মূল:বিশ্বনবী প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের আদর্শ

সিরাজুল ইসলাম আলী আকবর

সম্পাদনা: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ

যাকারিয়া আলী হাসান তৈয়ব

ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে আরব দেশে কোনো সুসংগঠিত রাষ্ট্রব্যবস্থা কার্যকর ছিল না। গোটা আরব ছিল কতিপয় বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠি বা গোত্রের সমষ্টি। এদের পরস্পরের মধ্যে কোনো সমন্বয় সূত্র ছিলনা। প্রতিটি গোত্র নিজস্ব রসম রেওয়াজের অনুসারী ছিল। আর তার ওপর চলত গোত্রপতিদের আদেশ-নিষেধের কর্তৃত্ব ও আধিপত্য। কোনো গোত্রই অপর কোনো গোত্রের কর্তৃত্ব বা প্রাধান্য কিংবা অন্য কোনো ব্যক্তির অধীনতা মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না। গোত্রপতিদের প্রাধান্যও খুব বেশি প্রভাবশালী হত না। মূলতঃ তখন প্রত্যেক ব্যক্তিই ছিল স্বেচ্ছাচারী। চারিদিকে হত্যাকাণ্ড, মারামারি ও লুটতরাজ চলত অবাধে। শক্তিমান ব্যক্তি নিজেকে দুর্বলদের অধিকার হরণ করা ও তাদের ওপর অত্যাচার চালানোর নিরঙ্কুশ অধিকারী বলে মনে করত; কিন্তু দীন ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সমগ্র আরব দেশে গোত্রীয় অনৈক্য ও পারস্পরিক ঝগড়া-বিবাদ সম্পূর্ণরূপে নির্মূল হয়ে যায়। শত শত বছর পূর্ব থেকে চলে আসা এই বিপর্যস্ত অবস্থাকে একটি সুসঙ্ঘবদ্ধ রাষ্ট্রব্যাবস্থার মাধ্যেমেই সম্পূর্ণরূপে আয়ত্তে আনা সম্ভবপর হয়েছিল। তখন সমগ্র আরব জনতাকে একটি মহান আদর্শিক ঐক্যসূত্রে গ্রথিত করে দেওয়া হয়েছিল। আর তা সম্ভবপর হয়েছিল কেবলমাত্র এই জন্য যে, সমগ্র আরব জনগণ ইসলাম গ্রহণ করে বিশ্বনবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিজেদের সর্বোচ্চ নেতা ও প্রশাসকরূপে মেনে নিয়েছিল।

বস্তুতঃ নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন আল্লাহ তা‘আলার সর্বশেষ রাসূল। দীন-ইসলাম প্রচার ও প্রতিষ্ঠাই ছিল তাঁর দায়িত্ব। আর দীন প্রতিষ্ঠার অর্থ হচ্ছে, আল্লাহর সার্বভৌমত্বের ভিত্তেতে এমন একটি পূর্ণাঙ্গ সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে আল্লাহর দীনই হবে একমাত্র বুনিয়াদী আদর্শ এবং আল্লাহর কুরআন ও রাসূলের সুন্নাত হবে আইনের একমাত্র উৎস। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জীবদ্দশাতেই আরবের বুকে তেমন একটি সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর জীবন সাধনার চূড়ান্ত সাফল্য এখানেই নিহিত।

নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনকালেই আরবের প্রতিটি অঞ্চল এই রাষ্ট্রব্যবস্থার অধীনে এসে গিয়েছিল। আরবদেশের প্বার্শবর্তী বেশ কয়েকটি অঞ্চলও রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য স্বীকার করে মদীনা রাষ্ট্রের অধীনতা মেনে নিয়েছিল।

১। যেসব অঞ্চল মদীনা রাষ্ট্রের আওতাধীন হয়েছিল। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেসব অঞ্চলে নিজের পক্ষ থেকে শাসনকর্তা নিযুক্ত করেছিলেন। মক্কা বিজয়ের পর সেখানকার শাসনকর্তা নিযুক্ত হয়েছিলেন সাহাবী ইতাব ইবন উসাইদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু। হিজাজ ও নজদ এই এলাকার অন্তর্ভুক্ত ছিল।

২। যেসব এলাকা সন্ধির মাধ্যমে মদীনা রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল সেসব এলাকায় ইসলামের পূর্বে বিভিন্ন ধরনের রাজতন্ত্র ও স্থানীয় কর্তৃত্বসম্পন্ন প্রশাসন প্রতিষ্ঠিত ছিল। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসব রাজা ও আমীরকে পদচ্যুত করার পরিবর্তে তাদেরকে স্ব স্ব পদে বহাল রেখেছিলেন। কেননা দেশ দখল করাই নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের উদ্দেশ্য ছিলনা। স্থানীয় প্রশাসকের হাত থেকে কর্তৃত্ব কেড়ে নিয়ে স্বীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করাও ছিলনা তার প্রধান লক্ষ্য, বরং মানবতাকে মাখলূকের দাসত্ব মুক্ত করে একমাত্র মহান আল্লাহর বান্দা বানানোই ছিল তাঁর প্রধান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। আর এই উদ্দেশ্যেই তিনি প্রেরিত হয়েছিলেন দুনিয়াতে। সুতরাং সাম্রাজ্য বিস্তার করাই তাঁর কোনো লক্ষ্য ছিল না। এ কারণে যেসব দেশের রাজা-বাদশাহ ও স্থানীয় শাসনকর্তা দীন ইসলাম কবুল করেছিলেন, তাদের হাতেই তিনি তাদের কর্তৃত্ব- এলাকার শাসন ভার অর্পণ করেছিলেন। শুধু তাই নয়, যেসব স্থানীয় প্রশাসক দীন ইসলাম কবুল না করেও ইসলামী রাষ্ট্রকে জিযিয়া-কর দিতে সম্মত হয়েছিলেন, সেই সব এলাকার কর্তৃত্বও তিনি তাদের হাতেই থাকতে দিয়েছিলেন। এদের নিকট থেকে জিযিয়া গ্রহণ ব্যতীত অন্য কিছুর দাবী কখনই করা হয়নি।

এই অঞ্চলগুলো নিম্নলিখিত প্রদেশ ও স্থানীয় কর্তৃত্বে বিভক্ত ছিল:

১। বাইরাইন: এখানকার প্রশাসক ছিলেন মুসলিম। তার নাম ছিল মুনযির ইবন মাভী।

২। আম্মান: এখানকার প্রশাসক ও পরিচালক ছিলেন দুই ভাই। এদের একজনের নাম ছিল জায়ফর আর অপরজনের নাম আরফ। এরা দু’জনেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।

তাইমা: স্থানীয় রাষ্ট্র। এর শাসনকর্তা ছিল একজন ইয়াহূদী।

৪। আয়লা: স্থানীয় রাষ্ট্র। এখানকার প্রশাসক ছিলেন একজন খৃষ্টান।

৫। দওমাতুল জান্দাল: স্থানীয় রাষ্ট্র। এখানকার প্রশাসনেও একজন খৃষ্টান নিযুক্ত ছিলেন।

৬। নাজরান: স্থানীয় প্রশাসন। এটাও খৃষ্টধর্মালম্বী ছিল।

৭। ইয়ামেন: এই প্রদেশটি বিভিন্ন স্থানীয় প্রশাসনে বিভক্ত ছিল। এসবের অধিকাংশ প্রশাসক ছিলেন হিময়ারি। তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপস্থাপিত দীন কবুলের আহ্বানে মুসলিম হয়েছিলেন। সানার শাসনকর্তা বাযান ইবন সাসান পারসিক ছিলেন। তিনিও ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।

রাসূলের প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের আদর্শিক ব্যবস্থা:

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সময়কালে নিম্নলিখিত ধর্মসমূহ প্রচলিত ছিলঃ

১। দীন ইসলাম। তা ছিল এই রাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় আদর্শ। দেশের অধিকাংশ আদীবাসিই ছিল মুসলমান। আর সংখ্যাগুরু অধিবাসীদের জীবন আদর্শই যে রাষ্ট্রীয় আদর্শ হওয়া স্বাভাবিক, তাতে কোনো দ্বিমত থাকতে পারে না। কেননা প্রশাসনের নিয়ম শৃঙ্খলা পরিচালনের দায়িত্ব প্রধানত তাদের ওপরই অর্পিত হয়ে থাকে। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের সংকট বা তার ওপর হুমকি দেখা দিলে সংখ্যাগুরু জনতাই তখন নিজেদের ধন-মাল ও জান-প্রাণ কুরবান করার জন্য প্রস্তুত থাকে। কেননা দেশের স্বাধীনতাই তাদের স্বাধীনতা। তাদের নিজেদের স্বাধীনতা দেশের স্বাধীনতার ওপর নির্ভরশীল। এমতাবস্থায় সংখ্যাগুরু জনতার স্বকীয় জীবনাদর্শের পূর্ণ বাস্তবায়ন যেমন ন্যায়সঙ্গত শাসন ব্যবস্থা হতে পারে, তেমনি সংকটকালে তাদের নিকট থেকে জান-মালের কুরবানী পেতে হলে তাদের জীবনাদর্শকে পূর্ণ বিজয়ী ও প্রতিষ্ঠিত করা একান্তই অপরিহার্য। অন্যথায় দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব কিছুতেই রক্ষা পেতে পারে না।

২। ইয়াহূদী ধর্মমত। দক্ষিনে ইয়ামেন ও উত্তরে সিরিয়ায় এই ধর্মালম্বী জনতা বাস করত।

৩। খৃষ্ট ধর্মমত। এই ধর্মে বিশ্বাসী লোকদেরও অধিকাংশ বাস করত ইয়ামেন ও সিরিয়ায়।

৪। অগ্নিউপাসনার ধর্ম। এই ধর্মের লোক প্রধানত বাহরাইনে বাস করত। শেষোক্ত তিন ধর্মালম্বী লোকদের প্রতি ইসলামী রাষ্ট্রে পূর্ণ সুবিচার ও ন্যায়পরায়ণতার আচরণ প্রদর্শন করা হত। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগণ যেসব অধিকার ও সুবিধাদি ভোগ করতেন, তাদের জন্যও ছিল সেই সব অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা। অনুরূপভাবে তাদের ওপর দায়দায়িত্ব ঠিক সেইরূপ অর্পিত ছিল, যা ছিল সংখ্যাগুরু মুসলিম জনতার ওপর। বস্তুতঃ অধিবাসি জনগনের মধ্যে এমন এক মহত্তর সাম্য ও নিরপেক্ষ ন্যায়পরায়ণতা প্রতিষ্ঠিত ছিল, যার কোনো দৃষ্টান্ত কোথাও খুঁজে পাওয়া যেতে পারে না। দুনিয়ার সূচনা হতে নিয়ে অদ্যাবধি অপর কোনো আদর্শ বা ধর্মমত অনুরূপ দৃষ্টান্তের একশ ভাগের একভাগও উপস্থাপন করতে সক্ষম হয় নি, হবেও না ভবিষ্যতে। বস্তুত মুসলিম জনগণ অমুসলিম নাগরিকদেরকে ভ্রাতৃতুল্য জ্ঞান করতেন। কথা বা কাজ যে কোনো দিক দিয়ে তাদের সঙ্গে কোনোরূপ কষ্টদায়ক আচরণ করাকে তারা সম্পূর্ণ হারাম মনে করতেন। তাদের মতে, এ ধরনের আচরণে তাদের মানসিক কষ্টবোধের আশঙ্কা আছে। সূরা “আল-মুমতাহিনা” এর নিম্নোদ্ধৃত আয়াতটিই ছিল এ ক্ষেত্রে তাদের দিকদর্শন:

﴿لَّا يَنۡهَىٰكُمُ ٱللَّهُ عَنِ ٱلَّذِينَ لَمۡ يُقَٰتِلُوكُمۡ فِي ٱلدِّينِ وَلَمۡ يُخۡرِجُوكُم مِّن دِيَٰرِكُمۡ أَن تَبَرُّوهُمۡ وَتُقۡسِطُوٓاْ إِلَيۡهِمۡۚ إِنَّ ٱللَّهَ يُحِبُّ ٱلۡمُقۡسِطِينَ ٨﴾ [الممتحنة: ٨] 

“দীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে নি এবং তোমাদেরকে তোমাদের বাড়িঘড় থেকে বের করে দেয় নি তাদের প্রতি সদয় ব্যবহার করতে এবং তাদের প্রতি ন্যায় বিচার করতে আল্লাহ তোমাদেরকে নিষেধ করছেন না। নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায়পরায়ণদেরকে ভালোবাসেন”। [সূরা মুমতাহিনা, আয়াত: ৮]

ইসলাম এসব ধর্মালম্বীদের আকীদা-বিশ্বাস গ্রহণের পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছিল। তারা নিজেদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি কোনো প্রকার বাধা-প্রতিবন্ধকতা ব্যতীতই যথাযথভাবে পালন করতে পারত; নিজেদের মত বিশ্বাসের প্রকাশ ও প্রচার করার অবাধ সুযোগও পেত। তাদের নিজেদের পারস্পরিক ঝগড়া-বিবাদসমূহ নিজেদের ধর্ম বিধানের ভিত্তেতে মীমাংসা করে নেওয়ার অধিকারী ছিল। সাধারণ, রাষ্ট্রীয় ও সামষ্টিক ব্যাপারে  তারা রাষ্ট্রের একজন সাধারণ নাগরিকের মতোই নিরপেক্ষ আচরণ লাভ করত। কেননা তারাও ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থায় মুসলিম নাগরিকদের ন্যায়ই অভিন্ন সম্মান ও মর্যাদা লাভের অধিকারী ছিল। তাদেরও মৌলিক অধিকার ছিল তাই, যা ছিল একজন মুসলিম নাগরিকের। তাদের ওপর সেই সব দায়িত্ব ও কর্তব্য অর্পিত হত, যা হত মুসলিমদের ওপর।

ইসলামী রাষ্ট্রে অমুসলিম নাগরিকদের নিকট থেকে জিযিয়া নামক এক ধরনের বিশেষ কর ব্যতীত আর কিছুই দাবী করা হত না। এই জিযিয়া দান কোনো ক্রমেই কোনো অপমানকর ব্যবস্থা ছিল না। তাদের সঠিক সংরক্ষণ, অধিকার আদায় ও নিরাপত্তা বিধানের যে দায়িত্ব ইসলামী রাষ্ট্রকে বহন ও পালন করতে হত, তারই বিনিময় স্বরূপ তাদের নিকট হতে এই খাতের অর্থ গ্রহণ করা হত। জিযিয়ার পরিমাণ নির্ধারণ করার দায়িত্ব সব সময়ই সরকারের ওপর ন্যাস্ত থাকত।

মুসলমানদের ওপর জিযিয়া ধরনের কোনো কর ধার্য হত না বটে, কিন্তু তার পরিবর্তে তাদের নিকট হতে গ্রহণ করা হত যাকাত। অমুসলিম নাগরিকদের যাকাত দিতে হত না। অবশ্য জিযিয়া ও যাকাতের মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। জিযিয়া একটি নির্দিষ্ট পরিমাণে ধার্য হয়, যাকাতের পরিমাণ অনির্দিষ্ট। কেননা যাকাতযোগ্য অধিক পরিমাণ সম্পদের মালিকদের নিকট থেকে অধিক পরিমাণে যাকাত আদায় করা হবে, এটাই স্বাভাবিক। শুধু তাই নয়, মুসলিমগণ যাকাত ছাড়াও সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে আরও নানা খাতে  অর্থ ব্যয় করতে বাধ্য থাকত; অমুসলিমদের জন্য এই বাধ্যবাধকতা ছিল না।

যাকাত ও জিযিয়ার মধ্যকার আরও একটি পার্থক্য তা হচ্ছে, যাকাত বাবদ প্রাপ্ত সম্পদের বেশিরভাগ গরীব ও মিসকীনদের জন্য ব্যয় করতে হয়, জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করা হয় তার খুব কম অংশ। আর জিযিয়া সম্পূর্ণভাবে ব্যয় করা হয় সাধারণতঃ জনকল্যাণ  ও উন্নয়নমূলক কাজে। ‘যাকাত’ শব্দের অর্থ কোনো জিনিসের পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতা বিধান ও প্রবৃদ্ধি সাধন। যাকাত প্রদান করলে অবশিষ্ট সম্পদ পবিত্র ও হালাল হয় ও প্রবৃদ্ধি লাভ করে। এটি ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের অন্যতম। এর নাম যাকাত রাখা হয়েছে এই উদ্দেশ্যে যে, আর্থিক প্রয়োজন পূরণের যে দায়িত্ব রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জনগণের ওপর অর্পন করা হয় এবং প্রশাসন ও উন্নয়নের জন্য যেসব অর্থ দেশের সাধারণ নাগরিকদের নিকট থেকে আদায় করা হয়, তা থেকে এই সম্পদ সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যবস্থায় রাখতে হবে। এটি মুসলিমদের দীনি কর্তব্যভুক্ত। তা কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে যথারীতি আদায় করতে হবে। আদায় করার কর্তব্য এড়িয়ে যেতে কোনো ঈমানদার মুসলমানই চেষ্টা করবে না- কোনোরূপ অপকৌশলের আশ্রয় গ্রহণ করবে না। যাকাত নারী-পুরুষ-শিশু সর্ব পর্যায়ের লোকদের নিকট থেকেই গ্রহণ করা হয়, কিন্তু জিযিয়া এরূপ নয়।

এ পর্যায়ে স্মরণ রাখতে হবে, ইসলামী রাষ্ট্র মানেই অমুসলিম নাগরিকদের নিকট থেকে জিযিয়া নামক কর অবশ্য অবশ্যই আদায় করতে হবে এমন কোনো কথা নেই। কোনো অমুসলিম দেশ যুদ্ধ করে জয় করার পর দখলে রাখা হলে সেখানে যারা দীন ইসলাম কবুল করবে না, অমুসলিম থাকতে চাইবে, জিযিয়া কেবল তাদের নিকট থেকেই গ্রহণ করা হবে -এই করের অন্য কোনো নাম করণ করাতেও কোনো বাধা নেই। আল-কুরআনে এ সম্পর্কে যা কিছু বলা হয়েছে, তার সারমর্ম হলো-ইসলামী রাষ্ট্রের আনুগত্য স্বীকার করে তার স্মারক স্বরূপ একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ রাষ্ট্রের ধনভান্ডারে নিয়মিত দিতে প্রস্তুত থাকতে হবে, অন্য কিছু নয়। অমুসলিম নাগরিকগণ যদি জিযিয়া না দিয়ে সাধারণ পর্যায়ের একটা কর দিতে ইচ্ছা প্রকাশ করে, তবে ইসলামী রাষ্ট্র তাদের থেকে তা-ই গ্রহণ করবে। দ্বিতীয় খলিফা উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর খিলাফত আমলে ‘বনু তাগলুব’ গোত্রের খৃষ্টান জনগণ আবেদন জানিয়েছিল, তাদের জিযিয়া দিতে বাধ্য না করে ‘সাদকা’ নামে দ্বিগুণ অর্থ তাদের নিকট থেকে গ্রহণ করা হোক। খলিফা তাদের নিকট থেকে তাই সানন্দে গ্রহণ করেছিলেন।

দীন ইসলাম অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় স্বাধীনতার যে অনির্বচনীয় অধিকার ও সুযোগ সুবিধা দিয়েছে, তা তার পক্ষে বিরাট গৌরবের বিষয়, সন্দেহ নেই। ইসলামী রাষ্ট্রে তারা সর্বাত্মক নিরাপত্তার সঙ্গে বসবাস করতে পারে। তাদের ধর্মমত পরিবর্তন বা ইসলাম ধর্ম গ্রহণে বাধ্য করার কোনো অধিকারই ইসলাম কাউকে দেয় নি। তাদের সম্মানার্হ ধর্মীয় নেতাদের গালাগাল করে তাদের মনে কোনোরূপ কষ্টদানের সুযোগ নেই। পক্ষান্তরে ইসলাম তাদের এই অধিকার দিয়েছে যে, তারা শালীনতার সর্বজনবিদিত সীমার মধ্য থেকে সত্যানুসন্ধানের উদ্দেশ্যে দীন ইসলাম সম্পর্কে মুসলিমদের সঙ্গে তর্ক বিতর্কেও লিপ্ত হতে পারে। কুরআন মজীদে মুসলমানদের এই পর্যায়ে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে:

﴿وَلَا تُجَٰدِلُوٓاْ أَهۡلَ ٱلۡكِتَٰبِ إِلَّا بِٱلَّتِي هِيَ أَحۡسَنُ إِلَّا ٱلَّذِينَ ظَلَمُواْ مِنۡهُمۡۖ وَقُولُوٓاْ ءَامَنَّا بِٱلَّذِيٓ أُنزِلَ إِلَيۡنَا وَأُنزِلَ إِلَيۡكُمۡ وَإِلَٰهُنَا وَإِلَٰهُكُمۡ وَٰحِدٞ وَنَحۡنُ لَهُۥ مُسۡلِمُونَ ٤٦﴾ [العنكبوت: ٤٦] 

“আর তোমরা উত্তম পন্থা ছাড়া আহলে কিতাবদের সঙ্গে বিতর্ক করো না। তবে তাদের মধ্যে ওরা ছাড়া যারা জুলুম করেছে আর তোমরা বল আমরা ঈমান এনেছি আমাদের প্রতি যা নাযিল করা হয়েছে এবং তোমাদের প্রতি যা নাযিল করা হয়েছে তার প্রতি এবং আমাদের ইলাহ ও তোমাদের ইলাহও একই আর আমরা তারই সমীপে আত্মসমর্পণ করি”। [সূরা আল-‘আনকাবুত, আয়াত:  ৪৬]

বস্তুতঃ কুরআন মজীদে এমন অসংখ্য আয়াত রয়েছে, যাতে অমুসলিমদের সঙ্গে ভাল ব্যবহার করার ও তাদের প্রতি সুবিচার করার সুস্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সম্বোধন করেই বলা হয়েছে:

﴿وَلَا تَسۡتَوِي ٱلۡحَسَنَةُ وَلَا ٱلسَّيِّئَةُۚ ٱدۡفَعۡ بِٱلَّتِي هِيَ أَحۡسَنُ فَإِذَا ٱلَّذِي بَيۡنَكَ وَبَيۡنَهُۥ عَدَٰوَةٞ كَأَنَّهُۥ وَلِيٌّ حَمِيمٞ ٣٤﴾ [فصلت: ٣٤] 

“আর ভালো ও মন্দ সমান হতে পারে না, মন্দকে প্রতিহত কর তা দ্বারা যা উৎকৃষ্টতর, ফলে তোমার ও যার মধ্যে শত্রুতা রয়েছে সে যেন হয়ে যাবে তোমার অন্তরঙ্গ বন্ধু”। [সূরা ফুসসিলাত, আয়াত: ৩৪]

নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে ইয়াহূদী, নাসারা ও অগ্নিপূজক ছাড়াও মুনাফিকদের একটা শ্রেণী বর্তমান ছিল। তারা অন্তরে ও মনে কুফরের প্রতি অবিচল থাকলেও মুখে ইসলামের প্রতি বিশ্বাস প্রকাশ করত। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বাহ্যিক আচরণকেই গ্রহণ করেছিলেন আর প্রকৃত ব্যাপার সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিয়েছিলেন। তবে এদেরকে রাষ্ট্রপরিচালনায় সুযোগদানের ব্যাপারে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছিল। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো দায়িত্বপূর্ণ পদেই তাদের নিয়োগ করেননি। তাদের প্রতি কখনও বিশ্বাস স্থাপন করেন নি। আস্থা বা নির্ভরতাও প্রকাশ করেন নি।