কুরআন ও সুন্নাহের ওপর আরোপিত বিভিন্ন প্রশ্নের জাওয়াব

অনুবাদক: জাকেরুল্লাহ আবুল খায়ের।। সম্পাদক: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

আল্লাহ তা‘আলার বাণী: ﴿قُلۡ إِنَّمَآ أَنَا۠ بَشَرٞ مِّثۡلُكُمۡ﴾  “বল, ‘আমি তোমাদের মতই একজন মানুষ।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, فيه فإن صلاتكم معروضة علي  “কারণ, আমার নিকট তোমাদের দরূদ পেশ করা হয়

প্রশ্ন: জুমু‘আর দিন জুমু‘আর ফযীলত সম্পর্কে রেডিওতে একজন ভাষ্যকারকে একটি হাদীস বলতে শুনেছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,  ” إن من أفضل أيامكم يوم الجمعة فأكثروا علي من الصلاة فيه فإن صلاتكم معروضة علي ” قال فقالوا يارسول الله وكيف تعرض صلاتنا عليك وقد أرمت ؟ قال يقولون بليت قال ” إن الله [ عز و جل ] حرم على الأرض أجساد الأنبياء صلى الله عليهم ” . “তোমরা আমার ওপর অধিক পরিমাণে দরূদ পড়। কারণ, আমার কাছে তোমাদের দরূদ পেশ করা হয়ে থাকে। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! কীভাবে আমাদের দরূদ আপনার কাছে পেশ করা হয়? অথচ আপনার হাড্ডি চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে। উত্তরে তিনি বললেন, নবীদের দেহসমূহকে আল্লাহ তা‘আলা জমিনের জন্য হারাম করে দিয়েছেন।”[1] যে সব আয়াতে এ কথা  ﴿قُلۡ إِنَّمَآ أَنَا۠ بَشَرٞ مِّثۡلُكُمۡ يُوحَىٰٓ إِلَيَّ أَنَّمَآ إِلَٰهُكُمۡ إِلَٰهٞ وَٰحِدٞۖ فَمَن كَانَ يَرۡجُواْ لِقَآءَ رَبِّهِۦ فَلۡيَعۡمَلۡ عَمَلٗا صَٰلِحٗا وَلَا يُشۡرِكۡ بِعِبَادَةِ رَبِّهِۦٓ أَحَدَۢا ١١٠﴾ [الكهف: ١١٠] “বল, ‘আমি তোমাদের মতই একজন মানুষ। আমার নিকট ওহী প্রেরণ করা হয় যে, তোমাদের ইলাহই এক ইলাহ। সুতরাং যে তার রবের সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম করে এবং তার রবের ইবাদাতে কাউকে শরীক না করে।’’ [সূরা আল-কাহাফ, আয়াত: ১১০] এবং এ কথা  ﴿وَإِنَّا لَجَٰعِلُونَ مَا عَلَيۡهَا صَعِيدٗا جُرُزًا ٨﴾ [الكهف: ٨]“আর নিশ্চয় তার উপর যা রয়েছে তাকে আমি উদ্ভিদহীন শুষ্ক মাটিতে পরিণত করব।” [সূরা আল-কাহাফ, আয়াত: ৮] বলা  হয়েছে তার সাথে এ হাদীসটি বিরোধপূর্ণ নয় কি?

মৃত্যুর পর দাফনের পূর্বে হাত-দ্বয় নাকের উপর রাখা অবস্থায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনদিন পড়ে থাকেন। তার চাচা আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু তার নিকট প্রবেশ করে এ অবস্থা দেখে বলেন, ‘তিনিও অন্যান্য মানুষের মতো দুর্গন্ধ হন’। এ হাদীসটি নাইলুল আওতার এবং শরহে মুনতাকাল আখবার কিতাবে বিদ্যমান। ইবন হিব্বান স্বীয় সহীহ্‌তে, হাকিম মুস্তাদরাকে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। হাদীসটি বুখারী ও মুসলিমের শর্তানুযায়ী বিশুদ্ধ। তবে তারা তাদের স্বীয় কিতাব-দ্বয়ে হাদীসটি উল্লেখ করেননি। ইবনু আবী হাতিম আল-‘ইলাল কিতাবে হাদীসটি বর্ণনা করেন এবং তিনি তার পিতা থেকে হাদীসটি সম্পর্কে বর্ণনা করে বলেন হাদীসটি মুনকার। কারণ, আব্দুর রহমান ইবন ইয়াযীদ ইব জাবের হাদীসের সনদে বর্ণনাকারী। আর তিনি হলেন একজন মুনকারুল হাদীস। ইবনুল আরবী রহ. বলেন, হাদীসটি প্রমাণিত নয়। আল্লাহর নিকট আমার কামনা তিনি যেন আমাকে এবং তোমাদেরকে এমন কর্ম করার তাওফীক দেন যা তিনি পছন্দ করেন এবং যার প্রতি তিনি সন্তুষ্ট হন।

উত্তর: আহলে ইলমগণের নিকট উল্লিখিত হাদীসটি প্রসিদ্ধ। হাদীসটির মধ্যে কোন দুর্বলতা বা অসুবিধার কিছু নেই। আল্লাহ তা‘আলা জন্য ক্ষমতা রয়েছে যে, তিনি তার বান্দাদের থেকে যাকে চান যেভাবে চান বিশেষ গুনে গুণান্বিত করে থাকেন। জমিনের জন্য নবীদের দেহসমূহকে হারাম করার মাধ্যমে খাস করা কোন আশ্চর্য নয়। কারণ, আল্লাহর নিকট তাদের রয়েছে বিশেষ মর্যাদা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর দরূদ পড়া শরী‘আত অনুমোদিত। যদি আমরা ধরে নেই যে, জমিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শরীর খেয়ে ফেললেও তা হাদীসের বাণী অনুযায়ী তার ওপর জুমু‘আর দিন অধিক পরিমাণে দরূদ পাঠের পরিপন্থী নয়। কারণ, জীবিত থাকা এবং মৃত্যু বরণ করা সর্বাবস্থায় তার ওপর দরূদ পড়ার বিধান রয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿إِنَّ ٱللَّهَ وَمَلَٰٓئِكَتَهُۥ يُصَلُّونَ عَلَى ٱلنَّبِيِّۚ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ صَلُّواْ عَلَيۡهِ وَسَلِّمُواْ تَسۡلِيمًا ٥٦﴾ [الاحزاب : ٥٦]  “নিশ্চয় আল্লাহ (ঊর্ধ্ব জগতে ফেরেশতাদের মধ্যে) নবীর প্রশংসা করেন এবং তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর জন্য দো‘আ করে[2]। হে মুমিনগণ, তোমরাও নবীর উপর দরূদ পাঠ কর এবং তাকে যথাযথভাবে সালাম জানাও।[সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৫৬] হে আল্লাহ আপনি তার ওপর কিয়ামতের দিন পর্যন্ত সর্বদা দরূদ ও সালাম প্রেরণ করুন। ইমাম মুসলিম সহীহ মুসলিমে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন  « مَنْ صَلَّى عَلَىَّ وَاحِدَةً صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ عَشْرًا ».“যে ব্যক্তি একবার আমার ওপর দুরূদ পড়ে আল্লাহ তা‘আলা তার ওপর দশবার দরূদ পড়ে।” সুতরাং, জীবিত থাকা, মৃত্যু বরণ করা এবং আলমে বরযখে থাকা সহ সর্বাবস্থায় তার ওপর দরূদ পড়া যাবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দেহ অক্ষত থাকার কথাটি এ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। আহলে ইলমগণের নিকট হাদীসটি বিশুদ্ধ। আর আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুর উক্তিটির বিশুদ্ধতা আজ পর্যন্ত জানতে পারিনি এবং তার সনদটি অনুসন্ধান করেও দেখিনি। যদি কথাটি আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বিশুদ্ধ সনদে প্রমাণিত হয়ও তাতেও কোন অসুবিধা নেই। যে কোন শরীরের জন্য যা হওয়ার তা হতেই পারে। তারপরও তা নিরাপদ ও অক্ষত থাকাতে কোন অসুবিধা নেই। জমিনের ওপর তা ভক্ষণ করা হারাম এবং নবীদের দেহ দুগর্ন্ধ হওয়া বা পচে যাওয়া থেকে নিরাপদ থাকাও অসম্ভব কিছু নয়। আল্লাহ তা‘আলা সবকিছুর ওপর ক্ষমতাশীল। নবীদের দেহ যখন কবরে রাখা হবে, তার দুর্গন্ধ ও পরিবর্তন দূর করে দেহকে নিরাপদ ও তাজা করে রাখা আল্লাহ তা‘আলার জন্য খুবই সহজ। শরী‘আত ও জ্ঞান কোন কিছুই এর পরিপন্থী নয়।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দেহ কবরে অক্ষত থাকুক বা নাই থাকুক তার জন্য সালাত ও সালাম পেশ করা শরী‘আত সম্মত। হাদীস যদি বিশুদ্ধ না হয়ে থাকে তবে তার দেহ কবরে অক্ষত না থাকা তার ওপর সালাত ও সালাম পেশ করাতে কোন অসুবিধা নেই। কারণ, ঊর্ধ্ব জগতে তার রূহ অবশ্যই রয়েছে। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের আকীদা অনুযায়ী নবীদের মত সমস্ত মানুষের রূহসমূহও অবশিষ্ট থাকে।

মু’মিনদের রূহ জান্নাতে আর কাফেরদের রূহ থাকে জাহান্নামে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রূহ ঊর্ধ্ব জগতে। বিশুদ্ধ হাদীসে বর্ণিত, মু’মিনদের রূহ জান্নাতের গাছে জুলন্ত পাখির পেটে। শহীদদের রূহ জান্নাতের বিভিন্ন স্থানে বিচরণ করতে থাকে। তারপর আরশের নিচে জুলন্ত প্রদীপের কাছে ফিরে আসে। বিশুদ্ধ হাদীসে বর্ণিত, শহীদের রূহ হলুদ পাখির পেটে।

রূহ অবশিষ্ট রয়েছে, ফলে সালাত ও সালাম প্রেরণ করা সম্ভব যদিও দেহ নষ্ট হয়ে যায়। তবে হাদীসটি— ” إن الله [ عز و جل ] حرم على الأرض أجساد الأنبياء صلى الله عليهم “আল্লাহ তা‘আলা জমিনের জন্য নবীদের দেহকে হারাম করে দিয়েছেন।” কোন অসুবিধার কারণ নয়। যতক্ষণ পর্যন্ত বিশুদ্ধ দলীল এর পরিপন্থী বলে জানা না যাবে ততক্ষণ পর্যন্ত এ হাদীসটি গ্রহণ করা ও তার ওপর অটুট থাকাই হলো মূলনীতি।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী: ” إن الله [ عز و جل ] حرم على الأرض أجساد الأنبياء صلى الله عليهم “আল্লাহ তা‘আলা জমিনের ওপর নবীদের দেহকে হারাম করে দিয়েছেন।” যাকে তিনি আমাদের সংবাদ দিয়েছেন, নবীদের দেহ অক্ষত থাকে। আর এ কথা তিনি অবশ্যই নিজের পক্ষ থেকে বলেননি। তার এ কথা অবশ্যই আল্লাহর পক্ষ থেকে তার প্রতি অহী। যখনই কোন হাদীস ক্রুটি মুক্ত হবে, তখন তা আহলে ইলমদের নিকট বিশুদ্ধ ও গ্রহণ যোগ্য হওয়াতে কোন অসুবিধা নেই। আর আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুর উক্তি যদি বিশুদ্ধ প্রমাণিত হয়, তাতেও নবীদের দেহ কবরে অক্ষত ও তাজা থাকা তার উক্তির পরিপন্থী নয়। আল্লাহ তা‘আলাই তাওফীক দাতা।

শাইখ আব্দুল আযীয বিন বায রহ.

[1] বর্ণনায় তিরমিযী ছাড়া অপর পাঁচটি সুনান গ্রন্থ।

[2] ইমাম বুখারী আবুল ‘আলিয়া থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওপর আল্লাহর সালাত’ বলতে বুঝানো হয়েছে ফিরিশতাদের কাছে নবীর প্রশংসা এবং ফিরিশতাদের সালাত হলো দো‘আ। আর ইমাম তিরমিযী সুফিয়ান সওরী থেকে বর্ণনা করেন যে, এখানে আল্লাহর সালাত বলতে রহমত এবং ফিরিশতাদের সালাত বলতে ইস্তেগফার বুঝানো হয়েছে (তাফসীর ইবন কাসীর)।

ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে। তাহলে আপনিও ব্লগের কার্যক্রম কে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার লেখণী পাঠাতে পারেন।আপনার লেখনী পাঠিয়ে আমাদের ফেচবুক পেজের ম্যাসেঞ্জারে গিয়ে দয়াকরে নক করুন।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন