ড. আব্দুল কারীম যাইদান

অনুবাদক: মুহাম্মাদ বুরহানুদ্দীন

সম্পাদক: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

১৬. ইসলামী শরী‘আতে শাস্তির ভিত্তি বান্দার প্রতি রহমত ও দয়া প্রদর্শন, তাদের কল্যাণ সাধন এবং তাদের থেকে যাবতীয় অকল্যাণ দূরীকরণ। তাই এ ভিত্তি থেকে স্বাভাবিকভাবেই কতিপয় মূলনীতি বেরিয়ে আসে, ইসলামে শাস্তির বিধান প্রবর্তনে যেগুলো বিবেচনা করা হয়েছে। যাতে এ ভিত্তির সাথে শাস্তির সামঞ্জস্য থাকে এবং শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যও অর্জিত হয়। কুরআন, হাদিস ও ফিকহ শাস্ত্রবিদদের উক্তি থেকে সেসব মূলনীতি জানা যায়। বিচারের ক্ষেত্রে এগুলো বিবেচনায় রাখা জরুরী। নিম্নে কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি আলোচনা করা হলো:

১৭. প্রথম মূলনীতি: ‘অপরাধ ও শাস্তির মধ্যে সমতা রক্ষা।’ এ মূলনীতিটি মূলত: বান্দার প্রতি আল্লাহর ন্যায় বিধানের একটি নমুনা। কারণ শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে প্রয়োজনের তাকিদে। আর প্রয়োজন অনুপাতেই তা নির্ধারিত হয়ে থাকে। তা ছাড়া শাস্তি সংশোধন ও মানব কল্যাণ সংরক্ষণের জন্য মূল বিষয় নয়; বরং ব্যতিক্রমী বিষয়। আর যা ব্যতিক্রম তা সীমাবদ্ধ ও অস্থায়ী। শাস্তি হলো রোগীর ঔষধস্বরূপ। রোগের জন্য যতটুকু প্রয়োজন সুক্ষ্ম হিসাব অনুযায়ী ঔষুধের মাত্রা ততটুকুই দিতে হয়, অনুমান করে দেওয়া যায় না। যেমন দেওয়া যায় সুস্থ্য ব্যক্তিকে তার খাদ্য। এ কারণে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَجَزَٰٓؤُاْ سَيِّئَةٖ سَيِّئَةٞ مِّثۡلُهَاۖ فَمَنۡ عَفَا وَأَصۡلَحَ فَأَجۡرُهُۥ عَلَى ٱللَّهِۚ إِنَّهُۥ لَا يُحِبُّ ٱلظَّٰلِمِينَ ٤٠﴾ [الشورا: ٤٠]

“মন্দের প্রতিফল অনুরূপ মন্দ, তবে যে ক্ষমা করে দেয় ও আপোস-নিষ্পত্তি করে তার পুরস্কার আল্লাহর নিকট আছে।” [সূরা আশ-শূরা, আয়াত: ৪০]

 سيئةবা মন্দ বলতে তাই বুঝায় যা মানুষ অপছন্দ করে। এ হিসেবে শাস্তিও سيئة বা মন্দের অন্তর্ভুক্ত। তাই ইসলামী শরী‘আতে শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী। ইচ্ছাকৃত হত্যা ও জখম করার শাস্তি হিসেবে কিসাসের ক্ষেত্রে এ সমতা স্পষ্ট। তাই এসব অপরাধে কিসাসই উপযুক্ত শাস্তি। আক্রান্ত ব্যক্তির ওপর অপরাধী ব্যক্তি যেরূপ আচরণ করে অনুরূপ আচরণ তার ওপর করাকে কিসাস বলে। অন্যান্য অপরাধের تعزير বা অনির্ধারিত শাস্তির ক্ষেত্রেও সমতার এ নীতি বিদ্যমান। কেননা تعزير বা অনির্ধারিত শাস্তির অপরাধ বিভিন্ন রকম হওয়ায় শাস্তির (تعزير) ধরণও বিভিন্ন রকম হয়। একইভাবে হুদুদ বা নির্ধারিত দণ্ডের অপরাধ ও তার শাস্তির মধ্যে সমতা উপস্থিত। এতদসত্বেও কেউ কেউ ভিন্ন কথা বলে থাকেন। তবে গভীরভাবে চিন্তা করলে এসব অপরাধ ও তার দণ্ডের মধ্যে সমতা লক্ষ্য্ করা যায়। কেননা এখানকার সমতা দাঁড়িপাল্লা দিয়ে পণ্য মাপার সমতার মত ইন্দ্রিয় বা বস্তুগত নয়; বরং অপরাধের পঙ্কিলতা ও ক্ষতির পরিমাণ এবং নির্ধরিত দণ্ডের মধ্যে যে অবস্তুগত সমতা এখানে তা পুরোমাত্রায় বিদ্যমান। শরী‘আত প্রণেতা আল্লাহ নিজেই এখানে এসব অপরাধের উপযুক্ত শাস্তি নির্ধারণ করে দিয়েছেন -যাকে হদ বা দণ্ড বলে অভিহিত করা হয়। সুতরাং আমাদেরকে নিশ্চিত ও প্রশান্তচিত্তে মেনে নিতে হবে যে, এ জাতীয় অপরাধ ও শরী‘আত নির্ধারিত দণ্ডের মধ্যে যথাযথ সমতা বিদ্যমান আছে। সামনে দণ্ডমূলক শাস্তি প্রসঙ্গে এ বিষয়ে আরো বিস্তারিত আলোচন করা হবে।

১৮. দ্বিতীয় মূলনীতি:‘নিবৃত্তি।’ এ মূলনীতির উদ্দেশ্য-শাস্তির পরিমাণ এতটুকু হওয়া আবশ্যক যাতে অপরাধীর অপরাধ করার প্রবণতা নিবৃত্ত হয় এবং সমাজের সবাই অন্যায় কর্মে লিপ্ত হওয়া থেকে দূরে থাকে। এ জাতীয় কোনো অপরাধ যদি সংঘটিত হয় তাহলে তার শাস্তি এমন হতে হবে, যেন অপরাধী উচিত শিক্ষা পায় ও একই অপরাধ পুনরায় করতে সাহস না পায় এবং অন্য কেউ অনুরূপ কাজে উদ্বুদ্ধ না হয়। শাস্তি ব্যবস্থায় এতটুকু দুঃখ-যাতনা থাকা দরকার, যাতে জনমনে ভীতির সঞ্চার হয় এবং শাস্তি পাওয়ার ভয়ে অপরাধমূলক কাজ থেকে বিরত থাকে। কেননা প্রতিটি লোকই স্বভাবগতভাবে নিজের প্রাণকে ভালোবাসে ও দুঃখ-যাতনাকে ভয় করে। সে যখন জানবে যে, এ অপরাধ করলে তার প্রাণ যাবে কিংবা ব্যক্তি স্বাধীনতা লোপ পাবে অথবা দৈহিক শাস্তি ভোগ করতে হবে বা অঙ্গচ্ছেদ হবে। তখন শাস্তির ভয়ে শঙ্কিত হয়ে সে অপরাধ করা থেকে বিরত থাকবে। কেউ যদি অপরাধে জড়িত হয়ে পড়ে এবং তজ্জন্য শাস্তি ভোগ করে, তবে শাস্তির দুঃখ-বেদনা স্মরণ করে সে পুনরায় ঐ কাজ করা থেকে ক্ষান্ত থাকবে এবং অন্যরাও সংযত হবে। তাই জনৈক ফকীহ শাস্তি সম্পর্কে বলেছেন, অপরাধ ঘটার পূর্বে এটা থাকে নিবৃত্তকারী আর ঘটে যাওয়ার পরে হয় সতর্ককারী।

১৯. তৃতীয় মূলনীতি: ‘অপরাধী ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব সংরক্ষণসহ সমাজকে অপরাধের ক্ষতি থেকে রক্ষার প্রতি গুরুত্বারোপ।’ প্রকৃতপক্ষে এ মূলনীতিটি শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে দুটো দৃষ্টিভঙ্গির মাঝে সমন্বয় করেছে। প্রথম দৃষ্টিভঙ্গি হলো অপরাধীর ব্যক্তিত্ব, পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও পরিস্থিতিকে উপেক্ষা করে সমাজকে অপরাধের কবল থেকে সুরক্ষা করাকে গুরুত্ব দেওয়া। দ্বিতীয় দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে অপরাধীর ব্যক্তিত্ব ও সংশোধনের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া এবং শাস্তি দানের ক্ষেত্রে তার সামাজিক মর্যাদা ও অবস্থাকে বিবেচনায় রেখে শাস্তি নির্ধারণ করা, যদিও তা সমাজের স্বার্থ রক্ষায় যথেষ্ট বলে বিবেচিত না হয়। কেননা, এখানে সমাজকে অপরাধের ক্ষতি থেকে রক্ষা করার গুরুত্বের চেয়ে অপরাধীর ব্যক্তিত্ব ও সংশোধনের গুরুত্বকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

এ দু’ধরণের দৃষ্টিভঙ্গি সামনে রেখে শরী‘আত শাস্তির বিধান প্রণয়নকালে উভয় প্রকারের জন্য সর্বোত্তম পন্থা অবলম্বন করেছে। যাতে সমাজের স্বার্থ ও অপরাধীর কল্যাণ উভয়টা বহাল থাকে। এ বিভাজন পদ্ধতির আলোকে ইসলামী শরী‘আত হদ বা নির্ধারণ দণ্ডের ক্ষেত্রে অপরাধীর ব্যক্তিত্বকে অগ্রাধিকার দিয়েছে এবং দণ্ড দানের পূর্বে অপরাধ করার সময় তার বালেগ হওয়া, জ্ঞান ও বিবেক সম্পন্ন থাকা, ইচ্ছাকৃত করা, নিরুপায় হয়ে করেছে কি-না বা কেউ তাকে বাধ্য করেছে কি-না অথবা অজ্ঞাত বসত[1] করেছে কি-না তা বিবেচনা করার প্রতি জোর দিয়েছে। কিন্তু যদি কোনো বালেগ লোক স্বজ্ঞানে, ইচ্ছাকৃতভাবে, নিরুপায় না হয়ে ও অন্যের চাপে বাধ্য না হয়ে দণ্ড জাতীয় অপরাধ করে যেমন, ব্যভিচার, চুরি ও মদ্যপান ইত্যাদি, তাহলে সকল ফিকহ শাস্ত্রবিদদের মতে উপরের ব্যাখ্যা অনুযায়ী সে নির্ধারিত দণ্ডে দণ্ডিত হবে। তার পরিবেশ, অবস্থান, চরিত্র, শিক্ষা-সভ্যতার মান ও মানসিক অস্থিরতার প্রতি আদৌ ভ্রুক্ষেপ করা যাবে না। কেননা, অপরাধের জঘন্নতা ও ভয়বহতার মোকাবেলায় তার এ সবের কোনোটিই তার প্রাপ্য শাস্তি লাঘব কিংবা অন্য কিছুর মাধ্যমে তা বদলিয়ে দেওয়ার সমর্থন যোগ্য বলে বিবেচনা করে না। যেহেতু সে যখন এ অপরাধে জড়িয়ে পড়ে তখন সে প্রাপ্তবয়ষ্ক ও পূর্ণ বিবেকবান। স্বেচ্ছায় বুঝে-শুনে এবং কোনো কারণে বাধ্য না হয়ে সে এহেন কাজ করেছে। উচিত ছিল, তার বিবেক এ অপরাধ করতে তাকে বাধা দিয়ে বিরত রাখবে। কিন্তু যখন সে ক্ষান্ত হলো না তখন শাস্তি তাকে অবশ্যই ভোগ করতে হবে। বিচারক শাস্তি কার্যকর করা ব্যতীত অন্য কিছুর অধিকার রাখে না। সমাজকে যাবতীয় অকল্যাণ থেকে বাঁচিয়ে সমাজ ও সমাজে বসবাসকারী নাগরিকদের কল্যাণ সুরক্ষার এটাই সঠিক পথ। সমাজের যাবতীয় কল্যাণ সুনিশ্চিত করা সমাজেরই দাবি। কারণ সমাজ একটি বিশাল-বিস্তৃত ঘর সদৃশ। আর  জনগণ সে ঘরের বাসিন্দা। তাদের সমাজ নামক ঘরটি সকল প্রকার হুমকি অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা থেকে মুক্ত থাকলেই তাদের শান্তি ও কল্যাণ নিশ্চিতরূরপে প্রতিষ্ঠিত হয়।

দণ্ড কর্যকর করা অপরিহার্য হওয়ার বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়ে যায় আরেক দিকে লক্ষ্য করলে। তা হচ্ছে, দণ্ডযোগ্য অপরাধীকে তার সামাজিক মর্যাদা ও পারিপার্শ্বিকতা বিবেচনা করে প্রাপ্য দণ্ড না দিয়ে যদি বিশেষ প্রকারের লঘু শাস্তি দেওয়া হয় তাহলে সমাজে ঐরূপ অপরাধ করার প্রবণতা দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে এবং এ জাতীয় অপরাধীরা সেই শাস্তি থেকে রেহাই পেয়ে যাবে, যা তাদেরকে অপরাধ করা থেকে ফিরিয়ে রাখতে পারত। কারণ এ অবস্থায় তখন অপরাধকারীর পারিপার্শ্বিকতাকে বিবেচনায় নিতে হবে এবং এ অসংবিধিবদ্ধ স্বতন্ত্র শাস্তি তখন এমন একটি ভিত্তি হয়ে দাঁড়াবে যার কোনো স্পষ্ট সীমারেখা নেই। ফলে এ প্রক্রিয়ার মধ্যে হীন মানসিকতা ও নিকৃষ্ট ভাবনা প্রবেশ করার যথেষ্ট সুযোগ থাকবে। পরিণামে শাস্তি নির্ধারণে এমন অবস্থা সৃষ্টি হবে যা সমাজে বড় ধরণের অশান্তি বয়ে আনবে। অথচ শাস্তির উদ্দেশ্য ছিল সমাজ থেকে অশান্তি ও অকল্যাণ দূর করা। কিন্তু এ অশান্তি দূর হবে না এ জাতীয় সকল অপরাধীর ওপর উক্ত দণ্ড কার্যকর করা ব্যতীত। অবশ্য রায় দেওয়ার পূর্বে উত্তমরূপে দেখতে হবে তার প্রাপ্ত বয়ষ্ক হওয়া, সজ্ঞানে স্বেচ্ছায় করা, অনন্যোপায় হয়ে করা, অন্যের চাপে করা এবং অজ্ঞতাবশত: করা হয়েছে কিনা -যেমনটি পূর্বে বলা হয়েছে।

ইচ্ছাকৃত হত্যা বা আহত করার অপরাধের শাস্তি কিসাস, যদি এর শর্তসমূহ বিদ্যমান থাকে। এ ক্ষেত্রে অপরাধীর ব্যক্তিত্ব বিবেচনা করা যাবে না। তবে দেখতে হবে অপরাধী পূর্ণ বয়স্ক কি-না, তার বিবেক বুদ্ধি আছে কি-না এবং ইচ্ছাকৃতভাবে করেছে কি-না। তার ব্যক্তিগত বিষয়ে কেবল এ দিকগুলোই বিবেচনা করা হয়েছে। অবশ্য আক্রান্ত ব্যক্তি ও তার ওয়ারিশগণের জন্য শরী‘আত অপরাধীকে ক্ষমা করে দেওয়ার অধিকার দিয়েছে। তারা ক্ষমা করে দিলে কিসাস রহিত হয়ে যাবে। অবশ্য আদালত তখনও তাকে শিক্ষামূলক অন্য শাস্তি তা‘যীর (تعزير) দেওয়ার অধিকার রাখে।

অন্যান্য অপরাধ অর্থাৎ যেসব অপরাধে লঘু শাস্তি দেওয়া হয় এবং শরী‘আত কোনো শাস্তি নির্ধারণ করে নি, সেসব অপরাধের শাস্তি নির্ধারণের সময় অভিযুক্ত ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব, তার মর্যাদা, গতি-প্রকৃতি ও পূর্বের কৃতি বিবেচনা করা আবশ্যক। কারণ, এসব অপরাধের ক্ষতির দিক হদ ও কিসাসের অপরাধের ন্যায় চরম পর্যায়ের নয়। সেজন্য এ জাতীয় অপরাধের বিশাল ও বিস্তৃত ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র শাস্তি বিবেচনা করার সুযোগ যথেষ্ট আছে এবং তার সংখ্যা অনেক।


[1] যেমন, কেউ যদি আংগুরের জুস মদ নয় ভেবে পান করে তবে তার শাস্তি হবে না। অনুরূপভাবে যদি কোনো নারী কোনো পুরুষকে জড়িয়ে ধরে এবং সে তাকে স্বীয় স্ত্রী মনে করে মিলিত হয়, তবে তার ওপরও কোনো শাস্তি আসবে না।