চার্চের বিকৃতির এক ঐতিহাসিক আলেখ্য

মুহাম্মাদ আতাউর- রহীম

অনুবাদ: হোসেন মাহমুদ

সম্পাদনা: আবদুল্লাহ শহীদ আবদুর রহমান

যীশু প্রকৃতপক্ষে কে বা কী ছিলেন তা আবিষ্কারের জন্য মানুষ যত বেশি চেষ্টা করতে থাকে ততই তার সম্পর্কে জ্ঞানের স্বল্পতা প্রকট হয়ে দেখা দেয়। তার শিক্ষা কর্মকাণ্ডের লিখিত বিবরণ থাকলেও তিনি আসলে কীভাবে জীবন অতিবাহিত করতেন এবং অন্য লোকদের সাথে তিনি প্রতিদিন কীভাবে কাজকর্ম করতেন, সে ব্যাপারে খুব কমই জানা যায়।

যীশু এবং তার কর্মকান্ড সম্পর্কে বহু লোক বিভিন্ন মত দিয়েছে, কিন্তু সেগুলো বিকৃত। এ সবের মধ্যে কিছু সত্যতা যদিও আছে, কিন্তু একথা সত্য যে, বিভিন্ন সময়ে লিখিত ৪টি গৃহীত গসপেল (বাইবেলের নতুন নিয়ম) পরিবর্তিত ও সেন্সরকৃতই শুধু হয় নি, সেগুলো প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণও নয়। প্রথম গসপেলের রচয়িতা মার্ক (Mark)। এটি লিখিত হয় ৬০-৭৫ সনে। তিনি ছিলেন সেন্ট বার্নাবাসের (St. Barnabas)- এর বোনের পুত্র। মথি (Mathew) ছিলেন একজন ট্যাক্স কালেক্টর (কর আদায়কারী) তথা নিম্নপদস্থ কর্মকর্তা। তিনি যীশুর সাথে ভ্রমণ করেন নি। লূকের (Luke) গসপেল অনেক পরে লিখিত। তাছাড়া মথি ও মার্কের মত তার গসপেলের বর্ণনার উৎস একই। লুক ছিলেন পলের (পৌল-Paul) চিকিৎসক এবং পলের মত তিনিও কখনো যীশুকে দেখেননি। জনের (ইউহোন্না) গসপেলের উৎস ভিন্ন এবং আরো পরে ১শ’ সনের দিকে রচিত। তাকে যীশুর শিষ্য জন (John) মনে করা ভুল হবে, কারণ তিনি ভিন্ন ব্যক্তি। এই গসপেলকে যীশুর জীবনের নির্ভরযোগ্য বিবরণ বলে গণ্য করা উচিৎ হবে কিনা এবং তা পবিত্র গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত হবে কিনা তা নিয়ে দু’শ বছর ধরে উত্তপ্ত বিতর্ক চলেছিল।

বিখ্যাত ‘মরু সাগর পুঁথির’ (Dead Sea Scrolls) আবিষ্কার যীশু যে স্থানে জন্মগ্রহণ করেছিলেন সেখানকার সমাজের প্রকৃত ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে নতুন আলোকপাত করে। বার্নাবাসের গসপেলে অন্যান্য গসপেলগুলোর চেয়ে যীশুর জীবনের অনেক বেশি দিক বর্ণিত হয়েছে এবং যীশু প্রকৃতপক্ষে কি ছিলেন, কুরআন ও হাদীস সে বিষয়টি আরো ব্যাখ্যার মাধ্যমে সুস্পষ্ট করেছে।

আমরা দেখতে পাই যে, যীশু আক্ষরিক অর্থে ‘ঈশ্বরের পুত্র’ ছিলেন না। তার পূর্ববর্তী নবী ইবরাহীম আলাইহিস সালাম ও নবী মূসা আলাইহিস সালাম এবং পরবর্তী নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মতো তিনিও ছিলেন একজন নবী। সকল মানুষের মতো তিনিও খাদ্য গ্রহণ করতেন এবং হাট- বাজারে যেতেন।

আমরা দেখি, অনিবার্যভাবে তিনি সেই সব লোকদের সাথে নিজেকে সংগ্রামরত দেখতে পেয়েছিলেন যাদের স্বার্থ ছিল তার শিক্ষার বিরোধী। তিনি যে প্রত্যাদেশ লাভ করেন সেটা তারা মেনে নেয়নি অথবা সত্য জানা সত্ত্বেও তা উপেক্ষা করে মানুষের চোখে ক্ষমতা লাভ, ধন সম্পদ অর্জন ও খ্যাতি প্রতিপত্তির জন্য তা ব্যবহার করেছে।

আরো দেখা যায়, যীশুর ইহলৌকিক জীবন ইয়াহূদী ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই তার কাহিনি জানতে গেলে সে ইতিহাসের প্রতি দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। যীশু তার সমগ্র জীবনে ছিলেন একজন গোঁড়া ইয়াহূদী ধর্মাচরণকারী। তিনি বহু বছর ধরে পরিবর্তনের শিকার মূসা আলাইহিস সালামের মূল শিক্ষা পুনর্ব্যক্ত ও পুনরুজ্জীবনের জন্য এসেছিলেন।

পরিশেষে আমরা দেখি, যিনি ক্রুশবিদ্ধ হয়েছিলেন তিনি যীশু নন, তারই মত দেখতে অন্য এক ব্যক্তি। এক রোমান কর্মকর্তা লেন্টালাস (Lentutus) যীশুর বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে:

কান পর্যন্ত বাদামি রঙের চুল ছিল তার, সেগুলো ছিল কোঁকড়ানো এবং সে চুলের বাহারিগুচ্ছ নেমে গিয়েছিল কাঁধের উপর, নাজারেনীয়দের মত মাথার মধ্যভাগে ছিল সিঁথি কাটা। তার ভ্রূ ছিল মসৃণ ও স্পষ্ট, কোনো দাগ ও বলিরেখা শূন্য লালচে মুখমণ্ডল। নাক ও মুখ ছিল নিখুঁত। তার ছিল সুদৃশ্য দাড়ি যার রং ছিল মাথার চুলের রঙের মতই এবং তা মধ্যভাগে বিভক্ত ছিল। তার দু’টি চোখ ছিল নীল ধূসর, তাতে অসাধারণভাবে সব অনুভূতির প্রকাশ ঘটত। তার উচ্চতা ছিল মাঝারি, সাড়ে ১৫ মুঠো (Fists) দীর্ঘ। কঠিন অবস্থায়ও তিনি উৎফুল্ল থাকতেন। কোনো কোনো সময় তিনি কাঁদতেন, তবে কেউ তাঁকে কোনোদিন হাসতে দেখে নি।

হাদীস শরীফে তার বর্ণনা রয়েছে সামান্য পৃথকভাবে:

তার গায়ের রং ছিল সাদা ঘেঁষা লালচে। তিনি কখনো মাথায় তেল দেন নি। তিনি হাঁটতেন খালি পায়ে। দিনের খাবার ছাড়া তার সম্বল ছিল না। তার কোনো ঘর ছিল না। ছিল না কোনো অলংকার, কোনো জিনিসপত্র, পোশাক সামগ্রী, কোনো সম্পদ। তার মাথা থাকত অবিন্যস্ত, তার মুখমণ্ডল ছিল ছোট। এই পৃথিবীতে তিনি ছিলেন এক দরবেশ, পরবর্তী জীবনের জন্য অপেক্ষা মান এবং আল্লাহর ইবাদতে মশগুল।

যীশুর জন্মের সঠিক তারিখ জানা যায় নি। লূকের মতে ৬ খৃষ্টাব্দে যে আদমশুমারি হয়, তার কাছাকাছি সময়ে যীশু জন্মগ্রহণ করেন। এ কথাও বলা হয়েছে যে, তিনি হেরোদের (Herode) আমলে জন্মগ্রহণ করেন। হেরোদের মৃত্যু হয় ৪ খৃষ্টপূর্বাব্দে।

ভিনসেন্ট টেইলরের (Vincent Taylor) সিদ্ধান্ত যীশুর জন্ম ৮ খৃষ্টপূর্বাব্দের দিকে হতে পারে। তার মতে, যেহেতু যীশুর প্রকৃত বা আসন্ন জন্মলাভের সংবাদের প্রেক্ষিতে হেরোদ বেথলেহেমের সকল নবজাত শিশুদের হত্যার ফরমান জারি করেছিলেন, সেহেতু যীশুর জন্ম অবশ্যই হেরোদের মৃত্যুর পূর্বেই ঘটেছিল। এমনকি আমরা যদি লূকের গসপেল দেখি, তাহলে দেখা যায়, এই একই গসপেলের দু’টি পঙ্ক্তির বিবরণের মধ্যকার ব্যবধান দশ বছর। অধিকাংশ ভাষ্যকারই দ্বিতীয় পঙ্ক্তিতে বিশ্বাস করেন। এতে বলা রয়েছে, যীশু ৪ খৃষ্টপূর্বাব্দে অর্থাৎ ‘খৃষ্টের জন্মের চার বছর পূর্বে’ জন্মগ্রহণ করেন।

মাতা মেরীর অলৌকিক গর্ভ ধারণ ও যীশুর জন্মগ্রহণ ব্যাপক আলোচনার বিষয়বস্তু হয়েছে। কিছু লোকের বিশ্বাস যে তিনি জোসেফের রক্ত মাংসের সন্তান ছাড়া অন্য কিছু নন। পক্ষান্তরে অলৌকিক ধারণায় বিশ্বাসীদের মতে তিনি ছিলেন ঈশ্বরের পুত্র। তবে এই ‘ঈশ্বরের পুত্র’ কথাটি আক্ষরিকভাবে না আলংকারিকভাবে গ্রহণ করা হবে সে ব্যাপারে তাদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। লূক বলেন,

দূত গাব্রিয়েল ঈশ্বরের কাছ থেকে একজন কুমারীর কাছে প্রেরিত হয়েছিলেন…….. সেই কুমারীর নাম ছিল মেরী এবং দূত তার কাছে আগমন করলেন এবং সম্বোধন করলেন: ‘হে ঈশ্বরের বিপুল অনুগ্রহ প্রাপ্ত রমণী।’ তিনি যখন তাকে দেখলেন, তার কথায় বিব্রত হলেন এবং এ সম্বোধনটির তাৎপর্য উপলব্ধির চেষ্টা করলেন। দূত তাকে বললেন: ‘হে মেরী! আপনি ভীত হবেন না, কারণ আপনি ঈশ্বরের অনুগ্রহ লাভ করেছেন। আপনার গর্ভ সঞ্চার হবে এবং এক পুত্র জন্ম নিবে, তার নামকরণ করবেন যীশু….।” তখন মেরী দূতকে বললেন: ‘এটা কি করে সম্ভব? আমি কোনো পুরুষকে চিনি না।” …. দূত জবাব দিলেন: “ ঈশ্বরের ইচ্ছায় কোনো কিছুই অসম্ভব নয়”… মেরী বললেন, “আমি ঈশ্বরের সেবিকা, আমার ব্যাপারে ঈশ্বরের ইচ্ছাই পূর্ণ হোক।” এরপর দূত প্রস্থান করলেন।[1]

একই ঘটনা কুরআন মজিদে বর্ণিত হয়েছে এভাবে:

“স্মরণ কর, যখন ফিরিশতাগণ বলেছিল: হে মারইয়াম! আল্লাহ তোমাকে মনোনীত ও পবিত্র করেছেন এবং বিশ্বের নারীর মধ্যে তোমাকে মনোনীত করেছেন…. হে মারইয়াম! নিশ্চয় আল্লাহ তোমাকে তাঁর পক্ষ থেকে একটি কালেমার সুসংবাদ দিচ্ছেন (পুত্র সন্তানের), তার নাম মসীহ, মারইয়াম তনয় ঈসা…. সে বলল: হে আমার রব! আমাকে কোনো পুরুষ স্পর্শ করে নি, আমার সন্তান হবে কীভাবে? তিনি বললেন: এভাবেই। আল্লাহ যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন। তিনি যখন কিছু স্থির করেন তখন বলেন, ‘হও’ এবং তা হয়ে যায়।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৪২-৪৭]

৪টি গসপেলের মধ্যে মার্ক ও জন (যোহন-ইউহোন্না) যীশুর জন্ম সম্পর্কে নীরব এবং মথি দায়সারাভাবে তা উল্লেখ করেছেন। এরপর লূক যীশুর বংশ বৃত্তান্ত উল্লেখ করে আবার স্ববিরোধিতার পরিচয় দিয়েছেন, পক্ষান্তরে মার্ক ও জন কোনো বংশ বৃত্তান্ত দেন নি। মথি ও লূকের মধ্যে মথি আদম ও যীশুর মধ্যবর্তী ২৬ জনের নাম উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে লূকের তালিকায় আছে ৪২ জনের নাম। এভাবে দু’জনের বর্ণনায় ১৬ জনের অসামঞ্জস্য পরিলক্ষিত হয়। যদি কোনো ব্যক্তির গড় বয়স ৪০ বছরও মেনে নেওয়া যায়, তারপরও যীশুর কথিত পূর্বপুরুষদের দু’টি তালিকার মধ্যে ব্যবধান দাঁড়ায় ৬ শত ৪০ বছর।

কিন্তু যীশুর অলৌকিক জন্মের ব্যাপারে কুরআনে পরস্পর বিরোধী কোনো বর্ণনা নেই। যীশুর ‘ঈশ্বরত্বের’র (Divinity) বিষয়টি কুরআন দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। যীশুর জন্ম গ্রহণের পরপরই যা ঘটেছিল কুরআনে সে বর্ণনা পাঠ করলেই তা সুস্পষ্ট হবে:

﴿فَأَتَتۡ بِهِۦ قَوۡمَهَا تَحۡمِلُهُۥۖ قَالُواْ يَٰمَرۡيَمُ لَقَدۡ جِئۡتِ شَيۡ‍ٔٗا فَرِيّٗا ٢٧ يَٰٓأُخۡتَ هَٰرُونَ مَا كَانَ أَبُوكِ ٱمۡرَأَ سَوۡءٖ وَمَا كَانَتۡ أُمُّكِ بَغِيّٗا ٢٨ فَأَشَارَتۡ إِلَيۡهِۖ قَالُواْ كَيۡفَ نُكَلِّمُ مَن كَانَ فِي ٱلۡمَهۡدِ صَبِيّٗا ٢٩ قَالَ إِنِّي عَبۡدُ ٱللَّهِ ءَاتَىٰنِيَ ٱلۡكِتَٰبَ وَجَعَلَنِي نَبِيّٗا ٣٠ وَجَعَلَنِي مُبَارَكًا أَيۡنَ مَا كُنتُ وَأَوۡصَٰنِي بِٱلصَّلَوٰةِ وَٱلزَّكَوٰةِ مَا دُمۡتُ حَيّٗا ٣١ وَبَرَّۢا بِوَٰلِدَتِي وَلَمۡ يَجۡعَلۡنِي جَبَّارٗا شَقِيّٗا ٣٢ وَٱلسَّلَٰمُ عَلَيَّ يَوۡمَ وُلِدتُّ وَيَوۡمَ أَمُوتُ وَيَوۡمَ أُبۡعَثُ حَيّٗا ٣٣ ذَٰلِكَ عِيسَى ٱبۡنُ مَرۡيَمَۖ قَوۡلَ ٱلۡحَقِّ ٱلَّذِي فِيهِ يَمۡتَرُونَ ٣٤ مَا كَانَ لِلَّهِ أَن يَتَّخِذَ مِن وَلَدٖۖ سُبۡحَٰنَهُۥٓۚ إِذَا قَضَىٰٓ أَمۡرٗا فَإِنَّمَا يَقُولُ لَهُۥ كُن فَيَكُونُ ٣٥﴾ [مريم: ٢٧،  ٣٥] “এরপর সে সন্তানকে নিয়ে তার সম্প্রদায়ের কাছে উপস্থিত হলো। তারা বলল: ‘হে মারইয়াম! তুমি তো এক অদ্ভুত কাণ্ড করে বসেছ! হে হারুণের বোন, তোমার পিতা অসৎ ব্যক্তি ছিল না এবং তোমার মাতাও ছিল না ব্যভিচারিণী।” এরপর মারইয়াম সন্তানের দিকে ইঙ্গিত করল। তারা বলল, ‘যে কালের শিশু, তার সাথে আমার কেমন করে কথা বলল?” সে বলল. “আমি তো আল্লাহর বান্দা। তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন ও নবী করেছেন। যেখানেই আমি থাকি না কেন তিনি আমাকে বরকতময় করেছেন। তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন জীবদ্দশা পর্যন্ত সালাত ও যাকাত আদায় করতে, আর আমাকে আমার মাতার প্রতি অনুগত করেছেন, তিনি আমাকে করেন নি উদ্ধত ও হতভাগ্য। আমার প্রতি শান্তি যেদিন আমি জন্মলাভ করেছি, যেদিন আমার মৃত্যু হবে এবং যেদিন জীবিতাবস্থায় আমি পুনরুত্থিত হব।” এই-ই ঈসা মারইয়াম তনয়। আমি বললাম সত্য কথা, যে বিষয়ে তারা বিতর্ক করে। সন্তান গ্রহণ করা আল্লাহর

কাজ নয়। তিনি পবিত্র মহিমাময়।

তিনি যখন কিছু স্থির করেন, তখন বলেন ‘হও’ আর তা হয়ে যায়।” [সূরা মারইয়াম, আয়াত: ২৭-৩৫]

আদম আলাইহিস সালামের জন্ম সবচেয়ে বড় অলৌকিক ঘটনা যেহেতু পিতা বা মাতা ছাড়াই তিনি জন্ম গ্রহণ করেন। হাওয়ার জন্মও যীশুর জন্মের চেয়ে অনেক বড় অলৌকিক ঘটনা, যেহেতু তিনি কোনো মা ছাড়াই জন্মে ছিলেন। কুরআন মাজীদে বর্ণিত আছে:

﴿إِنَّ مَثَلَ عِيسَىٰ عِندَ ٱللَّهِ كَمَثَلِ ءَادَمَۖ خَلَقَهُۥ مِن تُرَابٖ ثُمَّ قَالَ لَهُۥ كُن فَيَكُونُ ٥٩﴾ [ال عمران: ٥٩] 

“আল্লাহর কাছে ঈসার দৃষ্টান্ত আদমের দৃষ্টান্ত সদৃশ। তিনি তাকে সৃষ্টি করেছিলেন মাটি থেকে, তারপর তিনি তাকে বলেছিলেন: ‘হও’ এবং সে হয়ে গেল।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৫৯]

যীশু যে সমাজে জন্মগ্রহণ করেছিলেন সে সমাজে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে যিা ঘটেছিল তার প্রেক্ষাপটে যীশুর জীবনকে বিচার করা গুরুত্বপূর্ণ। ইয়াহূদী জগতে এটা ছিল এক মহা গোলযোগের কাল। ইয়াহূদীরা তাদের ইতিহাসে বার বার আগ্রাসনের শিকার হয়ে হানাদারের পদতলে নিষ্পিষ্ট হয়েছে। এ বিষয়ে পরে বিস্তারিত আলোচনা করা যাবে। যা হোক, বারংবার পরাজয় ইয়াহূদীদের অসহায় করে তোলে, ফলে তাদের মনে ধিকি ধিকি জ্বলতে থাকে ঘৃণার আগুন। তা সত্ত্বেও, গভীর হতাশা ভরা দিনগুলোতেও ইয়াহূদীদের একটি বড় অংশই তাদের মানসিক ভারসাম্য বহাল রাখে এ আশায় যে, এক নয়া মূসা আলাইহিস সালাম আসবেন এবং তার সহযোগীদের নিয়ে আগ্রাসনকারীদের বিতাড়িত করতে সক্ষম হবেন, আবার প্রতিষ্ঠিত হবে যিহোভার শাসন। তিনি হবেন মেসিয়াহ্ (Messiah) অর্থাৎ অভিষিক্ত যীশু।

ইয়াহূদী জাতির মধ্যে একটি অংশ ছিল যারা সবসময় ক্ষমতাসীনদের পূঁজা করত। প্রতিকূল অবস্থায়ও নিজেদের সুবিধা লাভের জন্য তারা যুগের সাথে তাল মিলিয়ে পাল উড়িয়ে দিত। তারা ধনসম্পদ ও ধর্মীয় অবস্থানের দিক দিয়ে উচ্চস্থানে অধিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও ইয়াহূদী জাতির অবশিষ্ট অংশ তাদের বিশ্বাসঘাতক হিসেবেই গণ্য করত।

এ দু’টি অংশ ছাড়াও ইয়াহূদীদের মধ্যে তৃতীয় আরেকটি দল ছিল যাদের সাথে পূর্বোক্ত দু’টি দলের ব্যাপারে পার্থক্য ছিল। তারা আশ্রয় নিয়েছিল জঙ্গলে এবং তাওরাত অনুযায়ী তারা ধর্ম পালন করত। যখনই সুযোগ আসত তখনি তারা হানাদারদের বিরুদ্ধে লড়াই করত। এ সময় রোমানরা তাদের গুপ্ত ঘাঁটিগুলো খুঁজে বের করার জন্য বহুবার চেষ্টা চালিও ব্যর্থ হয়। এই দেশ প্রেমিক ইয়াহূদীদের সংখ্যা ক্রমশই বাড়তে থাকে। জোসেফাসের কাছ থেকে তাদের কথা প্রথম জানা যায়। তিনি ইয়াহূদীদের এ ৩টি দলকে যথাক্রমে ফারীসী (Pharisees), সাদ্দুকী (Sadducces) ও এসেনি (Essenes) বলে আখ্যায়িত করেন।

এসেনিদের অস্তিত্ব সম্পর্কে অবহিত হওয়া গেলেও বিশদ কিছু জানা যায় না। ৪টি গসপেলের কোনোটিতেই তাদের নাম একবারও উল্লেখ হয় নি। এর পর নাটকীয় আকস্মিকতার মধ্যে মরু সাগরের কাছে জর্দানের পাহাড়গুলোতে মরু সাগর পুঁথি (Dead Sea Scrolls) নামে পরিচিত দলীল-পত্র আবিষ্কৃত হয়। এ আবিষ্কার বিশ্বের বুদ্ধিজীবী ও যাজক মহলে ঝড় তোলে। এ প্রসঙ্গে এ দলিল- পত্র কীভাবে আবিষ্কৃত হলো সে কাহিনির কিছুটা উল্লেখ করা যেতে পারে।

১৯৪৭ সাল। কুমরানের কাছে প্রান্তরে এক আরব বালক মেঘ চরাচ্ছিল। এক সময় সে লক্ষ করল, পালে একটি মেষ নেই। কাছেই পাহাড়। মেষটি হয়তো সেদিকেই গেছে ভেবে বালকটি পাহাড়ে গিয়ে মেষ খুঁজতে শুরু করল। এক সময় তার নজরে পড়ল একটি গুহা। সে ভাবল, মেষটি বোধহয় এর মধ্যেই ঢুকে পড়েছে। বালকটি গুহার ভিতরে একটি পাথর নিক্ষেপ করল। পাথরে পাথরে সংঘর্ষের শব্দ শোনার আশা করছিল সে। কিন্তু তার পরিবর্তে মনে হলো, পাথরের টুকরোটি কোনো মাটির পাত্র জাতীয় কোনো বস্তুর গায়ে আঘাত করেছে। মুহূর্তেই তার মনে রঙিন স্বপ্ন ডানা মেলে। সে ভাবল, নিশ্চয় কোনো গুপ্তধন আছে এ গুহায়। পরদিন সকালে সে আবার গুহায় ফিরে আসে। সাথে একজন বন্ধুকেও নিয়ে যায় সে। দু’জনে গুহার ভিতরে প্রবেশ করে। কিন্তু হতাশ হয় তারা। গুহার কোথাও গুপ্তধন নেই। তার পরিবর্তে ভাঙাচোরা মাটির জিনিসপত্রের মধ্যে তারা কয়েকটি মাটির কলস (Jar) দেখতে পেল। এর ভেতর থেকে একটি কলস নিয়ে নিজেদের তাঁবুতে এল তারা। সেটি ভেঙে ফেলার পর তাদের শেষ আশাটুকুও বিলীন হয়ে গেল। কলসের ভেতর থেকে পাওয়া গেল চামড়ায় লেখা একটি পুঁথি। গোটানো পুঁথিটি খুলতে খুলতে শেষ পর্যন্ত তা তাঁবুর এপাশ থেকে ওপাশ পর্যন্ত পৌছল। এটা ছিল সেই পুঁথিগুলোর একটি যা পরে আড়াই লাখ ডলারে বিক্রি হয়। আরব বালকটি কয়েক শিলিং এর বিনিময়ে কানডো (Kando) নামক এক সিরীয় খৃষ্টানের কাছে পুঁথিটি বিক্রি করে দেয়। কানডো ছিল একজন মুচি। সে বহু পুরোনো চামড়াটি কিনেছিল এ জন্য যে, এটা হয়তো কোনো পুরোনো জুতা মেরামতে কাজে লাগবে। হঠাৎ কানডো লক্ষ করে যে চামড়াটির উপরে কীসব লেখা রয়েছে। কিন্তু ভাষাটি তার অজানা থাকায় সে কিছুই বুঝতে পারল না। ভালো করে দেখে নিয়ে সে পুঁথিটি জেরুজালেমের সেন্ট মার্ক মঠের সিরীয় আর্চ বিশপকে দেখাবে বলে মনস্থ করল। এভাবে এ দুই ব্যক্তি অর্থোপার্জনের কারণে পূঁথিটি এক দেশ থেকে অন্য দেশে বয়ে নিয়ে যায়।

জর্দানের আমেরিকান ওরিয়েন্টাল ইনস্টিটিউটে এ পুঁথিগুলো ওল্ড টেস্টামেন্টের টিশাইয়ের গ্রন্থের (Book of Tsaiah) জ্ঞাত কপিগুলোর মধ্যে সর্বাপেক্ষা প্রাচীন বলে দেখা গেল। এর ৭ বছর পর পুঁথিগুলো ইসরাইল সরকার কর্তৃক জেরুজালেমের গ্রন্থ মন্দিরে (Shrine of the book) রক্ষিত হয়। মোটামুটি হিসেবে জর্দান নদীর তীরবর্তী পাহাড়ে প্রায় ৬শ গুহা রয়েছে। এ সব গুহাতেই বাস করত এসেনীরা। এ ইয়াহূদী সম্প্রদায়টি মানুষের সংশ্রব ত্যাগ করেছিল। কারণ, তারা বিশ্বাস করত যে, একজন প্রকৃত ইয়াহূদী শুধুমাত্র যিহোভার (Jehovah) (ওল্ড টেস্টামেন্টে ঈশ্বরকে যিহোভা বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে) সার্বভৌমত্বের অধীনেই বাস

করতে পারে, অন্য কারো কর্তৃত্বের অধীনে নয়। তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী রোমান সম্রাটের অধীনে যে ইয়াহূদী বসবাস এবং তাকে প্রভূ হিসেবে স্বীকার করে সে পাপ কাজ করে।

পৃথিবীর ভোগ-বিলাস, আড়ম্বরপূর্ণ জীবন এবং অদম্য সেই শক্তি যা অনিবার্যভাবে মানুষকে ঠেলে দেয় বিরোধ ও আত্ম-ধ্বংসের পথে, প্রভৃতি কারণে বীতশ্রদ্ধ এ ইয়াহূদী সম্প্রদায় মরু সাগরের তীরবর্তী পাহাড়ে নির্জন স্থানে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল। পাহাড়ের গুহায় বসবাসের এ জীবন তারা বেছে নিয়েছিল এ কারণে যে নীরব-নিভৃত পরিবেশে তারা পবিত্র জীবন যাপনে মনোনিবেশ করতে পারবে এবং মুক্তি লাভ করতে সক্ষম হবে। মন্দিরের বহু ইয়াহূদীর মত তারা ওল্ড টেস্টামেন্টকে অর্থোপার্জনের কাজে ব্যবহার করে নি, বরং পবিত্র গ্রন্থের শিক্ষানুযায়ী জীবন-যাপনের চেষ্টা করে। এ জীবন-যাপনের মাধ্যমে শুদ্ধতা ও পবিত্রতা লাভ করতে পারবে বলে তারা আশা করেছিল। ঈশ্বরের নির্দেশ ইয়াহূদীরা অনুসরণ না করায় প্রকৃতপক্ষে ধ্বংসের পথে এগিয়ে চলেছিল। সেই পথ তারা কীভাবে পরিহার করেছে, অবশিষ্ট ইয়াহূদীদের সামনে তার দৃষ্টান্ত স্থাপনই ছিল তাদের লক্ষ্য।

তারা আধ্যাত্মিক গান রচনা করেছিল যা মানুষের হৃদয়কে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। একজন অধ্যাত্মবাদীর জীবনকে ঝড়ে পতিত জাহাজের ন্যায় বলে একটি গানে উল্লেখ রয়েছে। অন্য একটি গানে একজন অধ্যাত্মবাদীকে তলোয়ারের মত জিহবা বিশিষ্ট সিংহ পরিপূর্ণ অরণ্যে ভ্রমণকারী একজন পথিক বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। পথের শুরুতে একজন আধ্যাত্মবাদী যে অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয় তাকে তুলনা করা হয়েছে প্রথম সন্তানের জন্মদাত্রী মায়ের অভিজ্ঞতার সাথে। যদি সে এই বিপর্যয় পাড়ি দিতে সক্ষম হয় তাহলেই সে ঈশ্বরের পাক-পবিত্র আলোকধারায় স্নাত হয়। তখন সে উপলব্ধি করে যে, মানুষ মাটি ও পানির মিশ্রণে তৈরি এক ব্যর্থ ও শূন্য সৃষ্টি মাত্র। কঠিন দুর্ভোগ অতিক্রম করে এবং সন্দেহ ও হতাশার সাগর পেরিয়ে আসার পর সে লাভ করে অশান্তির মধ্যে শান্তি, দুঃখের মধ্যে সুখ এবং বেদনার মধ্যে আনন্দের এক মধুর জীবন। তারপর সে নিজেকে দেখতে পায় ঈশ্বরের ভালোবাসা মুড়ানো অবস্থায়। এ পর্যায়ে অপরিসীম কৃতজ্ঞতার সাথে সে উপলব্ধি করে যে, কীভাবে তাকে অতল গহবর থেকে তুলে আনা হয়েছে এবং স্থাপন করা হয়েছে উঁচু সমতল ভূমিতে। এখানে ঈশ্বরের আলোয় হাঁটতে হাঁটতে পৃথিবীর নির্মম শক্তির সামনে সে অটল অবিচল হয়ে দাঁড়ায়।

মরু সাগর পূঁথি আবিষ্কারের পূর্বে এসেনীদের বিষয়ে অতি অল্পই জানা যেত। প্লিনি (Pliny) ও জোসেফাস (Josephus) তাদের কথা উল্লেখ করলেও পরবর্তী কালের ঐতিহাসিকদের দ্বারা কার্যত তারা উপেক্ষিত হয়েছে। প্লিনি এই মানব গোষ্ঠীকে বিশ্বের অন্য যে কোনো মানব গোষ্ঠীর চেয়ে অধিকতর উল্লেখযোগ্য বলে বর্ণনা করেছেন।

তাদের স্ত্রী নেই, তারা যৌন সংসর্গ পরিত্যাগ করে, তাদের কোনো অর্থ সম্পদ নেই…. তাদের জীবনাচারণ দেখে বিপুল সংখ্যক লোক তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং এভাবে তাদের সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছিল…. এভাবে এ গোষ্ঠীটি হাজার হাজার বছর টিকে ছিল যদিও তারা কোনো সন্তান উৎপাদন করত না। জোসেফাস, যার জীবন শুরু হয়েছিল একজন এথেনী হিসেবে, তিনি লিখেছেন যে এথেনীরা বিশ্বাস করত যে আত্মা অমর। এটা ঈশ্বরের প্রদত্ত এক উপহার। ঈশ্বর কিছু কিছু আত্মাকে সকল পাপ থেকে মুক্ত করে নিজের জন্য পবিত্র করে নেন। এভাবে বিশুদ্ধকরণকৃত ব্যক্তি সকল অপবিত্রতা থেকে মুক্ত হয়ে পবিত্রতা অর্জন করে।

যুগে যুগে বিজয়ী বহিঃশক্তি মন্দির ধ্বংস ও ইয়াহূদীদের বহুবার পরাজিত করা সত্ত্বেও এ গুহাবাসীদের জীবন-যাত্রায় তার কোনো প্রভাব পড়ে নি। তাদের এই স্বেচ্ছা নির্বাসনের জীবন ধর্মের পবিত্রতা এবং বিদেশি আগ্রাসন থেকে জুডিয়াকে (Judea) মুক্ত করার জন্য প্রতিটি ইয়াহূদীর সংগ্রামের দায়িত্ব থেকে পলায়ন ছিল না। প্রাত্যহিক প্রার্থনা ও পবিত্র গ্রন্থ পাঠের পাশাপাশি তাদের কেউ কেউ একটি সুদক্ষ বাহিনী গড়ে তুলেছিল যারা শুধু মূসা আলাইহিস সালামের ধর্মই প্রচার করত না, উপরন্তু নির্দেশিত পথে স্বাধীনতার জন্য লড়াই করতেও প্রস্তুত ছিল। তাদের যুদ্ধ ছিল শুধুমাত্র ঈশ্বরের সেবার জন্য, ক্ষমতা লাভ বা ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জন্য নয়। এই যোদ্ধা বাহিনীর সদস্যদেরকে শত্রুরা ‘ধর্মান্ধ ইহুদি’ বলে আখ্যায়িত করত। তারা এক পতাকার অধীনে সংগঠিত ছিল এবং প্রতিটি গোত্রের নিজস্ব পরিচিতি পতাকা ছিল। তারা ছিল ৪টি ডিভিশনে বিভক্ত এবং প্রতিটি ডিভিশনের শীর্ষে ছিল একজন প্রধান। প্রতিটি ডিভিশনই গঠিত ছিল ইসরাইলের ৩টি গোত্রের লোক নিয়ে। এভাবে ইয়াহূদীদের ১২টি গোত্রের সকলেই এক পতাকার নীচে সংগঠিত হয়েছিল। বাহিনীর প্রধানকে একজন লেবীয় পুরোহিত হতে হত। তিনি শুধু একজন সামরিক অধিনায়কই ছিলেন না, আইনের একজন শিক্ষকও ছিলেন। প্রতিটি ডিভিশনের তার নিজস্ব মাদ্রাসা (‘মিদরাস’ বা স্কুল) ছিল এবং পুরোহিতদের একজন সামরিক কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন ছাড়াও বিদ্যালয়ে নিয়মিত “দরশ” বা শিক্ষা প্রদান করতে হত।

এভাবে এসব গুহায় আদিম পরিবেশে বাস করে এসেনীরা আনন্দ-বিলাস পরিত্যাগ করেছিল, তারা বিবাহকে ঘৃণা করত এবং ধন-সম্পদের প্রতি বিতৃষ্ণা ছিল। তারা একটি গুপ্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করেছিল এবং তাদের গুপ্ত বিষয়সমূহ সদস্য নয় এমন কারো কাছে কখনোই প্রকাশ করা হত না। রোমকরা তাদের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানলেও তাদের চারপাশের গোপনীয়তার মুখোশ ভেদ করতে পারে নি। প্রতিটি অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় ইয়াহূদীরই স্বপ্ন ছিল এই সমাজের সদস্য হওয়া, কারণ বিদেশি হানাদারদের বিরুদ্ধে লড়াই করার এটাই ছিল একমাত্র সহজলভ্য পন্থা। প্লিনির বর্ণনা থেকে আমরা যেমনটি জানতে পারি, কার্যতও এসেনীরা বিবাহকে ঘৃণা করত। তবে তারা অন্যদের নম্র ও বাধ্য শিশুদের তাদের নিকটজন হিসেবে গ্রহণ করত এবং নিজেদের জীবন ধারায় তাদের গড়ে তুলত। এভাবেই শত শত বছর ধরে এসেনীরা তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পেরেছিল যদিও তাদের সমাজে কোনো শিশুর জন্ম হত না। এভাবেই, টেম্পল অব সলোমন বা সলোমন মন্দিরের প্রধান

পুরোহিত যাকারিয়া (Zachariah) বৃদ্ধ বয়সে যখন একটি পুত্র সন্তান লাভ করেন তিনি তাকে এসেনীয়দের আদিম পরিবেশে পাঠিয়ে দেন এবং সেখানেই তিনি বেড়ে ওঠেন। ইতিহাসে তিনিই জন দি ব্যাপটিষ্ট (John the Baptist) বা ব্যাপটিষ্ট জন নামে পরিচিত।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে, এসেনী সম্প্রদায় তাদের আদিম পরিবেশে অস্তিত্বশীল ছিল। তাদের কাছে যাকারিয়ার সন্তান প্রেরণের কারণও বোধগম্য। তিনি তার বহুকাংখিত পুত্রকে মরুভূমিতে একাকী পাঠান নি, তিনি সবচেয়ে বিশ্বস্ত সম্প্রদায়টির কাছে তার দায়িত্ব ভার অর্পণ করেছিলেন যে সম্প্রদায় জীবন যাপন করত যিহোভার সন্তুষ্টি সাধনের জন্য। যাকারিয়ার পত্নী এলিজাবেথের জ্ঞাতি বোন মেরীকে যাকারিয়া লালন-পালন করেছিলেন। কারণ, মেরীর মা তাকে মন্দিরের সেবায় উৎসর্গ করার মানত করে তাকে যাকারিয়ার হাতে তুলে দিয়েছিলেন। এই পরিবেশে যীশুর জন্ম গ্রহণ ঘটে।

ইয়াহূদীরা মনে করত যে মেসিয়াহ (Messiah) নামে একজন নয়া নেতার আবির্ভাব ঘটবে। তিনি খৃষ্টধর্মে দীক্ষিত হবেন এবং তাদের রাজাকে হত্যা করবেন। তার আশু জন্মগ্রহণের গুজব ইয়াহূদীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ার পর যেখানে মেসিয়াহর জন্মগ্রহণের কথা, সেই বেথলেহেমে জন্ম গ্রহণকারী সকল শিশুকে হত্যা করার জন্য হেরোদ (Herod) সিদ্ধান্ত নেয়। যাকারিয়া এসেনীদের শক্তিশালী গুপ্ত সমাজকে বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত করেন। মেরী রোমক সৈন্যদের লৌহ বেষ্টনী ভেদ করে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। তিনি যীশুকে নিয়ে মিশর গমন করেন। সেখানে এসেনীদের আরেকটি সম্প্রদায় বাস করত।

মরু সাগর পূঁথি (Dead Sea Scroll) আবিষ্কারের পূর্ব পর্যন্ত মেরী ও যীশুর আকস্মিক অন্তর্ধান এবং রোমান কর্তৃপক্ষের হাত থেকে তাদের নিরাপদ পলায়নের বিষয়টি রহস্যাবৃত এবং নান জল্পনা- কল্পনার উৎস ছিল। কোনো গসপেলেই এ অধ্যায়টি সম্পর্কে কিছু বলা হয় নি। এসেনী সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব থেকে এটা বোঝা যায় যে, কীভাবে যীশুর জন্মকালীন ব্যাপক প্রচারণা সত্ত্বেও অনুসরণকারীদের চোখ এড়িয়ে তারা (মেরী ও যীশু) সাফল্যের সাথে পলায়ন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। অন্য কোনো পরিস্থিতিতে, যে শিশুটি চমৎকারভাবে গুছিয়ে প্রামাণিক কথাবার্তা বলতেন এবং মেষপালকরা ও ম্যাগি (Magi) যাকে দর্শন করেছিলেন, তিনি কিছুতেই এত সহজে পালিয়ে যেতে পারতেন না।

খৃষ্টপূর্ব ৪ সনে যীশুর বয়স যখন ৩ বা ৪ বছর, তখন হেরোদের মৃত্যু হয়। ফলে যীশুর আশু প্রাণ সংশয় ভীতি অপসারিত হয় এবং তিনি তখন অবাধে ঘুরে বেড়াতে পারতেন। মনে হয়, এসেনী শিক্ষকদের কঠোর শৃঙ্খলার মধ্যে তিনি শিক্ষা লাভ করেছিলেন। যেহেতু তিনি অত্যন্ত মেধাবী শিক্ষার্থী ছিলেন সে কারণে খুব দ্রুত তাওরাত শিক্ষা করতে পেরেছিলেন। ১২ বছর বয়সে তাকে মন্দিরে প্রেরণ করা হয়। এ সময় দেখা গেল, বারবার পাঠ পুনরাবৃত্তির পরিবর্তে তিনি অটল আস্থা ও পান্ডিত্যের সাথে কথা বলছেন।

কয়েকজন মুসলিম ঐতিহাসিকের বিবরণে তার শিশু কালে সংঘটিত অলৌকিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে বলা হয়েছে। সালাবীর ‘কাসাসুল আম্বিয়া’ গ্রন্থে আছে।

ওয়াহাব বলে: বালক ঈসার প্রথম যে নিদর্শন লোকেরা প্রত্যক্ষ করল তা হলো এই যে, তার মাতা মিশরের একটি গ্রামে গ্রাম প্রধানের বাড়িতে বাস করতেন। ছুতার মিস্ত্রি যোশেফ যিনি মারইয়ামের সাথে মিশর গমন করেছিলেন তিনিই তাকে সে বাড়িতে নিয়ে এসেছিলেন। দরিদ্র ছুতার মিস্ত্রি গ্রাম প্রধানের বাড়ি মেরামত করতেন। একবার গ্রাম প্রধানের তহবিল থেকে কিছু অর্থ চুরি যায়। কিন্তু তিনি দরিদ্র ছুতারকে সন্দেহ করেন নি। গ্রাম প্রধানের এই অর্থ চুরির ঘটনায় মারইয়াম দুঃখিত হন। বালক ঈসা মাতাকে গৃহস্বামীর অর্থ চুরির ঘটনায় দুঃখ-কাতর দেখে তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন: মা, আপনি কি চান যে, আমি এই চুরি যাওয়া অর্থের সন্ধান করি। তিনি জবাব দিলেন, হ্যাঁ বাছা। তিনি বললেন: তাহলে গৃহস্বামীকে বলুন সব দরিদ্রদের আমার কাছে ডেকে আনতে। একথা শুনে মারইয়াম গৃহস্বামীর কাছে গিয়ে তাকে তার পুত্রের কথা জানালেন। তিনি সব দরিদ্র ব্যক্তিকে ডেকে আনলেন। তারা সবাই এসে পৌঁছলে ঈসা আলাইহিস সালাম তাদের মধ্যে দু’ব্যক্তির কাছে গেলেন। এদের একজন ছিল অন্ধ, অন্যজন ছিল খোঁড়া। তিনি খোঁড়া ব্যক্তিকে অন্ধ ব্যক্তির ঘাড়ের ওপর তুলে দিলেন। তারপর তাকে বললেন: উঠে দাঁড়াও। অন্ধ লোকটি জবাব দিল. এ ব্যক্তিকে ঘাড়ে করে উঠে দাঁড়ানোর শক্তি আমার নেই। ঈসা আলাইহিস সালাম তখন বললেন: গতকাল এ শক্তি তুমি কীভাবে পেয়েছিলে? উপস্থিত লোকজন ঈসা আলাইহিস সালামের একথা শুনে অন্ধ ব্যক্তিকে মারধর করতে শুরু করার সে উঠে দাঁড়াল। সে উঠে দাঁড়াতেই খোঁড়া ব্যক্তি গৃহস্বামীর ধন-ভাণ্ডারের জানালার কাছে পৌঁছে গেল। তখন ঈসা আলাইহিস সালাম গৃহস্বামীর উদ্দেশ্যে বললেন: এভাবেই তারা গতকাল আপনার সম্পদ চুরি করেছে। অন্ধ লোকটি খোঁড়ার দৃষ্টিশক্তি এবং খোঁড়া দু’জনই একযোগে বলে উঠল: হ্যাঁ, ইনি সত্য কথাই বলেছেন। তারপর তারা চুরি করা অর্থ গ্রামপ্রধানকে ফিরিয়ে দিল। তিনি সেগুলো নিজের ধনভাণ্ডারে রাখলেন। বললেন: হে মারইয়াম, তুমি এর অর্ধেকটা গ্রহণ কর। তিনি জবাবে বললেন: অর্থের প্রতি আমার কোনো আগ্রহ নেই। গ্রাম প্রধান বললেন: ঠিক আছে, এ অর্থ তাহলে তোমার পুত্রকে দাও। মারইয়াম বললেন: তার মর্যাদা আমার চেয়েও অধিক। …..এ সময় ঈসার আলাইহিস সালাম বয়স ছিল ১২ বছর।

দ্বিতীয় নিদর্শন:

সুদ্দী বলেন, ঈসা আলাইহিস সালাম যখন বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করতেন তখন তিনি তার সহপাঠী ছেলেদের কাছে তাদের পিতা-মাতারা কি করছেন, তা বলে দিতেন। তিনি এক একদিন এক একটি ছেলেকে বলতেন: বাড়ি যাও, তোমরা বাড়ির লোকেরা অমুক অমুক জিনিস আহার করছে এবং তোমার জন্য অমুক অমুক জিনিস তৈরি করছে এবং তারা অমুক অমুক খাবার খাচ্ছে। একথা শুনে ছেলেটি বাড়ি চলে যেত এবং তার কাছে যা যা শুনেছে সেগুলো তাকে না দেওয়া পর্যন্ত কান্নাকাটি করত। বাড়ির লোকেরা তাকে জিজ্ঞেস করত কে তোমাকে এগুলো বলেছে? সে বলত ঈসা। কয়েকটি ঘটনা ঘটার পর বাড়ির লোকেরা ছেলেগুলোকে একটি বাড়িতে আটক রাখল। ঈসা আলাইহিস সালাম তাদের খুঁজতে খুঁজতে সেখানে গেলেন। লোকদের কাছে ছেলেদের কথা জানতে চাইলে তারা বলল, তারা সেখানে নেই। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: তাহলে এ বাড়িতে কী আছে? তারা বলল: শূকর। তিনি বললেন: তারা শূকরে পরিণত হোক। তারপর লোকেরা দরজা খুলে শুধু শূকরই দেখতে পেল। ইসরাইলের শিশুরা ঈসার আলাইহিস সালাম জন্য বিপাকে পড়েছিল। তার মা এ কারণে তার জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলেন। তিনি তাকে একটি গাধার পিঠে তুলে মিসেরর উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন……।

আতা বলেন, মারইয়াম ঈসা আলাইহিস সালামকে বিদ্যালয় থেকে নিয়ে এসে বিভিন্ন রকম কাজ শেখানোর চেষ্টা করতে লাগলেন। সর্বশেষ তিনি তাকে বস্ত্র রঞ্জনকারীদের কাছে দিলেন। তিনি তাকে বস্ত্র রঞ্জনকারীদের প্রধানের হাতে তুলে দিলেন যাতে তিনি তার কাছ থেকে কাজ শিখতে পারেন। কিছু দিন কেটে গেল। সে লোকটির কাছে বিভিন্ন ধরনের বস্ত্র ছিল। তিনি এগুলো নিয়ে সফরের যাচ্ছিলেন। তিনি ঈসা আলাইহিস সালামকে বললেন: তুমি এখন ব্যবসা শিখেছ। আমি ১০ দিনের জন্য সফরে যাচ্ছি। এই বস্তুগুলো বিভিন্ন রঙের। এগুলো কোনো রঙে রং করা হবে আমি তা চিহ্নিত করে রেখেছি। আমি চাই যে, আমার ফিরে আসার আগেই এ কাজগুলো তুমি সম্পন্ন করে রাখবে। তারপর তিনি চলে গেলেন। ঈসা আলাইহিস সালাম একটি রং করার পাত্রে একটি রং তৈরি করলেন এবং সকল কাপড় তার মধ্যে ডুবিয়ে দিয়ে আল্লাহর কাছে দো‘আ করলেন। নির্দিষ্ট দিনে বস্ত্র রঞ্জনকারী ফিরে এলেন। তিনি দেখলেন, ঈসা আলাইহিস সালাম একটি রঙের পাত্রে সকল বস্ত্র রেখেছেন। তিনি চিৎকার করে বললেন: হায় হায়! এ তুমি কি করেছ? তিনি জবাব দিলেন: আমি কাজটি সম্পন্ন করেছি। বস্ত্র রঞ্জনকারী বললেন: সেগুলো কোথায়? তিনি বললেন: রঙের পাত্রেই সব রয়েছে। বস্ত্র রঞ্জনকারী বললেন, সবগুলো? তিনি বললেন: হ্যাঁ। বস্ত্র রঞ্জনকারী বললেন: সকল কাপড় তুমি একটি পাত্রে কীভাবে রাখলে? তুমি সবগুলো কাপড়ই নষ্ট করে দিয়েছ। তিনি বললেন: ওগুলো তুলুন এবং দেখুন। তিনি কাপড়গুলো তুললেন। ঈসা আলাইহিস সালাম একটি হলুদ, একটি সবুজ একটি লাল এভাবে একের পর এক বিভিন্ন রঙের কাপড় তার হাতে তুলে দিতে থাকলেন। দেখা গেল, বস্ত্র রঞ্জনকারী যেমনটি চেয়েছেন সেগুলো তেমনটিই হয়েছে। এবার বস্ত্র রঞ্জনকারীর বিস্মিত হবার পালা। তিনি বুঝতে পারলেন, যা ঘটেছে তা সবই আল্লাহর ইচ্ছায়। তিনি কত না গৌরবময়। তখন বস্ত্র রঞ্জনকারী লোকজনকে ডেকে বলতে থাকলেন: তোমরা দেখে যাও ঈসা আলাইহিস সালাম কি করেছেন। এরপর তিনি এবং তার সহচররা তাঁকে বিশ্বাস করে আল্লাহর ওপর ঈমান আনলেন এবং তার অনুসারীতে পরিণত হলেন।

যীশুর শিশুকালে একটি গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে যে জন (John) এসেনী সম্প্রদায়ের কাছ থেকে চলে এসেছেন এবং নির্জনে বাস করছেন। তার পরনে রয়েছে শুধু মাত্র উটেরলোমের তৈরি একটি বস্ত্র এবং কোমরে রয়েছে চামড়ার বন্ধনী। তিনি শুধু ফল-মূল এবং বন্য মধু আহার করেন: (মিথি ৩ : ৪)। তিনি সরাসরি লোকজনের মধ্যে ধর্মপ্রচার করেন। তিনি দীর্ঘকাল শিক্ষা নবিশির জন্য জোর করেন না যা কিনা এসেনী ভ্রাতৃসংঘের সদস্যপদ লাভের জন্য অত্যাবশ্যক। তিনি জনগণের মধ্যে আলোড়ন তুলেছেন। তিনি যিহোভার দিকে ফিরে আসার জন্য সকলের প্রতি ডাক দিয়েছেন এবং সকলকে আশ্বাস দিয়েছেন যে শিগগিরই ঈশ্বরের রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে।

এ বিষয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট হিসাবে জোসেফাস কর্তৃক লিখিত অন্য এক সন্ন্যাসীর ইতিহাস পাঠও আগ্রহোদ্দীপক। জোসেফাস ছিলেন ঐ সন্ন্যাসীর শিষ্য। জোসেফাস এক কঠোর তপস্যায় তিন বছর নির্জন স্থানে অতিবাহিত করেন। এ সময় তিনি বানাস (Bannus) নামক এক সন্ন্যাসীর তত্ত্বাবধানে ছিলেন যিনি শুধুমাত্র গাছের পাতা দিয়ে তৈরি পোশাক পরতেন, বুনো ফল-মূল আহার করতেন এবং শীতল পানিতে অবিরাম অবগাহনের মাধ্যমে নিজের কাম-প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতেন। সুতরাং সন্ন্যাসীদের সকল সাধারণ প্রথা জন মেনে চলতেন ও অনুসরণ করতেন, এটাই স্বাভাবিক। ডেভিড এবং তার পূর্বেকার নবীগণের কাছে নির্জন স্থানগুলো ছিল আশ্রয়স্থল। এখানে এসে ইয়াহূদীরা তাদের বিদেশি শাসকদের আধিপত্য ও ভুয়া ঈশ্বরের প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারত। এখানে পৌত্তলিক শাসকদের অধীন থাকার বা তাদের একটুখানি কৃপাদৃষ্টি লাভের কোনো ব্যাপার ছিল না। এ রকম পরিবেশে স্রষ্টার ওপর নির্ভরশীলতা সৃষ্টি হত এবং একমাত্র তারই ইবাদত হত। এটা ছিল

একত্ববাদের দোলনা। মরুভূমির এই নির্জন অঞ্চলে এসে মানুষের মন থেকে নিরাপত্তার মিথ্যা ধারণাটি অপসারিত হয়ে যেতে এবং সে শুধু বাস্তবতার ওপরই নির্ভরশীল হতে শিখত। “নির্জন বিরানা প্রান্তরে অন্যান্য সব কিছুই অসার প্রতিপন্ন হত এবং মানুষ সকল প্রাণের চিরন্তন উৎস, সকল নিরাপত্তার মূল শক্তি এক প্রভূর কাছে খোলাখুলিভাবে সমর্পিত হত।” সেই নির্জনতায় সংগ্রামের দু’টি দিক ছিল। প্রথমত: যারা ঈশ্বরের সন্তুষ্টির লক্ষ্যে জীবন যাপন করতে চাইত, নিজেদের সাথে এই সংগ্রামের ফলে ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস ও আস্থা তাদের মনে দৃঢ় মূল হত। দ্বিতীয়ত: এই পথ অবলম্বনের ফলে যারা অন্যপন্থায় জীবন যাপন করতে চাইত তাদের সাথে সংঘাত অনিবার্য হয়ে উঠত। প্রথম সংগ্রামটি ছিল যিহোভাকে বিশ্বাসের এবং আধ্যাত্মিক সাফল্যের প্রশ্ন, তা সে দ্বিতীয় লড়াইতে জয়ী হোক আর না হোক।

জনের উদাত্ত আহ্বান বিপুল সংখ্যক লোককে আকৃষ্ট করতে শুরু করল। তিনি এসেনীয়দের জীবনাচরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিলুপ্ত করলেন। সেটি ছিল- সম্প্রদায়ের কোনো গুপ্ত বিষয়ই কারো কাছে প্রকাশ করা যাবে না- এমনকি নির্যাতনে মৃত্যু হলেও নয়” আগের মত কঠোর নিয়ম পালিত না হওয়ায় আন্দোলনের মধ্যে রোমানদের জন্য গুপ্তচরের অনুপ্রবেশ ঘটানো সহজ হয়ে ওঠে। কিন্তু জন তার নবী সুলভ ক্ষমতাবলে এসব ছদ্মবেশী লোকদের পরিচয় জেনে ফেলতে সক্ষম হন। তিনি তাদের ‘বিষাক্ত সাপ’ (Vipers) বলে আখ্যায়িত করেন (মথি ৩ : ৭)। তার কনিষ্ঠ জ্ঞাতি ভ্রাতা যীশু এ আন্দোলনে যোগ দেন এবং সম্ভবত তিনি ছিলেন গোড়ার দিকে অভিষিক্তদের অন্যতম। তার সর্বক্ষণের সঙ্গী বার্ণাবাসও সম্ভবত তার সাথেই দীক্ষা গ্রহণ করেন। যীশুর অন্য সঙ্গী ম্যাথিয়াসও তার সাথেই দীক্ষিত হন।

জন জানতেন যে, তিনি লড়াই শুরু করার আগেই ‘বিষাক্ত সাপেরা’ সফল হতে যাচ্ছে। কিন্তু যীশুর দীক্ষা গ্রহণের ফলে তিনি এতই সন্তুষ্ট হয়েছিলেন যে, তার মৃত্যুর সাথেই যে তার আন্দোলন শেষ হয়ে যাবে না এ ব্যাপারে তিনি নিশ্চিন্ত ছিলেন। জন যেমনটি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, তেমনটিই হলো। রাজা হেরোদ তার শিরশ্ছেদ করলেন। ফলে তার আন্দোলনের সকল ভার যীশুর কাঁধে এসে পড়ল।

যীশু এসময় ছিলেন ৩০ বছরের যুবক। তার কাজের মেয়াদ ৩ বছরের বেশি স্থায়ী হয় নি। তিনি উপলব্ধি করেন যে, তার প্রস্তুতির কাল শেষ ও জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। সময়টির পূর্ণ তাৎপর্য উপলব্ধির জন্য আমরা যীশুকে ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে স্থাপন করব এবং বিশেষ করে ইয়াহূদী ইতিহাসের প্রতি দৃষ্টি দিব। এগুলো পুনরায় সে বিষয়গুলোকেই ব্যাখ্যা করবে ইতিমধ্যে যেগুলো ঘটতে শুরু করেছিল। যেমন, এসেনী সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব, জনের কর্মকান্ড এবং চূড়ান্তভাবে যীশু ও রোমানদের মধ্যে বিরোধ। এগুলোর সবই সেই একই পদ্ধতির ঘটনা যা ইয়াহূদীদের ইতিহাসে বারবার সংঘটিত হয়েছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই শাসকরা যখন তাদেরকে ঈশ্বরের সাথে নিজেদের সহযোগী ও অংশীদার করার চেষ্টা করেছে চূড়ান্তভাবে, তখনই ইয়াহূদীরা বিদেশি হানাদারদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে। এক ঈশ্বরের বিশ্বাস এবং তিনি ছাড়া আর কেউ উপাস্য নন, তাদের এ ব্যাপারটি ছিল নিঃশর্ত ও সুস্পষ্ট।

ইয়াহূদীদের মধ্যে শাসক বা রাষ্ট্র নায়কোচিত গুণাবলির ঘাটতি ছিল। ইতিহাসের উষালগ্নে দেখা যায়, ইয়াহূদীরা তাদের নিজেদের রাজার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছে। কারণ তিনি ঈশ্বরের দৃষ্টিতে যা খারাপ তার সব কিছুই করেছিলেন [১ রাজাবলী (II Kings) ১৩ : ১১]। ব্যাবিলনের নেবুশাদনেযার (Nebuchadnezzar) জেরুজালেম দখল করেন। মন্দির অক্ষত রইল। কিন্তু মন্দির ও রাজপ্রাসাদের ধন-রত্ন নতুন শাসকের অধীনে ন্যস্ত হলো। ইয়াহূদীরা ব্যাবিলনীয় হানাদার শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে কালক্ষেপণ করল না। এর ফলে আবার বিদেশি হামলা হয় এবং মন্দির প্রসাদ ধ্বংস হয়।

ভাগ্যের চাকা অন্যদিকে ঘুরল। সাইরাসের (Cyrus) নেতৃত্বে পারস্যবাসীরা ব্যাবিলন জয় করে। ইয়াহূদীদের আর একবার হানাদারদের সেবায় নিয়োজিত করা হলো। তবে সাইরাস অবিলম্বেই ব্যাবিলনে এত বিপুল সংখ্যক বিদেশি লোকের উপস্থিতির বিপদ উপলব্ধি করতে সক্ষম হলেন এবং তিনি তাদের জেরুজালেমে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। তাদের মন্দির পুনর্নিমাণেরও অনুমতি দেওয়া হলো।

জেরুজালেম অভিমুখে অগ্রসর মান কাফেলার ইয়াহূদীদের সংখ্যা ছিল ৪২,৩৬০ জন। এ ছাড়া তাদের সাথে ছিল ৭,৩৩৭ জন দাস ও স্ত্রীলোক। এদের মধ্যে ছিল ২শ’ জন পুরুষ নারী গায়ক-গায়িকা। কাফেলার লোকদের বহন করে আনছিল ৭৩৬টি ঘোড়া, ২৪৫ টি খচ্চর, ৪৩৫টি উট এবং ৬,৭২০ টি গাধা (এজরা (Ezra) ২ : ৬৪-৬৯)। যে সকল প্রাণী ধন-সম্পদ বহন করে আনছিল, সেগুলো এ হিসেবের বাইরে ছিল।

জেরুজালেমে পৌঁছার পর তারা মন্দির পুনর্নিমাণের পরিকল্পনা করতে শুরু করল। এ উদ্দেশ্যে তারা ৬১ হাজার ড্রাম (Drams) সোনা ও ৫ হাজার পাউন্ড রুপা সংগ্রহ করেছিল। অবশ্য তারা ব্যাবিলন থেকে যে ধন-সম্পদ নিয়ে এসেছিল সেগুলো এ হিসাবের মধ্যে ধরা হয় নি। ব্যাবিলন থেকে ৩০ টি ঘোড়া সোনা বয়ে এনেছিল। রুপা আনার জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল ১ হাজার ঘোড়া। এ ছাড়াও মন্দিরে স্থাপনের জন্য ৫,৪০০ সোনা ও রুপার পাত মজুদ করা ছিল (এজরা ১ : ৯: ১১)। যেসব বন্দী দাস জেরুজালেমে প্রত্যাবর্তন করেছিল তারা সংখ্যা ও সম্পদ উভয়ভাবেই বৃদ্ধি লাভ করেছিল।

জেরুজালেমের শাসক হিসেবে ইয়াহূদীরা দীর্ঘকাল শান্তি উপভোগ করতে পারে নি। আলেকজান্ডার জেরুজালেম বিজয়ের পর ৩২৩ খৃষ্ট পূর্বাব্দে তার মৃত্যুর আগেই তিনি ভার জয় করেন। তার মৃত্যুর পর তার সেনাধ্যক্ষরা সাম্রাজ্যকে নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাঁটোয়ারা করে নিয়েছিলেন। টলেমি আলেকজান্দ্রিয়াকে রাজধানী করে মিশর শাসন করতে থাকেন। সেলুকাসের রাজ্যের রাজধানী হয় এন্টিওক এবং আলেকজান্ডারের অবশিষ্ট সাম্রাজ্যের রাজধানী হয় ব্যাবিলন। টলেমীয় ও সেলুসীয় শাসকরা নিজেদের মধ্যে নিরন্তর যুদ্ধ-বিগ্রহে লিপ্ত ছিলেন। গোড়ার দিকের এক লড়াইতে জেরুজালেম মিশরীয় গ্রীকদের হাতে পতিত হয়ে। নয়া শাসকরা ইসরাইলে বিপুলসংখ্যক ইয়াহূদীদের সমাবেশে খুশি ছিল না। তারা বহুসংখ্যক ইয়াহূদীকে মিসরে পাঠিয়ে দেয়। এর ফলে ইসরাইলের বাইরে প্রথমবারের মত বৃহত্তম এক ইয়াহূদী উপনিবেশ গড়ে উঠে। সেখানে তারা গ্রীক সভ্যতার ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে আসার সুযোগ লাভ করে এবং হিব্রু গ্রন্থাদি গ্রীক ভাষায় রূপান্তরিত হয়। টলেমীয় শাসকদের কাছে ইসরাইল ছিল এক সুদূরবর্তী উপনিবেশ। তাদের বাৎসরিক রাজস্ব পরিশোধ করেও ইয়াহূদীদের কাছে বিপুল পরিমাণ অর্থ থেকে যেত।

১৯৮ খৃষ্ট পূর্বাব্দে সেলুসীয় (Selucian) শাসকরা টলেমীয় শাসকদের কাছ থেকে জেরুজালেম দখল করে নেয়। জেরুজালেম ছিল তাদের একবারে হাতের কাছে। সুতরাং আগের শাসকদের মত কোনো গড়িমসি না করে তারা জেরুজালেমের লোকদের সকল বিষয়ে ব্যাপকভাবে হস্তক্ষেপ করতে শুরু করে। টলেমীয় শাসকদের মতই নয়া শাসকদের অধীনেও তাদের জীবনাচারের সাথে ইয়াহূদীদের সম্পৃক্ত করার বেপরোয়া চেষ্টার মাধ্যমে গ্রীক সংস্কৃতিমনা (Hellenised) করে তোলার প্রক্রিয়া চলতে থাকে। এন্টিওকাস এপেপলিয়ানাসের (Antiochus Epeplianus) শাসনামলে এই বলপূর্বক সাংস্কৃতিক ঐক্য সাধন প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে। তিনি সলোমনের মন্দিরে জিউসের (Zeus) একটি মূর্তি স্থাপনের মত একটি ভুল কাজ করেন। এ বিষয়টি ইয়াহূদীদের বিক্ষুব্ধ করে তোলে এবং তারা জুদাহ ম্যাকাবিসের (Judah Maccabes) নেতৃত্বে বিদ্রোহ করে। হাতুড়ি ছিল তাদের বিদ্রোহের প্রতীক। গ্রীকদের জেরুজালেমের বাইরে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। বিজয়ী ইয়াহূদীরা দেখতে পেল ধ্বংসপ্রাপ্ত মন্দির, জনশূন্য উপাসনাস্থল, অপবিত্র বেদী এবং মন্দিরের পুড়ে যাওয়া দ্বার। তারা তাওরাত অনুযায়ী মন্দির পুনঃ নির্মাণ করল। নয়া শাসকরা এতই জনপ্রিয় হয়েছিল যে, তারা একাধারে মন্দিরের উচ্চ পুরোহিত ও ইসরাঈলের রাজায় পরিণত হয়। এক হাতে সকল ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করে শাসকরা আইন-কানূনের প্রয়োগে অত্যন্ত কঠোরতা অবলম্বন করে। ইয়াহূদীরা তখন বিদেশি শাসকদের কল্যাণকর শাসনের জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়ে। নিজেদের শাসনের বিরুদ্ধে জনমনে অসন্তোষ লক্ষ্য করে ম্যাকাবিস আরো উদ্ধত ও অত্যাচারী হয়ে ওঠে। ইয়াহূদীরা আরো একবার তাদের নিজেদের শাসকদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করে। জেরুজালেমে রোমান শাসন কায়েমে এর ভূমিকা কোনো ক্রমেই ক্ষুদ্র ছিল না। যীশুর জন্মের সময় রোমকরা পূর্ববর্তী শাসকদের ভুলেরই পুনরাবৃত্তি করেছিল। তারা মন্দিরে প্রধান দরজার ওপর একটি স্বর্ণ ঈগল স্থাপন করেছিল। এ বিষয়টি ইয়াহূদীদের ক্রুদ্ধ করে তুলেছিল এবং এর ফলে রোমকদের বিরুদ্ধে উপর্যুপরি বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। ম্যাকাবিসের দু’জন অনুসারী প্রথম বিদ্রোহের পতাকা উত্তোলন করে। স্বর্ণ ঈগল ধ্বংস করাই ছিল তাদের লক্ষ্য। রোমকদের কাছে এটা শুধু রাষ্ট্রদ্রোহিতাই ছিল না, তাদের ধর্মের প্রতিও এটা ছিল অবমাননার শামিল। বহু রক্তপাতের পর বিদ্রোহ দমন করা হয়। বিদ্রোহের দু’ নেতাকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়। এর অল্পকাল পরই রোমানদের আরেকটি বিদ্রোহের

সম্মুখীন হতে হয়। এ যুদ্ধে ইয়াহূদীদের পরাজয় ঘটে এবং ২ হাজার বিদ্রোহীকে ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যা করা হয়।

ইয়াহূদীরা পরাজিত হলেও তাদের মনের মধ্যে ক্রোধ ধিকিধিকি জ্বলছিল। ৬ সনে কর ধার্যের সুবিধার জন্য সম্রাট আগাষ্টাস (Augustus) যখন ইয়াহূদীদের জনসংখ্যা গণনার নির্দেশ দেন তখনও সে ক্রোধ অত্যন্ত উঁচুমাত্রায় বিরাজিত ছিল। দেবত্ব আরোপিত সম্রাটকে কর প্রদান করা ছিল তাওরাতের শিক্ষার বিপরীত। ইয়াহূদীরা শুধু যিহোভাকেই রাজা বা সম্রাট বলে গণ্য করত। ফলে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। ইয়াহূদীদের মধ্যে উদার মনোভাবাপন্ন অংশটি উপলব্ধি করলেন যে, এই লড়াই ইয়াহূদীদের জন্য পুরোপুরি গণহত্যায় পরিণত হবে। তারা সমঝোতার আবেদন করে কর প্রদান করতে সম্মত হওয়ার মাধ্যমে অর্থহীন আত্মহত্যা থেকে তাদের জনগণকে বাঁচাতে চাইলেন। যে নেতারা এই মূল্য দিয়ে শান্তি কিনলেন তারা জনপ্রিয় হন নি, বরং তাদের ইয়াহূদী জাতির প্রতি বিশ্বাসঘাতক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

যীশুর জন্মকালীন সময় এবং যোহনের মৃত্যু পর্যন্ত সংঘটিত ঘটনার সাথে ঐ সময়ের বাস্তব ও সামাজিক পরিস্থিতির কথা ইতিমধ্যেই উল্লেখ করা হয়েছে। আমরা এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছি যেখানে সমগ্র প্রতিরোধ আন্দোলনই ঐশী অনুপ্রেরণায় উদ্দীপ্ত যীশুকে ঘিরে কেন্দ্রীভূত হয়েছিল।

কোনো কিছু করার আগে যীশুর ৪০ দিন নির্জনে বাস ও প্রার্থনা করা প্রয়োজন ছিল। তার বয়স তখন ছিল ৩০ বছর। ইয়াহূদী আইন অনুযায়ী এটা ছিল সেই বয়স যে বয়সে কোনো মানুষ তার পিতার নিয়ন্ত্রণ মুক্ত হয়। যোহন যখন মানুষের মধ্যে ধর্মপ্রচার করেছিলেন তখন তিনি রোমকদের বিরুদ্ধে সকলের রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে ছিলেন। কিন্তু যীশু এর আগে প্রকাশ্যে ধর্ম প্রচার করেন নি। সুতরাং সতর্কতার সাথে তার প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। এর আগের প্রচেষ্টার পরিসমাপ্তি ঘটেছিল বিপর্যয়ের মধ্যে দিয়ে এবং সম্প্রতি যোহনের মৃত্যুর স্মৃতি তার মনে জাগরূক ছিল। দূরদৃষ্টি ও বিচক্ষণতার সাথে তিনি ইয়াহূদীদের সংগঠিত করার কাজ শুরু করলেন। তিনি কাউকে দীক্ষা দিলেন না। এটা অকারণে রোমানদের ব্যাপক দৃষ্টি আকর্ষণ করত এবং তা বিপজ্জনক অবস্থার সৃষ্টি করতে পারত। অন্যদিকে তিনি ‘বিষাক্ত সাপ’গুলোর প্রতিরোধ আন্দোলনে অনুপ্রবেশেও বাধা দিলেন না। তিনি ইসরাইলের ১২টি গোত্রের প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে প্রচলিত প্রথায় ১২ জন শিষ্য বা অনুসারী নিয়োগ করলেন। তারা আবার তাদের নেতৃত্বে কাজ করার জন্য ৭০ জন দেশপ্রেমিককে নিয়োগ করল। ইয়াহূদীদের আচারনিষ্ঠ ধর্মীয় সম্প্রদায় ফারীসীরা গ্রামের শক্ত সমর্থ ইয়াহূদীদের (আম আল আরেজ- Am-Al Arez) সাথে শীতল সম্পর্ক বজায় রাখতে যীশু তাদের নিজের অধীনে নিয়ে এলেন। এই কৃষকদের মধ্যে অনেকেই এসেনী সম্প্রদায়ভূক্ত ছিল। তারা যীশুর ঈর্ষণীয় সমর্থকে পরিণত হয়। তার জন্য তারা জীবন দিতে প্রস্তুত ছিল। তারা পরিচিত ছিল ধর্মযোদ্ধা (Zealots) নামে। বাইবেলের মতে, ১২ জন শিষ্যের মধ্যে অন্তত ৬জন ছিল ধর্মযোদ্ধা। যীশু মূসা আলাইহিস সালামের শিক্ষা প্রত্যাখ্যান নয়, পুনঃপ্রচারের জন্য আগমন করেছিলেন। তিনি ওল্ড টেস্টামেন্টের আবেদন তুলে ধরলেন: “যে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং চুক্তি মেনে চলে, আমার পরেই তার স্থান” (ম্যাকাবিস ২ : ২৭-৩১)। বহু লোক তার অনুসারী হতে শুরু করে। কিন্তু তাদের গোপন স্থানে রাখা হত এবং নির্জন এলাকায় তাদের প্রশিক্ষণ শুরু হয়। তাদের বলা হত ‘বার ইওনিম’ (Bar Yonim) অর্থাৎ ‘নির্জনস্থানের সন্তান’। তাদের মধ্যে যারা ছুরকার ব্যবহার শিক্ষা করেছিল তারা ‘সাইকারি’ (Sicarii) বা ‘চুরিকাধারী ব্যক্তি’ নামে পরিচিত ছিল। এ ছাড়া মুষ্টিমেয় কিছু লোককে নিয়ে এক ধরনের দেহরক্ষী দল তৈরি করা হয়। তারা পরিচিত ছিল ‘বার জেসাস’ নামে পরিচিত লোকের কথা উল্লেখ করেছেন। তা সত্ত্বেও এসব লোকদের ঘিরে এক ধরনের রহস্য বিরাজ করত। ফলে তাদের সম্পর্কে বেশি কিছু জানা যায় না। এটা বোধগম্য। কারণ, তারা ছিল যীশুর অনুসারী ঘনিষ্ঠ মহলটির অংশ। তাই রোমান গুপ্তচরদের চোখের আড়ালে রাখার জন্য তাদের পরিচয় গোপন রাখা হত।

অনুসারীদের যীশু নির্দেশ দিলেন: ‘যার টাকার থলি আছে তাকে সেটা নিতে দাও, সে তাই নিয়ে থাক এবং যার কোনো তরবারি নেই তাকে তার পোশাক বিক্রি করতে দাও যাতে সে একটি কিনতে পারে (লূক ২২ : ৩৬)। যীশুর শিক্ষা অলৌকিক কর্মকান্ডে অনুপ্রাণিত হয়ে তার অনুসারীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। এসব প্রস্তুতির ফল দাঁড়াল এই যে পিলেট- (Pilate) এর উত্তর সুরী সোসিয়ানাস হিয়েরোকলস (Sossianus Hierocles) খোলাখুলিই বললেন যে, যীশু ৯শ ডাকাতের একটি দলের নেতা (‘চার্চ ফাদার’ ল্যাকটানিয়াস (Lactanius) কর্তৃক উদ্ধৃত)। জোসেফাসের রচিত গ্রন্থের মধ্যযুগীয় হিব্রু অনুলিপি থেকে দেখা যায়, যীশুর সাথে ২ হাজার থেকে ৪ হাজার সশস্ত্র অনুসারী ছিল।

এসেনীদের অনুসৃত ধর্মাদর্শ থেকে যাতে বেশিদূরে সরে না যান, সেদিকে যীশুর সতর্ক দৃষ্টি ছিল। তিনি জানতেন যে, এসেনীদের ধর্মগ্রন্থের প্রতি পৃষ্ঠাতেই গসফেল ও ঈশ্বর প্রেরিত দূতদের আচার অনুষ্ঠান ও নীতি বাক্য রয়েছে। ধর্মপ্রচারকালে যীশু তার শিক্ষা ও আদর্শ সম্পূর্ণরূপে তার অনুসারীদের কাছে প্রকাশ করেন নি। মূলত পূর্ণ সত্যটি মাত্র অতি অল্প কয়েকজনের জানা ছিল।

“তোমাদের কাছে আমার এখনও অনেক কিছু বলার বাকি আছে। কিন্তু তোমরা সেগুলো বহন করতে পারবে না। যা হোক, সেই তিনি অর্থাৎ সত্য আত্মা যখন আগমন করবেন তখন তিনি তোমাদের পূর্ণ সত্যের পথে পরিচালিত করবেন, কিন্তু তিনি নিজে থেকে কিছু বলবেন না। তিনি যা শুনবেন, তাই তিনি বলবেন।” (যোহন ১৬ : ১২-১৪)

তিনি কোনো জাগতিক ক্ষমতা চান নি। তাই তিনি দেশের শাসক যেমন হতে চাননি, তেমনি চাননি ধর্মশাস্ত্রবিদ হতে বা প্রভাবশালী ইয়াহূদী চক্রের নেতৃত্ব। কিন্তু সাধারণ মানুষের মধ্যে তার বিপুল জনপ্রিয়তা দেখে ও তার অনুসারীদের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে রোমকরা এবং তাদের সমর্থক ইয়াহূদী পুরোহিতরা শঙ্কিত হয়ে ওঠে যে, তিনি বোধ হয় শাসন ক্ষমতা দখল করতে চাইছেন। নিজেদের ক্ষমতার প্রতি হুমকি সৃষ্টি হতে যাচ্ছে ভেবে তারা তাঁকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য দ্রুত সচেষ্ট হয়ে ওঠে।

যীশুর একমাত্র লক্ষ্য ছিল স্রষ্টা যেমনটি নির্দেশ করেছেন তদনুযায়ী উপাসনার পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করা। ঐশী নির্দেশিত পন্থায় চলার পথে যে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করবে তার সাথে লড়াই করার জন্য যীশু ও তার অনুসারীরা প্রস্তুত ছিলেন।

প্রথম লড়াইটি সংঘটিত হয় রোমকদের অনুগত ইয়াহূদীদের সাথে। এ যুদ্ধে যীশুর পক্ষে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ‘বার জেসাস’ বারাববাস (Bar Jesus Barabbas) এ যুদ্ধে ইয়াহূদী দলের নেতা নিহত হলে তারা সম্পূর্ণরূপে মনোবল হারিয়ে ফেলে। কিন্তু বারাববাস গ্রেফতার হন।

পরবর্তী লক্ষ ছিল সলোমনের মন্দির। এ মন্দিরের কাছেই রোমকদের একটি শক্তিশালী বাহিনী ছিল, কারণ সেটা ছিল বাৎসরিক উৎসবের সময় এবং পূর্ব উপলক্ষে ভোজোৎসব (Feast of the Passover) ছিল আসন্ন। এ রোমক সৈন্যরা বছরের এ সময় সাধারণভাবে ছোট-খাট গোলযোগের জন্য প্রস্তুত হয়েই থাকত। তবে এবার তারা অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি সতর্ক ছিল। এরা ছাড়াও ছিল মন্দির পুলিশ যারা পবিত্র স্থানগুলো পাহারা দিত। যীশুর মন্দির অভিযানটি এমনই সুপরিকল্পিত ছিল যে, রোমক সৈন্যরা ঘটনার সময় একেবারে হত বিহবল হয়ে পড়ে। যীশু মন্দিরের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেন। এই লড়াই ‘মন্দির শুদ্ধিকরণ’ (Cleansing of the Temple) নামে খ্যাত। যোহন এর গসপেলে এ ঘটনা নিম্নোক্ত ভাষায় বর্ণনা করা হয়েছে।

“যীশু মন্দিরে সেই সব ব্যক্তিদের দেখতে পেলেন যারা গরু, ভেড়া ও পায়রা বিক্রি করছিল। মুদ্রা বিনিময়কারীরা তাদের কাজে নিয়োজিত ছিল। যীশু চাবুকের আঘাত করে গরু ও ভেড়াসহ তাদের মন্দিরের বাইরে তাড়িয়ে দিলেন। তিনি মুদ্রা ব্যবসায়ীদের টাকাগুলো ছুঁড়ে ফেলে দিলেন এবং তাদের টেবিলগুলোও উল্টিয়ে দিলেন। (যোহন ২ : ১৪)

চাবুকের আঘাত সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে কারমাইকেল (Carmichael) বলেন যে-

যেটা কার্যত ছিল এক বিরাট ঘটনা যে ক্ষেত্রে তারা মাত্র সহিংসতার আভাস দিয়েছিলেন এবং সন্দেহাতীতভাবে অতি সামান্যতম আঘাত মাত্র হেনেছিলেন। আমরা যদি শুধু সেই মন্দিরের আয়তন কল্পনা করি, যার ভিতর ও বাইরে সমবেত হয়েছিল বহু হাজার লোক, অসংখ্য সেবক, পুলিশ বাহিনী রোমক সৈন্যরা, পাশাপাশি মুদ্রা ব্যবসায়ীদের ব্যাপারে কিছু না বলে শুধু গরু বিক্রেতাদের প্রতিক্রিয়ার কথা ভাবি, আমরা দেখতে পাই যে, কাজটি ছিল বিস্ময়কর ব্যাপারের চাইতেও অনেক বেশি কিছু। চতুর্থ গসপেলে এ ঘটনার যে বর্ণনা রয়েছে আসল ঘটনা ছিল একেবারেই ভিন্নতর। ইতিহাসকার বাস্তবতার বাইরে ঘটনাটিকে ‘ঐশ্বরিকীকরণে’র মাধ্যমে তাৎপর্যহীন করে ফেলেছেন।

প্রতিটি যোদ্ধার এ বিষয়টি জানা ছিল যে, স্থানীয় পুলিশদের সহানুভূতি ছিল দেশপ্রেমিকদের প্রতি, দখলদার সেনাবাহিনীর প্রতি নয়। এ বিষয়টি মন্দিরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার একটি কারণ হতে পারে।

রোমকরা স্থানীয়ভাবে বিপর্যয়ের সম্মুখীন হলেও তাদের শক্তি চূর্ণ হয় নি। তার শক্তি বৃদ্ধির জন্য সাহায্য চেয়ে পাঠালে নতুন সৈন্য দল জেরুজালেমের দিকে অগ্রসর হয়। জেরুজালেমের তোরণ রক্ষার লড়াই কয়েকদিন ধরে চলে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেশ প্রেমিক বাহিনীর তুলনায় রোমান বাহিনী অনেক বেশি শক্তিশালী প্রমাণিত হয়। তার সকল অনুসারী পিছু হটে যায়। এমনকি যীশুর ঘনিষ্ঠ শিষ্যরাও পলায়ন করে। তার সাথে মাত্র সামান্য কিছু মানুষ অবশিষ্ট ছিল। যীশু আত্মগোপন করলেন। রোমানরা তাকে খুঁজে বের করার জন্য ব্যাপক তল্লাশি শুরু করে।

যীশুর গ্রেফতার, ‘বিচার’ এবং ‘ক্রুশবিদ্ধ’ করা নিয়ে এত বেশি পরস্পর বিরোধী ও বিভ্রান্তিকর বিবরণ পাওয়া যায় যে, তার মধ্য থেকে বাস্তবে কি ঘটেছিল তা জানা অত্যন্ত দুষ্কর। আমরা দেখতে পাই যে, রোমক সরকার স্বল্পসংখ্যক ইয়াহূদীদের আনুগত্য ও সেবা লাভ করতে সক্ষম হয়েছিল। কারণ জেরুজালেমে রোমক শাসন অব্যাহত থাকলে এ বিশেষ মহলটির স্বার্থ রক্ষিত হতো।

যীশুর এক শিষ্য জুডাস ইসক্যারিয়ট (Judas Iscariot) যীশুকে গ্রেফতারের কাজে সাহায্য করার বিনিময়ে ৩০ টি রৌপ্যখণ্ড লাভের প্রতিশ্রুতি পেয়ে রোমকদের দলে ভিড়ে যায়। যে কোনো ধরনের গোলযোগ এড়াতে রাতের বেলায় যীশুকে গ্রেফতার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যীশু যে স্থানে তার কয়েকজন সঙ্গীসহ অবস্থান করছিলেন সেখানে পৌঁছে জুডাসকে যীশুকে চুম্বন করার নির্দেশ দেওয়া হয় যাতে বিদেশি রোমক সৈন্যরা সহজেই তাকে শনাক্ত করতে পারে। কিন্তু পরিকল্পনাটি ভন্ডুল হয়ে যায়। সৈন্যরা অন্ধকারের মধ্যে দিশা হারিয়ে ফেলে। দু’জনকেই অন্ধকারের মধ্যে এক রকম মনে হচ্ছিল। সৈন্যরা ভুল করে যীশুর পরিবর্তে জুডাসকে গ্রেফতার করে। এর পরে যীশু পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।

এ ব্যাপারে পবিত্র কুরআন মজীদে বলা হয়েছে: তারা তাকে হত্যা বা ক্রুশবিদ্ধ করে নি, কিন্তু তাদের এরূপ বিভ্রম হয়েছিল।

বন্দীকে যখন রোমক বিচারক পিলেট-এর সামনে হাযির করা হলো, ঘটনার নাটকীয়তা সকলকেই সন্তুষ্ট করেছিল। অধিকাংশ ইয়াহূদী উল্লসিত হয়ে উঠেছিল এ কারণে যে অলৌকিকভাবে বিশ্বাসঘাতক নিজেই কাঠগড়ায় দণ্ডায়মান ছিল, যীশু নন। অন্যদিকে রোমকদের অনুগত ইয়াহূদীরা খুশি হয়েছিল এ কারণে যে জুডাসের মৃত্যু হলে তাদের অপরাধের প্রমাণ বিলুপ্ত হবে। উপরন্তু যেহেতু আইনের দৃষ্টিতে যীশুর মৃত্যু ঘটবে সে কারণে তিনি আর প্রকাশ্য আত্ম প্রকাশ করে তাদের জন্য কোনো সমস্যা সৃষ্টি করতে পারবেন না।

রোমক বিচারক পিলেট বিচার কাজে কী ভূমিকা পালন করেছিলেন তা জানা যায় না। বাইবেলে বলা হয়েছে যে, তিনি সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিলেন। ইয়াহূদী নেতাদের প্রতি তার পক্ষপাতিত্ব ছিল, অন্যদিকে যীশুর প্রতিও তার সহানুভূতি ছিল। ফলে এ ব্যাপারে এমন এক কাহিনী তৈরি হয় যা বিশ্বাস করা কঠিন। গসপেলের লেখকরা যীশুকে ক্রুশবিদ্ধ করে তার সকল দায়-দায়িত্ব সমগ্র ইয়াহূদী জাতির ওপর চাপিয়ে দিতে এবং যীশুর কথিত মৃত্যুর দায় থেকে রোমকদের মুক্ত করার যে চেষ্টা চালিয়েছিলেন, তার ফলশ্রুতিতেও প্রকৃত ঘটনা তালগোল পাকানো হতে পারে। এ ক্ষেত্রে একমাত্র পথ হতে পারত এই ঘটনা সম্পর্কে এমন একটি সরকারী বিবরণ যা দেশি শাসকদের জন্য ক্ষতিকর হত না এবং সেখানে কর্তৃপক্ষ যাতে অসন্তুষ্ট বা ক্রুদ্ধ না হয় সে জন্য প্রকৃত ঘটনা প্রয়োজন বোধে কিছুটা ঘুরিয়ে লেখা। আর তৎকালীন পরিবেশে শুধু এ ধরনের বিবরণই টিকে থাকা সম্ভব ছিল।

অতএব, একটি শক্তিশালী সূত্রে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে যে, পিলেট ৩০ হাজার পাউন্ডের সমপরিমাণ অর্থ ঘুষ গ্রহণ করেন। গসপেলে যা বর্ণিত হয়েছে তা যদি সত্য হয়ে থাকে তাহলে এটা নিশ্চিত যে, সেদিন জেরুজালেমে যে নাটক অনুষ্ঠিত হয় সেখানে পিলেট একটি বিশেষ মহলের স্বার্থে কাজ করেছিলেন।

সর্বশেষ আর একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনার কথা উল্লেখ করা যায়। মিশর ও ইথিওপিয়ার কপ্টিক চার্চের সন্তদের (Saints of the Coptic Church) ক্যালেন্ডারগুলো থেকে দেখা যায়, পিলেট ও তার স্ত্রী ‘সন্ত’ (Saints) হিসেবে গণ্য হয়েছেন। এটা শুধু তখনই হওয়া সম্ভব যদি মেনে নেওয়া যায় যে, পিলেট সৈন্যদের ভুল ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবহিত ছিলেন এবং তিনি জেনেশুনেই জুডাসকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে যীশুকে পালিয়ে যাবার সুযোগ করে দেন।

বার্ণাবাসের বিবরণে বলা হয়েছে যে, গ্রেফতারের সময় স্রষ্টার ইচ্ছায় জুডাস যীশুর চেহারায় পরিবর্তিত হন এবং তা এতই নিখুঁত ছিল যে, তার মাতা ও ঘনিষ্ঠ অনুসারীরাও তাকে যীশু বলেই বিশ্বাস করেছিলেন। জুডাসের মৃত্যুর পর যীশু তাদের কাছে হাযির না হওয়া পর্যন্ত তারা বুঝতেই পারেন নি যে, প্রকৃতপক্ষে কী ঘটে গেছে। এ থেকেই বোঝা যায়, তৎকালীন পরিবেশ ও পরিস্থিতিতে কেন এই বিভ্রান্তি ঘটেছিল এবং কেন কোনো কোনো লেখক এ ঘটনার বর্ণনা করতে গিয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থেকেও যীশুর ক্রুশবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর ভ্রান্ত কথা সমর্থন করে গেছেন।

যীশুর সাথে বিশ্বাসঘাতকতাকারী বলে উল্লিখিত ব্যক্তি ক্রুশবিদ্ধ হয়ে মারা গিয়েছিল কিনা সে ব্যাপারে সকলেই সম্পূর্ণ একমত নন। গোড়ার দিকের খৃষ্টানদের মধ্যে সেরিনথিয়ানস (Cerinthians) ও পরে ব্যাসিলিডিয়ানস (Basilidians) যীশুর ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন। তারা বিশ্বাস করতেন যে, যীশুর বদলে সাইরিন এর সাইমন (Simon of Cyrene) ক্রুশবিদ্ধ হয়েছিলেন। পিটার, পল ও জন এর সমসাময়িক সেরিনথিয়ানস যীশুর পুনরুত্থানের কথাও স্বীকার করেন। গোড়ার দিকের আরেকটি খৃষ্টান সম্প্রদায় কার্পোক্রেশিয়ানরা (Carpocratians) বিশ্বাস করত যে, যীশু নয়, হুবহু তার মত দেখতে তার এক অনুসারীকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছে। চতুর্থ শতাব্দীর মানুষ প্লাটিনাস (Platinus) বলেছেন যে, তিনি ‘দি জার্নি’স অব অ্যাপোসলস, (The Journies of the Apostles) নামক একটি গ্রন্থ পাঠ করেন যা পিটার, জন, অ্যান্ড্রু, টমাস ও পলের কর্মকান্ড সম্পর্কে রচিত হয়েছিল। অন্যান্য বিষয়ের সাথে এখানেও বলা হয়েছে যে, যীশু ক্রুশবিদ্ধ হন নি, তার স্থানে অন্য ব্যক্তি ক্রুশবিদ্ধ হয় এবং যারা বিশ্বাস করেছিল যে, তারা ক্রুশবিদ্ধ করে তাঁকে হত্যা করেছে, তাদের তিনি উপহাস করতেন। এভাবে দেখা যায়, যীশু ক্রুশবিদ্ধ হন নি বলে জানা গেলেও সে কালের লেখকগণ বা ঐতিহাসিকরা যীশুর স্থলে কে ক্রুশবিদ্ধ হয়ে মারা গেলেন তার ব্যাপারে মতপার্থক্যের শিকার কিংবা সুনির্দিষ্ট কিছু বলতে অপারগ। কেউ কেউ কিছুই বিশ্বাস করতে চান না।

যখন কেউ রোমান সৈনিকদের দৌরাত্ম্যের কথা বর্ণনা করেন তিনি আক্ষরিকভাবেই ওল্ড টেস্টামেন্টের নির্দিষ্ট কয়েকটি অনুচ্ছেদের পুনরাবৃত্তি করেন……… তখনই পুরো বিষয়টিই নিছক কল্পনাপ্রসূত আবিষ্কার বলে সন্দেহ জেগে ওঠে।

বার্নাবাসের গসপেল (Gospel of Barnabas) ও কুরআন ছাড়া যীশুর ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার পর কী ঘটেছিল, সে সম্পর্কে কোনো ঐতিহাসিক রেকর্ড নেই। উক্ত বার্নাবাসের গসপেল ও কুরআনে এ ঘটনার বর্ণনা রয়েছে যাকে ৪টি স্বীকৃত গসপেলেই ‘ঊর্ধ্বারোহন’(Ascension) বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। যার অর্থ তাকে পৃথিবী থেকে তুলে নেওয়া হয়েছিল।


[1] লূক: ১ : ২৬-৩৯।