(১) শেষ দিবসের (আখিরাতের) ওপর ঈমান

আখেরাতের ওপর ঈমান হচ্ছে, এ বিশ্বাস পোষণ করা যে, পার্থিব জীবন শেষ হয়ে মৃত্যু ও কবর জীবনের মাধ্যমে অন্য জগত শুরু হবে। এভাবে কিয়ামত সংঘটিত হবে, তারপর পুনরুত্থান, হাশর, নাশর ও হিসাব-নিকাশের পর ফলাফল প্রাপ্ত হয়ে জান্নাতীরা জান্নাতে এবং জাহান্নামীরা জাহান্নামে যাবে।

শেষ দিবসের ওপর ঈমান আনা ঈমানের রুকনসমূহের অন্যতম একটি রুকন। যার ওপর ঈমান আনা ছাড়া কোনো বান্দার ঈমান পরিপূর্ণ হবে না। আর যে ব্যক্তি শেষ দিবসকে অস্বীকার করবে সে কাফির হয়ে যাবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَلَٰكِنَّ ٱلۡبِرَّ مَنۡ ءَامَنَ بِٱللَّهِ وَٱلۡيَوۡمِ ٱلۡأٓخِرِ ﴾ [البقرة: ١٧٧]

“বরং সৎকাজ হলো এই যে, ঈমান আনবে আল্লাহর ওপর ও কিয়ামত দিবসের ওপর।” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৭৭]

অনুরূপভাবে হাদীসে জিবরীল-এ এসেছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«فأخبرني عن الإيمان؟ قال: أن تؤمن بالله، وملائكته وكتبه، ورسله واليوم الآخر، وتؤمن بالقدر خيره وشره».

“জিব্রাঈল বলেন, হে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে ঈমান সম্পর্কে অবগত করান। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ঈমান হলো, আল্লাহ ও তাঁর ফিরিশতা, তাঁর কিতাবসমূহ, তাঁর রাসূল এবং শেষ দিবসের ওপর ঈমান আনা, আরো ঈমান আনা তাকদীরের ভাল মন্দের প্রতি।” (সহীহ মুসলিম: ১/১৫৭)

শেষ দিবসের পূর্বে কিয়ামতের যে সকল আলামত সংঘটিত হবে তার ওপর ঈমান আনা, যেগুলো সম্পর্কে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সংবাদ দিয়েছেন।

আলেমগণ এ আলামতকে দু’ভাগে বিভক্ত করেছেন:

(ক) ছোট আলামত: যা কিয়ামত নিকটে হওয়া বুঝায়, আর তার সংখ্যাও অনেক। তন্মধ্যকার অধিকাংশ সংঘটিত না হলেও অনেকগুলো সংঘটিত হয়ে গেছে। যেমন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রেরণ। আমানতের খিয়ানত করা। মসজিদ অধিক মাত্রায় সাজ-সজ্জা ও তা নিয়ে গর্ব করা। বড় বড় অট্রালিকা নিয়ে রাখালদের গর্ব করা। ইয়াহূদীদের সাথে যুদ্ধ ও তাদের নিহত হওয়া। সময় নিকটবর্তী হওয়া, আমল কমে যাওয়া, ফিৎনা-ফাসাদ প্রকাশ পাওয়া, অধিক হত্যা হওয়া, ব্যভিচার ও অন্যায় কাজ অধিক মাত্রায় হওয়া। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ٱقۡتَرَبَتِ ٱلسَّاعَةُ وَٱنشَقَّ ٱلۡقَمَرُ ١﴾ [القمر: ١]

“কিয়ামত আসন্ন ও চন্দ্র বিদীর্ণ হয়েছে। [সূরা আল-ক্বামার-আয়াত-১]

(খ) বড় আলামত: যা কিয়ামতের পূর্ব মূহুর্তে সংঘটিত হবে এবং কিয়ামত শুরু হওয়ার সতর্ক করবে। এমন বড় আলামত দশটি। যার কোনো একটিও প্রকাশিত হয় নি।

বড় আলামতসমূহ হলো: ইমাম মাহদীর আগমন, দাজ্জালের আগমন, ঈসা আলাইহিস সালাম-এর আকাশ হতে ন্যায় বিচারক হিসাবে অবতরণ, তিনি খৃষ্টানদের ক্রুসেড ভেঙ্গে দিবেন, দাজ্জাল ও শুকুরকে হত্যা করবেন। জিযিয়া করের আইন রহিত করবেন। ইসলামী শরী‘আত অনুপাতে বিচার পরিচালনা করবেন। ইয়াজুজ, মাজুজ বের হবে। তাদের ধ্বংসের জন্য তিনি দো‘আ করবেন, অতঃপর তারা মারা যাবে। তিনটি বড় ভূমিকম্প হবে। পূর্বে একটি, পশ্চিমে একটি, জাযিরাতুল আরবে একটি। ধোঁয়া বের হবে, তা হলো আকাশ হতে প্রচণ্ড ধোঁয়া নেমে এসে সকল মানুষকে ঢেকে নিবে। কুরআন যমীন থেকে আকাশে তুলে নেওয়া হবে। পশ্চিম আকাশে সূর্য উদিত হবে। এক (অদ্ভুত) চতুস্পদ জন্তু বের হবে। ইয়ামানের আদন (জায়গার নাম) থেকে ভয়ানক আগুণ বের হয়ে মানুষদের শামের দিকে নিয়ে আসবে। এটাই সর্বশেষ বড় আলামত।

হুযাইফা ইবন আসীদ আল-গিফারী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে, ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেন। হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন,

«اطلع النبي r ونحن نتذاكر فقال: «ما تذكرون؟» قالوا: نذكر الساعة. قال: «إنها لن تقوم حتى تروا قبلها عشر آيات.فذكر: الدخان، والدجال، والدابة، وطلوع الشمس من مغربها ،ونزول عيسى بن مريم، ويأجوج، وثلاثة خسوف: خسف بالمشرق، وخسف بالمغرب، وخسف بجزيرة العرب، وآخرذلك نار تخرج من اليمن تطرد الناس إلى محشرهم».

“নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নিকট আগমন করলেন, এমতাবস্থায় আমরা এক বিষয় নিয়ে আলোচনা করছিলাম। তিনি বললেন তোমরা কি বিষয় আলোচনা করছ? তারা বললেন আমরা কিয়ামতের ব্যাপারে আলোচনা করছি। তিনি বললেন, কিয়ামত সংঘটিত হবে না যতক্ষণ না তোমরা তার পূর্বে দশটি আলামত সংঘটিত হতে দেখবে। অতঃপর আলামতসমূহ উল্লেখ করলেন, ধোঁয়া, দাজ্জাল, চতুস্পদ জন্তু, পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উঠা, ঈসা ইবন মারইয়াম এর আগমন, ইয়াজুজ-মাজুজের আগমন, তিনটি ভূমি কম্প- একটি প্রাচ্যে আর একটি পাশ্চাত্যে, আর একটি জাযিরাতুল আরবে, শেষ আলামত হল ইয়ামান থেকে আগুন বের হয়ে মানুষদেরকে হাশরের মাঠের দিকে নিয়ে যাবে। (সহীহ মুসলিম)

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন,

«يخرج في آخر أمتي المهدي، يسقيه الله الغيث، وتخرج الأرض نباتها، ويعطي المال صحاحاً، وتكثر الماشية، وتعظم الأمة، يعيش سبعاً، أو ثمانياً، يعني حججاً».

“আমার উম্মাতের শেষ ভাগে ইমাম মাহদী বের হবেন, তার ওপর আল্লাহ বৃষ্টি বর্ষন করবেন। যমীন উদ্ভিদ জন্ম দিবে। সুস্থ্য ও সচ্ছল লোকদের মাল প্রদান করা হবে। চতুস্পদ জানোয়ারের সংখ্যা বেড়ে যাবে। উম্মাতের সংখ্যা বেড়ে যাবে। তিনি সাত অথবা আট বছর বসবাস করবেন। (হাকেম)

বর্ণিত আছে যে, ঐ নিদর্শনগুলো পর্যায়ক্রমে সংঘটিত হবে, যেমন পুতির মালায় পুতি পর্যায়ক্রমে সাজানো থাকে। এগুলোর একটি সংঘটিত হওয়ার পর পরই অপরটি সংঘটিত হবে। এ দশটি নিদর্শন সংঘটিত হওয়ার পর পরই আল্লাহর আদেশে কিয়ামত সংঘটিত হবে।

কিয়ামত দ্বারা কি বুঝায়: কিয়ামত দ্বারা উদ্দেশ্য হল ঐ দিন, যে দিন মানুষ আল্লাহর আদেশে তাদের কবর থেকে বের হবে, হিসাব নিকাশের জন্য, অতঃপর সৎকর্মশীল সুফল ও শান্তি এবং অসৎ কর্মশীল কুফল ও শাস্তি প্রাপ্ত হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿يَوۡمَ يَخۡرُجُونَ مِنَ ٱلۡأَجۡدَاثِ سِرَاعٗا كَأَنَّهُمۡ إِلَىٰ نُصُبٖ يُوفِضُونَ ٤٣﴾ [المعارج: ٤٣]

 “সে দিন তারা কবর থেকে দ্রত বেগে বের হবে-যেন তারা কোনো এক লক্ষ্যস্থলের দিকে ছুটে যাচ্ছে।” [সূরা আল-মা‘আরিজ, আয়াত: ৪৩]

এ দিনের একাধিক নাম কুরআনে কারীমে উল্লেখ হয়েছে। যেমন,

(يوم القيامة) ইয়াওমুল ক্বিয়ামাহ, (القارعة) আল-ক্বারি‘আহ,

 (يوم الحساب) ইয়াওমুল হিসাব, ((يوم الدين ইয়াওমুদ্দিন, (الطامة) আত্ত্বামাহ, (الواقعة) আল-ওয়াক্বি‘আহ, (الحاقة) আল-হা-ক্কাহ, (الصاخة)

আসসাখখাহ, (الغاشية) আল-গাশিয়াহ ইত্যাদি।

(২) শেষ দিবসের ওপর ঈমান আনার নিয়ম:

শেষ দিবসের প্রতি সংক্ষিপ্ত ও বিস্তারিতভাবে ঈমান আনা:

শেষ দিবসের প্রতি সংক্ষিপ্ত ঈমা(يوم القيامة) ইয়াওমুল ক্বিয়ামাহ: আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿لَآ أُقۡسِمُ بِيَوۡمِ ٱلۡقِيَٰمَةِ ١ ﴾ [القيامة: ١]

“কিয়ামাত দিবসের শপথ।” [সূরা আল-ক্বিয়ামাহ, আয়াত: ১]

(القارعة) আল-ক্বারি‘আহ: আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ٱلۡقَارِعَةُ ١ مَا ٱلۡقَارِعَةُ ٢﴾ [القارعة: ١، ٢]

“(আল ক্বারিয়াহ) করাঘাতকারী, করাঘাতকারী কী? [সূরা আল-ক্বারি‘আহ, আয়াত: ১-২]

(يوم الحساب) ইয়াওমুল হিসাব: আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿إِنَّ ٱلَّذِينَ يَضِلُّونَ عَن سَبِيلِ ٱللَّهِ لَهُمۡ عَذَابٞ شَدِيدُۢ بِمَا نَسُواْ يَوۡمَ ٱلۡحِسَابِ ٢٦﴾ [ص: ٢٦]

“নিশ্চয় যারা আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত হয়, তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি, এ কারণে যে, তারা হিসাব দিবসকে ভুলে যায়।” [সূরা ছোয়াদ, আয়াত: ২৬]

(يوم الدين) ইয়াওমুদ দিন: আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَإِنَّ ٱلۡفُجَّارَ لَفِي جَحِيمٖ ١٤ يَصۡلَوۡنَهَا يَوۡمَ ٱلدِّينِ ١٥﴾ [الانفطار: ١٤، ١٥]

“এবং পাপিষ্টরা থাকবে জাহান্নামে, তারা বিচার দিবসে তথায় প্রবেশ করবে।” [সূরা আল- ইনফিতার, আয়াত: ১৪-১৫]

(الطّامة)আত্ত্বামাহ্: আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿فَإِذَا جَآءَتِ ٱلطَّآمَّةُ ٱلۡكُبۡرَىٰ ٣٤﴾ [النازعات: ٣٤]

“অতঃপর যখন মহাসংকট এসে যাবে।” [সূরা আন-নাযি‘আত, আয়াত: ৩৪]

(الواقعة) আল-ওয়াক্বি‘আহ: আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿إِذَا وَقَعَتِ ٱلۡوَاقِعَةُ ١﴾ [الواقعة: ١]

“যখন কিয়ামতের ঘটনা ঘটবে।” [সূরা আল-ওয়াকি‘আহ, আয়াত: ১]

(الحاقة) আল-হাক্কাহ: আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ٱلۡحَآقَّةُ ١ مَا ٱلۡحَآقَّةُ ٢﴾ [الحاقة: ١، ٢]

“সু-নিশ্চিত বিষয়, সু-নিশ্চিত বিষয় কী? [সূরা আল-হাক্কাহ, আয়াত: ১-২]

(الصّاخة) আস-সাখখাহ: আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿فَإِذَا جَآءَتِ ٱلصَّآخَّةُ ٣٣ ﴾ [عبس: ٣٣]

“অতঃপর যে দিন কর্ণ বিদারক আওয়াজ আসবে।” [সূরা আবাসা-আয়াত, ৩৩]

(الغاشية) আল-গাশিয়াহ: আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿هَلۡ أَتَىٰكَ حَدِيثُ ٱلۡغَٰشِيَةِ ١﴾ [الغاشية: ١]

“আপনার কাছে আচ্ছন্নকারী কিয়ামতের বৃত্তান্ত পৌঁছেছে কি? [সূরা আল-গাশিয়াহ, আয়াত: ১]

ন আনার পদ্ধতি হচ্ছে, এ বিশ্বাস পোষণ করা যে, এমন একটি দিন রয়েছে, যে দিন আল্লাহ তা‘আলা পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকলকে একত্রিত করবেন। প্রত্যেকেই স্ব-স্ব কর্মের প্রতিদান প্রদান করবেন। একদল জান্নাতী হবে, অপর দল জাহান্নামী হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿قُلۡ إِنَّ ٱلۡأَوَّلِينَ وَٱلۡأٓخِرِينَ ٤٩ لَمَجۡمُوعُونَ إِلَىٰ مِيقَٰتِ يَوۡمٖ مَّعۡلُومٖ ٥٠﴾ [الواقعة: ٤٩، ٥٠]

“বলুন, নিশ্চয় পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকলেই একটি নির্ধারিত দিনে একত্রিত হবে। [সূরা আল-ওয়াকি‘আহ, আয়াত: ৪৯-৫০]

আর শেষ দিবসের প্রতি বিস্তারিত ঈমান হলো, মৃত্যুর পর যা কিছু সংঘটিত হবে তার প্রতি বিস্তারিত ঈমান আনা।

আর তা নিম্নবর্ণিত বিষয়গুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে:

প্রথমত: ফিৎনাতুল কবর বা কবরের পরীক্ষা, আর তা হলো, মৃত ব্যক্তিকে দাফনের পর তাকে তার রব, দীন ও নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা বা প্রশ্ন করা হবে। অতঃপর যারা ঈমান এনেছিল, তাদেরকে আল্লাহ সত্যের ওপর অটল রাখবেন। যেমন হাদীসে এসেছে,

«ربي الله، وديني الإسلام ونبي محمدr ».

“যখন তাঁকে প্রশ্ন করা হবে, সে বলবে, আমার রব আল্লাহ, আমার দীন ইসলাম, আর আমার নবী হচ্ছেন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।” (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)

ফিরিশতাদ্বয়ের প্রশ্ন করা ও তাঁর পদ্ধতি, মুমিনরা ও মুনাফিকরা কি উত্তর দিবেন এ সম্পর্কে বর্ণিত সকল হাদীসের ওপর ঈমান আনা ওয়াজিব।

দ্বিতীয়ত: কবরের শাস্তি ও শান্তি: কবরের শাস্তি ও শান্তির ওপর ঈমান আনা ওয়াজিব। আর নিশ্চয় কবর জাহান্নামের গর্তের একটি গভীর গর্ত অথবা জান্নাতের বাগানের একটি বাগান। আর কবর আখিরাতের প্রথম

ধাপ বা স্টেশন। যে ব্যক্তি কবর থেকে মুক্তি পাবে (তার জন্য) কবরের পরের ধাপগুলো হতে মুক্তি পাওয়া সহজ হবে। আর যে ব্যক্তি কবর থেকে মুক্তি পাবে না তার জন্য এর পরের ধাপগুলোতে মুক্তি পাওয়া আরো কঠিন হবে। বস্তুত যার মৃত্যু হল তখন থেকে তার কিয়ামত শুরু হয়ে গেল। অতঃপর আত্মা ও শরীর, উভয়ে কবরে শাস্তি বা শান্তি ভোগ করবে। আর কখনো কখনো শুধু আত্মা তা ভোগ করবে। আর কবরের আযাব বা শাস্তি শুধুমাত্র যালেমদের জন্য, আর শান্তি শুধুমাত্র সত্যবাদী মুমিনদের জন্য।

আর মৃত ব্যক্তি কবর জীবনের শাস্তি অথবা শান্তি প্রাপ্ত হবে, চাই ভূগর্ভস্থ করা হোক বা না-ই হোক। যদিও মৃত ব্যক্তিকে আগুনে জালিয়ে দেওয়া হয়, অথবা পানিতে ডুবিয়ে দেওয়া হয় অথবা হিংস্র পশু পাখি খেয়ে ফেলে, তারপরও সে এ শাস্তি অথবা শান্তি ভোগ করবে।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ٱلنَّارُ يُعۡرَضُونَ عَلَيۡهَا غُدُوّٗا وَعَشِيّٗاۚ وَيَوۡمَ تَقُومُ ٱلسَّاعَةُ أَدۡخِلُوٓاْ ءَالَ فِرۡعَوۡنَ أَشَدَّ ٱلۡعَذَابِ ٤٦﴾ [غافر: ٤٦]

“সকালে ও সন্ধায় তাদেরকে আগুনের সামনে পেশ করা হয় এবং যেদিন কিয়ামত সংঘটিত হবে, সে দিন আদেশ করা হবে, ফেরাউন গোষ্ঠীকে কঠিনতর আযাবে দাখিল কর।” [সূরা গাফির, আয়াত: ৪৬]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«فلو لا أن لا تدافنوا لدعوت الله أن يسمعكم من عذاب القبر».

“হায়!! যদি তোমরা (তাদেরকে) দাফন না করার আশংকা না করতাম, তাহলে আমি আল্লাহর কাছে দো‘আ করতাম তোমাদেরকে কবরের আযাব শুনানোর জন্য।” (সহীহ মুসলিম)

তৃতীয়ত: শিঙ্গায় ফুৎকার: শিঙ্গা হল বাঁশীস্বরূপ; যাতে ইসরাফীল আলাইহিস সালাম ফুৎকার দিবেন। প্রথম ফুৎকার দেওয়ার সাথে সাথেই আল্লাহ যা জীবিত রাখবেন তা ছাড়া সকল সৃষ্টজীব মারা যাবে। দ্বিতীয় ফুৎকার দেওয়ার সাথে সাথেই পৃথিবী সৃষ্টি থেকে কিয়ামত পর্যন্ত যত সৃষ্টিজীবের আর্বিভাব হয়েছিল, তারা সকলেই উঠে যাবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَنُفِخَ فِي ٱلصُّورِ فَصَعِقَ مَن فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَمَن فِي ٱلۡأَرۡضِ إِلَّا مَن شَآءَ ٱللَّهُۖ ثُمَّ نُفِخَ فِيهِ أُخۡرَىٰ فَإِذَا هُمۡ قِيَامٞ يَنظُرُونَ ٦٨﴾ [الزمر: ٦٨]

“আর শিঙ্গায় ফুঁক দেওয়া হবে, ফলে আসমান ও জমিনে যারা আছে সকলে বেহুঁশ হয়ে যাবে, তবে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন সে ব্যতীত। অতঃপর আবার ফুৎকার দেওয়া হবে, তৎক্ষনাৎ তারা দণ্ডায়মান হয়ে দেখতে থাকবে।” [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৬৮]

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«ثم ينفخ في الصور فلا يسمعه أحد إلا أصغى ليتا ورفع ليتاً ثم لا يبقى أحد إلا صعق ،ثم ينزل الله مطرا كأنه الطل, فتنبت منه أجساد الناس, ثم ينفخ فيه أخرى فإذا هم قيام ينظرون».

“অতঃপর শিঙ্গায় ফুৎকার দেওয়ার সাথে সাথে সকলেই স্কন্ধ উচু করবে। অতঃপর সকলেই জ্ঞানহারা হয়ে পড়ে যাবে। তারপর আল্লাহ হালকা বৃষ্টি বর্ষণ করবেন। বৃষ্টি থেকে মানুষের দেহ তৈরি হবে। তারপর শিঙ্গায় দ্বিতীয় ফুৎকার দেওয়ার সাথে সাথেই সকলে দাঁড়িয়ে তাকাতে থাকবে।” (সহীহ মুসলিম)

চতুর্থত: পুনরুত্থান: আর তা হলো, শিঙ্গায় দ্বিতীয় ফুঁক দেওয়ার সময় আল্লাহ সকল মৃত্যদের জীবিত করবেন।

তারা সকলে সমগ্র বিশ্বের প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে দাঁড়িয়ে যাবে। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা শিঙ্গায় ফোঁক দেওয়া ও প্রত্যেক আত্মাকে স্ব-শরীরে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দিলে সকল মানুষ তাদের কবর থেকে দাঁড়িয়ে জুতা বিহীন, নাঙ্গা পা, বস্ত্র-বিহীন-উলঙ্গ শরীর, খাৎনা বিহীন ও দাঁড়ি-গোঁফ বিহীন অবস্থায় দ্রুত ময়দানের দিকে ছুটে যাবে।

ময়দানের অবস্থান দীর্ঘ হবে, সূর্য তাদের নিকটবর্তী হবে, সূর্যের উত্তাপ বেড়ে যাবে। এ উত্তপ্ত ও কঠিন অবস্থান দীর্ঘ হওয়ায় শরীর থেকে নির্গত ঘামে হাবু-ডুবু খাবে, কারো ঘাম পায়ের দু’ গিরা পর্যন্ত, কারো দু’ হাটু পর্যন্ত, কারো মাজা পর্যন্ত, কারো বক্ষ পর্যন্ত, কারো দু’ কাঁধ পর্যন্ত পৌঁছবে। আর কেউ-সম্পূর্ণভাবে হাবুডুবু খাবে, এ সব হলো তাদের (ভালো-মন্দ) কর্ম অনুপাতে।

পুনরুত্থান সত্য ও নিশ্চিত, যা ইসলামী শরী‘আহ, (কুরআন ও হাদীস) অনুভূতি শক্তি ও বুদ্ধি-বিবেক দ্বারা প্রমাণিত।

ইসলামী শরী‘আহ: এর স্বপক্ষে প্রমাণ কুরআনে অনেক আয়াত ও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে অনেক বিশুদ্ধ হাদীস রয়েছে। যেমন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿قُلۡ بَلَىٰ وَرَبِّي لَتُبۡعَثُنَّ﴾ [التغابن: ٧]

“বলুন, অবশ্যই হবে, আমার পালনকর্তার কসম, তোমরা নিশ্চয় পুনরুত্থিত হবে।” [সূরা আত-তাগাবুন, আয়াত: ৭]

তিনি আরো বলেন,

﴿كَمَا بَدَأۡنَآ أَوَّلَ خَلۡقٖ نُّعِيدُهُۥۚ﴾ [الانبياء: ١٠٤]

“যেভাবে আমরা প্রথমবার সৃষ্টি করেছিলাম, সেভাবে পুনরায় সৃষ্টি করব।” [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ১০৪]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«ثم ينفخ في الصور فلا يسمعه أحد إلا أصغى ليتاً ورفع ليتاُ، ثم لا يبقى أحد إلا صقع، ثم ينزل الله مطراً كأنه الطل أو الظل- شك الراوي- فتنبت أجساد الناسن ثم ينفخ فيه أخرى فإذا هم قيام ينظرون».

“অতঃপর শিঙ্গায় ফুঁক দেওয়ার সাথে সাথে সকলেই স্কন্ধ উচু করবে অতঃপর সকলেই জ্ঞানহারা হয়ে পড়ে যাবে। তারপর আল্লাহ হালকা বৃষ্টি বর্ষণ করবেন। বৃষ্টি থেকে মানুষের দেহ তৈরী হবে। তারপর শিঙ্গায় দ্বিতীয় ফুঁক দেওয়ার সাথে সাথেই সকলে দাঁড়িয়ে তাকাতে থাকবে।” (সহীহ মুসলিম)

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿قَالَ مَن يُحۡيِ ٱلۡعِظَٰمَ وَهِيَ رَمِيمٞ ٧٨ قُلۡ يُحۡيِيهَا ٱلَّذِيٓ أَنشَأَهَآ أَوَّلَ مَرَّةٖۖ وَهُوَ بِكُلِّ خَلۡقٍ عَلِيمٌ ٧٩﴾ [يس: ٧٨، ٧٩]

“বলে, কে জীবিত করবে অস্থিসমূহকে যখন সেগুলো গলে পচে যাবে? বলুন, যিনি প্রথমবার সেগুলোকে সৃষ্টি করেছেন, তিনিই জীবিত করবেন। তিনি সর্ব প্রকার সৃষ্টি সম্পর্কে অবগত।” [সূরা ইয়াসীন, আয়াত: ৭৮-৭৯]

অনুভূতি: অনুভূতি থেকে পুনরুত্থানের ওপর দলীল:

আল্লাহ তা‘আলা এই পৃথিবীতে অনেক মৃতকে জীবিত করে তাঁর বান্দাদেরকে দেখিয়েছেন। আর এ বিষয়ে সূরা বাক্বারায় পাঁচটি উপমা রয়েছে,

মূসা আলাইহিস সালামের সম্প্রদায় যাদেরকে আল্লাহ তাদের মৃত্যুর পর জীবিত করেছিলেন।

বনী ইসরাঈলের এক নিহত ব্যক্তিকে জীবিত করেছিলেন।

ঐ সম্প্রদায়কে জীবিত করেছিলেন, যারা মৃত্যুর ভয়ে নিজেদের গ্রাম ত্যাগ করেছিল।

ঐ ব্যক্তিকে জীবিত করেছিলেন, যে ব্যক্তি জনপদ দিয়ে অতিক্রম করেছিল,

ইবরাহীম আলাইহিস সালামের পাখিসমূহকে।

আক্বল: বা সুস্থ বিবেক থেকে পুনরুত্থানের দলীল:

আর তা দু’ভাবে হতে পারে:

(ক) আল্লাহ আসমান ও জমিন এবং এতদুভয়ের মধ্যে যা রয়েছে সকলকে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ আসমান যমীন প্রথমে সৃষ্টি করেছেন। যিনি প্রথম সৃষ্টির ওপর ক্ষমতাবান তিনি (তাকে) পূনরায় সৃষ্টি করার ব্যাপারে অপারগ নন।

(খ) জমিন শুষ্ক ও নির্জীব হয়ে যায়, অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা বৃষ্টি নাযিল করে জমিনকে সতেজ ও সজীব করে তুলেন, সর্ব প্রকার সবুজ-শ্যামল গাছ পালা উৎপন্ন হয়। সুতরাং যিনি এ মৃত জমিনকে জীবিত করতে সক্ষম তিনিই মৃতদের পূনরায় জীবিত করাতেও সক্ষম।

পঞ্চমত: হাশর, হিসাব-নিকাশ এবং প্রতিদান ও প্রতিফল

আমরা ঈমান আনবো যে, সকল দেহের হাশর নাশর হবে, তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে, তাদের মাঝে বিচারে ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত হবে এবং সকল সৃষ্টিজীবকে স্বীয় কৃত কর্মের প্রতিদান ও প্রতিফল প্রদান করা হবে।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَحَشَرۡنَٰهُمۡ فَلَمۡ نُغَادِرۡ مِنۡهُمۡ أَحَدٗا ٤٧ ﴾ [الكهف: ٤٧]

“আর আমরা তাদেরকে একত্রিত করব, অতঃপর তাদের কাউকে ছাড়ব না।” [সূরা আল-ক্বাহাফ, আয়াত: ৭৪]

তিনি আরো বলেন,

﴿فَأَمَّا مَنۡ أُوتِيَ كِتَٰبَهُۥ بِيَمِينِهِۦ فَيَقُولُ هَآؤُمُ ٱقۡرَءُواْ كِتَٰبِيَهۡ ١٩ إِنِّي ظَنَنتُ أَنِّي مُلَٰقٍ حِسَابِيَهۡ ٢٠ فَهُوَ فِي عِيشَةٖ رَّاضِيَةٖ ٢١﴾ [الحاقة: ١٩، ٢١]

“অতঃপর যার আমলনামা ডান হাতে দেওয়া হবে, সে বলবে, নাও, তোমরাও আমলনামা পড়ে দেখ। আমি জানতাম যে, আমাকে হিসাবের সম্মুখীন হতে হবে। অতঃপর সে সুখী জীবন-যাপন করবে।” [সূরা আল-হাক্কাহ, আয়াত: ১৯-২১]

তিনি আরো বলেন,

﴿وَأَمَّا مَنۡ أُوتِيَ كِتَٰبَهُۥ بِشِمَالِهِۦ فَيَقُولُ يَٰلَيۡتَنِي لَمۡ أُوتَ كِتَٰبِيَهۡ ٢٥ وَلَمۡ أَدۡرِ مَا حِسَابِيَهۡ ٢٦﴾ [الحاقة: ٢٥، ٢٦]

“অতঃপর যার আমলনামা তার বাম হাতে দেয়া হবে, সে বলবে, হায় আমায় যদি আমার আমলনামা না দেওয়া হতো। আমি যদি না জানতাম আমার হিসাব।” [সূরা আল-হাক্কাহ, আয়াত: ২৫-২৬]

আর হাশর হচ্ছে, মানুষদেরকে তাদের হিসাব-নিকাশের জন্য ময়দানে একত্রিত করা।

হাশর ও পুনরুত্থানের মধ্যে পার্থক্য: পুনরুত্থান হলো: দেহসমূহকে পুনরুজ্জীবিত করা। আর হাশর হলো, পুনরুত্থিত ব্যক্তিদেরকে অবস্থান ময়দানে একত্রিত করা।

হিসাব, নিকাশ ও প্রতিফল: আল্লাহু তা‘বারাকা ও তা‘আলা তাঁর বান্দাদেরকে তাঁর সামনে দাঁড় করাবেন ও তাদেরকে তাদের সম্পাদিত কর্ম সম্পর্কে অবগত করাবেন।

অতঃপর মুমিন মুত্তাকীদের হিসাব নিকাশ হলো, শুধুমাত্র তাদের নিকট তাদের কর্ম পেশ করা হবে। যাতে তারা তাদের ওপর আল্লাহর অনুগ্রহ বুঝতে পারে, যে অনুগ্রহ আল্লাহ তাদের নিকট থেকে দুনিয়াতে গোপন রেখেছিলেন। আর আল্লাহ আখিরাতে তাদেরকে মাফ করে দিয়েছেন। আর তাদের হাশর হবে তাদের ঈমান অনুপাতে। ফিরিশতারা তাদেরকে স্বাগত জানাবে ও জান্নাতে প্রবেশের সুসংবাদ প্রদান করবে, আর তাদেরকে অস্থিরতা ও সকল প্রকার ভয়-ভীতি এবং এ কঠিন দিনের ভয়াবহতা থেকে নিরাপত্তা দিবে, অতঃপর তাদের মূখমণ্ডল উজ্জ্বল হবে। আর তাদের মুখমণ্ডল সে দিন হাসি-খুশী, আনন্দ-উৎফুল্ল সুসংবাদ প্রাপ্ত হবে।

অতঃপর আল্লাহ বিমুখ মিথ্যাবাদীদের (কাফিরদের) হিসাব-নিকাশ অত্যন্ত কঠিনভাবে হবে। সুক্ষ্মাতিসুক্ষ্ম প্রত্যেকটি ছোট বড় কর্মের। কিয়ামত দিবসে তাদেরকে তাদের মুখের উপর টেনে হেঁচড়ে জাহান্নামে ফেলা হবে, তাদেরকে লাঞ্ছিত করার জন্য ও তাদের কৃত কর্মের ফল হিসাবে এবং তাদের মিথ্যা বলার কারণে।

কিয়ামত দিবসে সর্বপ্রথম হিসাব নেওয়া হবে আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উম্মাতের, তাদের সাথে সত্তর হাজার লোক তাদের পূর্ণ তাওহীদের বদৌলাতে বিনা হিসাবে ও বিনা শাস্তিতে জান্নাতে প্রবেশ করবে। তারা ঐ সকল লোক নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের ভাষায় যাদের গুণ বর্ণনা করেছেন, তারা কারো নিকট ঝাড়-ফুঁক অনুসন্ধান করেন নি, লৌহ জাতীয় কোনো কিছুর ছেঁক দিয়ে চিকিৎসা নেন নি। কোনো দিন কোনো কিছু থেকে কুলক্ষণ গ্রহণ করেন নি। আর তারা তাদের প্রভুর ওপর-ই ভরসা করতেন। তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন প্রসিদ্ধ সাহাবী উক্কাশা ইবন মিহসান রাদিয়াল্লাহু আনহু। আর বান্দার সর্বপ্রথম হিসাব নেওয়া হবে আল্লাহর হক্ব-সালাতের (নামাযের) আর মানুষের মাঝে সর্বপ্রথম ফায়সালা করা হবে রক্তপাতের।

ষষ্ঠত: হাউয

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাউযের ওপর ঈমান আনবো। আর তা বিশাল হাউয ও সম্মানিত অবতরণ স্থান। কিয়ামতের মাঠে জান্নাতের আল-কাউসার নামক নদী থেকে শরাব প্রবাহিত হবে। এতে অবতরণ করবে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুমিন উম্মাতেরা।

হাউযের কিছু বৈশিষ্ট্য: তার শারাব দুধের চাইতে সাদা, বরফের চাইতে ঠাণ্ডা, মধুর চাইতে অধিক মিষ্টি। মিশকের চাইতে সুগন্ধি, যা সুপ্রশস্ত, যার দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ সমান, এর প্রতিটি প্রান্তের আয়তন এক মাসের পথের সমান। এতে জান্নাত থেকে প্রবাহিত দু’টি নালা রয়েছে। আর এর পান-পাত্র আকাশের তারকারাজির চাইতে অধিক। যে ব্যক্তি তা থেকে একবার পানি পান করবে, সে আর কখনও পিপাসার্ত হবে না।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«حوضي مسيرة شهر، ماؤه أبيض من اللبن وريحه أطيب من المسك، وكيزانه كنجوم السماء، من شرب منه فلا يظمأ أبداً».

“আমার হাউযের আয়তন এক মাসের পথ সমতুল্য, তার পানি দুধের চাইতে সাদা ও তার ঘ্রাণ মিশকের চাইতে সুগন্ধি, তার পান-পাত্র আকাশের তারকারাজির সংখ্যার ন্যায়। যে ব্যক্তি তা থেকে একবার পানি পান করবে সে আর কখনও পিপাসার্ত হবে না।” (সহীহ বুখারী)

সপ্তমত: শাফাআহ

যখন সেই মহান প্রান্তরে মানুষের বিপদ কঠিন হয়ে দাঁড়াবে এবং সেথায় তাদের অবস্থান দীর্ঘ হবে। তখন তারা এ প্রান্তরের ভয়াবহ বিপদ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যে তাদের প্রভুর নিকট সুপারিশ পেশ করার প্রচেষ্টা চালাবে। রাসূলদের মধ্যে যারা উলুল আযম তথা উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন রাসূল যেমন, নূহ, ইবরাহীম, মূসা ও ঈসা আলাইহিমুস সালাম, তারা অপারগতা প্রকাশ করবেন, তখন সর্ব শেষ রাসূল আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইাহি ওয়াসাল্লাম (যার আগের ও পরের গুনাহ আল্লাহ মাফ করে দিয়েছেন) তার নিকটে সবাই পৌঁছবে। তখন নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য দাঁড়াবেন। তিনি এমন স্থানে দাঁড়াবেন যে স্থানে আগের ও পরের সকলেই তাঁর প্রশংসা করবে এবং এর দ্বারা তাঁর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহা সম্মান ও উঁচু মর্যাদা প্রকাশিত হবে। তারপর ‘আরশের নিচে সাজদায় পড়ে যাবেন, আল্লাহ তখন তাঁর নিকট আল্লাহর অনেক প্রশংসা ও উপযুক্ত আদেশ ইলহাম করবেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেগুলো দ্বারা আল্লাহর প্রশংসা করবেন ও তাঁর মর্যাদা বর্ণনা করবেন। তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর রবের নিকট (তাদের জন্য) সুপারিশ করার অনুমতি চাইবেন। আল্লাহ তা‘আলা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সৃষ্টিজীবের জন্য সুপারিশ করার অনুমতি দিবেন, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুপারিশ করবেন; যাতে বান্দাদের মাঝে অসহনীয় দুঃখ-কষ্ট ও চিন্তা ভোগের পর সুষ্ঠু ফায়সালা করা হয়।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«إن الشمس تدنو يوم القيامة حتى يبلغ العرق نصف الأذن فبينما هم كذلك، استغاثوا بآدم، ثم بإبراهيم، ثم بموسى، ثم بعسيى، ثم بمحمد- r-. فيشفع ليقضي بين الخلق، فيمشى حتى يأخذ بحلقة الباب، فيؤمئذ يبعثه الله مقاماً محموداً يحمده أهل الجمع كلهم».

“কিয়ামত দিবসে সূর্য নিকটে হবে। এমনকি ঘাম অর্ধ কান পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। তারা এই অবস্থাতেই থাকবে। ফলে তারা আদম আলাইহিস সালাম, অতঃপর ইবরাহীম আলাইহিস সালাম, অতঃপর মূসা আলাইহিস সালাম, অতঃপর ঈসা আলাইহিস সালাম, অতঃপর মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাধ্যমে এ অবস্থা থেকে উদ্ধারের জন্য আল্লাহর কাছে ধর্ণা দেওয়ার প্রার্থনা করবে।

অতঃপর মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুপারিশ করবেন; যাতে সৃষ্টিজীবের মাঝে ফায়সালা সুসম্পন্ন করা হয়। অতঃপর তিনি জান্নাতের দিকে অগ্রসর হবেন ও জান্নাতের দরজার কড়া (খোলার জন্য) ধরবেন। আল্লাহ তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রশংসিত স্থানে অবতরণ করাবেন। সে স্থানের প্রশংসা সকলে করবে”। (সহীহ বুখারী)

এ মহান শাফা‘আত আল্লাহ একমাত্র রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য নির্দিষ্ট করেছেন। এ ছাড়া তিনি আরো অনেক শাফা‘আতের অধিকারী হবেন।

(১) জান্নাতীদের জান্নাতে প্রবেশের অনুমতির জন্যে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শাফা‘আত।

তার প্রমাণ, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«آتي باب الجنة يوم القيامة فاستفتح،فيقول الخازن من أنت؟ قال فأقول محمد فيقول بك أمرت لا أفتح لأحد قبلك».

“আমি কিয়ামত দিবসে জান্নাতের দরজার নিকটে আসবো, দরজা খোলার অনুমতি চাবো। অতঃপর জান্নাতের প্রহরী বলবেন, আপনি কে? আমি উত্তরে বলব, আমি মুহাম্মাদ, অতঃপর প্রহরী বলবে, আপনার জন্যই শুধু দরজা খোলার আদেশ প্রাপ্ত হয়েছি, আপনার পূর্বে কারো জন্য (দরজা) খুলবো না।” (সহীহ মুসলিম)

(২) মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শাফা‘আত ঐ সকল ব্যক্তির জন্য, যাদের নেকী ও বদী বা সৎ কাজ ও অসৎ কাজ সমান হয়ে গেছে। তাদের জান্নাতে প্রবেশের ব্যাপারে তিনি শাফা‘আত করবেন। এ হচ্ছে কিছু আলেমের অভিমত। কিন্তু এ ব্যাপারে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরাম থেকে কোনো সহীহ হাদীস বর্ণিত হয় নি।

(৩) মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শাফা‘আত ঐ সম্প্রদায়ের জন্যে, যারা জাহান্নামের অধিকারী হয়ে গেছে, তাদেরকে জাহান্নামে না দেওয়ার ব্যাপারে। এর প্রমাণ হল, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস,

«شفاعتي لأهل الكبائر من أمتي».

“আমার উম্মাতের মধ্যে যারা কাবীরা গোনাহ করেছে তাদের জন্য আমার শাফা‘আত।” (আবূ দাউদ)

(৪) মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সে শাফা‘আত যা তিনি জান্নাতে জান্নাতীদের মর্যাদা বৃদ্ধির ব্যাপারে করবেন। তার প্রমাণ, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস,

«اللهم اغفر لأبي سلمة وارفع درجته في المهديين».

“হে আল্লাহ, আবূ সালামাকে মাফ কর এবং সঠিক পথপ্রাপ্তদের মাঝে তাঁর মর্যাদা বাড়িয়ে দাও।” (সহীহ মুসলিম)

(৫) মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শাফা‘আত ঐ সম্প্রদায়ের জন্য যারা জান্নাতে প্রবেশ করবে বিনা হিসাবে ও বিনা শাস্তিতে। এর প্রমাণ, উক্কাশাহ ইবন মিহসান রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীস, সত্তর হাজার লোকের ব্যাপারে, যারা বিনা হিসাবে ও বিনা শাস্তিতে জান্নাতে প্রবেশ করবে। অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার (উক্কাশাহ) জন্য দো‘আ করলেন,

«اللهم اجعله منهم».

“হে আল্লাহ তাকে (উক্কাশাকে) তাদের অন্তর্ভুক্ত করে দাও।” (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)

(৬) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উম্মাতের মধ্যে যারা কাবীরা গোনাহ করায় জাহান্নামে প্রবেশ করবে, তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করার ব্যাপারে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শাফা‘আত। এর প্রমাণ হলো, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস,

«شفاعتي لأهل الكبائر من أمتي».

“আমার উম্মাতের কাবীরা গোনাহকারীদের জন্য আমার শাফা‘আত।” (আবূ দাউদ)

তাছাড়া এ ব্যাপারে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আরো একটি হাদীস হলো,

«يخرج قوم من النار بشفاعة محمد-r- فيدخلون الجنة يسمون الجهنميين».

“একদল লোককে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শাফা‘আতে জাহান্নাম থেকে বের করা হবে, অতঃপর তারা জান্নাতে যাবে। তাদেরকে জাহান্নামী বলে নামকরণ করা হবে।” (সহীহ বুখারী)

(৭) যারা শাস্তির হক্বদার হবে তাদের শাস্তি হালকা করার ব্যাপারে তাঁর শাফা‘আত। যেমন, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চাচা আবু তালেবের জন্য শাফা‘আত। এর প্রমাণ, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস,

«لعله تنفعه شفاعتي يوم القيامة فيجعل في ضحضاح من النار يبلغ كعبيه يغلي منه دماغه».

“সম্ভবত কিয়ামতের দিবসে আমার শাফা‘আত তার শাস্তি লাঘবে উপকারে আসবে, তাই শাস্তি হিসাবে শুধু পায়ের গিরা পর্যন্ত দু’টি জুতা পরিয়ে দেয়া হবে, ফলে মাথার মগজ ফুটতে থাকবে।” (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)

তবে আল্লাহর নিকট শাফা‘আত গ্রহণ হওয়ার জন্য দু’টি শর্ত রয়েছে:

(ক) শাফা‘আতকারীর ও শাফা‘আতকৃত ব্যক্তির প্রতি আল্লাহর সন্তুষ্টি থাকতে হবে।

(খ) শাফা‘আতকারীর শাফা‘আত করার ব্যাপারে আল্লাহর অনুমতি থাকতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَلَا يَشۡفَعُونَ إِلَّا لِمَنِ ٱرۡتَضَىٰ﴾ [الانبياء: ٢٨]

“তারা শুধু তাদের জন্যে সুপারিশ করে, যাদের প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট।” [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ২৮]

তিনি আরো বলেন,

﴿مَن ذَا ٱلَّذِي يَشۡفَعُ عِندَهُۥٓ إِلَّا بِإِذۡنِهِۦۚ﴾ [البقرة: ٢٥٥]

“তাঁর (আল্লাহর) অনুমতি ব্যতীত সুপারিশ করার কে অধিকার রাখে? [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ২৫৫]অষ্টমত:মীযান: মীযান সত্য, তার ওপর ঈমান আনা ফরয। আর সে মীযান আল্লাহ কিয়ামত দিবসে স্থাপন করবেন, বান্দাদের আমল মাপার ও তাদের কর্মের প্রতিদান প্রদানের জন্য। এটি বাস্তব মীযান বা মানদণ্ড, কাল্পনিক নয়, এর দু’টি পাল্লা ও রশি রয়েছে, এর দ্বারা কর্ম অথবা আমলনামা অথবা স্বয়ং কর্ম সম্পাদনকারীকে মাপা হবে। সবই মাপা হবে, তবে ওজন ভারি-হালকার বিষয়বস্তু হবে শুধু কর্ম। কর্ম সম্পাদনকারী ও আমলনামা নয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَنَضَعُ ٱلۡمَوَٰزِينَ ٱلۡقِسۡطَ لِيَوۡمِ ٱلۡقِيَٰمَةِ فَلَا تُظۡلَمُ نَفۡسٞ شَيۡ‍ٔٗاۖ وَإِن كَانَ مِثۡقَالَ حَبَّةٖ مِّنۡ خَرۡدَلٍ أَتَيۡنَا بِهَاۗ وَكَفَىٰ بِنَا حَٰسِبِينَ ٤٧ ﴾ [الانبياء: ٤٧]

“আর আমরা কিয়ামত দিবসে ন্যায়বিচারের মীযানসমূহ স্থাপন করব। সুতরাং কারও প্রতি যুলুম হবে না। যদি কোনো আমল সরিষার দানা পরিমাণও হয় আমরা তা উপস্থিত করব এবং হিসাব গ্রহনের জন্য আমরাই যথেষ্ট।” [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ৪৮]

তিনি আরো বলেন,

﴿وَٱلۡوَزۡنُ يَوۡمَئِذٍ ٱلۡحَقُّۚ فَمَن ثَقُلَتۡ مَوَٰزِينُهُۥ فَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡمُفۡلِحُونَ ٨ وَمَنۡ خَفَّتۡ مَوَٰزِينُهُۥ فَأُوْلَٰٓئِكَ ٱلَّذِينَ خَسِرُوٓاْ أَنفُسَهُم بِمَا كَانُواْ بِ‍َٔايَٰتِنَا يَظۡلِمُونَ ٩﴾ [الاعراف: ٨، ٩]

“আর সে দিন যথার্থই ওজন হবে। অতঃপর যাদের পাল্লা ভারি হবে, তারাই সফলকাম হবে এবং যাদের পাল্লা হাল্কা হবে, তারাই এমন হবে, যারা নিজেদের ক্ষতি করেছে। কেননা, তারা আমার আয়াতসমূহ অস্বীকার করতো।” [সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ৮-৯]

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«الطهور شطر الإيمان، والحمد لله تملأ الميزان».

“পবিত্রতা অর্জন করা ঈমানের অর্ধেক। আল-হামদুলিল্লাহ্ (সকল প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য) বাক্যটি ওজনের পাল্লাকে পরিপূর্ণ করে দেয়।” (সহীহ মুসলিম)

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন,

«يوضع الميزان يوم القيامة فلو وزن فيه السماوات والأرض لوسعت».

“কিয়ামত দিবসে এমন মীযান স্থাপন করা হবে, তাতে যদি সাত আসমান ও সাত যমীনও মাপা হয় তবে তাও তাতে জায়গা হবে”।

নবমত: আসসিরাত বা পুল সিরাত:

আর আমরা পুল সিরাতের ওপর ঈমান আনবো। আর তা হলো জাহান্নামের পিঠের উপর স্থাপিত পুল, যা ভয়-ভীতি সন্ত্রস্ত অতিক্রম স্থল বা পথ। এর উপর দিয়ে মানুষ জান্নাতের দিকে অতিক্রম করবে। কেউ অতিক্রম করবে চোখের পলকের ন্যায়। কেউ অতিক্রম করবে বিজলীর ন্যায়। কেউ বাতাসের ন্যায়। কেউ পাখির ন্যায়। কেউ ঘোড়ার ন্যায় চলবে। কেউ মুসাফিরের ন্যায় চলবে। কেউ ঘন ঘন পা রেখে চলবে। সর্বশেষ যারা অতিক্রম করবে তাদেরকে টেনে ফেলা হবে। সকলেই অতিক্রম করবে তাদের কর্মের ফলাফল অনুপাতে। এমনকি যার আলো তার পায়ের বৃদ্ধা আঙ্গুলের পরিমাণ হবে সেও অতিক্রম করবে। কাউকে থাবা মেরে জাহান্নামে ফেলে দেওয়া হবে। আর যে ব্যক্তি পুল সিরাত অতিক্রম করতে পারবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।

সর্বপ্রথম আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অতঃপর তাঁর উম্মাত পুলসিরাত পাড়ি দিবেন। আর সে দিন একমাত্র রাসূলগণ কথা বলবেন। রাসূল (আলাইহিমুস সালাম) দের কথা হবে (اللهم سلم سلم) “হে আল্লাহ মুক্তি দাও, মুক্তি দাও।

জাহান্নামে পুলসিরাতের দু’ধারে হুকের ন্যায় কন্টক থাকবে, এর সংখ্যা আল্লাহ ছাড়া কেহ্ জানে না। সৃষ্টি-জীব থেকে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করবেন তাকে থাবা মেরে (জাহান্নামে) ফেলে দেওয়া হবে।

পুলসিরাতের কিছু বর্ণনা:

তা তরবারীর চাইতে ধারালো, আর চুলের চাইতে সূক্ষ্ম ও পিচ্ছিল জাতীয়। এতে আল্লাহ যাদের পা স্থির রাখবেন, শুধুমাত্র তাদেরই পা স্থির থাকবে, আর তা অন্ধকারে স্থাপিত হবে। আমানত ও আত্মীয়তার বন্ধনকে পুলসিরাতের দু’পার্শে দণ্ডায়মান অবস্থায় রাখা হবে, যারা তা সংরক্ষণ করেছেন তাদের সপক্ষে, আর যারা সংরক্ষণ করে নি তাদের বিপক্ষে সাক্ষী দেওয়ার জন্য।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَإِن مِّنكُمۡ إِلَّا وَارِدُهَاۚ كَانَ عَلَىٰ رَبِّكَ حَتۡمٗا مَّقۡضِيّٗا ٧١ ثُمَّ نُنَجِّي ٱلَّذِينَ ٱتَّقَواْ وَّنَذَرُ ٱلظَّٰلِمِينَ فِيهَا جِثِيّٗا ٧٢﴾ [مريم: ٧١، ٧٢]

“তোমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই, যে তথায় (পুলসিরাতে) পৌঁছবে না, এটা আপনার রবের অনিবার্য ফায়সালা। অতঃপর আমরা তাকওয়ার অধিকারীদেরকে উদ্ধার করব এবং যালিমদেরকে সেখানে নতজানু অবস্থায় ছেড়ে দিব।” [সূরা মারইয়াম, আয়াত: ৭১-৭২]

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«ويضرب الصراط بين ظهراني جنهم فأكون أنا وأمتي أول من يجيزه».

“জাহান্নামের পিঠের উপর পুলসিরাত স্থাপন করা হবে, আর সর্বপ্রথম আমি ও আমার উম্মাত তা অতিক্রম করবো।” (সহীহ মুসলিম)

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন,

«ويضرب جسر جهنم..فأكون أول من يجيز ودعاء الرسل يومئذ اللهم سلم سلم».

“জাহান্নামের পুল স্থাপন করা হবে, অতঃপর আমিই সর্বপ্রথম অতিক্রম করবো। আর সে দিন রাসূলদের দো‘আ হবে, আল্লাহুম্মা সাল্লিম, সাল্লিম, (হে আল্লাহ! মুক্তি দাও, মুক্তি দাও)।” (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)

আবু সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,

«بلغني أن الجسر أدق من الشعر وأحد من السيف».

“আমি সংবাদপ্রাপ্ত হয়েছি যে, পুলসিরাত চুলের চাইতে সূক্ষ্ম আর তরবারীর চাইতে ধারালো হবে।” (সহীহ মুসলিম)

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«وترسل الأمانة والرحم فتقوم على جنبي الصراط يميناً وشمالاً، فيمر أولكم كالبرق… ثم كمر الريح، ثم كمر الطير وشد الرحال، تجزي بهم أعمالهم، ونبيكم قائم على الصراط يقول: رب سلم سلم، حتى تعجز أعمال العباد، حتى يجئ الرجل فلا يستطيع السير إلا زحفاً قال وعلى حافتي الصراط كلاليب معلقة مأمورة بأخذ من أمرت به فمخدوش ناج ومكدوس في النار».

“আমানত ও আত্মীয়তার বন্ধনকে প্রেরণ করা হবে, অতঃপর পুল সিরাতের ডানে ও বামে দাঁড়াবে, তোমাদের মধ্যে সর্বপ্রথম যারা অতিক্রম করবে, তারা বিজলীর ন্যায় অতিক্রম করবে, তারপর যারা অতিক্রম করবে তারা বাতাসের ন্যায়। তারপর পাখির ন্যায় অতিক্রম করবে, তারপর মুসাফিরের ন্যায় অতিক্রম করবে, তাদের কর্ম তাদেরকে অতিক্রম করাবে। আর তোমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুল সিরাতের পার্শ্বে দণ্ডায়মান থাকবেন এবং বলবেন, হে প্রভু মুক্তি দাও, মুক্তি দাও। এভাবে বান্দাদের কর্ম অপারগ হয়ে যাবে, এমন কি কিছু লোক হামাগুড়ি দিয়ে অতিক্রম করবে। পুলসিরাতের দু’ধারে ঝুলন্ত হুকের ন্যায় কন্টক থাকবে, যাদেরকে গ্রেফতার করার আদেশপ্রাপ্ত হয়েছে তাদেরকে গ্রেফতার করবে। অতঃপর কিছু আহত হয়ে মুক্তি পাবে আর কিছু চাপাচাপি করে জাহান্নামে পড়ে যাবে। (সহীহ মুসলিম)

দশমত: আল-কানত্বারাহ

আমরা ঈমান আনবো এ কথার প্রতি যে, মু‘মিনেরা পুলসিরাত অতিক্রম করে কানত্বারাতে অবস্থান করবে বা দাঁড়াবে। আর তা (কানত্বারাহ্) হলো জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যবর্তী স্থান, এখানে ঐ সকল মুমিনদেরকে দাঁড় করানো হবে, যারা পুলসিরাত অতিক্রম করে এসেছে এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেয়েছে, জান্নাতে যাওয়ার পূর্বে একে অপরের কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণের জন্যে (এখানে দাঁড় করানো হবে)। অতঃপর তাদের পরিশুদ্ধির পর জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«يخلص المؤمنون من النار فيحبسون على قنطرة بين الجنة والنار، فيقتص لبعضهم من بعض مظالم كانت بينهم في الدنيا حتى إذا هذبوا ونقوا أذن لهم في دخول الجنة، فوالذي نفس محمد بيده لأحدهم أهدى بمنزله في الجنة منه بمنزله كان في الدنيا».

“মুমিনরা জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে, তারপর তাদেরকে জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যবর্তী কানত্বারাহ্ নামক স্থানে আটকানো হবে। তারপর দুনিয়াতে তাদের মাঝে যে যুলুম নির্যাতন ঘটেছিল একে অপরের পক্ষ থেকে তার প্রতিশোধ গ্রহণ করা হবে। যখন তারা এসব থেকে মুক্ত হবে তখন তাদেরকে জান্নাতে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে। অতঃপর শপথ সেই সত্তার যার হাতে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রাণ, নিশ্চয় তাদের প্রত্যেকের দুনিয়ার বাসস্থান থেকে জান্নাতের বাসস্থান অধিক উত্তমভাবে চিনে নিতে সমর্থ হবে।” (সহীহ বুখারী)

একাদশতম: জান্নাত ও জাহান্নাম

আমরা ঈমান আনবো যে, জান্নাত ও জাহান্নাম সত্য, এ দু’টি (জান্নাত ও জাহান্নাম) বর্তমানে বিদ্যমান রয়েছে, আর তা কখনো ধ্বংস হবে না, নিঃশেষও হবে না, বরং সর্বদা থাকবে। আর জান্নাতবাসীদের নি‘আমত শেষ ও ঘাটতি হবে না, অনুরূপ জাহান্নামীদের মধ্যে যার ব্যাপারে আল্লাহ চিরস্থায়ী শাস্তির ফায়সালা করেছেন তার শাস্তি কখনও বিরত ও শেষ হবে না।

তবে তাওহীদপন্থীরা, আল্লাহর রহমতে ও শাফা‘আতকারীদের শাফা‘আতে জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবেন।

আর জান্নাত হল, অতিথিশালা, যা আল্লাহ কিয়ামতে মুত্তাকীদের জন্য তৈরি করে রেখেছেন। সেখানে রয়েছে প্রবাহিত নদী উন্নত ও সুউচ্চ কক্ষ, মনোলোভা রমণীগণ। তথায় আরো রয়েছে মনঃপূত-মনোহর সামগ্রী যা কোনো দিন কোনো চক্ষু দেখে নি, কোনো কর্ণ শ্রবণ করে নি, আর কোনো মানুষের অন্তরেও কোনো দিন কল্পনায় আসে নি।

জান্নাতের নি‘আমত চিরস্থায়ী, কোনো দিন শেষ হবে না। জান্নাতে চাবুক সমতুল্য জায়গা দুনিয়া ও দুনিয়ার সব কিছুর চেয়ে উত্তম।

আর জান্নাতের সুগন্ধি চল্লিশ বৎসর দূরত্বের রাস্তা থেকে পাওয়া যাবে। জান্নাতে মুমিনদের জন্য সব চাইতে বড় নি‘আমত হলো আল্লাহকে সরাসরি স্বচক্ষে দর্শন লাভ করা।

কিন্তু কাফিররা আল্লাহর দর্শনলাভ থেকে বঞ্চিত হবে: আর যারা মুমিনদের জন্য তাদের রবের দর্শনকে অস্বীকার করলো সে বস্তুতঃ এ বঞ্চিত হওয়াতে মুমিনদেরকে কাফিরদের ন্যায় মনে করলো। আর জান্নাতে একশতটি ধাপ রয়েছে, এক ধাপ থেকে অপর ধাপের দূরত্ব আসমান থেকে জমিনের দূরত্ব অনুরূপ। আর সবচেয়ে উন্নত ও উত্তম জান্নাত হল, জান্নাতুল ফিরদাউস আল-আ‘লা। এর ছাদ হলো আল্লাহর ‘আরশ। আর জান্নাতের আটটি দরজা রয়েছে, প্রত্যেক দরজার পার্শ্বের দৈর্ঘ্য ‘মক্কা’ থেকে ‘হাজর’ এর দূরত্বের সমান। আর এমন দিন আসবে যে দিনে তা ভীড়ে পরিপূর্ণ হবে, আর জান্নাতে নূন্যতম মর্যাদার অধিকারী যে হবে তার জন্য দুনিয়া ও আরো দশ দুনিয়ার পরিমাণ জায়গা হবে।

আল্লাহ তা‘আলা জান্নাত সম্পর্কে বলেন,

﴿أُعِدَّتۡ لِلۡمُتَّقِينَ ١٣٣﴾ [ال عمران: ١٣٣]

“মুত্তাকীদের জন্য তৈরী করা হয়েছে।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৩৩]

এই বইটির সকল আর্টিকেল পড়তে নিচের লিংক গুলো ক্লিক করুন

প্রথম রুকন: মহান আল্লাহর ওপর ঈমান

দ্বিতীয় রুকন: ফিরিশতাদের ওপর ঈমান

তৃতীয় রুকন: আসমানী গ্রন্থসমূহের ওপর ঈমান

চতুর্থ রুকন: রাসূলদের ওপর ঈমান

পঞ্চম রুকন: শেষ দিবসের ওপর ঈমান

ষষ্ঠ রুকন: তাকদীরের ওপর ঈমান