ভাষাগত মুজিজা

ইলমী গবেষণা ডীনশীপ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, মদিনা মুনাওয়ারা

অনুবাদ: মোহাম্মাদ ইবরাহীম আবদুল হালীম সম্পাদনা: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

(১) রাসূল আলাইহিমুস সালামগণের ওপর ঈমান আনা:

আর তা ঈমানের রুকনসমূহের একটি রুকন, যার ওপর ঈমান আনা ছাড়া কোনো ব্যক্তির ঈমান পরিপূর্ণ হবে না।

রাসূলগণের ওপর ঈমান হল: এ কথার দৃঢ় বিশ্বাস করা যে, আল্লাহর অনেক রাসূল রয়েছে যাদেরকে তিনি তাঁর রিসালাত প্রচার করার জন্য নির্বাচন করেছেন। যারা তাদের অনুসরণ করবে, তারা হিদায়াত (সঠিক পথ) পাবে। আর যারা তাদের অনুসরণ করবে না তারা পথভ্রষ্ট হবে। আল্লাহ তাদের নিকট যে কিতাব অবতীর্ণ করেছেন তা সুস্পষ্টভাবে প্রচার করেছেন। তারা অর্পিত আমানত আদায় করেছেন এবং স্বীয় উম্মাতকে কল্যাণের উপদেশ দিয়েছেন। তারা আল্লাহর পথে যথাযথ জিহাদ করেছেন। এবং যা সহ প্রেরিত হয়েছেন তার কোনো অংশ পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও গোপন না করে স্বজাতির ওপর হুজ্জাত (পক্ষ-বিপক্ষের দলীল) কায়েম করেছেন। আল্লাহ যে সকল রাসূলদের নাম আমাদের কাছে উল্লেখ করেছেন, আর যাদের নাম উল্লেখ করেন নাই তাদের সকলের প্রতি আমরা ঈমান আনবো।

প্রত্যেক রাসূলই তাঁর পূর্ববর্তী রাসূল আগমণের সুসংবাদ দিতেন এবং পরবর্তী রাসূল পূর্ববতী রাসূলের সত্যায়ন করতেন।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿قُولُوٓاْ ءَامَنَّا بِٱللَّهِ وَمَآ أُنزِلَ إِلَيۡنَا وَمَآ أُنزِلَ إِلَىٰٓ إِبۡرَٰهِ‍ۧمَ وَإِسۡمَٰعِيلَ وَإِسۡحَٰقَ وَيَعۡقُوبَ وَٱلۡأَسۡبَاطِ وَمَآ أُوتِيَ مُوسَىٰ وَعِيسَىٰ وَمَآ أُوتِيَ ٱلنَّبِيُّونَ مِن رَّبِّهِمۡ لَا نُفَرِّقُ بَيۡنَ أَحَدٖ مِّنۡهُمۡ وَنَحۡنُ لَهُۥ مُسۡلِمُونَ ١٣٦﴾ [البقرة: ١٣٦]

“তোমরা বল, আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহর ওপর এবং যা অবতীর্ণ হয়েছে আমাদের প্রতি এবং যা অবতীর্ণ হয়েছে ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকুব এবং তদীয় বংশধরের প্রতি এবং মূসা, ঈসা ও অন্যান্য নবীকে তাদের রবের পক্ষ থেকে যা দান করা হয়েছে, তৎসমূদয়ের ওপর। আমরা তাদের মধ্যে পার্থক্য করি না। আর আমরা তাঁরই আনুগত্যকারী।” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৩৬]

আর যে ব্যক্তি কোনো রাসূলকে মিথ্যা জানল, সে যেন অস্বীকার করল যা সত্য বলে বিশ্বাস করেছিল এবং যে ব্যক্তি তাঁর (রাসূলের) অবাধ্য হলো, সে মূলতঃ তাঁর অবাধ্য হলো যিনি তাকে আনুগত্যের আদেশ করেছেন। (অর্থাৎ আল্লাহর)।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿إِنَّ ٱلَّذِينَ يَكۡفُرُونَ بِٱللَّهِ وَرُسُلِهِۦ وَيُرِيدُونَ أَن يُفَرِّقُواْ بَيۡنَ ٱللَّهِ وَرُسُلِهِۦ وَيَقُولُونَ نُؤۡمِنُ بِبَعۡضٖ وَنَكۡفُرُ بِبَعۡضٖ وَيُرِيدُونَ أَن يَتَّخِذُواْ بَيۡنَ ذَٰلِكَ سَبِيلًا ١٥٠ أُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡكَٰفِرُونَ حَقّٗاۚ وَأَعۡتَدۡنَا لِلۡكَٰفِرِينَ عَذَابٗا مُّهِينٗا ١٥١﴾ [النساء: ١٥٠، ١٥١]

“যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণকে অস্বীকার করে তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণের প্রতি বিশ্বাসে তারতম্য করতে চায় আর বলে যে, আমরা কতককে বিশ্বাস করি ও কতককে অস্বীকার করি এবং এরাই মধ্যবর্তী কোনো পথ অবলম্বন করতে চায়। প্রকৃতপক্ষে এরাই সত্য অস্বীকারকারী। আর যারা সত্য অস্বীকারকারী তাদের জন্য তৈরী করে রেখেছি অপমানজনক শাস্তি।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১৫০-১৫১]

(২) নবুওয়াতের হাকীকাত:

নবুওয়াত হলো: স্রষ্টা (আল্লাহ) ও সৃষ্টি জীবের (বান্দার) মাঝে তাঁর শরী‘আত প্রচারের মাধ্যম। আল্লাহ স্বীয় বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা নবুওয়াতের জন্য মনোনীত করেন এবং নবুওয়াত দিয়ে সম্মানিত করেন। এতে আল্লাহ ছাড়া কারো কোনো প্রকার ইখতিয়ার নেই।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ٱللَّهُ يَصۡطَفِي مِنَ ٱلۡمَلَٰٓئِكَةِ رُسُلٗا وَمِنَ ٱلنَّاسِۚ إِنَّ ٱللَّهَ سَمِيعُۢ بَصِيرٞ ٧٥﴾ [الحج: ٧٥]

“আল্লাহ ফিরিশতা ও মানুষের মধ্য থেকে রাসূল মনোনীত করেন, নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।” [সূরা আল-হাজ্, আয়াত: ৭৫]

নবুওয়াত (আল্লাহ কর্তৃক) প্রদত্ত, কারো অর্জিত নয়, অধিক ইবাদত বা আনুগত্যের মাধ্যমে পাওয়া যায় না। কোনো নবীর ইচ্ছায় বা তাঁর চাওয়ার মাধ্যমে ও আসে না। তা শুধুমাত্র মহান আল্লাহর নির্বাচন ও মনোনয়ন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ٱللَّهُ يَجۡتَبِيٓ إِلَيۡهِ مَن يَشَآءُ وَيَهۡدِيٓ إِلَيۡهِ مَن يُنِيبُ ١٣﴾ [الشورا: ١٣]

“আল্লাহ যাকে ইচ্ছা মনোনীত করেন এবং যে তাঁর অভিমূখী হয়, তাকে পথ প্রদর্শন করেন।” [সূরা আশ-শূরা, আয়াত: ১৩]

(৩) রাসূল প্রেরণের হিকমত বা রহস্য:  

রাসূলগণের প্রেরণের হিকমত নিম্নরূপ:

প্রথমত: বান্দাদেরকে বান্দার ইবাদত করা থেকে মুক্ত করে বান্দার প্রতিপালকের (আল্লাহর) ইবাদতে নিয়ে যাওয়া এবং সৃষ্টিজীবের দাসত্বের বন্ধন থেকে মুক্ত করে স্বীয় রবের (আল্লাহর) স্বাধীন ইবাদতের পথ দেখানো।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَمَآ أَرۡسَلۡنَٰكَ إِلَّا رَحۡمَةٗ لِّلۡعَٰلَمِينَ ١٠٧﴾ [الانبياء: ١٠٧]

“আর আমরা তো আপনাকে কেবল সৃষ্টিকুলের জন্যে রহমতস্বরূপই প্রেরণ করেছি।” [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ১০৭]

দ্বিতীয়ত: যে উদ্দেশ্যে আল্লাহ সৃষ্টিজীব সৃষ্টি করেছেন, সে উদ্দেশ্যের সাথে (মানুষকে) পরিচয় করানো।

আর সে উদ্দেশ্য হলো তাঁর একত্ববাদ বিশ্বাস ও ইবাদত করা। তা একমাত্র রাসূলগণের মাধ্যমে জানা যায়। যাদেরকে আল্লাহ তাঁর সৃষ্টজীব থেকে মনোনয়ন করেছেন এবং সকলের ওপর প্রাধান্য দিয়েছেন।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَلَقَدۡ بَعَثۡنَا فِي كُلِّ أُمَّةٖ رَّسُولًا أَنِ ٱعۡبُدُواْ ٱللَّهَ وَٱجۡتَنِبُواْ ٱلطَّٰغُوتَۖ﴾ [النحل: ٣٦]

“আর অবশ্যই আমরা প্রত্যেক উম্মাতের মধ্যেই রাসূল প্রেরণ করেছি এই মর্মে যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং তাগূতকে (আল্লাহ ব্যতীত অন্যের ইবাদত করা হয় তাদেরকে) বর্জন কর।” [সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৩৬]

তৃতীয়ত: রাসূলগণকে প্রেরণের মাধ্যমে মানুষের ওপর হুজ্জাত (পক্ষ-বিপক্ষের দলীল) প্রতিষ্ঠিত করা।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿رُّسُلٗا مُّبَشِّرِينَ وَمُنذِرِينَ لِئَلَّا يَكُونَ لِلنَّاسِ عَلَى ٱللَّهِ حُجَّةُۢ بَعۡدَ ٱلرُّسُلِۚ وَكَانَ ٱللَّهُ عَزِيزًا حَكِيمٗا ١٦٥﴾ [النساء: ١٦٥]

“সুসংবাদদাতা ও ভীতি-প্রদর্শনকারী রাসূলগণকে প্রেরণ করেছি, যাতে রাসূলগণের পরে আল্লাহর প্রতি অপবাদ আরোপ করার মতো কোনো অবকাশ মানুষের জন্য না থাকে, আর আল্লাহ পরাক্রমশীল, প্রজ্ঞাময়।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১৬৫]

চতুর্থত: কিছু গায়েবী বিষয়ের বিষয় বর্ণনা করা, যা মানুষ তাদের জ্ঞান দ্বারা উপলব্ধি করতে পারে না।

যেমন, আল্লাহর নামসমূহ ও তাঁর গুণসমূহ এবং ফিরিশতাদের ও শেষ দিবস সম্পর্কে জানা ইত্যাদি।

পঞ্চমত: যাতে রাসূলরা অনুসরণীয় উত্তম আদর্শ হয়; কেননা আল্লাহ তাদেরকে উত্তম চরিত্রে পূর্ণ করেছেন এবং তাদেরকে সংশয় ও প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে মুক্ত রেখেছেন।

 আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿أُوْلَٰٓئِكَ ٱلَّذِينَ هَدَى ٱللَّهُۖ فَبِهُدَىٰهُمُ ٱقۡتَدِهۡۗ﴾ [الانعام: ٩٠]

“তারা এমন ছিলেন, যাদেরকে আল্লাহ পথ-প্রদর্শন করেছিলেন, অতএব আপনিও তাদের পথ অনুসরণ করুন।” [সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ৯০]

তিনি আরো বলেন,

﴿لَقَدۡ كَانَ لَكُمۡ فِيهِمۡ أُسۡوَةٌ حَسَنَةٞ﴾ [الممتحنة: ٦]

“তোমাদের জন্য রাসূলদের মধ্যে উত্তম আদর্শ-রয়েছে।” [সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ২১]

ষষ্ঠত: আত্মশুদ্ধি ও পবিত্রকরণ এবং আত্মবিনষ্টকারী থেকে সর্তক-সাবধান করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿هُوَ ٱلَّذِي بَعَثَ فِي ٱلۡأُمِّيِّ‍ۧنَ رَسُولٗا مِّنۡهُمۡ يَتۡلُواْ عَلَيۡهِمۡ ءَايَٰتِهِۦ وَيُزَكِّيهِمۡ وَيُعَلِّمُهُمُ ٱلۡكِتَٰبَ وَٱلۡحِكۡمَةَ وَإِن كَانُواْ مِن قَبۡلُ لَفِي ضَلَٰلٖ مُّبِينٖ ٢﴾ [الجمعة: ٢]

“তিনিই সে সত্তা, যিনি নিরক্ষরদের মধ্য থেকে একজন রাসূল প্রেরণ করেছেন, যিনি তাদের কাছে পাঠ করেন তাঁর আয়াতসমূহ, তাদেরকে পবিত্র করেন এবং শিক্ষা দেন কিতাব ও হিকমাত।” [সূরা আল-জুমু‘আ, আয়াত: ২]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«إنما بعثت لأتمم مكارم الأخلاق».

“আমি উত্তম আদর্শ পরিপূর্ণ করার জন্যেই প্রেরিত হয়েছি।” (আহমদ ও হাকেম)

(৪) রাসূলগণের দায়িত্বসমূহ:

রাসূলগণের অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে, যেমন:

(ক) শরী‘আত প্রচার করা, মানুষকে এক আল্লাহর ইবাদত করতে এবং তিনি ব্যতীত অন্যের ইবাদত থেকে মুক্ত হওয়ার আহবান করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ٱلَّذِينَ يُبَلِّغُونَ رِسَٰلَٰتِ ٱللَّهِ وَيَخۡشَوۡنَهُۥ وَلَا يَخۡشَوۡنَ أَحَدًا إِلَّا ٱللَّهَۗ وَكَفَىٰ بِٱللَّهِ حَسِيبٗا ٣٩﴾ [الاحزاب: ٣٩]

“তাঁরা (নবীগণ) আল্লাহর রিসালাত প্রচার করতেন ও তাঁকে ভয় করতেন। তারা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে ভয় করতেন না। হিসাব গ্রহণের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।” [সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৩৯]

(খ) দীনের অবতীর্ণ বিধান বর্ণনা করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿بِٱلۡبَيِّنَٰتِ وَٱلزُّبُرِۗ وَأَنزَلۡنَآ إِلَيۡكَ ٱلذِّكۡرَ لِتُبَيِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِّلَ إِلَيۡهِمۡ وَلَعَلَّهُمۡ يَتَفَكَّرُونَ ٤٤ ﴾ [النحل: ٤٤]

“আপনার কাছে আমরা উপদেশ ভাণ্ডার (কুরআন) অবতীর্ণ করেছি। যাতে আপনি লোকদের সামনে ঐ সব বিষয় বিবৃত করেন, যেগুলো তাদের প্রতি অবতীর্ণ করা হয়েছে, যাতে তারা চিন্তা ভাবনা করে।” [সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৪৪]

(গ) উম্মাতকে কল্যাণের পথ প্রদর্শণ ও অকল্যাণ থেকে সতর্ক সাবধান করা এবং তাদেরকে পূণ্যের সুসংবাদ ও তাদেরকে শাস্তির ভীতি-প্রদর্শন করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿رُّسُلٗا مُّبَشِّرِينَ وَمُنذِرِينَ﴾ [النساء: ١٦٥]

“সুসংবাদদাতা ও ভীতি-প্রদর্শনকারী রাসূলগণকে প্রেরণ করেছি।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১৬৫]

(ঘ) মানুষকে কথায় ও কাজে সুন্দর চরিত্র ও উত্তম আদর্শবান করে তোলা।

(ঙ) আল্লাহর শরী‘আত বান্দাদের মাঝে প্রতিষ্ঠা ও বাস্তবায়ণ করা।

(চ) রাসূলগণের স্বীয় উম্মাতের বিপক্ষে শেষ দিবসে এ সাক্ষ্য দেওয়া যে তারা তাদের নিকট স্পষ্টভাবে দীনের দাওয়াত পৌঁছায়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿فَكَيۡفَ إِذَا جِئۡنَا مِن كُلِّ أُمَّةِۢ بِشَهِيدٖ وَجِئۡنَا بِكَ عَلَىٰ هَٰٓؤُلَآءِ شَهِيدٗا ٤١﴾ [النساء: ٤١]

“আর তখন কি অবস্থা দাঁড়াবে, যখন আমি প্রতিটি উম্মাতের মধ্য থেকে সাক্ষী উপস্থাপন করব এবং আপনাকে তাদের ওপর সাক্ষী উপস্থাপন করব।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৪১]

(৫) ইসলাম সকল নবীদের দীন:

ইসলাম সকল নবী ও রাসূলগণের দীন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿إِنَّ ٱلدِّينَ عِندَ ٱللَّهِ ٱلۡإِسۡلَٰمُۗ﴾ [ال عمران: ١٩]

“নিঃসন্দেহে আল্লাহর নিকট গ্রহনযোগ্য দীন বা ধর্ম একমাত্র ইসলাম।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৯]

তাঁরা সকলেই এক আল্লাহর ইবাদত করার দিকে এবং আল্লাহ ছাড়া অন্যের ইবাদত বর্জন করার আহবান জানাতেন। যদি ও তাদের শরী‘আত ও বিধি-বিধান ভিন্ন রকম ছিল, কিন্তু তারা সকলেই মূলনীতিতে একমত ছিলন, তা হলো তাওহীদ বা আল্লাহর একত্ববাদ।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«الأنبياء إخوة لعلات»

“নবীরা একে অপরে বৈমাত্রেয় ভাই ছিলেন।” (সহীহ বুখারী)

(৬) রাসূলগণ মানুষ, তারা গায়েব জানেন না:

ইলমে গাইব জানা আল্লাহর বৈশিষ্ট্য, নবীগণের গুণ নয়। কারণ তারা অন্যান্য মানুষের মত মানুষ। তারা পানাহার করেন, বৈবাহিকসূত্রে আবদ্ধ হন, নিদ্রা যান, অসুস্থ হন ও ক্লান্ত হন।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَمَآ أَرۡسَلۡنَا قَبۡلَكَ مِنَ ٱلۡمُرۡسَلِينَ إِلَّآ إِنَّهُمۡ لَيَأۡكُلُونَ ٱلطَّعَامَ وَيَمۡشُونَ فِي ٱلۡأَسۡوَاقِۗ ﴾ [الفرقان: ٢٠]

“আপনার পূর্বে যত রাসূল প্রেরণ করেছি, তারা সবাই খাদ্য গ্রহণ করত এবং হাটে বাজারে চলা ফেরা করত।” [সূরা আল-ফুরকান, আয়াত: ২০]

আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন,

﴿وَلَقَدۡ أَرۡسَلۡنَا رُسُلٗا مِّن قَبۡلِكَ وَجَعَلۡنَا لَهُمۡ أَزۡوَٰجٗا وَذُرِّيَّةٗۚ﴾ [الرعد: ٣٨]

“আপনার পূর্বে আমরা অনেক রাসূল প্রেরণ করেছি এবং তাদেরকে স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি দিয়েছি।” [সূরা আর-রা‘দ, আয়াত: ৩৮]

তাদেরকে ও চিন্তা, দুঃখ আনন্দ ও কর্ম প্রেরণা স্পর্শ করে যেমন- সাধারণ মানুষকে পেয়ে থাকে। কিন্তু আল্লাহ তাদেরকে তাঁর দীন প্রচার করার জন্য মনোনয়ন করেছেন। আল্লাহ তাদেরকে (রাসূলদেরকে ইলমে গায়েব হতে) যা অবগত করান তা ব্যতীত কোনো ইলমে গায়েব জানেন না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿عَٰلِمُ ٱلۡغَيۡبِ فَلَا يُظۡهِرُ عَلَىٰ غَيۡبِهِۦٓ أَحَدًا ٢٦ إِلَّا مَنِ ٱرۡتَضَىٰ مِن رَّسُولٖ فَإِنَّهُۥ يَسۡلُكُ مِنۢ بَيۡنِ يَدَيۡهِ وَمِنۡ خَلۡفِهِۦ رَصَدٗا ٢٧﴾ [الجن: ٢٦، ٢٧]

“তিনি গায়েবের জ্ঞানী, পরন্তু তিনি গায়েবের বিষয় কারও কাছে প্রকাশ করেন না। তাঁর মনোনীত রাসূল ব্যতীত। তখন তিনি তার অগ্রেও পশ্চাতে প্রহরী নিযুক্ত করেন।” [সূরা আল-জিন্ন, আয়াত: ২৬-২৭]

(৭) রাসূলগণ মা‘সূম বা নিস্পাপ: আল্লাহ তা‘আলা তাঁর রিসালাত প্রদান ও প্রচার করার জন্য তাঁর সৃষ্টজীব থেকে উত্তম লোকদেরকে নির্বাচন করেছেন। যারা সৃষ্টিগত ও চরিত্রগত দিক থেকে পরিপূর্ণ, আল্লাহ তাদেরকে কবীরা গুনাহ থেকে নিরাপদে রেখেছেন। সকল ত্রুটি থেকে তাদেরকে মুক্ত করেছেন।

যাতে তারা আল্লাহর অহী স্বীয় উম্মাতের নিকট পৌঁছাতে সক্ষম হন।

আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর রিসালাত প্রচারের ব্যাপারে যে সংবাদ দিয়েছেন, তাতে তারা যে মা‘সূম তা সর্বজনস্বীকৃত। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلرَّسُولُ بَلِّغۡ مَآ أُنزِلَ إِلَيۡكَ مِن رَّبِّكَۖ وَإِن لَّمۡ تَفۡعَلۡ فَمَا بَلَّغۡتَ رِسَالَتَهُۥۚ وَٱللَّهُ يَعۡصِمُكَ مِنَ ٱلنَّاسِۗ﴾ [المائ‍دة: ٦٧]

“হে রাসূল, পৌঁছে দিন আপনার প্রতি পালকের পক্ষ থেকে আপনার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে। আর যদি আপনি এরূপ না করেন,তবে আপনি তাঁর রিসালাত কিছুই পৌঁছালেন না, আল্লাহ আপনাকে মানুষের কাছ থেকে নিরাপদে রাখবেন।” [সূরা আল-মায়েদা, আয়াত: ৬৭]

তিনি আরো বলেন,

﴿ٱلَّذِينَ يُبَلِّغُونَ رِسَٰلَٰتِ ٱللَّهِ وَيَخۡشَوۡنَهُۥ وَلَا يَخۡشَوۡنَ أَحَدًا إِلَّا ٱللَّهَۗ﴾ [الاحزاب: ٣٩]

“তাঁরা (নবীগণ) আল্লাহর রিসালাত প্রচার করতেন ও তাঁকে ভয় করতেন, তারা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে ভয় করতেন না।” [সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৩৯]

তিনি আরো বলেন,

﴿لِّيَعۡلَمَ أَن قَدۡ أَبۡلَغُواْ رِسَٰلَٰتِ رَبِّهِمۡ وَأَحَاطَ بِمَا لَدَيۡهِمۡ وَأَحۡصَىٰ كُلَّ شَيۡءٍ عَدَدَۢا ٢٨﴾ [الجن: ٢٨]

“যাতে আল্লাহ তা‘আলা জেনে নেন যে, রাসূলগণ তাদের পালনকর্তার রিসালাত পৌঁছিয়েছেন কিনা। রাসূলগণের কাছে যা আছে, তা তাঁর জ্ঞান-গোচর। তিনি সব কিছুর সংখ্যার হিসাব রাখেন।” [সূরা আল-জিন্ন, আয়াত: ২৮]

এবং যখন তাদের কারো পক্ষ থেকে এমন কোনো ছোট পাপ কর্ম প্রকাশিত হয় যা তাবলীগের (দীন প্রচারের) সাথে সম্পৃক্ত নয়, তখন তা তাদের নিকট বর্ণনা করা হলে তারা আল্লাহর কাছে তাওবাহ ও তাঁর দিকে এমনভাবে ধাবমান যেন এ পাপ তাদের কাছ থেকে প্রকাশ পায় নি, ফলে তারা তাদের পূর্বের মর্যাদার চেয়ে আরো উচ্চ মর্যাদা লাভ করবেন। তা এ জন্য যে, আল্লাহ তাঁর নবীদেরকে পূর্ণ সৎ চরিত্রে ও ভাল গুণে বিশেষিত করেছেন। এবং তাদের মান-মর্যাদা সুউচ্চ অবস্থান ক্ষুন্ন হয় এমন সকল জিনিস থেকে তাদেরকে পবিত্র রেখেছেন।

(৮) নবী ও রাসূলগণের সংখ্যা ও তাদের মধ্যে যারা উত্তম:

রাসূলগণের সংখ্যা তিন শত দশের কিছু বেশি প্রমাণিত হয়েছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যখন রাসূলগণের সংখ্যা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয় তখন তিনি বলেন,

«ثلاثمائة وخمس عشرة جماً وغفيراً»

“তিনশত পনের জনের বিরাট এক দল।” (হাকিম)

আর নবীদের সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি। আল্লাহ তাদের কারোও কথা তাঁর কিতাবে আমাদের জন্য বর্ণনা করেছেন, আর কারোও কথা বর্ণনা করেন নি। আল্লাহ তাঁর কিতাবে পঁচিশ জন নবী ও রাসূলের নাম উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَرُسُلٗا قَدۡ قَصَصۡنَٰهُمۡ عَلَيۡكَ مِن قَبۡلُ وَرُسُلٗا لَّمۡ نَقۡصُصۡهُمۡ عَلَيۡكَۚ وَكَلَّمَ ٱللَّهُ مُوسَىٰ تَكۡلِيمٗا ١٦٤﴾ [النساء: ١٦٤]

 

“আর এমন কতক রাসূল প্রেরণ করেছি যাদের ইতিবৃত্ত আমরা আপনাকে বর্ণনা করেছি ইতোপূর্বে এবং এমন কতক রাসূল প্রেরণ করেছি যাদের বৃত্তান্ত আপনার কাছে বর্ণনা করি নি।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১৬৪]

তিনি আরো বলেন,

 ﴿وَتِلۡكَ حُجَّتُنَآ ءَاتَيۡنَٰهَآ إِبۡرَٰهِيمَ عَلَىٰ قَوۡمِهِۦۚ نَرۡفَعُ دَرَجَٰتٖ مَّن نَّشَآءُۗ إِنَّ رَبَّكَ حَكِيمٌ عَلِيمٞ ٨٣ وَوَهَبۡنَا لَهُۥٓ إِسۡحَٰقَ وَيَعۡقُوبَۚ كُلًّا هَدَيۡنَاۚ وَنُوحًا هَدَيۡنَا مِن قَبۡلُۖ وَمِن ذُرِّيَّتِهِۦ دَاوُۥدَ وَسُلَيۡمَٰنَ وَأَيُّوبَ وَيُوسُفَ وَمُوسَىٰ وَهَٰرُونَۚ وَكَذَٰلِكَ نَجۡزِي ٱلۡمُحۡسِنِينَ ٨٤ وَزَكَرِيَّا وَيَحۡيَىٰ وَعِيسَىٰ وَإِلۡيَاسَۖ كُلّٞ مِّنَ ٱلصَّٰلِحِينَ ٨٥ وَإِسۡمَٰعِيلَ وَٱلۡيَسَعَ وَيُونُسَ وَلُوطٗاۚ وَكُلّٗا فَضَّلۡنَا عَلَى ٱلۡعَٰلَمِينَ ٨٦ وَمِنۡ ءَابَآئِهِمۡ وَذُرِّيَّٰتِهِمۡ وَإِخۡوَٰنِهِمۡۖ وَٱجۡتَبَيۡنَٰهُمۡ وَهَدَيۡنَٰهُمۡ إِلَىٰ صِرَٰطٖ مُّسۡتَقِيمٖ ٨٧﴾ [الانعام: ٨٣، ٨٧]

“এটি ছিল আমার যুক্তি, যা আমরা ইবরাহীমকে তাঁর সম্প্রদায়ের বিপক্ষে প্রদান করেছিলাম। আমরা যাকে ইচ্ছা মর্যাদায় সমুন্নত করি। আপনার পালনকর্তা প্রজ্ঞাময়, মহাজ্ঞানী। আমরা তাঁকে দান করেছি ইসহাক ও ইয়াকূব। প্রত্যেককেই আমরা পথ-প্রদর্শন করেছি এবং পূর্বে আমি নূহকে পথ-প্রদর্শন করেছি- তাঁর সন্তানদের মধ্যে দাউদ, সোলায়মান, আইউব, ইউসুফ, মূসা ও হারুনকে। এমনিভাবে আমরা সৎকর্মীদের প্রতিদান দিয়ে থাকি। আরও যাকারিয়া, ইয়াহ্ইয়া, ঈসা এবং ইলিয়াসকে। তারা সবাই পূণ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। আর ইসমাঈল, ঈসা, ইউনুস, লূতকে প্রত্যেককেই আমরা সারা বিশ্বের ওপর গৌরবান্বিত করেছি। আরো তাদের কিছু সংখ্যক পিতৃপুরুষ, সন্তান-সন্ততি ও ভ্রাতাদেরকে, আমরা তাদেরকে মনোনীত করেছি এবং সরল পথ প্রদর্শন করেছি।” [সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ৮৩-৮৭]

আল্লাহ নবীদের কাউকে অন্যদের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَلَقَدۡ فَضَّلۡنَا بَعۡضَ ٱلنَّبِيِّ‍ۧنَ عَلَىٰ بَعۡضٖۖ﴾ [الاسراء: ٥٥]

“অবশ্যই আমরা নবীদেরকে কতককে কতকের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি।” [সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ৫৫]

এবং আল্লাহ রাসূলদের কাউকে কারো ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿تِلۡكَ ٱلرُّسُلُ فَضَّلۡنَا بَعۡضَهُمۡ عَلَىٰ بَعۡضٖۘ﴾ [البقرة: ٢٥٣]

“এ রাসূলগণ আমরা তাদের কাউকে কারো ওপর মর্যাদা দান করেছি।” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ২৫৩]

রাসূলগণের মধ্যে যারা উলুল-আযম তথা উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন তারা সর্ব উত্তম। তারা হলেন নূহ, ইবরাহীম, মূসা, ঈসা ও আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿فَٱصۡبِرۡ كَمَا صَبَرَ أُوْلُواْ ٱلۡعَزۡمِ مِنَ ٱلرُّسُلِ﴾ [الاحقاف: ٣٥]

“অতএব আপনি ধৈর্য ধরুন, যেমন উলুল আযম (উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন) রাসূলগণ ধৈর্য ধরেছেন।” [সূরা আল-আহক্বাফ, আয়াত: ৩৫]

তিনি আরো বলেন,

﴿وَإِذۡ أَخَذۡنَا مِنَ ٱلنَّبِيِّ‍ۧنَ مِيثَٰقَهُمۡ وَمِنكَ وَمِن نُّوحٖ وَإِبۡرَٰهِيمَ وَمُوسَىٰ وَعِيسَى ٱبۡنِ مَرۡيَمَۖ وَأَخَذۡنَا مِنۡهُم مِّيثَٰقًا غَلِيظٗا ٧﴾ [الاحزاب: ٧]

“যখন আমরা নবীগণের কাছ থেকে, আপনার কাছ থেকে এবং নূহ, ইবরাহীম মূসা ও মারিইয়ামের পুত্র ঈসার কাছ থেকে অঙ্গীকার নিলাম, আরো অঙ্গীকার নিলাম তাদের কাছ থেকে দৃঢ় অঙ্গীকার।” [সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৭]

মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাসূলদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ নবী, মুত্তাকীদের ইমাম, আদম সন্তানের সরদার। নবীরা যখন একত্রিত হবেন তখন তিনি তাদের ইমাম। যখন তারা কোনো জায়গা থেকে প্রতিনিধি দল হিসাবে আগমন করেন তখন তিনি তাদের প্রবক্তা। তিনি মাকামে মাহমুদের (প্রশংসিত স্থানের) মালিক, যে স্থানকে নিয়ে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকলেই ঈর্ষা করবে।

অবতরণ স্থান, হাউয ও হামদ বা প্রশংসার ঝাণ্ডার মালিক। শেষ দিবসে সমস্ত সৃষ্টি জীবের সুপারিশকারী, জান্নাতের ওয়াসীলা নামক স্থা্ন ও মর্যাদার মালিক। আল্লাহ তাকে তাঁর দীনের সর্বোত্তম শরী‘আত বিধি-বিধান দিয়ে প্রেরণ করেছেন এবং তাঁর উম্মাতকে সর্বোত্তম উম্মতরূপে এই পৃথিবীতে মানুষের কল্যাণের জন্য পাঠানো হয়েছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর উম্মাতের জন্য বহু মর্যাদা ও উত্তম বৈশিষ্ট্য দিয়েছেন। যা তাদের পূর্ববর্তীদের থেকে স্বতন্ত্র। সৃষ্টির দিক দিয়ে তারা সর্বশেষ উম্মত আর পুনরুত্থানে তারা সর্বপ্রথম উম্মত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«فضلت على الأنبياء بست».

“আমি ছয়টি বৈশিষ্ট্যে সকল নবীদের ওপর প্রাধান্য পেয়েছি।” (সহীহ মুসলিম)

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন,

«أنا سيد ولد آدم يوم القيامة وبيدي لواء الحمد ولا فخر. وما من نبي يومئذ آدم فمن سواه إلا تحت لوائي يوم القيامة».

“আমি কিয়ামত দিবসে আদম সন্তানের সর্দার, আমারই হাতে হামদের পতাকা থাকবে। এটা কোনো গর্বের বিষয় নয়। কিয়ামত দিবসে আদম ছাড়া সকলেই আমার পতাকার অধীনে থাকবে।” (তিরমিযী ও আহমদ)

মর্যাদার দিক দিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরে যিনি তিনি হলেন ইবরাহীম খালীলুর রহমান। সুতরাং (আল্লাহর) দু’বন্ধু -মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও ইবরাহীম আলাইহিস সালাম উলুল আযমদের সর্বশ্রেষ্ঠ। অতঃপর তিনজন (নূহ, মূসা ও ঈসা) সর্বশ্রেষ্ঠ (অন্য সব নবীদের চেয়ে)।

(৯) নবীদের মু‘জিযা:

আল্লাহ তাঁর রাসূলদের সহযোগিতা করেছেন বড় বড় নিদর্শন ও উজ্জ্বল মু‘জিযার (অলৌকিক শক্তির) দ্বারা। যাতে হুজ্জাত (পক্ষে-বিপক্ষে প্রমাণ) প্রতিষ্ঠিত হয় অথবা প্রয়োজন পূরণ হয়।

যেমন, কুরআনুল কারীম, চন্দ্র বিদীর্ণ হওয়া, লাঠি ভয়ানক সাপে পরিণত হওয়া, ইত্যাদি।

অতঃপর মু‘জিযা (স্বাভাবিক নীতি ভঙ্গকারী-অলৌকিক শক্তি) নবুওয়াতের সত্যতা প্রমাণের দালীল, আর কারামাহ্ (অলীদের জন্যও অলৌকিক শক্তি) নবুওয়াতের সত্যতা সাক্ষ্যকারী প্রমাণস্বরূপ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿لَقَدۡ أَرۡسَلۡنَا رُسُلَنَا بِٱلۡبَيِّنَٰتِ﴾ [الحديد: ٢٥]

“আমরা আমাদের রাসূলদেরকে সুস্পষ্ট প্রমাণাদিসহ প্রেরণ করেছি।” [সূরা আল-হাদীদ, আয়াত: ২৫]

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«ما من نيي من الأنبياء إلا وقد أوتي من الآيات ما آمن على مثله البشر وإنما كان الذي أوتيته وحياً أوحاه إلي فأرجو أن أكون أكثرهم تابعاً يوم القيامة».

“প্রত্যেক নবীই নিদর্শন বা মু‘জিযাপ্রাপ্ত হয়েছেন, যে মু‘জিযার মত কিছু দেখে মানুষ ঈমান এনেছে। আর আমি যা প্রাপ্ত হয়েছি তা সেই অহী যা আমার নিকট (আল্লাহ) অবতীর্ণ করেছেন। ফলে আমি আশাবাদী যে, কিয়ামত দিবসে তাদের চেয়ে আমার অনুসারী বেশি হবে।” (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)

(১০) আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়াতের ওপর ঈমান:

নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়াতের ওপর ঈমান আনা ঈমানের মূলনীতিসমূহের একটি অন্যতম মূলনীতি। এর ওপর ঈমান আনা ছাড়া কারোও ঈমান পরিপূর্ণ হবে না।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَمَن لَّمۡ يُؤۡمِنۢ بِٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦ فَإِنَّآ أَعۡتَدۡنَا لِلۡكَٰفِرِينَ سَعِيرٗا ١٣﴾ [الفتح: ١٣]

“যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ওপর ঈমান আনে না, আমি সেসব কাফিরের জন্য জ্বলন্ত অগ্নি প্রস্তুত করে রেখেছি।” [সূরা আল-ফাতহ, আয়াত: ১৩]

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«أمرت أن أقاتل الناس حتى يشهدوا أن لا إلا إله إلا الله وإني رسول الله».

“আমি আদেশপ্রাপ্ত হয়েছি যে মানুষের সাথে যুদ্ধ করব যতক্ষণ না তারা-আল্লাহ ছাড়া সত্যিকার কোনো মা‘বুদ নেই এবং আমি আল্লাহর রাসূল-এ কথার সাক্ষ্য দিবে।” (সহীহ মুসলিম)

নিম্নে বর্ণিত বিষয়ের ওপর ঈমান আনার মাধ্যমে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর ঈমান আনা পরিপূর্ণ হবে:

প্রথমত: আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা বা জানা। তিনি হলেন মুহাম্মাদ ইবন আব্দুল্লাহ ইবন আব্দুল মুত্তালিব ইবন হাশিম, হাশিম কুরাইশ বংশ, আর কুরাইশ আরব বংশ আর আরব ইসমাঈল ইবন ইবরাহীম আল-খালীল এর বংশধর, তাঁর ও আমাদের নবীর ওপর সর্ব উত্তম দুরুদ ও সালাম বর্ষিত হউক। তাঁর তেষট্টি বছর বয়স হয়েছিল। নবুয়াতের পূর্বে চল্লিশ বৎসর, নবী ও রাসূল হওয়ার পরে তেইশ বৎসর।

দ্বিতীয়ত: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে বিষয়ে সংবাদ দিয়েছেন সে বিষয়ে তাঁকে বিশ্বাস করা, যে বিষয় তিনি আদেশ করেছেন, তার অনুসরণ করা। যে বিষয় থেকে তিনি নিষেধ করেছেন ও সতর্ক করেছেন তা থেকে বিরত থাকা। তিনি যে বিধান দান করেছেন সে অনুযায়ী আল্লাহর ইবাদত করা।

তৃতীয়ত: তিনি জিন্ন ও ইনসান সকলের নিকট প্রেরিত আল্লাহর রাসূল এ কথার বিশ্বাস রাখা। সবাইকে তাঁর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) অনুসরণ করতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿قُلۡ يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ إِنِّي رَسُولُ ٱللَّهِ إِلَيۡكُمۡ جَمِيعًا﴾ [الاعراف: ١٥٨]

“আপনি বলুন হে মানবসকল! আমি তোমাদের সকলের প্রতি আল্লাহর রাসূল হিসেবে প্রেরিত হয়েছি।” [সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ১৫৮]

চতুর্থত: তাঁর রিসালাতের ওপর ঈমান আনা, তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ ও শেষ নবী। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَلَٰكِن رَّسُولَ ٱللَّهِ وَخَاتَمَ ٱلنَّبِيِّ‍ۧنَۗ ﴾ [الاحزاب: ٤٠]

“তিনি আল্লাহর রাসূল ও শেষ নবী।” [সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৪১]

এবং তিনি আল্লাহর খালীল ও আদম সন্তানের সর্দার বা নেতা। তিনি মহান শাফা‘আতের মালিক এবং জান্নাতে সুউচ্চ ওসীলা নামক স্থান তাঁরই জন্য। তিনি কাউসারের মালিক। তাঁর উম্মাত সর্বশ্রেষ্ঠ বা উত্তম। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿كُنتُمۡ خَيۡرَ أُمَّةٍ أُخۡرِجَتۡ لِلنَّاسِ﴾ [ال عمران: ١١٠]

“তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত যা মানুষের (কল্যাণের) জন্য সৃজিত হয়েছে।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ২০]

অধিকাংশ জান্নাতবাসী হবে তাঁরই উম্মত এবং তাঁর রিসালাত পূর্ববর্তী সকল রিসালাতের রহিতকারী।

পঞ্চমতঃ আল্লাহ তাঁকে মহান মু‘জিযা ও সুস্পষ্ট নিদর্শন দ্বারা সহযোগিতা করেছেন। তা হলো মহাগ্রন্থ আল-কুরআন; আল্লাহর বাণী, যা পরিবর্তন ও পরিবর্ধন হতে সংরক্ষিত।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿قُل لَّئِنِ ٱجۡتَمَعَتِ ٱلۡإِنسُ وَٱلۡجِنُّ عَلَىٰٓ أَن يَأۡتُواْ بِمِثۡلِ هَٰذَا ٱلۡقُرۡءَانِ لَا يَأۡتُونَ بِمِثۡلِهِۦ وَلَوۡ كَانَ بَعۡضُهُمۡ لِبَعۡضٖ ظَهِيرٗا ٨٨﴾ [الاسراء: ٨٨]

“বলুন, যদি মানব ও জিন্ন এই কুরআনের অনুরূপ রচনা করে আনয়নের জন্য একত্রিত হয় এবং তারা পরস্পরের সাহায্যকারী হয়,তবুও তারা এর অনুরূপ রচনা করে আনতে পারবে না।” [সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ৮৮]

তিনি আরো বলেন,

﴿إِنَّا نَحۡنُ نَزَّلۡنَا ٱلذِّكۡرَ وَإِنَّا لَهُۥ لَحَٰفِظُونَ ٩ ﴾ [الحجر: ٩]

“আমরা স্বয়ং এ উপদেশ গ্রন্থ অবতরণ করেছি এবং আমরা নিজেই এর সংরক্ষক।” [সূরা আল-হিজর, আয়াত: ৯]

ষষ্টত: নিশ্চয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রিসালাত প্রচার করেছেন, আমানত আদায় করেছেন, উম্মাতদেরকে উপদেশ দিয়েছেন। সকল প্রকার কল্যাণের সন্ধান দিয়েছেন ও তার প্রতি উৎসাহিত করেছেন। সকল প্রকার অকল্যাণ হতে তাঁর উম্মাতকে নিষেধ করেছেন ও তা থেকে তাদেরকে সাবধান করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿لَقَدۡ جَآءَكُمۡ رَسُولٞ مِّنۡ أَنفُسِكُمۡ عَزِيزٌ عَلَيۡهِ مَا عَنِتُّمۡ حَرِيصٌ عَلَيۡكُم بِٱلۡمُؤۡمِنِينَ رَءُوفٞ رَّحِيمٞ ١٢٨ ﴾ [التوبة: ١٢٨]

“তোমাদের কাছে এসেছে তোমাদের মধ্য থেকেই একজন রাসূল। তোমাদের দুঃখ-কষ্ট তাঁর পক্ষে-দুঃসহ। তিনি তোমাদের মঙ্গলকামী, মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল, দয়াময়। [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ১২৮]

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«ما من نبي بعثه الله في أمة قبلي إلا كان حقاً عليه أن يدل أمته على خير ما يعلمه لهم ويحذر أمته من شرما يعلمه لهم».

“আমার উম্মাতের পূর্বে আল্লাহ যত নবী প্রেরণ করেছেন, তাদের ওপর দায়িত্ব ছিল নিজ উম্মাতের জন্য যা কল্যাণকর তাদেরকে তার সন্ধান দেওয়া। আর যা কল্যাণকর নয় তা থেকে তাদেরকে সতর্ক করা।” (সহীহ মুসলিম)

সপ্তমত: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ভালোবাসা ও তাঁর ভালোবাসাকে নিজের জানের ও সকল সৃষ্টিজীবের ভালোবাসার ওপর প্রাধান্য দেওয়া। তাঁকে সম্মান করা, মর্যাদা দেওয়া, ইহতেরাম করা ও তাঁর আনুগত্য করা। নিশ্চয় এটা সে হক্ব বা অধিকার যা আল্লাহ তাঁর কিতাবে তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য সাবস্ত করেছেন। কারণ তাঁর ভালোবাসা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর ভালোবাসা এবং তাঁর আনুগত্য প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর আনুগত্য। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿قُلۡ إِن كُنتُمۡ تُحِبُّونَ ٱللَّهَ فَٱتَّبِعُونِي يُحۡبِبۡكُمُ ٱللَّهُ وَيَغۡفِرۡ لَكُمۡ ذُنُوبَكُمۡۚ وَٱللَّهُ غَفُورٞ رَّحِيمٞ ٣١﴾ [ال عمران: ٣١]

“বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাস, তাহলে আমাকে অনুসরণ কর, যাতে আল্লাহও তোমাদিগকে ভালোবাসেন এবং তোমাদিগকে তোমাদের পাপ মার্জনা করে দেন। আর আল্লাহ হলেন ক্ষমাকারী দয়ালু।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৩১]

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«لا يؤمن أحدكم حتى أكون أحب إليه من ولده ووالده والناس أجمعين».

“তোমাদের কেহই ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারে না যতক্ষণ পর্যন্ত আমি তার নিকট তার ছেলে সন্তান, পিতামাতা ও সকল মানুষের চেয়ে প্রিয়তম না হবো।” (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)

অষ্টমত: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর দুরুদ ও সালাম বেশি বেশি পাঠ করা। কারণ কৃপণ ঐ ব্যক্তি যার নিকট নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নাম উল্লেখ হওয়ার পরও তাঁর ওপর দুরূদ পাঠ করে না।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿إِنَّ ٱللَّهَ وَمَلَٰٓئِكَتَهُۥ يُصَلُّونَ عَلَى ٱلنَّبِيِّۚ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ صَلُّواْ عَلَيۡهِ وَسَلِّمُواْ تَسۡلِيمًا ٥٦﴾ [الاحزاب: ٥٦]

“আল্লাহ ও তাঁর ফিরিশতাগণ নবীর ওপর দুরুদ পাঠ করেন। হে মুমিনগণ! তোমরা নবীর ওপর দুরুদ ও সালাম পাঠ কর।” [সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৫৬]

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«من صلى عليّ واحدة صلى الله عليه بها عشراً».

“যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দুরূদ পাঠ করবে আল্লাহ তার ওপর এর বিনিময়ে দশবার দুরুদ পাঠ করবেন।” (সহীহ মুসলিম)

নিম্নের স্থানগুলোতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর দুরুদ পাঠ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সালাতের তাশাহুদে, বিতির সালাতের কুনুতের দো‘আয়, জানাযার সালাতে, জুমু‘আর খুৎবাতে। আযানের পর, মসজিদে প্রবেশ ও মসজিদ থেকে বের হওয়ার সময়। দো‘আর সময় এবং যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নাম উল্লেখ করা হয়, আরো অন্যান্য স্থানে।

নবমত: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সকল নবী তাদের প্রভূর নিকট জীবিত। শহীদদের কবরের জীবন থেকে তাদের কবরের জীবন আরো বেশি পরিপূর্ণ ও উচ্চ। তবে তাদের কবরের জীবন, পৃথিবীর জীবনের মত নয়। তা এমন জীবন যার বিবরণ সম্পর্কে আমরা জানি না, সে জীবন তাদের থেকে মৃত্যুর নামও দূর করে না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«إن الله حرم على الأرض أن تأكل أجساد الأنبياء».

“আল্লাহ জমিনের জন্য নবীদের লাশ ভক্ষণকে হারাম করে দিয়েছেন।” (আবু দাউদ ও নাসাঈ)

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন,

«ما من مسلم يسلم عليّ إلا رد الله عليّ روحي كي أرد عليه السلام».

“যখনই কোনো মুসলিম আমাকে সালাম দেয় তখনই আল্লাহ আমার রুহ্ বা আত্মা আমার নিকট ফিরিয়ে দেন তার সালামের উত্তর দেওয়ার জন্য।” (আবূ দাউদ)

দশমত: তাঁর জীবদ্দশায় তাঁর সামনে উচু আওয়াজ না করা, অনুরূপ তাঁর কবরে তাঁর ওপর সালাম দেওয়ার সময় উচু আওয়াজ না করা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ইহতেরামের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَا تَرۡفَعُوٓاْ أَصۡوَٰتَكُمۡ فَوۡقَ صَوۡتِ ٱلنَّبِيِّ وَلَا تَجۡهَرُواْ لَهُۥ بِٱلۡقَوۡلِ كَجَهۡرِ بَعۡضِكُمۡ لِبَعۡضٍ أَن تَحۡبَطَ أَعۡمَٰلُكُمۡ وَأَنتُمۡ لَا تَشۡعُرُونَ ٢﴾ [الحجرات: ٢]

“হে মুমিনগণ! তোমরা নবীর কন্ঠস্বরের ওপর তোমাদের কন্ঠস্বর-উঁচু করো না এবং তোমরা একে অপরের সাথে যেরূপ উঁচুস্বরে কথা বল, তাঁর সাথে সেরূপ উঁচু স্বরে কথা বলো না। এতে তোমাদের কর্ম নিষ্ফল হয়ে যাবে এবং তোমরা টেরও পাবে না।” [সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ২]

দাফনের পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সম্মান করা তাঁর জীবিত অবস্থায় সম্মান করার ন্যায়। সুতরাং তাঁকে আমরা সেভাবে সম্মান করবো যেভাবে সাহাবায়ে কেরাম তাঁকে সম্মান করতেন। কারণ, তারা সকল মানুষের চেয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অধিক অনুসরণকারী ছিলেন। তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরোধিতা করা থেকে এবং দীনের অন্তর্ভুক্ত নয় এমন কিছু দীনের মাঝে সংযোজন করা থেকে অধিক দূরে থাকতেন।

একাদশতম: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীদেরকে, পরিবার-পরিজনকে ও স্ত্রীদেরকে ভালোবাসা ও তাদের সকলের সাথে বন্ধুত্ব রাখা। তাদের মর্যাদাহানী হতে বা তাদেরকে গালী দেওয়া থেকে ও তাদের চরিত্রে কোনো প্রকার আঘাত হানা থেকে সাবধান থাকা। কারণ, আল্লাহ তাদের প্রতি রাজি হয়েছেন ও তাদেরকে তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সহচর হিসেবে নির্বাচন করে নিয়েছেন। এই উম্মাতের ওপর তাদের সাথে বন্ধুত্ব রাখা ওয়াজিব করে দিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَٱلسَّٰبِقُونَ ٱلۡأَوَّلُونَ مِنَ ٱلۡمُهَٰجِرِينَ وَٱلۡأَنصَارِ وَٱلَّذِينَ ٱتَّبَعُوهُم بِإِحۡسَٰنٖ رَّضِيَ ٱللَّهُ عَنۡهُمۡ وَرَضُواْ عَنۡهُ وَأَعَدَّ لَهُمۡ جَنَّٰتٖ تَجۡرِي تَحۡتَهَا ٱلۡأَنۡهَٰرُ خَٰلِدِينَ فِيهَآ أَبَدٗاۚ ذَٰلِكَ ٱلۡفَوۡزُ ٱلۡعَظِيمُ ١٠٠﴾ [التوبة: ١٠٠]

“আর যারা সর্বপ্রথম হিজরতকারী ও আনসারদের মাঝে পুরাতন এবং যারা তাদের অনুসরণ করেছে, আল্লাহ সে সমস্ত লোকদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে।” [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ১০০]

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«لا تسبوا أصحابي فوالذي نفسي بيده لو أنفق أحدكم مثل أحد ذهبا ما بلغ مد أحدهم ولا نصيفه». “তোমরা আমার সাহাবাদেরকে গালী দিও না, সেই সত্তার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ, তোমাদের কেউ যদি উহুদ পর্বতের সমপরিমাণ (আল্লাহর পথে) ব্যয়

করে, তবুও

তাদের এ বিশাল ব্যয় সাহাবাদের আল্লাহর রাস্তায় এক মুদ (প্রায় ৭০০ গ্রাম) বা অর্ধ মুদ ব্যয় করার সমান হবে না।” (সহীহ বুখারী)

সুতরাং পরবর্তী লোকদের উচিৎ সাহাবীদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং নিজেদের মনে তাদের ব্যাপারে যাতে কোনো প্রকার কুটিলতা না থাকে এ জন্য আল্লাহর কাছে দো‘আ করা।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَٱلَّذِينَ جَآءُو مِنۢ بَعۡدِهِمۡ يَقُولُونَ رَبَّنَا ٱغۡفِرۡ لَنَا وَلِإِخۡوَٰنِنَا ٱلَّذِينَ سَبَقُونَا بِٱلۡإِيمَٰنِ وَلَا تَجۡعَلۡ فِي قُلُوبِنَا غِلّٗا لِّلَّذِينَ ءَامَنُواْ رَبَّنَآ إِنَّكَ رَءُوفٞ رَّحِيمٌ ١٠﴾ [الحشر: ١٠]

“যারা তাদের পরে আগমন করেছে তারা বলেঃ হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদেরকে এবং ঈমানে অগ্রণী আমাদের ভাইদেরকে ক্ষমা কর এবং ঈমানদারদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে কোনো বিদ্বেষ রেখো না। হে আমাদের রব, আপনি দয়ালু পরম করুণাময়।” [সূরা আল-হাশর, আয়াত: ১০]

দ্বাদশতম: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যাপারে অতিরঞ্জিত করা থেকে বিরত থাকা। কারণ, অতিরঞ্জিত করা তাঁকে বড় কষ্ট দেওয়ার অন্তর্ভুক্ত। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উম্মাতকে তাঁর ব্যাপারে অতিরঞ্জিত করা থেকে ও তাঁর প্রশংসা করার সময় সীমালংঘন করা থেকে সতর্ক করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে যে মর্যাদা দিয়েছেন, তাঁকে তার চেয়ে মর্যাদা দেওয়া থেকে সতর্ক করেছেন। কারণ, তা একমাত্র আল্লাহর জন্য খাস।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«إنما أنا عبد فقولوا عبد الله ورسوله، لا أحب أن تر فعوني فوق منزلتي»

“আমি একজন বান্দা বা দাস। সুতরাং তোমরা আমাকে আল্লাহর বান্দা ও আল্লাহর রাসূল বল। তোমরা আমাকে আমার মর্যাদার চেয়ে উঁচু কর না এটা আমি ভালোবাসি না”।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন,

«لا تطروني كما أطرت النصارى ابن مريم».

“তোমরা আমার ব্যাপারে অতিরঞ্জিত কর না যেমন খৃষ্টানরা ঈসা ইবন মারইয়াম-এর ব্যাপারে অতিরঞ্জিত করেছিল।” (সহীহ বুখারী)

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আহ্বান করা ও তাঁর কাছে ফরিয়াদ করা। তাঁর কবরের পাশ দিয়ে ত্বাওয়াফ করা, তাঁর নামে মান্নত মানা, পশু যবেহ করা বৈধ নয়।

এ সকল কাজ আল্লাহর সাথে শরীক করার নামান্তর, অথচ আল্লাহ অন্যের ইবাদত করা থেকে নিষেধ করেছেন।

অনুরূপভাবে তাঁকে ইহতেরাম না করায় তাঁর প্রতি অনীহা প্রকাশ পায়। তাঁর মানহানি করা, তাঁকে তুচ্ছ জানা, তাঁর ব্যাপারে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা, ইসলাম থেকে মুর্তাদ বা বের হয়ে যাওয়া ও আল্লাহর সাথে কুফুরী করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿قُلۡ أَبِٱللَّهِ وَءَايَٰتِهِۦ وَرَسُولِهِۦ كُنتُمۡ تَسۡتَهۡزِءُونَ ٦٥ لَا تَعۡتَذِرُواْ قَدۡ كَفَرۡتُم بَعۡدَ إِيمَٰنِكُمۡۚ﴾ [التوبة: ٦٥، ٦٦]

“আপনি বলুন, তোমরা কি আল্লাহর সাথে তাঁর হুকুম-আহ্কামের সাথে এবং তাঁর রাসূলের সাথে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করেছিলে? ওযর পেশ করো না, তোমরা তো কাফির হয়ে গেছ ঈমান প্রকাশ করার পর।” [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ৬৫-৬৬]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সত্যিকার ভালোবাসা, তাঁর নীতির ও সুন্নাতের অনুসরণ-অনুকরণ, তাঁর পথের বিরোধিতা না করার প্রেরণা যোগায়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿قُلۡ إِن كُنتُمۡ تُحِبُّونَ ٱللَّهَ فَٱتَّبِعُونِي يُحۡبِبۡكُمُ ٱللَّهُ وَيَغۡفِرۡ لَكُمۡ ذُنُوبَكُمۡۚ وَٱللَّهُ غَفُورٞ رَّحِيمٞ ٣١﴾ [ال عمران: ٣١]

“বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাস, তাহলে আমাকে অনুসরণ কর; যাতে আল্লাহও তোমাদিগকে ভালোবাসেন এবং তোমাদিগকে তোমাদের পাপ মার্জনা করে দেন। আর আল্লাহ হলেন ক্ষমাকারী দয়ালু।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৩১]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্মানের ব্যাপারে কম-বেশি করে সীমালঙ্ঘন না করা ওয়াজিব। তাই তাঁকে ইলাহ বা মা‘বুদের গুণে গুণাম্বিত করা যাবে না। তাঁর মর্যাদা সম্মান ও ভালোবাসার অধিকার কমানোও যাবে না, যার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো তার শরী‘আতের অনুসরণ করা, তার নীতির ওপর চলা ও তাঁর অনুকরণ করা।

ত্রয়োদশতম: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর ঈমান আনা পূর্ণাঙ্গ হবে তাঁকে সত্যায়ন করা এবং তিনি যে শরী‘আত নিয়ে এসেছেন তার ওপর আমল করার মাধ্যমে, এটাই তাঁর আনুগত্য করার অর্থ।

বস্তুতঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য আল্লাহরই আনুগত্য, আর তাঁর নাফরমানী বস্তুত আল্লাহরই নাফরমানী। আর তাঁকে পূর্ণভাবে বিশ্বাস ও অনুসরণের মাধ্যমেই তাঁর প্রতি পরিপূর্ণভাবে ঈমান আনা হয়ে থাকে।

এই বইটির সকল আর্টিকেল পড়তে নিচের লিংক গুলো ক্লিক করুন

প্রথম রুকন: মহান আল্লাহর ওপর ঈমান

দ্বিতীয় রুকন: ফিরিশতাদের ওপর ঈমান

তৃতীয় রুকন: আসমানী গ্রন্থসমূহের ওপর ঈমান

চতুর্থ রুকন: রাসূলদের ওপর ঈমান

পঞ্চম রুকন: শেষ দিবসের ওপর ঈমান

ষষ্ঠ রুকন: তাকদীরের ওপর ঈমান