সূর্য যাবে ডুবে -পাট ওয়ান

চোখজোড়া ‘প্রণোদনা ম্যাগাজিনের ওই পাতাগুলোতেই আটকে আছে। আমি আবার পড়তে শুরু করলাম :

‘এখন যে-কেউ প্রশ্ন করতে পারে, সাম্প্রতিক বিজ্ঞানের আবিষ্কৃত তথ্য চৌদ্দশো বছর আগের একটি বইতে কীভাবে থাকতে পারে? এই প্রশ্নটি আসা স্বাভাবিক। প্রথমত, আমাদের যে-জিনিসটি বুঝতে হবে তা হলো, এই কুরআন কোনো মানুষের লেখা বই নয়। এটি এমন এক সত্তার বাণী, যিনি সৃষ্টি করেছেন পৃথিবী এবং পৃথিবীর বাইরের সবকিছু। তিনিই সৃষ্টি করেছেন চাঁদ, তারা, সূর্য, নক্ষত্র, গ্যালাক্সি। তিনিই সৃষ্টি করেছেন পাহাড়-পর্বত, নদী, সমুদ্র, বন—সবকিছুর ওপর তিনিই একচ্ছত্র অধিপতি। তিনি সময়ের বাঁধনে আবদ্ধ নন; বরং তিনিই সময়ের সৃষ্টিকর্তা। মহাকাশের ক্ষুদ্র তারকা থেকে গভীর সমুদ্রতলের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বালুকণা—এমন কোনোপদার্থ, এমন কোনোজিনিস নেই, যা সম্পর্কে তিনি ওয়াকিবহাল নন। এদের অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ সবই তার জানা। সূর্য এবং নক্ষত্ররাজির সৃষ্টিকর্তাই তো জানবেন—এদের ভবিষ্যৎ পরিণতি কী হতে পারে। সুতরাং, সূর্যের সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকে আসা বাণীর মধ্যে সূর্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা থাকবে, এটি খুব আশ্চর্যের কিছু নয়। বিশ্বাসী মানুষমাত্রই এটি সহজে বুঝতে পারবে। দ্বিতীয়ত এই কুরআন কোনোসাইন্সের বই নয়। অর্থাৎ এটি এমন কোনোবই নয় যে, এতে কেমিস্ট্রির বিক্রিয়া, পদার্থ বিজ্ঞানের সূত্র আর জীববিজ্ঞানের মোটা মোটা থিওরি এতে গত্বাঁধা লেখা থাকবে। এতে সাইন্স থাকবে না; বরং সাইন থাকবে। অর্থাৎ এতে থাকবে বহু নিদর্শন। এই নিদর্শনগুলো কোনো স্পেশাল বিজ্ঞানী বা কোনো স্পেশাল মানুষের জন্যে দেওয়া হয়নি। এগুলো সকল মানুষের জন্যই দেওয়া। তাই এগুলো এমনভাবে দেওয়া হয়েছে যেন মাঠের কৃষক থেকে শুরু করে গবেষণাগারের বিজ্ঞানী, সবাই বুঝে নিতে পারে।

এবার তাহলে আবার প্রসঙ্গে ফিরে আসা যাক। কুরআন কোথায় বলেছে সূর্য একদিন তার সকল শক্তি নিঃশেষ করে আলোহীন, নিস্তেজ হয়ে পড়বে, তাই না?

আমরা প্রথমেই সূরা ইয়াসীনের আটত্রিশ নম্বর আয়াতের দিকে তাকাই। আয়াতটিতে বলা হচ্ছে  ‘And the Sun runs (on course) toward its stopping point. That is the determinaton of the exalted in might, the knowing’

অর্থাৎ এই আয়াতের সরল বাংলা করলে এরকম হয়, ‘আর, সূর্য ছুটে চলছে তার জন্যে নির্দিষ্ট করে দেওয়া গন্তব্যের দিকে। এটি মহাপরাক্রমশালী সর্বজ্ঞের সুনিরুপিত নির্ধারণ।

একটু গভীরভাবে যদি খেয়াল করি, এই আয়াতে সূর্যের জন্য নির্ধারিত গন্তব্য বোঝাতে যে-অ্যারাবিক ওয়ার্ড ব্যবহার করা হয়েছে, সেটি হলো ‘লিমুসতাকাররিন। এই আরবী শব্দের জন্য যদি আমরা ব্রিটিশ ইংরেজি ডিকশনারি খুলি, তাহলে দেখব যে, এই আয়াতের অর্থ করা আছে, ‘The resting place, The stopping point. সরল বাংলা করলে হবে, থেমে যাওয়ার স্থান’, ‘নির্ধারিত গন্তব্য ইত্যাদি।

তাহলে কী বোঝা গেল? উক্ত আয়াতের ভাষ্যমতে, সূর্য তার জন্যে নির্দিষ্ট করে দেওয়া গন্তব্যের দিকে অবিরত ছুটে চলেছে। তার জন্যে একটি নির্দিষ্ট পয়েন্ট, একটি নির্দিষ্ট অবস্থা নির্ধারণ করা আছে, যে-সময়ে, যে-অবস্থায় এসে তাকে থেমে যেতে হবে এবং এটাই হচ্ছে মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার নির্ধারিত নিয়ম।

আধুনিক বিজ্ঞান কী বলছে? আধুনিক বিজ্ঞান বলছে—সূর্যের সকল জ্বালানি একটি নির্দিষ্ট সময় পরে শেষ হয়ে যাবে। সেদিন সূর্য হয়ে পড়বে তেজহীন, আলোহীন তথা শক্তিহীন। সূর্যের এই জ্বালানি প্রতিনিয়ত নিঃশেষ হচ্ছেই। একটি পর্যায়ে গিয়ে ঘটবে চূড়ান্ত পতন। সেদিন সূর্যকে থেমে যেতে হবে। ঠিক এই কথাগুলোই কি আল কুরআন আজ থেকে সাড়ে চৌদ্দশো বছর আগে আমাদের জানায়নি?

শুধু তা-ই নয়। সূর্য যে একটি সময়ে আলো ও শক্তিহীন হয়ে পড়বে, সে ব্যাপারটি খুব স্পষ্ট করেই বলেছে কুরআন। সূরা তাকবিরের একেবারে শুরুতেই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলছেন, “যখন সূর্য হয়ে পড়বে জ্যোতিহীন।

এই সূরায় আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা কিয়ামতের আগের কিছু নিদর্শন নিয়ে কথা বলেছেন। সেখানে তিনি খুব স্পষ্ট করেই বলেছেন, কিয়ামতের আগে সূর্য জ্যোতিহীন হয়ে পড়বে। কিয়ামত কবে হবে সে-জ্ঞান আমাদের কারও জানা নেই। এমনকি স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকেও কিয়ামতের চূড়ান্ত সময়টি সম্পর্কে জানানো হয়নি। এই জ্ঞান কেবল আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার কাছেই। তো, তিনি বলছেন, কিয়ামতের আগে সূর্য জ্যোতিহীন হয়ে পড়বে। একই কথা কি আমাদের বিজ্ঞানও বলছে না? বিজ্ঞান কি বলছে না, একটি সময়ে গিয়ে সূর্য হারিয়ে ফেলবে তার তেজ, জ্যোতি ও শক্তি? বিজ্ঞান কি বলছে না, সূর্য হয়ে পড়বে আলোহীন? বিজ্ঞান কি বলছে না, সূর্য হয়ে যাবে শ্বেতবামন?

একটি দৃশ্য কল্পনা করার চেষ্টা করা যাক। মরুভূমির অঞ্চল। নিরক্ষর একজন লোক। দিনের আকাশে গনগনে সূর্য দেখে কেন তার মনে হবে এই সূর্য একদিন নেতিয়ে পড়বে? আললাহীন হবে? একজন সাধারণ মানুষ হলে তো তার ভাবা উচিত ছিল যে, এই সূর্য অবিনশ্বর। যার এত তেজ, এত শক্তি, এত তাপ, সে কীভাবে নিঃশেষ হতে পারে? আলোহীন হতে পারে?

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও ঠিক এরকম ভাবতেন যদি তিনি ঐশী বাণীপ্রাপ্ত না হতেন। যদি না তাকে সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্র, গ্যালাক্সির সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা জানাতেন—সূর্য একদিন আলোহীন হয়ে পড়বে। তাকে জানানোহয়েছে কুরআনের মাধ্যমে। তবেই তিনি জেনেছেন।

আধুনিক বিজ্ঞান এই সময়ে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে যে-সকল তথ্য আমাদের জানাচ্ছে, সেই তথ্যগুলো সম্পর্কে আজ থেকে সাড়ে চৌদ্দশো বছর আগে কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছেন। এটি যদি সুমহান আল্লাহর কাছ থেকেই না আসে তবে কীভাবে সম্ভব?

ঘটনার এখানেই শেষ নয়। শুরুতেই বলেছিলাম যে, কেবল সূর্যই নয়, সূর্যের মতো আরও অসংখ্য তারকা, নক্ষত্রের কপালেও জুটবে একই ভবিতব্য। সূর্যের মতো সেগুলোও হয়ে পড়বে আলোহীন, শক্তিহীন ও তাপহীন। তাদের কেউ হয়ে যাবে শ্বেতবামন, আবার কেউ হয়ে যাবে নিউট্রন তারকা। ঠিক এই ইঙ্গিতটাও আমরা পবিত্র কুরআন থেকে পাই। যেমন সূরা তাকবিরের দ্বিতীয় আয়াতেই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেছেন, যখন নক্ষত্ররাজি পতিত হবে (বা অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যাবে)।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই আয়াতে ‘পতিত হওয়া’ বা ‘অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যাওয়া অর্থে যে-আরবী ক্রিয়া ব্যবহার করা হয়েছে সেটি হলো—‘ইনকাদারাত’ এটার দুটো অর্থ। প্রথম অর্থ হলো—কোনোকিছু আলোহীন হয়ে যাওয়া। দ্বিতীয় অর্থ হলো—ঝরে যাওয়া, বিচ্যুত হওয়া, পতিত হওয়া।

আবার,‘কাদারাতুন’ অর্থ হলো—বৃহদাকৃতির পিণ্ড বস্তু। আয়াতটিতে বলা হচ্ছে, ‘ওয়া ইযান নুজুমুন কাদারাত। অর্থাৎ যখন নক্ষত্ররাজি আলোহীন হয়ে বৃহদাকৃতির ঢেলা বা বস্তুপিণ্ডের রূপ ধারণ করবে।

ঠিক এমনটাই আমরা ওপরে জেনেছি। আমরা জেনেছি যে, একটি নির্দিষ্ট সময়ে এসে সূর্যের মতো অন্যান্য উজ্জ্বল নক্ষত্ররাজিও তাদের জ্যোতি হারিয়ে ফেলবে এবং তারা পরিণত হবে শ্বেতবামন আর নিউট্রন তারকায়। আলো, শক্তি-তেজ এবং তাপহীন। এই অবস্থাগুলোকে বর্ণনা করতে গিয়ে কুরআন এভাবে বলছে,

‘যখন সূর্য জ্যোতিহীন হয়ে পড়বে

আর, খসে পড়বে নক্ষত্ররাজি’

এখানেও শেষ নয়। সূরা মুরসালাতের আট নম্বর আয়াতেও ঠিক একই কথা হয়েছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলছেন,

‘যখন নক্ষত্ররাজি হয়ে পড়বে আলোহীন’

আজ সাম্প্রতিক বিজ্ঞান আমাদের যা জানাচ্ছে, সৃষ্টিকুলের মালিক কত আগেই-না তা আমাদের জানিয়ে রেখেছেন। তিনি মানুষকে সত্যানুসন্ধানী হতে বলেছেন। তার সৃষ্টিজগৎ থেকে খুঁজে বের করতে বলেছেন তার নিদর্শনসমূহ। আধুনিক বিজ্ঞানের জন্মের বহু আগে একজন নিরক্ষর লোকের দ্বারা এগুলো রচনা করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তার পক্ষে কখনোই বলা সম্ভব নয় যে, কীভাবে সূর্যের মতো এত তেজস্বী নক্ষত্র আলোহীন হয়ে যেতে পারে। কীভাবে সুবিশাল নক্ষত্ররাজি হয়ে পড়তে পারে আলো, শক্তিহীন। বলা তো দূরের কথা, তার ভাবনাতেও এগুলো আসা স্বাভাবিক যুক্তিবিরুদ্ধ, যদি-না তিনি কোনোঐশীবাণী দ্বারা এগুলো সম্পর্কে জ্ঞাত না হন। এই বাণীগুলো নিশ্চিতরূপে সেখান থেকেই আসা সম্ভব, যে-সত্তা এই আকাশ, সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্রসহ সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা। তিনি সুমহান আল্লাহ।

সাজিদের প্রবন্ধটি এখানেই শেষ। পুরো লেখাটি পড়ার পরে আমার সারা শরীরে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল। আমি বিমোহিত হয়ে রইলাম খানিকক্ষণ। এতটা বিস্ময়ে ভরা আল কুরআন? মানুষকে জানাচ্ছে কিয়ামতপূর্ব কিছু নিদর্শন। অথচ, তার মধ্যেই কি বিজ্ঞানের ছোঁয়া। সুবহানাল্লাহ!

আগের অংশ টুকু পড়তে[এখানে ক্লিক করুন]পরের অংশ টুকু পড়তে[এখানে ক্লিক করুন]

ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে। তাহলে আপনিও ব্লগের কার্যক্রম কে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার লেখণী পাঠাতে পারেন।আপনার লেখনী পাঠিয়ে আমাদের ফেচবুক পেজের ম্যাসেঞ্জারে গিয়ে দয়াকরে নক করুন।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন