Lauren Booth e1572958540148 জার্নালিস্ট লরেন বুথের নওমুসলিম হবার গল্পবিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।

আমার নাম লরেন বুথ। পেশায় ব্রিটিশ সাংবাদিক। আমি একজন ধর্মান্তরিত মুসলিম। আজ আমি শোনাব, কী করে হিজাব পরিহিত অবস্থায় একজন মুসলিম হিসেবে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি।

২০১০ সালে আমি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করি। তার আগে একটি পত্রিকায় সাংবাদিকতা করতাম। তখন মিডিয়া ছিল ইসলাম সম্পর্কে নানা নেতিবাচক খবরে ভরপুর। আমরা জানতাম, “ইসলাম হলো সন্ত্রাসীদের ধর্ম ইসলামে নারীরা চরমভাবে নির্যাতিত, অবেহেলিত’ ‘মুসলিম পুরুষরা প্রায়ই নারীদের নির্যাতন করে’- ইত্যাদি।

ছোটবেলায় ফিরে যাই। মনে আছে, সাত বছর বয়সে আমি নিয়মিত ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করতাম। রাতে ঘুমানোর আগে দোয়া করতাম। আমার জন্ম একটি খ্রিষ্টান পরিবারে হলেও কখনোই ঈশ্বরকে বাদ দিয়ে যিশু কিংবা মাতা মেরির কাছে কিছু চাইনি। ত্রিত্ববাদ’ তথা তিন খোদার ধারণাটা আমার কিছুতেই বুঝে আসত না। আমি যা চাইতাম, সরাসরি সর্বশক্তিমান এক স্রষ্টার কাছেই চাইতাম।

কিন্তু বড় হতে হতে আমার সেই মনোভাব ধরে রাখতে পারিনি। আজকের এই আধুনিক যুগে স্রষ্টার উপর বিশ্বাস ও ধার্মিকতা ধরে রাখা আসলেই কঠিন। সব দেশের ক্ষেত্রেই কথাটা কমবেশি প্রযোজ্য।

আমলের পরিবেশ ও সমাজ আমাদেরকে আল্লাহ থেকে অনেক দূরে সরিয়ে না মানুষকে ভুলিয়ে দেয়- একজন অদৃশ্য সৃষ্টিকর্তা আছেন, মৃত্যুর পরে তার এই ফিরে যেতে হবে । আর ভুলে যাবেই না কেন? আজকের দিনে আমরা সবাই নিজের সাজসজ্জা, আমাক-পরিচ্ছদ, কেনাকাটা ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত। আমাদের যত চেষ্টা-সাধনা, আনা-কল্পনা-আলোচনা; সব এসব ঘিরেই। এসবের মধ্যে ডুবে গিয়ে স্রষ্টার সাদা স্রাব কি আর পাওয়া সম্ভব? নাকি মন অত গভীরে গিয়ে ভাবে? সে ১৬-১৭ হতে হতে আমি আল্লাহকে ডাকা প্রায় ছেড়ে দেই। সবাই আমার -মর খুব প্রশংসা করত। এই বয়সে রূপের সাথে মেধা থাকলে ভাবিকভাবেই মনে অহংকারবোধ কাজ করে। নিজের সামনে গোটা পৃথিবীকে আল হয় তুচ্ছ। বলতে লজ্জা লাগছে, আমার নিজের অনুভূতিও ছিল ঠিক তেমনই। এক বিকেলে বসে বসে টিভি দেখছিলাম। ২০০০ সালের কোন একসময়ের ঘটনা জাবে খবরের একটি দৃশ্য আমাকে দারুণভাবে নাড়া দিল। একটি বছর চৌদ্দশব্রো বয়সের ছেলে এক টুকরো পাথর হাতে শক্ত হয়ে দাড়িয়ে। তার সামনে ইজরাইলি সৈন্যদের বিশাল এক ট্যাংক। ট্যাংকের নল ঠিক তার বুকের দিকে তাক করা। ছেলেটির চোখেমুখে ভয়ের কোনো চিহ্ন নেই। বরং প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস, সাহস আর তীব্র ক্ষোভ তার সারা শরীর থেকে যেন ঠিকরে বেরুচ্ছিল।। তার নাম ছিল ফারেস উদে। খবরে বলছিল, ছেলেটি ফিলিস্তিনের গাজার এক কল বালক। ফিলিস্তিন নামটা আগে শুনলেও গাজা শব্দটা ছিল আমার কাছে। একেবারেই অপরিচিত। দশ দিন পরে ছেলেটির ছবি আবার আমার টিভির পর্দায় ভেসে উঠল। জীবিত নায়, প্রাণহীন নিস্পন্দ। ইজরাইলি সৈন্যদের গুলিতে তার কচি শরীর এফোঁড়ওফোড় হয়ে গেছে। প্রথমবারের মতো মনে হলো, এই পৃথিবী, এই জীবনকে আমি যেভাবে দেখছি, আমি যেভাবে ভাবছি, আসলে ঠিক তেমন নয়। আমার মনে হচ্ছিল, ফিলিস্তিনিদের উপর অবিচার করা হচ্ছে। ভাবলাম, বিষয়টা আরেকটু গভীরভাবে তলিয়ে দেখা দরকার। ২০০৪ সালে আমি ‘সানডে নিউজ’ পত্রিকাতে কাজ করতাম। পত্রিকাটা কোনোদিক দিয়েই ইসলাম ও মুসলমানদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল না। হঠাৎ করে কী মনে করে জানি না, সে বছরের ডিসেম্বরে আমার সম্পাদকের রুমে গেলাম। বললাম, আমি ফিলিস্তিনের নির্বাচন সরেজমিনে কাভার করতে চাই।

আমাকে অবাক করে দিয়ে সম্পাদক একটা চেক লিখে দিলেন, এই নাও তোমার খরচের টাকা। তুমি ফিলিস্তিন যাও। দু সপ্তাহ পর আমাদের জন্য চমৎকার কিছু নিউজ তৈরি করে আনবে। পরের বছর জানুয়ারিতে ফিলিস্তিন এসে হাজির হলাম। আমি এখানকার কাউকেই চিনি না, রাস্তাঘাটও অপরিচিত। সম্বল বলতে তিনজন অপরিচিত লোকের ফোন নম্বর।। সারা জীবন শুনে এসেছি মুসলমানরা সন্ত্রাসী। বিশেষ করে ফিলিস্তিনি মুসলমানদের কুখ্যাতি তো আরও বেশি। ফিলিস্তিনে এসে নিজের জীবন ও নিরাপত্তা নিয়ে তাই আমার মনে কিছুটা ভয় কাজ করছিল। তেলআবিব এয়ারপোর্টে নেমে আমি একটা ট্যাক্সি ডাকলাম। ড্রাইভারের নাম জামাল। সে আমাকে বলল, আপনি আমাকে জিমি বলে ডাকতে পারেন।

জিমি জামাল আমাকে তেলআবিব থেকে রামাল্লার দিকে নিয়ে চলল। যেতে যেতে শোনাল, ফিলিস্তিনিদের ওপর চলা ইজরাইলি বাহিনির ৬৩ বছরের অত্যাচার, নির্যাতন আর নিষ্ঠুরতার করুণ কাহিনি। আমাদের রাস্তা ছিল পাথুরে পাহাড়ী উপত্যকা বেয়ে। জামালকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘অত সুন্দর সহজ সোজা রাস্তা ছেড়ে তুমি আমাকে এই পাথুরে রাস্তায় নিয়ে এলে কেন?

জামাল বলল, ‘ম্যাডাম! আমরা সাধারণ ফিলিস্তিনি। ওই রাস্তা ইহুদিদের। ওই রাস্তায় আমাদের ঢোকা নিষেধ। দেখা মাত্র কোনো প্রশ্ন ছাড়াই পাঁচ মিনিটের মধ্যে গুলি করে মেরে ফেলবে। তবে আপনি চাইলে যেতে পারি। কি বলেন, যাব?’ |

আমি মাথা নাড়লাম, ‘না’ ।

এটা ছিল ফিলিস্তিনের রাস্তায় ফিলিস্তিনি মানুষের সংস্পর্শে আমার প্রথম দিন।। জামালের কথা শুনতে শুনতে মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। আমি স্তব্ধ হয়ে গাড়ির ভেতরে বসে রইলাম। ফিলিস্তিনে এসে অনুভব করতে পারছিলাম, তাদের প্রতি অন্যায় জুলুমের ভয়াবহতা কী, আর তার স্বরূপটাই বা কেমন।

মনে পড়ে, সে বারের ফিলিস্তিন যাত্রায় এক বয়স্ক মহিলার সাথে দেখা হয়েছিল। তিনি আমার হাত ধরে টেনে তার বাড়িতে আহবান করছিলেন, ‘ইয়াল্লা! ইয়াল্লা! অর্থাৎ ‘আসো, আসো।

ভিতরে গিয়ে তিনি আমার গায়ে একটা কোট পরিয়ে দিয়েছিলেন। ছোট একটা

মা ছু জামা কাপড় দিয়ে তার ফোন নম্বর লিখে দিয়েছিলেন। দরজার কাছে এনে হাত নেড়ে আমাকে বিদায় জানিয়েছিলেন, ‘আসসালামু আলাইকুম।

অথচ তিনি আমাকে চিনতেন না, আমার সম্পর্কে তেমন কিছুই তার জানা ছিল না জীবনে আর কখনো তার সাথে আমার দেখাও হয়নি। একজন অপরিচিত আকাষের প্রতি একজন মুসলিম নারীর এমন নিবিড় আন্তরিকতা আমার হৃদয়টাকে দারুনভাবে নাড়া দিয়েছিল। সেদিন মুসলিমদের সম্পর্কে আমার এত দিনকার চেতনা বেশ ভালোই ধাক্কা খেয়েছিল।চরম দুঃখ-কষ্ট-অবিচারের মুখো মুখি দাঁড়িয়েও মুসলিমদের মুখের হাসি আর তৃপ্তিবোধ আমাকে দারুণ অবাক করেছিল। আমার মনে আছে, সেখানকার আসলমদের মুখে কথায় কথায় একটা শব্দ শুনতাম, আলহামদুলিল্লাহ। আমি যানতাম না এই শব্দের অর্থ কী।

ভাবতাম, তারা হয়তো  স্রষ্টাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছেন। কিন্তু আমি এর অন্তর্নিহিত শক্তিকে উপলব্ধি করতে পারিনি। বুঝতে পারিনি, এই একটি শব্দ কী করে আল্লাহর সাথে তার বান্দার সুদৃঢ় সম্পর্ক তৈরি করে।

একজন অমুসলিমের ইসলামকে বুঝার জন্য প্রয়োজন ‘দাওয়াহ’। দাওয়াহ মানে অনেক তথ্যের সরবরাহ। সে সময় কয়েক বছর আমি সুচিন্তিতভাবে ইসলাম কিংবা সঠিক ধর্মমত খুঁজতে যাইনি। কিন্তু কোনো-না-কোনো ভাবে আমার কাছে ইসলামের দাওয়াহ আসতে লাগল।এ ক্ষেত্রে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন সোমালিয়ান ট্যাক্সি ড্রাইভারেরা। উত্তর লন্ডনের পথে পথে অধিকাংশ ট্যাক্সি ড্রাইভার ছিলেন সোমালিয়ান। আল্লাহ তাদের উপর রহম করুন। তারা ছিলেন ইসলামের নীরব যোদ্ধা।

যখনই কোনো মানুষ তাদের ট্যাক্সিতে চড়েন, তারা সুযোগ বুঝে কুরআন কিংবা হাদিসের বাণী শেয়ার করেন। এতে অনেক যাত্রীই ইসলাম সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে উঠেন।যখনই সোমালি ভাইদের ট্যাক্সিতে উঠতাম, আমি সালাম দিতাম ‘আসসালামু আলাইকুম। ফিলিস্তিনে গিয়ে আমি এই সম্ভাষণ শিখেছিলাম।

পরের অংশ টুকু পড়তে[এখানে ক্লিক করুন]

ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে। তাহলে আপনিও ব্লগের কার্যক্রম কে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার লেখণী পাঠাতে পারেন।আপনার লেখনী পাঠিয়ে আমাদের ফেচবুক পেজের ম্যাসেঞ্জারে গিয়ে দয়াকরে নক করুন।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন