মূল: প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ ২ । লেখক: আরিফ আজাদ । ওয়েব সম্পাদনা: আবু বক্কার ওয়াইস বিন আমর

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বাইরের করিডোরে বসে আছি আমরা। আমি আর সাজিদ। পৌষের হাড় কাঁপানো শীত। অল্প দূরের বস্তুগুলোও ভারী কুয়াশায় আচ্ছন্ন। শীতের তীব্রতায় ঘরে টেকা যেখানে দায়, সেখানে এরকম ভোলা পরিবেশে যে আমরা অপেক্ষার প্রহর গুনতে পারছি, সেটাই ঢের আশ্চর্যের।

আমরা অপেক্ষা করছি ডেভিডের জন্যে। ডেভিডের কথা নিশ্চয়ই মনে আছে? ওই যে, সাজিদের সেই আমেরিকান বন্ধু, যার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায় সাজিদের পরিচয় হয়েছিল। সে এখন অনর্গল বাংলা বলা শিখে গেছে। সাজিদ বলেছিল বাংলায় লেখা ওর মেইলগুলো পড়লে নাকি বোঝার উপায়ই নেই যে, এই ছেলে জন্মসূত্রে আমেরিকান। এমনকি বাংলা যতিচিহ্নের সঠিক ব্যবহারও নাকি খুব ভালোমতোই রপ্ত করেছে সে।

আজ ডেভিড দ্বিতীয়বারের মতো বাংলাদেশে আসছে। আমি আর সাজিদ ছাড়াও ডেভিডের আরও কিছু বাঙালি বন্ধু জুটেছে। তাদের সবাই খ্রিষ্টান। তার খ্রিষ্টান বন্ধুদের আমন্ত্রণে সে এবারের ক্রিসমাস ডে পালন করতেই মূলত বাংলাদেশে আসছে; কিন্তু ডেভিড নাকি বারবার করে সাজিদকে বলে রেখেছে আমরা যেন এয়ারপোর্টে তার জন্যে অপেক্ষা করি।

ঘড়ির কাঁটায় যখন সকাল সাতটা বাজে, ঠিক তখন ডেভিডের ফ্লাইট ল্যান্ড করে। ফ্লাইট ল্যান্ড করার বিশ মিনিট পরে কাঁধে একটি ইয়া মোটা ব্যাগ ঝুলিয়ে ডেভিড

বাইরে বেরিয়ে এলো। বাইরে এসেই এদিক-ওদিক তাকিয়ে আমাদের খুঁজতে লাগল সে। আমরা ভিড়ের মধ্যে ছিলাম বলে সে আমাদের দেখতে পায়নি। চশমার গ্লাস নাড়তে নাড়তে তার চোখ দুটো আমাদের তখনোখুঁজে ফিরছিল। পেছন দিক থেকে এসে আমি চিৎকার করে বললাম, “হাই ডেভিড। হেয়ার উই আর মাই ফ্রেন্ড।

পেছনে ফিরে আমাকে দেখে সেও চিৎকার করে বলল, ‘ওয়াও! আররিফ, নাইস টু মিট ইউ এগেইন। এটি বলেই সে আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। আমার পেছনেই ছিল সাজিদ। সে বলল, “ডেভিড, তোমার তো বাংলায় কথা বলার কথা। ইংরেজি কপচানোর তো কথা ছিল না।’

সাজিদকে দেখে ডেভিড আরেকবার চিৎকার করে বলে উঠল, “হেইই, সাজিদ। কেমন আছ তুমি?’ বলতে বলতেই সে সাজিদকে জড়িয়ে ধরল। আমেরিকানদের মধ্যে কোলাকুলির এই সংস্কৃতি আছে কি না জানি না। তবে সাজিদকে যেভাবে সে জড়িয়ে ধরল তা দেখে বোঝার উপায়ই নেই যে, সে কোনোবিদেশি। মনে হচ্ছে কোনো বাংলাদেশি বন্ধু অনেক বছর পরে দেশে ফিরে এসেছে। ডেভিডের চোখেমুখেও সে রকম উচ্ছ্বাস।

সাজিদ বলল, “আমি ভালো আছি। তুমি কেমন আছো বলো তো?’

‘ফাইন’, ডেভিড বলল। ও সরি সরি। আই অ্যাপোলোজাইজ। আমার তো বাংলায় কথা বলার কথা, রাইট?’

আমি আর সাজিদ দুজনেই হেসে ফেললাম। আমি বললাম, “তোমার অ্যাপোলোজিতেও কিন্তু বেশ ভালো রকমের ইংরেজি রয়ে গেছে। হা-হা-হা।

মাথা চুলকাতে চুলকাতে এবার ডেভিডও আমাদের সাথে হেসে ফেলল।

আমাদের গাড়ি চলতে শুরু করেছে। ডেভিড মাঝখানে, আমি আর সাজিদ তার দুই পাশে বসা। ডেভিড যত ভালোই বাংলা শিখুক, বাংলা বলার মধ্যে এখনোবেশ অস্পষ্টতা রয়ে গেছে তার। তার ‘ত’ উচ্চারণ এখনো‘ট’ এর মতো শোনায়। সে বলল, ‘শোননা সাজিদ, আগামীকাল তোমরা দুজনেই কিন্তু আমার সাথে যাচ্ছ।

‘কোথায়?’, জানতে চাইল সাজিদ।

‘অ্যালেনদের বাসায়।

‘অ্যালেন কে?’, আমার প্রশ্ন।

ডেভিড বলল, ‘অ্যালেন ক্রিস্টোফার। আমার বাঙালি বন্ধু।

‘ওখানে কী?’, সাজিদ জানতে চাইল।

‘আগামীকাল ক্রিসমাস ডে না? অ্যালেনদের বাসায় আমরা আগামীকাল একসাথে সেলিব্রেইট করব, ওকে?’ আমি বললাম, ‘আই সী; কিন্তু ডেভিড, একটি সমস্যা আছে। ডেভিড বলল, ‘সমস্যা? কী সমস্যা? “যেহেতু আমরা মুসলিম, তাই আমরা অন্য…।’

আমাকে কথা শেষ করতে দিল না সাজিদ। আমাকে থামিয়ে দিয়েই সে বলে উঠল, ‘ডেভিড, তোমার কি ক্ষুধা লেগেছে?

ডেভিড আমার দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে সাজিদের দিকে তাকাল। বলল, “ইয়াপা

সাজিদ বলল, ‘এক কাজ করি। চলো আমরা ভাপা পিঠা খাই।

সাজিদের কথা শুনে আমার বেশ রাগ হলো। আমাকে কথাটুকু শেষ করতে দিলে কী এমন হতো? আমি ডেভিডকে সুন্দরভাবেই বুঝিয়ে বলতাম যে, কেন একজন মুসলমানের উচিত নয় অন্য ধর্মাবলম্বীদের অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া; কিন্তু সাজিদের জন্যে আমি এগোতেই পারলাম না। সাজিদের প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেল ডেভিড। সে বলল, আমি বাংলাদেশি পিঠা খুব পছন্দ করি।

আমি বললাম, তুমি আবার বাংলাদেশি পিঠা খেলে কবে?

‘আমাদের ইউনিভার্সিটিতে কিছু বাঙালি ছেলেমেয়ে আছে। তাদের সাথে আমার খুব ভাব হয়েছে। ওরাই খাওয়ায় মাঝে মাঝে।

আমি আবার বললাম, ‘বাহ, তুমি তো দেখছি আমাদের চেয়েও বেশি বাঙালি বনে গেছ ভাই। গ্রেট জব!’

ঢাকার বিভিন্ন রাস্তার ধারে শীতকালীন পিঠা পাওয়া যায়। ভাপা পিঠা, চিতই পিঠা ইত্যাদি। মাটির ঢেলার একটি চুলা বানিয়ে মহিলারা এসব পিঠা বানায় আর পথচারীরা কিনে খায়। এরকম একটি পিঠার দোকান দেখে আমাদের গাড়িটি থামল। আমরা সবাই পিঠা খাওয়ার উদ্দেশ্যে নেমে আসলাম বাইরে

চালের গুড়া আর খেজুর গুড়ের ভাপা পিঠা খেতে খেতে ডেভিড শীতের আমেরিকা কীরকম হয় সেই গল্প সেরে নিল। পিঠা খাওয়ার পর্ব শেষ করে আমরা আবার গাড়িতে চড়ে বসলাম। চলতে শুরু করল আমাদের গাড়ি।

এবার প্রশ্ন করল ডেভিড। বলল, ‘আরিফ, তুমি কী যেন বলছিলে তখন?

সাজিদ বলল, আমি বলছি ডেভিড। আরিফ মে বি জানতে চাচ্ছিল যে, অ্যালেনদের বাসাটি ঢাকার কোনোজায়গায়। দূরে হলে কিন্তু ঢাকায় ট্রাভেল করা খুব ঝামেলার ব্যাপার। ঢাকার যে-ক’টি জিনিস বিখ্যাত, তার মধ্যে অন্যতম ঢাকার জ্যাম। তুমি নিশ্চয়ই এ ব্যাপারে জানো?

ডেভিড বলল, ও মাই গড! এই ট্রাফিক জ্যামের কথা আমি কোনোদিন ভুলতে পারব না। গতবার ঢাকা এসে আমি বুঝেছিলাম ট্রাফিক জ্যাম কাকে বলে।

আমি আর সাজিদ আবারও হেসে উঠলাম। সাজিদ বলল, হ্যাঁ। এটাই তো সমস্যা। তা, অ্যালেনদের বাসাটি কোথায় যেন?’

সে বলল, ‘আই ডোন্ট নো একচুয়ালি। তার সাথে কনট্যাক্ট করে জানতে হবে।

“ঠিক আছে, বলল সাজিদ। কিন্তু ডেভিড, আমার একটি প্রশ্ন আছে।

ডেভিড বলল, ‘শিওর।

‘ক্রিসমাস ডে কেন পালন করা হয় সে ব্যাপারে আমরা তোমার কাছ থেকে জানতে চাই।

ডেভিড অবাক হয়ে বলল, “আই সী। তোমরা জানোনা ক্রিসমাস ডে কেন পালন করা হয়?

আমরা দুজনেই চুপ করে রইলাম। ডেভিড আবার বলল, ক্রিসমাস ডে হলো জিসাস ক্রাইস্টের জন্মদিন। এই দিনে, অর্থাৎ পঁচিশে ডিসেম্বর মাতা মেরী জিসাস ক্রাইস্টকে জন্ম দেন। আমাদের পরম পবিত্র ঈশ্বরের এই দিনে পৃথিবীতে আগমনের স্মৃতি হিশেবে আমরা পঁচিশে ডিসেম্বরকে ক্রিসমাস ডে হিশেবে পালন করি।

সাজিদ বলল, ‘আই সী…।

সাজিদকে ‘আই সী’ বলতে দেখে ডেভিড বলল, “সাজিদ, আমার কথা শুনে তুমি বেশ অবাক হলে বলে মনে হলো।

সাজিদ বলল, ‘অবাক হওয়ার মতোই তো ব্যাপার।

সাজিদের কথা শুনে আমি নিজেই অবাক হয়ে গেলাম। যিশু খ্রিষ্টের জন্মদিনেই তো বড়দিন তথা ক্রিসমাস ডে পালন করা হয়। এ কথা তো একটি বাচ্চা ছেলেও জানে। এটি শুনে তো সাজিদের অবাক হবার কথা নয়।

আমার মতো ডেভিডও অবাক হলো। সে তার কপালের ভাঁজ মোটা করে বলল, ‘অবাক হওয়ার মতো ব্যাপার মানে? বুঝতে পারলাম না কিছুই।

সাজিদ থামল একটু। বলল, “আচ্ছা ডেভিড, তোমার জন্মদিন কবে? ডেভিড বুঝতে পারল না জিসাস ক্রাইস্টের জন্মদিনের সাথে তার জন্মদিনের কী সম্পর্ক। তারপরও সে বলল, জুলাইয়ের সতেরো তারিখ। সাজিদ বলল, ‘বাহ। তোমার জন্মদিনের সাথে একজন বিখ্যাত ব্যক্তির জন্মদিনের মিল রয়েছে।

ডেভিড বলল, “কার?’

‘স্যার জর্জ ল্যামিত্রে। আধুনিক বিগ ব্যাং থিওরির জনক বলা হয় যাকে। তিনিও জন্মেছিলেন আঠারোশো চুরানব্বই সালের সতেরোই জুলাইতে।

আমি বুঝতে পারছি না সাজিদ এসব কী আলাপ করছে ডেভিডের সাথে। বুঝতে না পারলেও কিছু করার নেই। চুপ করে শুনে যেতে হবে।

পরের অংশ টুকু পড়তে[এখানে ক্লিক করুন]

ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে। তাহলে আপনিও ব্লগের কার্যক্রম কে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার লেখণী পাঠাতে পারেন।আপনার লেখনী পাঠিয়ে আমাদের ফেচবুক পেজের ম্যাসেঞ্জারে গিয়ে দয়াকরে নক করুন।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন