মূল: প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ ২ । লেখক: আরিফ আজাদ । ওয়েব সম্পাদনা: আবু বক্কার ওয়াইস বিন আমর

সাজিদদের ডিপার্টমেন্ট থেকে একটি ম্যাগাজিন বের হবে। বিজ্ঞান ম্যাগাজিন। নাম ‘প্রণোদনা’। এই ম্যাগাজিনের খবর আমি অবশ্য সাজিদের কাছ থেকে পাইনি; পেয়েছি তাদের ডিপার্টমেন্টের আরেকজনের কাছ থেকে। সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে দেখি সাজিদ তার টেবিলে সোজা হয়ে বসে খুব মনোযোগ দিয়ে বই পড়ছে। বাসায় যে আমার মতো আস্ত একটি মানুষ এসে ঢুকল, সেটি হয়তো সে টেরও পায়নি। হয়তো পেয়েছে; কিন্তু আমার আগমন হয়তো তার কাছে তেমন কোনো ব্যাপার,অথবা এমনও হতে পারে যে, আমার চাইতে তার কাছে বই পড়াটাই বেশি মূল্যবান। সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে মনে হলো আজকাল আমি খুব বেশিই ফেলুদা সাজার চেষ্টা করছি। অকারণ সন্দেহ আর কৌতূহলের ব্যাপারটি ইদানীং খুব প্রকট আকারে আমার মধ্যে দেখা দিয়েছে। নিজেকে বোঝালাম, বাপু তুমি ফেলুদাও নও, হ্যারি পটারও নও। তোমার কাজ জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মোলকলা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা। প্রাণীর কোষের ভেতর থেকে অভূতপূর্ব তথ্য বের করে আনাই তোমার কম্ম। আর যাই হোক, সাইকোলজি তোমার সাবজেক্ট নয়!

আমি কাঁধ থেকে টেবিলে ব্যাগ রাখতে রাখতে বললাম, “শুনলাম তোদের ডিপার্টমেন্ট থেকে নাকি একটি ম্যাগাজিন বের হচ্ছে?

সাজিদ ঘাড় ফিরিয়ে আমার দিকে তাকাল।অন্যান্য দিনের তুলনায় আজকে আগেই বাসায় ফিরেছি। অন্য কেউ হলে হয়তো জিজ্ঞেস করত, ‘কীরে! আজকে এত তাড়াতাড়ি ফিরলি যে?

কিন্তু সাজিদের এসব জিজ্ঞেস করার টাইম নেই। ম্যাগাজিনের কথা শুনে সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “হ্যাঁ। ‘কী বিষয়ক ম্যাগাজিন?’

‘বিজ্ঞান।

‘তুই কোনোলেখা দিচ্ছিস?’

সাজিদ বইটি বন্ধ করল। এরপর বলল, ‘লেখা দিতে পারি; কিন্তু ব্যাপার হলো, মফিজুর রহমান স্যার ওই লেখা ছাপাবেন কি না, সন্দেহ আছে।

সাজিদ যেহেতু মফিজুর রহমান স্যারের আপত্তির কথা ভাবছে, তখন আমার আর বোঝার বাকি থাকে না, লেখাটি আসলে কোন কেন্দ্রিক হতে যাচ্ছে। আমি বললাম, ‘ছাপাবে না কেন? আলবত ছাপাবে। ভালো লেখা হলে মফিজুর রহমান স্যার অবশ্যই ছাপাতে বাধ্য।

আমার কথাগুলো শুনে সাজিদ খুব-একটা আগ্রহ পেল বলে মনে হলো না। বলল, ‘দেখি।’ এইটুকু বলে সে আবার বইয়ের মাঝে ডুব দিল।

এরপর কেটে গেছে কয়েক মাস। পড়াশোনা, ল্যাব আর পরীক্ষার চাপে আমিও ম্যাগাজিনের ব্যাপারটি বেমালুম ভুলে গেলাম। একদিন রাতে বাসায় ফেরার পর দেখি সাজিদ বাসায় নেই। তার টেবিলের ওপরে নীল মলাটের একটি ম্যাগাজিন রাখা। কৌতূহল থেকে ম্যাগাজিনটি হাতে নিয়ে দেখি ওপরে মোটা মোটা বাংলায় লেখা ‘প্রণোদনা। সাথে সাথে ম্যাগাজিনটা হাতে তুলে নিলাম। এটাই তো সাজিদদের ডিপার্টমেন্ট থেকে বের হবার কথা ছিল। শেষমেশ হলো তাহলে কিন্তু এতে কি সাজিদের লেখা আছে? সাজিদ লেখা দিলেও মফিজুর রহমান স্যার কি তা আদৌ ছেপেছে? অতশত না ভেবে ম্যাগাজিনের পৃষ্ঠা উল্টিয়ে সোজা চলে গেলাম ম্যাগাজিনের সূচিপত্র অংশে। আমার চোখ দুটো খুঁজে ফিরছে সাজিদের নাম। মাঝামাঝিতে এসে আমি ঠিক ঠিক পেয়ে গেলাম। ইয়েস! ইটস দেয়ার! একটি প্রবন্ধের নাম আমার চোখের সামনে জ্বলজ্বল করছে। “সূর্য যাবে ডুবে’ চুয়াত্তর পৃষ্ঠায়। আমি তড়িঘড়ি করে পৃষ্ঠা নম্বর চুয়াত্তর খুঁজে বের করে দাঁড়ানো অবস্থাতেই পড়তে শুরু করলাম।

ম্যাগাজিনটির ইনার-ডিজাইন খুব সুন্দর করে সাজানো। প্রতিটি লেখার সাথে কিছু স্থির চিত্র দেওয়া আছে যাতে বিষয়বস্তু সম্পর্কে পাঠক সহজে অনুমান করতে পারে। ।”সূর্য যাবে ডুবে” এই লেখাটার সাথেও দেওয়া হয়েছে খুব সুন্দর একটি চিত্র। ডুবুডুবু অবস্থায় একটি সূর্য। আমি আর লোভ সামলাতে পারছি না। সরাসরি পাঠে মনোেযোগ দিলাম।

আধুনিক বিজ্ঞান আমাদের প্রতিনিয়ত নানা বিস্ময়কর সব তথ্য জানিয়ে হতবাক করে ছাড়ছে। পাল্টে দিচ্ছে আমাদের রোজকার জীবন। আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের পদে পদে বিজ্ঞানের অবদান অবশ্যই অনস্বীকার্য। বিজ্ঞানের হাত ধরেই মানুষ যাত্রা করেছে চাঁদ থেকে মঙ্গলে। বিজ্ঞানের রূপরেখা ধরেই মানুষ গভীর সমুদ্র চষে বেড়াচ্ছে। জয় করে নিচ্ছে অজেয় সব ব্যাপার। প্রাণঘাতী রোগের চিকিৎসা আমাদের জন্য বিজ্ঞান সহজলভ্য করে দিয়েছে। আধুনিক জীবনে বিজ্ঞান যেন আমাদের জীবনের প্রতিশব্দ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অনেক অনেক সুখকর তথ্য, আবিষ্কার এবং উদ্ভাবনের সাথে সাথে বিজ্ঞান আমাদের প্রায়ই বেশ কিছু দুঃসংবাদও শুনিয়ে থাকে। সেগুলোর মধ্যে অন্যতম যে-দুঃসংবাদ বিজ্ঞান আমাদের সম্প্রতি জানিয়েছে তা হলো, আমাদের সূর্য একদিন তার সব তেজ-শক্তি আর আলো হারিয়ে নিঃশেষ হয়ে পড়বে।

অবাক করা ব্যাপার হলেও সত্য যে, একদিন আমাদের পৃথিবী আর সূর্যের আলোয় আলোকিত হবে না। সকালের সোনা রোদের আশায় অপ্রস্ফুটিত ফুলের কলিটি আর কখনোই প্রস্ফুটিত হবার সুযোগ পাবে না। পৃথিবী ছেয়ে যাবে অন্ধকারে। ঘোর অন্ধকার…।

বিজ্ঞান ব্যাপারটি ব্যাখ্যা করেছে এভাবে, একটি পর্যায়ে গিয়ে মহাকাশের তারাগুলো তাদের সব শক্তিমত্তা, তেজ হারিয়ে ফেলবে। যেসব তারকার ভর সৌর ভরের আট গুণের কম থাকে, অন্তিম দশায় পৌঁছালে তাদের কেন্দ্রের ভর চন্দ্রশেখরের সীমা, অর্থাৎ ১.৪ গুণ সৌর ভরের নিচে থাকবে। এরকম অবস্থায় যারা পতিত হবে তাদের বলা হয় শ্বেতবামন। এর বিপরীতে, অর্থাৎ যেসব তারকার ভর সৌর ভরের আট গুণের বেশি থাকে, অন্তিম দশায় পৌঁছালে তাদের কেন্দ্রের ভর চন্দ্রশেখরের সীমা, অর্থাৎ ১.৪ গুণের মধ্যে থাকলে সেই তারকাগুলো ‘নিউট্রন’

তারকায় পরিণত হবে। তবে এদের ভর যদি ৩ গুণ সৌরভর অপেক্ষা বেশি হয় তাহলে তারা আর নিজেদের ধরে রাখতে পারে না। সংকুচিত হতে হতে এরা একটি ব্ল্যাকহোলে পরিণত হয়ে যায়।

আমাদের অতি প্রিয়, অতি পরিচিত সূর্যের বেলাতেও এই কথাগুলো প্রযোজ্য। সাম্প্রতিক বিজ্ঞান আমাদের জানাচ্ছে যে, সূর্যের জ্বালানি ক্রমশ ফুরিয়ে যাচ্ছে। সূর্যের জ্বালানি হলো Hydrogen Fuel. নাসার বিজ্ঞানীরা বলছেন, সূর্য তার ভেতরে যে-তাপ ধারণ করে আছে, গত ৪.৫ বিলিয়ন বছরে সেই তাপের প্রায় অর্ধেকটাই শেষ হয়ে গেছে। প্রতিনিয়ত সূর্যের এই জ্বালানি খরচ হচ্ছে এবং কমছে নিজের তেজস্ক্রিয়তাও; কিন্তু সর্যের তাপের মাত্রা এতই বেশি যে, তার ক্ষয়ে যাওয়া শক্তির ঘাটতি সাধারণত আমাদের চোখে পড়ে না। খুব সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বৈজ্ঞানিক গবেষণা ছাড়া এই ব্যাপারগুলো বোঝা যায় না। এভাবে নিজের শক্তি ক্ষয় হতে হতে এমন একটি সময় উপস্থিত হবে, যেদিন সূর্য একেবারেই আলোহীন এবং নিস্তেজ হয়ে পড়বে। আমাদের পরিচিত সূর্য পরিণত হবে শ্বেতবামনে।

তবে খুব শীঘ্রই যে এমনটি ঘটবে, তা নয়। বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন যে, সূর্যের মধ্যে এখনোযে-পরিমাণ জ্বালানি মজুদ আছে, সেই জ্বালানি দিয়ে আগামী আরও ৫ বিলিয়ন বছর সূর্য এভাবে বহাল তবিয়তে থাকতে পারবে।

নাসার বক্তব্য এবং তথ্যাদি বিশ্লেষণ করে যে-সারমর্ম পাওয়া যায় তা হলো, সূর্যের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় অপেক্ষা করছে যখন সূর্য আলোহীন, শক্তিহীন হয়ে পড়বে। শুধু সূর্যই নয়, সূর্যের মতো আরও অসংখ্য, অগণিত এরকম নক্ষত্রের ভাগ্যেও যে এই পরিস্থিতি জুটবে, সেটাও বিজ্ঞান আমাদের জানাচ্ছে খুব স্পষ্ট করে। ইতোমধ্যেই অসংখ্য নক্ষত্র নিজেদের শক্তি, জ্যোতি হারিয়ে শ্বেতবামন আর নিউট্রন তারকায় পরিণত হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও হবে।

খুব মজার ব্যাপার হলো, আজ থেকে সাড়ে চৌদ্দশো বছর আগে, মরুভূমিতে একজন নিরক্ষর লোকের ওপর নাযিল হওয়া পবিত্র কুরআনুল কারীমে ঠিক এই কথাগুলো খুব সুন্দর, খুব গোছালো এবং সুস্পষ্ট করে বলা আছে।

‘প্রণোদনা’ ম্যাগাজিনের এতটুকু পড়ে এবার আমি নড়েচড়ে বসলাম। আমি আসলে এতক্ষণ এই টুইস্টটির জন্যেই অপেক্ষা করছিলাম; কিন্তু ঘটনা যে—এতটা কাহিনির রূপ নেবে, সেটি বুঝতে পারিনি। সূর্যের অন্তিম পরিণতি, সূর্যের জ্বালানির নিঃশেষহয়ে যাওয়া, শ্বেতবামন আর নিউট্রন তারকা সম্পর্কিত তথ্যাবলি আমাকে পুরোটাই চমকে দিয়েছে; কিন্তু এই ব্যাপারগুলো কুরআনে কীভাবে আছে সেই কৌতূহলটাই এখন বেশি। আর অপেক্ষা করতে পারছি না। পরের অংশটুকু পড়ার জন্যে মনটি ব্যাকুল হয়ে আছে। ধপাস করে গিয়ে বসলাম সাজিদের খাটে।

পরের অংশ টুকু পড়তে[এখানে ক্লিক করুন]

এই ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে তাহলে দয়া করে ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ একে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন