লেট দেয়ার বি লাইট -পাট থ্রি

ডেভিড কিছুই বলল না। সাজিদ আবার বলতে শুরু করল, খেয়াল করো, যিশুর বাগদত্তা পিতা জোসেফ এবং যিশুকে গর্ভে নিয়ে মাতা মেরীর পক্ষে কি কখনোই গালীল প্রদেশের নাসরত অঞ্চল থেকে বরফে আচ্ছাদিত পথ, কুয়াশার আস্তরণ মাড়িয়ে বেথেলহামে আসা সম্ভব ছিল? ছিল না। যুক্তিতে বিশ্বাসী এমন যে-কেউ বলবে যে, এটি কোনোভাবেই সম্ভব না। তাছাড়া, একজন রাজাও এমন সময়ে রাজ্যে আদমশুমারি ডাকবেন না, যখন ওই রাজ্যে কনকনে শীতকাল। চারদিকে তুষারপাত। তিনি ভালো করেই জানেন—এরকম পরিস্থিতিতে দূর-দূরান্তের প্রজাদের পক্ষে বেথেলহামে আসা সম্ভব না। তাই তিনি ডিসেম্বরে আদমশুমারি ডাকবেন, এটি অসম্ভব। তাহলে কোন সময়ের ঘটনা হতে পারে এটা? হতে পারে। এমন সময়ের যখন আবহাওয়া শুষ্ক ছিল। রাস্তাঘাট ভালো ছিল। তাহলে মেরী এবং জোশেফের পক্ষে গালীল প্রদেশ থেকে বেথেলহামে আসা সহজ। আর, রাজাও এমন সময়ে আদমশুমারি ডেকেছিলেন যখন আবহাওয়া শুষ্ক ছিল। কারণ, আদমশুমারিগলো সাধারণত ফসল কাটার পর পর ডাকা হতো। কিন্ত ডিসেম্বর কোনোভাবেই ফসল কাটার মৌসুম নয়। তাহলে কোন সময়ের ঘটনা হতে পারে এটি? হতে পারে গ্রীষ্ম ঋতুর ঘটনা।

‘তাহলে?’, প্রশ্ন ডেভিডের।

‘তাহলে দুইয়ে দুইয়ে চার হয়। মানে, জোসেফ এবং মেরী এমন সময়ে বেথেলহামে এসেছিলেন যখন আবহাওয়া শুষ্ক ছিল এবং রাস্তাঘাট ভালো ছিল। রাজাও এমন একটি সময়ে আদমশুমারি ডেকেছিলেন যখন আবহাওয়া শুষ্ক ছিল। আবার অন্যদিকে, মেষপালকরাও এমন একটি সময়ে, রাতের বেলা মেষ চরাচ্ছিল যখন আকাশে জোছনা ছিল। আবহাওয়া শুষ্ক ছিল। কনকনে শীত ছিল না। মোদ্দাকথা, বাইবেলের বর্ণনা থেকে এই ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, যিশু আসলে শীতের সময়ে, অর্থাৎ ডিসেম্বরে জন্মগ্রহণ করেননি।

আমি এতক্ষণ চুপ করেই ছিলাম; কিন্তু আর চুপ থাকতে পারলাম না। বললাম, ‘সাজিদ, তোর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ থেকে এই কথাই প্রমাণিত হয় যে, যিশু পঁচিশে ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেননি; কিন্তু আমার প্রশ্ন, কুরআনে কি যিশু, আই মিন ঈসা আলাইহিস সালামের জন্মের ব্যাপারে কোনোইঙ্গিত আছে?

আমার প্রশ্নের সাথে ডেভিডও মাথা নেড়ে সহমত জানাল। সম্ভবত সেও এই প্রশ্নটাই মনে মনে প্রস্তুত করছিল। সাজিদ বলল, “বাইবেলের মতো কুরআনও ঈসা আলাইহিস সালামের জন্মের ব্যাপারে নির্দিষ্ট কোনোদিন-তারিখের ব্যাপারে বলে না। তবে কুরআনে কিছুটা ইঙ্গিত পাওয়া যায় ঈসা আলাইহিস সালামের জন্মের সময়ের পরিবেশ সম্পর্কে।

“যেমন?’, আমি জানতে চাইলাম।

“যেমন ধর, পবিত্র কুরআনের সম্পূর্ণ একটি সূরার নামই হলো মারইয়াম। ঈসা আলাইহিস সালামের মাতার নামে এই সূরার নামকরণ। এই সূরার মধ্যে ঈসা আলাইহিস সালাম জন্মের সময়কার কয়েকটি চিত্রের বর্ণনা আছে। মারইয়াম আলাইহাস সালাম যখন আল্লাহর ইচ্ছায় গর্ভবতী হলেন, তখন তিনি খুব ভীত হয়ে পড়লেন। তিনি ভয় পাচ্ছিলেন তার কওম তার বিরুদ্ধে-না আবার ব্যভিচারের অপবাদ আনে! মারইয়াম আলাইহিস সালাম ছিলেন পূত-পবিত্র নারী। তাকে কোনোদিন কোনোপুরুষ স্পর্শও করেনি। কওমের নিন্দার ভয়ে তিনি লোকালয় থেকে দূরে কোথাও চলে গেলেন। যখন তার প্রসববেদনা শুরু হয়, তখন তিনি একটি খেজুর গাছের নিচে অবস্থান করছিলেন। প্রচণ্ড ব্যথা আর কওমের নিন্দার ভয়ে তিনি একেবারেই ভেঙে পড়লেন। প্রচণ্ড দুঃখবোধ থেকে তিনি ওই মুহূর্তে মুখে বিড়বিড় করে যে-কথাগুলো বলেছিলেন, সেগুলো হুবহু কুরআনে স্থান পায়। সূরা মারইয়ামের তেইশ নম্বর আয়াতে বলা হচ্ছে, ‘হায়! এর আগেই (অর্থাৎ ঈসা আলাইহিস সালাম ভূমিষ্ঠের আগেই) যদি আমি মরে যেতাম এবং মুছে যেতাম মানুষের স্মৃতি থেকে।

এমন সময় তাকে শান্তনা দিয়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে বলা হলো, তুমি চিন্তা কোরো। তোমার রব তোমার পায়ের নিচে একটি ঝরনা সৃষ্টি করেছেন। আর তুমি খেজুর গাছের ডাল ধরে নাড়া দাও। তাহলে সেখান থেকে তোমার জন্য পাকা খেজুর পড়বে। এই কথাগুলো আছে সূরা মারইয়ামের চব্বিশ এবং পঁচিশ নম্বর আয়াতে।

আমি বুঝতে পারলাম না, এখান থেকে সাজিদ কী প্রমাণ করতে চাচ্ছে। সম্ভবত ডেভিডও বুঝতে পারেনি। আমি বললাম, এই আয়াতগুলো থেকে কী প্রমাণিত হয়?

সাজিদ বলল, ‘পঁচিশ নম্বর আয়াতটি খেয়াল কর। ওই আয়াতে মারইয়াম আলাইহিস সালামকে কী করতে বলা হচ্ছে? বলা হচ্ছে তিনি যেন খেজুর গাছের ডাল ধরে

নাড়া দেন। তাহলে খেজুর গাছ থেকে পাকা খেজুর পড়বে এবং তা মারইয়াম আলাইহাস সালাম খেতে পারবেন।

‘তো?’

‘এখনো বুঝতে পারিসনি?’, সাজিদ আমার কাছে জানতে চাইল।

আমি মুখ কালো করে বললাম, না।

হঠাৎ ‘ইয়েস…ইয়েস…’ শব্দে চেঁচিয়ে উঠল ডেভিড। এই আমেরিকানকে এভাবে চিৎকার দিয়ে উঠতে দেখে আমি  অবাক হলাম বটে। ডেভিড বলল, ‘আমি মনে হয় বুঝতে পেরেছি তুমি কী বোঝাতে চাচ্ছ।

‘কী?’, প্রশ্ন সাজিদের।

‘মারইয়ামকে বলা হলো খেজুর গাছের ডাল ধরে নাড়াতে। তাহলে খেজুর গাছ থেকে পাকা খেজুর পড়বে। তার মানে হলো, ডিসেম্বর বা শীতকালে তো খেজুর পাকার কথা নয়। খেজুর পাকে গ্রীষ্মকালে। যেহেতু ওই সময়ে গাছে পাকা খেজুর থাকার কথা বলা হচ্ছে, তাহলে সময়টি নিশ্চিত ডিসেম্বর নয়। কারণ, ডিসেম্বরে কোনভাবেই খেজুর গাছে পাকা খেজুর থাকবে না।

সাজিদ মুচকি হাসল। বলল, “ইউ আর রাইট মাই ফ্রেন্ড। ঠিক এই ব্যাপারটিই আমি বলতে চাচ্ছিলাম। কুরআনের এই ইঙ্গিত থেকেও বোঝা যায় যে, ঈসা আলাইহিস সালাম ডিসেম্বরের শীতে নয়; বরং গ্রীমের কোনোএকটি সময়ে জন্মেছেন। বাইবেল থেকেও এরকম ইঙ্গিতই পাওয়া যায়। তাহলে ডেভিড, যে-দিনটায় আসলে যিশু জন্মই। নেননি, সে দিনটি তার জন্মদিন হিশেবে পালন করা কি আদৌ ঠিক? তুমি বলো?

ডেভিডের উৎফুল্ল চেহারা মুহূর্তেই আবার অন্ধকারে ছেয়ে গেল। সে বুঝতে পারছে না—কীভাবে তারা যুগের পর যুগ ধরে ভুল একটি দিনে যিশুর জন্মদিন পালন করে যাচ্ছে। ডেভিড মুখ কালো করে বলল, “সাজিদ, পঁচিশে ডিসেম্বরে যদি যিশু জন্মগ্রহণ না-ই করে, তাহলে খ্রিষ্টানরা কেন এই দিনে যিশুর জন্মদিন পালন করে? ‘সরি টু সে মাই ফ্রেন্ড। কোনো খ্রিষ্টানের কাছেই এই প্রশ্নের যথাযথ কোনোউত্তর নেই। ‘এই দিনটি কীভাবে তাহলে যিশুর জন্মদিন হিশেবে স্বীকৃতি পেল?

“সে ইতিহাস অবশ্য অনেক লম্বা। সেই গল্পটি চা খেতে খেতে করা যাক, চললা…।

আমরা হাঁটতে হাঁটতে টিএসসিতে চলে এলাম। মতি ভাইয়ের দোকানের টুলে এসে বসলাম আমরা তিন জন। আমাদের সাথে সাদা চামড়ার এই আগন্তুককে দেখে খানিকটা অবাক হলেন টিএসসির এই সুদর্শন চা-ওয়ালা। একটু পরপর তিনি ডেভিডের দিকে তাকাচ্ছেন। আমাদের দেখে ইতোমধ্যেই কেটলিতে পানি বসিয়ে দিয়েছেন তিনি। মতি ভাইকে নিয়ে আমাদের ক্যাম্পাসে বেশ ভালো রকমের গল্প রটানো আছে। কথিত আছে, তিনি নাকি গ্রামে থাকাবস্থায় কোনো এক পরীর সাথে প্রেম করতেন। দীর্ঘ দুই বছরের প্রেমের ইতি ঘটে, যখন মতি ভাই চায়ের দোকান নিয়ে বসে। মতি ভাই চা বিক্রি করছেন, এটি জানতে পেরেই নাকি পরী মতি ভাইয়ের সাথে ব্রেকআপ করে। একটি পরীর বয়ফ্রেন্ড সামান্য চা-বিক্রেতা, এটি সম্ভবত জিন-সমাজে বেশ অপমানজনক ব্যাপার। এ জন্যেই পরীটি মতি ভাইকে ছেড়ে অন্যত্র চলে যায়।

আমি মতি ভাইকে বললাম, “তা মতি ভাই, তোমার পরী কি পরে আর আসছিল? মতি ভাই বেশ নরম সুরে বললেন, ‘না। আর আইব কিয়েল্লাই। হেতির আর আমারে দিয়া কাম কী কও?’

‘কোনো চিঠিপত্রও কখনো পাঠায়নি?

এবারও মতি ভাই ‘না-সূচক উত্তর দিলেন। এরপর বললেন, “তোমাদের কি আদা চা-ই দিমু?

আমি বললাম, তা-ই দাও।’ ডেভিডের দিকে ফিরে বললাম, “ডেভিড, তুমিও কি আদা চা-ই খাবে?’

ডেভিড আমেরিকান ইংরেজিতে বলল, ‘হোয়্যাট ডাজ ইট মিন বাই আদা চা?’

ডেভিডের ইংরেজি শুনে মতি ভাই আমাকে বলল, “কে এই লোক?

‘আমাদের বন্ধু।

‘কই থাহে?’

আগের অংশ টুকু পড়তে[এখানে ক্লিক করুন]পরের অংশ টুকু পড়তে[এখানে ক্লিক করুন]

এই ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে তাহলে দয়া করে ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ একে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন