সমুদ্রবিজ্ঞান পাট-টু

আমাদের বন্ধু মাশুক থাকলে এতক্ষণে কোনো না কোনো উপায় নির্ঘাত বের করে ফেলত। জাহাজ না-হলে ট্রলার, ট্রলার না-হলে নৌকায় চেপে সে আমাদের সেন্ট মার্টিন ফেলে আসতই। মাশুকের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিল রাজিব। সে এদিক-ওদিক খোঁজখবর নিয়ে শেষমেশ একটি ট্রলারের সন্ধান পেল যেটি একটু পরেই সেন্ট মার্টিনের উদ্দেশে ছাড়বে। সাধারণত, এরকম ট্রলারগুলো কতটুকু নিরাপদ সে ব্যাপারে সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে বৈকি। তবুও সকল জল্পনা-কল্পনার পরে এই ট্রলারে করে সেন্ট মার্টিন যাওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো।

মাগরিবের সালাত পড়ে এসে ট্রলারে উঠে বসলাম। আমরা একা নই। আরও কিছু সেন্ট মার্টিনগামী যাত্রীও আমাদের সাথে আছে এই ট্রলারে।

দেখতে দেখতে কখন যে নাফ নদী পার হয়ে বঙ্গোপসাগরে এসে পড়লাম তা টের পাইনি মোটেও। ঢেউয়ের আধিক্য আর উপচে পড়ার শক্তিমত্তা দেখেই বুঝলাম যে, আমরা এখন নোনা জলের ওপরে ভাসছি। ঢেউগুলো একটির পর একটি এগিয়ে আসছে আর ভেঙে পড়ছে কূলঘেঁষে। দূরে তাকালে মনে হবে পুরো সমুদ্র দুধে ছেয়ে গেছে। রাতের বেলার সমুদ্র যে এত সুন্দর হয় তা আমি জানতাম না।

আমরা তিনজন বসেছি ট্রলারের সামনের দিকে। এদিক থেকে সমুদ্রটি অন্যরকম লাগছে দেখতে। রাজিব প্রশ্ন করল, “আচ্ছা, আমি যতদূর জানি সেন্ট মার্টিনে একশো ভাগ মুসলিম বাস করে। অথচ দ্বীপটির নাম সেন্ট মার্টিন কীভাবে হলো? একজন খ্রিষ্টানের নামে?

রাজিবের প্রশ্ন শুনে মনে হলো—এটি একটি ভালো প্রশ্ন। আস্ত একটি দ্বীপের নাম কীভাবে খ্রিষ্টান ব্যক্তির নামে হয়ে গেল তা জানা জরুরি। উত্তরের জন্য আমরা সাজিদের দিকে তাকালাম। সে তখনো সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে আছে। কিছুক্ষণ পরে আমাদের দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে বলল, “আমাকে কিছু বল ছিলি?

রাজিব বলল, তোমাকেই তো বলছিলাম।

‘কী বলছিলি?

‘এই যে এই সেন্ট মার্টিন দ্বীপ, এটার নাম সেন্ট মার্টিন হলো কীভাবে? আমি শুনেছি। এই দ্বীপে নাকি একশো ভাগ মুসলিমের বসবাস। পুরোপুরি মুসলিম অধ্যুষিত একটি অঞ্চলের নাম খ্রিষ্টান কোনোব্যক্তির নামে, ব্যাপারটি বেশ বেখাপ্পা। সাজিদ বলল, “তোর হঠাৎ এই ব্যাপারটি মাথায় এলো কেন?

সাজিদের পাল্টা প্রশ্নে চুপ হয়ে গেল রাজিব। তাকে চুপ মেরে যেতে দেখে আমার বেশ হাসি পেয়ে গেল। তার মন খারাপ দেখে সাজিদ আবার বলল, “তোর ক্যামেরাটি দে।

“কেন?’, জানতে চাইল রাজিব। ‘তোর একটি ছবি তুলব।

‘আমার ছবি?

‘হ্যাঁ।

‘কেন?

‘মানুষ তো ফটোগ্রাফারদের তোলা সুন্দর সুন্দর ছবিই দেখে। মন খারাপের সময়ে ফটোগ্রাফারদের চেহারা যে ব্ল্যাক হোলের মতো অন্ধকার হয়ে যায়, সেটাও তো মানুষের জানা উচিত।

সাজিদের কথা শুনে ফিক করে হেসে ফেলল রাজিব। সম্ভবত চেহারার উপমাটি শুনে সে খুব মজা পেয়েছে। হেসে ফেললাম আমিও। হাসাহাসির পর্ব শেষে সাজিদ আবারও সমুদ্রবিলাসে ডুব দিল। সাঁই সাঁই করে বাতাস বইছে সাগরের বুকে। ট্রলারের দুলুনি খেতে খেতে আমরা ছুটে চলছি। অন্ধকার রাত। এই তল্লাটে কেবল আকাশ আর সাগরের মিতালি।

অনেকক্ষণ পরে রাজিব আবারও প্রশ্ন করে বসল সাজিদকে। বলল, তোমার নাকি সমুদ্র খুব পছন্দের? ‘তুম।

‘কেন?

‘সমুদ্রে একটি বিস্ময় আছে।

‘কীরকম বিস্ময়?’

‘সমুদ্র একই সাথে সুন্দর এবং ভয়ংকর।

‘যেমন?

‘সমুদ্রের এই যে বিশালতা, উপচে পড়া ঢেউ, তার বুকে সূর্যের হারিয়ে যাওয়া, নীল জলরাশির উন্মত্ততা, এগুলো হলো সমুদ্রের অপার রহস্য আর সৌন্দর্য। আবার এই সমুদ্র যখন উন্মাতাল হয়ে যায়, সে হয়ে ওঠে বিধ্বংসী আর ভয়ংকর। যে-জলরাশির মাধ্যমে জীবন সঞ্চারিত হয়, সেই জলরাশিই হয়ে ওঠে জীবন হরণের কারণ। খুব অদ্ভুত না?’

সাজিদের কথা শুনে রাজিব বেশ অবাক হলো বলে মনে হলো। মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বলল, “আসলেই অদ্ভুত!’

সমুদ্র নিয়ে যে সাজিদ এত দার্শনিকসুলভ চিন্তা-ভাবনা করতে পারে তা আমি জানতাম না। অবশ্য ওর যত দার্শনিকতা সব পেটের মধ্যেই জমিয়ে রাখে। প্রসঙ্গ এসে পড়লেই সেগুলো বের হয়ে আসে।

সমুদ্রের বুক চিরে ছুটে চলেছে আমাদের ট্রলার। সাজিদের ভাষায় ভয়ংকর এই সুন্দরের সাথে এরকম চ্যালেঞ্জ চ্যালেঞ্জ খেলা খেলতে বেশ ভালোই লাগছে আমার। রাজিব আবারও সাজিদকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘মনে হচ্ছে সমুদ্র নিয়ে তোমার বেশ আগ্রহ আছে?

সাজিদ মাথা নেড়ে বলল, হ্যাঁ।

‘তাহলে তো তোমার ঝুলিতে বেশ চমৎকার-সব গল্প আছে সমুদ্র নিয়ে, তাই না?

সাজিদ আবারও মাথা নেড়ে ‘হ্যাঁ’ বলল। রাজিব বলল, তাহলে তো সেই গল্পগুলো আমাদের সাথে তুমি করতেই পারে। আমার দিকে তাকিয়ে রাজিব আবার বলল, ‘তুমি কী বলো আরিফ?’

আমি বললাম, সহমত।

সমুদ্র নিয়ে কোন ধরনের গল্প যে সাজিদ করবে তা আমার জানা নেই। সে বিভিন্ন দেশের সমুদ্রের বুকে ঘুরে বেড়িয়েছে তার বাবার সাথে। সেগুলোর কিছু কিছু গল্প আমার সাথে সে শেয়ারও করেছিল আগে। পর্তুগিজ জেলেদের সমুদ্র থেকে তিমি মাছ শিকারের কাহিনিটাই সবচেয়ে মজার ছিল। সেটি নিয়ে সাজিদের বাবার লেখা একটি ইয়া বিশাল আর্টিকেলও আছে।

সাজিদ সম্ভবত এতক্ষণে ঠিক করে ফেলেছে—সে সমুদ্র নিয়ে কোন ধরনের গল্প করবে। একটু নড়েচড়ে বসে রাজিবকে দিয়েই শুরু করল। বলল, “রাজিব, তোকে যদি এখন ধাক্কা দিয়ে ট্রলার থেকে ফেলে দিই, কেমন হবে তাহলে?

রাজিব চোখেমুখে বিস্ময় নিয়ে বলল, “কী অদ্ভুত! আমাকে সমুদ্রে ফেলতে যাবে কেন? আমিও বুঝলাম না ব্যাপারটি। সমুদ্রের গল্পে হঠাৎ করে এরকম ফেলে দেওয়া-দেওয়ি কীভাবে ঢুকল? রাজিবের চেহারার বিষন্নতা দেখে হেসে ফেলল সাজিদ। বলল, ‘ভয় পাচ্ছিস কেন? আমি কি সত্যি সত্যিই তোকে ফেলতে যাব নাকি? মজা করে বললাম।

রাজিব বলল, “তোমার কোনটি মজা আর কোনটি যে সিরিয়াস সেটি বোঝাই তো দুরূহ ব্যাপার।

আমি মনে করেছিলাম রাজিব খুব সাহসী ছেলে। ফটোগ্রাফারদের বন-জঙ্গল, পাহাড়-পর্বত, সমুদ্র-অরণ্য চষে বেড়িয়ে প্রকৃতির সবচেয়ে সুন্দর রূপ আর মুহূর্তগুলো ক্যামেরাবন্দী করতে হয়। এরকম কাজ রাজিবের মতো ভীতু টাইপের একটি ছেলেকে দিয়ে কীভাবে সম্ভব হচ্ছে সেটাই এখন আমার কাছে আশ্চর্যের।

সাজিদ বলল, “তোদের তাহলে সমুদ্রের গল্পই বলা যাক, কী বলিস রাজিব?’

‘শুরু করো শুরু করো’, রাজিব উৎসাহের সাথে বলল।

সাজিদ নড়েচড়ে বসল। এরপর বলতে লাগল, ‘সমুদ্রের অনেক ব্যাপার কম-বেশি আমরা সকলেই জানি। আজ আমি এমন কিছু বলব, যা সম্ভবত তোদের দুজনের কেউই জানিস না।

‘ওয়াও, বলে চিৎকার দিয়ে উঠল রাজিব। তাকে বেশ উৎসুক আর উৎফুল্ল বলে মনে হচ্ছে। সাজিদ যে নতুন কিছু বলতে যাচ্ছে সেটি নিশ্চিত। সে কখনো একই গল্প দু-বার আমার কাছে বলবে না। তার মানে হলো সে এখন যে-গল্প বলতে যাচ্ছে সেই গল্প আমি আগে শুনিনি। নতুন গল্প শোেনার জন্যে আমি নিজেও একপ্রকার উৎসুক হয়ে আছি বলা চলে।

সাজিদ বলতে শুরু করল, ‘সমুদ্রের অপার সৌন্দর্যের মধ্যে একটি হলো তীরে উপচে পড়া ঢেউগুলো। এই ঢেউগুলো নিয়ে অসংখ্য কবিতা লেখা হয়েছে। এই ঢেউয়ের কথা এসেছে গল্প, উপন্যাস আর নাটকেও; কিন্তু যে-ঢেউ সাধারণত আমরা দেখে থাকি সেই ঢেউ ছাড়া আরও এক প্রকার ঢেউ আছে সমুদ্রে। মজার ব্যাপার হলো, এই ঢেউ নিয়ে কোনোদিন কোনোকবিতা লেখা হয়নি। এই ঢেউয়ের কথা কোনোদিন কোনোগল্প, উপন্যাস কিংবা নাটকেও আসেনি। এমনকি, গত শতাব্দীতেও বিজ্ঞানীরা এই ঢেউয়ের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানত না।

রাজিব বেশ অবাক হয়ে প্রশ্ন করল, সেটি আবার কেমন ঢেউ?’

আমি বললাম, “ঢেউ তো ঢেউই। ঢেউ আবার দুই প্রকার কীভাবে হয়? ‘হয়’, বলল সাজিদ। এই ঢেউয়ের অস্তিত্ব ওপরে নয়, সমুদ্রের গভীরে।

ব্যাপারটি আমি বুঝে উঠতে পারলাম না। সাজিদকে বললাম, “তুই বলতে চাইছিস যে সমুদ্রের গভীরেও এক ধরনের ঢেউ তৈরি হয় এবং তা অদৃশ্য থাকে? কেউ দেখতে পায় না?

‘এক্সাক্টলি’, বলল সাজিদ। সমুদ্রের রয়েছে কয়েকটি স্তর। সব স্তরে পানির ঘনত্ব সমান থাকে না। কোনোস্তরে পানির ঘনত্ব কম আবার কোনোস্তরে বেশি। সমুদ্রের গভীরতা যত বেশি, পানির ঘনত্বও তত বেশি। আবার গভীরতা যত কম, পানির ঘনত্বও তত কম হয়।

‘তো?’, প্রশ্ন রাজিবের।

‘তো, সমুদ্রের এসব স্তরের মধ্যে রয়েছে একটি সূক্ষ্ম সংযোগ। বেশি ঘনত্বের পানি যখন কম ঘনত্বের পানির সাথে এসে মেশে, তখন সেখানে একটি ঢেউয়ের সৃষ্টি হয়।[১]

[১] Oceanography, Page : 205

আগের অংশ টুকু পড়তে[এখানে ক্লিক করুন]পরের অংশ টুকু পড়তে[এখানে ক্লিক করুন]

ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে। তাহলে আপনিও ব্লগের কার্যক্রম কে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার লেখণী পাঠাতে পারেন।আপনার লেখনী পাঠিয়ে আমাদের ফেচবুক পেজের ম্যাসেঞ্জারে গিয়ে দয়াকরে নক করুন।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন