মুসলিম

মূল: ড. মাজহার কাজি । অনুবাদ: মাওলানা ফয়জুলাহ− মুজহিরী। সম্পাদনা: এম মুসলেহ উদ্দিন

মুসলিম-অমুসলিম সকলে একবাক্যে স্বীকার করে যে, কুরআন মাজিদ বর্তমানে তার সেই প্রকতৃ রূপেই বিদ্যমান আছে যেমনটি মানবজাতির জন্যে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর অবতীর্ণ হয়েছিল। কেবল কুরআন মাজিদের বিষয়বস্তুতেই কোনো পরিবর্তন আসে নি তা নয়, বরং, এমনকি, তার যতিচিহ্ন এবং বর্ণের ক্ষেত্রেও কোনোরূপ এদিক-ওদিক হয় নি। ফলশ্রুতিতে তার বিশ্বাসযোগ্যতার ব্যাপারে এ পর্যন্ত কোনো প্রশ্ন ওঠে নি।

বিগত পৃষ্ঠাগুলিতে কুরআন মাজিদের ১৬০টি সুস্পষ্ট মুজিজা উপস্থাপন করা হয়েছে। যেমনটি ইতোপূর্বে বর্ণিত হয়েছে, মুজিজা আল্লাহ তাআলারই কাজ। যদি পাঠক এসবের কোনো একটি মুজিজাকেও বিশ্বাস করে, প্রকারান্তরে সে যেন স্বীকার করে যে, কুরআন মাজিদ আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ আসমানি প্রত্যাদেশ। কুরআন মাজিদের শাশ্বত ও সদা বর্তমান মুজিজাসমূহও এ কথা নির্দেশ করে যে, এটি আল্লাহ তাআলার পক্ষ

থেকে মানবজাতির জন্যে সার্বজনীন বার্তা। কুরআন মাজিদ এভাবে তার সিদ্ধতার শর্তটি যথাযথভাবে পূরণ করে। অতএব সকলের উচিত সাবধানতার সঙ্গে কুরআন মাজিদের মৌলিক বার্তার প্রতি মনোনিবেশ করা এবং এর নির্দেশনা অনুসরণের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার রহমত লাভ করা।

কুরআন মাজিদের বুনিয়াদি বার্তা হল, সর্বশক্তিমান প্রভু আল্লাহ তাআলার একত্বে বিশ্বাস স্থাপন করা। এই বিশ্বাসের নাম তাওহিদ এবং তা ইসলামের সকল বিশ্বাসের মূল বুনিয়াদ বা ভিত্তি। এটি বিশ্বের সকল ধর্ম থেকে ইসলামকে স্বাতন্ত্র্য দান করেছে। কুরআন মাজিদ তার বার্তা প্রচারের জন্য খুব সাধারণ ও মানবিক উপায় ব্যবহার করেছে। এটি মানুষের মৌলিক বিচার-বুদ্ধিতে আবেদন সৃষ্টি করে। যেমনটি কিয়দংশ নিম্নে তুলে ধরা হল :

