কুরআনে বৈপরীত্যের সত্যাসত্য-টু

এখান থেকে দুইটি বিষয় পরিষ্কার।

এক, যেদিন সৃষ্টিকুলের মানুষ দাঁড়াবে তাদের রবের সামনে। সেটি কোন দিন? কিয়ামতের দিন।।

দুই. ‘তা হবে এমন একদিন, যার পরিমাণ হবে ৫০,০০০ বছর। সুতরাং এখান থেকে বোঝা যায় যে, কিয়ামত দিবসের সময়কাল সাধারণ সময়কালের চেয়ে দীর্ঘ। হাদীস এবং কুরআন থেকে এটি স্পষ্ট যে, সূরা মাআরিজে উল্লিখিত সময়কাল পৃথিবী এবং আল্লাহর মধ্যবর্তী সময়কাল নয়; বরং এটি কিয়ামত দিবসের সময়কাল। জেনারেল সেন্স থেকেও যদি আমরা বিচার করি, দুঃখ-কষ্টের সময়গুলো আসলেই কেমন যেন দীর্ঘ মনে হয় আমাদের কাছে। সময়গুলো যেন ফুরোতেই চায় না। কিয়ামত দিবসের চেয়ে ভয়াবহ সময় আর কী হতে পারে? তাই এই সময়কালটা দীর্ঘ হওয়াই কিন্তু স্বাভাবিক।

সাজিদ এক নিঃশ্বাসে বলে গেল কথাগুলো। এরপর সে থামল। আমাদের গরম-গরম। চা-পরোটা চলে এসেছে। চায়ের মধ্যে পরোটা ডুবিয়ে মুখে দিতে দিতে সাজিদ আবারও বলতে শুরু করল, এরপর দ্বিতীয় ভাগে আসা যাক। আমরা আয়াতগুলো আবার খেয়াল করি।

সূরা হজের ৪৭ নম্বর আয়াত

‘তারা আপনাকে তাড়াতাড়ি শাস্তি নিয়ে আসতে বলে (কিন্তু শাস্তি তো আসবে আল্লাহর ওয়াদা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ে); কেননা, আল্লাহ কক্ষনো তাঁর ওয়াদার খেলাফ করেন না। তোমার প্রতিপালকের একদিন হলো তোমাদের গণনায় এক হাজার বছরের সমান।

সূরা সাজদার ৫ নম্বর আয়াত

‘তিনি আকাশ হতে পৃথিবী পর্যন্ত কার্য পরিচালনা করেন, অতঃপর সকল বিষয়াদি তাঁরই কাছে একদিন উখিত হবে, যার পরিমাপ তোমাদের গণনা অনুযায়ী এক হাজার বছর।

সূরা মাআরিজের ৪ নম্বর আয়াত

“ফেরেশতা এবং রূহ (অর্থাৎ জিবরীল) আল্লাহর দিকে আরোহণ করে এমন একদিনে, যার পরিমাণ পঞ্চাশ হাজার বছর।

প্রথম আয়াত দুটো খেয়াল করো, মঈনুল ভাই। প্রথম আয়াতে একটি স্পেসেফিক কথা আছে। সেটি হলো, তোমার প্রতিপালকের একদিন হলো তোমাদের গণনায় এক হাজার বছরের সমান।

দ্বিতীয় আয়াতে বলা হচ্ছে, অতঃপর সকল বিষয়াদি তাঁরই কাছে একদিন উখিত হবে, যার পরিমাণ তোমাদের গণনা অনুযায়ী এক হাজার বছর।

দুটি আয়াতেই একটি কমন জিনিস বলে দেওয়া হচ্ছে। সেটি হলো—“তোমার রবের একদিন তোমাদের গণনায় এক হাজার বছরের সমান। কিন্তু তৃতীয় আয়াতে শুধু বলা হচ্ছে, ফেরেশতা এবং রূহ আল্লাহর দিকে আরোহণ করে এমন একদিনে, যার পরিমাণ পঞ্চাশ হাজার বছর।

খেয়াল করো, আগের দুই আয়াতের মতো এই আয়াতে কিন্তু বলা হচ্ছে না যে, ‘তোমাদের রবের একদিন তোমাদের গণনা অনুযায়ী এত বছর। কেন এমনটা বলা হলো না? কারণ, এই হিশাবটা আগের আয়াতগুলোর মতো একই ঘটনার নয়, এ জন্য। আগের আয়াত দুটো ছিল আল্লাহ এবং পৃথিবীর মানুষের মধ্যকার সময়; কিন্তু পরের আয়াতে একটি আলাদা, নির্দিষ্ট দিক ইঙ্গিত করে। সেটি হলো, কিয়ামত দিবস।

সুতরাং আগের দুই আয়াতের এক হাজার বছরের সাথে পরের আয়াতের পঞ্চাশ হাজার বছর গুলিয়ে ফেলার কোনো কারণ নেই। আশা করি তুমি বুঝতে পেরেছ।

মঈনুল কিছু না বলে চুপ করে আছে। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে সাজিদ বলতে লাগল, ‘আরেকটি ব্যাপার খেয়াল করো। প্রথম দুই আয়াতে আল্লাহ যেখানে একহাজার বছরের কথা বলেছেন, সেখানে কিন্তু রূহ বা জিবরাঈল, কারও কথাই উল্লেখ নেই। শুধু মানুষ এবং আল্লাহর মধ্যবর্তী সময়সীমা নিয়ে বলা আছে; কিন্তু তিন নম্বর আয়াতে যেখানে পঞ্চাশ হাজার বছরের কথা এসেছে, সেখানে ফেরেস্তা এবং রূহের কথাও কিন্তু বলা হচ্ছে। আয়াতটির দিকে আরেকবার খেয়াল করো, ফেরেশতা এবং রূহ আল্লাহর দিকে আরোহণ করে এমন এক দিনে—যার পরিমাণ ৫০,০০০ বছর।

এখান থেকে কী বোঝা গেল? এখান থেকে এটাই বোঝা গেল যে, দুই জায়গায় বক্তব্যের সাবজেক্ট কিন্তু আলাদা আলাদা। একটি জায়গায় মানুষকে ইঙ্গিত করা হয়েছে, অন্য জায়গায় ফেরেশতাদের। যেখানে বক্তব্যের সাবজেক্ট-ই আলাদা হয়ে গেছে, সেখানে উল্লিখিত সময়কাল যে একই থাকবে, তা কী করে ধরে নিলে?

সাজিদের এই কথাটা বুঝতে না পেরে মঈনুল বলল, “বুঝিনি।

“ঠিক আছে। আমি একটি উদাহরণ দিয়ে পরিষ্কার করছি ব্যাপারটা।’-বলল সাজিদ। ‘ধরো, তোমার বাসা থেকে স্কুলের দূরত্ব হলো আধা কিলোমিটার। এই দূরত্বটুকু হেঁটে যেতে তোমার সময় লাগে ১০ মিনিট। এখন তুমি বললে, “বাসা থেকে স্কুলে যেতে আমার সময় লাগে ১০ মিনিট।

মঈনুল মাথা নাড়ল।

‘আরও ধরো, তোমাদের বাসা থেকে স্কুলে হেঁটে যেতে তোমার ছোটবোনের লাগে ২০ মিনিট। এখন সে যদি বলে, বাসা থেকে স্কুলে যেতে আমার সময় লাগে ২০ মিনিট, তাহলে তোমার কথা এবং তোমার বোনের কথার মধ্যে কি কোনো বৈপরীত্য আছে?

‘না’, মঈনুল বলল।

‘তোমার কথা এবং তোমার বোনের কথার মধ্যে যদি কোনো বৈপরীত্য না থাকে, তাহলে ওপরের আয়াতগুলোতেও কোনো বৈপরীত্য নেই। কারণ, তুমি আর তোমার বোন আলাদা আলাদা সাবজেক্ট। তোমার জন্য যেটা দশ মিনিটের, তোমার বোনের জন্য সেটি ২০ মিনিটের। তোমাদের উভয়ের বক্তব্যে না তুমি ভুল বলেছ,

তোমার বোন ভুল বলেছে। তোমরা দুজনেই দুজনের জায়গা থেকে ঠিক। কোনো বৈপরীত্য নেই এখানে। ঠিক একইভাবে, একটি আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা যখন তাঁর আর বান্দার মধ্যবর্তী সময়ের কথা বলছেন, তখন সে পিরিওড একরকম, আবার তিনি যখন কিয়ামত দিবসের কথা বলছেন, তখন সে পিরিওড অন্যরকম। দুই ক্ষেত্রে দুই রকম টাইম স্কেল হলেই যে সেটি বৈপরীত্য হয়ে যায়, তা কিন্তু নয়। কুরআনকে যারা সঠিকভাবে বুঝতে পারে না তাদের কাছেই কেবল এই আয়াতগুলো অসামঞ্জস্য বলে মনে হবে।

মঈনুল কিছু না বলে চুপ করে আছে। সাজিদের ওপর এতক্ষণ অভিমান করে থাকলেও এখন আর সেটি নেই। আমার খুব করে মঈনুলকে আরেকবার জিজ্ঞেস করতে মন চাইছে—সে কোন কোন পণ্ডিতের কাছে কুরআন পড়েছে। কিন্তু না; এই মুহূর্তে তাকে আর অপমান করা ঠিক হবে না।

আগের অংশ টুকু পড়তে[এখানে ক্লিক করুন]

এই ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে তাহলে দয়া করে ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ একে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন