূর্বের বিজ্ঞানীদের বিশ্বাসের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে। পাশাপাশি তা মানুষের উৎস সম্পর্কে এই মর্মে যথাযথ ও সঠিক তথ্য প্রদান করে যে, মানুষের সৃষ্টি হয় শুক্র বিন্দু থেকে।

মুজিজা : ৬৬
গর্ভধারণের ক্ষেত্রে পুরুষ ও মহিলার ভূমিকা

হে মানুষ, আমি (আল্লাহ) তোমাদেরকে এক নারী ও এক পুরুষ থেকে সৃষ্টি করেছি। (হুজুরাত, ৪৯ : ১৩)

আর তিনি (আল্লাহ) আর তিনিই যুগল সৃষ্টি করেন- পুরুষ ও নারী। (মিশ্রিত) শুক্রবিন্দু থেকে যখন তা নিক্ষিপ্ত হয়। (নাজম, ৫৩ : ৪৫-৪৬)

পূর্বেকার একদল বিজ্ঞানীর বিশ্বাস ছিল, পুরুষের নিঃসৃত বীর্য কিংবা স্ত্রীদের রজঃস্রাব একটি নবজাত শিশুর ভ্রুণ গঠনের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে না। তাদের ধারণা ছিল, পুরুষের বীর্যে একটি পূর্ণ আকত্রিরৃ মানুষের অস্তিত্ব বিদ্যমান রয়েছে এবং মানুষের বিকাশ তার একটি সাধারণ মৌলিক আকৃতি বড় হওয়া থেকে অধিক নয়, যা গর্ভধারণের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রাক্কালে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়। অন্যরা- যেমনটি পূর্বে উল্লিখিত হয়েছে- বিশ্বাস করতেন, একটি নবজাত শিশুর গঠনে কেবল মহিলারই ভূমিকা রয়েছে এবং পুরুষের বীর্য তার বিকাশের ক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা পালন করে না। বিজ্ঞানী লিউয়েন হুক ১৭৭৩ সালে সাধারণ অনুবীক্ষণ যন্ত্র আবিষ্কার করেন। ১৭৭৫ সালে বিজ্ঞানী স্প্যালাঞ্জানি (Spallanzani) প্রমাণ করেন, পুরুষের শুক্রাণু এবং মহিলার ডিম্বানু উভয়টিই একটি নবজাত শিশুর গঠনে সমান ভূমিকা রাখে। বিস্ময়ের ব্যাপার হল, কুরআন মাজিদ এই তথ্যটি উল্লেখ করেছে বহু শতাব্দী পূর্বে।

মুজিজা : ৬৭
মানব ভ্রুণের পর্যায়সমূহ

তোমাদের কী হল, তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বের পরোয়া করছ না? অথচ তিনি তোমাদেরকে নানা স্তরে সৃষ্টি করেছেন। (নুহ, ৭১ : ১৩-১৪)

তিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন তোমাদের মাতগর্ভে;ৃ এক সৃষ্টির (পর্যায়ের) পর আরেক সৃষ্টি (পর্যায়)। (যুমার, ৩৯ : ০৬)

একদা জানা ছিল, একজন মানুষ বিকশিত হয় পুরুষের শুক্রাণু ও নারীর ডিম্বাণু নিষিক্ত হওয়ার মাধ্যমে। কিন্তু প্রশ্ন দেখা দিল, একটি সাধারণ জাইগোট কোষ বহুকোষে, সেখান থেকে বহু অঙ্গে এবং তা থেকে বহুতন্ত্র সম্বলিত একজন পরিপূর্ণ মানুষে রূপান্তরিত হওয়া প্রসঙ্গে। যদিও পূর্বেকার বিজ্ঞানীদের মধ্যে নবজাত শিশুর আদি উৎস সম্পর্কে মতের ভিন্নতা রয়েছে, তাদের এই সাধারণ বিশ্বাস ছিল যে, পুরুষের শুক্রাণু কিংবা মহিলার ডিম্বাণুতে একটি পূর্ণ আকৃতির মানুষ বিদ্যমান রয়েছে। অধিকন্তু তারা এই ধারণাও পোষণ করত যে, একটি মানব ভ্রুণের বৃদ্ধি কেবল তার মূল আকৃতির পরিমাণ বাড়ার এক অভিন্ন প্রক্রিয়া। অনেক বিজ্ঞানীর মধ্যে এই ধারণা প্রবল ছিল। পক্ষান্তরে, কুরআন মাজিদ সুস্পষ্টভাবে এই ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে এবং বলে, মানবভ্রুণ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয় কিছু পরম্পরাগত পর্যায়ে, যা বর্তমানে ভ্রুণতত্ত্ববিদদের মাধ্যমে একটি পরিপূর্ণ প্রতিষ্ঠিত সত্যের মর্যাদা লাভ করেছে। উল্লেখ্য যে, ভ্রুণ বিকাশের এই পর্যায়ক্রমিক স্তরসমূহের ধারণা সর্বপ্রথম প্রদান করেন ডড়ষভ (উলফ) ১৭৫৯ সালে। যা হোক ১৯৪০ সাল পর্যন্ত মানব ভ্রুণ বিকাশের সুনির্দিষ্ট স্তরসমূহ নির্ধারিত হয় নি। কেবল সাম্প্রতিক সময়েই ভ্রুণবিজ্ঞানীগণ ভ্রুণ বিকাশের বিভিন্ন স্ত র ও ধাপ নির্ণয় করেছেন। এটি কুরআন মাজিদের একটি সুস্পষ্ট মুজিজা যে, ভ্রুণবিজ্ঞানীগণ ধারণা করারও বহুশত বছর পূর্ব থেকে কুরআন মাজিদে এই তথ্য বিদ্যমান রয়েছে।

মুজিজা : ৬৮
তিনটি আবরণ দ্বারা ভ্রুণের আচ্ছাদন

তিনি (আল্লাহ) তোমাদেরকে সৃষ্টি করেন তোমাদের মাতগর্ভে;ৃ বিভিন্ন স্তরে একেরপর এক, তিন অন্ধকারের (আবরণের) মধ্যে। তিনিই আলাহ,− তোমাদের রব ও পালনকর্তা। (যুমার ৩৯ : ০৬)

পূর্বেকার ভাষ্যকারগণ ‘অন্ধকারের তিন আচ্ছাদন’-এর ব্যাখ্যা করেছেন- উদরের বেষ্টনী, জরায়ুর দেয়াল ও ভ্রুণের চারপাশে বেষ্টিত ঝিলি।− ভ্রুণবিজ্ঞানের সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, এই তিনটি স্তরের প্রত্যেকটি পরবর্তীতে তিনটি পৃথক পৃথক স্তর গঠন করে। উদরের আচ্ছাদন তিনটি স্তর দ্বারা গঠিত : বহিঃস্থ তির্যক মাংসপেশীর আস্তরণ, আভ্যন্তরীণ তির্যক মাংসপেশীর আস্তরণ ও আড়াআড়ি মাংসপেশীসমূহ। অনুরূপভাবে জরায়ুর দেয়াল তিনটি স্তর দ্বারা গঠিত : Epimetrium, Myometrium ও Endometrium. Myometrium পরবর্তীতে তিনস্তরের মাংসপেশী দ্বারা গঠিত হয় : Longitudinal স্তর, আটটি মাংসপেশী সমেত তারপরবর্তী একটি Interwoven স্তর, অতঃপর একটি বৃত্তাকার মাংসপেশীর স্তর। অধিকন্তু যে কোষ ভ্রুণকে বেষ্টন করে থাকে তাও তিন স্তরে গঠিত। যথা : Amnion, Chorion ও Decidion। ভ্রুণবিজ্ঞানের কোনো কোনো বইতে বলা হয়েছে, ভ্রুণ চারটি ঝিলি− দ্বারা পরিবেষ্টিত। তারা Yolk  cell ঝিলিকে− ভ্রুণের চতুর্থ স্তর বলে গণ্য করেন। যা হোক, Yolk cell ঝিলির− পুষ্টিসংক্রান্ত কোনো কাজ নেই এবং অবশেষে তা বিলুপ্ত হয়ে যায়। ভ্রুণের চারপাশে অবশেষে তিনটি ঝিলীই− অবশিষ্ট থাকে। সৃষ্টিকর্তা ও সৃষ্টিজীবের রিজিকদাতা আল্লাহ তাআলা ব্যতীত আর কার কাছে মানবভ্রুণ বেষ্টিত আস্তরণের মত এমন জটিল ও সূক্ষ্ম বিষয়ের জ্ঞান থাকতে পারে?

মুজিজা : ৬৯
ভ্রুণ বিকাশের তিনটি প্রধান পর্যায়

আর অবশ্যই আমি (আল্লাহ) মানুষকে মাটির নির্যাস থেকে সৃষ্টি করেছি। অতঃপর (ছুম্মা) আমি তাকে শুক্ররূপে (নুতফা) সংরক্ষিত আধারে স্থাপন করেছি। তারপর (ছুম্মা) আমি ‘নুতফা’ কে ‘আলাকা’য় (রক্তপিণ্ড) পরিণত করি (খালাকনা)। অতঃপর (ফা) আমি আলাকাকে ‘মুদগা’য় (গোশতপিণ্ডে) পরিণত করি। অতঃপর (ফা) মুদগাকে ‘ইযামে’ (হাড়ে) পরিণত করি। অতঃপর (ফা) ‘ইযাম’ কে ‘লাহম’ (মাংসপেশী) দ্বারা আবৃত করি। তারপর (ছুম্মা) আমি ‘আনশা’নাহু’ (তাকে গড়ে তুলি) অন্য এক সৃষ্টিরূপে। অতএব সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ কত বরকতময়! (মুনিনুন, ২৩ : ১২-১৪)

উল্লেখ্য যে, এই আয়াতে কুরআন মাজিদ দু’টি ভিন্ন সংযোজক অব্যয় তথা ‘ফা’ ও ‘ছুম্মা’ ব্যবহার করেছে। অধিকাংশ অনুবাদের ক্ষেত্রে উভয়টির একই অর্থ  করা হয়েছে। অথচ পূর্বে যেমনটি উল্লেখিত হয়েছে ‘ফা’ অব্যয়টি অব্যবহিত পরে অর্থ  বুঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয়। পক্ষান্তরে ‘ছুম্মা’ অব্যয়টি ব্যবহৃত হয় বিলম্বিত পরম্পরা বুঝানোর জন্য। কুরআন মাজিদ উপরোক্ত আয়াতে ‘ছুম্মা’ অব্যয়টি কেবল তিনবার ব্যবহার করেছে। যা নির্দেশ করে, ভ্রূণের বিকাশের ক্ষেত্রে তিনটি স্বতন্ত্র পর্যায় রয়েছে। ভ্রুণবিজ্ঞানীগণ ইলেক্ট্রন মাইক্রোস্কোপ ব্যবহার করে এই বিষয়টি আবিষ্কার করেছেন কেবল কয়েক বছর পূর্বে। আল্লাহ তাআলা ব্যতীত আর কে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর বহু শতাব্দী পূর্বে এমন সূক্ষ্ম ও সুনির্দিষ্ট তথ্য অবতীর্ণ করতে পারেন?
কুরআন মাজিদ ভ্রুণ বিকাশের স্তরগুলিকে নির্দেশ করার জন্য তিনটি সুনির্দিষ্ট শব্দ ব্যবহার করেছে। সেগুলি নিম্নে তুলে ধরা হল :
১.‘নুতফা’ : এটি বিকাশের প্রথম ধাপকে নির্দেশ করে এবং এই ধাপটি পুরুষ ও নারীর বীর্য মিলন থেকে মায়ের জরায়ুতে জাইগোট সৃষ্টি হওয়া পর্যন্ত পুরো বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করে। এ ধাপে আন্তকোষীয় জাইগোট বিভাজিত হওয়া শুরু করে এবং একটি অধিকতর জটিল রূপ ধারণ করে।
২.‘খালাক্বনা বা তাখলিক : এটি ভ্রূণ বিকাশের দ্বিতীয় ধাপ। এটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সৃষ্টির ¯র।— যা শুরু হয় তৃতীয় সপ্তাহ থেকে এবং শেষ হয় গর্ভধারণের অষ্টম সপ্তাহে। এই ধাপে কোষ বিভাজন আরো ত্বরান্বিত হয় এবং মানব অঙ্গসমূহ ও বিভিন্ন তন্ত্রের পার্থক্য পরিষ্কার হয়।
.‘আনশা’না বা নাশআ : এটি ভ্রূণবিকাশের তৃতীয় ও সর্বশেষ স্তর। এই ধাপে দ্রুত কোষ বিভাজন, পৃথকীকরণ ও বৃদ্ধি সাধন একটি সুনির্দিষ্ট মানব আকৃতি গঠন করে, যাকে বলা হয় ভ্রূণ। ধাপটি শুরু হয় গর্ভধারণের নবম সপ্তাহ থেকে এবং শিশু ভূমিষ্ট হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।

এসব ধাপের প্রত্যেকটি অঙ্গসংস্থান ও শরীরতাত্ত্বিক বিভিন্ন পরিবর্তনের একটি জটিল প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে অতিবাহিত হয়। এই পরিবর্তনগুলি হয় দ্রুত, কিন্তু একটি থেকে অপরটি অত্যন্ত সুস্পষ্ট। কুরআন মাজিদ এসব উপধাপকে সুনির্দিষ্ট শব্দে ‘ফা’ সংযোজক অব্যয় সহকারে বর্ণনা দিয়েছে, যা দ্রুত ও তাৎক্ষণিক পরিবর্তন নির্দেশ করে। আগত পৃষ্ঠাগুলি এ কথা পরিষ্কার করে দিবে যে, ভ্রূণবিকাশের এসব উপধাপ বর্ণনার ক্ষেত্রে কুরআন মাজিদের শব্দসমূহ অধিক ব্যাপক ও যথোপযুক্ত। এভাবে কুরআন মাজিদের প্রতিটি পরিভাষাই একথা ঘোষণা করে যে, মানব ভ্রূণবিদ্যা মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর একটি জীবন্ত মুজিজা এবং স্বয়ং কুরআন মাজিদের জন্যেও তা মুজিজা।

বিকাশের ‘নুতফা’ পর্যায় মানব ভ্রুণবিদ্যা
‘নুতফা’ পর্যায়টি নিুলিখিত ধাপ বা উপপর্যায়সমূহে বিভক্ত :

মুজিজা : ৭০
কুরআনি পরিভাষা ‘আল মাউদ্ দাফিক্ব’

আভিধানিকভাবে ‘আল মাউদ্ দাফিক্ব’ কথাটির অর্থ, প্রবলবেগে নির্গমনকারী কিংবা স্বেচ্ছা নির্গমনকারী তরল পদার্থ  বা এমন একটি ফোটা যা নির্গত হয়েছে। অন্যকথায়, তা এমন তরল পদার্থ নির্গমনকে নির্দেশ করে যা স্বেচ্ছায় নিষ্ক্রান্ত হয়, যা নিজে নিজে চলৎক্ষম। মাইক্রোস্কোপ ব্যবহারে দেখা গেছে, কেবল শুক্রাণুই নয় বরং ডিম্বাণুও চলৎক্ষমতা প্রদর্শন

করে। পরিপক্ক শুক্রাণু একটি স্বাধীনভাবে সন্তরণকারী কার্যকরী অঙ্কুর কোষ, যাতে একটি মাথা ও একটি লেজ রয়েছে। লেজ শুক্রাণুতে গতি সঞ্চার করে এবং এটিকে ডিম্বাণুর দিকে গমনে সাহায্য করে।
Fimbrac আঙ্গুল সদৃশ প্রক্ষেপণ যা Infundibulum-এর অংশ, ডিম্বনালীর ফানেল আকৃতির প্রান্ত। সিলিয়া তথা  Fimbrac-এর ওপর সূক্ষ্ম অণুবীক্ষণিক চাবুক একই সময়ে ডিম্বকোষকে Infundibulum-এর দিকে চলনে সহযোগিতা করে। শুক্রাণু ও ডিম্বাণু উভয়ের প্রদর্শিত নড়াচড়া ব্যতিরেকে নিষিক্তকরণ সংগঠিত হওয়া সম্ভব নয়। কুরআন মাজিদের শব্দ ‘আল মাউদ্ দাফিক্ব’ এভাবে দ্রুতবেগে নির্গমন, স্বেচ্ছানির্গমন, এবং এই উপধাপের চলাচল সংক্রান্ত ঘটনাবলিকে অন্তর্ভুক্ত করে।

মুজিজা : ৭১
কুরআন মাজিদের শব্দ ‘সুলালা’

তারপর তিনি (আল্লাহ) তার (মানুষের) বংশধর সৃষ্টি করেছেন ‘সুলালা’ (তুচ্ছ পানির নির্যাস) থেকে। (সাজদাহ, ৩২ : ০৮)

আর আমি অবশ্যই মানুষকে ‘সুলালা’ (মাটির নির্যাস) থেকে সৃষ্টি করেছি। তারপর আমি (আল্লাহ) নুতফারূপে সংরক্ষিত আধারে স্থাপন করেছি। (মুমিনুন, ২৩ : ১২-১৩)

আরবি শব্দ ‘সুলালা’র তিনটি ভিন্ন ভিন্ন অর্থ রয়েছে। এর অর্থ একটি তরলের সাধারণ নির্যাস, স্বল্প পরিমাণ তরল ও একটি মৎস্য সদৃশ কাঠামো। উল্লেখ্য যে, মানুষের শুক্রাণু একটি লম্বা আকৃতির মাছের সঙ্গে সাদৃশ্য রাখে। অধিকন্তু প্রত্যেক বীর্যপাতের সময় ৩০০ থেকে ৪০০ মিলিয়ন শুক্রাণু নির্গত হয়। যা থেকে কেবল ২০০টি শুক্রাণু ৫ মিনিটের মধ্যে নিষিক্তকরণ অঞ্চলে পৌঁছে যায়। সেসব থেকে কেবল একটি শুক্রাণুকেই ডিম্বাণুর সঙ্গে নিষিক্তকরণের জন্য নিংড়ে নেওয়া হয়। অধিকন্তু শুক্রাণুগুলো সামান্য পরিমাণ তরলের রূপ ধারণ করে, যা ৩.৫ থেকে ৫.০ মিলিমিটারের বেশি নয়। অতএব কারণে কুরআনের ‘সুলালা’ শব্দটি কেবল যথার্থ  বর্ণনাই প্রদান করে না, বরং এই উপধাপের অঙ্গসংস্থান এবং শরীরতাত্ত্বিক গঠনকেও নির্দেশ করে। আরও উল্লেখ্য যে, কুরআন মাজিদ এই ধাপে কেবল পুরুষের বীর্য সম্পর্কে নির্দেশ করে। আর তাও ভ্রূণবিদ্যার সাম্প্রতিক জ্ঞানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।

মুজিজা : ৭২
কুরআন মাজিদের পারিভাষিক শব্দ ‘নুতফা’

মানুষ ধ্বংস হোক, সে কতই না অকৃতজ্ঞ তিনি (আল্লাহ) তাকে কোন বস্তু থেকে সৃষ্টি করেছেন? ‘নুতফা’ (শুক্রবিন্দু) থেকে তিনি (আল্লাহ) তাকে সৃষ্টি করেছেন। (আবাসা, ৮০ : ১৭-১৯)

এই আয়াতগুলো আমাদেরকে মানুষের প্রাথমিক উপাদান সম্পর্কে তথ্যের যোগান দেয় যে, ‘নুতফা’ই হল একটি নবজাত শিশু সৃষ্টির মূল উপাদান। আরবি শব্দ ‘নুতফা’-এর অর্থ হল, একটি ফোঁটা কিংবা অল্প পরিমাণ তরল। বর্তমানে এই বিষয়টি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত যে, ‘নুতফা’ হল পুরুষের শুক্রাণু ও মহিলার ডিম্বাণুর সমন্বয়ে গঠিত স্বল্প পরিমাণ তরল এবং এই তরলটিই নবগঠিত মানবদেহের মূল উপাদান।

মুজিজা : ৭৩
কুরআন মাজিদের পরিভাষা ‘নুতফাতুন আমশায’

আমি (আল্লাহ) মানুষকে সৃষ্টি করেছি ‘নুতফাতুন আমশায’ (মিশ্র শুক্রবিন্দু) থেকে, আমি তাকে পরীক্ষা করব। (ইনসান, ৭৬ : ০২)

ইতোপূর্বে উল্লিখিত হয়েছে যে, ‘নুতফা’ হল একটি ফোঁটা। পক্ষান্তরে ‘আমশায’ শব্দের অর্থ  হল, একটি মিশ্রণ। অতএব এই শব্দটি পুরুষ ও মহিলার বীর্যপাতের উপাদানগত মিশ্রণকে নির্দেশ করে। ভ্রূণবিজ্ঞানের সাম্প্রতিক জ্ঞান অনুসারে সাধারণত এই মিশ্রণ সংগঠিত হয় ডিম্বনালীর উপরের এক তৃতীয় অংশে এবং খুব কমই জরায়ুর অভ্যন্তরে। তা পরে জাইগোট সৃষ্টি করে। উল্লেখ্য, ‘নুতফা’ শব্দটি একটি একবচন বিশেষ্য। পক্ষান্তরে ‘আমশায’ হল বিশেষণ, যা বহুবচনের শব্দ নির্দেশ করে। এভাবে ‘নুতফাতুন আমশায’ শব্দদ্বয় দু’টি তরল উপাদানের মিশ্রণ এবং ভ্রূণবিকাশের এই উপপর্যায়ে একটি জাইগোটের গঠনকে যথাযথভাবে বর্ণনা করে।

মুজিজা : ৭৪
কুরআন মাজিদের পরিভাষা ‘কারারিম মাকিন’

তারপর আমি তাকে ‘নুতফা’ রূপে ‘কারারিম মাকিন’ (সুরক্ষিত আধার)-এ স্থাপন করেছি। (মুমিনুন, ২৩ : ১৩)

আরবি শব্দ ‘ক্বারার’-এর অর্থ  অবস্থান। আর ‘মাকিন’ শব্দের অর্থ সুদৃঢ়ভাবে স্থাপিত। ভ্রূণবিজ্ঞানের সাম্প্রতিক জ্ঞানের ভিত্তিতে, ‘কারার’ শব্দটি জরায়ুর সঙ্গে একটি বিকাশমান ভ্রূণের সম্পর্ককে নির্দেশ করে এবং ‘মাকিন’ শব্দটি মায়ের শরীরের সঙ্গে জরায়ুর সম্পর্ক নির্দেশ করে। নিষিক্ত হওয়ার সাত থেকে নয় দিন পর Blastocyst জরায়ুর দিকে সরে আসে এবং তার দেয়ালের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে সংযুক্ত হয়ে যায়। এটিই সেই স্থান যেখানে অধিকতর কোষ বিভাজন এবং পৃথকীকরণের প্রক্রিয়া সংগঠিত হয়। এটি খুবই জরুরি যে, Blastocyst জরায়ুর একটি নির্দিষ্ট স্থানে পূর্ণরূপে স্থাপিত হবে এবং সেই স্থানও ভালভাবে সংরক্ষিত হবে। নতুবা তা স্খলিত হয়ে নষ্ট হয়ে যেতে পারে, যেমনটি হয়ে থাকে উদরস্থিত কিংবা Blastocyst গর্ভধারণের ক্ষেত্রে। এতদুভয় ধারণাই কুরআন মাজিদের শব্দ ‘কারারিম মাকিন’-এর মধ্যে সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে।

মুজিজা : ৭৫
কুরআন মাজিদের পরিভাষা ‘কাদ্দারাহু’

মানুষ ধ্বংস হোক, সে কতই না অকৃতজ্ঞ তিনি (আল্লাহ) তাকে কোন বস্তু থেকে সৃষ্টি করেছেন? ‘নুতফা’ থেকে তিনি তাকে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর (‘ফা’) তিনি ‘কাদ্দারাহু’ (তাকে সুগঠিত করেছেন)। (আবাসা, ৮০ : ১৭-১৯)

একটি নতুন মানব দেহ সৃষ্টির সূচনা হয় একটি জাইগোট গঠনের মাধ্যমে। এটি ২৩ জোড়া ক্রোমোজোম ও প্রায় ৮মিলিয়ন ভিন্ন ভিন্ন জিন দ্বারা গঠিত। প্রত্যেক ক্রোমোজমেরই নির্দিষ্ট সেটের জিন রয়েছে, যা নবজাতকের সুপ্ত বৈশিষ্ট্যসমূহ বহন করে। পুরুষ ও মহিলার জিন বিনিময় যা, পারস্পরিক alleles pair  নামে পরিচিত। প্রতিটি জিনেরই একটি পরিমাণগত কিংবা গুণগত বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যখন জিনের পারস্পরিক জোড়া বিনিময় হয় তখন নবজাতকের বৈশিষ্ট্য গঠন হয়। যদি জিনের মধ্যে কোনো গুণগত বৈশিষ্ট্য থাকে, প্রবল বৈশিষ্ট্যটি দুর্বল বৈশিষ্ট্যটিকে পরাস্ত করে এবং কেবল প্রবল বৈশিষ্ট্যই নবজাতকের দেহে দেখা যায়। যদি জিনটির কোনো পরিমাণগত বৈশিষ্ট্য থাকে, পুরুষ ও মহিলার জিন পরস্পর মিশ্রিত হয়ে মধ্যবর্তী চরিত্র বৈশিষ্ট্যের সৃষ্টি করে। এভাবে কার্যক্রমের একটি জটিল প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়, যা নবজাতকের মধ্যে সকল প্রকার চরিত্রবৈশিষ্ট্য গঠন ও প্রকাশ ঘটায়। উল্লেখ্য যে, ভ্রূণতত্ত্ববিদরা ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত একটি প্রজনন পরিকল্পনার ধারণার বর্ণনা দিতে পারে নি।
এটি কুরআন মাজিদের একটি মুজিজা যে, তা এই ঘটনা বর্ণনার জন্যে ‘কাদ্দারাহ’ শব্দ ব্যবহার করেছে। ‘কাদ্দারাহ’ শব্দটি মূল শব্দ ‘কাদারা’ থেকে উদ্ভুত। যার অর্থ  পরিকল্পনা প্রণয়ন বা কার্যক্রম বিন্যস্ত করা। কুরআন মাজিদ এভাবে জিনের প্রকাশ ও চরিত্র-বৈশিষ্ট্য গঠনের বিষয় বহুপূর্বে সপ্তম শতাব্দীতে সুদৃঢ়ভাবে বর্ণনা করেছে। পক্ষান্তরে ভ্রূণবিশারদরা তা আবিষ্কার করেছে বিংশ শতাব্দীতে। আরো উল্লেখ্য যে, এই গঠন-প্রক্রিয়া হয় খুব দ্রুত এবং তা ধষষবষরপ জিন বহনকারী বিনিময়কতৃ ক্রোমোজমগুলির পাশাপাশি অবস্থানের সঙ্গে সঙ্গে সংঘটিত হয়। কুরআন মাজিদ ‘ফা’ অব্যয় ব্যবহারের মাধ্যমে এই বিষয়টির যথাযথ বর্ণনা প্রদান করেছে, যা অব্যবহিত পরম্পরাগত পরিবর্তন নির্দেশ করে।

মুজিজা : ৭৬
কুরআনি পরিভাষা ‘হারছ’

তোমাদের স্ত্রী তোমাদের ‘হারছ’ (শস্যক্ষেত্র)। সুতরাং তোমরা তোমাদের শস্যক্ষেত্রে গমন কর, যখন এবং যেভাবে চাও। (বাকারা, ০২ : ২২৩)

এই আয়াতগুলি মানব বিকাশের বৈজ্ঞানিক সত্যকে সুন্দরভাবে বর্ণনা করে; কিভাবে একটি জীবনের বীজ একজন পরিপূর্ণ মানুষরূপে বিকশিত হয়। উপরে বর্ণিত উপ-পর্যায়গুলি শেষ হওয়ার পর জাইগোটটি জরায়ু নালী থেকে জরায়ুতে স্থানান্তরিত হয় এবং তা জরায়ুর দেওয়াল স্থাপিত হয়, যেমনটি বীজ মাটির ভেতর বপন করা হয়। এটিই ‘নুতফা’র সর্বশেষ পর্যায়। কুরআন মাজিদ ‘হারছ’ শব্দ দ্বারা এটিকে নির্দেশ করে। আভিধানিক অর্থে ‘হারছ’ শব্দটি মাটি চাষ করা বুঝায়। এখানে তার সঙ্গে সাদৃশ্য হল, জরায়ুর দেওয়াল মাটিসদৃশ। আর জাইগোট সেই বীজের মত যা তাতে বপন করা হয়েছে। অধিকন্তু বীজ যেমনটি মাটি থেকে পুষ্টি আহরণ করে এবং একটি চারাগাছে পরিণত হয়, তেমনিভাবে জাইগোট জরায়ুর ভেতর দিয়ে পুষ্টি আহরণ করে এবং একজন মানুষের আকৃতি লাভ করে।

বিকাশের ‘তাখলিক’ পর্যায় :
এটি মানব ভ্রূণ বিকাশের দ্বিতীয় প্রধান পর্যায়। বিভিন্ন অঙ্গে ও তন্ত্রে কোষের বিভাজন ও পৃথকীকরণ এ পর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত। এটি আরম্ভ হয় তৃতীয় সপ্তাহের প্রথম থেকে এবং অব্যাহত থাকে অষ্টম সপ্তাহের শেষ পর্যন্ত। ইতোপূর্বে উল্লিখিত আয়াতসমূহ (সুরা ২৩ : ১২-১৪) অনুসারে এই পর্যায়টি নিুলিখিত উপপর্যায়সমূহ নিয়ে গঠিত : ‘আলাকা’, ‘মুদগা’, ‘ইযাম’ ও ‘লাহম’। নিুলিখিত বিবরণ থেকে দেখা যাবে, কুরআন মাজিদের এ সকল পরিভাষা সাম্প্রতিক আবিষ্কৃত মানব ভ্রূণবিকাশের সঙ্গে সম্পূর্ণ সঙ্গতিপূর্ণ। প্রতিটি শব্দই অত্যন্ত যথার্থ ও ব্যাপক ভঙ্গিতে ভ্রূণবিজ্ঞানের এক একটি সুনির্দিষ্ট উপধাপকে নির্দেশ করে। আর তা ভ্রূণবিজ্ঞানের সাম্প্রতিক জ্ঞানের সঙ্গে সম্পূর্ণ সঙ্গতিপূর্ণ। এভাবে প্রতিটি শব্দই কুরআন মাজিদের একেকটি মুজিজা তুলে ধরে।

মুজিজা : ৭৭
‘আলাকা’ উপপর্যায়

আর অবশ্যই আমি মানুষকে মাটির নির্যাস থেকে সৃষ্টি করেছি। তারপর (ছুম্মা) আমি তাকে শুক্ররূপে (নুতফা) সংরক্ষিত আধারে (জরায়ুতে) স্থাপন করেছি। পরবর্তীতে (ছুম্মা) নুতফাকে আমি ‘আলাকা’য় (রক্তপিণ্ডে) পরিণত করি। (মুমিনুন, ২৩ : ১২-১৪)

এই পর্ব শুরু হয় ১৫ তম দিনে এবং শেষ হয় ২৩/২৪তম দিনে। আরবি ভাষায় ‘আলাকা’ শব্দের তিনটি অর্থ  রয়েছে। তা এমন এক বস্তুকে নির্দেশ করে, যা কিছুর সঙ্গে সংযুক্ত কিংবা কিছুর সঙ্গে ঝুলানো। তার আরেক অর্থ জোঁক, যা পানিতে বাস করে এবং অন্যান্য প্রাণীর রক্ত চোষে জীবন ধারণ করে। তার অন্য একটি অর্থ, একটি ঘন রক্তপিণ্ড। ভ্রূণতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে কুরআন মাজিদের শব্দ ‘আলাকা’ এই ধাপের ভ্রূণবিকাশের অঙ্গসংস্থান সংক্রান্ত স্তরকে যথাযথভাবে পরিব্যপ্ত করে। কুরআন মাজিদে ‘আলাকা’ শব্দটি নিুলিখিত আরো চারটি স্থানে উল্লিখিত হয়েছে :

হে মানুষ, যদি তোমরা পুনরুত্থানের ব্যাপারে সন্দেহে থাক তবে নিশ্চয় জেনে রেখো, আমি তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছি, তারপর শুক্র থেকে, তারপর ‘আলাকা’ থেকে। (হজ, ২২ : ০৫)

তিনিই (আল্লাহ) তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে তারপর শুক্রবিন্দু থেকে তারপর ‘আলাকা’ থেকে। (গাফির, ৪০ : ৬৭)

মানুষ কি মনে করে যে, তাকে এমনকি ছেড়ে দেয়া হবে? সে কি বীর্যের শুক্রবিন্দু ছিল না, যা স্খলিত হয়? অতঃপর সে আলাকায় পরিণত হয়। তারপর আল্লাহ তাকে সুন্দর আকতিতেৃ সৃষ্টি করেছেন এবং সুবিন্যস্ত করেছেন। (কিয়ামা ৭৫ : ৩৬-৩৮)

পড় তোমার প্রভুর নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন। তিনি সৃষ্টি করেছেন মানুষকে ‘আলাকা’ থেকে। (আলাক, ৯৬ : ০১-০২)

আধুনিক ভ্রূণবিজ্ঞান অনুসারে, ‘নুতফা’ খুব দ্রুত একটি blastocyte- এ পরিণত হয় এবং তা নিজেকে একটি বৃন্তের সহযোগিতায় জরায়ুর বহিঃত্বকে প্রতিস্থাপিত করে, যা পরবর্তীতে umbilical cord-এ রূপান্তরিত হয়। এই প্রতিস্থাপন শুরু হয় ৬ষ্ঠ দিনে এবং দশ দিনের মধ্যে তা সম্পূর্ণ হয়ে যায়। প্রতিস্থাপনের এই প্রক্রিয়া ‘আলাকা’-এর প্রথম অর্থকে নির্দেশ করে, অর্থাৎ কোনো কিছুর সঙ্গে সংযুক্ত কিংবা কোনো কিছুতে ঝুলন্ত । ভ্রূণ তখন তার গোলাকতিৃ হারিয়ে ফেলে। এটি দীর্ঘায়িত হয় এবং জোঁকের আকৃতি ধারণ করে। একই সময়ে তা মায়ের রক্ত থেকে তার পুষ্টি আহরণ করতে শুরু করে। অধিকন্তু তা পরবর্তীতে amniotic fluid দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়, ঠিক যেমনটি জোঁক পানি দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকে। কুরআন মাজিদের শব্দ ‘আলাকা’- বিকাশের এই ধাপকে যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত করে। ‘আলাকা’-এর তৃতীয় অর্থ  তথা রক্তপিণ্ডও ভ্রূণের বাহ্যিক আকৃতির সঙ্গে যথাযথভাবে প্রযোজ্য হয়। অতএব ‘আলাকা’ শব্দটি ভ্রূণবিকাশের দ্বিতীয় প্রধান পর্যায় ‘তাখলিক’-এর প্রথম উপধাপ বর্ণনার ক্ষেত্রে অধিক সার্বজনীন ও যথার্থ  অভিব্যক্তি।

মুজিজা : ৭৮
‘মুদগা’ উপ-পর্যায়

হে মানুষ, যদি তোমরা পুনরুত্থানের ব্যাপারে সন্দেহে থাক তবে নিশ্চয়ই জেনে রাখ, আমি তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছি, তারপর ‘নুতফা’ থেকে, তারপর ‘আলাকা’ থেকে। পরবর্তীতে ‘মুদগা মুখালাকা’− (পূর্ণ আকতিবিশিষ্টৃ গোশত) থেকে এবং ‘গায়রি মুখালাকা’− (অপূর্ণ আকতিবিশিষ্টৃ গোশত) থেকে তোমাদের নিকট বিষয়টি সুস্পষ্টরূপে ব্যক্ত করার নিমিত্তে। (হজ, ২২ : ০৫)

‘আলাকা’ উপপর্যায় শেষ হয় ২৪-২৫ দিনের মধ্যে। অতঃপর ভ্রুণটি ২৬-২৭ তম দিনে মুদগাতে পরিবর্তিত হয়। আভিধানিক দৃষ্টিকোণ থেকে ‘মুদগা’ শব্দের কতিপয় অর্থ  রয়েছে। প্রথম অর্থ, ‘দাঁতে চর্বনকতৃ কোনো বস্তু’। দ্বিতীয় একটি অর্থ, ‘একটি ছোট পদাথ’র্। তৃতীয় অর্থ ‘একটি ছোট গোশতের টুকরা’। ইউসুফ আলী তার তাফসিরে ‘মুদগা’ শব্দের তরজমা করেছেন, গোশতের টুকরা। পক্ষান্তরে, মুহাম্মদ আসাদ, মরিস বুকাইলি প্রমূখ তার একটি উন্নততর অনুবাদ গ্রহণ করেছেন। অর্থাৎ ‘একটি চর্বিত টুকরা’।
ভ্রূণবিজ্ঞানের সাম্প্রতিক গবেষণায় এই স্তরের ভ্রূণের পরিবর্তনকে কুরআন মাজিদের শব্দ ‘মুদগা’র মাধ্যমে বর্ণনা করার যথার্থতা প্রমাণিত হয়েছে।
যেহেতু একটি ভ্রূণ জরায়ু থেকে পুষ্টি গ্রহণ করে, তাই তার বৃদ্ধি ঘটে একটি দ্রুত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। এর কোষগুলো একটি গুটি সদৃশ আকৃতি ধারণ করে এবং মনে হয় তা এমন একটি বস্তু যাতে দাঁতের ছাপ রয়েছে। পরবর্তীতে ভ্রূণটি তার অবস্থান পরিবর্তন করে তার ভরকেন্দ্র পরিবর্তিত হওয়ার কারণে। যা দেখতে চর্বিত টুকরার মত। এ সকল পরিবর্তন ‘মুদগা’র প্রথম অর্থের সঙ্গে পুরোপুরি সঙ্গতিপূর্ণ।
এই ধাপে একটি ভ্রুণ থাকে খুবই ছোট। দৈর্ঘ্যে আনুমানিক ১ সেন্টিমিটার। উল্লেখ্য যে, ‘আলাকা’র উল্লিখিত পূর্ববর্তী পর্যায়ে তা একটি ‘মর্সেল’-এর সমান আকৃতি লাভ করে না, কেননা তা দৈর্ঘ্যে ৩.৫ মিলিমিটারের বেশি নয়। এটি ‘মুদগা’-এর দ্বিতীয় অর্থ  তথা একটি ছোট বস্তুকণিকা’-এর সঙ্গে সঙ্গতি রাখে।
‘মুদগা’-এর তৃতীয় অর্থ  অর্থাৎ, মর্সেল সদৃশ এক টুকরো গোশত- তা এই স্তরের ভ্রূণের আকৃতি প্রকৃতির বিচারে প্রযোজ্য। এ কারণে এ স্তরের জন্য কুরআন মাজিদ ব্যবহৃত পরিভাষা ‘মুদগা’ শব্দটি ভ্রূণতত্ত্ববিদদের ব্যবহৃত পরিভাষা somite থেকেও অধিক বেশি যথার্থ  ও ব্যাপক। এ শব্দটি একটি ভ্রূণের বহিঃস্থ অবস্থার যেমন যথার্থ বর্ণনা প্রদান করে তেমনি এই ধাপের অন্তঃস্থ বিকাশেরও বর্ণনা দেয়। স্মর্তব্য যে, এমনকি বিগত কয়েক বছর পূর্বেও এ বিষয়গুলি মানুষের জানা ছিল না। কুরআন মাজিদ কেবল এই পরিবর্তনগুলির পর্যায়ক্রমই বর্ণনা করে নি; বরং এই পরিবর্তনগুলির ধরন এবং আকতিরওৃ বর্ণনা দিয়েছে। নিঃসন্দেহে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এই জ্ঞানের উৎস সর্বজ্ঞাতা ও জ্ঞানময় সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ আসমানি প্রত্যাদেশ বা ওহি।

মুজিজা : ৭৯
‘ইযাম’ উপ-পর্যায়

অতঃপর (ছুম্মা) ‘নুতফা’কে আমি (আল্লাহ) ‘আলাকা’য় পরিণত করি। তারপর (ফা) ‘আলাকা’কে ‘মুদগা’য় রূপান্তরিত করি। তারপর (ফা) ‘মুদগা’কে ‘ইযাম’-এ (হাড়, মেরুদণ্ড, কঙ্কাল ইত্যাদিতে) পরিণত করি। তারপর (ফা) হাড়কে গোশত দিয়ে আবৃত করি। (মুমিনুন, ২৩ : ১৪)

‘মুদগা’ পর্যায়ে ৬ষ্ঠ সপ্তাহ পর্যন্ত ভ্রুণের বিকাশ অব্যাহত থাকে। এ পর্যায়ে কোনো স্পষ্ট মানবাকতিৃ দেখা যায় না। পঞ্চম সপ্তাহের সূচনা থেকে কোমলাস্থি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। এই আয়াত পরিষ্কারভাবে বলে, ‘ইযাম’-এর পর্যায় শুরু হয় ‘মুদগা’ পর্যায়ের পরে। অধিকন্তু ‘ফা’ অব্যয়টি নির্দেশ করে যে, এই গঠন প্রক্রিয়া অনতিবিলম্বে দ্রুত সম্পাদিত হয়ে থাকে। বিস্ময়ের ব্যাপার হল, কুরআন মাজিদের সকল তথ্যই ভ্রুণবিজ্ঞানের সাম্প্রতিক আবিষ্কৃত অধিকাংশ তথ্যের সঙ্গে সম্পূর্ণ সঙ্গতিপূর্ণ।

মুজিজা : ৮০
কুরআন মাজিদের পরিভাষা ‘সাওয়াকা’

হে মানুষ, কিসে তোমাকে তোমার মহান রব সম্পর্কে ধোঁকা দিয়েছে? যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর (ফা) তিনি ‘সাউওয়াকা’ (তোমাকে মসৃণ ও সোজা করেছেন)। অতঃপর (ফা) তোমাকে সুসামঞ্জস্য করেছেন। (ইনফিতার, ৮২ : ০৬-০৭)

অঙ্গসংস্থান (Organogenesis) সম্পন্ন হয় ‘ইযাম’ ধাপে। অতঃপর ভ্রূণের সাধারণীকতৃ কোষগুলো পৃথক হতে শুরু করে এবং কার্যকরী মাংসপেশী ও অস্থিসম্পর্কীয় দল গঠন করে। এটি এখন প্রতিষ্ঠিত সত্য যে, শুরুতে ভ্রুণ থাকে ‘C’ আকৃতির অতঃপর তা সপ্তম সপ্তাহে সোজা ও দীর্ঘায়িত হয় এবং বাহ্যত একটি খুব মসৃণ ও খুব সোজা আকৃতি ধারণা করে। বিস্ময়ের ব্যাপার হল, কুরআন মাজিদ এমন একটি সূক্ষ্ম কিন্তু সুস্পষ্ট ভ্রুণবিকাশের স্তরকে ‘সাওয়াকা’ শব্দ ব্যবহার করে উল্লেখ করেছে। যার অর্থ মসৃণ কিংবা সোজা।

মুজিজা : ৮১
‘লাহম’ উপ-পর্যায়

অতঃপর (ছুম্মা) ‘নুতফা’কে আমি (আল্লাহ) ‘আলাকা’য় পরিণত করি। তারপর (ফা) ‘আলাকা’কে ‘মুদগা’য় রূপান্তরিত করি। তারপর (ফা) ‘মুদগা’কে ‘ইযাম’-এ (হাড়, মেরুদণ্ড, কঙ্কাল ইত্যাদিতে) পরিণত করি। তারপর (ফা) হাড়কে গোশত দিয়ে আবৃত করি। (মুমিনুন, ২৩ : ১৪)

এখানে কুরআন মাজিদ সুস্পষ্টভাবে বলে, ভ্রূণগত হাড় গঠিত হয় ‘মুদগা’ পর্যায়ের পরে। অতঃপর মাংসপেশী দ্বারা আবৃত হয়। এটি পরবর্তীতে ভ্রূণকে জরায়ুর অভ্যন্তরে নড়াচড়ায় সাহায্য করে। এই ধাপ শুরু হয় সপ্তম সপ্তাহের সমাপ্তির পর এবং অষ্টম সপ্তাহ ধরে চলতে থাকে। ভ্রূণবিকাশের দ্বিতীয় প্রধান পর্যায় অর্থাৎ, ‘তাখলিক’-এই ধাপের মাধ্যমে সমাপ্ত হয়। যা শেষ হয় ভ্রূণ বিকাশের অষ্টম সপ্তাহের সমাপ্তির মাধ্যমে। এরপরে ভ্রূণ তৃতীয় এবং সর্বশেষ পর্যায় তথা ‘নাশআ’ বা বিকাশের চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রবেশ করে। এ কারণে কুরআন মাজিদ এ ক্ষেত্রে ‘ছুম্মা’ সংযোজক অব্যয় ব্যবহার করেছে, যা ‘তাখলিক’ ও ‘নাশআ’- ভ্রূণ বিকাশের এই দুই প্রধান পর্যায়ের মাঝখানে একটি সময়ের ব্যবধান নির্দেশ করে।

মুজিজা : ৮২
নবজাতকের লিঙ্গ নির্ধারণ

অতঃপর (ছুম্মা) সে (নবজাতক) আলাকায় পরিণত হয়। তারপর (ফা) আল্লাহ তাকে সুন্দর আকতিতেৃ সৃষ্টি করেন এবং সুবিন্যস্ত করেন। অতঃপর (ফা) তিনি তা থেকে সৃষ্টি করেন দুই ধরনের লিঙ্গ-পুরুষ ও মহিলা। (কিয়ামা ৭৫ : ৩৮-৩৯)

প্রফেসর কিথ মুর তার ভ্রূণতত্ত্বের পাঠ্যবই ‘The  Developing Human,  1912,  P.272’ -এর মধ্যে এই আয়াতের ব্যাখ্যা প্রদান করেন এভাবে : ভ্রূণতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে সপ্তম সপ্তাহ পর্যন্ত নবজাতকের লিঙ্গের অঙ্গসংস্থানগত লক্ষণ দেখা যায় না, যখন পুরুষের অণ্ডকোষ এবং মহিলার ডিম্বকোষ গঠিত হয়। যৌন অঙ্গসমূহের বিকাশ শুরু হয় চূড়ান্ত পর্যায়ের প্রথম দিকে। এটি উপরোল্লিখিত কুরআন মাজিদের বর্ণনার সঙ্গে সম্পূর্ণ সঙ্গতিপূর্ণ যে, যৌনাঙ্গের বিকাশ শুরু হয় হাড় ও মাংসপেশী গঠিত হওয়ার পর।
‘নাশআ’ বা বিকাশের চূড়ান্ত পর্যায়

মুজিজা : ৮৩
‘নাশআ’ পর্যায়

…অতঃপর (ছুম্মা) আমি আনশা’নাহু (তাকে গড়ে তুলি) ‘খালকান আখারা’ (অন্য এক সৃষ্টি রূপে)। অতএব, সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ কত বরকতময়। (মুমিনুন, ২৩ : ২১)

‘নাশআ’ বা চূড়ান্ত পর্যায় শুরু হয় নবম সপ্তাহে এবং গর্ভধারণের শেষ পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকে। এ পর্যায়ে ভ্রুণ মানব আকৃতি প্রদর্শন করে। ভাষাগত দৃষ্টিকোণ থেকে ‘নাশআ’ শব্দের কতিপয় অর্থ রয়েছে। যথা : আরম্ভ করা, জন্মানো, বৃদ্ধি করা, উঠা ইত্যাদি। বস্তুত ভ্রুণ এর সবকটি পরিবর্তনের ভেতর  দিয়েই  অতিবাহিত  হয়।  প্রথম  অর্থ,  আরম্ভ  করা-  তা  বিভিন্ন শারীরিক অঙ্গ ও তন্ত্রের ক্রিয়াতৎপরতা শুরু করার বর্ণনা দেয়। দ্বিতীয় অর্থ  তথা জন্মানো- তা বিভিন্ন অঙ্গের দ্রুত বিকাশের প্রতি নির্দেশ করে। তৃতীয় অর্থ  তথা বৃদ্ধি করা- তা ভ্রুণের আকৃতি ও ওজন বৃদ্ধির বর্ণনা দেয়। অতএব, কুরআন মাজিদের শব্দ ‘নাশআ’ এ সকল পরিবর্তন বর্ণনার ক্ষেত্রে অধিক উপযুক্ত ও সার্বজনীন।

মুজিজা : ৮৪
কুরআন মাজিদের পরিভাষা ‘খালকান আখার’

‘……. অতঃপর (ছুম্মা) আমি (আল্লাহ) আনশা’নাহু (তাকে গড়ে তুলি) খালকান আখার (অন্য এক সৃষ্টিরূপে)। অতএব, সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ কত বরকতময়। (মুমিনুন, ২৩ : ২৪)

Fetal কোষসমূহের দ্রুত বৃদ্ধি ও বিকাশ ভ্রুণের বৃদ্ধি ঘটায়, যা তখন একটি সম্পূর্ণ নতুন রূপ ধারণ করে। এই নতুন রূপটিই উপরোল্লিখিত আয়াতে ‘খালকান আখার’ (অন্যসৃষ্টি) শব্দে ব্যক্ত হয়েছে। এই নতুন রূপটি এখন সম্পূর্ণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও তন্ত্রসমূহ নিয়ে গঠিত, আর তা একটি মানব আকৃতির রূপ লাভ করে।
স্মর্তব্য যে, পূর্বের বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করতেন, পুরুষের শুক্রাণুতে কিংবা মহিলার ডিম্বাণুতে একটি পূর্ণ আকৃতি বিশিষ্ট মানব-কায়া বিদ্যমান রয়েছে। কুরআন মাজিদ চৌদ্দশ বছরেরও অধিককাল পূর্বে বর্ণনা করেছে, একজন মানব শিশুর অঙ্গসংস্থানগত রূপ গঠনের সূচনা প্রাথমিকভাবে দৃষ্টিগোচর হয় ভ্রুণবিকাশের সর্বশেষ ধাপে এসে। ভ্রূণবিজ্ঞানীরা কেবল সম্প্রতিই ইলেক্ট্রন অনুবিক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে তা আবিষ্কার করেছে।মানব ভ্রুণবিদ্যা

মুজিজা : ৮৫
প্রসব বেদনা ও সন্তান প্রসব

মানুষ ধ্বংস হোক, সে কতই না অকৃতজ্ঞ তিনি (আল্লাহ) তাকে কোন বস্তু থেকে সৃষ্টি করেছেন? একটি ‘নুতফা; থেকে তাকে তিনি সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তাকে সুগঠিত করেছেন। পরবর্তীতে (ছুম্মা) তিনি তার পথ সহজ করে দিয়েছেন। (আবাসা, ৮০ : ১৭-২০)

ভ্রূণ পূর্ণরূপে গঠিত হয় ষষ্ঠ মাসের শেষ দিকে। অতঃপর তা জরায়ুর উত্তাপের মধ্যে একটি সময়কাল অতিবাহিত করে। সকল দৈহিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও তন্ত্রসমূহ এই সময় বিকশিত হয়। জরায়ু এ সময় তাকে বৃদ্ধির জন্যে পুষ্টি যোগায় এবং তা তাকে দ্রুত বড় করে তোলে। প্রসব পর্যন্ত এই ধাপ অব্যাহত থাকে, যখন ভ্রূণটি মায়ের গর্ভ থেকে বেরিয়ে আসে। সাধারণত প্রসবের পথটি খুব সরু থাকে এবং বাহ্যত মনে হয় তা দিয়ে সন্তান প্রসব হওয়া খুব কষ্টসাধ্য হবে। যা হোক, প্রসবের সময় মায়ের শরীরে বিভিন্ন ধরনের শারীরিক, শরীরতাত্ত্বিক পরিবর্তন ঘটে। এসব পরিবর্তন প্রসবের রাস্তা দিয়ে সন্তান নির্গমন ও তার নড়াচড়াকে মসৃণ ও নিষ্কন্টক করে তোলে। এসব পরিবর্তনের কতেক হল :
প্রসবের পথ প্রশস্ত হওয়ার জন্যে Pelvis joints (নিম্ন ঔদরিক গিঁটসমূহ) শিথিল হয়, প্রসবের রাস্তা আরও প্রসারিত হতে সহযোগিতার জন্য মাংসপেশীগুলি শিথিল হয়ে যায়। Amniotic তরল পদার্থ, যা ইতোপূর্বে ভ্রুণের চারপাশে ছিল তা প্রসবের পথকে পিচ্ছিল করে দেয়। আর ভ্রূণের মাথার খুলির হাড় ভ্রূণটিকে মায়ের গর্ভাশয় থেকে পৃথিবীতে আসতে আরো সহায়তা করে। কুরআন মাজিদ এই পুরো প্রক্রিয়াকেই এই আয়াত দ্বারা ব্যক্ত করেছে -‘…তিনি তার পথ সহজ করে দিয়েছেন।’
বিগত আলোচনা থেকে এ কথা পরিষ্কার হয়েছে যে, কুরআন মাজিদ গর্ভধারণের প্রাথমিক পর্যায় থেকে শুরু করে ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হওয়া, পরিণত হওয়া ও প্রসবের পর্যায় পর্যন্ত মানব ভ্রূণবিকাশের বিস্তারিত বিবরণ প্রদান করে। প্রথম. তা বিকাশের ক্ষেত্রে প্রধান প্রধান ঘটনাগুলির বর্ণনা দেয়। দ্বিতীয়. তা এ সকল ঘটনার ক্রমপরম্পরারও বর্ণনা প্রদান করে, যা ইলেক্ট্রন মাইক্রোস্কোপের মাধ্যমে আবিষ্কৃত কালুনুক্রমিক বিন্যাসের সঙ্গে সম্পূর্ণ সঙ্গতিপূর্ণ। তৃতীয়. তা এ সকল পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পৃক্ত সময়েরও
বর্ণনা দেয়। সংঘটিত পরিবর্তন বা ঘটনাটি কি দ্রুত সংঘটিত হয়? না এর জন্য দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন এই পার্থক্য নির্দেশ করে। চতুর্থ. এটি এসব পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সর্বাধিক উপযুক্ত ও সার্বজনীন শব্দ ব্যবহার করে। প্রত্যেক শব্দই একটি নির্দিষ্ট ধাপের বর্ণনা দেয়, যার বৈশিষ্ট্যপূর্ণ সূচনা ও সমাপ্তি রয়েছে এবং যার আছে অঙ্গ-সংস্থানগত বা শরীরতত্ত্ব সম্পর্কিত বিশেষ স্বকীয়তা। ভ্রূণতত্ত্বের ওপর সাম্প্রতিক গবেষণাসমূহ কুরআন মাজিদের এ সকল বর্ণনার সত্যতাকে প্রত্যয়ন করে। সকল প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা সেই মহিমান্বিত আল্লাহর জন্য যিনি তাঁর প্রিয় রাসুলের ওপর এমন মুজিজাপূর্ণ ওহি অবতীর্ণ করেছেন, যা তাঁর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি সম্পর্কিত এমন বিস্ময়পূর্ণ তথ্য ধারণ করে। সেই সুমহান আল্লাহ তাআলার প্রতি অজস্র কৃতজ্ঞতা যিনি তাঁর গ্রন্থে এমন সমুজ্জ্বল মুজিজাসমূহ গচ্ছিত রেখেছেন, যাতে মানবজাতির কাছে তাঁর সর্বশেষ আসমানি গ্রন্থ হিসেবে কুরআন মাজিদের ন্যায্যতার প্রশ্নে কোনোরূপ সন্দেহ না থাকে।

‘হে লোক সকল, যদি তোমরা পুনরুত্থানের ব্যাপারে সন্দিগ্ধ হও তবে (ভেবে দেখ) আমি (আল্লাহ) তোমাদেরকে মৃত্তিকা থেকে সৃষ্টি করেছি, পরবর্তীতে (ছুম্মা) বীর্য (নুতফা) থেকে, পরবর্তীতে (ছুম্মা) আলাকা (জমাট রক্ত)  থেকে। এরপর (ছুম্মা) পূর্ণ আকতিবিশিষ্টৃ ও অপূর্ণ আকৃতি বিশিষ্ট মাংসপিণ্ড থেকে। তোমাদের কাছে (আমার ক্ষমতাকে) প্রকাশ করার জন্য। আর আমি একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত মাতগর্ভেৃ যা ইচ্ছা রেখে দেই। এরপর (ছুম্মা) আমি তোমাদেরকে শিশু অবস্থায় বের করি; তারপরে (আমি তোমাদেরকে প্রতিপালন করি) যাতে তোমরা যৌবনে পদার্পন কর। তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ মৃত্যুমুখে পতিত হয় এবং তোমাদের মধ্যে কাউকে নিষ্কর্মা বয়স পর্যন্ত পৌঁছানো হয়, যাতে সে জানার পর জ্ঞাত বিষয় সম্পর্কে সজ্ঞান না থাকে। …. আর নিশ্চয় কিয়ামত (বিচার দিবস) অবশ্যম্ভাবী। এতে কোনো সন্দেহ নেই। আর নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা কবরে যারা আছে, তাদেরকে পুনরুত্থিত করবেন। (হজ, ২২ : ০৫-০৭)

আল কুরআনের ১৬০ মুজিজা ও রহস্য বইটির সকল লেখনী পড়তে নিন্মের লিঙ্ক সমূহে ভিজিট করুনঃ

এই ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে তাহলে দয়া করে ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ একে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।
পর্যালোচনা ওভারভিউ
আধুনিক বিজ্ঞান
ভ্রুণবিদ্যা
আধুনিক ভ্রূণবিজ্ঞান
পূর্ববর্তী আর্টিকেলমানব সত্তায় আবিষ্কার সংক্রান্ত মুজিজা
পরবর্তী আর্টিকেলকুরআন মাজিদের ভবিষ্যৎবাণী সংক্রান্ত মুজিজাসমূহ

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন