হোম ইসলামী শরী‘আতে শাস্তির বিধান মুরতাদের শাস্তির ওপর আপত্তি

মুরতাদের শাস্তির ওপর আপত্তি

0

ড. আব্দুল কারীম যাইদান

অনুবাদক: মুহাম্মাদ বুরহানুদ্দীন

সম্পাদক: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

৫৪. অভিযোগকারীগণ বলেন, মুরতাদের শাস্তি একজন মানুষের স্বাধীন আকীদাহ-বিশ্বাসের ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপ, ধর্ম পরিবর্তনের বিরুদ্ধে জবরদস্তি এবং যে ধর্ম সে মানতে অনিচ্ছুক ও অনাগ্রহী তা বিশ্বাস ও গ্রহণ করতে বাধ্য করার নামান্তর।

৫৫. এ অভিযোগ গ্রহণযোগ্য নয়। মূলতঃ মুরতাদের শাস্তির প্রকৃতি সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং রিদ্দা শব্দের তাৎপর্য ও আকীদাহ পরিবর্তনে জবরদস্তি সম্পর্কে অজ্ঞতাই এ আপত্তির কারণ। এর বিবরণ নিম্নরূপ:

পূর্বেই বলা হয়েছে যে, রিদ্দা অর্থ ইসলাম ত্যাগ করা। আর ইসলাম যে ত্যাগ করে তাকে বলা হয় মুরতাদ। এখন আমাদের সামনে এমন একজন মুসলিম উপস্থিত যে স্বীয় ধর্ম ত্যাগ করে মুরতাদ হওয়ার অপরাধে অপরাধী। এ মাসআলার সুরাহা কী? আমরা তো ইয়াহুদী বা নাসারা ধর্মের ইমাম নই যে, ইসলাম ত্যাগ করে সে নতুন যে ধর্মে প্রবেশ করেছে জোরপূর্বক সে ধর্ম পরিবর্তন করে পুনরায় ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করব। উল্লেখ্য যে, ধর্ম গ্রহণে বাধ্য করা বিষয়ে কুরআনে স্পষ্ট বর্ণনা আছে। সে বর্ণনাই ইসলামী বিধানে এতদসংক্রান্ত মূলনীতি। এ নীতি এতই সহজ-সরল ও স্পষ্ট যে, এর সাথে অন্য কিছু যোগ করার কোনো সুযোগ নেই। কেননা ইসলাম অমুসলিমদের প্রতি জিযিয়া কর প্রবর্তণ ও জিম্মী চুক্তির ব্যবস্থা করেছে। অর্থাৎ ইসলাম অমুসলিমদেরকে তাদের ধর্ম-বিশ্বাসসহ স্বাধীনভাবে জীবন-যাপনের সুযোগ করে দিয়েছে। ধর্ম পরিবর্তন করতে বাধ্য করা ও ইসলাম গ্রহণ করতে বল প্রয়োগ করা যদি বৈধ হত তাহলে ইসলাম কখনও জিম্মী চুক্তির বিধান দিত না।

তবে এখানে প্রশ্ন হয় যে, মুরতাদকে তা হলে শাস্তি দেওয়া হবে কেন? এটা কি তার না রাজী সত্ত্বেও তাকে ইসলামে বহাল রাখার জন্য বাধ্য করা হয় না? এ প্রশ্নের জবাব এই -একজন মুসলিম তার ইসলাম পরিচয়ের মাধ্যমে ইসলামী বিধি-বিধান ও ইসলামী আকীদাহ-বিশ্বাস স্বীকার করে নেয়। স্বীকার করে নেওয়ার পর তা প্রত্যাহার করা যায় না। স্বীকার করে যে প্রত্যাহার করে তাকে উপযুক্ত শাস্তি ভোগ করতে হয়। মুরতাদ ইসলামকে স্বীকার করে তা প্রত্যাখ্যান করায় এবং এর সাথে আরো কিছু অবস্থা মুক্ত হওয়ায় তার জন্য এ শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে। কারণ মুরতাদ ইসলাম ত্যাগ করার ফলে আরও বেশ কিছু  অপরাধে জড়িয়ে পড়ে অথবা বলা যায় এ অপরাধগুলো তার মুরতাদ হওয়ার অনিবার্য পরিণতি। তাহলো, মুরতাদকে অবশ্যই প্রকাশ্যেভাবে তার ইসলাম ত্যাগের ঘোষণা দিতে হয়। ঘোষণা দেওয়ার যেসব পদ্ধতি চালু থাকে তন্মধ্যে যে কোনো এক পদ্ধতিতে ঘোষণা দেবে। কেননা সে যদি তার ধর্ম পরিবর্তনকে গোপন রাখে, ঘোষণা না দেয় তাহলে আমরা তার অবস্থান সম্পর্কে জানতে পারব না। ফলে সে মুনাফিক হয়ে থাকবে। সুতরাং তার ইসলাম ত্যাগের ঘোষণা করাটাই আর এক অপরাধ। কেননা এর দ্বারা মুসলিম উম্মার আকীদাহকে হেয় করা হয় ও ইসলামকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা নিয়ম-শৃঙ্খলাকে তাচ্ছিল্য প্রদর্শন করা হয়। এ ছাড়া তার ইসলাম ত্যাগে মুনাফিকদের কপটতা বেড়ে যায়, সর্বত্র ইসলাম বর্জনের চর্চা হতে থাকে ও মুনাফিকদের কপটতা প্রকাশ্য রূপ লাভ করে। তদুপরি তাদের আকীদাহর সাথে দুর্বল আকীদাহর সংমিশ্রণে সমাজে সংশয় সন্দেহ দানা বেধে ওঠে। এ বিষয়গুলো সমাজের মধ্যে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে এবং প্রতিষ্ঠিত ইসলামী সমাজ ব্যবস্থাকে অস্থির করে তোলে ও এ ব্যবস্থার প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করে। যেহেতু এগুলো অত্যন্ত ভয়ংকর বিষয়, তাই মুরতাদকে শাস্তি দানের মাধ্যমে সমাজ থেকে এসব নির্মূল করা অপরিহার্য। মুরতাদের শাস্তি রাখা হয়েছে মৃত্যুদণ্ড। কেননা তার অপরাধ গুরুতর। আর দায়িত্বে অবহেলা করে সে অপরাধকে আরো ভয়াবহ রূপ দিয়েছে। তার এ শাস্তিতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা যায় দায়িত্বে অবহেলার কারণে অবহেলাকারীর শাস্তি মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হয়ে থাকে। যেমন, কোনো ব্যক্তি যদি সরকারের সাথে সৈনিকদের খাদ্য সরবরাহের চুক্তি করে। সৈনিকরা আছে যুদ্ধক্ষেত্রে। তাদের খাদ্যের প্রয়োজন। এমতাবস্থায় যদি চুক্তিকারী খাদ্য সরবরাহ বন্ধ করে দেয়, অথচ চুক্তি অনুযায়ী খাদ্য পাঠাতে কোনো সমস্যা নেই। এ অপরাধে তার শাস্তি মুত্যুদণ্ড পর্যন্ত থেকে পারে। অনুরূপ কোনো ধাত্রী যদি কোনো শিশুকে দুধ পান করবার চুক্তি করে, এরপর চুক্তি ভঙ্গ করে দুধ পান করানো বন্ধ করে দেয় এবং ক্ষুধার তাড়নায় শিশুটি মারা যায়, তাহলে একদল ফকীহর মতে তার শাস্তি হবে মৃত্যুদণ্ড।

উপসংহার, মুরতাদের অপরাধ গুরুতর হওয়া সত্বেও ইসলামী শরী‘আত তাকে তিন দিন অবকাশ দেওয়ার কথা বলেছে। এর মধ্যে সে যদি ফিরে আসে তবে তার শাস্তি রহিত হয়ে যায়। আমাদের উপরোক্ত বক্তব্যের পর কারো পক্ষে একথা বলার কি কোনো সুযোগ আছে যে, মুরতাদের শাস্তি তার স্বাধীন বিশ্বাসের ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপ এবং তাকে ধর্ম পরিবর্তন করতে ও ইসলাম গ্রহণ করতে বাধ্য করার নামান্তর?

pratyabartan
Exit mobile version