বল, ‘সকল প্রশংসাই আল্লাহর নিমিত্তে। আর শান্তি তাঁর বান্দাদের প্রতি যাদের তিনি মনোনীত করেছেন। আল্লাহ শ্রেষ্ঠ, না কি যাদের এরা শরীক করে তারা’? বরং তিনি (শ্রেষ্ঠ), যিনি আসমানসমূহ ও জমিনকে সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদের জন্য তিনি আসমান থেকে পানি বর্ষণ করেন। অতঃপর তা দ্বারা আমি মনোরম উদ্যান সৃষ্টি করি। তার বৃক্ষাদি উৎপন্ন করার ক্ষমতা তোমাদের নেই। আল্লাহর সঙ্গে কি অন্য কোনো ইলাহ আছে? বরং তারা এমন এক কওম যারা র্শিক করে। বরং তিনি, যিনি জমিনকে আবাসযোগ্য করেছেন এবং তার মধ্যে প্রবাহিত করেছেন নদী-নালা। আর তাতে স্থাপন করেছেন সুদৃঢ় পর্বতমালা এবং দুই সমুদ্রের মধ্যখানে অন্তরায় সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর সঙ্গে কি অন্য কোনো ইলাহ আছে? বরং তাদের অধিকাংশই জানে না। বরং তিনি, যিনি নিরুপায়ের আহবানে সাড়া দেন এবং বিপদ দূরীভূত করেন এবং তোমাদেরকে জমিনের প্রতিনিধি বানান। আল্লাহর সঙ্গে কি অন্য কোনো ইলাহ আছে ? তোমরা কমই উপদেশ গ্রহণ করে থাক। বরং তিনি, যিনি তোমাদেরকে স্থলে ও সমুদ্রের অন্ধকারে পথ দেখান এবং যিনি স্বীয় রহমতের প্রাক্কালে সুসংবাদবাহী বাতাস প্রেরণ করেন। আল্লাহর সঙ্গে কি অন্য কোনো ইলাহ আছে? তারা যা কিছু শরীক করে আল্লাহ তা থেকে ঊর্ধ্বে। বরং তিনি, যিনি সৃষ্টির সূচনা করেন, তারপর তার পুনরাবৃত্তি করবেন এবং যিনি তোমাদেরকে আসমান ও জমিন থেকে রিজিক দান করেন, আল্লাহর সঙ্গে কি কোনো ইলাহ আছে? বল, ‘তোমাদের প্রমাণ নিয়ে এসো যদি তোমরা সত্যবাদী হও।’ বল, ‘আল্লাহ ছাড়া আসমানসমূহে ও জমিনে যারা আছে তারা গায়েব জানে না। আর কখন তাদেরকে পুনরুত্থিত করা হবে তা তারা অনুভব করতে পারে না’। বরং আখিরাত সম্পর্কে তাদের জ্ঞান নিঃশেষ হয়েছে। বরং সে বিষয়ে তারা সন্দেহে আছে; বরং এ ব্যাপারে তারা অন্ধ। আর কাফিররা বলে, ‘আমরা ও আমাদের পিতৃপুরুষরা মাটি হয়ে যাব তখনো কি আমাদেরকে উত্থিত করা হবে’? ইতঃপূর্বে আমাদেরকে আমাদের পিতৃপুরুষদেরকে এ বিষয়ে ওয়াদা দেয়া হয়েছিল, ‘এটি প্রাচীন লোকদের উপকথা ছাড়া কিছুই নয়’। বল, ‘তোমরা জমিনে ভ্রমণ কর, তারপর দেখ, কিরূপ হয়েছিল অপরাধীদের পরিণতি।’ আর তাদের জন্য দুঃখ করো না এবং তারা যে ষড়যন্ত্র করে তাতে মনক্ষুণ্ণ হয়ো না। আর তারা বলে, ‘তোমরা সত্যবাদী হলে (বল) এই ওয়াদা কখন আসবে’? বল, ‘আশা করা যায়, তোমরা যে বিষয়ে তাড়াহুড়া করছ তার কিছু অচিরেই হবে’। আর নিশ্চয় তোমার রব মানুষের প্রতি অনুগ্রহশীল; কিন্তু তাদের বেশির ভাগই শুকরিয়া আদায় করে না। (নামাল ২৭ : ৫৯-৬৪)

তাওহিদের পর দ্বিতীয় প্রধান গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হল, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নবুওয়াতের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করা। কুরআন মাজিদ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর একটি জীবন্ত মুজিজা এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেও কুরআন মাজিদের জীবন্ত প্রতীক। কুরআন মাজিদ বলে,

‘যারা অনুসরণ করে রাসূলের, যে উম্মি নবী; যার গুণাবলি তারা নিজদের কাছে তাওরাত ও ইঞ্জিলে লিখিত পায়, যে তাদেরকে সৎ কাজের আদেশ দেয় ও বারণ করে অসৎ কাজ থেকে এবং তাদের জন্য পবিত্র বস্তু হালাল করে আর অপবিত্র বস্তু হারাম করে। আর তাদের থেকে বোঝা ও শৃংখল-যা তাদের উপরে ছিল- অপসারণ করে। সুতরাং যারা তার প্রতি ঈমান আনে, তাকে সম্মান করে, তাকে সাহায্য করে এবং তার সঙ্গে যে নূর নাজিল করা হয়েছে তা অনুসরণ করে তারাই সফলকাম।’ (আরাফ ০৭ : ১৫৭)

যুক্তি ও সাধারণ চেতনাবোধ এ কথা দাবি করে যে, যারা কুরআন মাজিদের এই বার্তা অনুসরণ করে তারা আল্লাহ তাআলার রহমত ও অনুগ্রহ লাভ করবে। আর যারা এই বার্তাকে প্রত্যাখ্যান করবে তারা আল্লাহ তাআলার ক্রোধ ও সাজা প্রাপ্ত হবে। কুরআন মাজিদ এই বিষয়টি খুব পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করেছে। এটি শেষ বিচারের দিবসের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করতে আহ্বান করে।

‘আর প্রত্যেককে তার আমলের পূর্ণ প্রতিফল দেয়া হবে এবং তারা যা করে সে সম্পর্কে তিনিই সর্বাধিক পরিজ্ঞাত। আর কাফিরদেরকে দলে দলে জাহান্নামের দিকে হাঁকিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। অবশেষে তারা যখন জাহান্নামের কাছে এসে পৌঁছবে তখন তার দরজাগুলো খুলে দেয়া হবে এবং জাহান্নামের রক্ষীরা তাদেরকে বলবে, ‘তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের কাছে কি রাসূলগণ আসেনি, যারা তোমাদের কাছে তোমাদের রবের আয়াতগুলো তিলাওয়াত করত এবং এ দিনের সাক্ষাৎ সম্পর্কে তোমাদেরকে সতর্ক করত’? তারা বলবে, ‘অবশ্যই এসেছিল’; কিন্তু কাফিরদের ওপর আযাবের বাণী সত্যে পরিণত হল। বলা হবে, ‘তোমরা জাহান্নামের দরজাসমূহে প্রবেশ কর, তাতেই স্থায়ীভাবে থাকার জন্য। অতএব অহঙ্কারীদের আবাসস্থল কতই না মন্দ। আর যারা তাদের রবকে ভয় করেছে তাদেরকে দলে দলে জান্নাতের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। অবশেষে তারা যখন সেখানে এসে পৌঁছবে এবং এর দরজাসমূহ খুলে দেয়া হবে তখন জান্নাতের রক্ষীরা তাদেরকে বলবে, ‘তোমাদের প্রতি সালাম, তোমরা ভাল ছিলে। অতএব স্থায়ীভাবে থাকার জন্য এখানে প্রবেশ কর’। (যুমার ৩৯ : ৭০-৭৩)

আল্লাহ তাআলা পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু, অধিক উপকারী, সর্বাপেক্ষা অনুগ্রহশীল এবং অপরিসীম উদার। তিনি তাঁর সর্বশেষ বাণীকে মানব জাতির জন্য সকল ধরনের বিচ্যুতি ও ত্রুটি থেকে সংরক্ষিত রেখেছেন। আর তিনি তার সর্বশেষ এই বাণীকে করেছেন খুব সুস্পষ্ট, সব ধরনের অসঙ্গতি, এমনকি সন্দেহের লেশ থেকে পর্যন্ত রেখেছেন মুক্ত । অধিকন্তু তিনি তাঁর এই আসমানি বাণীকে দ্ব্যর্থকতা ও দুর্বোধ্যতা থেকে। তাঁর আসমানি বার্তার সঙ্গে সঙ্গে তিনি মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ব্যক্তিত্বের মধ্যে তার একটি জীবন্ত নমুনাও পাঠিয়েছেন। একই সময়ে আল্লাহ তাআলা মানব জাতিকে সাধারণ বোধশক্তি, বুদ্ধিমত্তা এবং বিচার-বিবেচনার গুণাবলিও দান করেছেন। অতঃপর তিনি প্রত্যেক মানুষকে তাঁর সেই গুণগুলি ব্যবহার করে তাঁর সর্বশেষ বাণীর অনুসরণ করা কিংবা তার গুণগুলিকে নষ্ট করে তাঁর বাণীকে প্রত্যাখ্যান করার স্বাধীনতা দান করেছেন। তারাই রহমতপ্রাপ্ত যারা তাঁর বাণীর অনুসরণ করে। তারাই সেসব লোক যারা উভয় জগতে উন্নতি ও সফলতা লাভ করে। তারাই সেসব লোক যারা তার অপরিসীম রহমত ও দয়া লাভের আশা করতে পারে এবং পরকালে একটি অন্তহীন পুরস্কার জান্নাত এবং অনন্ত জীবন লাভ করতে পারে। তারাই ধ্বংসপ্রাপ্ত যারা নিজেদের স্বাথপর্র প্রবৃত্তির অনুসরণ করে এবং তাঁর বাণীকে প্রত্যাখ্যান করে। তারাই হচ্ছে সেসব লোক যারা উভয় জাহানে ব্যর্থ ও বিফল। তারাই আল্লাহ তাআলার ক্রোধ ও সাজাপ্রাপ্ত হবে এবং তাদের আবাস হবে জাহান্নামের আগুনে, যেখানে তারা লাভ করবে কষ্ট ও যন্ত্রণার এক অনন্ত জীবন। ইরশাদ হয়েছে-

‘আর তোমরা তোমাদের রবের অভিমুখী হও এবং তোমাদের ওপর আজাব আসার পূর্বেই তার কাছে আত্মসমর্পণ কর। তার (আজাব আসার) পরে তোমাদেরকে সাহায্য করা হবে না। আর অনুসরণ কর উত্তম যা নাযিল করা হয়েছে তোমাদের রবের পক্ষ থেকে, তোমাদের ওপর অতর্কিতভাবে আজাব আসার পূর্বে। অথচ তোমরা উপলব্ধি করতে পারবে না। যাতে কাউকেও বলতে না হয়, হায় আফসোস! আল্লাহর হক আদায়ে আমি যে  শৈথিল্য করেছিলাম তার জন্য। আর আমি কেবল ঠাট্টা-বিদ্রুপকারীদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিলাম’। অথবা যাতে কাউকে একথাও বলতে না হয়, ‘আল্লাহ যদি আমাকে হিদায়াত দিতেন তাহলে অবশ্যই আমি মুত্তাকিদের অন্তর্ভুক্ত হতাম’। অথবা আজাব প্রত্যক্ষ করার সময় যাতে কাউকে একথাও বলতে না হয়, ‘যদি একবার ফিরে যাওয়ার সুযোগ আমার হত, তাহলে আমি মুমিনদের অন্তর্ভুক্ত হতাম’। হ্যাঁ,  অবশ্যই তোমার কাছে আমার নিদর্শনাবলি এসেছিল, অতঃপর তুমি সেগুলোকে অস্বীকার করেছিলে এবং তুমি অহঙ্কার করেছিলে। আর তুমি কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত ছিলে। আর যারা আল্লাহর প্রতি মিথ্যারোপ করে কিয়ামতের দিন তুমি তাদের চেহারাগুলো কালো দেখতে পাবে। অহঙ্কারীদের বাসস্থান জাহান্নামের মধ্যে নয় কি? আর তোমরা তোমাদের রবের অভিমুখী হও এবং তোমাদের ওপর আজাব আসার পূর্বেই তার কাছে আত্মসমর্পণ কর। তার (আজাব আসার) পরে তোমাদেরকে সাহায্য করা হবে না। (যুমার, ৩৯ : ৫৪-৬১)

আল কুরআনের ১৬০ মুজিজা ও রহস্য বইটির সকল লেখনী পড়তে নিন্মের লিঙ্ক সমূহে ভিজিট করুনঃ

ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে। তাহলে আপনিও ব্লগের কার্যক্রম কে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার লেখণী পাঠাতে পারেন।আপনার লেখনী পাঠিয়ে আমাদের ফেচবুক পেজের ম্যাসেঞ্জারে গিয়ে দয়াকরে নক করুন।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন