কুরআন ও সুন্নাহের ওপর আরোপিত বিভিন্ন প্রশ্নের জাওয়াব

অনুবাদক: জাকেরুল্লাহ আবুল খায়ের।। সম্পাদক: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

আল্লাহর বাণী: ﴿وَإِن تُبۡدُواْ مَا فِيٓ أَنفُسِكُمۡ أَوۡ تُخۡفُوهُ ٢٨٤﴾ “আল্লাহ তা’আলা উম্মতে মুহাম্মদী থেকে তাদের অন্তরের গুনাহের উদ্রেক ও ইচ্ছাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন…

 প্রশ্ন: আল্লাহ তা‘আলা বাণী: ﴿وَإِن تُبۡدُواْ مَا فِيٓ أَنفُسِكُمۡ أَوۡ تُخۡفُوهُ يُحَاسِبۡكُم بِهِ ٱللَّهُۖ ٢٨٤﴾ [البقرة: ٢٨٤]   এর অর্থ কি? আল্লাহর বাণীর মধ্যে এবং ঐ হাদীস যাতে বলা হয়েছে— إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ عَنْ أُمَّتِي مَا حَدَّثَتْ بِهِ أَنْفُسَهَا مَا لَمْ تَعْمَلْ أَوْ تَتَكَلَّمْ “আল্লাহ তা’আলা উম্মতে মুহাম্মদী থেকে তাদের অন্তরের গুনাহের উদ্রেক ও ইচ্ছাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন যতক্ষণ না তা মুখে উচ্চারণ বা বাস্তবায়ন না করে।” উভয়ের মধ্যে কীভাবে বিরোধ নিরসন করব?

উত্তর: এ ﴿لِّلَّهِ مَا فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَمَا فِي ٱلۡأَرۡضِۗ وَإِن تُبۡدُواْ مَا فِيٓ أَنفُسِكُمۡ أَوۡ تُخۡفُوهُ يُحَاسِبۡكُم بِهِ ٱللَّهُۖ فَيَغۡفِرُ لِمَن يَشَآءُ وَيُعَذِّبُ مَن يَشَآءُۗ وَٱللَّهُ عَلَىٰ كُلِّ شَيۡءٖ قَدِيرٌ ٢٨٤﴾ [البقرة: ٢٨٤] আল্লাহর জন্যই যা রয়েছে আসমানসমূহে এবং যা রয়েছে জমিনে। আর তোমরা যদি প্রকাশ কর যা তোমাদের অন্তরে রয়েছে অথবা গোপন কর, আল্লাহ সে বিষয়ে তোমাদের হিসাব নেবেন। অতঃপর তিনি যাকে চান ক্ষমা করবেন, আর যাকে চান আযাব দেবেন। আর আল্লাহ সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান। [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ২৮৪]  আয়াতটি যখন নাযিল হয় তখন অনেক সাহাবীর কাছে বিষয়টি কঠিন ও দু:সাধ্য মনে হলো। তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এলো এবং বলল, এটি এমন একটি বিষয় যা পালন করা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বললেন, তোমাদের পূর্বে যারা ছিল তারা বলেছিল আমরা শুনলাম এবং অমান্য করলাম তোমরাও কি তাদের মতো বলতে চাও? তোমরা বরং এ কথা বল, আমরা শুনলাম ও মানলাম। এ কথা শোনে তারা বলল, আমরা শুনলাম এবং আনুগত্য করলাম। তারা যখন এ কথা বলল এবং তাদের জবান এ কথার প্রতি অনুগত হলো, আল্লাহ তা‘আলা পরবর্তী আয়াত নাযিল করে বলেন, ﴿ءَامَنَ ٱلرَّسُولُ بِمَآ أُنزِلَ إِلَيۡهِ مِن رَّبِّهِۦ وَٱلۡمُؤۡمِنُونَۚ كُلٌّ ءَامَنَ بِٱللَّهِ وَمَلَٰٓئِكَتِهِۦ وَكُتُبِهِۦ وَرُسُلِهِۦ لَا نُفَرِّقُ بَيۡنَ أَحَدٖ مِّن رُّسُلِهِۦۚ وَقَالُواْ سَمِعۡنَا وَأَطَعۡنَاۖ غُفۡرَانَكَ رَبَّنَا وَإِلَيۡكَ ٱلۡمَصِيرُ ٢٨٥ لَا يُكَلِّفُ ٱللَّهُ نَفۡسًا إِلَّا وُسۡعَهَاۚ ٢٨٦﴾ [البقرة: ٢٨٥،  ٢٨٦]  “রাসূল তার নিকট তার রবের পক্ষ থেকে নাযিলকৃত বিষয়ের প্রতি ঈমান এনেছে, আর মুমিনগণও। প্রত্যেকে ঈমান এনেছে আল্লাহর উপর, তাঁর ফেরেশতাকুল, কিতাবসমূহ ও তাঁর রাসূলগণের উপর, আমরা তাঁর রাসূলগণের কারও মধ্যে তারতম্য করি না। আর তারা বলে, আমরা শুনলাম এবং মানলাম। হে আমাদের রব! আমরা আপনারই ক্ষমা প্রার্থনা করি, আর আপনার দিকেই প্রত্যাবর্তনস্থল। আল্লাহ কোন ব্যক্তিকে তার সামর্থ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না।” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ২৮৫, ২৮৬]  আল্লাহ তা‘আলা তাদের প্রতি দয়া ও ক্ষমা করলেন এবং আয়াতের প্রতিপাদ্য মর্মটি রহিত করে দিলেন। কর্ম সম্পাদন ছাড়া অথবা কোন কর্ম বার বার করা ছাড়া অথবা অটুট থাকা ছাড়া কোন মানুষকে পাকড়াও করা হবে না। মানুষের অন্তর বা নফসের মধ্যে গুনাহের যে উদ্রেক বা চিন্তা আসে তা ক্ষমা। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ عَنْ أُمَّتِي مَا حَدَّثَتْ بِهِ أَنْفُسَهَا مَا لَمْ تَعْمَلْ أَوْ تَتَكَلَّمْ “আল্লাহ তা’আলা উম্মাতে মুহাম্মদীর অন্তরে গুনাহের যে উদ্রেক ও ইচ্ছা হয়, তাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন যতক্ষণ না তা মুখে উচ্চারণ বা বাস্তবায়ন না করে।”[1]

আলহামদু লিল্লাহ প্রশ্ন দূর হয়ে গেছে। একজন তার আমল, মুখের কথা বা প্রত্যয় ছাড়া পাকড়াও করা হবে না। অথবা তার অন্তরে বার বার এসে স্থায়ী হওয়া গুনাহ যেমন, লৌকিকতা, মুনাফেকী, অহংকার ইত্যাদি গুনাহ ছাড়া সে আল্লাহর দরবারে পাকড়া হবে না।

আর যে সব সন্দেহ সংশয় মানুষের অন্তরে মাঝে মধ্যে উদ্রেক হয় এবং ঈমান ও বিশ্বাসের কারণে তা চলে যায় তাতে কোন ক্ষতি নেই। এগুলো শয়তানেরই চক্রান্ত ও কু-মন্ত্রণা। এ কারণেই আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীসে এসেছে তিনি বললেন,— جاء ناس من أصحاب النبي صلى الله عليه و سلم فقالوا : إنا نجد في أنفسنا ما نتعاظم أن نتكلم به قال قد وجدتموه قالوا نعم قال ذلك صريح الإيمان  “কতক লোক রাসূলের দরবারে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের অন্তরে এমন এমন কঠিন কথার উদ্রেক হয়, তা মুখে উচ্চারণ করার চেয়ে আসমান আমাদের ওপর ভেঙে পড়া অনেক সহজ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এটি সু-স্পষ্ট ঈমান।”[2]

এটি শয়তানেরই কু-মন্ত্রণা, শয়তান যখন একজন মু’মিনের মধ্যে সততা ইখলাস বিশুদ্ধ ঈমান ও আখিরাতের প্রতি আগ্রহী দেখে তখন তাকে বিভিন্নভাবে কু-মন্ত্রণা দিয়ে থাকে। তার অন্তরে বিভিন্ন খারাপ কথা ডেলে দেয়। তারপর যখন সে মুজাহাদা সংগ্রাম এবং শয়তান থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করে তখন শয়তানের অনিষ্ঠতা থেকে নিরাপদ থাকে। এ কারণেই আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত অপর হাদীসে এসেছে—রাসূলু্ল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, لا يزال الناس يتساءلون حتى يقال هذا خلق الله الخلق فمن خلق الله ؟ فمن وجد من ذلك شيئا فليقل آمنت بالله  “মানুষ সর্বদা প্রশ্ন করতে থাকে এমনকি এক পর্যায়ে সে বলে, আল্লাহ তা‘আলা সবকিছু সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহকে কে সৃষ্টি করেছে? যখন কারো অন্তরে এ ধরণের প্রশ্ন আসবে সে যে অনতি বিলম্বে এ কথা বলে, আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি বিশ্বাস করলাম” অপর বর্ণনায় এসেছে এ কথাও বলবে—“বিতাড়িত শয়তান থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করলাম। সে যেন তা থেকে ফিরে আসে এবং তার প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে।” এ ধরণের কু-মন্ত্রণা যা আল্লাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন তা তার কোন ক্ষতি করতে পারবে না। আল্লাহ তা‘আলাই তাওফীক দাতা।

শাইখ আব্দুল আযীয বিন বায রহ.

[1] সহীহ বুখারী হাদীস নং 5269

[2] নাসাঈ হাদীস নং 15000

ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে। তাহলে আপনিও ব্লগের কার্যক্রম কে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার লেখণী পাঠাতে পারেন।আপনার লেখনী পাঠিয়ে আমাদের ফেচবুক পেজের ম্যাসেঞ্জারে গিয়ে দয়াকরে নক করুন।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন