লেট দেয়ার বি লাইট-পাট ফোর

‘আমেরিকা। বাংলাদেশে বেড়াতে এসেছে।

মতি ভাই ‘ও’ বলে আবার চা বানানোয় মন দিল। সাজিদ ডেভিডকে আদা চায়ের ব্যাপারে বুঝিয়ে বলার পরে ডেভিডও আদা চা খাওয়ার ব্যাপারে রাজি হয়ে গেল। ডেভিড বলল, “সাজিদ, এবার বুঝিয়ে বলো কেন খ্রিষ্টানরা ভুল দিনে ক্রিসমাস ডে পালন করে।

সাজিদ গলা খাঁকারি দিল হালকা করে। বলল, “সারপ্রাইজিং টুথ কী জানো ডেভিড? এই ক্রিসমাস ডের সাথে ক্রিশ্চিয়ানিটির আসলে কোনোসম্পর্কই নেই।

সাজিদের এই কথা শুনে ডেভিড আর আমি দুজনেই চমকে উঠলাম। বলে কী ও! ক্রিসমাস ডের সাথে নাকি খ্রিষ্টানদের কোনোসম্পর্ক নেই! চোখেমুখে বিস্ময় নিয়ে আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কী বলছিস এসব তুই? ক্রিসমাস ডের সাথে ক্রিশ্চিয়ানিটির সম্পর্ক নেই মানে? তাহলে ক্রিশ্চিয়ানিটির মধ্যে ক্রিসমাস ডে এলো কোত্থেকে?

সাজিদ মুচকি হেসে বলল, “সেটাই হচ্ছে প্রশ্ন। ক্রিশ্চিয়ানিটির মধ্যে এই উৎসব ঢুকল কী করে! আরও অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে, ক্রিশ্চিয়ানিটির মধ্যে এই ক্রিসমাস ডে তথা পঁচিশে ডিসেম্বরে উৎসব পালনের রীতিটি এসেছে প্যাগানদের কাছ থেকে।

এবার আমি আর ডেভিড দুজনেই হাঁ করে রইলাম। কারও মুখে কোনোকথা নেই যেন। সাজিদ আবার বলতে শুরু করল, এই ইতিহাস অনেক পুরোনো। যিশুর জন্মের আগে ইউরোপে রাজত্ব করত প্যাগানরা। এই প্যাগানরা তখন ‘স্যাটারন্যালিয়া নামক একটি উৎসব পালন করত। দেবতা স্যাটার্ন’ এর পূজোই এই উৎসবের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। দেবতা স্যাটার্ন ছিল ফসলের দেবতা। ফসল কাটার মৌসুম শেষে যখন সবার ঘরে ঘরে খাবার এবং ফসল মজুদ হয়ে যেত, তখনই এই উৎসব পালন করা হতো বলে জানা যায়। ডিসেম্বরের সতেরো তারিখে এই স্যাটারন্যালিয়া উৎসব পালন করা হতো৷

মতি ভাই আমাদের দিকে চা এগিয়ে দিল। আমরা সন্তর্পণে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে সাজিদের কথার দিকে মনোযোগ দিলাম।

‘প্যাগানদের মধ্যে আরেকটি প্রধান উৎসবের প্রচলন ছিল। সেটি হলো দেবতা মিগ্রাসের জন্মদিন। এটিকে মিথ্রাইজম বলা হয়। মিগ্রাস ছিল আলোর প্রতীক। যিশুর জন্মের দুই হাজার বছর আগ থেকে এই দেবতা মিথ্রাসের পুজোর প্রচলন ছিল

প্যাগানদের মধ্যে। জানা যায়, এই মিগ্রাস দেবতার জন্মদিন ছিল পঁচিশে ডিসেম্বর। তাই, প্যাগানরা ডিসেম্বরের পঁচিশ তারিখ এই মিথ্রাসের জন্মদিন পালন করত। প্যাগানরা এই উৎসবকে বলত ‘Dies Natalis Solis Invicti’. এর মানে হলো “The Birthday of Unconquerable Sun’. যাইহোক, তখন ইউরোপে আস্তে আস্তে ক্রিশ্চিয়ানিটি প্রবেশ করছিল মাত্র। কিছু কিছু প্যাগান প্যাগানিজম ছেড়ে খ্রিষ্টধর্মে চলে আসা শুরু করে। তখন কনস্ট্যানটাইন নামের একজন রোমান, যিনি প্যাগানধর্মের একজন একনিষ্ঠ ভক্ত, তিনি খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করেন। খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করার পরে তিনি প্যাগানদের মধ্যে খ্রিষ্টান চার্চের ব্যাপক প্রচারণা শুরু করে দেন; কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, প্যাগানিজম ছেড়ে তিনি খ্রিষ্টধর্মে আসলেও প্যাগানদের রীতি-নীতিকে মন থেকে ছুড়ে ফেলতে পারেননি। তখন থেকে তিনি চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকেন ক্রিশ্চিয়ানিটি এবং প্যাগানিজমের মধ্যে একটি মেলবন্ধন তৈরি করতে। পরে তিনিই দেবতা স্যাটার্ন এবং দেবতা মিথ্রাসের জন্মদিনকে যিশুর জন্মদিন বলে প্রচার করতে লাগলেন, যাতে একই দিনে প্যাগানরা এবং খ্রিষ্টানরা উৎসব পালন করতে পারে।

আমাদের বিস্ময়ের রেশ এখনো কাটেনি। বললাম, “তো, কনস্ট্যানটাইন নামের ভদ্রলোক যে, প্যাগান উৎসবকে যিশুর জন্মদিন বলে চালিয়ে দিল, খ্রিষ্টান পাদ্রীরা আপত্তি করল না কেন?

সাজিদ বলল, গুড পয়েন্ট। কনস্ট্যানটাইন যখন প্যাগান এই উৎসবগুলো যিশুর জন্মদিন বলে চালিয়ে দিল, তখন খ্রিষ্টান পাদ্রীরা কয়েকটি কারণে আপত্তি করেনি। প্রথমত, তাদের নিজেদের কাছেও যিশুর সঠিক জন্মদিনের কোনো প্রমাণ নেই। কারণ, বাইবেলে এটি সম্পর্কে নির্দিষ্ট করে কিছুই বলা নেই। দ্বিতীয়ত, এই পাদ্রীরা চাচ্ছিলেন যে, ওই সময়ে ক্রিশ্চিয়ানিটি যেন সর্বত্র ছড়িয়ে যায়। এমতাবস্থায়, যদি প্যাগানদের বোঝানো যায় যে, ‘দেখো, আমরাও কিন্তু তোমাদের মতো পঁচিশে ডিসেম্বরে আমাদের ঈশ্বরের জন্মদিন পালন করি। তোমাদের ঈশ্বর আর আমাদের ঈশ্বর, সে তো একই। আসসা, তোমরাও খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করো।

ডেভিড এতক্ষণ পর কথা বলে উঠল। সে বলল, “সাজিদ, তুমি বলতে চাচ্ছ যে, প্যাগানদের খ্রিষ্টধর্মে ভিড়ানোর জন্যে চার্চের পাদ্রীরা প্যাগান দেবতার জন্মদিনকে যিশুর জন্মদিন হিশেবে মেনে নিয়েছে?

‘একদম তা-ই’, বলল সাজিদ।

‘কিন্তু ক্রিসমাস ডেতে প্র্যাকটিস হওয়া রিয়ালগুলো তাহলে কীভাবে এলো?” ‘কোন রিয়ালগুলো?’, জানতে চাইল সাজিদ।

‘এই ধরো, ক্রিসমাস ট্রি এর কথা। ক্রিসমাসের দিন একটি সবুজ গাছকে ঘিরে যে-সাজ-সজ্জা এবং আনন্দ-ফুর্তি হয়, সেটা।

‘সত্যি বলতে, এই রিচুয়ালগুলোও প্যাগানদের থেকে ধার করা। প্যাগানরা মনে করত সবুজ বৃক্ষ হলো প্রাণ তথা জীবনের প্রতীক। তাই তারা তাদের পুজো-উৎসবে তাদের ঘর এবং ঘরের আশপাশ এরকম সবুজ বৃক্ষ দিয়ে সাজিয়ে রাখত এবং পুজো করত। এমনকি সান্তা ক্লজ, যেটি ক্রিসমাস ডের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, সেটাও ধার করা জার্মান মিথোলজি থেকে। সান্তা ক্লজ যে ক্রিসমাসের আগের রাতে এসে বাচ্চাদের উপহার দিয়ে যায়, সেটি মিথোলজির দেবতা Odin এর কাহিনি থেকে আসা।

আমি বললাম, ‘তা না-হয় বুঝলাম বাপু; কিন্তু যিশুর সময়কাল থেকেই যদি এই উৎসব পালন হয়ে থাকে তো এত যুক্তি-প্রমাণের তো কোনোদরকার নেই, তাই না?

‘রাইট’, বলল ডেভিড। তার চোখেমুখে উজ্জ্বল আভা। যেন সে শক্ত কোনোভিত্তি পেয়ে গেল পায়ের তলায়।

সাজিদ বলল, ‘সরি টু সে, পৃথিবীর ইতিহাসে চতুর্থ শতাব্দীর আগে ক্রিসমাস ডে উদ্যাপনের কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। এই কথাটি ক্রিশ্চিয়ান চার্চের VSCPC Capataifa yote 1636, ‘Though speculation as to the time of the year of Christ’s birth dates from the early 3rd century…. the celebration of the anniversary does not appear to have been general till the later 4th century.’ ক্যাথলিক এনসাইক্লোপিডিয়া লিখেছে। 9792, ‘Christmas was not among the earliest festivals of the Church’ খেয়াল করো, যিশুর জন্মের আরও তিনশো বছর পরে এসে হঠাৎ করে ক্রিসমাস ডে পালন করা শুরু হলো। এর আগে এরকম কোনোউৎসবের নাম-গন্ধও খ্রিষ্টানদের ইতিহাসে ছিল না। অদ্ভুত না ব্যাপারটি?

আমি আর ডেভিড দুজনেই চুপ করে রইলাম। আমাদের মনোযোগ বিচ্ছিন্ন হলো মতি ভাইয়ের কথায়। মতি ভাই বলল, “কী ব্যাপার! আম্নেরা দেহি চা-টারে বরফ বানাইয়া ছাইড়লেন।

আমরা খেয়াল করলাম যে, আসলেই আমাদের তিনজনের চা-ই ঠান্ডা বরফ হয়ে আছে। ক্রিসমাসের প্রকৃত রহস্য শুনতে শুনতে ভুলেই গিয়েছি যে, হাতে চায়ের কাপ ধরে বসে আছি।

আমাদের ওই চা আর খাওয়া হলো না। চায়ের বিল পরিশোধ করে দিয়ে হাঁটা ধরলাম বাসার উদ্দেশ্যে। ডেভিডের মুখ একেবারে শুকনো হয়ে আছে। বেচারা কত শখ করে বাংলাদেশে ক্রিসমাস ডে পালন করতে এসেছিল। সাজিদ সবটায় জল ঢেলে দিল। আমি বললাম, তা ডেভিড, অ্যালেনদের বাসার ঠিকানা তো নিলে না এখনো। আগামীকাল তো তোমার সেখানে যাওয়ার কথা।

সে মুখ নিচু করে বলল, “না আরিফ। আমি ক্রিসমাস ডেতে অ্যাটেন্ড করব না।

বেচারার শুকনো মুখ দেখে আমার খুব মায়া হলো। আমি সাজিদকে টেনে একপাশে নিয়ে গিয়ে বললাম, ‘অ্যাই, আজকেই তোর এই ইতিহাস টানতে হলো কেন? বেচারা কত শখ করে সেই সুদূর আমেরিকা থেকে বাংলাদেশে ক্রিসমাস পালনের জন্যে এসেছে। তুই তো ওর সব আশায় জল ঢেলে দিলি।

সাজিদ আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। বলল, বাইবেলে খুব সুন্দর একটি শ্লোক আছে। জানিস কী সেটা?

আমি বললাম, “কী?

সাজিদ বলল, ‘Let There Be Light’, অর্থাৎ আলোকিত হতে দাও। বাইবেল বলছে, যেখানে অন্ধকার, অজ্ঞতা রয়েছে, সেখানে আলো দাও। আমিও তা-ই করলাম। অন্ধকারে আলো দিলাম।

ঠিক কী কারণে জানি না। শ্লোকটি আমারও বেশ পছন্দ হয়ে গেল। লেট দেয়ার বি লাইট…

ক্রিসমাস ডে সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে

১) McGowan, A. How December 25th Became Christmas, Bible History Daily.

২) Stephen Nissenbaum, The Battle for Christmas : A Cultural History of America’s Most Cherished Holiday, New York: Vintage Books, 1997, p. 4.

৩) The two babylons by Alexander Hislops

৪) The Golden Bough- Sir James Frazer

৫) Encyclopedia-Man, Myth & Magic by Richard Cavendis

সমাপ্ত

আগের অংশ টুকু পড়তে[এখানে ক্লিক করুন]

ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে। তাহলে আপনিও ব্লগের কার্যক্রম কে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার লেখণী পাঠাতে পারেন।আপনার লেখনী পাঠিয়ে আমাদের ফেচবুক পেজের ম্যাসেঞ্জারে গিয়ে দয়াকরে নক করুন।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।

1 মন্তব্য

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন