মূল: ড. মাজহার কাজি । অনুবাদ: মাওলানা ফয়জুলাহ− মুজহিরী। সম্পাদনা: এম মুসলেহ উদ্দিন

কুরআন মাজিদের একটি অনন্য দিক হল, তা এমন অসংখ্য আয়াত ধারণ করে কার্যকারণ, যুক্তি কিংবা সাধারণ বোধের মাধ্যমে যেগুলির ব্যাখ্যা দেয়া যায় না। কুরআন মাজিদ এমন কিছু ঘটনা বা বিষয়ের বর্ণনা দেয়, আরব উপদ্বীপ কিংবা আরব সমাজের শারীরিক কিংবা পরিবেশগত অবস্থার সঙ্গে যার কোনো সম্পর্ক নেই, যেখানে কুরআন মাজিদ সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয়।

এটাও স্মর্তব্য যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর প্রাপ্ত বয়সে কেবল একবারই দীর্ঘ সফর করেছেন, মক্কা থেকে সিরিয়ায়। কুরআন মাজিদে বর্ণিত ঘটনাগুলি না মক্কা থেকে সিরিয়া যাবার পথে দৃষ্টিগোচর হয়, আর না তা সিরিয়ায় দেখা যায়। অধিকন্তু, কুরআন মাজিদে এমন কিছু ঐতিহাসিক ঘটনা ও সেসবের নিদর্শন বর্ণিত হয়েছে কুরআন অবতরণের প্রাক্কালে আরব-সমাজ যে সম্পর্কে ছিল সম্পূর্ণ বেখবর। তবে কুরআন মাজিদ এসব ঘটনার এমন যথার্থ  ও সবিস্তার বিবরণ প্রদান করে, মনে হবে যেন তা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষকৃত। তাছাড়া কুরআন মাজিদের প্রতিটি বর্ণনাই বিজ্ঞান, ইতিহাস, ভূগোল ইত্যাদির সাম্প্রতিক গবেষণার সঙ্গে সম্পূর্ণ সঙ্গতিপূর্ণ। এভাবে এসব বর্ণনা কুরআন মাজিদের রহস্য, যা কেবল আল্লাহ তাআলা প্রদত্ত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মুজিজা বলেই ব্যাখ্যা দেয়া যেতে পারে। নিম্নে কুরআন মাজিদের কিছু রহস্য তুলে ধরা হল :

মুজিজা-৮৬

সাগর তরঙ্গ

অথবা (অবিশ্বাসীদের অবস্থা) প্রমত্ত সমুদ্রের বুকে গভীর অন্ধকারের ন্যায়, যাকে উদ্বেলিত করে তরঙ্গের ওপর তরঙ্গ, যার ওপর আছে ঘন কালো মেঘ। অন্ধকার, একের ওপর এক। যখন সে তার হাত বের করে, তখন তাকে একেবারেই দেখতে পায় না। আল্লাহ যাকে জ্যোতি দেন না তার কোনো জ্যোতিই নেই। (নূর, ২৪ : ৪০)

উল্লেখ্য যে, মক্কা ও মদিনা, যেখানে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর জীবনের পুরো সময়ই অতিবাহিত করেছেন, তা সমুদ্রের নিকটবর্তী ছিল না। অধিকন্তু তিনি তার পুরো জীবদ্দশায় কখনো সমুদ্র যাত্রা করেন নি। তথাপি সমুদ্র তরঙ্গ সম্পর্কে তাঁর এই বর্ণনা বাস্তবতার অধিক নিকটবর্তী।

গ্রে মিলার (Gray  Miller) তাঁর The  Amazing  Quran’ নামক গ্রন্থে নিম্নলিখিত ছোট ঘটনাটি বর্ণনা করেন, ‘একজন মুসলিম এক সমুদ্র-বণিককে কুরআন মাজিদের একটি কপি দেয়। লোকটি ইসলামের ইতিহাস সম্পর্কে কিছুই জানত না। যখন সে কুরআন মাজিদ পাঠ শেষ করল, সে তার মুসলমান বন্ধুকে জিজ্ঞেস করল, ‘এই লোক, (মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালাম)− কি একজন নাবিক ছিলেন? যখন তাকে বলা হল, তিনি সবসময় একটি মরুময় এলাকায় বসবাস করতেন এবং সম্ভবত সমগ্র জীবনে তিনি একবারের জন্যও সমুদ্র দেখেন নি। তখন লোকটি সেখানেই কালেমা পড়ে মুসলমান হয়ে যায়। সে স্বীকার করল, কুরআন মাজিদের এই বর্ণনা কেবল তিনিই দিতে পারেন যিনি প্রকতৃ প্রস্তাবে সামুদ্রিক ঝড় প্রত্যক্ষ করেছেন। অথচ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনো তা প্রত্যক্ষ করেন নি।রহস্য

আরও লক্ষনীয়, এই আয়াতটি একটি গভীর সমুদ্রের অবস্থা বর্ণনা করে, যাতে রয়েছে বড় বড় ঢেউ, অন্য বড় বড় ঢেউয়ের উপর, একটির ওপর অন্যটি। মানুষ এই বিষয়টি দেখতে পেয়েছে সাবমেরিন আবিষ্কারের পর। সর্বপ্রথম নিউক্লিয়ার সাবমেরিন আবিষ্কৃত হয় ১৯৫৪ সালে। তখনই সর্বপ্রথম গভীর সমুদ্রের তরঙ্গ-রহস্য অবলোকন করা সম্ভব হয়। তখনই জানা যায়, সমুদ্রের উপরিভাগের নিচে যে পানি রয়েছে তা স্থির ও শান্ত নয়। সাগরের নিম্নদেশেও ঢেউ আবিষ্কৃত হয়, যাকে বর্তমানে গভীর সমুদ্রস্রোত নামে অভিহিত করা হয়। যেগুলি একটির ওপর অপরটি প্রবাহিত হয়। প্রায়ই সেগুলি এত উন্মত্ত হয় যে, সাগরের তলদেশের মাটি একস্থান থেকে অন্যস্থানে সরিয়ে নিয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা ব্যাতীত আর কে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে সমুদ্র তলদেশের এই তথ্য দান করেছেন?রহস্য

মুজিজা-৮৭

নদী ও সমুদ্রের পানির মিশ্রণ

তিনিই সমান্তরালে দুই পানির ধারা প্রবাহিত করেছেন। একটি সুস্বাদু ও মিষ্ট আর অপরটি লবণাক্ত ও বিস্বাদযুক্ত। আর তিনি উভয়ের মাঝখানে রেখেছেন একটি অন্তরায়, একটি দুর্ভেদ্য অন্ত রায়। (ফুরকান, ২৫ : ৫৩)

এই আয়াতের একটি ব্যাখ্যা হল, কুরআন মাজিদ এখানে সাগরের পানির সঙ্গে নদীর পানির মিশ্রণের বিবরণ দিচ্ছে। উভয় প্রকারের পানি দেখতে একই; কিন্তু নদীর পানি সুমিষ্ট ও সুস্বাদু এবং সমুদ্রের পানি লবণাক্ত ও বিস্বাদ। তাছাড়া কোনো মানুষই এই দুই ধরনের পানির স্রোতের মাঝে এমন সূক্ষ্ম বিভেদরেখা টানতে সক্ষম নয়।

আমাদের আরও স্মরণ রাখতে হবে, পুরো আরব উপদ্বীপে কোনো নদী বলতে নেই। ফলে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এমন ব্যাপার প্রত্যক্ষ করার কোনো ধরনের সুযোগ ঘটে নি। বলাবাহুল্য, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন কোনো বিষয়ে যথাযথ ধারণা বা কল্পনা করতে পারেন না, যা তিনি তার পুরো জীবনে কখনো প্রত্যক্ষ করেন নি। এই আয়াতটি কুরআন মাজিদ প্রকৃতিগতভাবে আসমানি গ্রন্থ হওয়ার এক অনন্য স্মারক।রহস্য

কুরআন মাজিদের উপরোক্ত আয়াত বলে, ‘আল্লাহ তাআলা দুইটি সমুদ্রকে সমান্তরালে প্রবাহিত করেছেন….এবং উভয়ের মাঝখানে একটি অন্তরায় রয়েছে।’ বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি আবিষ্কার করেছেন, উভয় প্রকারের পানির স্রোতের মধ্যে লবণাক্ততা, ঘনত্ব, ও তাপমাত্রার তারতম্য রয়েছে। তারা এও আবিষ্কার করেছেন, যখন পানি উপরের স্রোত থেকে নিচের স্রোতে প্রবেশ করে কিংবা বিপরীতক্রমে প্রবাহিত হয়, তখন তৎক্ষণাৎ তার অবস্থা অন্য স্রোতের পানির অনুসরণে বদলে যায়। এভাবে সেখানে দু’ধরনের পানি স্বাধীনভাবে মিশে যায়; কিন্তু উভয়ে স্ব স্ব বৈশিষ্ট্য অক্ষুন্ন  রাখে। বিজ্ঞানীরা তা আবিষ্কারের শত শত বছর পূর্বে কুরআন মাজিদ এমন একটি জটিল বিষয় শনাক্ত করেছে।রহস্য

মুজিজা-৮৮

লুত সম্প্রদায়ের আজাব মুজিজা

 যখন আমার প্রেরিত ফেরেশতাগণ লুতের কাছে আগমন করল, তখন তাদের কারণে তিনি বিষন্ন হয়ে পড়লেন এবং তার মন তাদের (রক্ষার) ব্যাপারে সংকীর্ণ হয়ে গেল। তারা বলল, ভয় করবেন না এবং দুঃখ করবেন না। আমরা আপনাকে এবং আপনার পরিবার বর্গকে রক্ষা করবই। আপনার স্ত্রী ব্যাতীত, সে ধ্বংসপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত থাকবে। আমরা এই জনপদের অধিবাসীদের ওপর আকাশ থেকে আজাব নাজিল করব তাদের পাপাচারের কারণে। আমি (আল্লাহ) তাতে বুদ্ধিমান সম্প্রদায়ের জন্যে একটি স্পষ্ট নিদর্শন রেখে দিয়েছি। (আনকাবুত, ২৯ : ৩৩-৩৫)

এই আয়াতসমূহে লুত আলাইহিস সালাম-এর সম্প্রদায়ের ওপর নাজিলকতৃ আযাবের উল্লেখ রয়েছে। তারা সমকামিতার মত জঘণ্য অপরাধে অভ্যস্ত ছিল। ফলে আল্লাহ তাআলা তাদের জনপদকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেন।রহস্য

আয়াতগুলিতে স্পষ্ট নিদর্শন বলতে ‘সাদুম’ ও ‘গোমরাহ’ সম্প্রদায়ের জনপদগুলির ধ্বংসাবশেষকে বুঝানো হয়েছে, যা সম্প্রতি মৃত সাগরের কাছে আবিষ্কৃত হয়েছে। ভৌগলিকরা দেখতে পেয়েছেন, অঞ্চলটি প্রচুর পরিমাণে গন্ধকে ভর্তি। ফলে সমগ্র অঞ্চলটিতে প্রাণী বা উদ্ভিদ কোনো ধরনের জীবনের অস্তিত্ব নেই। পুরো এলাকা সর্বাঙ্গীন ধ্বংসের একটি নিদর্শন হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। এভাবে এটি সকল যুগের মানুষের জন্য আল্লাহর শাস্তির একটি উজ্জ্বল নিদর্শন হয়ে আছে। বলাবাহুল্য, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনো অঞ্চলটি পরিদর্শন করেন নি। জনপদগুলির ধ্বংসের তথ্য জানার মতো তার কোনো মাধ্যম ছিল।

মুজিজা-৮৯

সাদুম ও গোমরাহ সম্প্রদায়ের জনপদ

আপনার প্রাণের কসম (হে নবী,) নিশ্চয় তারা (লুত সম্প্রদায়) আপন নেশায় উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরপাক খাচ্ছিল। অতঃপর সূর্যোদয়ের প্রাক্কালে একটি বিকট আওয়াজ তাদেরকে পাকড়াও করল। অতঃপর আমি (আল্লাহ) তাদের (সাদুম গোত্রের) জনপদগুলিকে উল্টে দিলাম এবং তাদের ওপর বর্ষণ করলাম পোড়ামাটির পাথর। নিশ্চয় এতে পর্যবেক্ষণকারীদের জন্য নিদর্শনাবলি রয়েছে। আর নিশ্চয় তা (জনপদগুলি) রাজপথের পাশেই বিদ্যমান। নিশ্চয় এতে ঈমানদের জন্য নিদর্শনাবলি রয়েছে। (হিজর, ১৫ : ৭২-৭৭)

এই আয়াতগুলিতে কুরআন মাজিদ ধ্বংসপ্রাপ্ত জনপদগুলির অধিক সুনিশ্চিত অবস্থানস্থলের নির্দেশনা প্রদান করে। এতে বর্ণিত হয়েছে সেগুলি রাজপথের পাশে অবস্থিত।

ভৌগলিকরা সম্প্রতি আবিষ্কার করেছে, জনপদগুলি মৃত সাগরের দক্ষিণ পূর্বে, মক্কা থেকে সিরিয়া পর্যন্ত একটি রাজপথের পাশে অবস্থিত। নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, যার ভূগোল সম্পর্কে তেমন কোনো জ্ঞান ছিল না, তথাপি এই আয়াতগুলি এমন এক বাস্তবতার কথা বলে যা কেবল সাম্প্রতিক ভূগোল বিশারদদের দ্বারাই আবিষ্কৃত হয়েছে।

মুজিজা-৯০

‘আইকা’র অধিবাসী

অতঃপর ভূমিকম্প তাদের (অসতর্ক অবস্থায়) পাকড়াও করল। তারপর তারা তাদের গৃহে উপুড় হয়ে পড়ে রইল। সেসব লোক যারা শুয়াইব আলাইহিস সালাম-কে  মিথ্যাবাদী বলেছিল, মনে হয় যেন তারা সেখানে বসবাসই করেনি। যারা শুয়াইবকে মিথ্যাবাদী বলেছিল তারাই ছিল ক্ষতিগ্রস্ত। (আরাফ, ০৭ : ৯১-৯২)

আর নিশ্চয় আইকার অধিবাসীরা ছিল যালিম। অতএব আমি (আল্লাহ) তাদের থেকে প্রতিশোধ নিলাম। আর এ (জনপদ) দু’টি উন্মুক্ত রাস্তার পাশেই বিদ্যমান। (হিজর, ১৫ : ৭৮-৭৯)

‘আইকা’ ছিল সেই সম্প্রদায় যেখানে নবী শুয়াইব আ. প্রেরিত হয়েছিলেন। ভৌগলিকরা সম্প্রতি এই জনপদ আবিষ্কার করেছেন সৌদি আরবের তাবুক শহরের সন্নিকটে। এখনও যে কেউ (এই ধ্বংসস্তুপ প্রত্যক্ষ করে) কুরআন মাজিদের এই আয়াতের বাস্তবতা প্রত্যক্ষ করতে পারে। নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম না ছিলেন একজন ভৌগলিক, না ছিলেন কোনো পর্যটক। এটি অধিক সুস্পষ্ট যে, আল্লাহ তাআলা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর এই তথ্য অবতীর্ণ করেছেন। অতঃপর যা তিনি কুরআন মাজিদের মাধ্যমে আমাদের কাছে পৌঁছিয়েছেন।

মুজিজা-৯১

হিজরের অধিবাসী

আর ছামুদের নিকট (আমি প্রেরণ করেছি) তাদের ভাই সালিহকে। সে বলল, ‘হে আমার কওম, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর। তিনি ছাড়া তোমাদের কোনো (সত্য) ইলাহ নেই। (আরাফ, ০৭ : ৭৩)

যারা অহংকার করেছিল তারা বলল, নিশ্চয় তোমরা যার প্রতি ঈমান এনেছ, আমরা তাকে অস্বীকার করি। ফলে ভূমিকম্প তাদেরকে পাকড়াও করল। তাই সকালে তারা তাদের গৃহে উপুড় হয়ে মরে রইল। (আরাফ, ০৭ : ৭৬-৭৮)

আর অবশ্যই হিজরের অধিবাসীরা (সালেহের কওম) রাসুলদেরকে অস্বীকার করেছে। আর আমি তাদেরকে আমার আয়াতসমূহ দিয়েছিলাম, তবে তারা তা থেকে বিমুখ হয়েছে। আর তারা পাহাড় কেটে বাড়ি বানাত, নিরাপদ ভেবে। কিন্তু অবশেষে ভোরের প্রাক্কালে এক বিকট আওয়াজ তাদেরকে পাকড়াও করল। আর তারা যা উপার্জন করত তা তাদের কোনো কাজে আসল না। (হিজর, ১৫ : ৮০-৮৪)

ঐতিহাসিকরা বলেন, ‘হিজর’ ছিল ছামুদ সম্প্রদায়ের লোকদের প্রধান শহর। ধারণা করা হয়, তারা ছিল হযরত নুহ আ.-এর পঞ্চম অধঃস্তন বংশধর, যার ধ্বংসাবশেষ সম্প্রতি আবিষ্কৃত হয়েছে আধুনিক শহর ‘আল-উলা’র সন্নিকটে, যা সৌদি আরবের মদিনা থেকে তাবুক যাওয়ার পথে অবস্থিত। অষ্টম শতাব্দীর মহান পরিব্রাজক ইবনে বতুতা এই এলাকাটি ভ্রমণ করেন এবং লিখেন, ‘আমি লাল পর্বতসমূহে খোদাই করা ছামুদ সম্প্রদায়ের লোকদের ভবনগুলি দেখেছি। সেগুলির চিত্রকর্মগুলি এতই উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল, মনে হচ্ছিল যেন সেগুলি অতি সম্প্রতি সেখানে স্থাপন করা হয়েছে। এবং সেখানকার অধিবাসীদের জরাজীর্ণ অস্থিসমূহ এখনও তাদের ধ্বংসাবশেষে বিদ্যমান। এটি কুরআন মাজিদের একটি মুজিজা, যে কেউ এটির সত্যতা আজও স্বচক্ষে আবলোকন করতে পারে।

মুজিজা-৯২

‘ইরাম’ শহর

তুমি কি দেখনি তোমার রব কিরূপ আচরণ করেছেন আদ জাতির সঙ্গে? ইরাম (গোত্রের) সঙ্গে, যারা ছিল সুউচ্চ স্তম্ভের অধিকারী? যাদের মত সৃষ্টির করা হয় নি কোনো দেশে? (ফজর, ৮৯ : ০৬-০৮)

কুরআন মাজিদের ভাষ্যকারগণ বলেন, ‘আদ ইরাম’ হল আদ জাতির প্রথম দিককার একটি গোত্র, যারা ‘আদে উলা’ বা পূর্ববর্তী আদ নামে পরিচিত। পূর্বেকার আরব ঐতিহাসিকদের কাছে তারা ছিল সম্পূর্ণ অজ্ঞাত। সর্বপ্রথম কুরআন মাজিদই তাদেরকে উল্লেখ করেছে, এভাবে- ‘আদ জাতি, যারা বসবাস করে ইরাম শহরে।’

National  Geography পত্রিকার ১৯৭৮ সালের ডিসেম্বর সংখ্যায় একটি প্রাচীন শহর ‘মলবা’, যা ১৯৭৩ সনে সিরিয়ায় খননকার্যের মাধ্যমে আবিষ্কৃত হয়েছে, তার ব্যাপারে একটি মজাদার বিবরণ দিয়েছে। শহরটি প্রায় তেতাল্লিশ শত বছরের প্রাচীন। ম্যাগাজিনটি আরও লিখেছে, শহরটিতে একটি লাইব্রেরি ছিল। তাতে পাশ্ববর্তী শহরগুলির একটি তালিকা ছিল, যাদের সঙ্গে এলবার অধিবাসীরা বাণিজ্য করত। আরও বিস্ময়কর ব্যাপার হল, সেই শহরগুলির তালিকায় ‘ইরাম’ নামক একটি শহরের নামও লিপিবদ্ধ ছিল। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কিভাবে ৬ষ্ঠ শতাব্দীতে এমন একটি শহর সম্পর্কে জানতে পারেন যা ছিল তেতাল্লিশ শত বছরের পুরনো এবং যা অতি সম্প্রতি ১৯৭৩ সালে ভূতত্ত্ববিদদের মাধ্যমে আবিষ্কৃত হয়েছে? আল্লাহ তাআলা ব্যতীত আর কে তাঁকে এই জ্ঞান দান করেছেন?

মুজিজা-৯৩

আদ সম্প্রদায়ের অধিবাসী

আর স্মরণ কর আদ সম্প্রদায়ের ভাইয়ের (হুদের) কথা, যখন সে আহকাফের স্বীয় সম্প্রদায়কে সতর্ক করেছিল। আর এমন সতর্ককারী তার পূর্বে এবং পরেও গত হয়েছে যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া আর কারও ইবাদত করো না। নিশ্চয় আমি তোমাদের ওপর এক ভয়াবহ দিনের আজাবের আশংকা করছি।’ তারা বলল, ‘তুমি কি আমাদেরকে আমাদের উপাস্যদের থেকে নিবৃত করতে আমাদের নিকট এসেছ? তুমি যদি সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হও তাহলে আমাদেরকে যার ভয় দেখাচ্ছ তা নিয়ে এসো।’ অতঃপর যখন তারা তাদের উপত্যকার দিকে মেঘমালা দেখল তখন তারা বলল, ‘এ মেঘমালা আমাদেরকে বৃষ্টি দিবে।’ (হুদ আ. বলল,) বরং এটি তা- ই যা তোমরা ত্বরান্বিত করতে চেয়েছিলে। এ এক ঝড়, যাতে যন্ত্রণাদায়ক আজাব রয়েছে। ফলে তারা এমন (ধ্বংস) হয়ে গেল যে, তাদের আবাসস্থল ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। এভাবেই আমি অপরাধী কওমকে প্রতিফল দিয়ে থাকি। (আহকাফ, ৪৬ : ২১-২২, ২৪-২৫)

কুরআন মাজিদের ভাষ্যকাররা বলেন, ‘আদ সম্প্রদায়ের একটি অংশ প্রথম আজাব ও ধ্বংস থেকে বেঁচে গিয়েছিল এবং অন্যান্য শহরে বসতি স্থাপন করেছিল। তাদেরকে ‘আদে উখরা’ বা পরবর্তী আদ হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়। তারাও তাদের নবীদের বিরুদ্ধাচারণ করেছিল এবং পূর্ববর্তী আদ জাতির ন্যায় ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল।

একটি আমেরিকান মুসলিম সাময়িকী ‘The  message’ এর  ১৯৯২ সালের মার্চ সংখ্যায় রিপোর্ট করা হয়, দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার ভূতত্ত্ববিশারদদের একটি টিম সম্প্রতি আদ সম্প্রদায়ের শহরের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কার করেছে। যারা ছিল ছামুদ সম্প্রদায়ের সমসাময়িক। কুরআন মাজিদ চব্বিশটি ভিন্ন ভিন্ন স্থানে এই সম্প্রদায়ের কথা উল্লেখ করেছে। বিশ্বের সকল ধর্মগ্রন্থের মধ্যে কেবল কুরআন মাজিদই এই শহর ও তার অধিবাসী সম্পর্কে কথা বলেছে। বাইবেলের পুরাতন ও নতুন সমাচার (Old  and  New  Testaments) এদের সম্পর্কে নিরব। না মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আর না যারা তার চারপাশে বসবাস করত তাদের কেউ কখনো মরুভূমির প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত সেই দূরবর্তী এলাকা সফর করেছিল। এমনকি যদি কেউ এই অঞ্চলটি সফর করেও থাকে, তবু সে এই শহর সম্পর্কে জানতে পারত না। কেননা, তা গভীর বালির নিচে চাপা পড়ে ছিল।

ইহুদি, খৃস্টান ও নাস্তিকরা বলে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-ই কুরআন মাজিদের রচয়িতা। যাহোক, কেউ এ কথার ব্যাখ্যা দিতে পারে না যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই অভাবিত জ্ঞান কিভাবে লাভ করেছিলেন? বাস্তব কথা হল, আল্লাহ তাআলাই মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর এই জ্ঞান নাজিল করেছিলেন, তাঁর শাশ্বত আসমানি বার্তার উজ্জ্বল প্রমাণ স্বরূপ।

মুজিজা-৯৪

গুহাবাসী লোকেরা (আসহাবে কাহফ)

তুমি কি মনে করেছ যে, গুহা ও রকিমের অধিবাসীরা ছিল আমার আয়াতসমূহের এক বিস্ময়? যখন যুবকরা গুহায় আশ্রয় নিল, অতঃপর বলল, ‘হে আমাদের রব, আমাদেরকে আপনার পক্ষ থেকে রহমত দিন এবং আমাদের জন্য আমাদের কর্মকাণ্ড সঠিক করে দিন।’ ফলে আমি গুহায় তাদের কান বন্ধ করে দিলাম অনেক বছরের জন্য। বিতর্ককারীরা বলবে, ‘তারা ছিল তিনজন, চতুর্  হল তাদের কুকুর।’ আর কতক বলবে, ‘তারা ছিল পাঁচজন, ষষ্ঠ হল তাদের কুকুর।’ এসবই অজানা বিষয়ে অনুমান করে। আর কেউ কেউ বলবে, ‘তারা ছিল সাতজন; অষ্টম হল তাদের কুকুর। (কাহফ, ১৮ : ০৯,১২,২২)

কুরআন মাজিদের টিকাকারদের মতে, এই আয়াতে একদল যুবকের কথা উল্লিখিত হয়েছে, যারা এক রোমান রাজার উৎপীড়ন থেকে নিজেদের ঈমান ও জীবন রক্ষার জন্য পাহাড়ের একটি গর্তে আশ্রয় নিয়েছিল। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে গুহার ভেতর প্রায় তিনশ বছর ঘুমিয়ে রেখেছিলেন। যখন তারা ঘুম থেকে জাগ্রত হল, তাদের একজন সাথীকে একটি মুদ্রা দিয়ে খাবার কিনে আনার জন্য পাঠাল। যখন সে শহরে প্রবেশ করল, দেখতে পেল পুরো শহর সম্পূর্ণরূপে বদলে গেছে। দোকানী এত প্রাচীন মুদ্রা দেখে হতবিহ্বল হয়ে গেল। সে মনে করল, এই যুবক কোনো ধরনের ধনভাণ্ডারের সন্ধান পেয়েছে এবং সে এই মুদ্রার উৎস সম্পর্কে জানতে চাইল। যুবকটি এমন বিপত্তির মুখে পড়ে আরও অধিক বিস্মিত হল। বিষয়টি শেষ পর্যন্ত রাজ দরবার পর্যন্ত গড়াল। রাজা যুবকটির কাহিনী শুনে বিস্মিত হলেন। অতঃপর তার সভাসদদের সঙ্গে নিয়ে সেই গুহার কাছে গেলেন এবং যুবকদেরকে তাদের জন্য দুআ করতে বললেন। পরবর্তীতে তারা সেই একই গুহার মধ্যেই বসবাস করতে লাগল এবং মৃত্যু বরণ করল। ‘গিবন’ তার ‘রোমান সম্রাজ্যের উত্থান-পতন’ (অধ্যায় ৩৩) নামক গ্রন্থে এই ঘটনার আরও কিছু বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। তার মতে, এই ঘটনাটি সংঘটিত হয় রোম সম্রাট ‘ডিসাস’ এর রাজত্বকালে ২৪৯-২৫১ খৃস্টাব্দে। যুবকরা অতঃপর জাগ্রত হয়েছিল রোমান সম্রাট থিউডুসাস এর রাজত্বকালে। যার শাসনকাল ছিল ৪০৭ থেকে ৪৫০ খৃস্টাব্দ। কিছুদিন পূর্বে আমি জর্ডানে এক স্থান ভ্রমণ করি, যাকে অধিকাংশ লোক আসহাবে কাহফের গুহা বলে ধারণা করে থাকে। এটি রাজধানী শহর আম্মানের বহিরপার্শ্বে অবস্থিত। পুরো এলাকাটি খুব এবড়ো-থেবড়ো, পিঙ্গলবর্ণ পাহাড়ময়। একটি পাহাড়ের নিচে চাপা পড়ে আছে একটি সুপ্ত গুহা, যার রয়েছে একটি বড় কক্ষ। আমি কক্ষটিতে প্রবেশ করলাম। পাথরে খোদিত সাতটি গর্ত দেখতে পেলাম। প্রতিটি গর্তের ভেতর একটি করে প্রকোষ্ঠ, যাতে একেকটি মানব কঙ্কাল। সেখানে অন্য একটি গর্ত আছে, যাতে আছে কুকুরের কঙ্কাল।

স্মর্তব্য, এসব লোকের ব্যাপারে ন্যূনতম জ্ঞান অর্জন কিংবা জানার জন্য মুহাম্মদ সা.-এর কাছে কোনো মাধ্যম কিংবা উৎস ছিল না এবং বাস্তবতা হল, তা এখনো মাটির নিচে একটি গুহায় চাপা পড়ে আছে। এটি কুরআনের মুজিজা যে, তা ঐতিহাসিকদের বর্ণনা বা নৃবিজ্ঞানীদের আবিষ্কারের শত শত বছর পূর্বের ঘটনার বর্ণনা দিয়েছে।

মুজিজা-৯৫

গুহাবাসীদের কর্ণকুহর বন্ধ করে দেয়া

ফলে আমি (আল্লাহ) গুহায় তাদের কান (শ্রবণশক্তি) বন্ধ করে দিলাম বহু বছরের জন্য (যাতে তারা গভীর নিদ্রায় নিমগ্ন হয়)। (কাহফ ১৮ : ১১)

এই আয়াতে সেসব যুবকের কথা উল্লেখিত হয়েছে যারা গুহার ভেতর ঘুমিয়ে ছিল তিনশত বছর। লক্ষ্য করলে বিস্মিত হতে হয় যে, এই আয়াতে কুরআন মাজিদ শ্রবণ ব্যতীত সেসব যুবকের অন্য কোনো শরীরবৃত্তের বর্ণনা দেয় নি। সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছে, সকল সংবেদনশীল অঙ্গের মধ্যে কেবল কানই, এমন কি, ঘুমের মধ্যেও সক্রিয় থাকে। এ কারণেই ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়ার জন্য আমাদের শাব্দিক সংকেত প্রয়োজন হয়। যেহেতু, আল্লাহ তাআলা এসব লোককে দীর্ঘদিনের জন্য নিদ্রিত রাখতে ইচ্ছা করলেন, তিনি তাদের শ্রবণেন্দ্রীয়কেও বন্ধ করে দিলেন। নিশ্চিতভাবে নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চৌদ্দশ বছর পূর্বে ঘুমের শরীরবৃত্তীয় বিদ্যা সম্পর্কে অবহিত ছিলেন না।

মুজিজা-৯৬

গুহাবাসীদের পার্শ্ব পরিবর্তন

তুমি তাদের মনে করতে জাগ্রত, অথচ তারা ছিল ঘুমš ।— আমি তাদেরকে পার্শ্ব পরিবর্তন করাচ্ছি ডানে ও বামে এবং তাদের কুকুরটি আঙিনায় তার সামনের দু’পা বাড়িয়ে আছে। (কাহফ, ১৮ : ১৮)

এই আয়াতটি গুহার যুবকদের ঘুমানোর ধরন সম্পর্কিত। এই আয়াত বলে, যদিও তারা তিনশ বছরের অধিককাল ঘুমিয়েছিল, আল্লাহ তাআলা তাদের ডানে ও বামে পার্শ্ব পরিবর্তন করাতেন। এই আয়াতটি এভাবে সেসব লোকদের জন্য একটি বিশেষ স্বাস্থ্য-নিয়মের নির্দেশনা দেয় যারা দীর্ঘ সময়ের জন্য বিছানায় শুয়ে থাকতে বাধ্য হয়। এ ধরনের লোকদের উপদেশ দেয়া হয়েছে বিছানায় তাদের অবস্থান নিয়ত পরিবর্তন করতে। অন্যথায় পরিণামে তারা বিভিন্ন স্বাস্থ্য-সমস্যায় পতিত হবে। যেমন- রক্ত সঞ্চালনজনিত জটিলতা, ত্বকের পঁচন, শরীরের নিম্নাংশে রক্তের চাপ ইত্যাদি।

আল্লাহ তাআলা ব্যতীত আর কে এসব যুবকের ঘুমানোর ধরন বর্ণনার ক্ষেত্রে এমন যথার্থ ভাষা ব্যবহার করতে পারেন?

মুজিজা-৯৭

ইউসুফ ও মুসা আ.-এর বৃত্তান্ত

কুরআন মাজিদ নবী ইউসুফ আ. ও নবী মুসা আ. এর বিরুদ্ধাচারণের বৃত্তান্ত সমকালীন রাজা-বাদশাহদের আলোচনাসহ সবিস্তারে বর্ণনা দিয়েছে। এটি অধিক লক্ষণীয় বিষয় যে, ইউসুফ আ. ও তাঁর সমকালীন বাদশাহর আলোচনা প্রসঙ্গে কুরআন মাজিদ সর্বদা ‘রাজা’ শব্দটি ব্যবহার করেছে। পক্ষান্তরে যখন মুসা আ. ও তাঁর সমকালীন রাজা প্রসঙ্গে আলোচনা এসেছে সেক্ষেত্রে কুরআন সর্বদা ‘ফেরাউন’ শব্দ ব্যবহার করেছে। ইহুদি ঐতিহাসিকগণ অনুরূপভাবে বাইবেলের পুরাতন ও নতুন সমাচার এমন সুনির্দিষ্ট পার্থক্য দেখায় নি। উভয়ের বর্ণনাতেই আছে, উভয় নবীই ফেরাউনের সঙ্গে মুকাবিলা করেন। সাম্প্রতিক ঐতিহাসিকরা এই নবীদ্বয়ের সময়কাল নির্দিষ্ট করেছে। ধারণা করা হয়, ইউসুফ আ. জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৯০৬ খৃস্টপূর্বে। মিশর সে সময় শাসন করত ‘হায়কস’ নামক এক রাজা, ফেরাউন নয়। ‘আপফিস’ নামক ‘হায়কস’ রাজা ১৮৯০ খৃস্টপূর্বাব্দে হযরত ইউসুফ আ. কে কারারুদ্ধ করেন। মিশরের ইতিহাসে ‘ফেরাউন’ নাম আসে অনেক পরে। বর্ণিত আছে, মুসা আ. কে যে ফেরাউন লালন-পালন করে সে ছিল ‘দ্বিতীয়

রামজিস’। সে মিশর শাসন করে ১২৯২ থেকে ১২২৫ খৃ.পূর্বাব্দ পর্যন্ত। যে ফেরাউন মুসা আ.-এর সঙ্গে যুদ্ধ করেছিল সে ছিল মাইনপথ (গরহবঢ়ধঃয)। সে ‘দ্বিতীয় রামজিস’-এর জীবদ্দশাতেই মিশরের রাজমুকুট ধারণ করে। অধিকন্তু বর্ণিত আছে, মুসা আ. মৃত্যুবরণ করেন ১২৭২ খৃস্টপূর্বাব্দে। এই তারিখসমূহের ওপর ভিত্তি করে ঐতিহাসিকরা সম্প্রতি একথা প্রতিষ্ঠিত করেছেন যে, ইউসুফ আ. ফেরাউনের মুকাবিলা করেন নি।

একথা স্মর্তব্য যে, না পুরাতন সমাচার, না নতুন সমাচার, আর না পূর্বের ইহুদি ঐতিহাসিকরা এ বিষয়টি সনাক্ত করতে পেরেছিল। পক্ষান্তরে, কুরআন মাজিদ এই সত্যটি চিহ্নিত করেছে। তা হযরত ইউসুফ আ.-এর আলোচনা প্রসঙ্গে সর্বদা ‘রাজা’ শব্দ ব্যবহার করেছে এবং মুসা আ. এর আলোচনা করার সময় তার বিপরীতে সর্বদা ‘ফেরাউন’ শব্দ ব্যবহার করেছে। তিনি আল্লাহ তাআলা ব্যতীত আর কে হতে পারেন, যিনি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে এমন সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রদান করেছেন?

মুজিজা : ৯৮

রোমানদের পরাজয়ের এলাকা

আলিফ, লাম, মীম। রোমান সাম্রাজ্য পরাজিত হয়েছে। একটি নিম্নতম স্থানে। তারা অচিরেই বিজয় লাভ করবে, তাদের পরাজয়ের পর। (রুম, ৩০ : ১-৩)

এই আয়াতে যে আরবি শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে তা হল আদনাল-আরদ (ضر ا )ﻥدأ)। ‘আরদ’ শব্দের অর্থ ভূমি এবং ‘আদনা’ শব্দটির দু’টি অর্থ রয়েছে- একটি হল, নিকটবর্তী এবং অন্যটি নিম্ন। এই আয়াত সেই যুদ্ধের দিকে ইঙ্গিত করে যা সংঘটিত হয় রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের মধ্যে। হিজরতের দ্বিতীয় বছরে (মোতাবেক ৬২৪ খৃস্টাব্দে)। সকল আরব, মুসলিম-অমুসলিম সকলে এই যুদ্ধ সম্পর্কে সজাগ ছিল এবং এও জানত যে, তা সংগঠিত হয় জর্ডানের বর্তমান মৃত সাগরের সন্নিকটে একটি নির্দিষ্ট স্থানে। কুরআন মাজিদের পূর্ববর্তী ভাষ্যকারগণ ‘আদনা’ শব্দের কেবল প্রথম অর্থ ব্যবহার করে এই আয়াতের ব্যাখ্যা দেন এবং বলেন, এই যুদ্ধ সংগঠিত হয় আরব উপদ্বীপের সন্নিকটবর্তী একটি স্থানে। সাম্প্রতিক সময়ের একদল মুসলিম বিজ্ঞানী জানতে চাইলেন, ‘আদনা’ শব্দের অন্য অর্থ  ‘নিম্নভূমি’ এর সঙ্গে এই আয়াতের কোনো সম্পর্ক আছে কি না? তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একজন সুপ্রসিদ্ধ ভূতত্ত্ববিদ পলমারকে পৃথিবীর সবচেয়ে নিম্নতম ভূমি চিহ্নিত করতে বললেন। উল্লেখ্য যে, প্রফেসর পলমার ছিলেন সেই কমিটির সভাপতি যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের Geology Society-র শত বার্ষিকী উৎসবের আয়োজন করে। প্রফেসর পলমার বলেন, পৃথিবীতে বহু সংখ্যক নিম্নভূমি রয়েছে। তখন তাকে বলা হল, পৃথিবীর সর্বনিম্ন স্থানটি চিহ্নিত করতে। তিনি জর্ডানের মৃত সাগরের সন্নিকটে একটি বিশেষ স্থানের দিকে নির্দেশ করলেন। তখন মুসলিম বিজ্ঞানীরা তাকে কুরআন মাজিদের এই আয়াতটি দেখালেন এবং তাকে এও জানালেন যে, এটি হচ্ছে হুবহু সেই স্থান যেখানে যুদ্ধটি সংগঠিত হয়। প্রফেসর পলমার বললেন, তিনি জানেন না, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সময়কালে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কি অবস্থা ছিল। তবে এটি পরিষ্কার যে, কুরআন মাজিদ আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে আসমানি আলো।

মুজিজা : ৯৯

লোহার রহস্য

নিশ্চয় আমি আমার রাসুলদেরকে পাঠিয়েছি স্পষ্ট প্রমাণাদিসহ এবং তাদের সঙ্গে কিতাব ও (ন্যায়ের) মানদণ্ড নাজিল করেছি, যাতে মানুষ সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে। আমি আরও নাজিল করেছি লোহা, তাতে প্রচণ্ড (রণ) শক্তি ও মানুষের জন্য বহু কল্যাণ রয়েছে। আর যাতে আল্লাহ জেনে নিতে পারেন, কে না দেখেও তাঁকে এবং তাঁর রাসুলদেরকে সাহায্য করে। অবশ্যই আল্লাহ মহা শক্তিধর, পরাগমশালী। (হাদিদ, ৫৭ : ২৫)

লক্ষণীয় বিষয় যে, কুরআন মাজিদ পৃথিবীতে লোহার অবতরণ বুঝাতে ‘নাযালা’ (ل,ﻥ) শব্দটি ব্যবহার করেছে। নৃতত্ত্ববিদরা এখন স্বীকার করে যে, আমাদের সৌর জগতের পুরো শক্তি এক পরমাণু লোহা উৎপাদনের জন্যও যথেষ্ট নয়। অধিকন্তু তারা বলে, পৃথিবীর উপরিভাগে এক পরমাণু পরিমাণ লোহা উৎপাদন করার জন্যে আমাদের সৌর জগতের চারগুণ শক্তির প্রয়োজন হবে। এভাবে নৃতত্ত্ববিদরা এই উপসংহারে পৌঁছে যে, লোহা একটি অতি জাগতিক বস্তু, যা পৃথিবীতে এসেছে অন্য কোনো গ্রহ থেকে। Chemical  Education  নামক আমেরিকান এক সাময়িকীতে ১৯৯০ সালের সেপ্টেম্বর সংখ্যায় এবং  New  Scientists -এর ১৩ জানুয়ারি ১৯৯০ সংখ্যায় বলা হয়েছে : লোহার পরমাণু কণিকাসমূহ সাধ্যাতীত দৃঢ়ভাবে ঘনীভূত। লোহা হল সর্বাধিক ভারী পদার্থ যা মানসম্মত পারমাণবিক প্রজ্জ্বলনের মাধ্যমে একটি নক্ষত্রে তৈরি হয়েছে। এতে রয়েছে সর্বাধিক সুদৃঢ় নিউক্লিয়াস। লোহাকে সংশেষণ− করার জন্য যে শক্তির প্রয়োজন তা পৃথিবীতে সুলভ নয়। তাই, পৃথিবীতে যে লোহা পাওয়া যায় নিঃসন্দেহে তা বাইরের মহাকাশে সংশেষিত।−

‘নাযালা’ শব্দটি পূর্বেকার ভাষ্যকারদের কাছে ছিল কুরআন মাজিদের এক রহস্য। জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক উৎকর্ষতা কুরআন মাজিদের এই রহস্যকে বিজ্ঞানের একটি বাস্তব সত্যে রূপান্তরিত করেছে। আল্লাহ তাআলা ব্যতীত আর কার এমন সুনিশ্চিত জ্ঞান থাকতে পারে, যা মানব জ্ঞানের সকল স্তরকে অতিক্রম করে ও ছাপিয়ে যায়।

মুজিজা : ১০০

সাগরের অভ্যন্তরের অন্ধকারাচ্ছন্নতা

অথবা (অবিশ্বাসীদের অবস্থা) গভীর সমুদ্রের ঘনীভূত অন্ধকারের মত, যাকে আচ্ছন্ন করে ঢেউয়ের উপরে ঢেউ, তার উপরে মেঘমালা। অনেক অন্ধকার, এক স্তরের ওপর আরেক স্তর। কেউ হাত বের করলে আদৌ তা দেখতে পায় না। (নূর, ২৪ : ৪০)

মানুষ, বিশেষত: যারা সমুদ্রে মুক্তা সংগ্রহ করে, সাধারণত সমুদ্রের ২০ থেকে ৩০ মিটার পর্যন্ত গভীরে ডুব দেয়, যেখানে তারা সবকিছু পরিষ্কার দেখতে পায়। যা হোক, সাবমেরিন পর্যন্ত সমুদ্রে ৫০ মিটারের গভীরে যেতে পারে নি যে, মানুষ সমুদ্রের তলদেশের অন্ধকার সম্পর্কে জানতে পারবে। এটি কুরআন মাজিদের একটি মুজিজা, তা কেবল সমুদ্রের তলদেশের অন্ধকার সম্পর্কেই বর্ণনা দেয় নি; বরং তার অন্ধকারের অবস্থা সম্পর্কেও বর্ণনা দিয়েছে। বলেছে, ‘অন্ধকার’ এক স্তরের ওপর আরেক স্তর’। অন্ধকারের এই অবস্থা সম্পর্কে বর্তমানে সমুদ্র বিজ্ঞানীদের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

বিজ্ঞানীরা বর্তমানে এ বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত করেছে যে, সমুদ্রের ওপর যে আলো পতিত হয় তা সমুদ্রের তরঙ্গের মধ্যেও প্রতিফলিত হয়। এভাবে তার একটি অংশ সমুদ্রে প্রবেশ করার ক্ষেত্রে বাধাগ্রস্ত হয়। সমুদ্রে নিয়ত গতিশীল তরঙ্গমালার বিভিন্ন স্তর রয়েছে। এই তরঙ্গগুলি স্তরে স্তরে একটির ওপর আরেকটি সঞ্চালিত হয়। এ কারণে তরঙ্গের গতি ও গভীরতার ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন স্তরের তরঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রার আলো প্রতিফলিত হয়। ফলে, সাগরে যে আলো প্রবেশ করে তা গভীরতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে হ্রাস পেতে থাকে এবং অবশেষে তলদেশ পর্যন্ত কোনো আলোই পৌঁছতে পারে না। এই ব্যাপারটি কুরআন মাজিদের উপরোক্ত আয়াতের বিষয়বস্তুর সঙ্গে সম্পূর্ণ সঙ্গতিপূর্ণ যে, ‘অন্ধকারের স্তরসমূহ একটির ওপর আরেকটি।’

এই আয়াতের অপর একটি ব্যাখ্যা আলোর প্রতিসরণের রহস্যের মধ্যে নিহিত। সমুদ্রের পানিতে আলো প্রবেশ করার পর তা তার অঙ্গীভূত সাত বর্ণে বিভক্ত হয়। সমুদ্র বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি এ কথা প্রতিষ্ঠা করেছেন যে, সমুদ্রের গভীর অংশ একটি সুনির্দিষ্ট বর্ণ বা নির্দিষ্ট তরঙ্গ দৈর্ঘ্যরে আলো শুষে নেয়। তারা সম্প্রতি দেখিয়েছেন, লাল বর্ণই সর্বপ্রথম ৩০ মিটার গভীর পর্যন্ত শোষিত হয়। অন্য কথায়, যদি কোনো ডুবুরী আঘাতপ্রাপ্ত হয় এবং এই গভীরতার মধ্যে তার শরীর থেকে রক্ত বের হয় সে তা দেখতে পায় না। দ্বিতীয় যে রং শোষিত হয় তা হল কমলা। পরে হলুদ বর্ণ, যা শোষিত হয় ৫০ মিটার পর্যন্ত এরপরে সবুজ ও বেগুনী বর্ণ ১০০ মিটার গভীর পর্যন্ত শোষিত হয় এবং সর্বশেষ যে বর্ণ শোষিত হয় তা হল নীল, যা ২০০ মিটার পর্যন্ত প্রবেশ করে। এভাবেই সাগরের তলদেশ ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে যায় এবং এই অন্ধকারাচ্ছন্নতা বিরাজ করে বিশেষ স্তরসমূহে, একটির পর অন্যটি। এটা শুরু হয় ৩০ মিটার গভীরতা থেকে এবং পর্যায়ক্রমে ধীরে ধীরে বিভিন্ন বর্ণ স্তরে ২০০ মিটারের গভীরতা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে থাকে, এরপরে বিরাজ করে পূর্ণ অন্ধকারাচ্ছন্নতা। সমুদ্র সম্পর্কে সাম্প্রতিক আবিষ্কৃত এই তথ্য কুরআন মাজিদের উপরে বর্ণিত আয়াতের সঙ্গে সম্পূর্ণ সঙ্গতিপূর্ণ।

মুজিজা : ১০১

ফসলহীন উপত্যকা

‘হে আমাদের রব, নিশ্চয় আমি আমার কিছু বংশধরকে ফসলহীন উপত্যকায় তোমার পবিত্র ঘরের (মক্কার কাবা শরিফের) নিকট বসতি স্থাপন করালাম। (ইবরাহিম, ১৪ : ৩৭)

এটি সেই বিবৃতি যা আল্লাহর নবী ইবরাহিম আলাইহিস সালাম আজ থেকে চার হাজার বছরেরও আগে তাঁর পরিবারের সদস্যদের সম্পর্কে দিয়েছিলেন। এই আয়াতে উপত্যকা বলতে বুঝানো হয়েছে মক্কা নগরী এবং বলা হয়েছে, এটি এমন একটি উপত্যকা যেখানে চাষাবাদ হয় না। আরব উপদ্বীপের ভূভাগে বহু পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। যে কেউ এখন দেখতে পাবে কিছু পানির ড্যাম, পানি সেচের জন্য প্রচুর পানির কূপ এবং বহু চারণভূমি ও খামারবাড়ি। এটি লক্ষণীয় বিষয়, এই চার হাজার বছরের দীর্ঘ সময়েও এই উপত্যকার ভূমিতে তার চারপাশে কোনো পরিবর্তন আসে নি। মক্কা এখনও অনাবাদী ভূমি হিসেবে রয়ে গেছে।

মুজিজা : ১০২

মেঘ সৃষ্টি ও বৃষ্টি বর্ষণ

তুমি কি দেখনি যে, আল্লাহ মেঘমালাকে পরিচালিত করেন, তারপর তিনি সেগুলোকে একত্রে জুড়ে দেন, তারপর সেগুলো স্তুপীকতৃ করেন, তারপর তুমি দেখতে পাও তার মধ্য থেকে বৃষ্টি বের হয়। আর তিনি আকাশস্থিত পাহাড় (সদৃশ্য) মেঘমালা থেকে শিলা বর্ষণ করেন, (অথবা মহসিন খানের অনুবাদ মতে : আকাশে শিলার পর্বতমালা রয়েছে)। অতঃপর তা দ্বারা যাকে ইচ্ছে আঘাত করেন। আর যার কাছ থেকে ইচ্ছা তা সরিয়ে দেন। এর বিদ্যুতের ঝলক দৃষ্টিশক্তি প্রায় কেড়ে নেয়। (নূর ২৪ : ৪৩)

আলাহ,− যিনি বাতাস প্রেরণ করেন ফলে তা মেঘমালাকে ধাওয়া করে, অতঃপর তিনি মেঘমালাকে যেমন ইচ্ছা আকাশে ছড়িয়ে দেন এবং তাকে খণ্ড-বিখণ্ড করে দেন, ফলে তুমি দেখতে পাও, তার মধ্য থেকে নির্গত হয় বারিধারা। অতঃপর যখন তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাদের ওপর ইচ্ছা বারি বর্ষণ করেন, তখন তারা হয় আনন্দিত। (রূম, ৩০ : ৪৮)

মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মত একজন বেদুঈন আরব একটি মরুময় অঞ্চলে থেকে মেঘ সৃষ্টি, বৃষ্টিপাত, বিদ্যুতের ঝলকানি এসব ঘটনা খুব কমই প্রত্যক্ষ করেছেন। আল্লাহ তাআলা মেঘের গঠন ও বৃষ্টিপাত সম্পর্কিত এসব তথ্য তাঁর কাছে নাজিল না করলে তিনি এসবের এমন প্রাণবন্ত বর্ণনা দিতে পারতেন না। আবহাওয়াবিদগণ মেঘের গঠন ও বৃষ্টিপাত সম্পর্কে নিম্নোক্ত বিষয়গুলি পেয়েছেন।

বাতাস মেঘমালাকে ধাবিত করে যাতে সেগুলি ঘনীভূত হতে শুরু করে। অতঃপর মেঘগুলি পরস্পর জুড়ে যায় এবং বড় মেঘ তৈরি করে এবং লম্বভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে। এভাবে মনে হয় যেন সেগুলি স্তপিকৃত নবগঠিত মেঘের ওপর অংশে পানির ফোঁটা পুঞ্জিভূত হতে শুরু করে এবং যখন তা খুব ভারী হয়ে যায়, তখন পৃথিবীতে বৃষ্টির আকারে নেমে আসে।

আমাদের উচিত, এই তথ্যটিকে উপরিউক্ত কুরআনের আয়াতের সঙ্গে তুলনা করা এবং এতে যে কেউ এ কথা স্বীকার করতে বাধ্য হবে যে, কেবল আল্লাহ তাআলাই কুরআন মাজিদের এই তথ্যের উৎস।

মুজিজা : ১০৩

পরিবহনের আধুনিক বাহনসমূহ

আর (তিনি সৃষ্টি করেছেন) ঘোড়া, খচ্চর ও গাধা, তোমাদের আরোহন ও শোভার জন্য এবং তিনি সৃষ্টি করেন এমন কিছু, যা তোমরা জান না। (নাহল, ১৬ : ৮)

এই আয়াত যখন অবতীর্ণ হয় তখন মানুষের কোনো ধারণাই ছিল না যে, ভবিষ্যতে এসব প্রাণী ব্যতীত পরিবহনের জন্য অন্য কিছু ব্যবহৃত হতে পারে। এ জন্যেই আল্লাহ তাআলা এই আয়াতে ইরশাদ করেছেন, ‘তিনি সৃষ্টি করেছেন (অন্যান্য) এমন কিছু যা তোমরা জান না।’ বস্তুতঃ, ইতিহাস বলে, মানুষ পরিবহন ও যোগাযোগের জন্য পর্যায়ক্রমে নতুন নতুন উপায় আবিষ্কার করেছে। যে কোনো যুগের দিকে তাকালে দেখা যায়, পরিবহনের কিছু মাধ্যম মানুষের সর্বদা অজ্ঞাত ছিল। এভাবে এই আয়াতটি প্রত্যেক যুগের মানুষের জন্যই সত্য।

মুজিজা : ১০৪

মেরু অঞ্চলে দিনের দৈর্ঘ্য

অবশেষে যখন সূর্যোদয়ের স্থানে এসে পৌঁছল তখন সে দেখতে পেল, তা এমন এক জাতির ওপর উদিত হচ্ছে যাদের জন্য আমি সূর্যের বিপরীতে কোনো আড়ালের ব্যবস্থা করি নি। (কাহফ, ১৮ : ৯০)

এই আয়াত এমন একজন রাজার বিজয় অভিযানের বর্ণনা দেয় যাকে কুরআন মাজিদ ‘যুল-কারনাইন’ বলে অভিহিত করেছে। এই আয়াত বলে, তিনি এমন এক স্থানে গমন করেন যেখানে তিনি সূর্যকে উদিত হওয়ার অবস্থায় দেখতে পান এবং সেই স্থানের লোকদের সূর্যের বিপরীতে কোনো আড়ালের ব্যবস্থা ছিল না। আমরা এখন জানতে পারি, এটি হল মেরু অঞ্চলের সূর্যের অবস্থা যেখানে তা ছয় মাসের জন্য অস্ত যায় না। অধিকন্তু, সূর্য সর্বদা নিম্নে উদিত হওয়ার অবস্থায় থাকে, যেমনটি কুরআন মাজিদে বর্ণিত হয়েছে। না মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আর না কোনো আরবি ব্যক্তির এই সূর্যোদয়ের অবস্থা সম্পর্কে সামান্যতম ধারণা ছিল। আল্লাহ তাআলা ব্যতীত আর কে, কুরআন মাজিদে এই তথ্য সন্নিবেশিত করতে পারেন?

মুজিজা : ১০৫

বৃষ্টির চক্রাবর্তন

শপথ আসমানের, যা প্রদান করে আবর্তিত বৃষ্টি। শপথ পৃথিবীর, যা বিদীর্ণ হয় (বৃষ্টির কল্যাণে)। নিশ্চয় এটা (কুরআন মাজিদ সত্য ও মিথ্যার মধ্যে) ফয়সালাকারী বাণী। আর তা উপহাসের বিষয় নয়। (আত-তারিক, ৮৬ : ১১-১৩)

এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অবতীর্ণ করেছেন যা কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার পরও বহু শতাব্দী পর্যন্ত মানুষের অজানা ছিল। এই আয়াত যে ‘বৃষ্টির আবর্তন’ -এর কথা বলে তা ছিল আরব বেদুঈনদের কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত। এখন আমরা জানি যে, ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগ ও সাগরের পানি সূর্যের তাপে বাষ্পীভূত হয়ে মেঘে রূপান্তরিত হয়, ঘনীভূত হয় এবং বৃষ্টি রূপে পুনরায় পতিত হয়। এভাবে আকাশ পৃথিবীকে সেই পানি ফিরিয়ে দেয় যা একটি নিত্য চক্রাবর্তে তার কাছে উঠে। এই বিষয়টি বর্ণনার পর কুরআন মাজিদ মানব জাতিকে পৃথিবী বিদীর্ণ হওয়ার প্রতি মনোনিবেশ করার দাওয়াত দেয়। যেমন, ‘বৃষ্টির ফলে জীবনের উদ্ভব। কুরআন মাজিদ অবশেষে মানব জাতিকে দাওয়াত দেয় তার যথার্থতা ও প্রাজ্ঞতা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে। এটিকে নিছক মনোরঞ্জনের বিষয় হিসেবে নেয়া মানুষের জন্য অনুচিত।

মুজিজা : ১০৬

ফেরাউনের মৃতদেহ সংরক্ষণ

‘আজ আমি (আল্লাহ) তোমার দেহটি রক্ষা করব, যাতে তুমি তোমার পরবর্তীদের জন্য নিদর্শন হয়ে থাক। আর নিশ্চয় অনেক মানুষ আমার নিদর্শনসমূহের ব্যাপারে গাফেল। (ইউনুস, ১০ : ৯২)

চৌদ্দশত বছর পূর্বে কুরআন মাজিদ ভবিষ্যৎবাণী করেছে, আল্লাহ তাআলা ফেরাউনের দেহ সংরক্ষণ করবেন। প্রত্নতত্ত্ববিদরা সম্প্রতি ফেরাউন ‘মাইনপথ’-এর দেহ আবিষ্কার করেছে, যে মূসা আঃ-এর পশ্চাদ্ধাবন করতে গিয়ে ডুবে গিয়েছিল। এটি বর্তমানে কায়রোর একটি মিউজিয়ামে কুরআন মাজিদের একটি জীবন্ত মুজিজারূপে তাদের জন্য সংরক্ষিত আছে যারা আল্লাহ তাআলার নিদর্শনের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করে। স্মর্তব্য যে, বাইবেলেও বর্ণিত আছে, ফেরাউন সমুদ্রে নিমজ্জিত হবে। কিন্তু পরবর্তীতে তার দেহ কি হবে এ ব্যাপারে কোনো তথ্য নেই। পক্ষান্তরে বাস্তবতা হল, কুরআন মাজিদ উল্লেখ করেছে, আল্লাহ তাআলা ফেরাউনের দেহ সংরক্ষণ করবেন। যা অন্য একটি প্রমাণ যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরআন মাজিদ বাইবেল থেকে নকল করেন নি। বরং তাঁর জ্ঞানের উৎস হল সর্বজ্ঞাতা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে আসমানি অহি।

মুজিজা : ১০৭

কুরআন মাজিদে উল্লিখিত শব্দ ‘হামান’

আর  ফিরাউন  বলল,  ‘হে  পরিষদবর্গ,  আমি  ছাড়া  তোমাদের কোনো ইলাহ আছে বলে আমি জানি না। অতএব হে হামান, আমার জন্য তুমি ইট পোড়াও, তারপর আমার জন্য একটি প্রাসাদ তৈরি কর। যাতে আমি মূসার ইলাহকে দেখতে পাই। আর আমি নিশ্চয় মনে করি সে মিথ্যাবাদীদের অন্তর্ভুক্ত।’ (কাসাস, ২৮ : ৩৮)

কুরআন মাজিদ কিছু ঐতিহাসিক ঘটনার বর্ণনা দিয়েছে, মিশরের পূর্ববর্তী ইতিহাস সম্পর্কে, যা বহু শতাব্দী পর্যন্ত মানুষের অজানা ছিল। ‘হামান’ একটি চরিত্র, যার নাম কুরআন মাজিদে উল্লিখিত হয়েছে ফেরাউনের সঙ্গে। সে ফেরাউনের একজন নিকটতম লোক হিসেবে কুরআন মাজিদের ছয়টি ভিন্ন ভিন্ন স্থানে তার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে লক্ষ রাখা নিতান্ত আবশ্যক যে, তাওরাতের সেসব পরিচ্ছেদে হামানের নাম মোটেই উল্লিখিত হয় নি, যেখানে মূসার (আলাইহিস সালাম)- জীবন সংক্রান্ত আলোচনা আছে। পুরাতন সমাচারের শেষ অধ্যায়ে একজন ব্যাবিলনীয় রাজার সহযোগী হিসেবে হামানের নাম উল্লেখ রয়েছে, যার আগমন ঘটেছে মূসা আলাইহিস সালাম-এর প্রায় ১,১০০ বছর পরে। এটি নিশ্চিতভাবে বলা যায়, যদি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পুরাতন সমাচার থেকে কুরআন মাজিদ নকল করতেন তবে ফেরাউনের সঙ্গে কিছুতেই হামানের উল্লেখ করতেন না।

নৃতত্ত্ববিদরা মিশরের পিরামিড থেকে বিচিত্র রকমের বর্ণলিপির ফলক উদ্ধার করেছে। দীর্ঘদিন কেউ এই বর্ণলিপিগুলির পাঠোদ্ধার করতে পারে নি। ১৭৯৯ সালে একটি স্বতন্ত্র ধরনের শিলালিপি উদ্ধার করা হয়। এটিকে বলা হয় ‘Rosetta’ শিলা, এতে তারিখ লিখা আছে ১৯৬ খৃস্ট পূর্বাব্দ। এই শিলাটিতে তিনটি ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় লিখিত শিলালিপি রয়েছে : চিত্র লিখন (Hiero  glyphics), ডেমোক (Democ) ও গ্রীক। গ্রীক ভাষার সহযোগিতায় অপর দুই ভাষার পাঠোদ্ধার সম্ভব হয়। এই অনুবাদ সম্পন্ন হয়েছিল  Jaen-Francoise  Champollin নামক একজন ভাষাবিদের মাধ্যমে। বিস্ময়ের ব্যাপার হল, এই শিলালিপিতে হামানের নামও রয়েছে।

‘People in the  New Kingdom’ নামক অভিধানে (Herman Rank, Die  Agyptischen  Personennamen, Verzeichnis dor Namen, Verlag Ven, J.J. Augustin in  Gluckstadt, Born  11-1952) যা তৈরি হয়েছিল শিলালিপির সকল সংগ্রহের ওপর ভিত্তি করে, তাতে হামানকে বলা হয়েছে শিলা ছেদনকারী কর্মীদের নেতা। লক্ষণীয় বিষয় হল, কুরআন মাজিদ কেবল ফেরাউনের সঙ্গে হামানের নামকে একত্রিতই করে নি, বরং এও বলেছে যে, সে নির্মাণ বিষয়ক কাজের সঙ্গে জড়িত ছিল। এজন্যেই ফেরাউন তাকে একটি উঁচু টাওয়ার নির্মাণ

করতে আদেশ দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজিদে এই তথ্যটি অবতীর্ণ না করলে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কিভাবে তার বর্ণনা দিলেন?

মুজিজা : ১০৮

কাবা শরিফে আল্লাহ তাআলার নিদর্শন

নিশ্চয় প্রথম ঘর, যা মানুষের (ইবাদতের) জন্যে স্থাপিত হয়েছে তা বাক্কায় (মক্কায়), যা বরকতময় এবং বিশ্ববাসীর জন্য হিদায়াত (নির্দেশিকা)। তাতে রয়েছে স্পষ্ট নিদর্শনসমূহ, (উদাহরণ স্বরূপ) মাকামে ইবরাহিম। আর যে তাতে প্রবেশ করবে সে নিরাপদ হয়ে যাবে। (আলে ইমরান, ০৩ : ৯৬-৯৭)

এই আয়াত অনুসারে কাবা শরিফ আল্লাহ তাআলার অনেক সমুজ্জ্বল নিদর্শনাবলি ধারণ করে আছে। একজন ঈমানদার পুরুষ কিংবা নারী যখন তাতে প্রবেশ করে তখন সে মুহূর্তেই সেসব আধ্যাত্মিক নিদর্শন অনুভব করতে পারে। অনুরূপভাবে কাবা শরিফের কিছু খুব সমুজ্জ্বল বাহ্যিক নিদর্শনও রয়েছে। এসব নিদর্শনের একটি হল জমজম কূপ, যা কাবা শরিফের অভ্যন্তরে অবস্থিত। হাদিসের ভাষ্য অনুসারে, জমজম কূপের পানি একজন মানুষের যে কোনো ইচ্ছা কিংবা প্রয়োজন পূরণে সাহায্য করে। এই হাদিসের ওপর ভিত্তি করে মুসলমানরা এই পানি ব্যাপকভাবে ব্যবহার করে।

উল্লেখ্য যে, কাবা শরিফ মক্কায় অবস্থিত, যা খুব শুষ্ক। এর চারপাশে রয়েছে তরু-লতাহীন পাথুরে পর্বতমালা। মক্কা মরুভূমি হওয়ার কারণে তাতে পুরো বছর উল্লেখ করার মত তেমন কোনো বৃষ্টিপাতও হয় না। অধিকন্তু মক্কার ভেতরে কিংবা বাইরে কোনো পুকুর কিংবা হ্রদও নেই। এ কারণে যে কেউ ধারণা করতে পারে, জমজম কূপ একটি সীমিত পরিমাণ পানি সরবরাহ করবে। কিন্তু বাস্তবতা হল, অসংখ্য মানুষ বিরতিহীনভাবে তার পানি ব্যবহার করছে। প্রথমত: মক্কার অধিকাংশ অধিবাসী, জেদ্দার পার্শ্ববর্তী শহরসমূহ এবং তায়েফবাসীরা তাদের প্রাত্যহিক খাবার পানি ও রান্নার জন্য জমজমের পানির নিয়মিত সরবরাহের ব্যবস্থা করেছে। দ্বিতীয়ত: সারা বছর অসংখ্য মানুষ কাবা শরিফ জিয়ারত করতে আসে। তারা খাবার, গোসল এমনকি ধোয়া-মোছার কাজেও ব্যাপকভাবে জমজমের পানি ব্যবহার করে। তৃতীয়ত তারা যখন তাদের বাড়ি-ঘরে ফিরে যায় তখন প্রচুর পরিমাণে পানি তাদের বন্ধু-বান্ধব ও পরিবারের সদস্যদের জন্য হাদিয়া স্বরূপ নিয়ে যায়। চতুর্থত: রোজার মাসে দৈনিক কমপক্ষে পাঁচলাখ মানুষ কাবা শরিফে সমবেত হয়। এ সকল জিয়ারতকারী ত্রিশদিন যাবৎ এই পানি প্রচুর পরিমাণে ব্যবহার করে। পঞ্চমত: হজ্বের মৌসুমে কাবা শরিফে বিশ লাখেরও অধিক লোকের আগমন ঘটে। এ সকল জিয়ারতকারী তাদের প্রাত্যহিক সকল প্রয়োজনে এই পানি ব্যাপকভাবে ব্যবহার করে এবং বাড়ি ফিরে যাওয়ার সময় প্রত্যেকে কমপক্ষে এক কনটেইনার করে পানি সঙ্গে নিয়ে যায়। বিস্ময়কর ব্যাপার হল, সারা বছর ধরে জমজম কূপের পানির এত প্রচুর ব্যবহার সত্ত্বেও তাতে কখনো পানি সল্পতা দেখা দেয় নি। এখনো পর্যন্ত কেউ ধারণাও করতে পারে না যে, মক্কার মত এমন ঊষর ও পাথুরে ভূমিতে এই নিঃসীম পানির উৎস কোথায়। এটি উপরোক্ত আয়াতে বর্ণিত কাবা শরিফে আল্লাহ তাআলার একটি উজ্জ্বল নিদর্শন।

মুজিজা : ১০৯

রাসুল সা.-এর সাহাবিদের মধ্যে পারস্পরিক ভালবাসা ও সহানুভূতি

(আর তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ কর এবং বিভক্ত হয়ো না।) আর তোমরা তোমাদের ওপর আল্লাহর নিয়ামতকে (কতজ্ঞতারৃ সঙ্গে) স্মরণ কর, যখন তোমরা পরস্পর শত্রু ছিলে, অতঃপর আল্লাহ তোমাদের অন্তরে ভালবাসার সঞ্চার করলেন। অতঃপর তোমরা তাঁর অনুগ্রহে ভাই ভাই হয়ে গেলে। (আলে ইমরান, ০৩ : ১০৩)

আর যদি তারা তোমাকে ধোঁকা দিতে চায়, তাহলে তোমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। তিনিই তোমাকে শক্তিশালী করেছেন তাঁর সাহায্য ও মুমিনদের দ্বারা। আর তিনি তাদের অন্তরসমূহে প্রীতি স্থাপন করেছেন। যদি তুমি জমিনে যা আছে তার সবকিছু ব্যয় করতে, তবুও তাদের অন্তরসমূহে প্রীতি স্থাপন করতে পারতে না। কিন্তু আল্লাহ তাদের মধ্যে প্রীতি স্থাপন করেছেন। নিশ্চয় তিনি পরাগমশালী, প্রজ্ঞাবান। (আনফাল, ০৮ : ৬২-৬৩)

এই আয়াতগুলি অনুধাবন ও উপলব্ধির জন্য ইসলাম গ্রহণের পূর্বে আরবদের অবস্থা সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকা প্রয়োজন। ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে আরব উপদ্বীপে কোনো সুসংগঠিত রাষ্ট্রব্যবস্থা ছিল না। দেশটি বিভিন্ন গোত্রে বিভক্ত ছিল। গোত্র প্রতিহিংসা ও গোত্রযুদ্ধ ছিল সেই ভূখণ্ডের আইন। প্রায়ই যুদ্ধ সংঘটিত হত কোনো তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে। যেমন : কোনো কূপ থেকে পানি পান ইত্যাদি। আর এই সৃষ্ট যুদ্ধ যুগযুগ ধরে চলতে থাকত। গোত্র সংঘাত ও গোত্র শত্রুতা মদিনার মধ্যে ছিল অধিক বেশি প্রকট। তাতে ছিল দুটি সমান শক্তিধর গোত্র, একটির নাম আউস, অপরটি খাজরাজ। যেহেতু উভয় গোত্রই ছিল শক্তিধর, তাই তারা জীবনের সব ক্ষেত্রেই ছিল একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী। নিত্য যুদ্ধ, প্রতিহিংসা ও অবিশ্বাসের একটি দুর্গ›দ্ধময় পরিবেশে ছিল তাদের নিত্যদিনের বসবাস। আরও বিস্ময়ের ব্যাপার হল, তারা ইসলাম গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে এসব কিছু ভালবাসা ও সহানুভূতির পরিবেশে রূপান্তরিত হয়ে যায়। অধিকন্তু, পুরো আরব সমাজ পারস্পরিক এমন সৌহার্দ্যপূর্ণ একটি অবিচ্ছিন্ন জাতিতে পরিণত হয় পুরো মানবজাতির ইতিহাসে যার কোনো তুলনা মিলে না। কুরআন মাজিদ এ কথাই বলছে, আল্লাহ তাআলাই মুমিনদের ওপর এই অনুগ্রহ করেছেন এবং তা কেউ কোনো জাগতিক উপায়ে অর্জন করতে পারে নি।

মুজিজা : ১১০

সংখ্যাসূচক সমতার রহস্য

কুরআন মাজিদের বিভিন্ন শব্দের সংখ্যাসূচক সম্পর্কের বিবরণ দিয়ে বহু বই ও প্রবন্ধ লিখা হয়েছে। এই সংখ্যাতাত্ত্বিক সম্পর্কের ব্যাপারে এ পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত টানা যায় নি। তবে তা এতই অনুপম যে, কুরআন মাজিদের বিস্ময়কর প্রকৃতিতে তা নতুন ক্ষেত্র প্রসারিত করেছে। নিম্নে কুরআন মাজিদের কিছু সংখ্যাতাত্ত্বিক সাদৃশ্যের দৃষ্টান্ত পেশ করা হল :

১. কুরআন মাজিদ বলে, সাতটি আসমান রয়েছে। কুরআন মাজিদের কেবল সাতটি সুরার মধ্যেই এই বর্ণনা পাওয়া যায়।

২. কুরআন মাজিদ বলে, আল্লাহ তাআলা কর্তকৃ স্থিরীকতৃ মাসের সংখ্যা হল ১২ (বারো)। ‘মাস’ শব্দের আরবি প্রতিশব্দ ‘শাহ্র’। এই ‘শাহ্র’ শব্দটি কুরআন মাজিদে কেবল বারো বার উল্লিখিত হয়েছে।

৩. আরবি শব্দ ‘ঈমান’ অর্থ বিশ্বাস। এই শব্দের বিপরীত শব্দ ‘কুফর’, যার অর্থ অস্বীকৃতি কুরআন মাজিদে এই (ن /یإ) ঈমান শব্দটি ১৭ (সতের) বার দেখা যায়। বিস্ময়ের ব্যাপার হল কুরআন মাজিদে কুফর শব্দটিও এসেছে ১৭ (সতের) বার। অধিকন্তু ‘মুমিনুন’ শব্দটি কুরআন মাজিদে পাওয়া যায় ৮ (আট) স্থানে এবং ‘কাফিরুন’ শব্দটিও পাওয়া যায় ৮টি স্থানে।

৪. আরবি শব্দ ‘মালাইকা’ অর্থ ফেরেশতা এবং ‘শয়তান’ শব্দ নির্দেশ করে ইবলিশ। শব্দদুটি তাদের বৈশিষ্ট্য ও ভূমিকার ক্ষেত্রে পরস্পর বিরোধী। কুরআন মাজিদে এই ‘মালাইকা’ শব্দটি সর্বমোট ৬৮ (আটষট্টি) বার ব্যবহৃত হয়েছে। বিস্ময়ের ব্যাপার হল ‘শয়তান’ শব্দটিও কুরআন মাজিদে ৬৮ (আটষট্টি) বার ব্যবহৃত হয়েছে।

৫. আরবি শব্দ ‘দুনয়া’ অর্থ ইহকাল এবং ‘আখিরাহ’ অর্থ পরকাল। কুরআন মাজিদে ‘দুনয়া’ শব্দটি এসেছে ১১৫ বার। অনুরূপভাবে ‘আখিরাহ’ শব্দটিও এসেছে ১১৫ মোট ১০৮ বার।

৬. আরবি শব্দ ‘ত্বীন’ অর্থ কাদা মাটি এবং ‘নুতফা’ অর্থ ‘শুক্রবিন্দু’। কুরআন মাজিদ বলে, মানুষ প্রথমে সৃষ্টি হয়েছে ‘ত্বীন’ থেকে এবং পরে ‘নুতফা’ থেকে। কুরআন মাজিদে ‘ত্বীন’ শব্দটি দেখা যায় মোট ১২ (বারো) বার। ‘নুতফা’ শব্দেরও একই অবস্থা, তাও রয়েছে ১২ (বারো) বার।

৭. আরবি শব্দ ‘ফে’ল’ মানে কাজ এবং ‘আজর’ অর্থ  প্রতিদান। কুরআন মাজিদে ‘ফে’ল’ শব্দটি দেখা যায় মোট ১০৮ (একশত আট) বার। ‘আজর’ শব্দের ক্ষেত্রেও তা সত্যি, তাও দেখা যায় ১০৮ বার।

৮. ‘রহমান’ ও ‘রহীম’ আল্লাহ তাআলার দুটি গুণবাচক নাম, উভয় শব্দই রহম, যার অর্থ  দয়া- থেকে নির্গত। ‘রহমান’ এমন দয়াকে ইঙ্গিত করে যার সঙ্গে আছে ন্যায় বিচার। পক্ষান্তরে ‘রহীম’ এমন দয়াকে নির্দেশ করে যার সঙ্গে আছে ক্ষমা। কুরআন মাজিদে ‘রহমান’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে মোট ৫৭ (সাতান্ন) বার, কিন্তু ‘রাহীম’ শব্দটি দেখা যায় মোট ১১৪ (একশত চৌদ্দ) বার। যা ৫৭ (সাতান্ন) এর ঠিক দুই গুণ। বিভিন্ন হাদিস এই সম্পর্কে প্রমাণ বহন করে যে, আল্লাহ তাআলার দয়া তাঁর ক্রোধ ও রাগের ওপর প্রবল।

৯. আরবি শব্দ ‘জাযা’ অর্থ বিনিময় বা প্রতিদান এবং ‘মাগফিরাহ’ শব্দের অর্থ ক্ষমা। কুরআন মাজিদে ‘জাযা’ শব্দটি মোট ১১৭ বার দেখা যায়। ‘মাগফিরাত’ শব্দটি দেখা যায় ২৩৪ (দুইশত চৌত্রিশ) বার, যা ১১৭-এর ঠিক দুই গুণ। তা আবারও নির্দেশ করে, আল্লাহ তাআলার ক্ষমা তার ন্যায় বিচারের ওপর ছায়া বিস্তার করে।

অনেকেই কুরআন মাজিদের এমন অসংখ্য সংখ্যাতাত্ত্বিক সাদৃশ্য বের করেছেন। আলোচ্য বিষয়ের সঙ্গে প্রত্যেক সাদৃশ্যের একটি বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। বলাবাহুল্য, কুরআন মাজিদের সকল শব্দ হিসাব করার জন্য মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এমন কোনো কম্পিউটার ছিল না, যা তাকে কুরআন মাজিদে একটি বিশেষ শব্দকে তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ শব্দের সঙ্গে একটি সংখ্যাতাত্ত্বিক সম্পর্কের মাধ্যমে ব্যবহার করতে সক্ষম করেছে।

মুজিজা : ১১১

অন্ধকার ও আলোর বর্ণনা

এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে শান্তির পথ দেখান, যারা তাঁর সন্তুষ্টির অনুসরণ করে এবং তাঁর অনুমতিতে তিনি তাদেরকে ‘যুলুমাত’ (অনেক অন্ধকার) থেকে ‘নুর’ (আলো)-এর দিকে বের করেন। (মায়েদা, ০৫ : ১৬)

কুরআন মাজিদ যখন অন্ধকারের (যুলমাত)- বর্ণনা দেয় তখন তা একবচন ও বহুবচন উভয় ধরনের শব্দ ব্যবহার করে। পক্ষান্তরে, তা যখন আলো (নুর)-এর বর্ণনা দেয় তখন তা সর্বদা একবচনের শব্দই ব্যবহার করে। বস্তুত, কুরআন মাজিদে এমন একটি আয়াতও পাওয়া যায় না যেখানে নুর শব্দটি বহুবচনে ব্যবহৃত হয়েছে। কুরআন মাজিদে অন্ধকার বলতে বিভিন্ন ধরনের মানবীয় দুর্বলতা ও অজ্ঞতাকে নির্দেশ করে। একজন মানুষের বিভিন্ন ধরনের মানবিক দুর্বলতা থাকতে পারে। যেমন, অহম, লোভ, কৃপণতা ইত্যাদি। তার বিভিন্ন ধরনের অজ্ঞাতাও থাকতে পারে। যেমন, মিথ্যা উপাস্যের আরাধনা কিংবা ভ্রান্ত মতবাদের অনুসরণ, যেমন, নাস্তি ক্যবাদ, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ইত্যাদি। একই সময়ে একজন মানুষ বিভিন্ন মাত্রা ও পরিমাণের অন্ধকারের অনুসরণ করতে পারে। অতএব বিভিন্ন প্রকার ও বিভিন্ন মাত্রার অন্ধকার রয়েছে। এজন্যেই কুরআন মাজিদ অন্ধকারের বর্ণনার ক্ষেত্রে একবচনের পাশাপাশি বহুবচনের শব্দও ব্যবহার করেছে।

যখন কুরআন মাজিদ আলোর কথা বলে তখন তা সেই সত্য হেদায়েতের প্রতিই নির্দেশ করে যা আল্লাহ তাআলা তাঁর নবীগণ (আলাইহিমুস সালাম) ও আসমানি কিতাবের মাধ্যমে অবতীর্ণ করেছেন। পুরো মানব ইতিহাসে সত্য কেবল একটিই ছিল। এজন্যেই কুরআন মাজিদ আলো বুঝাতে সর্বদা ‘নুর’ শব্দটিকে একবচনে উল্লেখ করেছে। সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি কুরআন মাজিদের প্রতিটি শব্দেরই একটি বিশেষ অর্থ ও বার্তাবাহী অবতীর্ণ করেছেন।

মুজিজা : ১১২

শ্রবণেন্দ্রীয় ও দর্শনেন্দ্রীয়ের বর্ণনা

(অবিশ্বাসীদের) বল, তোমরা আমাকে জানাও, যদি আল্লাহ তোমাদের শ্রবণ (কান) ও তোমাদের দৃষ্টিসমূহ (চক্ষুসমূহ) কেড়ে নেন এবং তোমাদের অন্তরসমূহে মোহর এঁটে দেন, কে আছে ইলাহ আল্লাহ ছাড়া, যে তোমাদের এগুলো নিয়ে আসবে? (আনআম, ০৬ : ৪৬)

তোমরা কিছুই গোপন করতে না (ইহজগতে এই বিশ্বাসে) যে, তোমাদের কান, চোখসমূহ ও চামড়াসমূহ তোমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে না। বরং তোমরা মনে করেছিলে তোমরা যা কিছু করতে আল্লাহ তার অনেক কিছুই জানতেন না। (ফুসসিলাত, ৪১ : ২২)

আর আমি তাদেরকে কান, চোখ ও হৃদয় দিয়েছিলাম। কিন্তু যখন তারা আমার আয়াতসমূহকে অ¯ীকার করত, তখন তাদের কান, তাদের চোখ ও তাদের হৃদয়সমূহ তাদের কোনো উপকারে আসে নি। আর তারা যা নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করত তা-ই তাদেরকে পরিবেষ্টন করল। (আহকাফ, ৪৬ : ২৬)

একজন সাধারণ পাঠকের চোখে এসব আয়াত পাঠ করার সময় বিশেষ কিছু ধরা নাও পড়তে পারে। কিন্তু একজন মনোযোগী পাঠক লক্ষ্য করবে, কুরআন মাজিদ এসব আয়াতে শ্রবণের (‘সামআ’) ক্ষেত্রে একবচনের শব্দ, কিন্তু দর্শনের ক্ষেত্রে বহুবচনের শব্দ (‘আবসার’) ব্যবহার করেছে। লক্ষ্য করলে আরও অধিক বিস্মিত হতে হয় যে, আমাদের দুটি চোখের মত দুটি কান রয়েছে। এতদসত্ত্বেও কুরআন মাজিদ শ্রবণেন্দ্রীয়ের ক্ষেত্রে একবচন এবং দর্শনেন্দ্রীয়ের ক্ষেত্রে বহুবচনের শব্দ ব্যবহার করেছে। কেবল আল্লাহ তাআলাই জানেন এধরনের শব্দ চয়নের রহস্য। আমরা আমাদের কর্ণ ও চক্ষুর ব্যবহারের ভিন্নতার ভিত্তিতে এই বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে পারি।

দেখার ক্রিয়া মানুষের এমন একটি অনুভূতির অন্তর্ভুক্ত যা সামগ্রিকভাবে তার ইচ্ছাশক্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। মানুষের এ স্বাধীনতা রয়েছে যে, যা সে পছন্দ করে তা দেখবে এবং যা সে পছন্দ করে না তা দেখা থেকে দৃষ্টিকে নিয়ন্ত্রণ করবে। পক্ষান্তরে আগত শব্দ থেকে সে তার কানকে বন্ধ করে রাখতে পারে না, চাই সে পছন্দ করুক বা না করুক। যেখানে দেখার বিষয়টি ঐচ্ছিক ও নৈর্ব্যক্তিক, সেখানে শ্রবণের বিষয়টি আবশ্যিক এবং অনৈর্ব্যক্তিক। অধিকন্তু আমাদের চোখের ওপর আমাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। আমরা একটি চোখ ইচ্ছা করলে সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে পারি, কিন্তু একটি কানের ক্ষেত্রে তেমনটি পারি না। এভাবে চোখের বহুমুখী ও ঐচ্ছিক ক্রিয়া রয়েছে। এ কারণেই কুরআন মাজিদ দর্শনের ক্ষেত্রে বহুবচনের শব্দ ব্যবহার করেছে। শ্রবণের ক্ষেত্রে এই ব্যবহার প্রযোজ্য নয়। এজন্যেই শ্রবণের ক্ষেত্রে কুরআন মাজিদ একবচনের শব্দ ব্যবহার করেছে।

মুজিজা : ১১৩

কুরআন মাজিদের সংরক্ষণ

নিঃসন্দেহে আমি এই বার্তা (কুরআন মাজিদ) অবতীর্ণ করেছি, এবং আমিই তার (বিকতৃ হওয়া থেকে) রক্ষণাবেক্ষণকারী। (হিজর, ১৫ : ০৯)

মুসলিম-অমুসলিম সকলে একবাক্যে স্বীকার করে যে, কুরআন মাজিদের টেক্সট এর মধ্যে কখনও কোনো পরিবর্তন সাধিত হয় নি। কুরআন মাজিদের শাশ্বত সংরক্ষণ ও তার বিশুদ্ধতার ভবিষ্যৎবাণী কেবল তার টেক্সট এর ক্ষেত্রেই সত্য প্রমাণিত হয়নি; বরং তার ক্ষুদ্রতম যতিচিহ্নের ক্ষেত্রেও অনুরূপভাবে সত্য। আরও লক্ষণীয় যে, এই বিচারে আরবি ভাষা সম্পূর্ণ স্বাতন্ত্র্যের অধিকারী যে, বর্ণমালার প্রত্যেকটি বর্ণই বিশেষ সাংকেতিক চিহ্নের (হরকতের) মাধ্যমে লিখা হয়, যা তার নির্দিষ্ট উচ্চারণ প্রদান করে। নিম্নলিখিত উপাত্তটি কুরআন মাজিদের একটি বিস্তারিত বিবরণ সরবরাহ করে। এই তথ্যগুলি নেয়া হয়েছে ‘শরিয়া ডাইজেস্ট’, কুরআন সংখ্যা, ভলিউম ১৩ নম্বর -৫, পৃ. ১৮৭-৮৯, ১৯৬৯, লাহোর, পাকিস্তান থেকে।

সর্বমোট আয়াত সংখ্যা : ৬,১৩৬।

সর্বমোট শব্দ সংখ্যা : ৮৬,৪৩০।

সর্বমোট বর্ণ সংখ্যা : ৩,২৩,৭৬০।

প্রতিটি বর্ণের মোট সংখ্যা :

‘আলিফ’ : ৪,৮৮,৭৭২; বা : ১১,৪২৮, তা : ১,১৯৯, ছা : ১,২৬৭, জীম :৩,২৭৩, হা : ৯৭, খা : ২,৪১৬, দাল : ৫৬০২, জাল : ৪,৫৭৭, রা :১১,৭৯৩ যা : ১,৫৯০, সীন : ৫৯৯১, শীন : ২,১১০, সাদ : ২,০১২, দুয়াদ : ১,  ত্বা : ১২৭৭, যোয়া : ৮৪, আইন : ৯,২২০, গাইন : ২,২০৮, ফা : ৮,৪৯৯, ক্বাফ : ৬,৮১৩, কাফ : ৯৫০০, লাম : ৩,৪২২, মীম : ৩৬,৫৩৫, নূন : ৪০,১৯০, ওয়াও : ২৫,৫৩৬, হা : ১৯,০৭০, হামজা : ৩,৭২০, ইয়া : ৪৫,৯১৯।

হরকত বা বিশেষ ভাষাতাত্ত্বিক চিহ্নের মোট সংখ্যা :

ফাতহা (যবর) : ৫৩,২২৩, কাসরা (যের) : ৩৯,৫৮২ যম্মা (পেশ) : ৮,৮০৪, মাদ্দ : ১,৭৭১ তাশদিদ : ১,২৭৪ নুকতা : ১০৫৬৮৪।

এটি কুরআন মাজিদের একটি মুজিজা যে তার কোনো শব্দ, কোনো বর্ণ, কোনো যতিচিহ্ন কিংবা কুরআন মাজিদের কোনো হরকত পর্যন্ত বিগত চৌদ্দশত বছরে পরিবর্তিত হয় নি।

মুজিজা : ১১৪

মহাশূন্যে ভ্রমণ

আর আসমানসমূহ ও জমিনে কত নিদর্শন রয়েছে, যা তারা অতিগম করে চলে যায়। অথচ সেগুলো থেকে তারা বিমুখ। (ইউসুফ, ১২ : ১০৫)

পথপূর্ণ আসমানের শপথ। (যারিয়াত, ৫১ : ০৭)

অতঃপর আমি কসম করছি পশ্চিম আকাশের লালিমার। আর রাতের কসম এবং রাত যা কিছুর সমাবেশ ঘটায় তার। আর চাঁদের কসম, যখন তা পরিপূর্ণ হয়। অবশ্যই তোমরা এক স্তর থেকে আরেক স্তরে (কিংবা এক গ্রহ থেকে আরেক গ্রহে) আরোহণ করবে। অতএব তাদের কী হল যে তারা ঈমান আনছে না? (ইনশিক্বাক, ৮৪ : ১৬-২০)

কুরআন মাজিদের ভাষাই একটি স্বতন্ত্র মুজিজা। কুরআন মাজিদ বিভিন্ন প্রাকৃতিক ঘটনা (phenomena) এমন এক ভাষায় বর্ণনা করে যা একটি ব্যাপক অর্থ  ও বার্তা বহন করে। আমরা এখন কুরআন মাজিদের এসকল আয়াত, মহাশূন্যের নিরেট বাস্তবতা হিসেবে, সম্প্রতিক আবিষ্কারের আলোকে যথার্থরূপে অনুধাবন করতে সক্ষম, যেমন- ‘কসম পথপূর্ণ আসমানের’ এবং ‘আকাশের নিদর্শনসমূহ’ এজাতীয় আয়াত। অধিকন্তু কুরআন মাজিদের আয়াত, ‘আসমানসমূহের কত নিদর্শন তারা অতিক্রম করে চলে যায়’ এবং ‘তোমরা আরোহণ করবে একস্তর থেকে আরেকস্তরে’ এটিও সাম্প্রতিক সময়ে মহাশূন্যে মানুষের ভ্রমণের পরিভাষায় খুব ভালভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।

মুজিজা : ১১৫

মহাশূন্যে বিভিন্ন কক্ষপথ

কসম, কক্ষপথ- গতিপথ- পথপূর্ণ আসমানের। (যারিয়াত, ৫১ :০৭)

এই মহাবিশ্বে প্রায় ২০০ বিলিয়ন ছায়াপথ রয়েছে, যার প্রত্যেকটি ধারণ করে আছে প্রায় ২০০ বিলিয়ন নক্ষত্র। অধিকন্তু এসব নক্ষত্রের অধিকাংশেরই রয়েছে গ্রহপুঞ্জ। আর এই গ্রহপুঞ্জের অধিকাংশেরই রয়েছে উপগ্রহ। এসব মহাকাশীয় বস্তুর প্রতিটিই রয়েছে একটি নিত্য-গতিময় অবস্থায়। একই সময়ে ছায়াপথগুলি অসাধারণ গতিতে পরিক্রমণ করছে পরিকল্পিত নির্দিষ্ট পথরেখায়। মহাশূন্যের বহিরাংশ এভাবে অসংখ্য গতিপথ, পথরেখা কিংবা কক্ষপথের স্তরসমূহে পূর্ণ। এ কথা সুনিশ্চিত যে, যখন এই আয়াতগুলি অবতীর্ণ হচ্ছিল তখন মানুষ জানত না, মহাশূন্য বিভিন্ন গতিপথ কিংবা কক্ষপথে পূর্ণ। মহাকাশবিজ্ঞানীগণ কেবল সাম্প্রতিককালেই এই জ্ঞান লাভ করেছেন। এই আয়াতও আল্লাহর নিরংকুশ ক্ষমতা ও প্রজ্ঞার কথা বলে যে, এই গতিপথ অতিক্রমণের সময় এসব মহাকাশীয় দেহগুলির কোনোটিই অন্যটির পথ কর্তন করে না কিংবা অন্যদের সঙ্গে ধাক্কা খায় না।

মুজিজা : ১১৬

পৃথিবীর চারপাশে সুরক্ষিত ছাদ

আর আমি (আল্লাহ) আসমানকে করেছি সুরক্ষিত ছাদ (পৃথিবীর চতুর্দিকে); কিন্তু তারা তার নিদর্শনাবলি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। (আম্বিয়া, ২১ : ৩২)

পৃথিবীর চারপাশে যে বায়ুমণ্ডল বেষ্টন করে আছে তা আমাদের জীবনের জন্যে সহায়ক সর্বোচ্চ সেবা প্রদান করে যায়। মহাকাশীয় ভৌত-রসায়নবিদ্যার সাম্প্রতিক অগ্রগতি আমাদেরকে এই বিষয়টি এবং উল্লিখিত আয়াত অনুধাবন ও হৃদয়ঙ্গম করার জ্ঞান প্রদান করেছে।

বায়ুমণ্ডল সেসব উল্কাকে ধ্বংস করে দেয় যা পৃথিবী অভিমুখে আসার চেষ্টা করে; পাছে যাতে তা সকল প্রকার জীবের ধ্বংসের কারণ না হয়।

পৃথিবীর চারপাশে যে ওজোন-স্তর আছে তা মহাশূন্য থেকে আগত আলোকরশ্মিসমূহের জন্যে ছাকনির কাজ করে। তা কেবল ক্ষতিকর নয় এমন এবং উপকারী রশ্মিসমূহকেই মহাশূন্য থেকে প্রবেশের অনুমতি দেয়। বায়ুমণ্ডল পৃথিবীকে মহাশূন্যের জমানো ঠাণ্ডা থেকেও রক্ষা করে, যা আনুমানিক মাইনাস ২৭০. সেল্টিগ্রেড।

বায়ুমণ্ডল একটি চৌম্বক স্তর ধারণ করে যাকে বলা হয় Van  Allen Belt এটি সেসব ক্ষতিকর আলোকরশ্মির বিরুদ্ধে ঢালের কাজ দেয়, যা আমাদের এই গ্রহের দিকে বিস্ফোরিত হয়। এসব বিস্ফোরণের একটি যে পরিমাণ শক্তি উৎপন্ন করে তা হিরোশিমায় যে পারমাণবিক বোমা নিক্ষিপ্ত হয়েছিল সে ধরনের ১০০ বিলিয়ন পারমাণবিক বোমার শক্তির সমান।

সংক্ষেপে বলা চলে, বায়ুমণ্ডলে একটি শক্তিশালী সিস্টেম কাজ করে, তা যেন পৃথিবীর চারপাশে একটি সুরক্ষিত ছাদ। বৈজ্ঞানিকরা কেবল সম্প্রতিই তা উদ্ঘাটন করতে সক্ষম হয়েছে, যা কুরআন বর্ণনা করেছে শত শত বছর পূর্বে।

মুজিজা : ১১৭

আবর্তনকারী আকাশ

কসম, আবর্তন প্রগিয়াসম্পন্ন আসমানের। (তারিক, ৮৬ : ১১)

কুরআন মাজিদ শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে খুবই স্বতন্ত্র। প্রায়ই আমরা তার একটি শব্দ, শব্দটির তাৎপর্য ও আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের সঙ্গে তার সম্পর্ক উদ্ঘাটনের চেষ্টা ব্যতিরেকে অনুধাবন করতে পারি না। উপরোক্ত আয়াত বলে যে, আসমানে একটি চক্রাবর্ত রয়েছে। এখন এটা ভালভাবে জানা যে, পৃথিবীর চারপাশে যে বায়ুমণ্ডল আছে তার অনেক স্তর রয়েছে। প্রত্যেক স্তরেরই বস্তু কিংবা রশ্মিকে মহাশূন্যে ফিরিয়ে দেয়া কিংবা পৃথিবীতে পুনরায় নামিয়ে দেয়ার নির্দিষ্ট কাজ রয়েছে। নিম্নে বায়ুমণ্ডলের সেসব চক্রাবর্তের একটি সংক্ষিপ্ত নমুনা দেওয়া হল :

বায়ুমণ্ডলের যে স্তরকে Trophosphere বা বারিমণ্ডল বলা হয় তা জলীয় বাষ্পকে ঘনীভূত হওয়া এবং তা বৃষ্টির আকারে পৃথিবীতে আসতে সাহায্য করে।

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২৫ কিলোমিটার উপরে যে ওজন স্তর রয়েছে তা ক্ষতিকর অতি বেগুণী বশ্মিকে প্রতিফলিত করে মহাশূন্যে ফিরিয়ে দেয়।

আয়নমণ্ডল নামে যে স্তর রয়েছে তা পৃথিবী থেকে সম্প্রচারিত বেতার তরঙ্গকে প্রতিফলিত করে পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে ফেরত পাঠায়।

‘চৌম্বকমণ্ডল’ নামে যে স্তর রয়েছে তা সূর্য ও অন্যান্য নক্ষত্র থেকে নির্গত ক্ষতিকর বিভিন্ন তেজস্ক্রিয় উপাদান মহাশূন্যে ফেরত পাঠায়।

কুরআন মাজিদ ‘আবর্তনকারী’ বা ‘চক্রাবর্ত সাধনকারী’ আসমান পরিভাষা ব্যবহারের এটি একটি কারণ হতে পারে। কেবল আল্লাহ তাআলাই প্রকতৃ সত্য সম্পর্কে অবগত।

মুজিজা : ১১৮

সময়ের আপেক্ষিকতা

আর তারা তোমাকে আজাব ত্বরান্বিত করতে বলে। অথচ আল্লাহ কখনো তাঁর ওয়াদা খেলাফ করেন না। আর তোমার রবের নিকট নিশ্চয় একদিন তোমাদের গণনার হাজার বছরের সমান। (হজ্জ, ২২ : ৪৭)

ফেরেশতাগণ ও রূহ এমন একদিনে আল্লাহর পানে উর্ধ্বগামী হবে, যার পরিমাণ পঞ্চাশ হাজার বছর। (মা’আরিজ, ৭০ : ০৪)

একজন সাধারণ পাঠক এই আয়াতগুলিকে কুরআন মাজিদের একটি অসঙ্গতি বলে ধরে নিতে পারে। বর্তমানে আপেক্ষিক তত্ত্ব (The theory of  relativity) প্রমাণ করেছে যে, সময় হল একটি আপেক্ষিক ধারণা। আর তাই তা পরিবেশ ও অবস্থা অনুসারে পরিবর্তিত হতে পারে। বিজ্ঞানী আইনস্টাইন দেখিয়েছেন, সময়- ভর ও গতিবেগের ওপর নির্ভরশীল এবং তা অভিকর্ষশক্তির ওপরও নির্ভর করে। এখন এটা প্রমাণিত যে, পৃথিবীতে ও মহাশূন্যে সময়ের ব্যাপারটি একই রকম নয়। কুরআন মাজিদ সময়ের এই আপেক্ষিকতার ধারণার সত্যতা স্বীকার করেছে আইনস্টাইন তা আবিষ্কার করারও শত শত বছর আগে।

বিগত পৃষ্ঠাগুলি কুরআন মাজিদের বিস্ময়কর প্রকৃতির সঙ্গে একটি নতুন মাত্রা যোগ করে। পৃথিবীর আকৃতি-সম্পর্কিত বিস্ময়কর বর্ণনা, কুরআন মাজিদে শব্দসমূহের সংখ্যাগত সাদৃশ্য, মহাশূন্যে মানুষের পরিভ্রমণ ইত্যাদি আরও উজ্জ্বল প্রমাণ সরবরাহ করে যে, কুরআন মাজিদ আল্লাহ তাআলার কালাম। এই পৃষ্ঠাগুলিও এমন অনেক ফেনোমেনার বর্ণনা দেয় যা ছিল সেই পরিবেশে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত, যেখানে কুরআন মাজিদ অবতীর্ণ হয়েছিল। এতদসত্ত্বেও, কুরআন মাজিদ এসব ফেনোমেনার যথাযথ ও সঠিক বর্ণনা প্রদান করে। অধিকন্তু এই পৃষ্ঠাগুলি এমন অনেক ঘটনারও বর্ণনা দেয় যা ছিল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অজানা এবং সেসব লোকদেরও অজ্ঞাত যাদের প্রতি এই কুরআন অবতীর্ণ হয়েছিল। তথাপি এসব বর্ণনার প্রতিটি সত্য ও যথাযথ বলে প্রমাণিত হয়েছে।

পূর্ববর্তী যুগের মুসলমানরা এসব আয়াতকে কুরআন মাজিদের রহস্য হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। যতদিন তারা এসব রহস্যের পাঠোদ্ধারের প্রয়োজনীয় জ্ঞানের অধিকারী হতে পারেন নি, তারা সেগুলিকে আল্লাহ তাআলার কালাম বলে গ্রহণ করে নিয়েছিল। মানুষের জ্ঞানের পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরবর্তী যুগের মুসলমানরা তাদের জ্ঞানের পরিসীমা অনুসারে এসব ঘটনার ব্যাখ্যা দেয়। এভাবে প্রত্যেক যুগের মুসলমানরাই কুরআন মাজিদের কিছু কিছু রহস্যকে ইতিহাস ও বিজ্ঞানের বাস্তবতায় রূপায়িত করেন। এভাবেই কুরআন মাজিদ সকল প্রজন্মের মানুষের জন্যে একটি জীবন্ত মুজিজা হিসেবে চলমান থেকেছে। কুরআন মাজিদ সর্বদাই তার শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রেখেছে এবং তা ভবিষ্যতেও সর্বদা মানব জ্ঞানের পরিধিকে ছাপিয়ে তার শ্রেষ্ঠত্ব অক্ষুন্ন  রাখবে। এটি মানুষের জন্যে সর্বদা একটি শাশ্বত চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিরাজিত থাকবে। সব যুগের মানুষই কুরআন মাজিদের নতুন নতুন মুজিজা আবিষ্কার করেছে এবং এই ধারা অব্যাহত থাকবে।

আর আসমানসমূহ ও জমিনে কত নিদর্শন রয়েছে, যা তারা অতিগম করে চলে যায়, অথচ সেগুলো থেকে তারা বিমুখ। তাদের অধিকাংশ আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস করে, তবে (ইবাদতে) শিরক করা অবস্থায়। আর তারা কি নিরাপদ বোধ করছে যে, তাদের ওপর আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো সর্বগ্রাসী আজাব আসবে না, অথবা হঠাৎ তারা টের না পেতেই কিয়ামত উপস্থিত হবে না? (ইউসুফ, ১২ : ২০৫-২০৭)

আল কুরআনের ১৬০ মুজিজা ও রহস্য বইটির সকল লেখনী পড়তে নিন্মের লিঙ্ক সমূহে ভিজিট করুনঃ

এই ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে তাহলে দয়া করে ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ একে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন