মূল:ইসলামী সভ্যতা ও সংস্কৃতি

আবুল কালাম আযাদ আনোয়ার

আখতারুজ্জামান মুহাম্মদ সুলাইমান

সম্পাদনা : ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

সচ্চরিত্রতা বলতে বুঝায়, ‘হারাম ও অসুন্দর কাজ থেকে নিজেকে সংরক্ষণ করা।’

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাগণকে সচ্চরিত্রবান হওয়ার আদেশ করতেন। আবু সুফিয়ান রা. থেকে বর্ণিত, হিরাক্লিয়াস বাদশা তাকে নবী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন, নবী তোমাদেরকে কি করার আদেশ দেয়? আমি বললাম তিনি বলেন―‘তোমরা এক আল্লাহর ইবাদত কর, তার সাথে কাউকে শরিক করো না। তোমাদের পূর্বপুরুষ যা বলতেন তোমরা তা ছেড়ে দাও। আর আমাদেরকে সালাত, সততা ও সচ্চরিত্র ও আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখার আদেশ করেন।’

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রভুর নিকট দো‘আ করতেন—

«اللهـم إنى أسألك الهدى والتقى والعفاف والغنى».

হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট হেদায়েত, তাকওয়া, সচ্চরিত্র ও অভাব-মুক্তির প্রার্থনা করছি।

সচ্চরিত্রের প্রকারসমূহ:

(১) হারাম খাওয়া থেকে বিরত থাকা: এটি ওয়াজিব। এর উপকারিতা হলো, জাহান্নাম থেকে মুক্তি। কেননা, যে দেহ হারাম দ্বারা লালিত হয় তার জন্য জাহান্নামই উপযুক্ত স্থান। হারাম খাদ্য থেকে বেঁচে থাকলে দো‘আ কবুল হয় এবং আল্লাহ বিশেষভাবে তাকে হেফাযত করেন।

(২) ভিক্ষাবৃত্তি থেকে বিরত থাকা : আল্লাহ তা‘আলা বলেন—

﴿لَا يَسۡ‍َٔلُونَ ٱلنَّاسَ إِلۡحَافٗاۗ﴾ [البقرة: ٢٧٣]

তারা মানুষের কাছে কাকুতি-মিনতি করে ভিক্ষা চায় না।[1]

আউফ ইবনে মালেক রহ. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সহ কয়েকজন সাহাবিকে বললেন: ألا تبايعـــون؟ তোমরা কী বাই‘আত গ্রহণ করবে না? সাহাবিগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল আমরা তো বাই‘আত গ্রহণ করেছি। নতুন করে কোনো বিষয়ে আপনার হাতে বাইআত গ্রহণ করব? তিনি বললেন, তোমরা মানুষের নিকট কিছু চেওনা।

উপকারিতা :

আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো কাছে আশ্রয় না নেওয়া।

তাঁর উপর সত্যিকারার্থে ভরসা করা।

নিজের সম্মান রক্ষা করা।

সৃষ্টির কাছে ভিক্ষা করার লাঞ্ছনা থেকে নিজেকে হেফাযত করা।

সচ্চরিত্রতার ক্ষেত্রে মানুষের প্রকারভেদ:

এক্ষেত্রে মানুষ কয়েক ভাগে বিভক্ত। সকলে এক পর্যায়ের নয়। কারো ক্ষেত্রে ভিক্ষা না করা ওয়াজিব। যেমন প্রয়োজন না হলে সম্পদ না চাওয়া। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি সম্পদ বাড়ানোর জন্যে মানুষের নিকট ভিক্ষা চায়, সে যেন আগুনের জ্বলন্ত কয়লা চাইল। অতএব, তা কম করুক বা বেশি করুক সেটা তার ইচ্ছা।

কারো কারো ক্ষেত্রে চাওয়া ত্যাগ করা ওয়াজিব নয়। তাদের ক্ষেত্রে চাওয়া ত্যাগ করা মর্যাদার বিষয়। যেমন ইতোপূর্বে উল্লেখিত আউফ ইবনে মালেকের বর্ণনায় এসেছে,

«فلقـد رأيت بعض أولئك النفر يسقط سوط أحدهم فما يسأل أحداً يناوله إياه».

‘আমি তাদের কাউকে কাউকে দেখেছি ঘোড়ায় আরোহিত অবস্থায় হাতের লাঠি পড়ে গেলে, তা উঠিয়ে দেওয়ার জন্যে অন্য কাউকে বলতেন না।’

(৩) গোপনাঙ্গের পবিত্রতা : এর উদ্দেশ্য হচ্ছে অশ্লীল কাজ ও উপকরণ থেকে গোপনাঙ্গ সংরক্ষণ করা। এটি ওয়াজিব। আল্লাহ বলেন―

﴿ وَلۡيَسۡتَعۡفِفِ ٱلَّذِينَ لَا يَجِدُونَ نِكَاحًا﴾ [النور: ٣٣] 

‘যারা বিবাহ করতে পারে না, তারা যেন নিজেদেরকে হেফাযত করে।[2]

তিনি আরো বলেন―

﴿ قُل لِّلۡمُؤۡمِنِينَ يَغُضُّواْ مِنۡ أَبۡصَٰرِهِمۡ وَيَحۡفَظُواْ فُرُوجَهُمۡۚ ذَٰلِكَ أَزۡكَىٰ لَهُمۡۚ إِنَّ ٱللَّهَ خَبِيرُۢ بِمَا يَصۡنَعُونَ ٣٠ ﴾ [النور: ٣٠] 

‘(হে নবী) আপনি মুমিন পুরুষদের বলেন, তারা যেন নিজেদের দৃষ্টি নিচু করে রাখে এবং তাদের গোপনাঙ্গ হেফাযত করে। এটাই তাদের জন্যে পবিত্র পন্থা। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা তাদের কর্ম সম্পর্কে অধিক জ্ঞাত।[3]

উপকারিতা :

গোপনাঙ্গের হেফাযতকারীকে আল্লাহ তা‘আলা আরশের নীচে ছায়া দেবেন : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন―

«سـبعة يظلهم الله في ظله يوم لا ظل إلا ظله …. ورجل دعته امرأة ذات منصب وجمال، فقال : إني أخاف الله».

‘সাত প্রকার ব্যক্তিকে আল্লাহ তা‘আলা আরশের নীচে ছায়া দেবেন। তাদের মাঝে ঐ ব্যক্তিও অন্তর্ভুক্ত যাকে কোনো সুন্দরী সম্ভ্রান্ত পরিবারের নারী কু-কর্মের দিকে আহ্বান করলে সে বলে, আমি আল্লাহকে ভয় করি।

জান্নাতে প্রবেশের মাধ্যম : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি দুই চোয়ালের মধ্যকার মুখ ও দুই পায়ের মধ্যকার গুপ্তাঙ্গ হেফাজতের জিম্মাদার হলো, আমি তার জান্নাতে প্রবেশের দায়িত্ব নিলাম।

 

গোপনাঙ্গ হেফাযতের উপকরণসমূহ :

দৃষ্টির হেফাযত।

যৌবনে পদার্পণের সাথে সাথে দ্রুত বিবাহ।

বিবাহে অপারগ হলে সিয়াম সাধনা।

নারীর পূর্ণ হিজাব গ্রহণ।

বেশির ভাগ সময় ঘরে অবস্থান। আল্লাহ তা‘আলা বলেন :―

﴿ وَقَرۡنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجۡنَ تَبَرُّجَ ٱلۡجَٰهِلِيَّةِ ٱلۡأُولَىٰۖ﴾ [الاحزاب: ٣٣]

“আর তোমরা (নারীরা) ঘরে অবস্থান কর এবং জাহেলী যুগের নারীদের মত খোলামেলা চলাফেরা কর না।”[4]

অপরিচিত নারীর সাথে নির্জনে অবস্থান না করা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : إياكم والدخول على النـــساء ‘‘তোমরা নারীদের নিকট প্রবেশ করার ব্যাপারে সতর্ক থাক।’’

কোন নারীর সাথে মুসাফাহা না করা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : إني لا أصافح النـــساء ‘‘আমি নারীর সাথে মুসাফাহা করি না।’’

পুরুষ-নারী একসাথে মেলামেশা না করা।

অশ্লীলতার দিকে ধাবিত করে এমন সকল কথা ও কাজ থেকে দূরে থাকা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন—

﴿ وَلَا تَقۡرَبُواْ ٱلزِّنَىٰٓۖ﴾ [الاسراء: ٣٢] 

‘আর তোমরা ব্যভিচারের নিকটবর্তী হয়ো না।’

অশ্লীল কথা বা কাজের কথা শোনা, অশালীন বস্তুর প্রতি দৃষ্টিপাত, অশ্লীল ছবি বা সিনেমা দেখা, অশ্লীল কিছু পাঠ করা―এ সবই আয়াতের নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত।

সচ্চরিত্রতা ও পবিত্র থাকার বিষয়টিতে দুর্বলতা আসার কারণসমূহ :

অভিভাবক ও মুরব্বীগনের পক্ষ থেকে যথাযথ লালন-পালন ও নজরদারি দুর্বল হওয়া।

হারাম বস্তুর প্রতি অবাধে দৃষ্টিপাত। এটি ফিতনার সবচেয়ে বড় কারণ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, فزنا العينين النظر ‘চোখের ব্যভিচার হলো দৃষ্টিপাত।’

জারীর ইবনে আব্দুল্লাহ রা. বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আকস্মিক দৃষ্টি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি আমাকে তাৎক্ষণিকভাবে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতে বললেন।

বুরাইদা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : হে আলী, তুমি প্রথম দৃষ্টির পর দ্বিতীয়বার দৃষ্টি দিয়ো না। প্রথমটি তোমার জন্যে জায়েয বটে, কিন্তু দ্বিতীয়টির অধিকার নেই।

যুবক-যুবতীদের দেরি করে বিবাহ দেওয়া।

এমন দেশে ভ্রমণ করা, যেখানে বেহায়া ও উলঙ্গপনার সয়লাব রয়েছে।

অপরিচিত নারীর সাথে মেলামেশা ও নির্জনবাসের ব্যাপারে অবহেলা করা। পূর্বসুরীগণ এ ব্যাপারে যথেষ্ট সতর্ক করতেন। উবাদা ইবনে সামেত রা. ছিলেন একজন বয়োজ্যাষ্ঠ আনসারী সাহাবি। তিনি বলেন―তোমরা দেখ না আমি অন্যের সাহায্য ব্যতীত দাঁড়াতে পারি না এবং নরম খাবার ব্যতীত খেতে পারি না। আমার সাথি (পুরুষাঙ্গ) অনেকদিন হল মরে গিয়েছে। সারা পৃথিবীর বিনিময়ে হলেও কোনো অপরিচিত নারীর সাথে নির্জনে থাকা আমার পছন্দ হয় না। কেননা শয়তান হয়তোবা আমার জিনিসটিকে নাড়া দিতে পারে।

যে ব্যক্তি নিজে পবিত্র থাকতে চায় না এবং সমাজকে কলুষমুক্ত রাখতে চায় না এমন লোকের সাথে উঠা-বসা করা। অতএব, এ ধরনের লোকদের সঙ্গ ত্যাগ করে ভালো লোকদের সঙ্গ তালাশ করা উচিত।

অধিক অবসর। তাই দ্বীন-দুনিয়ার উপকার হয়, এমন কাজে নিজেকে সর্বদা নিয়োজিত রাখা উচিত। যাতে শয়তানি চিন্তা-ভাবনা আক্রমণ করতে না পারে।

সর্বশেষ কথা হলো, শরিয়তের হুকুম আহকাম ছেড়ে দেওয়াই হলো চারিত্রিক দুর্বলতার সবচেয়ে বড় কারণ।

গোপনাঙ্গ সংরক্ষণের সু-ফল :

চরিত্রবান ব্যক্তির জান্নাতে প্রবেশের দায়িত্ব রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর।

কেয়ামতের ময়দানে আল্লাহ তা‘আলার ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ।

ব্যক্তির পবিত্রতা তার পরিবার ও মাহরাম আত্মীয়দের পবিত্রতার কারণ। যে ব্যক্তি হারামে লিপ্ত হয়, তার নিজের ও পরিবারের উপর যে কোনো সময় এর খারাপ পরিণতি নেমে আসতে পারে।

ধ্বংসাত্মক রোগ, ফাসাদ, আপদ-বিপদ ও অনিষ্ট থেকে সমাজ নিরাপদ থাকার বড় মাধ্যম হলো চারিত্রিক পবিত্রতা।

সাধারণ ও বিশেষ শাস্তি এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টি থেকে দূরে থাকার মাধ্যম পবিত্রতা।

 


[1] সূরা আল-বাকারাহ: ২৭৩।

[2] সূরা আন-নূর: ৩৩।

 

[4] সূরা আল-আহযাব: ৩৩।