সমুদ্রবিজ্ঞান পাট-থ্রি

আমি বললাম, “এই ঢেউ চোখে দেখা যায় না?

সাজিদ বলল, ‘না। কেবল পানির লবণাক্ততা এবং তাপমাত্রা পরীক্ষা করেই এই ঢেউয়ের অস্তিত্ব নিরূপণ করা সম্ভব। তাহলে বুঝতেই পারছিস খুব অত্যাধুনিক বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি না হলে এই ঢেউয়ের ব্যাপারে জানা কোনোভাবেই সম্ভব না এবং আরও মজার ব্যাপার হলো, বিজ্ঞানীরা মাত্র কয়েক বছর আগেই এ ব্যাপারে জানতে পেরেছে।

রাজিব বলল, ‘মজার তো?’

সমুদ্রের তীব্র বাতাসে আমাদের শরীরে প্রচণ্ড কাঁপনি ধরিয়ে দিল। ভাগ্যিস আমরা ব্যাগে করে চাদর নিয়ে এসেছিলাম। গায়ে চাদর মুড়িয়ে আমরা আবার আড্ডায় মজে গেলাম।

‘বিস্ময়ের কিন্তু এখানেই শেষ নয়। সমুদ্রের গভীরে রয়েছে এক অদ্ভুত রকমের অন্ধকার।

‘অদ্ভুত রকমের অন্ধকার?’, জানতে চাইল রাজিব।।

‘হ্যাঁ।

‘কীরকম সেটা?

‘সূর্য থেকে সাতটি রং সমুদ্রের পানিতে এসে পড়ে। এই সাতটি রং হলো লাল, নীল, বেগুনি, সবুজ, কমলা, আসমানী আর হলুদ। আমি বললাম, তার মানে রংধনু?

‘এক্সাক্টলি’, বলল সাজিদ। রংধনুর রংগুলো যখন সূর্য থেকে সমুদ্রে এসে পড়ে, তখন সেগুলো সমুদ্রের পানি ভেদ করে গভীরে ঢুকতে থাকে। গভীরে যেতে যেতে এই রংগুলো আস্তে আস্তে মিলিয়ে যায়। রাজিব বলল, “সাজিদ ভাই, তোমার কথার কিছুই কিন্তু আমি বুঝতে পারলাম না।

‘আচ্ছা আমি বুঝিয়ে বলছি তোকে। সূর্য থেকে প্রতিফলিত আলোর রং যখন সমুদ্রের পানিতে মেশে, সেই রং তখন ধীরে ধীরে গভীরে প্রবেশ করতে শুরু করে।

সমুদ্রের প্রথম বিশ মিটার পর্যন্ত পানিতে কেবল লাল রঙেরই আধিক্য থাকে। এরপর বিশ মিটার পার হয়ে যখনই পচিশ মিটারে পৌঁছায়, তখন কিন্তু পানিতে আর লাল রং থাকে না। লাল রং এর আগেই মিলিয়ে গেছে।

‘প্রতি বিশ মিটার পরপরই কি এভাবে একেকটি রং ফিকে হয়ে হারিয়ে যায়?’, প্রশ্ন করলাম আমি।

‘অনেকটাই তা-ই’, বলল সাজিদ। বলা চলে প্রতি বিশ থেকে ত্রিশ মিটারের পরেই একেকটি রং হারিয়ে ফিকে হয়ে যায়। একারণেই, সমুদ্রের প্রথম বিশ মিটারে যেকোননা কিছুকে লাল দেখায়, পরের বিশ মিটারে হলুদ, এরপরে নীল, তারপরে সবুজ।

‘দারুণ তো! এ তো দেখি সমুদ্রের নিচে রঙের খেলা’, বলল রাজিব।

‘হুম। তবে রঙের এই আধিপত্য দুইশো মিটার পর্যন্তই। দুইশো মিটারের ঘরে পোঁছেই সব রং ফিকে হয়ে হারিয়ে যায়। ফলে সমুদ্রের নিচে দুইশো মিটারের পরে আর কোনোরঙের উপস্থিতি না থাকায় সেই অঞ্চল হয় একেবারে ঘুটঘুটে অন্ধকার। সেখানে যদি কেউ হাত বের করে চোখের সামনে আনে তারপরেও সে তার হাত দেখতে পাবে না।

দুইশো মিটার নিচে কি কোনোমানুষের পক্ষে যাওয়া সম্ভব?’, প্রশ্ন রাজিবের।

‘তা অবশ্য অসম্ভব। তবে সাবমেরিন আবিষ্কারের পরে বিজ্ঞানীরা এমন অনেক অসম্ভব ব্যাপারকে জানার ব্যাপারে আমাদের জন্য সহজ করে দিয়েছে; কিন্তু আজ থেকে মাত্র কয়েক বছর আগেও সমুদ্রের নিচের এই নিকষ কালো অন্ধকার সম্পর্কে কেউ জানত না। এমনকি এটাও জানত না যে, সমুদ্রের গভীরেও একটি ঢেউয়ের সৃষ্টি হয়। যদি জানত তাহলে সেগুলোও নিয়েও হয়তো কবিতা লেখা হতো। সেগুলোও হয়তো স্থান পেত কবি-সাহিত্যিকদের সাহিত্যে।

রাজিব বলল, “আসলেই অদ্ভুত! প্রকৃতিজুড়ে এরকম কত রহস্য যে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে আল্লাহ মালুম৷

সাজিদ বলল, “তবে, আধুনিক বিজ্ঞানের আবিষ্কারের আগে এই ব্যাপারটি সম্পর্কে একজন কিন্তু ঠিকই জানে।

উৎসুক চোখ নিয়ে রাজিব বলল, “কে?

আমার দৃষ্টিও সাজিদের দিকে নিবদ্ধ। একটু আগেই সে বলল, এই ব্যাপারগুলো সম্পর্কে নাকি সেদিনও কেউ কিছু জানত না, আবার এখন বলছে বিজ্ঞানের আবিষ্কারের আগেও একজন ঠিকই জানত। কে হতে পারে সেই একজন? আমিও প্রশ্ন করে বসলাম, কে?

হেসে ফেলল সে। বলল, “আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা। এবং শুধু তা-ই নয়, কুরআনের একটি আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা এই ব্যাপারে আজ থেকে সাড়ে চৌদ্দশো বছর আগেই মানবজাতিকে জানিয়ে রেখেছেন।

রাজিবের চোখেমুখে বিস্ময়ের পারদ সর্বোচ্চ পর্যায়ে এসে ঠেকেছে। সে এতক্ষণ বুঝতেই পারেনি যে, কাহিনি এরকম একটি মোড় নেবে। তা ছাড়া, অতি সাম্প্রতিক এই ব্যাপারগুলো কীভাবে সাড়ে চৌদ্দশো বছর আগের কুরআনে থাকতে পারে সেটাও তার মাথায় ধরছে না। সে বলল, “সত্যি সত্যিই?’

‘হ্যাঁ। সত্যি সত্যিই।

বিস্ময়ে তার কণ্ঠে উত্তেজনার আমেজ পাওয়া যাচ্ছে। সে বলল, আমি শুনতে চাই প্লিজ।

সাজিদ আরেকটু নড়েচড়ে বসল। এরপর বলতে শুরু করল, “কুরআনের সূরা নূরের চল্লিশ নম্বর আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা কাফিরদের দৃষ্টান্ত দিতে গিয়ে এমন কিছু উপমা টেনেছেন, যা আজকের আধুনিক বিজ্ঞানের দ্বারা প্রমাণিত। উক্ত আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলছেন, তাদের (কাফিরদের আমলের) অবস্থা হচ্ছে গভীর সমুদ্রে ঘনীভূত অন্ধকারের মতো, যাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে ঢেউয়ের ওপর ঢেউ। তার উপরিভাগে রয়েছে ঘন মেঘমালা। অন্ধকারের ওপর আরেক অন্ধকার। কেউ যদি তাতে নিজের হাত বের করে তখন সে নিজের হাতটাও আর দেখতে পায় না। আল্লাহ যাকে আলো দান করেন না তার জন্যে আর কোনোআলো থাকে না।

খেয়াল করো, এই আয়াতে উপমার মূল বিষয়বস্তু হিশেবে কোনটি ধরা হয়েছে? সেটি হলো সমুদ্র। এরপর সেখানে নতুন উপমা হিশেবে নিয়ে আসা হয়েছে আরও কিছু ব্যাপার, যা আসলে সমুদ্রের বৈশিষ্ট্যের অন্তর্গত। সেগুলো কী কী? প্রথমে বলা হলো তাদের অবস্থা হচ্ছে গভীর সমুদ্রে ঘনীভূত অন্ধকারের মতো। সমুদ্রের গভীরে যে অন্ধকার থাকে, সেটি সাবমেরিন আবিষ্কারের আগে মানুষ জানতই না। কারণ, সমুদ্রের নিচে যতটুকু পর্যন্ত মানুষ পৌঁছাতে পারত তাতে কোনো অন্ধকারের লেশমাত্র ছিল না। আগেই বলেছি সমুদ্রের দুইশো মিটার গভীর পর্যন্ত আলো পৌঁছাতে পারে। এর নিচে আর আলো যেতে পারে না। ব্যাপার হচ্ছে, যে জিনিসটি সাবমেরিন আবিষ্কারের আগে বিজ্ঞানীরাই জানত না, সেটি আজ থেকে সাড়ে চৌদ্দশো বছর আগে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কীভাবে জানলেন?

এরপরের অংশে বলা হচ্ছে, সেই অন্ধকারকে আচ্ছন্ন করে আছে ঢেউ এবং তার ওপরে আরও ঢেউ। তার উপরিভাগে রয়েছে ঘন মেঘমালা।

এই অংশটুকু খুবই ইন্টারেস্টিং। আল্লাহ বলছেন, “সেই অন্ধকারকে আচ্ছন্ন করে আছে ঢেউ এবং তার ওপর আরও ঢেউ। এখানে খুবই স্পষ্টভাবে দুইটি ঢেউয়ের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেছেন। ঢেউ এবং তার ওপরে আরও ঢেউ এবং তার ওপরে মেঘমালা। তাহলে, এখানে প্রথম যে-ঢেউয়ের কথা বলা হচ্ছে সেটি হলো সমুদ্রের গভীরের যে-ঢেউয়ের কথা বলেছিলাম, সেটাই। Internal Waves এই ঢেউয়ের ওপরে রয়েছে আরেকটি ঢেউ। সেটি কোনটি তাহলে? সেটি হলো সমুদ্রের উপরিভাগের ঢেউ যা আমরা চোখে দেখি, উপভোগ করি। যে-ঢেউয়ের কথা কবি-সাহিত্যিকরা কবিতা-গল্প আর উপন্যাসে লিখে থাকে। এর ওপরে রয়েছে মেঘমালা। একদম ক্লিয়ার। সমুদ্রের উপরিভাগেই তো মেঘ থাকে। একটি আয়াতে উপমা টানতে গিয়ে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা দুই দুইটি সমুদ্রবিজ্ঞানের কথা আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন। এটি আজ থেকে সাড়ে চৌদ্দশো বছর আগে কোনোমানুষের পক্ষে জানা এবং বলে দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। এটি সমুদ্রের সৃষ্টিকর্তা, যার নির্দেশে সমুদ্র প্রবাহিত, তার পক্ষ থেকে আসা বলেই সম্ভব।

রাজিবের মুখে কোনোকথা নেই। সে এতটাই হতভম্ব হয়ে গেছে যে—মুখ দিয়ে কোনোশব্দই বেরুচ্ছে না। সাজিদ আমাকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘আরিফ, তোকে একবার ড. গ্যারি মিলারের ব্যাপারে বলেছিলাম না?’

‘কোন গ্যারি মিলার? ওই যে ম্যাথমেটিশিয়ান, যিনি পরে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন?

‘হ্যাঁ। তার কথাই বলছি। তিনি একবার একটি ঘটনা বলেছিলেন। ঘটনাটি ছিল এরকম, কানাডার টরেন্টোর এক নাবিককে একবার তার এক মুসলিম বন্ধু কুরআনের একটি কপি উপহার দিয়েছিল। বেচারা তখনো ইসলাম এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে কিছুই জানতেন না, তবে কুরআন তিনি বেশ আগ্রহভরেই গ্রহণ করেছিলেন। কুরআন পড়ে শেষ করে যখন সেই মুসলিম বন্ধুর কাছে তিনি সেটি ফেরত দিচ্ছিলেন, তখন বললেন, ‘আচ্ছা বন্ধু, এই বইটির লেখক মুহাম্মদ কি কোনো নাবিক ছিলেন?

অর্থাৎ তিনি জানতে চাইলেন, এই বই যিনি লিখেছেন তিনি কোনো জাহাজের নাবিক ছিলেন কি না, যার সমুদ্র সম্পর্কে বেশ ভালো রকমের জানাশোনা ছিল। তিনি মূলত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকেই কুরআনের রচয়িতা মনে করেছিলেন। তখন সেই মুসলিম বন্ধু বলল, “না তো। তিনি তো কোনো নাবিক ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন উত্তপ্ত মরুভূমির বাসিন্দা। এই কথা শুনে তিনি খুবই অবাক হলেন। বললেন, কীভাবে সম্ভব? নাবিক কিংবা সমুদ্রবিজ্ঞান সম্পর্কে না জেনে এত নিখুত সামুদ্রিক অবস্থা বর্ণনা করা তো কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে কোনোদিনও সম্ভব না।

রাজিব বলল, “তারপর? ‘তারপর আর কী। সেই লোকটি ইসলাম গ্রহণ করেন।

রাজিব ‘ওয়াও’ বলে আবারও চিৎকার দিয়ে উঠল।

আমরা যখন সেন্ট মার্টিন এসে পৌঁছালাম তখন রাত নয়টা বেজে সাইত্রিশ মিনিট। ট্রলার থেকে নেমেই আমরা ভালো একটি হোটেলের সন্ধানে লেগে গেলাম। শেষমেশ যে-হোটেলটায় উঠলাম সেটার নাম ‘সীমানা পেরিয়ে। হোটেলের নাম নির্বাচনের ক্ষেত্রেও মানুষের ক্রিয়েটিভিটি দেখে আশান্বিত হওয়াই যায়।

আগের অংশ টুকু পড়তে[এখানে ক্লিক করুন]

এই ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে তাহলে দয়া করে ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ একে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন