মূল: প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ ২ । লেখক: আরিফ আজাদ । ওয়েব সম্পাদনা: আবু বক্কার ওয়াইস বিন আমর

আজ আমার আবৃত্তির ক্লাস আছে। নতুন একটি আবৃত্তি ক্লাবে জয়েন করেছি সেদিন। কবিতার প্রতি অন্যরকম ভালোলাগা থেকেই মূলত আবৃত্তি ক্লাবে আসা। সারা দিন গুনগুন করে কবিতা আওড়াই। যেদিন থেকে আবৃত্তি শিখতে শুরু করেছি, সেদিন থেকে আমার মধ্যে অদ্ভুত কিছু ব্যাপার দেখা দিয়েছে। কয়েকদিন আগের কথা। সাজিদসহ ফিরছিলাম সদরঘাট থেকে। দেখতে গিয়েছিলাম বুড়িগঙ্গা নদী। একটি জীবন্ত, সতেজ আর শুদ্ধ স্রোতের নদী মানুষের অত্যাচারে কীভাবে ধুকেধুকে মরে যায়, তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ এই বুড়িগঙ্গা।

আসার পথে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে খুব সুন্দর একটি বিলবোর্ড দেখলাম। সম্ভবত কোনো বেসরকারি এনজিওর বিলবোর্ড হবে। সাধারণত কোম্পানি আর কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিলবোর্ড হয় বলে জানতাম; কিন্তু এরকম এনজিওরও বিলবোর্ড থাকে সেটি আমি ওইদিনই জানতে পারলাম। যাই হোক, ওই বিলবোর্ডে বেশ সুন্দর কিছু কথা লেখা ছিল। মানবসেবাধর্মী কথা। কথাগুলোতে চোখ পড়ে যাওয়ায় আমি থমকে দাঁড়িয়ে সেগুলোর ওপর চোখ বুলাতে লাগলাম। এভাবে বেশ কিছুক্ষণ কেটে গেল। আমি ওদিকে তাকিয়েই আছি। বিলবোর্ডের দিকে তাকিয়ে আমাকে এরকম ‘হাঁ’ হয়ে থাকতে দেখে সাজিদ বলল, ‘ওটি কবিতা নয়, বিলবোর্ড। এত মনোযোগ দিয়ে পড়ার কিছু নেই।

ওর কথা শুনে আমার সংবিৎ ফিরল। খেয়াল করলাম সে আমার দিকে বেশ বিরক্ত চেহারা নিয়ে তাকিয়ে আছে। আমার দিকে তাকিয়ে সে বলল, “মানুষ তো বায়োস্কোপের মধ্যেও এভাবে চোখ ডুবিয়ে দেয় না, তুই বিলবোর্ডে যেভাবে ডুব দিয়েছিস।

আমার এই হয়েছে এক সমস্যা। সবখানে আমি আজকাল সাহিত্য খুঁজে বেড়াই। আমার সেই খোঁজাখুঁজি বিলবোর্ড থেকে শুরু করে ঝালমুড়ির ঠোঙা পর্যন্ত বিস্তৃত।

সকাল থেকে আমি একটি কবিতাই আবৃত্তি করে যাচ্ছি। নির্মলেন্দু গুণের ‘স্ববিরোধী’ কবিতাটি।।

আমি জন্মেছিলাম এক বিষন্ন বর্ষায়

কিন্তু আমার প্রিয় ঋতু বসন্ত। আমি জন্মেছিলাম এক আষাঢ় সকালে কিন্তু ভালোবাসি চৈত্রের বিকেল।

আমি জন্মেছিলাম দিনের শুরুতে কিন্তু ভালোবাসি নিঃশব্দ নির্জন নিশি। আমি জন্মেছিলাম ছায়াসুনিবিড় গ্রামে ভালোবাসি বৃক্ষহীন রৌদ্রদগ্ধ ঢাকা। জন্মের সময় আমি খুব কেঁদেছিলাম এখন আমার সবকিছুতেই হাসি পায়। আমি জন্মের প্রয়োজনে ছোট হয়েছিলাম এখন মৃত্যুর প্রয়োজনে বড় হচ্ছি।

কবি নির্মলেন্দু গুণের একটি ব্যাপারের সাথে আমার বেশ মিল পাচ্ছি। কবি জন্মেছেন বর্ষায়; কিন্তু বর্ষার বদলে তার পছন্দের ঋতু হলো বসন্ত। বাবার কাছে শুনেছি, আমি নাকি জন্মেছিলাম ফাগুন মাসে। ফাগুনের আগুন লাগা সময়ে যখন গাছগুলো কৃষ্ণচূড়া ফুলে রক্তাক্ত লাল হয়ে ওঠে, ঠিক ওই সময়টাতেই নাকি আমার জন্ম। ফাগুন মাসে জন্মালেও লাল রং আমার একদম অপছন্দ। বিচ্ছিরি লাগে। নির্মলেন্দু গুণের সাথে আমার এরকম অপূর্ব মিল দেখে আমি যারপরনাই আনন্দিত।

সাজিদ তার বেডের ওপরে শুয়ে ম্যাগাজিন পড়ছে। আমি যে এত সুন্দর করে কবিতা আবৃত্তি করছি সেদিকে তার কোনোভুক্ষেপই নেই। সবকিছুতেই তার এই নির্মোহ ভাবটি আমার কাছে বিরক্তিকর লাগে।

আমি তাকে উদ্দেশ্য করে বললাম, “শুনছিস?

সে মুখের ওপর থেকে ম্যাগাজিন না সরিয়েই বলল, ‘বল।

‘আমার সাথে না নির্মলেন্দু গুণের একটি ব্যাপারে বেশ মিল আছে।

সাজিদ বলল, ‘হুম। এটি বলেই সে আবার চুপ মেরে গেল। আমি আবার বললাম, ‘কোন ব্যাপারে মিল আছে শুনবি না?”

‘বল।”

আমি তার বেডে এসে বসলাম। বললাম, ‘মুখের ওপর এরকম ছাতা টেনে রাখলে কথা বলা যায়?

সে এবার ম্যাগাজিনটি সরিয়ে আমার দিকে তাকাল। বলল, “ঠিক আছে, বল।

আমি এবার একটু নড়েচড়ে বসলাম। নিজের গল্প অন্যকে শোনাতে আমার বেশ লাগে। বললাম, কবি নির্মলেন্দু গুণের নাকি বর্ষাকাল পছন্দ না। অথচ তিনি জন্মেছেন ঘোর বর্ষায়।

সাজিদ বলল, “হুম।

‘তার সাথে আমার একটি মিল রয়েছে। আমি জন্মেছি ফাগুন মাসে; কিন্তু লাল রং আমার একদম অপছন্দ। বিচ্ছিরি।

‘ফাগুনের সাথে লাল রঙের কী সম্পর্ক?’, জিজ্ঞেস করল সাজিদ।

“ওমা! ফাগুন মাসেই তো কৃষ্ণচূড়া ফুল ফোটে, তাই না?

‘তো? কৃষ্ণচূড়া ফুল কি তুই পছন্দ করিস না?

‘তা তো করি।

‘তাহলে?

‘লাল রংটি কেমন যেন অপছন্দের।

সাজিদ জোরে একটি নিঃশ্বাস নিয়ে বলল, “ফাগুন মাসের সাথে লাল রঙের কোনোসম্পর্ক নেই। ফাগুন মাসে অনেক অনেক ফুল ফোটে। সেই ফুলগুলোর কোনোটির রং সবুজ, কোনোটি নীল। কোনোটি আবার হলুদ। তার মধ্যে কৃষ্ণচূড়া হলো টকটকে লাল। কবির অপছন্দ হলো বর্ষাঋতু, আর তোর অপছন্দ কেবল একটি নির্দিষ্ট রং। কবির সাথে তাহলে তোর মিল কোথায়?

সাজিদের সাথে আমি কখনো খুব বেশি তর্কে যাই না। আমার ধারণা পৃথিবীতে যদি সেরা তিনজন কাঠখোট্টা তোক নির্বাচন করা হয়, তার মধ্যে সাজিদের নামও থাকবে। দুনিয়ার সবকিছু নিয়েই তার বিশ্লেষণ থাকে। সেই বিশ্লেষণগুলো আবার যুক্তি, দর্শন আর বিজ্ঞাননির্ভর। একজন সুস্থ মানুষের মাথা ধরিয়ে দেওয়ার জন্যে এরকম একজন লোকই যথেষ্ট।

দ্রুতই প্রসঙ্গ পাল্টানো উচিত। তাকে বললাম, “হ্যাঁ রে, তোর পছন্দ কীসে? মানে, প্রকৃতির কোন জিনিসটি তোর বেশি পছন্দের?

সাজিদ আবারও চুপ মেরে গেল। হঠাৎ করে ভিন্ন প্রসঙ্গে চলে যাওয়াতে সে হয়তো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়েছে। আবার বললাম, “তোর কি সমুদ্র দেখতে ভালো লাগে?

সে মাথা নেড়ে ‘হ্যাঁ বলল। আমি বললাম, “চল, তাহলে আমরা একদিন সমুদ্র দেখতে যাই।

আমার এই প্রস্তাবে সাজিদ রাজি হয়ে গেল। বললাম, “কোথায় যাবি? কক্সবাজার সেন্ট মার্টিন?’

সে কিছুক্ষণ ভেবে এরপর বলল, “সেন্ট মার্টিন যাওয়া যায়। শীতের এই সময়টায় সেন্ট মার্টিনে থাকে দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড়। সমুদ্রবিলাসী মানুষগুলো এই মৌসুমে দল বেঁধে এখানে আসে। স্বচ্ছ নোনা জল, পাথর বিছানোপথ আর দৃষ্টিসীমাজুড়ে জলতরঙ্গ—পৃথিবী যেন তার সব সৌন্দর্যের ডালাহাতে দাঁড়িয়ে আছে এই দ্বীপে।

এমন সময়ে টিকেট পাওয়া খুবই দুরূহ ব্যাপার। তবে আমাদের ‘থিওরি অফ এভ্রিথিং বালক মাশুককে টিকেটের ব্যবস্থা করতে বলা মাত্রই সে বলল, এটি কোনোব্যাপার হলো দোস্ত?

মাশুককে আমরা ‘থিওরি অফ এভ্রিথিং’ বলে ডাকি। আমাদের যার যা সমস্যা, সবকিছুর সমাধান মাশুকের কাছে পাওয়া যাবে। কারও ক্লাসে প্রক্সি দেওয়া লাগবে? মাশুককে বললেই কাজ হয়ে যায়। ডিপার্টমেন্ট চেয়ারম্যানের কাছে কোনো অভিযোগ করা লাগবে? মাশুকই ভরসা। ডিপার্টমেন্টে কোনো প্রোগ্রামের আয়োজন করা লাগবে? মাশুক একাই একশো। কারও কারও মতে, দুনিয়ায় এমন কোনো সমস্যার জন্ম হয়নি, যেটার সমাধান মাশুকের কাছে নেই। সেই থেকে মাশুকের নাম হয়ে গেছে ‘থিওরি অফ এভরিথিং।

মাশুক ঠিক ঠিক আমাদের জন্য তিনটে টিকেট জোগাড় করে নিয়ে এলো। সে কীভাবে যেন পেরে যায় সবকিছু। সে যখন টিকেট নিয়ে এলো, তখন আমি বেশ বিস্ময় নিয়ে বললাম, কীভাবে ম্যানেজ করলি?

মাশুক তার সেই কমন ডায়ালগ ছেড়ে বলল, “এটি কোনোব্যাপার হলো দোস্ত?

আসলেই তার কাছে এটি কোনোব্যাপার না। এই কারণেই তার নাম থিওরি অফ এভ্রিথিং।

দু-দিন পর আমরা রওনা করলাম। আমি, সাজিদ আর রাজিব। রাজিবের পরিচয় দিয়ে নিই। পুরো ঢাবি ক্যাম্পাসের সেরা কয়েকজন ফটোগ্রাফারের একজন ও। শুধু ঢাবি বললে অবশ্য ভুল হবে, বাংলাদেশের সেরা ফটোগ্রাফারদের তালিকা করা হলে সেখানেও অনায়েসে ঢুকে পড়বে সে। ফটোগ্রাফিতে আন্তর্জাতিক পুরস্কারও এই বয়সে পকেটে পুরে নিয়েছে। আমার মুখে সেন্ট মার্টিন যাওয়ার কথা শুনেই এক পায়ে খাড়া হয়ে গেল যাওয়ার জন্য।

বাসে করে আমরা ঢাকা থেকে রওনা করলাম। আমাদের বাস যখন টেকনাফে এসে ঢুকল, তখন সন্ধ্যে প্রায়। প্রচণ্ড খিদেয় আমাদের পেটের নাড়িভুড়ি হজম হয়ে যাওয়ার জোগাড়। পাশের একটি হোটেলে ঢুকে খাওয়া-দাওয়া সেরে বের হয়ে এলাম।

আমরা ধরেই নিয়েছিলাম—রাতের সমুদ্রবিলাস উদ্যাপন করতে করতেই আমরা সেন্ট মার্টিন গিয়ে পৌঁছাব; কিন্তু না। এখানে এসে জানতে পারলাম যে, রাতের বেলায় এখান থেকে কোনো জাহাজই সেন্ট মার্টিন যায় না। মহা বিপদ!

পরের অংশ টুকু পড়তে[এখানে ক্লিক করুন]

ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে। তাহলে আপনিও ব্লগের কার্যক্রম কে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার লেখণী পাঠাতে পারেন।আপনার লেখনী পাঠিয়ে আমাদের ফেচবুক পেজের ম্যাসেঞ্জারে গিয়ে দয়াকরে নক করুন।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন