মূল:বিশ্বনবী প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের আদর্শ

সিরাজুল ইসলাম আলী আকবর

সম্পাদনা: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ

যাকারিয়া আলী হাসান তৈয়ব

ইসলামী রাষ্ট্রের মৌল দৃষ্টিকোণ হচ্ছে, ধর্ম বর্ণ বংশ গোত্র ও জাতীয়তা নির্বিশেষে সমগ্র মানবজাতির কল্যাণে কাজ করা, পূর্ণ ন্যায় পরায়ণতার সঙ্গে সমস্ত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করা, সকলের প্রতি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ সুবিচার প্রদর্শন করা।

বর্তমান কালের সুসভ্য ও বড় বড় সংস্কৃতিবান জাতিসমূহ নিজদেরকে মানবতার একমাত্র বন্ধু বলে দাবি করছে। অথচ এদের সকলেরই রাষ্ট্রনীতি সংকীর্ণ জাতীয়তা ও দেশমাতৃকাভিত্তিক। তাদের সামনে রয়েছে নিজেদের স্বমতের ও স্বদেশী লোকদের কল্যাণ, নির্বিশেষে সকল মানুষের জন্য নয়। এসব জাতি বা রাষ্ট্র অন্য মানুষের কোনো সাহায্য যদি কখনও করেও, তবে  তা একান্ত নিজ স্বার্থে। সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের দোহাই তারা দেয় শুধু এই উদ্দেশ্যে যে, দুর্বল পশ্চাদপদ জনগোষ্ঠি ও জাতিসমূহকে যেন ধোকা দিয়ে নিজের দাসত্ব নিগড়ে বন্দী করতে পারে; যেন প্রয়োজনের সময় এসব জাতির লোকেরা তাদের জন্য যুদ্ধের ময়দানে প্রাণ বিসর্জন দিতে প্রস্তুত হয়।

কিন্তু নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপস্থাপিত আদর্শ দীন ইসলামে কোনোরূপ ধোকা ও প্রতারণার অবকাশ নেই। এই দীন কোনো জাতি বা অঞ্চলের প্রতি লোভাতুর দৃষ্টিতে তাকাবার অনুমতিও কাউকে দেওয়া না। অপর কোনো দেশের শস্য শ্যামল উর্বরা ভূমি বা মূল্যবান খনিজ সম্পদ অথবা ঐশ্বর্য-বিত্ত-বৈভবের প্রতি কোনো লোভই মুসলিমদের থাকতে পারে না। ইসলামের লক্ষ্য বিশ্বমানবতার কল্যাণ ও হিদায়াত। ইসলামের দৃষ্টিতে এই কল্যাণ ও হিদায়াত ওতপ্রোতভাবে জড়িত কিংবা বলা যায় প্রত্যেকটি অপরটির ওপর নির্ভরশীল। কল্যাণ পেতে হলে হিদায়াত গ্রহণ করতে হবে আর হিদায়াত গ্রহণ করলেই কল্যাণ লাভ সম্ভব। হিদায়াত গ্রহণ ছাড়া যে কল্যাণ, ইসলামের দৃষ্টিতে তা ধ্বংসের নামান্তর।

ইসলামী রাষ্ট্র নাগরিকদের মধ্যে পরিপূর্ণ সুবিচার, ন্যায়পরায়ণতা ও পূর্ণ সাম্য প্রতিষ্ঠায় বদ্ধপরিকর। জাতীয়তা ও ভাষার দৃষ্টিতে সেখানে নাগরিকদের মধ্যে কোনোরূপ পার্থক্য সৃষ্টির বিন্দু পরিমাণ সুযোগ নেই। এই রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে অনারব তেমনই সম্মানার্হ, যেমন আরব। নিগ্রো ও কৃষ্ণাঙ্গের সেই রূপ অধিকার স্বীকৃত যেমন স্বীকৃত শ্বেতাঙ্গের। বস্তুতঃ ইসলাম একটা দীন ও আদর্শিক আন্দোলন বিশেষ। তা জাতীয়তাবাদী বা ভাষাভিত্তিক আন্দোলন নয়। এ ধরনের বিতর্কের সঙ্গে ইসলামের কোনো দূরতম সম্পর্কও নেই।

এ নীতির কারণে ইসলামী রাষ্ট্রে আরবদের ছাড়া অন্যান্য জাতির লোকেরাও বড় বড় রাষ্ট্রীয় পদে অভিষিক্ত হতে পারতেন। তাদের আনুগত্য করা নির্বিশেষে সকল নাগরিকদের জন্য কর্তব্য ছিল। সে লোক কোনো পশ্চাদপদ বা অবহেলিত জাতির মধ্য থেকে আগত হলেও তাতে কোনোরূপ দ্বিধা সংকোচ করা চলত না। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাস্তব কর্মের মাধ্যমেই এই  আদর্শকে ভাস্বর করে তুলেছিলেন। সাহাবী সালমান রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু একজন ইরানী (পারস্য দেশীয়) ক্রীতদাস ছিলেন। কিন্তু সমাজে তিনি অতীব সম্মানিত ব্যক্তি হিসাবে বিবেচিত ছিলেন।  সুহাইব রুমীও ছিলেন একজন ক্রীতদাস। কিন্তু কি যুদ্ধ কি সন্ধি, কোনো অবস্থায়ই তাঁর সঙ্গে পরামর্শ না করে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতেন না। হাবশি গোলাম বিলাল ইবন রবাহ সম্পর্কেও এ কথা প্রযোজ্য। ইসলামী রাষ্ট্রে তিনি কেবল মসজিদের মুয়াজ্জিনই ছিলেন না, তিনি ছিলেন নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের কোষাধ্যক্ষ। আধুনিক পরিভাষায় বলতে গেলে তিনি ছিলেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী। এরূপ সুমহান ও অতুলনীয় সাম্যের আদর্শ দুনিয়ায় আর কেউ প্রতিষ্ঠিত করেছে কি?