ইলমী গবেষণা ডীনশীপ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, মদিনা মুনাওয়ারা

অনুবাদ: মোহাম্মাদ ইবরাহীম আবদুল হালীম

সম্পাদনা: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

১- যাকাতের সংজ্ঞা:

যাকাতের শাব্দিক অর্থ: বৃদ্ধি পাওয়া, বেশি হওয়া। কখনো প্রশংসা, পবিত্রকরণ ও সংশোধন এর অর্থে ব্যবহৃত হয়। আর মালের যে অংশ বের করা হয় তাকে যাকাত বলে। কারণ, এর দ্বারা বরকতের মাধ্যমে মাল বৃদ্ধি পায় আর ক্ষমার মাধ্যমে ব্যক্তিকে পবিত্র করা হয়।

যাকাতের পারিভাষিক অর্থ: নির্ধারিত সময়ে নির্দিষ্ট গোষ্ঠির জন্য নির্ধারিত মালে অত্যাবশকীয় হক্ব বের করা।

২- ইসলামে যাকাতের স্থান:

যাকাত ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম একটি স্তম্ভ।

আল-কুরআনে বহু স্থানে সালাতের সাথে যাকাতের আলোচনা হয়েছে। যেমন-আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَأَقِيمُواْ ٱلصَّلَوٰةَ وَءَاتُواْ ٱلزَّكَوٰةَ ٤٣﴾ [البقرة: ٤٣]

“তোমরা সালাত কায়েম কর ও যাকাত প্রদান কর”। [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ৪৩]

তিনি আরো বলেন,

﴿وَيُقِيمُواْ ٱلصَّلَوٰةَ وَيُؤۡتُواْ ٱلزَّكَوٰةَ ٥﴾ [البينة: ٥]

“এবং (তারা আদিষ্ট হয়েছিল) সালাত কায়েম করতে এবং যাকাত প্রদান করতে”। [সূরা আল-বায়্যিনাহ, আয়াত: ৫]

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«بني الإسلام على خمس» وذكر منها «إيتاء الزكاة».

“ইসলাম পাঁচটি স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত, তন্মধ্যে যাকাত আদায় করা অন্যতম একটি রুকন”।[1]

আল্লাহ মানব জাতির আত্মাকে কৃপণতা, বখীলতা ও লোভ-লালসা থেকে পবিত্র করার জন্য, ফকীর-মিসকীন ও অভাবীদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করার জন্য, মালকে পবিত্র ও বৃদ্ধি করার জন্য, তথায় বরকত অবতীর্ণ করার জন্য, তাকে বিপদ-আপদ ও বিপর্যয় থেকে রক্ষা করার জন্য এবং জাতির জীবনে সৌহার্দ্য ও সৌভাগ্য প্রতিষ্ঠা করার জন্য যাকাত প্রবর্তন করেছেন।

আল্লাহ তাঁর কিতাবে যাকাত গ্রহণের হিকমাত উল্লেখ করেছেন।

যেমন তিনি বলেন,

﴿خُذۡ مِنۡ أَمۡوَٰلِهِمۡ صَدَقَةٗ تُطَهِّرُهُمۡ وَتُزَكِّيهِم بِهَا ١٠٣﴾ [التوبة: ١٠٣]

“তুমি তাদের সম্পদ থেকে সাদ্কা (যাকাত) গ্রহণ কর। যার দ্বারা তুমি তাদেরকে পবিত্র এবং পরিশুদ্ধ করবে”। [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ১০৩]

৩- যাকাতের বিধান:

প্রত্যেক মুসলিম ব্যক্তি মালের শর্তানুযায়ী নিসাবের মালিক হলে তার ওপর যাকাত ফরয। এমনকি বাচ্চা ও পাগলদের পক্ষ থেকে তাদের অভিভাবক তাদের মালের যাকাত আদায় করবেন। যে ব্যক্তি জেনে-বুঝে ইচ্ছাকৃতভাবে এর ফরয হওয়াকে অস্বীকার করবে সে কাফের হয়ে যাবে। আর যে ব্যক্তি কৃপণতা ও অলসতা করে যাকাত দিবে না এর জন্য তাকে ফাসেক ও কাবীরাহ গুনাহে লিপ্ত বলে গণ্য করা হবে। আর তার যদি এ অবস্থায় মৃত্যু হয় তবে সে আল্লাহর ইচ্ছাধীনে থাকবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَغۡفِرُ أَن يُشۡرَكَ بِهِۦ وَيَغۡفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَآءُۚ ٤٨﴾ [النساء : ٤٨]

“আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করার অপরাধ ক্ষমা করেন না। তা ব্যতীত অন্য যে কোনো অপরাধ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন”। [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৪৮]

যদি জীবিত থাকে তবে তার কাছ থেকে যাকাত গ্রহণ করা হবে, আর হারামে পতিত হওয়ায় তাকে তা‘জির (অনির্ধারিত শাস্তি) প্রদান করা হবে।

আল্লাহ তা‘আলা যাকাত অস্বীকারকারীকে নিম্নের বাণী দ্বারা সাবধান করেছেন,

﴿وَٱلَّذِينَ يَكۡنِزُونَ ٱلذَّهَبَ وَٱلۡفِضَّةَ وَلَا يُنفِقُونَهَا فِي سَبِيلِ ٱللَّهِ فَبَشِّرۡهُم بِعَذَابٍ أَلِيمٖ ٣٤ يَوۡمَ يُحۡمَىٰ عَلَيۡهَا فِي نَارِ جَهَنَّمَ فَتُكۡوَىٰ بِهَا جِبَاهُهُمۡ وَجُنُوبُهُمۡ وَظُهُورُهُمۡۖ هَٰذَا مَا كَنَزۡتُمۡ لِأَنفُسِكُمۡ فَذُوقُواْ مَا كُنتُمۡ تَكۡنِزُونَ ٣٥ ﴾ [التوبة: ٣٤، ٣٥]

“আর যারা সোনা রূপা পুঞ্জীভূত করে রাখে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সংবাদ প্রদান করুন। যেদিন জাহান্নামের আগুনে তা উত্তপ্ত করা হবে এবং তা দ্বারা তাদের ললাট, পার্শ্ব ও পৃষ্ঠদেশে দাগ দেওয়া হবে। (এবং সেদিন বলা হবে) এটা তো তা-ই যা তোমরা তোমাদের নিজেদের জন্য পুঞ্জীভূত করে রেখেছিলে”। [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ৩৪-৩৫]

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«ما من صاحب كنـز لا يؤدي زكاته إلا أحمي عليه في نار جهنم، فيجعل صفائح، فيكوى بها جنباه وجبينه حتى يحكم الله بين عباده في يوم كان مقداره خمسين ألف سنة ثم يرى سبيله إما إلى الجنة وإما إلى النار»

“মালের মালিক যাকাত আদায় না করলে সে মালকে জাহান্নামের আগুনে গরম করে তক্তা বানানো হবে, তারপর তা দিয়ে তার পার্শ্বদ্বয় ও ললাটে দাগ দিতে থাকবে। আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মাঝে ফায়সালা করা পর্যন্ত ঐ দিনে, যে দিন পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান হবে। তারপর সে জান্নাতী হলে জান্নাতের পথ আর জাহান্নামী হলে জাহান্নামের পথ দেখবে”।[2]

৪- যাকাত ফরয হওয়ার শর্ত:

যাকাত ফরয হওয়ার জন্য পাঁচটি শর্ত রয়েছে,

প্রথম শর্ত: ইসলাম, সুতরাং কাফিরের ওপর যাকাত ফরয নয়। দ্বিতীয় শর্ত: স্বাধীন, অধিকাংশ বিদ্যানগণের নিকট দাসের মালে যাকাত

ফরয নয়। অনুরূপ মুকাতাব তথা চুক্তিবদ্ধ কৃতদাস মালের ওপর যাকাত ফরয নয়। কারণ, তার ওপর এক দেরহাম আদায় অবশিষ্ট থাকলেও সে দাস হিসাবে গণ্য।

তৃতীয় শর্ত: নিসাবের মালিক হওয়া, আর যদি মাল নিসাব পূর্ণ না হয়, তবে তাতে যাকাত ফরয নয়।

চতুর্থ শর্ত: মালের পূর্ণ মালিক হওয়া, আর তাই নিম্নোক্ত ক্ষেত্রসমূহে যাকাত ফরয নয়:

মুকাতাবের দাঈন বা ঋণে যাকাত ফরয নয়।

বন্টনের পূর্বে মুদারিব অর্থাৎ মুদারাবা (যৌথ ব্যবসায়) লেন-দেনে অংশ গ্রহণকারীর লভ্যাংশে যাকাত ফরয নয়।

অসচ্ছল ব্যক্তির ওপর যে ঋণ রয়েছে তা অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত তাতে যাকাত ফরয নয়।

আর যে মাল কল্যাণ ও পূণ্যের পথে যেমন মুজাহিদের, মসজিদের, বসবাসের ও অনুরূপ খাতে ওয়াক্ফ তাতে যাকাত ফরয নয়।

পঞ্চম শর্ত: এক বছর অতিবাহিত হওয়া। এক বছর অতিবাহিত না হওয়ার আগ পর্যন্ত কোনো মালেই যাকাত ফরয নয়। তবে জমি থেকে উৎপন্ন ফসল ও ফল-মূল ছাড়া। কারণ, তার যাকাত ফরয হবে তা কাটার ও পাড়ার সময়।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَءَاتُواْ حَقَّهُۥ يَوۡمَ حَصَادِهِۦۖ١٤١﴾ [الانعام: ١٤١]

“এবং ফসলের হক্ব আদায় কর তা কাটার দিবসে”। [সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ১৪১]

আর খনিজ সম্পদ ও রিকায (মাটিতে পুঁতে রাখা) সম্পদের যাকাতের বিধান জমি থেকে উৎপন্ন ফসল ও ফলের যাকাতের বিধানের ন্যায়, কারণ, তা জমি থেকে সংগৃহিত মাল।

গৃহপালিত পশুর এবং ব্যবসার লভ্যাংশের ওপর বছর অতিবাহিত হওয়া গণ্য হবে মূলের ওপর বছর অতিবাহিত হওয়ার ন্যায়। তাই গৃহপালিত পশুর উৎপাদিত ও ব্যবসার লভ্যাংশকে তার মূলধনের সাথে মিলাবে এবং নিসাব পূর্ণ হলে তার যাকাত দিবে।

আর যাকাত ফরয হওয়ার জন্য প্রাপ্তবয়স্ক ও জ্ঞানবান হওয়া শর্ত নয়। তাই অধিকাংশ বিদ্যানগণের নিকট বাচ্চা ও পাগলের মালে যাকাত ফরয হবে।

৫- যাকাত ফরয যোগ্য সম্পদ:

পাঁচ শ্রেণির মালে যাকাত ফরয হয়:

এক: সোনা, রূপার ও অনুরূপভাবে তার স্থলাভিষিক্ত প্রচলিত কাগজের মুদ্রার ওপর যাকাত ফরয:

আর তাতে যাকাতের পরিমাণ হলো রুবু‘উল ‘উশর (চল্লিশ ভাগের একভাগ)। আর রুব‘উল ‘উশরের পরিমাণ হলো শতকরা আড়াই ভাগ। এক বছর অতিবাহিত ও নিসাব পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত তাতে যাকাত ফরয হবে না।

সোনার নিসাবের পরিমাণ হলো বিশ মিছকাল। আর এক মিছকালের ওজন (৪.২৫) গ্রাম। অতএব, সোনার নিসাব হলো (৮৫) গ্রাম।

রূপার নিসাবের পরিমাণ হলো দু’শত দিরহাম। আর এক দিরহামের পরিমাণ হলো (২.৯৭৫)। সুতরাং রূপার নিসাব হলো (৫৯৫) গ্রাম।

তবে বর্তমান কাগজের মুদ্রা তার নিসাবের পরিমাণ হলো, এক বছর অতিবাহিত কালে যাকাত বের করার সময় তার মূল্য পঁচাশি (৮৫) গ্রাম সোনার অথবা পাঁচশত পঁচানব্বই (৫৯৫) গ্রাম রূপার সমান হতে হবে। এ জন্য সোনা ও রূপার নিসাবের পরিমাণের তুলনায় বর্তমান কাগজের মুদ্রার নিসাব তার দর-মান কম-বেশি হওয়ার কারণে ভিন্ন ভিন্ন হয়।

তাই কারও কাছে তার যে কাগজের মুদ্রা রয়েছে তা দিয়ে যদি সে পূর্বে বর্ণিত সোনা বা রূপার পরিমাণে যে কোনো একটি পরিমাণ ক্রয় করতে সক্ষম হয় বা তার চাইতে বেশি হয় তবে তাতে যাকাত ফরয হবে, তার নাম যাই হোক না কেন রিয়াল হোক বা দিনার হোক বা ফ্রাঙ্ক হোক বা ডলার হোক বা অন্য আরো যে কোনো নাম হোক। আর তার গুণাগুণ যাই হোক না কেন কাগজের মুদ্রা হোক বা খনিজ পদার্থ হোক, বা অন্য আরো কিছু হোক।

আরো প্রসিদ্ধ কথা হলো যে, মুদ্রার দর কোনো কোনো সময় পরিবর্তন হয়। তাই তাতে যখন যাকাত ফরয হবে তখন যাকাতদাতার তার মূল্যের প্রতি লক্ষ্য করা উচিৎ হবে। আর তা হলো তাতে এক বছর অতিবাহিত হওয়া। আর যদি কোনো মাল নিসাবের চাইতে বেশি হয় তবে সেই মাল থেকে নিসাব অনুসারে যাকাত বের করতে হবে ।

এর দলীল হলো, আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীস। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«إذا كانت لك مائتا درهم وحال عليها الحول ففيها خمسة دراهم، وليس عليك شيء حتى يكون لك عشرون ديناراً وحال عليها الحول ففيها نصف دينار، فما زاد فبحساب ذلك، وليس في مال زكاة حتى يحول عليه الحول».

“তুমি যদি দুই শত দিরহামের মালিক হও আর তাতে যদি এক বছর অতিবাহিত হয়। তবে তা যাকাতের নির্ধারিত পরিমাণ হবে পাঁচ দিরহাম। যদি তোমার নিকট বিশ দিনার থাকে আর তা এক বছর অতিবাহিত হয়, তবে তাতে অর্ধ দিনার যাকাত দিতে হবে। আর এর চাইতে কম মালে যাকাত ফরয হবে না। সুতরাং এ পরিমাণের বেশি হলে এ অনুপাতে যাকাত দিতে হবে। আর কোনো মালেই যাকাত ফরয হবে না এক বছর অতিবাহিত হওয়ার আগ পর্যন্ত”।[1]

অলঙ্কার-গহনা যদি জমা ও ভাড়া দেওয়ার জন্য তৈরি করে রাখা হয় তবে তাতে যাকাত ফরয হবে। এতে কোনো দ্বিমত নেই। আর তা যদি ব্যবহারের জন্য তৈরি করে রাখা হয় তবে তাতে ফকীহগণের দু’মতের গ্রহণযোগ্য মতে যাকাত ফরয হবে। কারণ, সোনা রূপার যাকাত ফরয হওয়ার ব্যাপারে যে সকল দলীল বর্ণিত হয়েছে তা আম বা ব্যাপক।

ইমাম আবু দাউদ, নাসাঈ ও তিরমিযী ‘আমর ইবন শু‘আইব তার পিতা হতে, পিতা তার দাদা থেকে বর্ণনা করেছেন,

«أن امرأة أتت النبي r ومعها ابنة لها وفي يدي بنتها مسكتان غليظتان من ذهب، فقال لها: أتعطين زكاة هذا ؟ قالت: لا، قال:(أيسرك أن يسورك الله بهما يوم القيامة سوارين من نار) فخلعتهما وألقتهما إلى النبي r، وقالت: هما لله ولرسوله».

“জনৈক মহিলা তার মেয়েসহ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আসলো। তার মেয়ের দু’ হাতে দু’টি সোনার মোটা চুড়ি ছিল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, তুমি কি এর যাকাত দাও? সে বলল, না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি কি ভালোবাস যে এর বিনিময়ে কিয়ামাতের দিন আল্লাহ তোমাকে আগুনের দু’টি চুড়ি পরাবেন? সাথে সাথে মহিলাটি চুড়ি দু’টি খুলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে রাখল এবং বলল, এ চুড়ি দু’টি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্য”।

আবু দাউদ ও অন্যান্যরা ‘আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণনা করেছেন,

«دخل علىّ رسول الله r فرأى في يدي فتخات من ورق فقال: ما هذا يا عائشة؟ فقالت: صنعتهن أتزين لك يا رسول الله، قال: أتؤدين زكاتهنّ؟ قلت: لا، أو ما شاء الله، قال: هو حسبك من النار».

“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার নিকট প্রবেশ করে আমার হাতে অনেকগুলো রূপার আংটি দেখে বললেন, হে আয়েশা এগুলো কি? অতঃপর আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, এগুলো আমি তৈরি করেছি আপনার সামনে সৌন্দর্য প্রকাশ করার জন্য। তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি কি এগুলোর যাকাত প্রদান কর? আমি বললাম, না অথবা আল্লাহ যা চেয়েছেন (তা বলেছি)। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এর যাকাত না দেওয়াটাই তোমার জাহান্নামে যাওয়ার জ্যন যথেষ্ট”।

খনিজ-জাত ধাতব দ্রব্যের ও সোনা ছাড়া তৈরি অলঙ্কার যেমন, মুক্তা, মতি ইত্যাদিতে কোনো ফকীহগণের নিকটেও যাকাত ফরয নয়। তবে যদি ব্যবসার জন্য তৈরী করা হয় তাহলে ব্যবসার জন্য তৈরী মালের যাকাতের ন্যায় যাকাত দিতে হবে।

দুই: চতুষ্পদ জন্তু:

আর তা হলো, উট, গরু, ছাগল। আর তাতে যাকাত ফরয হবে যখন তা ‘সায়েমা’ হবে, আর সায়েমা এ প্রাণীকে বলে যা চারণভূমিতে লালিত-পালিত হয়; সারা বছর বা বছরের অধিকাংশ দিনগুলোতে। কারণ, পূর্ণ অংশের যে বিধান তা অধিকাংশের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

এর দলীল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী,

«في كل إبل سائمة صدقة».

“প্রত্যেক ‘সায়েমা’ উটে যাকাত রয়েছে।”[2]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আরো বাণী হলো,

«في صدقة الغنم في سائمتها».

“ছাগলের যাকাত কেবলমাত্র সায়েমা ছাগলে”।[3] যখন নিসাব পূর্ণ হবে ও এক বছর অতিবাহিত হবে।

গৃহপালিত পশুর যাকাতের তালিকা

IMG 20210615 110328 1 যাকাত

আর যদি উটের সংখ্যা ১২০টির ওপর হয় তাহলে প্রতি ৪০টিতে দু’বছরের একটি মাদা উট। আর প্রতি ৫০টিতে তিন বছরের একটি মাদা উট দিতে হবে তবে অধিকাংশ ফকীহগণের নিকট।

IMG 20210615 111125 যাকাত

আর যদি গরুর সংখ্যা ৭৯টির ওপর হয় তাহলে প্রতি ৩০টিতে এক বছরের একটি বাছুর আর প্রতি ৪০টিতে এক বছরের একটি বক্না দিতে হবে।

IMG 20210615 111307 যাকাত

আর যদি ছাগলের সংখ্যা ৩০০ শত এর বেশি হয় তাহলে প্রতি ১০০ শতে একটি ছাগল দিতে হবে।

আর এর দলীল হলো, আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীস:

«أن أبا بكر كتب له هذا الكتاب لما وجهه إلى البحرين: بسم الله الرحمن الرحيم، هذه فريضة الصدقة التي فرض رسول الله r على المسلمين والتي أمر الله بها رسوله، فمن سُئِلها من المسلمين على وجهها فليعطها ومن سئل فوقها فلا يعط، في أربع وعشرين من الإبل فما دونها من الغنم من كل خمس شاة، فإذا بلغت خمساً وّعشرين إلى خمسٍ وثلاثين ففيها بنت مخاضٍ أنثى فإذا بلغت ستة وّثلاثين إلى خمس وأربعين ففيها بنت لبون أنثى، فإذا بلغت ستا وأربعين إلى ستين ففيها حقة، طروقة الجمل، فإذا بلغت واحدة وستين إلى خمس وسبعين ففيها جذعة، فإذا بلغت يعني ستا وسبعين إلى تسعين ففيها بنتا لبون، فإذا بلغت إحدى وتسعين إلى عشرين ومائة ففيها حقتان طروقتا الجمل، فإذا زادت على عشرين ومائة ففي كل أربعين بنت لبون وفي كل خمسين حقة، ومن لم يكن معه إلا أربع من الإبل فليس فيها صدقة إلا أن يشاء ربها، فإذا بلغت خمسا من الإبل ففيها شاة، وفي صدقة الغنم في سائمتها إذا كانت أربعين إلى عشرين ومائة شاة فإذا زادت على عشرين ومائة إلى مائتين شاتان، فإذا زادت على ثلاثمائة في كل مائة شاة، فإذا كانت سائمة الرجل ناقصة من أربعين شاة شاة واحدة فليس فيها صدقة إلا أن يشاء ربها».

“আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু যখন আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বাহরাইনে গভর্নর হিসেবে পাঠিয়েছিলেন, তখন তার নিকট এ পত্র লিখেছিলেন, বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফরয সাদকা (যাকাত) সম্পর্কে মুসলিমদের ওপর যা নির্ধারণ করেছেন এবং সে সম্পর্কে আল্লাহ তাঁর রাসূলকে যা আদেশ করেছেন তা এ কাজেই মুসলিমদের যার কাছেই (যাকাত) বিধি অনুসারে এটা চাওয়া হবে সে যেন তা প্রদান করে। কিন্তু যার নিকট তার অধিক (অর্থাৎ নির্দিষ্ট পরিমাণের অধিক) দাবী করা হবে সে যেন (অতিরিক্ত) প্রদান না করে। চব্বিশটি উট কিংবা তার কম হলে ছাগল দিতে হবে (এ নিয়মে যে) প্রতি পাঁচটি উটের জন্য একটি ছাগল। উটের সংখ্যা যখন পঁচিশ থেকে পঁয়ত্রিশ হবে তখন তাতে দু’ বছরের একটি মাদা উট দিতে হবে। যখন তা ছত্রিশ থেকে পঁয়তাল্লিশে পৌঁছবে তখন তাতে তিন বছরের একটি মাদা উট দিতে হবে। যখন তা ছিচল্লিশ থেকে ষাটে পোঁছবে তখন তাতে গর্ভধারণের উপযোগিনী একটি চার বছরের মাদা উট দিতে হবে। যখন তা (উটের সংখ্যা) একষট্টি থেকে পঁচাত্তর হবে তখন তাতে পাঁচ বছরের একটি মাদা উট দিতে হবে। যখন তা ছিয়াত্তর থেকে নব্বই হবে তখন তাতে দু’টি তিন বছরের মাদা উট দিতে হবে। যখন তা একানব্বই থেকে একশ বিশ হবে তখন তাতে গর্ভধারণের উপযোগিনী দু’টি চার বছরের মাদা উট দিতে হবে। যখন উটের সংখ্যা একশ বিশের ঊর্ধে হবে তখন প্রতি চল্লিশটির জন্য একটি তিন বছরের মাদা উট এবং প্রতি পঞ্চাশটি উটের জন্য একটি চার বছরের মাদা উট দিতে হবে। যদি কারো নিকট মাত্র চারটি উট থাকে তবে তাতে যাকাত দিতে হবে না। হাঁ যদি মালিক স্বেচ্ছায় (নফল সাদ্কা হিসেবে) কিছু প্রদান করে (তবে তাতে ক্ষতি নেই)। কিন্তু যখন উটের সংখ্যা পাঁচ হবে তখন তাতে একটি ছাগল দিতে হবে। যেসব ছাগল বিচরণ করে বেড়ায় তাতে যাকাত দিতে হবে। চল্লিশ থেকে একশ বিশটি পর্যন্ত একটি ছাগল, একশ বিশটির অধিক হলে দু’শ পর্যন্ত দু’টি ছাগল, দু’শতের অধিক হলে তিনশ পর্যন্ত তিনটি ছাগল এবং যদি তিনশ এর অধিক হয় তবে প্রতি একশটির জন্য একটি ছাগল দিতে হবে। বিচরণ করে খায় এমন ছাগলের সংখ্যা যদি কারো নিকট চল্লিশের একটিও কম থাকে তবে তাতে যাকাত দিতে হবে না। হাঁ, মালিক যদি স্বেচ্ছায় কিছু প্রদান করে (ক্ষতি নেই)”।[1]

আরো দলীল হলো, মু‘আয ইবন জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহু এর হাদীস,

«أن النبي r بعثه إلى اليمن فأمره أن يأخذ من كل ثلاثين بقرة تبيعاً أو تبيعة، وفي كل أربعين مسنة».

“নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে (মু‘আযকে) ইয়েমেন পাঠিয়েছিলেন। প্রতি ত্রিশটি গরু থেকে একটি বাছুর বা বক্না গ্রহণের আদেশ দিয়েছিলেন। আর প্রতি চল্লিশটি গরু থেকে দু’বছরের একটি বক্না গ্রহণের আদেশ দিয়েছিলেন”।[2]

যখন নিসাব গণনা করবে তখন গৃহপালিত পশুর উৎপন্ন বস্তু তার আসলের সাথে মিলাবে। আর যদি তাছাড়া গৃহপালিত পশুর নিসাব পূর্ণ না হয় তাহলে নিসাব পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত, তার দ্বারা একবছর অতিবাহিত গণ্য করা হবে।

আর যদি চতুষ্পদ জন্তু ব্যবসার জন্য লালিত-পালিত হয় তাহলে ব্যবসার মালের যাকাতের ন্যায় তার যাকাত দিতে হবে। আর যদি তা ব্যবহারের বা উন্নয়নের জন্য লালিত-পালিত হয়, তাহলে তাতে যাকাত ফরয হবে না। কারণ, (এ ব্যাপারে) আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর হাদীস বর্ণিত আছে,

«ليس على المسلم في عبده ولا فرسه صدقة».

“মুসলিম ব্যক্তির দাসের ও ঘোড়ার ওপর যাকাত নেই”।[3]

তিন: ফসল ও ফলাফল

অধিকাংশ ফকীহের নিকট উৎপাদিত ফসলে যাকাত ফরয হবে নিসাব পূর্ণ হলে। আর তাদের নিকট তার নিসাব হলো পাঁচ ‘ওয়াসাক’। কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«ليس فيما دون خمسة أوسق صدقة».

“পাঁচ ‘ওয়াসাক’ এর কমে যাকাত ফরয নয়”।[4]

আর এক ‘ওয়াসাক’ হচ্ছে, ষাট স্বা‘আ। সুতরাং নিসাবের পরিমাণ হলো তিনশত স্বা‘আ। ভালো গমের দ্বারা এ নিসাবের পরিমাণ হবে (৬৫২.৮০০) ছয়শত বায়ান্ন কিলোগ্রাম ও আটশত গ্রাম।

ফসল ও ফলের যাকাত ফরয হওয়ার জন্য এক বছর অতিবাহিত হওয়া শর্ত নয়। কারণ, এ ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলার বাণী রয়েছে,

﴿وَءَاتُواْ حَقَّهُۥ يَوۡمَ حَصَادِهِۦۖ ١٤١﴾ [الانعام: ١٤١]

“এবং তার (ফসলের) হক্ব আদায় কর তা কাটার দিবসে”। [সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ১৪১]

যে সকল ফসল বিনা পরিশ্রমে পানি সরবরাহ হয়ে উৎপন্ন হয়েছে তাতে যাকাতের নির্ধারিত পরিমাণ হলো, দশ ভাগের এক ভাগ আর যে সকল ফসল পরিশ্রমের দ্বারা পানি সরবরাহ হয়ে উৎপন্ন হয়েছে তাতে নির্ধারিত পরিমাণ হলো, বিশ ভাগের এক ভাগ।

কারণ, এ ব্যাপারে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস রয়েছে,

«فيما سقت السماء والأنهار والعيون أو كان عثرياً العشر، وفيما سقي بالسواني أو النضح نصف العشر».

“যেসব ভূমি বৃষ্টি ও ঝর্ণার পানি দ্বারা অথবা মাটি থেকে গাছের মূলের সাহায্যে স্বাভাবিকভাবে পানি চুষে নেওয়ার কারণে আবাদ হয়, তাতে উ‘শর (এক দশমাংশ) ফরয হবে। আর যে সব ভূমিতে পানি সেচ করতে হয় তাতে বিশ ভাগের একভাগ ফরয হবে (এটাই ফসলের যাকাত)”।[5]

চার: ব্যবসা সামগ্রী

মুসলিম ব্যক্তি ব্যবসার জন্য যে মাল প্রস্তুত করেছে তাকে ব্যবসা সামগ্রী বলে। তা যে কোনো শ্রেণির মাল হোক না কেন যাকাতের সাধারণ সম্পদ হিসাবে গণ্য হবে। নিসাব পূর্ণ হলে তাতে যাকাত ফরয হবে। ব্যবসা সামগ্রীর মূল্য সোনা ও রূপার নিসাবের সমান হওয়া গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হবে। আর তা হলো বিশ মিছকাল যা পঁচাশি গ্রাম সোনার সমতুল্য। অথবা দু’শত দিরহাম যা পাঁচশত পঁচানব্বই গ্রাম রূপার সমতুল্য।

সোনা ও রূপা থেকে ব্যবসা সামগ্রীর পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে ফকীরদের অবস্থার প্রতি লক্ষ্য রেখে। ব্যবসায়ী পণ্যের ক্ষেত্রে ক্রয় মূল্য ধরা হবে না বরং এক বছর অতিবাহিত হওয়ার পর যাকাত বের করার সময়ে বাজার মূল্য ধরা হবে।

পূর্ণ মূল্যের চল্লিশ ভাগের একভাগ যাকাত বের করা ফরয হবে। ব্যবসার লভ্যাংশ তার আসল মালের সাথে মিলাবে, যদি নিসাব পূর্ণ হয়ে যায় তাহলে তার যাকাত দানে নতুন বছরের অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। আর যদি লভ্যাংশ ছাড়া আসল মালে নিসাব পূর্ণ না হয় তাহলে নিসাব পূর্ণ হওয়ার সময় থেকে বছর শুরু/গণ্য হবে।

পাঁচ: খনিজ সম্পদ ও রিকায বা মাটিতে পুঁতে রাখা মাল

(ক) খনিজ সম্পদ

খনিজ সম্পদ ঐ সকল বস্তু যা জমি থেকে নির্গত হয়, তথায় জন্ম নেয় যা জমির মূল্যবান উৎপন্ন নয় এবং উদ্ভিদও নয়, যেমন সোনা-রূপা, লৌহ, তামা, ইয়াকুত পাথর ও পেট্রোল ইত্যাদি। আর তাতে যাকাত ফরয। কারণ, এ ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলার ব্যাপক বাণী রয়েছে,

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ أَنفِقُواْ مِن طَيِّبَٰتِ مَا كَسَبۡتُمۡ وَمِمَّآ أَخۡرَجۡنَا لَكُم مِّنَ ٱلۡأَرۡضِۖ ٢٦٧﴾ [البقرة: ٢٦٧]

“হে মুমিনগণ! তোমরা যা উপার্জন করেছ এবং আমরা তোমাদের জন্য জমি থেকে যা উৎপন্ন করেছি তার মধ্যে যা পবিত্র তা তোমরা ব্যয় কর”। [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ২৬৭]

খনিজ সম্পদ যে আল্লাহ তা‘আলা জমি থেকে নির্গত করেছেন এতে কোনো সন্দেহ নেই। অধিকাংশ ফকীহের নিকট খনিজ সম্পদে যাকাত ফরয হওয়ার জন্য নিসাব পূর্ণ হওয়া শর্ত। আর খনিজ সম্পদে চল্লিশ ভাগের এক ভাগ যাকাত আদায় করা ফরয। সোনা-রূপার যাকাতের পরিমাণের ওপর ক্বিয়াস বা তুলনা করে। তাতে এক বছর অতিবাহিত হওয়া শর্ত নয়। তা যখন সংগ্রহ হবে তখনই তাতে যাকাত ফরয হবে।

(খ) রিকায-মাটিতে পুঁতে রাখা ধনসম্পদ

জাহেলি যুগের মাটিগর্ভে-গচ্ছিত সম্পদ, অথবা পূর্ববর্তী কাফির সম্প্রদায়ের সম্পদ যদিও জাহেলি না হয় আর তার ওপর বা তার কিছুর ওপর কুফুরের নির্দশন হয় যেমন তাদের নাম, তাদের রাজাদের নাম, তাদের ছবি, তাদের পৃষ্ঠদেশ ও শুধু তাদের প্রতিমার বক্ষদেশ থাকে (তা হলেও তা রিকায হবে)।

আর যদি তার ওপর বা তার কিছুর ওপর মুসলিমদের নিদর্শন থাকে, যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নাম বা মুসলিমদের খলীফাদের কারও নাম বা কুরআন কারীমের আয়াত, তা হলে তা (লুক্বাতা) পথে পড়ে থাকা বস্তু হিসাবে গণ্য হবে।

আর যদি তাতে কোনো নির্দশন না থাকে, যেমন পাত্র, স্ত্রীলোকের অলঙ্কার সাজ-সজ্জা, স্বর্ণের বিস্কুট তা হলেও তা লুক্বাতা হবে আর তা প্রচার করার আগ পর্যন্ত কেউই তার মালিক হবে না। কারণ, তা হলো মুসলিম ব্যক্তির মাল আর তা থেকে তার মালিকানা নষ্ট হয়ে যায় নি। আর রিকাযে (মাটি গর্ভে গচ্ছিত রাখা সম্পদে) এক-পঞ্চমাংশ যাকাত ফরয।

কারণ আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীসে আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«وفي الركاز الخمس».

“আর ‘রিকাযে’ এক-পঞ্চমাংশ যাকাত দিতে হবে”।

অধিকাংশ ফকীহের নিকট রিকায, কম হোক বা বেশি হোক তাতে যাকাত ফরয হবে। তাদের নিকট তা বন্টনের খাত হলো ‘ফাই’ (‘যুদ্ধবিহীন অমুসলিম শত্রুর সম্পদ যা মুসলিমরা অর্জন করে’ সেটার) বন্টনের খাত। যে ব্যক্তি তা পাবে সে বাকী রিকাযের মালিক হবে, এতে ফকীহগণের কোনো মতানৈক্য নেই। কারণ, উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু অবশিষ্ট রিকায তার প্রাপককে দিয়েছিলেন। 

৬- যাকাত বন্টনের খাতসমূহ:

আট শ্রেণির লোক যাকাত পাওয়ার হক্বদার। তার তালিকা নিম্নে প্রদত্ত হলো:

প্রথমত: ফকীর: আর তারা হলেন ঐ সকল লোক যাদের কাছে জীবন যাপনের কোনো কিছুই নেই, অথবা কিছুটা আছে, তাদেরকে পূর্ণ বছরের জন্য যথেষ্ট হয় এ পরিমাণ যাকাত থেকে দেওয়া যাবে।

দ্বিতীয়ত: মিসকীন: যাদের নিকট তাদের প্রয়োজনের অর্ধেক বা অর্ধেকের চেয়ে কিছু বেশি খাবার রয়েছে। এ অর্থে মিসকীনের অবস্থা ফকীরের অবস্থার চেয়ে ভালো। তাদেরকে তাদের পুরা বছরের জন্য যথেষ্ট হয় এ পরিমাণ যাকাত দেওয়া যাবে।

তৃতীয়ত: যাকাত আদায়কারী: আর তারা হলেন, ঐ সমস্ত কর্মচারী যারা যাকাতদাতাদের নিকট থেকে তা সংগ্রহ ও সংরক্ষণ এবং নেতার আদেশে তার হক্বদারের নিকট বিতরণ করেন। তাদেরকে তাদের কর্মের পারিশ্রমিক হিসাবে যাকাত প্রদান করা যাবে।

চতুর্থত: যাদের অন্তর জয় করার উদ্দেশ্য হবে, আর তারা দু’ শ্রেণির লোক: কাফির এবং মুসলিম।

৬- যাকাত বন্টনের খাতসমূহ:

আট শ্রেণির লোক যাকাত পাওয়ার হক্বদার। তার তালিকা নিম্নে প্রদত্ত হলো:

প্রথমত: ফকীর: আর তারা হলেন ঐ সকল লোক যাদের কাছে জীবন যাপনের কোনো কিছুই নেই, অথবা কিছুটা আছে, তাদেরকে পূর্ণ বছরের জন্য যথেষ্ট হয় এ পরিমাণ যাকাত থেকে দেওয়া যাবে।

দ্বিতীয়ত: মিসকীন: যাদের নিকট তাদের প্রয়োজনের অর্ধেক বা অর্ধেকের চেয়ে কিছু বেশি খাবার রয়েছে। এ অর্থে মিসকীনের অবস্থা ফকীরের অবস্থার চেয়ে ভালো। তাদেরকে তাদের পুরা বছরের জন্য যথেষ্ট হয় এ পরিমাণ যাকাত দেওয়া যাবে।

তৃতীয়ত: যাকাত আদায়কারী: আর তারা হলেন, ঐ সমস্ত কর্মচারী যারা যাকাতদাতাদের নিকট থেকে তা সংগ্রহ ও সংরক্ষণ এবং নেতার আদেশে তার হক্বদারের নিকট বিতরণ করেন। তাদেরকে তাদের কর্মের পারিশ্রমিক হিসাবে যাকাত প্রদান করা যাবে।

চতুর্থত: যাদের অন্তর জয় করার উদ্দেশ্য হবে, আর তারা দু’ শ্রেণির লোক: কাফির এবং মুসলিম।

কাফিরকে যাকাত তখন দেওয়া হবে যখন তার ইসলাম গ্রহণ করার প্রত্যাশা করা যাবে, বা তাকে যাকাত দেওয়ার কারণে মুসলিমদের ওপর থেকে তার অত্যাচার অনিষ্ট বন্ধ হবে। আরো অনুরূপ কারণে।

আর মুসলিম ব্যক্তিকে যাকাত দেওয়া হবে তার ইসলাম গ্রহণকে আরো শক্তিশালী করার জন্য বা তার মত আরও একজনের ইসলাম গ্রহণের আশায়। এর মত অন্য আরো কারণে।

পঞ্চমত: দাসসমূহ, আর তারা হলেন ঐ সমস্ত ‘মুকাতিব’ দাস যাদের কাছে তাদের মালিকের সাথে কৃত চুক্তি পরিশোধের পয়সা নেই। তাই মুকাতিব দাসকে যাকাত থেকে যে পরিমাণ প্রদান করলে সে দাসত্ব থেকে মুক্তি পেতে সামর্থ্যবান হবে সে পরিমাণ তাকে প্রদান করা যাবে।

ষষ্ঠতম: ঋণগ্রস্তদেরকে, আর তারা দু’ ভাগে বিভক্ত: নিজেদের জন্য ঋণগ্রস্ত, অন্যের কারণে ঋণগ্রস্ত।

নিজের জন্য ঋণগ্রস্ত হচ্ছে, ঐ ব্যক্তি যে নিজের অভাবের কারণে ঋণ করেছে আর তা পরিশোধে সে সামর্থ্যবান নয়। তাই যাকাত থেকে তাকে যে পরিমাণ দিলে সে ঋণ পরিশোধ করতে পারবে সে পরিমাণ তাকে প্রদান করা যাবে।

অন্যের কারণে ঋণগ্রস্ত হচ্ছে, ঐ ব্যক্তি যে পরস্পরের মাঝে সংশোধন-ফায়সালা করার জন্য ঋণী হয়েছে। তাই সে ঋণী হলে যাকাত থেকে যে পরিমাণ দিলে সে ব্যাপারে তার সহযোগিতা হবে, সে পরিমাণ তাকে প্রদান করা যাবে।

সপ্তমত: যারা আল্লাহর রাস্তায় রয়েছেন তাদেরকে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, যারা জিহাদে রয়েছেন। সুতরাং যে সকল মুজাহিদদের বেতন রাষ্ট্রিয় কোষাগার থেকে নির্ধারিত নেই তাদেরকে যাকাত প্রদান করা যাবে।

অষ্টমত: মুসাফির, আর তা হচ্ছে ঐ মুসাফির, যার সব কিছু রাস্তায় শেষ হয়ে গেছে। তার কাছে তার দেশে পৌঁছার মতো খরচ নেই। সুতরাং যাকাত থেকে যে পরিমাণ তাকে দিলে সে তার দেশে পৌঁছতে পারবে সে পরিমাণ যাকাত তাকে প্রদান করা যাবে।

আল্লাহ তা‘আলা এ শ্রেণিগুলো তাঁর বাণীতে উল্লেখ করেছেন,

﴿إِنَّمَا ٱلصَّدَقَٰتُ لِلۡفُقَرَآءِ وَٱلۡمَسَٰكِينِ وَٱلۡعَٰمِلِينَ عَلَيۡهَا وَٱلۡمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمۡ وَفِي ٱلرِّقَابِ وَٱلۡغَٰرِمِينَ وَفِي سَبِيلِ ٱللَّهِ وَٱبۡنِ ٱلسَّبِيلِۖ فَرِيضَةٗ مِّنَ ٱللَّهِۗ وَٱللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٞ ٦٠﴾ [التوبة: ٦٠]

“বস্তুতঃ সাদকা ফকীরদের, মিসকীনদের, তা আদায়কারীদের, যাদের অন্তর জয় করার উদ্দেশ্য হবে তাদের, দাস মুক্তির, ঋণগ্রস্তদের, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারী ও মুসাফিরদের জন্য। আল্লাহর কর্তৃক ফরয। আল্লাহ সর্বজ্ঞ প্রজ্ঞাময়”। [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ৬০]

৭- যাকাতুল ফিতর:

(ক) যাকাতুল ফিত্বর বিধিবদ্ধ করার হিকমাত বা রহস্যঃ

সিয়াম পালনকারীদেরকে অনর্থক কথা, বাজে কাজ ও তার আনুসাঙ্গিক কর্ম থেকে পবিত্র করার জন্য যাকাতুল ফিত্বর প্রবর্তন করা হয়েছে।

এ ছাড়াও মিসকীনদের খাদ্য হিসাবে ও তাদেরকে ঈদের দিন মানুষের কাছে চাওয়া থেকে মুক্ত রাখার জন্যও তা চালু করা হয়েছে।

ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমার হাদীসে রয়েছে, তিনি বলেন,

«فرض رسول الله r زكاة الفطر طهرة للصائم من اللغو والرفث وطعمة للمساكين».

“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যাকাতুল ফিত্বর ফরয করেছেন, সিয়াম পালনকারীদেরকে অনর্থক কথা বা বাজে কাজ ও তার আনুসাঙ্গিক কাজ থেকে পবিত্র করার জন্য ও মিসকীনদের খাদ্য হিসাবে”।[1]

(খ) যাকাতুল ফিতর-এর বিধান:

যাকাতুল ফিত্বর প্রত্যেক মুসলিম নর ও নারী, ছোট বড়, স্বাধীন-ও দাস দাসীর ওপর ফরয।

ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুমার হাদীসে রয়েছে, তিনি বলেন,

«فرض رسول الله r زكاة الفطر من رمضان صاعاً من تمر أو صاعاً من شعير على العبد والحرّ، والذكر والأنثى، والصغير والكبير من المسلمين، وأمر بها أن تؤدى قبل خروج الناس إلى الصلاة».

“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রামাদান মাসের যাকাতুল ফিত্বর ফরয করেছেন, খেজুর বা যবের এক স্বা‘আ, দাসের, স্বাধীন ব্যক্তির, পুরুষের, নারীর ছোটদের ও বড়দের ওপর এবং তা আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন ঈদের সালাতের জন্য মানুষের বের হওয়ার পূর্বে”।[2]

যে শিশুর জন্ম হয় নি, পেটে রয়েছে, তার পক্ষ থেকে তা আদায় করা মুস্তাহাব। নিজের, নিজ স্ত্রী ও নিকটবর্তী আত্মীয় যাদের ভরণ পোষণ করা তার দায়িত্ব রয়েছে তাদের পক্ষ থেকে ফিৎরা আদায় করা ফরয।

ফিৎরা শুধুমাত্র তার ওপর ফরয যার খাদ্য ও ভরণ পোষণ করা তার ওপর দায়িত্ব তাদের খাদ্য ঈদের দিন ও রাত্রির জন্য যথেষ্ট হয়ে বেশি হবে।

(গ) ফিৎরার পরিমাণ:

শহরের প্রধান খাদ্য যেমন, গম, যব, খেজুর, কিসমিস-মুনাক্কা, পনির, চাল ও ভুট্টা থেকে যাকাতুল ফিতরের নির্ধারিত পরিমাণ হলো এক স্বা‘আ। আর এক স্বা‘আ প্রায় দু’ কিলো একশত ছিয়াত্তর গ্রাম এর সমান।

আর অধিকাংশ ফকীহগণের নিকট ফিৎরার মূল্য দেওয়া জায়েয নয়। কারণ, তা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা আদেশ দিয়েছেন তার বিপরীত এবং সাহাবাদের আমলের পরিপন্থী।

(ঘ) ফিৎরা আদায় করার সময়:

ফিৎরা আদায় করার দু’টি সময় রয়েছে

(ক) জায়েয সময়: আর তা হলো, ঈদের একদিন বা দু’ দিন আগে আদায় করা।

(খ) উত্তম সময়: আর তা হলো, ঈদের দিনের ফজর উদিত হওয়া থেকে ঈদের সালাত আদায়ের পূর্ব পর্যন্ত ফিৎরা আদায় করা।

কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষদের ঈদের সালাতের জন্য বের হয়ে যাওয়ার আগেই যাকাতুল ফিতর আদায় করার আদেশ দিয়েছিলেন। যাকাতুল ফিতর ঈদের সালাতের পর পর্যন্ত বিলম্ব করা বৈধ নয়।

কেউ যদি তা ঈদের সালাতের পরে আদায় করে তবে তা সাধারণ সাদকা (দান) হিসাবে গণ্য হবে। আর সে এ বিলম্বের কারণে গুনাহগার হবে।

(ঙ) যাকাতুল ফিতর বিতরণের খাত:

যাকাতুল ফিত্বর ফকীর ও মিসকীনদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। কারণ, অন্যদের চাইতে এরাই এর অধিক হক্বদার।

 


[1] হাদীসটি আবূ দাউদ এবং ইবন মাজাহ বর্ণনা করেছেন।

[2] সহীহ বুখারী ও মুসলিম।


[1] সহীহ বুখারী।

[2] হাদীসটি আহমাদ ও আসহাবুস্ সুনান বর্ণনা করেছেন।

[3] হাদীসটি বুখারী ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন।

[4] হাদীসটি বুখারী ও মুসলিম একত্রিতভাবে বর্ণনা করেছেন।

[5] হাদীসটি বুখারী বর্ণনা করেছেন।


[1] হাদীসটি আবূ দাউদ বর্ণনা করেছেন, আর হাদীসটি হাসান।

[2] হাদীসটি আহমাদ, আবু দাউদ ও নাসাঈ বর্ণনা করেছেন।

[3] সহীহ বুখারী।


[1] এ হাদীসটি বুখারী ও মুসলিম উভয়েই ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণনা করেছেন।

[2] হাদীসটি বুখারী ও মুসলিম একত্রিতভাবে বর্ণনা করেছেন, তবে শব্দগুলো মুসলিমের।