ড. মুহাম্মদ ইবন আব্দুল্লাহ ইবন সালেহ আস-সুহাইম

অনুবাদক : জাকেরুল্লাহ আবুল খায়ের  সম্পাদনা : প্রফেসর ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

প্রত্যেক ধর্মাবলম্বী বিশ্বাস করে, একমাত্র তার ধর্মই সত্য এবং প্রত্যেক ধর্মের অনুসারীরা মনে করে যে, তাদের ধর্মই সর্বশ্রেষ্ঠ ও অধিকতর সঠিক পথ। আপনি যখন বিকৃত অথবা মানবরচিত ধর্মের অনুসারীদের নিকট তাদের বিশ্বাসের সপক্ষে দলীল জানতে চাইবেন তখন তারা যুক্তি পেশ করে যে, তারা তাদের বাপ-দাদাদেরকে এ পদ্ধতির ওপর পেয়েছে, সুতরাং তারা তাদের পদাঙ্ক অনুসরণকারী। অতঃপর তারা বিভিন্ন প্রকার ঘটনা ও সংবাদ বর্ণনা করে যার সূত্র বিশুদ্ধ নয় এবং তার মূল অংশ (আসল ঘটনা) দোষ ত্রুটি ও নিন্দা থেকে মুক্ত নয়। আর তারা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এমন সব কিতাবের ওপর নির্ভর করে, যেগুলো কে বলেছে, কে লেখেছে, প্রথম তা কোন ভাষায় লেখা হয়েছিল, কোন দেশে তা পাওয়া গিয়েছিল, তা জানা যায় না। বরং এগুলো মিশ্রিত ও বিজড়িত কিছু গল্প-কাহিনী যা একত্রিত করা হয়েছিল, তারপর সেটাতে মহত্ব চাপিয়ে দেয়া হয়, অতঃপর সূত্র পরীক্ষা করা, ভাষ্য সংরক্ষণের জন্য  জ্ঞানসম্মত তদন্ত ছাড়াই প্রজন্মের পর প্রজন্ম সেটি ধারণ করে আসছে।

এ সমস্ত অজ্ঞাত কিতাবাদী, গল্প কাহিনী এবং অন্ধ অনুকরণ দীন ও আকীদার ক্ষেত্রে দলীল হওয়ার উপযুক্ত নয়। অতএব, বিকৃত ও মানবরচিত ধর্মগুলোর সবগুলো কি সঠিক নাকি বাতিল?

সবগুলোই সত্যের ওপর আছে, এটা বলা অসম্ভব, কারণ সত্য একটিই, একাধিক নয়। আর এসব প্রত্যেক বিকৃত ও মানবরচিত ধর্মগুলো আল্লাহর পক্ষ থেকে হবে এবং সবগুলোই সত্য এটাও অসম্ভব। আর এসব ধর্ম যখন একাধিক অথচ সত্য একটিই, তাহলে সত্য কোনটি? অতএব অবশ্যই এমন কতগুলো মূলনীতি রয়েছে যার মাধ্যমে আমরা বাতিল দীন থেকে সত্য দীনকে জানতে পারবো। সুতরাং আমরা যদি কোনো দীনে এই মূলনীতির প্রয়োগ যথার্থরূপে দেখতে পাবো তখনই জানবো যে, এটাই সত্য। পক্ষান্তরে যদি এই মূলনীতিগুলো অথবা তার একটি কোনো দীনে ত্রুটিপূর্ণ ও বিশৃঙ্খল হয়, তাহলে জানবো যে, এটা বাতিল।

যে মূলনীতির দ্বারা সত্য দীন ও বাতিল দীনের মাঝে আমরা পার্থক্য নিরূপণ করতে পারবো তা নিম্নরূপ:

১- সেই দীন হতে হবে আল্লাহর পক্ষ থেকে, যা তিনি একজন ফিরিশতার (জিবরীল ‘আলাইহিস সালামের) মাধ্যমে তাঁর রাসূলের প্রতি অবতীর্ণ করেন, যাতে করে তিনি তাঁর বান্দাদের নিকট তা প্রচার করেন; কারণ সত্য দীন তো আল্লাহরই দীন। তিনি কিয়ামতের দিন মানুষ ও জিন্নের বিচার করবেন ও হিসাব নিবেন ঐ দীনের ভিত্তিতে, যা তিনি তাদের নিকট অবতীর্ণ করেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿إِنَّآ أَوۡحَيۡنَآ إِلَيۡكَ كَمَآ أَوۡحَيۡنَآ إِلَىٰ نُوحٖ وَٱلنَّبِيِّ‍ۧنَ مِنۢ بَعۡدِهِۦۚ وَأَوۡحَيۡنَآ إِلَىٰٓ إِبۡرَٰهِيمَ وَإِسۡمَٰعِيلَ وَإِسۡحَٰقَ وَيَعۡقُوبَ وَٱلۡأَسۡبَاطِ وَعِيسَىٰ وَأَيُّوبَ وَيُونُسَ وَهَٰرُونَ وَسُلَيۡمَٰنَۚ وَءَاتَيۡنَا دَاوُۥدَ زَبُورٗا ١٦٣ ﴾ [النساء : ١٦٣]

“নিশ্চয় আমরা আপনার নিকট অহী প্রেরণ করেছিলাম, যেমন নূহ ও তার পরবর্তী নবীগণের প্রতি অহী প্রেরণ করেছিলাম। আর ইবরাহীম, ইসমা‘ঈল, ইসহাক, ইয়া‘কূব ও তার বংশধরগণ, ‘ঈসা, আইয়্যুব, ইউনুস, হারূন ও সুলাইমানের নিকটও অহী প্রেরণ করেছিলাম এবং দাউদকে প্রদান করেছিলাম যাবূর।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১৬৪ ]

তিনি আরো বলেন,

﴿وَمَآ أَرۡسَلۡنَا مِن قَبۡلِكَ مِن رَّسُولٍ إِلَّا نُوحِيٓ إِلَيۡهِ أَنَّهُۥ لَآ إِلَٰهَ إِلَّآ أَنَا۠ فَٱعۡبُدُونِ ٢٥﴾ [الانبياء: ٢٥]

“আর আপনার পূর্বে আমরা যে রাসূলই প্রেরণ করেছি তার কাছে এ অহীই পাঠিয়েছি যে, আমি ব্যতীত অন্য কোনো সত্য ইলাহ্ নেই, সুতরাং তোমরা আমারই ইবাদাত কর।” [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ২৫ ]

এর ওপর ভিত্তি করে কোনো ব্যক্তি যদি কোনো দীন পালন করে এবং তা আল্লাহ ব্যতীত নিজের দিকে সম্বন্ধ করে, তাহলে নিশ্চিতরূপে সেই দীন বাতিল।

২- সেই দীন শুধুমাত্র এক আল্লাহরই ইবাদাত করার দিকে এবং শির্ক ও শির্কের দিকে ধাবিত করে এমন যাবতীয় মাধ্যমকে হারাম সাব্যস্ত করার আহ্বান করে। কারণ, এক আল্লাহরই ইবাদাত তথা তাওহীদের দিকে আহ্বান করা নবী ও রাসূলগণের দা‘ওয়াতের মূল বুনিয়াদ। প্রত্যেক নবী তার আপন জাতিকে লক্ষ্য করে বলেন,

﴿ٱعۡبُدُواْ ٱللَّهَ مَا لَكُم مِّنۡ إِلَٰهٍ غَيۡرُهُۥۖ ٧٣ ﴾ [الاعراف: ٧٢]

“তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর, তিনি ছাড়া তোমাদের আর কোনো সত্য মা‘বুদ নেই।” [সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ৭২]

এর ওপর ভিত্তি করে যদি কোনো দীন শির্কে অন্তর্ভুক্ত করে এবং আল্লাহর সাথে অন্য কোনো নবী, ফিরিশতা অথবা ওলীকে অংশীদার করে, তাহলে সেই দীন বাতিল, যদিও সেই দীনের অনুসারীরা তাদেরকে নবীদের মধ্য থেকে কোনো নবীর দিকে সম্পৃক্ততার দাবী করে।

৩- সেই দীন যেন ঐ মূলনীতির সাথে ঐকমত্য হয় যার দিকে সমস্ত রাসূল আহ্বান করেন। যথা- একমাত্র আল্লাহর ইবাদাত, তাঁর পথে মানুষকে আহ্বান, আর শির্ক হারাম সহ পিতা-মাতার অবাধ্যতা, অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা এবং প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য অশ্লীলতাকে হারাম সাব্যস্ত ইত্যাদি। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَمَآ أَرۡسَلۡنَا مِن قَبۡلِكَ مِن رَّسُولٍ إِلَّا نُوحِيٓ إِلَيۡهِ أَنَّهُۥ لَآ إِلَٰهَ إِلَّآ أَنَا۠ فَٱعۡبُدُونِ ٢٥﴾ [الانبياء: ٢٥]

“আর আপনার পূর্বে আমরা যে রাসূলই প্রেরণ করেছি তার কাছে এ অহীই পাঠিয়েছি যে, আমি ব্যতীত অন্য কোনো সত্য ইলাহ নেই, সুতরাং তোমরা আমারই ইবাদাত কর।” [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ২৫ ]

মহান আল্লাহ আরও বলেন,

﴿قُلۡ تَعَالَوۡاْ أَتۡلُ مَا حَرَّمَ رَبُّكُمۡ عَلَيۡكُمۡۖ أَلَّا تُشۡرِكُواْ بِهِۦ شَيۡ‍ٔٗاۖ وَبِٱلۡوَٰلِدَيۡنِ إِحۡسَٰنٗاۖ وَلَا تَقۡتُلُوٓاْ أَوۡلَٰدَكُم مِّنۡ إِمۡلَٰقٖ نَّحۡنُ نَرۡزُقُكُمۡ وَإِيَّاهُمۡۖ وَلَا تَقۡرَبُواْ ٱلۡفَوَٰحِشَ مَا ظَهَرَ مِنۡهَا وَمَا بَطَنَۖ وَلَا تَقۡتُلُواْ ٱلنَّفۡسَ ٱلَّتِي حَرَّمَ ٱللَّهُ إِلَّا بِٱلۡحَقِّۚ ذَٰلِكُمۡ وَصَّىٰكُم بِهِۦ لَعَلَّكُمۡ تَعۡقِلُونَ ١٥١﴾ [الانعام: ١٥١]

“(হে মুহাম্মাদ) বলুন, ‘এসো, তোমাদের রব তোমাদের ওপর যা হারাম করেছেন তোমাদেরকে তা তিলাওয়াত করি, তা হচ্ছে, ‘তোমরা তাঁর সাথে কোনো শরীক করবে না, পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করবে, দারিদ্রের ভয়ে তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করবে না, আমরাই তোমাদেরকে ও তাদেরকে রিযিক দিয়ে থাকি। প্রকাশ্যে হোক কিংবা গোপনে হোক, অশ্লীল কাজের ধারে-কাছেও যাবে না। আল্লাহ যার হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন যথার্থ কারণ ছাড়া তোমরা তাকে হত্যা করবে না।’ তোমাদেরকে তিনি এ নির্দেশ দিলেন যেন তোমরা বুঝতে পার।” [সূরা আন‘আম, আয়াত: ১৫১ ]

তিনি আরও বলেন,

﴿وَسۡ‍َٔلۡ مَنۡ أَرۡسَلۡنَا مِن قَبۡلِكَ مِن رُّسُلِنَآ أَجَعَلۡنَا مِن دُونِ ٱلرَّحۡمَٰنِ ءَالِهَةٗ يُعۡبَدُونَ ٤٥﴾ [الزخرف: ٤٥]

“আর আপনার পূর্বে আমরা আমাদের রাসূলগণ থেকে যাদেরকে প্রেরণ করেছিলাম তাদেরকে জিজ্ঞেস করুন, আমরা কি রহমান ছাড়া ইবাদাত করা যায় এমন কোন ইলাহ স্থির করেছিলাম?” [সূরা আয-যুখরুফ, আয়াত: ৪৫ ]

৪- সেই দীনে যেন পরস্পরবিরোধী নিয়ম এবং একটা আরেকটার বিপরীত না হয়। সুতরাং তা এমন কোনো বিষয়ের আদেশ করবে না, যা অপর কোনো আদেশ দিয়ে ভঙ্গ করে দেয়। অনুরূপ কোনো জিনিসকে হারাম করবে না, যা পরে বিনা কারণে তার অনুরূপ জিনিসকে বৈধ করে এবং কোনো বস্তুকে এক শ্রেণির জন্য হালাল করে আবার তা অন্য শ্রেণির জন্য হারাম করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ ٱلۡقُرۡءَانَۚ وَلَوۡ كَانَ مِنۡ عِندِ غَيۡرِ ٱللَّهِ لَوَجَدُواْ فِيهِ ٱخۡتِلَٰفٗا كَثِيرٗا ٨٢﴾ [النساء:٨٢]

“তারা কেন কুরআন নিয়ে গবেষণা করে না? আর তা যদি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও নিকট থেকে হতো, তাহলে তারা এর মধ্যে অনেক মতানৈক্য পেতো।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৮২]

৫- সেই দীন যেন এমন বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করে, যা আদেশ, নিষেধ, হুশিয়ারি, আখলাক ইত্যাদি বিধান করার মাধ্যমে মানুষের দীন, মান-সম্মান, সম্পদ, জীবন ও বংশ এই পাঁচটি মৌলিক বিষয়কে হিফাযত করে।

৬- সেই দীন হবে সকল সৃষ্টজীবের জন্য রহমতস্বরূপ, তারা তাদের নিজেদের এবং তাদের পরস্পরের প্রতি যুলুম করা হতে হবে মুক্ত। চাই এ যুলুম হক নষ্ট করার মাধ্যমে হোক অথবা কল্যাণ কুক্ষিগত করার মতো স্বেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে হোক অথবা বড়দের দ্বারা ছোটদেরকে বিভ্রান্ত করার মাধ্যমে হোক। আল্লাহ তা‘আলা তাঁর সে রহমত সম্পর্কে সংবাদ দিয়ে বলেন, যা তিনি মূসা ‘আলাইহিস সালামের প্রতি অবতীর্ণ তাওরাতের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন:

﴿وَلَمَّا سَكَتَ عَن مُّوسَى ٱلۡغَضَبُ أَخَذَ ٱلۡأَلۡوَاحَۖ وَفِي نُسۡخَتِهَا هُدٗى وَرَحۡمَةٞ لِّلَّذِينَ هُمۡ لِرَبِّهِمۡ يَرۡهَبُونَ ١٥٤﴾ [الاعراف: ١٥٤]

“আর মূসার রাগ যখন প্রশমিত হলো, তখন তিনি ফলকগুলো তুলে নিলেন। যারা তাদের রবকে ভয় করে তাদের জন্য সে কপিগুলোতে যা লিখিত ছিল তাতে ছিল হিদায়াত ও রহমত।” [সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ১৫৪ ]

মহান আল্লাহ ঈসা ‘আলাইহিস সালামের নবুওয়াত সম্পর্কে সংবাদ দিয়ে বলেন,

﴿قَالَ كَذَٰلِكِ قَالَ رَبُّكِ هُوَ عَلَيَّ هَيِّنٞۖ وَلِنَجۡعَلَهُۥٓ ءَايَةٗ لِّلنَّاسِ وَرَحۡمَةٗ مِّنَّاۚ وَكَانَ أَمۡرٗا مَّقۡضِيّٗا ٢١﴾ [مريم: ٢١]

“সে বলল, ‘এ রূপই হবে।’ তোমার রব বলেছেন, ‘এটা আমার জন্য সহজ। আর আমরা তাকে এজন্য সৃষ্টি করব যেন সে হয় মানুষের জন্য এক নিদর্শন ও আমাদের কাছ থেকে এক রহমত; এটা তো এক স্থিরীকৃত ব্যাপার’।” [সূরা মারইয়াম, আয়াত: ২১]

মহিমান্বিত আল্লাহ সালেহ ‘আলাইহিস সালাম সম্পর্কে বলেন,

﴿قَالَ يَٰقَوۡمِ أَرَءَيۡتُمۡ إِن كُنتُ عَلَىٰ بَيِّنَةٖ مِّن رَّبِّي وَءَاتَىٰنِي رَحۡمَةٗ مِّنۡ عِندِهِۦ فَعُمِّيَتۡ عَلَيۡكُمۡ أَنُلۡزِمُكُمُوهَا وَأَنتُمۡ لَهَا كَٰرِهُونَ ٢٨﴾ [هود: ٢٨]

“তিনি বললেন, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আমাকে বল, আমি যদি আমার রব প্রেরিত স্পষ্ট প্রমাণে প্রতিষ্ঠিত থাকি এবং তিনি যদি আমাকে তাঁর নিজের পক্ষ থেকে রহমত দান করে থাকেন, অতঃপর সেটা তোমাদের কাছে গোপন রাখা হয়, আমরা কি এ বিষয়ে তোমাদেরকে বাধ্য করতে পারি, যখন তোমরা এটা অপছন্দ কর?” [সূরা হূদ, আয়াত: ২৮]

মহান আল্লাহ মহাগ্রন্থ আল কুরআন সম্পর্কে বলেন,

﴿وَنُنَزِّلُ مِنَ ٱلۡقُرۡءَانِ مَا هُوَ شِفَآءٞ وَرَحۡمَةٞ لِّلۡمُؤۡمِنِينَ وَلَا يَزِيدُ ٱلظَّٰلِمِينَ إِلَّا خَسَارٗا ٨٢﴾ [الاسراء: ٨٢]

“আর আমরা নাযিল করি কুরআন, যা মুমিনদের জন্য আরোগ্য ও রহমত, কিন্তু তা যালিমদের ক্ষতিই বৃদ্ধি করে।” [সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ৮২]

৭- সেই দীন যেন আল্লাহর বিধানের দিকে পথপ্রদর্শন করাকে অন্তর্ভুক্ত করে। আর আল্লাহ মানুষের নিকট কী চান সে দিকে তাকে পরিচালিত করে এবং তাকে সংবাদ দেয় যে, সে কোথা থেকে এসেছে ও কোথায় তার গন্তব্য? আল্লাহ তা‘আলা তাওরাত সম্পর্কে বলেন,

﴿إِنَّآ أَنزَلۡنَا ٱلتَّوۡرَىٰةَ فِيهَا هُدٗى وَنُورٞۚ ٤٤﴾ [المائ‍دة: ٤٤]

“নিশ্চয় আমরা তাওরাত অবতীর্ণ করেছি, যাতে ছিল হিদায়াত এবং আলো।” [সূরা আল-মায়েদাহ, আয়াত: ৪৪]

আর তিনি ইঞ্জিল সম্পর্কে বলেন,

﴿وَءَاتَيۡنَٰهُ ٱلۡإِنجِيلَ فِيهِ هُدٗى وَنُورٞ وَمُصَدِّقٗا لِّمَا بَيۡنَ يَدَيۡهِ مِنَ ٱلتَّوۡرَىٰةِ وَهُدٗى وَمَوۡعِظَةٗ لِّلۡمُتَّقِينَ﴾ [المائ‍دة: ٤٦]

“আর আমরা তাকে ইঞ্জিল দিয়েছিলাম, এতে রয়েছে হিদায়াত ও আলো; আর তা ছিল তার সামনে অবশিষ্ট তাওরাতের সত্যতা প্রতিপন্নকারী এবং মুত্তাকীদের জন্য হিদায়াত ও উপদেশস্বরূপ।” [সূরা আল-মায়েদাহ, আয়াত: ৪৬]

মহাগ্রন্থ আল-কুরআন সম্পর্কে বলেন,

﴿هُوَ ٱلَّذِيٓ أَرۡسَلَ رَسُولَهُۥ بِٱلۡهُدَىٰ وَدِينِ ٱلۡحَقِّ ٩﴾ [الصف: ٩]

“তিনি সেই সত্তা যিনি তাঁর রাসূলকে হিদায়াত এবং সত্য দীন সহকারে প্রেরণ করেছেন।” [সূরা আত-তাওবা, আয়াত: ৩৩ ]

আর সত্য দীন তো এটাই, যা আল্লাহর বিধানের দিকে পথপ্রদর্শন করাকে লালন করে এবং জীবনের নিরাপত্তা ও শান্তি নিশ্চিত করে। যেহেতু সে মনের সকল দ্বিধা দূর করে এবং প্রত্যেক জিজ্ঞাসার উত্তর দেয় ও প্রত্যেক সমস্যার সমাধান করে।

৮- সেই দীন যেন উত্তম চরিত্র এবং সৎকর্মের দিকে আহ্বান করে। যেমন, সত্যবাদিতা, ইনসাফ, আমানত, লজ্জা, পবিত্রতা, উদারতা ইত্যাদি। আর খারাপ কাজ হতে নিষেধ করে। যেমন, পিতা-মাতার অবাধ্যতা, মানুষ হত্যা, অশ্লীলতা নিষিদ্ধ, মিথ্যা, যুলুম, অবিচার, কৃপণতা ও পাপাচার।

৯- সেই দীন যেন ঐ ব্যক্তির কল্যাণ নিশ্চিত করে যে তার ওপর ঈমান আনে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ طه ١ مَآ أَنزَلۡنَا عَلَيۡكَ ٱلۡقُرۡءَانَ لِتَشۡقَىٰٓ ٢ ﴾ [طه: ١،  ٢]

“ত্বা-হা। (হে মুহাম্মাদ!) আপনাকে কষ্ট-ক্লেশে নিপতিত করার জন্য আমি আপনার প্রতি কুরআন অবতীর্ণ করিনি।” [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ১, ২]

আর তা যেন সঠিক ফিৎরাত বা মানব মনের স্বাভাবিক প্রকৃতির সাথে মিলে যায়,

﴿فِطۡرَتَ ٱللَّهِ ٱلَّتِي فَطَرَ ٱلنَّاسَ عَلَيۡهَاۚ لَا تَبۡدِيلَ لِخَلۡقِ ٱللَّهِۚ ذَٰلِكَ ٱلدِّينُ ٱلۡقَيِّمُ وَلَٰكِنَّ أَكۡثَرَ ٱلنَّاسِ لَا يَعۡلَمُونَ﴾ [الروم: ٣٠]

“আল্লাহর ফিতরাত (স্বাভাবিক রীতি বা দীন ইসলাম), যার ওপর (চলার যোগ্য করে) তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন; আল্লাহর সৃষ্টির কোনো পরিবর্তন নেই। এটাই প্রতিষ্ঠিত দীন; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না।” [সূরা আর-রূম, আয়াত: ৩০]

আর তা যেন বিশুদ্ধ বিবেকের সাথেও মিলে যায়; কারণ সঠিক দীন তো হলো আল্লাহর শরী‘আত। আর বিশুদ্ধ বিবেকও আল্লাহর সৃষ্টি। আর তাই আল্লাহর শরী‘আত এবং তাঁর সৃষ্টি পরস্পরবিরোধী হওয়া অসম্ভব।

১০- সেই দীন যেন সত্যের পথ দেখায় এবং বাতিল হতে সতর্ক করে। হিদায়াতের দিকে পথপ্রদর্শন করে এবং ভ্রষ্টতা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। আর মানুষকে এমন এক সিরাতে মুস্তাক্বীম তথা সোজা সরল পথের দিকে আহ্বান করে, যার মধ্যে কোনো প্রকার বক্রতা নেই। আল্লাহ তা‘আলা ঐসব জিন্নদের সম্পর্কে সংবাদ দিয়ে বলেন, যখন তাদের একদল কুরআন পড়া শুনে পরস্পর বলেছিল,

﴿قَالُواْ يَٰقَوۡمَنَآ إِنَّا سَمِعۡنَا كِتَٰبًا أُنزِلَ مِنۢ بَعۡدِ مُوسَىٰ مُصَدِّقٗا لِّمَا بَيۡنَ يَدَيۡهِ يَهۡدِيٓ إِلَى ٱلۡحَقِّ وَإِلَىٰ طَرِيقٖ مُّسۡتَقِيمٖ ٣٠﴾ [الاحقاف: ٣٠]

“তারা বলেছিল, ‘হে আমাদের সম্প্রদায়! নিশ্চয় আমরা এমন এক কিতাবের পাঠ শুনেছি যা নাযিল হয়েছে মূসার পরে, এটা তার সম্মুখস্থ কিতাবকে সত্যায়ন করে এবং সত্য ও সরল পথের দিকে হিদায়াত করে।” [সূরা আল-আহকাফ, আয়াত: ৩০]

সুতরাং, যাতে দুর্ভোগ রয়েছে এমন কিছুর দিকে তা তাদেরকে আহ্বান করে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ طه ١ مَآ أَنزَلۡنَا عَلَيۡكَ ٱلۡقُرۡءَانَ لِتَشۡقَىٰٓ ٢ ﴾ [طه: ١،  ٢]

“ত্বা-হা। (হে মুহাম্মাদ!) আপনাকে দুর্ভোগে নিক্ষেপ করার জন্য আমি আপনার প্রতি কুরআন অবতীর্ণ করিনি।” [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ১, ২]

যার মধ্যে তাদের ধ্বংস রয়েছে তার নির্দেশও তাদেরকে করে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَلَا تَقۡتُلُوٓاْ أَنفُسَكُمۡۚ إِنَّ ٱللَّهَ كَانَ بِكُمۡ رَحِيمٗا ٢٩﴾ [النساء : ٢٩]

“আর তোমরা নিজেদেরকে হত্যা করো না; নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের প্রতি ক্ষমাশীল।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ২৯]

লিঙ্গ, বর্ণ ও গোত্রের কারণে তাদের অনুসারীদের মাঝে কোনো প্রকার বিভেদ সৃষ্টি করে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ إِنَّا خَلَقۡنَٰكُم مِّن ذَكَرٖ وَأُنثَىٰ وَجَعَلۡنَٰكُمۡ شُعُوبٗا وَقَبَآئِلَ لِتَعَارَفُوٓاْۚ إِنَّ أَكۡرَمَكُمۡ عِندَ ٱللَّهِ أَتۡقَىٰكُمۡۚ إِنَّ ٱللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٞ ١٣﴾ [الحجرات: ١٣]

“হে মানুষ! আমরা তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী হতে, আর তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অন্যের সাথে পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সে ব্যক্তিই বেশি মর্যাদাসম্পন্ন যে তোমাদের মধ্যে বেশি তাকওয়াসম্পন্ন। নিশ্চয় আল্লাহ্ সর্বজ্ঞ, সম্যক অবহিত।” [সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ১৩]

অতএব সত্য দীনের মধ্যে মর্যাদার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হলো, আল্লাহ ভীতি অর্জন।

যে নীতিমালার মাধ্যমে সত্য দীন এবং বাতিল দীনের মধ্যে পার্থক্য করা যায় তা উপস্থাপন এবং এ ব্যাপারে কুরআন থেকে প্রমাণস্বরূপ যা উল্লেখ করেছি তা এটাই প্রমাণ করে যে, এই সকল নীতিমালা আল্লাহর নিকট থেকে প্রেরিত সকল সত্যবাদী রাসূলগণের জন্য সার্বজনীন। এরপর দীন বা ধর্মের প্রকারভেদ উপস্থাপন করা সঙ্গত মনে করছি।

ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে। তাহলে আপনিও ব্লগের কার্যক্রম কে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার লেখণী পাঠাতে পারেন।আপনার লেখনী পাঠিয়ে আমাদের ফেচবুক পেজের ম্যাসেঞ্জারে গিয়ে দয়াকরে নক করুন।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন