কুরআন ও সুন্নাহের ওপর আরোপিত বিভিন্ন প্রশ্নের জাওয়াব

অনুবাদক: জাকেরুল্লাহ আবুল খায়ের।। সম্পাদক: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

প্রশ্ন: রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, ,« مَنْ سَنَّ فِى الإِسْلاَمِ سُنَّةً حَسَنَةً فَلَهُ أَجْرُهَا وَأَجْرُ مَنْ عَمِلَ بِهَا إلى يوم القيامة» “যে ব্যক্তি ইসলামে ভালো কোন আদর্শ স্থাপন করল, তার জন্য রয়েছে তার সাওয়াব এবং কিয়ামত অবধি যত মানুষ তার ওপর আমল করবে তার সাওয়াব।” এটি কি হাদীস? যদি হাদীস হয় তাহলে ইসলামে কারো জন্য কোন একটি সুন্নাত চালু করার সুযোগ কি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রেখে গিয়েছেন? আশা করি বিষয়টি বিস্তারিত জানাবেন।

উত্তর: হাদীসটি বিশুদ্ধ। হাদীসটি সুন্নাতকে জীবিত করা, সুন্নাতের প্রতি মানুষকে দাওয়াত দেওয়া এবং বিদআত ও অন্যায়ের প্রচলন করা থেকে মানুষকে সতর্ক করার প্রমাণ। কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,« مَنْ سَنَّ فِى الإِسْلاَمِ سُنَّةً حَسَنَةً فَلَهُ أَجْرُهَا وَأَجْرُ مَنْ عَمِلَ بِهَا بَعْدَهُ مِنْ غَيْرِ أَنْ يَنْقُصَ مِنْ أُجُورِهِمْ شَىْءٌ وَمَنْ سَنَّ فِى الإِسْلاَمِ سُنَّةً سَيِّئَةً كَانَ عَلَيْهِ وِزْرُهَا وَوِزْرُ مَنْ عَمِلَ بِهَا مِنْ بَعْدِهِ مِنْ غَيْرِ أَنْ يَنْقُصَ مِنْ أَوْزَارِهِمْ شَىْءٌ » “যে ব্যক্তি ইসলামে ভালো কোন আদর্শ স্থাপন করল, তার জন্য রয়েছে তার সাওয়াব এবং তার পরবর্তী কিয়ামত অবধি যত মানুষ তার ওপর আমল করবে তার সাওয়াব। তাতে তার সাওয়াব থেকে কোন প্রকার ঘাটতি হবে না। আর যে ব্যক্তি ইসলামে কোন খারাপ কর্ম চালু করল, তার জন্য রয়েছে তার কর্মে গুনাহ এবং তার পরবর্তী কিয়ামত অবধি যত মানুষ তার ওপর আমল করবে তাদের গুনাহ। তাতে তাদের গুনাহে কোন ঘাটতি হবে না।”[1]

একই ধরনের হাদীস আবু হুরায়রাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, «مَنْ دَعَا إِلَى هُدًى كَانَ لَهُ مِنَ الأَجْرِ مِثْلُ أُجُورِ مَنْ تَبِعَهُ لاَ يَنْقُصُ ذَلِكَ مِنْ أُجُورِهِمْ شَيْئًا وَمَنْ دَعَا إِلَى ضَلاَلَةٍ كَانَ عَلَيْهِ مِنَ الإِثْمِ مِثْلُ آثَامِ مَنْ تَبِعَهُ لاَ يَنْقُصُ ذَلِكَ مِنْ آثَامِهِمْ شَيْئًا ومن سن سنة سيئة فعمل بها بعده كان عليه وزره ومثل أوزارهم من غير أن ينقص من أوزارهم شيئا». “যে ব্যক্তি কাউকে হিদায়াতের প্রতি দাওয়াত দেয়, যে তার অনুসরণ করে তার সাওয়াবের মধ্যে কম করা ছাড়া তার সমপরিমাণ সাওয়াব তাকে দেওয়া হবে। আর যে ব্যক্তি কোন গোমরাহীর দিকে কাউকে আহ্বান করে, তার অনুসরণ কারীর গুনাহের সমপরিমাণ গুনাহ হবে। তবে তার গুনাহের মধ্যে কোন কমতি করা হবে না। আর যে ব্যক্তি ইসলামে কোন খারাপ কর্ম চালু করল, তার জন্য রয়েছে তার কর্মের গুনাহ এবং তার পরবর্তী কিয়ামত অবধি যত মানুষ তার অনুসরণ করবে তাদের গুনাহ। তাতে তার গুনাহ একটুও কমানো হবে না।”[2]

অনুরূপভাবে আবু মাসউদ আল-আনসারী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, « مَنْ دَلَّ عَلَى خَيْرٍ فَلَهُ مِثْلُ أَجْرِ فَاعِلِهِ » “যে ব্যক্তি কোন মানুষকে ভালো কর্মের প্রতি পথ দেখালো, তার জন্য ঐ ভালো কর্মটি করার সমপরিমাণ সাওয়াব মিলবে।”[3] এর অর্থ, যে সুন্নাতটি মানুষের কাছ থেকে হারিয়ে বা বিলুপ্ত হয়ে গেছে এমন একটি সুন্নাতকে পুনর্জীবিত করলো, প্রচার করল এবং তুলে ধরল। সে মানুষকে তার প্রতি আহ্বান করতে থাকে, তার প্রচার করে, গুরুত্ব বর্ণনা করে। তখন যারা তার কথায় অনুসরণ করবে তাদের সমপরিমাণ সাওয়াব পাবে। এর অর্থ এ নয় যে, কোন একটি সুন্নাতকে আবিষ্কার করা। কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদআত থেকে নিষেধ করেছেন এবং বলেছেন, وان كل بدعة ضلالة“সব বিদআতই গোমরাহী।”[4] সমস্ত আহলে ইলমদের মতৈক্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী একটি অপরটির সত্যায়ন কারী একটি অপরটির বিরোধী নয়। হাদীস দ্বারা জানা গেল হাদীস দ্বারা উদ্দেশ্য পুনর্জীবিত করা, প্রচার করা।

এর দৃষ্টান্ত: যে দেশে কুরআন বা হাদীসের শিক্ষা চালু নেই সে দেশে একজন আলেম কুরআন ও হাদীসের শিক্ষা চালু করল, মানুষকে কুরআন ও হাদীস শিক্ষা দেয়ার উদ্দেশ্যে অবস্থান করল এবং  দেশের মধ্যে শিক্ষার  সুন্নাতটি চালু করল। অথবা এ দেশে বিভিন্ন দেশ থেকে শিক্ষকদের উপস্থিত করে কুরআন ও সুন্নাহ শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করল। অথবা কোন দেশের মানুষ তাদের দাড়ি মুন্ডায় বা ছোট করে। তখন লোকটি ঐ দেশে গিয়ে দাড়ি লম্বা করা এবং দাড়ি না কাটার বিষয়ে উদ্ভুদ্ধ করল। দেশটির মানুষ যে সুন্নাত সম্পর্কে জানতো না লোকটি সে মহান সুন্নাতকে পুনর্জীবিত করল। তার কারণে যে সব লোকেরা এ মহান সুন্নাতটির অনুসরণ করবে সে তাদের সমপরিমাণ সাওয়াব পাবে। আব্দুল্লাহ ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, قُصُّوا الشَّوَارِبَ وَأَعْفُوا اللِّحَى خَالِفُوا الْمُشْرِكِينَ “তোমরা গোপ ছোট কর এবং দাড়ি লম্বা কর মুশরিকদের বিরোধিতা করা।”[5] মানুষ যখন দেখল, লোকটি নিজে দাড়ি রেখেছে এবং মানুষকে দাড়ি রাখার প্রতি দাওয়াত দিয়েছে তখন তার অনুসরন করল। ফলে তাদের মাঝে সুন্নাতটি চালু করার কারণে তাদের আমল করার সাওয়াব তিনি পেয়ে যাবেন। ওপরে উল্লিখিত হাদীস এবং একই অর্থের আরো অন্যান্য হাদীসের কারণে সুন্নাতটি গুরুত্বপূর্ণ একটি ওয়াজিব যা ছেড়ে দেওয়া কোন ক্রমেই বৈধ নয়।  অনুরূপভাকে কোন দেশের মানুষ জুমুআর সালাত আদায় করত না। একজন লোক সেখানে গিয়ে জুমু‘আর সালাত চালু করল। তাহলে তিনি তাদের জু‘মুআর সালাত আদায় করা সাওয়াব পেয়ে যাবেন। অনুরূপভাবে কোন এলাকার মানুষ সালাতুল ভিতির সম্পর্কে অজ্ঞ। তখন তিনি তাদের সালাতুল ভিতির শেখালেন এবং তার অনুসরণে সালাতুল ভিতির আদায় করল। অথবা এ ধরনের অন্য কোন ইবাদত বা শরী‘আতের জরুরী কোন বিধান কোন দেশে চালু করল। সুতরাং, যে ব্যক্তি তাদের মধ্যে সুন্নাতটি প্রচার করল, পুনর্জীবিত করল এবং মানুষের মধ্যে তুলে ধরল, তাকে বলা হবে, ইসলামে সে একটি ভালো রীতি চালু করল। অর্থাৎ, ইসলামের বিধান প্রচার করল এবং সে এমন লোকদের অর্ন্তভুক্ত হবে যারা ইসলামের মধ্যে একটি ভালো রীতি চালু করলেন।

এ দ্বারা দীনের মধ্যে এমন কিছু আবিষ্কার করা উদ্দেশ্য নয়, যার অনুমতি আল্লাহ তা‘আলা দেননি। সব ধরনের বিদআতি গোমরাহী। কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিশুদ্ধ হাদীসে বলেছেন- وإياكم ومحدثات الأمور فان كل محدثة بدعة وان كل بدعة ضلالة “তোমরা নব আবিষ্কৃত বিষয়সমূহ থেকে বেঁচে থাক। কারণ প্রতিটি নব আবিষ্কৃত বস্তু বিদআত, আর প্রতিটি বিদআত গোমরাহী।” অপর একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, . مَنْ عَمِلَ عَمَلًا لَيْسَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا فَهُوَ رَدٌّ“যে ব্যক্তি এমন কোন আমল করল যার ওপর আমাদের কোন নির্দেশনা নেই তা প্রত্যাখ্যাত।”[6] অপর শব্দে « مَنْ أَحْدَثَ فِى أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدٌّ ». “যে ব্যক্তি আমাদের এ দীনের মধ্যে এমন কোন কর্ম আবিষ্কার করল যা এ দীনের বিষয় নয় তা প্রত্যাখ্যাত।”[7]

জুমু‘আর সালাতের খুতবায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, «أَمَّا بَعْدُ فَإِنَّ خَيْرَ الْحَدِيثِ كِتَابُ اللَّهِ وَخَيْرُ الْهُدَى هُدَى مُحَمَّدٍ وَشَرُّ الأُمُورِ مُحْدَثَاتُهَا وَكُلُّ بِدْعَةٍ ضَلاَلَةٌ » “অতঃপর সবোর্ত্তম কথা হলো, আল্লাহ কিতাব, আর সবোর্ত্তম আদর্শ হলো, রাসূলুল্লা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ । আর সবচেয়ে নিকৃষ্ট বিষয় হলো নব আবিষ্কৃত বিষয়। এবং প্রতিটি নব আবিষ্কৃত বিষয় গোমরাহী।”[8] যে ইবাদতের প্রচলন আল্লাহ তা‘আলা করেননি, তার প্রতি মানুষকে আহ্বান করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও অবৈধ। এ ধরনের লোককে সাওয়াব দেওয়া হবে না বরং এ ধরনের কর্ম করা এবং তার প্রতি দাওয়াত দেওয়া সম্পূর্ণ বিদআত এবং আহ্বানকারী গোমরাহীর প্রতি দাওয়াত দাতা হিসেবে বিবেচিত হবে। এ ধরনের লোকদের দুর্নাম করে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,  ﴿أَمۡ لَهُمۡ شُرَكَٰٓؤُاْ شَرَعُواْ لَهُم مِّنَ ٱلدِّينِ مَا لَمۡ يَأۡذَنۢ بِهِ ٱللَّهُۚ ٢١﴾ [الشورى: ٢١]  “তাদের জন্য কি এমন কিছু শরীক আছে, যারা তাদের জন্য দীনের বিধান দিয়েছে, যার অনুমতি আল্লাহ দেননি”? [সূরা আশ-শুরা, আয়াত: ২১] ।  আল্লাহ তা‘আলাই তাওফীক দাতা।

শাইখ আব্দুল আযীয বিন বায রহ.

[1] বর্ণনায় সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৩৯৮

[2] বর্ণনায় সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৬৯৮০

[3] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৫০০৭

[4] ইবনু মাযা, হাদীস নং ৪২

[5] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫৮৯২; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৬২৫

[6] সহীহ বুখারী, হাদীন নং ৭২৫০

[7] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৫৫০; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৪৫৮৯

[8] বর্ণনায় সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২০৪২

ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে। তাহলে আপনিও ব্লগের কার্যক্রম কে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার লেখণী পাঠাতে পারেন।আপনার লেখনী পাঠিয়ে আমাদের ফেচবুক পেজের ম্যাসেঞ্জারে গিয়ে দয়াকরে নক করুন।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন