সূর্য যাবে ডুবে-পাট টু

আমি পকেট থেকে মোবাইল বের করে সাজিদকে ফোন করলাম। তাকে আজ টিএসসির সাতরঙা চা খাওয়াব। ওর ফোনে কল গেল না। বন্ধ দেখাচ্ছে। আমি কাপড়চোপড় পাল্টিয়ে টিএসসি যাওয়ার জন্যে রেডি হলাম। ইতোমধ্যেই দেখি একগাদা বই হাতে সাজিদ রুমে ঢুকল। তাকে বললাম, “তোর ফোন বন্ধ পাচ্ছিলাম।

সে বলল, ‘ফোন চুরি গেছে।

আমি বেশ অবাক হয়ে বললাম, কীভাবে?

‘এক আত্মীয়কে দেখতে গিয়েছিলাম পিজিতে। আসার পথে রিক্সায় কথা বলছিলাম ফোনে। পেছন থেকে এক ছোকরা ঝাপটা মেরে নিয়ে দৌড় দিল।

আমি হাসতে হাসতে বললাম, “বেচারা দৌড় দিল কেন?’

সাজিদ আমার কথা শুনে বেশ অবাক হলো। সে খুব কমই অবাক হয়। সে যখন অবাক হয় তখন তার চোখের পাতা নড়ে না। একদৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। সে বলল, ‘ছিনতাইকারী ছিনতাই করে দৌড় দেবে এটাই স্বাভাবিক নয় কি?

আমি বেশ বিজ্ঞসুলভ চেহারায় বললাম, তা ঠিক; কিন্তু সে যদি জানত—তুই কোনোদিনও বেচারাকে ধাওয়া করবি না, তাহলে সে কিন্তু ফোন নিয়ে দৌড়ে পালাত না।

আমি বুঝতে পারলাম সাজিদ এই মুহূর্তে বিশাল এক লেকচার শুরু করবে। সে আমাকে ক্রিমিনাল সাইকোলজির নানান ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ শুনিয়ে প্রমাণ করে ছাড়বে যে, ওই মুহূর্তে ছিনতাইকারীর কেন দৌড়টি দেওয়া যৌক্তিক ছিল। লেকচার শুরুর পূর্বেই তাকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, “ওসব বাদ দে। আসল কথায় আসি। তোকে ফোন করেছিলাম একটি কারণে।

‘কী কারণ? জানতে চাইল সাজিদ।

‘তোকে এখন আমার সাথে টিএসসি যেতে হবে। আজ তোকে সাতরঙা চা খাওয়াব।

সাজিদ কিছুই বলল না। কিছু না বলার মানে হলো সে আমার সাথে টিএসসিতে যাবে। তাকে বললাম, “তোর আর্টিকেলটি একটু আগে পড়ে শেষ করলাম। ফাটাফাটি লিখেছিস। এ জন্যেই আজকে তোকে সাত রঙা চা খাওয়াব।

এবারও সে কিছু না বলে তার চেয়ারে গিয়ে বসল। হাত থেকে বইগুলো রেখে আবার উঠে দাঁড়াল। আমি আবার বললাম, “আচ্ছা, তুই না বলেছিলি এই ম্যাগাজিনে প্রবন্ধ দিলে মফিজুর রহমান স্যার নাও ছাপাতে পারে?

‘হ্যাঁ।

‘তাহলে ছাপাল কীভাবে?

‘তা তো জানি না।

‘তার কোনোপ্রতিক্রিয়া জানতে পেরেছিস?’

সাজিদ কোনোউত্তর না দিয়ে তার ব্যাগ থেকে একটি নীলরঙা খাম বের করে আমার হাতে দিল। সম্ভবত ভেতরে একটি চিঠি আছে। আমার হাতে খামটি দিয়েই সে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। আমি খামটি খুলে পড়তে শুরু করলাম

সাজিদ,

প্রণোদনা ম্যাগাজিনে প্রকাশিত তোমার আর্টিকেলটি আমি পড়েছি। আমি বলব

—তোমার আর্টিকেলটি পড়ে আমি বিমোহিত হয়েছি। তোমার আর্টিকেল পড়ার পরের অনুভূতি বোঝানোর মতো শব্দ আমার ডিকশনারিতে মজুদ নেই। ক্লাসে এবং ক্লাসের বাইরে ইতিপূর্বে তোমার সাথে আমার বেশ কয়েকবার ঠান্ডা বিতর্ক হয়েছে। খুব তাচ্ছিল্য ভরে তোমাকে আমি মি. আইনস্টাইন’ বলে ডাকতাম। আই অ্যাপোলোজাই মাই সান। খুব ধার্মিক পরিবারে বেড়ে উঠলেও জীবনে আমি বেশ কড়া অবিশ্বাসীতে পরিণত হই। বারবার চেষ্টা করেছি এই হতাশাগ্রস্ত জীবন থেকে বেরিয়ে আসতে পারিনি; কিন্তু বিশ্বাস করো, তোমার আর্টিকেলটি পড়ে আমার খুব করে আবার মন চাচ্ছে বিশ্বাসী শিবিরে ফিরে আসতে। আশা করছি আমি সফল হব। আমার জন্যে দোয়া কোরো। তোমাকে ধন্যবাদ।

তোমার স্যার মুহাম্মদ মফিজুর রহমান

চিঠি পড়া শেষ হতে খেয়াল করলাম আমার চোখ দুটো খুব ভারী হয়ে উঠেছে। টুপ করে দু-ফোটা জল নিচেও গড়িয়ে পড়ল। আমার চোখের জলে এই নীল খাম যাতে ভিজে না যায় সে জন্য তাড়াতাড়ি খামটি নিরাপদে সরিয়ে ফেললাম। চোখের জলে এই নীলরং মুছে না যাক। এই নীল শুভ্রতার প্রতীক। এই শুভ্রতা পবিত্রতার বাহক। এই পবিত্রতা ছড়িয়ে পড়ুক সব প্রাণে। জগতের সকল দ্বিধাগ্রস্ত মফিজুর রহমান স্যারেরা এই শুভ্রতায় পবিত্র হয়ে উঠুক। আমি মনে মনে বললাম, “সাজিদ, আই অ্যাম প্রাউড অফ ইউ মাই ফ্রেন্ড।

সমাপ্ত।

আগের অংশ টুকু পড়তে[এখানে ক্লিক করুন]

এই ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে তাহলে দয়া করে ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ একে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন