কুরআন ও সুন্নাহের ওপর আরোপিত বিভিন্ন প্রশ্নের জাওয়াব

অনুবাদক: জাকেরুল্লাহ আবুল খায়ের।। সম্পাদক: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

আল্লাহর বাণী: ﴿ وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِينَ حَتَّىٰ نَبۡعَثَ رَسُولٗا ١٥﴾ [الاسراء: ١٥] “আর রাসূল প্রেরণ না করা পর্যন্ত আমি আযাবদাতা নই।” [সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ১৫] আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামর বাণী: “আমার পিতা ও তোমার পিতা জাহান্নামে”

প্রশ্ন: আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে কারীমে বলেন ﴿وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِينَ حَتَّىٰ نَبۡعَثَ رَسُولٗا ١٥﴾ [الاسراء: ١٥] “আর রাসূল প্রেরণ না করা পর্যন্ত আমি আযাবদাতা নই।” [সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ১৫]  বিভিন্ন হাদীসে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সংবাদ দেনে যে, তার মাতা-পিতা জাহান্নামী। প্রশ্ন হলো, তারা কি ফিতরাতের যুগের ছিল না? যারা ফিতরাতের যুগে ছিল তাদের বিষয়ে কুরআন স্পষ্ট করেছেন যে, তারা নাজাত প্রাপ্ত। বিষয়টি স্পষ্ট করুন।

 উত্তর: ফিতরাতের যুগের মানুষ নাজাত প্রাপ্ত নাকি ধ্বংসপ্রাপ্ত এ বিষয়টি কুরআন স্পষ্ট করেননি। আল্লাহ তা‘আলা শুধু এ কথা বলেছেন, ﴿ وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِينَ حَتَّىٰ نَبۡعَثَ رَسُولٗا ١٥ ﴾ [الاسراء: ١٥] “আর রাসূল প্রেরণ না করা পর্যন্ত আমি আযাবদাতা নই।” [সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ১৫]

আল্লাহ তা‘আলার স্বীয় ইনসাফের কারণে শুধু রাসূল প্রেরণের পরই কাউকে শাস্তি দেবেন। ফলে যাদের নিকট দাও‘আত পৌঁছে নাই তাদের ওপর দলীল প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া তিনি তাদের শাস্তি দেবেন না। আর দলীল প্রতিষ্ঠা কখনো কিয়ামতের দিন হবে। যেমন হাদীসে বর্ণিত আছে ফিতরাতের যুগের লোকদের কিয়ামদের দিন ঈমানের দাও‘আত দেয়ার মাধ্যমে পরীক্ষা করা হবে। যারা সেদিনের পরীক্ষার উত্তীর্ণ হবে ঈমান গ্রহণ করবে এবং দাওয়া সাড়া দেবে তারা নাজাত পাবে আর যারা সেদিন দাও‘আত গ্রহণ করবে না এবং নাফরমানী করবে তারা জাহান্নামে যাবে। আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে হাদীস বর্ণিত, তিনি বলেন এক লোক বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমারা পিতা কোথায়? উত্তরে তিনি বলেন,« فِى النَّارِ »  তোমার পিতা জাহান্নামী। এ কথা শোনে লোকটির চেহারার মলিনতা দেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ডেকে বললেন, « إِنَّ أَبِى وَأَبَاكَ فِى النَّارِ » “আমার এবং তোমার পিতা জাহান্নামী।”[1] এ কথাটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সান্ত্বনা দেয়ার জন্য বলেছিলেন। তাকে এ কথা জানিয়ে দিলেন যে, তোমার পিতা একাই জাহান্নামী নয় এবং বিষয়টি তোমার পিতার জন্য খাস নয়। বরং আমার পিতারও একই হুকুম। হতে পারে এদের দুই জন অর্থাৎ লোকটির পিতা ও রাসূলের পিতা উভয়ের নিকট আল্লাহর পক্ষ থেকে দলীল পৌঁছেছে। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,  « إِنَّ أَبِى وَأَبَاكَ فِى النَّارِ »  “আমার এবং তোমার পিতা জাহান্নামী।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জেনেই কথাটি বলেছেন। কারণ, তিনি তার নিজের পক্ষ থেকে কখনো কথা বলেন না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿وَٱلنَّجۡمِ إِذَا هَوَىٰ ١ مَا ضَلَّ صَاحِبُكُمۡ وَمَا غَوَىٰ ٢ وَمَا يَنطِقُ عَنِ ٱلۡهَوَىٰٓ ٣ إِنۡ هُوَ إِلَّا وَحۡيٞ يُوحَىٰ ٤﴾ [النجم : ١،  ٤] “কসম নক্ষত্রের, যখন তা অস্ত যায়। তাতো কেবল ওহী, যা তার প্রতি ওহীরূপে প্রেরণ করা হয়। আর সে মনগড়া কথা বলে না। তোমাদের সঙ্গী পথভ্রষ্ট হয়নি এবং বিপথগামীও হয়নি।” [সূরা আন-নাজম, আয়াত: ১, ৪]

     রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্বীয় পিতা সম্পর্কে যা বলেছেন, তাতে প্রমাণিত হয় যে রাসূলের পিতা আব্দুল্লাহ ইবন আব্দুল মুত্তালিবের নিকট দলীল পৌঁছেছে। আর তারা ছিল ঐ সব কুরাইশদের দলভুক্ত যারা ইবরাহীম আলাইহিস সালামের দীন সম্পর্কে অবগত। কারণ, লুহাই ইবন আমর আল-খাযা‘ঈর মূর্তি পূজা আবিষ্কার করার পূর্ব পর্যন্ত কুরাইশরা মিল্লাতে ইবরাহীমির ওপর ছিল। কিন্তু যখন সে মক্কার গভর্নর হল এবং তখন তার আবিষ্কৃত নতুন বিষয়টি অর্থাৎ মূর্তি পূজা মক্কায় ছড়িয়ে পড়ল। এবং সে আল্লাহকে বাদ দিয়ে মূর্তিগুলো ইবাদতের দাওয়াত দেওয়ার কাজটি মক্কার মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল। তখন রাসূলের পিতা আব্দুল্লাহর নিকট এ কথা পৌঁছেছিল যে, কুরাইশদের মূর্তি পূজা করা এবং তাদের মধ্যে মূর্তিপূজার যে প্রচলন আরম্ভ হয়েছে তা সম্পূর্ণ বাতিল। তা সত্ত্বেও তিনি তাদের বাতিল ইলাহদের অনুসরণ করেন। ফলে তার ওপর হুজ্জত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, «رَأَيْتُ عَمْرَو بْنَ عَامِرٍ الْخُزَاعِىَّ يَجُرُّ قُصْبَهُ فِى النَّارِ وَكَانَ أَوَّلَ مَنْ سَيَّبَ السُّيُوبَ ». “আমি আমর ইবন লুহাইকে দেখেছি জাহান্নামের আগুনের মধ্যে তার নাড়ি-বুড়িকে টেনে হেঁচড়ে বের করা হচ্ছে। কারণ, সেই মক্কায় সর্ব প্রথম শির্কের প্রচলনের কারণ হয় এবং ইবরাহীম আলাইহিস সালামের মিল্লাতের পরিবর্তন করে। অপর একটি হাদীসে এ বিষয়ে বর্ণিত আছে— .استأذن أن يستغفر لأمه فلم يؤذن، فاستأذن أن يزورها فأذن له “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার মায়ের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার অনুমতি চাইলে, তাকে অনুমতি দেওয়া হয়নি। তারপর তিনি যিয়ারত করার অনুমতি চাইলে আল্লাহ তাকে যিয়ারতের অনুমতি দেওয়া হয়।”[2]

এ কথা বলারও অবকাশ রয়েছে যে, দুনিয়াতে জাহিলিয়্যাতের যুগের মানুষের সাথে কাফেরদের মতোই আচরণ করা হবে। ফলে তাদের জন্য দো‘য়া করা হবে না, ক্ষমা চাওয়া হবে না। কারণ, তারা কাফেরদের মতোই কাজ-কর্ম করে থাকে। ফলে তাদের সাথে সেই আচরণ করা হবে যে আচরণ কাফেরদের সাথে করা হয়। আর আখিরাতে তাদের বিষয়টি আল্লাহর হাতে সোপর্দ।

আর দুনিয়াতে যার ক্ষেত্রে দলীল প্রতিষ্ঠিত হয় নাই তাকে কিয়ামতের দিন ঈমান পেশ করে পরীক্ষা করা ছাড়া শাস্তি দেওয়া হবে না। কারণ, আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِينَ حَتَّىٰ نَبۡعَثَ رَسُولٗا ١٥﴾ [الاسراء: ١٥] “আর রাসূল প্রেরণ না করা পর্যন্ত আমি আযাবদাতা নই।” [সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ১৫] সুতরাং যারা ফিতরাতের যুগে বসবাস করছিল এবং তাদের নিকট তাওহীদের দা‘ওয়াত পৌঁছেনি, কিয়ামতের দিন তাওহীদের প্রতি দা‘ওয়াত দেওয়ার মাধ্যমে তাদের পরীক্ষা করা হবে। যদি তারা দা‘ওয়াত গ্রহণ করে তারা জান্নাতে যাবে আর যদি গ্রহণ না করে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।

অনুরূপভাবে অনুভূতিহীন বুড়ো, পাগল এবং তাদের মতো আরও যারা রয়েছে যেমন কাফেরদের বাচ্চা যারা প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার পূর্বে মারা গেছে— যাদের কাছে তাওহীদের দা‘ওয়াত পৌঁছেনি। কারণ, হাদীসে বর্ণিত— سُئِلَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ ذَرَارِيِّ الْمُشْرِكِينَ فَقَالَ اللَّهُ أَعْلَمُ بِمَا كَانُوا عَامِلِينَ “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যখন কাফেরদের বাচ্চাদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়, তখন তিনি উত্তরে বলেন, আল্লাহ তা‘আলা তারা কি আমল করত সে সম্পর্কে অধিক অবগত আছেন।”

কাফেরদের বাচ্চাদের কিয়ামতের দিন ফিতরাতের যুগের মানুষদের মতো পরীক্ষা করা হবে। যদি তারা সঠিক উত্তর দেয়, তবে তারা নাজাত পাবে অন্যথা তারা ধ্বংস-শীলদের সাথে হবে।

এক জামা‘আত আহলে ইলম বলেন, কাফেরদের বাচ্চারা নাজাত প্রাপ্ত—জান্নাতী। কারণ, তারা ফিতরাতের ওপর মারা গিয়েছে। এ ছাড়াও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন জান্নাতে প্রবেশ করেন তখন মুসলিম ও অমুসলিম উভয়ের বাচ্চাদের জান্নাতের বাগানে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম সাথে দেখেছেন।

দলীলের স্পষ্টতার কারণে এ মতামতটি অধিক শক্তিশালী। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের মতৈক্যে মুসলিমদের বাচ্চারা অবশ্যই জান্নাতী হবে। আল্লাহ তা‘আলা অধিক জ্ঞাত ও মহা প্রজ্ঞাবান।

শাইখ আব্দুল আযীয বিন বায রহ.

[1] বর্ণনায় ইমাম মুসলিম স্বীয় সহীহতে হাদীস নং ৫২১।

[2] বর্ণনায় সহীহ মুসলিম, হাদীস নং

ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে। তাহলে আপনিও ব্লগের কার্যক্রম কে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার লেখণী পাঠাতে পারেন।আপনার লেখনী পাঠিয়ে আমাদের ফেচবুক পেজের ম্যাসেঞ্জারে গিয়ে দয়াকরে নক করুন।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন