মূল: প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ । লেখক: আরিফ আজাদ । ওয়েব সম্পাদনা: আবু বক্কার ওয়াইস বিন আমর

ছুটির দিনে সারা দিন রুমে বসে থাকা ছাড়া আমার আর কোন কাজ থাকেনা । সপ্তাহের এই দিনটি অন্য সবার কাছে ঈদের মতো মনে হলেও আমার কাছে এই দিনটি খুবই বিরক্তিকর । ক্লাশ, ক্যাম্পাস, আড্ডা এসব স্তিমিত হয়ে যায় ।

এই দিনটি আমি রুমে শুয়ে-বসে, ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিলেও, সাজিদ এই দিনের পুরোটা সময় লাইব্রেরীতে কাটিয়ে দেয় । লাইব্রেরীতে ঘুরে ঘুরে নানান বিষয়ের উপর বই নিয়ে আসে ।

আজ সকালেও সে বেরিয়ে গেছে লাইব্রেরির উদ্দেশ্যে । ফিরবে জুমার আগে । হাতে থাকবে একগাদা মোটা মোটা বই ।

বাসায় আমি একা ভাবলাম একটু ঘুমাব । অনেক রাত পর্যন্ত বসে বসে অ্যাসাইনমেন্ট রেডি করেছি । চোখদুটো জবা ফুলের মতো টকটকে লাল হয়ে আছে । আমি হাই তুলতে তুলতে যেই ঘুমোতে যাবো, অমনি দরজার দিকে থেকে কেউ একজনের কাশির শব্দ কানে এলো ।

ঘাড় ঘুরিয়ে সে দিকে তাকাতেই দেখলাম, একজন বড় বড় চোখ চশমার ভেতর দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে । আগাগোড়া চোখ বুলিয়ে নিলাম । পরনে শার্ট-প্যান্ট, চোখে মোটা কালো ফ্রেমের চশমা । লোকটার চেহারায় সত্যজিৎ রায়ের বিখ্যাত ‘ফেলুদা’ চরিত্রের কিছুটা ভাব আছে । লোকটা আমার চোখাচোখি হতেই পিক করে হেসে দিল । এরপর বললো, -‘এটা কি সাজিদের বাসা ?’

প্রশ্নটা আমার গায়ে লাগলো । সাজিদ কি বাইরের সবাইকে এটাকে নিজের একার বাসা বলে বেড়ায় নাকি ? এই বাসার যা ভাড়া, তা সাজিদ আর আমি সমান ভাগ করে পরিশোধ করি । তাহলে চুক্তি মতে বাসাটা তো আমারও ।

লোকটা যতটা উৎসাহ নিয়ে প্রশ্ন করেছে, তার দ্বিগুন উৎসাহ নিয়ে আমি বললাম, -‘এটা সাজিদ আর আমার দু জনেরই বাসা ।’

লোকটা আমার উত্তর শুনে আবারো পিক করে হেসে দিল । ততক্ষনে লোকটা ভিতরে চলে এসেছে ।

সাজিদকে খুঁজতে এরকম প্র্যায়ই অনেকেই আসে । সাজিদ রাজনীতি না করলেও, নানারকম স্বেচ্ছাসেবী মূলক সংগঠনের সাথে যুক্ত আছে ।

লোকটা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, -‘সাজিদ মনে হয় ঘরে নেই, না ?’

আমি হাই তুলতে তুলতে বললাম, -‘জি না । বই আনতে গেছে । অপেক্ষা করুন, চলে আসবে ।’

লোকটাকে সাজিদের চেয়ারটা টেনে বসতে দিলাম । তিনি বললেন, -‘তোমার নাম ?’

-‘আরিফ ।’

-‘কোথায় পড়ো ?’

-‘ঢাবি তে ।’

-‘কোন ডিপার্টমেন্ট ?’

-‘জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং’

লোকটা খুব করে আমার প্রশংসা করলো । এরপর বলল, -‘আমি প্রথম ভেবেছিলাম তুমিই সাজিদ ।’

লোকটার কথা শুনে আমার ছ নম্বার হাঁইটা মুহূর্তেই মুখ থেকে গায়েব হয়ে গেল । ব্যাপারটা কি ? এই লোক কি সাজিদ কে চিনে না ?

আমি বললাম, -‘আপনি সাজিদের পরিচিত নন ?’

-‘না ।’

-‘তাহলে ?’

লোকটা একটু ইতঃস্তত বোধ করলো মনে হচ্ছে । এরপর বলল, -‘আসলে আমি একটি প্রশ্ন নিয়ে এসেছি সাজিদের কাছে । প্রশ্নটি আমাকে করেছিল একজন নাস্তিক । আমি আসলে কারো কাছে এটার কোনো সন্তোষজনক উত্তর পাইনি, তাই ।’

আমি মনে মনে বললাম, -‘বাবা সাজিদ, তুমি তো দেখি এখন সক্রেটিস বনে গেছো ।

পাবলিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তোমার দ্বারস্থ হয় ।’

লোকটার চেহারায় একটি গম্ভীর ভাব আছে । দেখলেই মনে হয় এই লোক অনেক কিছু জানে, বোঝে । কিন্তু কি এমন প্রশ্ন, যেটার জন্য কোন ফেয়ার এন্সার উনি পাচ্ছেন না ?

কৌতুহল বাড়লো ।

আমি মুখে এমন একটি ভাব আনলাম, যেন আমিও সাজিদের চেয়ে কোনো অংশে কম নযই । বরং তার চেয়ে কয়েক কাঠি সরেশ । এরপর বললাম, -‘আচ্ছা, কি সেই প্রশ্ন ?’

লোকটা আমার অভিনয়ে বিভ্রান্ত হলো । হয়তো ভাবলো, আমি সত্যিই ভালো কোন উত্তর দিতে পারবো ।

বললো, -‘খুবই ক্রিটিক্যাল প্রশ্ন । স্রষ্টা সম্পর্কিত ।’

আমি মনে মনে তখনি প্রায় লেজেগোবরে অবস্থা । কিন্তু মুখে বললাম, -‘প্রশ্ন যে খুবই ক্রিটিক্যাল, সেটা তো বুঝেছি । নইলে ঢাকা শহরে এই জ্যাম-ট্যাম  মাড়িয়ে কেউ এত কষ্ট করে এখানে আসে ?’

আমার কথায় লোকটা আবারো বিভ্রান্ত হল এবং আমাকে ভরসা করলো । এরপর আমাকে বলল, -‘আগেই বলে নিই, প্রশ্নের উত্তর ‘হ্যাঁ/না’ হতে হবে ।’

-‘আপনি আগে প্রশ্ন করুন, তারপর উত্তর কি হবে দেখা যাবে’ -আমি বললাম ।

-‘প্রশ্নটা হচ্ছে- স্রষ্টা কী এমন কোন কিছু বানাতে পারবে, যেটা স্রষ্টা উঠাতে পারবে না ?’

আমি বললাম, -‘আরে, এ তো খুবই সহজ প্রশ্ন । হ্যাঁ বলে দিলেই তো হয় । ল্যাটা চুকে যায় ।’

লোকটা হাসল । মনে হল, আমার সম্পর্কে ওনার ধারনা পাল্টে গেছে । এই মুহূর্তে উনি আমাকে গবেট, মাথামোটা টাইপ কিছু ভাবছেন হয়তো ।

আমি বললাম, -‘হাসলেন কেন ? ভুল বলেছি ?’

লোকটা কিছু না বলে আবার হাসল । এবার লোকটা হাসি দেখে আমি নিজেই বিভ্রান্ত হয়ে গেলাম । প্রশ্নটা আবার মনে করতে লাগলাম ।

স্রষ্টা কি এমন কোনো কিছু বানাতে পারবে, যেটা স্রষ্টা উঠাতে পারবে না ।

আবার চিন্তা করতে লাগলাম । উত্তর যদি ‘হ্যাঁ’ হয়, তাহলে ধরে নিচ্ছি যে, জিনিসটা বানাতে পারলেও সেটা তুলতে পারবে না । আরে এটা কিভাবে সম্ভব ? স্রষ্টা পারেনা এমন কোন কাজ আছে নাকি আবার ? আর, একটা জিনিস উঠানো কি এমন কঠিন কাজ যে স্রষ্টা সেটা পারবে না ?

আবার চিন্তা করতে লাগলাম । উত্তর যদি ‘না’ হয়, তাহলে ধরে নিচ্ছি যে- স্রষ্টা জিনিসটা উঠাতে পারলেও বানাতে পারবে না ।

ও আল্লাহ ! কি বিপদ ! স্রষ্টা বানাতে পারবে না এটা কিভাবে সম্ভব ? হ্যাঁ বললেও আটকে যাচ্ছি, না বললেও আটকে যাচ্ছি ।

লোকটা আমার চেহারার অস্থিরতা ধরে ফেলেছে । মুচকি মুচকি হাসতে শুরু করলো । আমি ভাবছি তো, ভাবছিই ।

এর একটু পরে সাজিদ এলো । সে আসার পরে লোকটার সাথে তার প্রাথমিক আলাপ শেষ হলো । এর মাঝে লোকটা সাজিদকে বলে দিয়েছে যে, আমি প্রশ্নটার প্যাঁচে কিরকম নাকানী-চুবানী খেলাম, সেটা । সাজিদ আমার দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ হেসে নিল ।

এরপর সাজিদ তার খাটে বসলো । হাতে কি কাগজের ঠোঙার মধ্যে বুট ভাজা । বাইরে থেকে কিনে এনেছে । সে বুটের ঠোঙ্গাটা লোকটার দিকে ধরে বলল, -‘নিন, এখনও গরম আছে ।’

লোকটা প্রত্যাখ্যান করতে চেয়েও করল না । কেন করলো না কে জানে ।

লোকটি সাজিদকে এবার তার প্রশ্ন সম্পর্কে বলল । প্রশ্নটি হল-

‘স্রষ্টা কি এমন কিছু বানাতে পারবে, যেটা স্রষ্টা নিজেই তুলতে পারবে না ?’

এই বলে লোকটা এবার প্রশ্নটিকে ভেঙ্গে বুঝিয়ে দিল । বলল, -‘দেখ, এই প্রশ্নের উত্তরে যদি ‘হ্যাঁ’ বলো, তাহলে তুমি ধরে নিচ্ছ যে, স্রষ্টা জিনিসটি বানাতে পারলেও তুলতে পারবে না । কিন্তু আমরা জানি স্রষ্টা সর্বশক্তিমান । কিন্তু, যদি স্রষ্টা জিনিসটি তুলতে না পারে, তিনি কি আর সর্বশক্তিমান থাকেন ? থাকেন না ।

যদি এই প্রশ্নের উত্তরে তুমি ‘না’ বলো, তাহলে তুমি স্বীকার করছ যে, সেরকম কোন জিনিস স্রষ্টা বানাতে পারবেন না যেটা তিনি তুলতে পারবেন । এখানেও স্রষ্টার ‘সর্বশক্তিমান’ গুণটি প্রশ্নবিদ্ধ । এই অবস্থায় তোমার উত্তর কি হবে ?’

সাজিদ লোকটির প্রশ্নটি মন দিয়ে শুনল । প্রশ্ন শুনে তার মধ্যে তেমন কোন ভাব লক্ষ্য করিনি । নর্মাল ।

সে বলল, -‘দেখুন সজীব ভাই, আমরা কথা বলবো লজিক দিয়ে, বুঝতে পেরেছেন ?’

এরমধ্যে সাজিদ লোকটির নামও জেনে গেছে । কিন্তু এই বৃদ্ধ লোকটিকে সে ‘আঙ্কেল’ কিংবা ঢাকা শহরের নতুন রীতি অনুযায়ী ‘মামা’ না ডেকে ‘ভাই’ কেন ডাকলো ? বুঝলাম না ।

লোকটি মাথা নাড়ালো । সাজিদ বলল, -‘যে মুহূর্তে আমার যুক্তির শর্ত ভাঙবো, ঠিক সেই মুহূর্তে যুক্তি আর যুক্তি থাকবে না । যেটা তখন হবে কু যুক্তি । ইংরেজিতে বলে Logical Fallacy সেটা তখন আত্মবিরোধের জন্ম দিবে, বুঝেছেন ?’

-‘হ্যাঁ’-লোকটা বলল ।

-‘আপনি প্রশ্ন করেছেন স্রষ্টার শক্তি নিয়ে । তার মানে, প্রাথমিকভাবে আপনি ধরে নিলেন যে, একজন স্রষ্টা আছেন, রাইট ?’

-‘হ্যাঁ’

-‘এখন স্রষ্টার একটি অন্যতম গুন হলো- তিনি অসীম, ঠিক না ?’

-‘হ্যাঁ, ঠিক ।’

-‘এখন আপনি বলছেন, স্রষ্টা এমন কিছু বানাতে পারবে কিনা, যেটা স্রষ্টা তুলতে পারবে না । দেখুন, আপনি নিজেই বলেছেন, এমনকিছু আই মিন Something, রাইট ?’

-‘হ্যাঁ’

-‘আপনি ‘এমনকিছু’ বলে আসলে জিনিসটার একটা আকৃতি, শেইপ, আকার বুঝিয়েছেন, তাই না ? যখনই Something ব্যবহার করেছেন, তখন মনে মনে সেটার একটা শেইপ আমরা চিন্তা করি, করি না ?’

-‘হ্যাঁ, করি ।’

-‘আমরা তো এমন কিছুকেই শেইপ বা আকার দিতে পারি, যেটা আসলে সসীম, ঠিক ?’

-‘হ্যাঁ, ঠিক ।’

-‘তাহলে এবার আপনার প্রশ্নে ফিরে যান । আপনি ধরে নিলেন যে স্রষ্টা আছে । স্রষ্টা থাকলে তিনি অবশ্যই অসীম । এরপর আপনি তাকে এমন কিছু বানাতে বলছেন, যেটা সসীম । যেটার নির্দিষ্ট একটা মাত্রা আছে, আকার আছে, আয়তন আছে । ঠিক না ?’

-‘হ্যাঁ’

-‘পরে শর্ত দিলেন, তিনি সেটা তুলতে পারবে না । দেখুন, আপনার প্রশ্নের লজিকটাই ঠিক নেই । একজন অসীম সত্ত্বা একটি সসীম জিনিস তুলতে পারবে না, এটা তো পুরোটাই লজিকের বাইরে প্রশ্ন । খুবই হাস্যকর না ? আমি যদি বলি, উইসান বোল্ট কোনদিনও দৌড়ে ৩ মিটার অতিক্রম করতে পারবেনা । সেটা কি হাস্যকর ধরনের যুক্তি নয় ?’

সজিব নামের লোকটা এবার কিছু বললেন না । চুপ করে আছেন ।

সাজিদ উঠে দাঁড়ালো । এরমধ্যেই বুট ভাঁজা শেষ হয়ে গেছে । সে বইয়ের তাকে কিছু বই রেখে আবার এসে নিজের জায়গায় বসল । এরপর আবার বলতে শুরু করল-

‘এর প্রশ্নটি করে মূলত আপনি স্রষ্টার ‘সর্বশক্তিমান’ গুণটাকে ‘প্রশ্নবিদ্ধ’ করে প্রমাণ করতে চাইছেন যে, আসলে স্রষ্টা নেই ।

আপনি ‘সর্বশক্তিমান’ টার্মটি দিয়ে বুঝাচ্ছেন, যে স্রষ্টা মানে এমন এক সত্ত্বা, যিনি যা ইচ্ছা তাই করতে পারেন, রাইট ?’

লোকটি বলল, -‘হ্যাঁ, স্রষ্টা মানেই তো এমন কেউ, কেউ যিনি যখন ইচ্ছা, তাই করতে পারেন ।’

সাজিদ মুচকি হাসলো । বললো, -‘আসলে সর্বশক্তিমান মানে এই না যে, তিনি যখন যা ইচ্ছা তাই করতে পারেন । সর্বশক্তিমান মানে হল- তিনি নিয়মের মধ্যে থেকেই সবকিছু করতে পারেন । নিয়মের বাইরে গিয়ে তিনি কিছু করতে পারেন না । করতে পারেন না বলাটা ঠিক নয়, বলা উচিত তিনি করেন না । এর মানে এই না যে, তিনি সর্বশক্তিমান নন বা তিনি স্রষ্টা নন । এর মানে হল এই -কিছু জিনিস তিনি করেন না, এটাও কিন্তু তার স্রষ্টা হবার গুণাবলী । স্রষ্টা হচ্ছেন সকল নিয়মের নিয়ন্ত্রক । এখন তিনি নিজেই যদি নিয়মের বাইরের হন -ব্যাপারটি তখন ডাবলস্ট্যান্ড হয়ে যায় । স্রষ্টা এরকম নন । তার কিছু বৈশিষ্ট্য আছে । তিনি সেই বৈশিষ্ট্যগুলো অতিক্রম করেন না । সেগুলো হলো তার মোরালিটি । এগুলো আছে বলেই তিনি স্রষ্টা, নাহলে তিনি স্রষ্টা থাকতেন না ।

সাজিদের কথায় এবার আমি কিছুটা অবাক হলাম । আমি জিজ্ঞেস করলাম। -‘স্রষ্টা পারে না, এমন কি কাজ থাকতে পারে ?’

সাজিদ আমার দিকে ফিরল । ফিরে বলল, -‘স্রষ্টা কি মিথ্যা কথা বলতে পারে ? ওয়াদা ভঙ্গ করতে পারে ? ঘুমাতে পারে ? খেতে পারে ?’

আমি বললাম, -‘আসলেই তো ।’

সাজিদ বলল, -‘এগুলো স্রষ্টা পারে না বা করেন না । কারণ এগুলো স্রষ্টার গুণ এর সাথে কন্ট্রাডিক্টরি । কিন্তু এগুলো করে না বলে কি তিনি সর্বশক্তিমান নন ? না । তিনি এগুলো করেন না কারন, এগুলো তার মোরালিটি সাথে যায় না ।’

এবার লোকটি প্রশ্ন করল, -‘কিন্তু, এমন জিনিস তিনি বানাতে পারবেন না কেন, যেটাতে তিনি তুলতে পারবেন না ?’

সাজিদ বলল, -‘কারন, স্রষ্টা যদি এমন জিনিস বানান, যেটা স্রষ্টা তিনি তুলতে পারবেন না- তবে জিনিসটাকে অবশ্যই তার চেয়েও বেশি শক্তিশালী হতে হবে । স্রষ্টা যে মুহূর্তে এরকম জিনিস বানাবেন, সে মুহূর্তেই তিনি স্রষ্টা হবার অধিকার হারাবেন । তখন স্রষ্টা হয়ে যাবে তার চেয়ে বেশি শক্তিশালী ঐ জিনিসটি । কিন্তু এটাতো স্রষ্টার নীতিবিরুদ্ধ ।  তিনি এটা কিভাবে করবেন ?’

লোকটা বলল, -‘তাহলে এমন জিনিস কি থাকা উচিত নয়, যেটা স্রষ্টা বানাতে পারলেও, তুলতে পারবে না ?’

-‘এমন জিনিস অবশ্যই থাকতে পারে, তবে যেটা থাকা উচিত নয়, তা হলো এমন প্রশ্ন ।’

-‘কেন ?’

এবার সাজিদ বলল, -‘যদি আমি আপনাকে জিজ্ঞেস করি, নীল রঙের স্বাদ কেমন ? কি বলবেন ? বা, ৯ সংখ্যাটির ওজন কত মিলিগ্রাম, কি বলবেন ?’

লোকটা ভ্যাবাচ্যাকা খেলো মনে হল । বলল, -‘নীল রঙের আবার স্বাদ কি ? ৯ সংখ্যাটির ওজনই হবে কি করে ?’

সাজিদ হাসলো । বললো, -‘নীল রঙের স্বাদ কিংবা ৯ সংখ্যাটির ওজন আছে কি নেই তা পরের ব্যাপার । থকেতেও পারে, নাও থাকতে পারে । তবে যেটা থাকা উচিত নয় সেটা হল, নিল রং এবং নয় সংখ্যাকে নিয়ে এই ধরনের প্রশ্ন ।’

সাজিদ বলল, -‘ফাইনালি আপনাকে একটি প্রশ্ন করি । আপনার কাছে দুটি অপশন । হয় ‘হ্যাঁ’ বলবেন, নয়তো ‘না’ । আমি আবার বলছি, হয় ‘হ্যাঁ’ বলবেন নয়তো ‘না’ ।’

লোকটা বলল, -‘আচ্ছা ।’

-‘আপনি কি আপনার বউকে পেটানো বন্ধ করেছেন ?’

লোকটি কিছুক্ষণ চুপ মেরে চিল । এরপর বলল, -‘হ্যাঁ’

এরপর সাজিদ বলল, -‘তার মানে আপনি একসময় বউ পেটাতেন ?’

লোকটা চোখ বড় বড় করে বলল, -‘আরে, না, না ।’

এবার সাজিদ বলল, -‘হ্যাঁ না হলে কি ? ‘না’ ?’

লোকটা এবার ‘না’ বলল ।

সাজিদ হাসতে লাগলো । বলল, -‘তার মানে আপনি এখনো বউ পেটান ?’

লোকটা এবার রেগে গেলো । বলল, -‘আপনি ফাউল প্রশ্ন করছেন । আমি কোনদিনও বউ পেটায় নি । এটা আমার নীতিবিরুদ্ধ ।’

সাজিদ বলল, -‘আপনিও স্রষ্টাকে নিয়ে একি ফাউল প্রশ্ন করেছেন । এটা স্রষ্টার নীতিবিরুদ্ধ ।

আমার প্রশ্নের উত্তরে আপনি যদি ‘হ্যাঁ’ বলেন, তাহলে স্বীকার করে নিচ্ছেন যে- আপনি একসময় বউ পেটাতেন । যদি ‘না’ বলেন, তাহলে স্বীকার করে নিচ্ছেন আপনি এখনো বউ পেটান । আপনি না ‘হ্যাঁ’ বলতে পারছেন, না পারছেন ‘না’ বলতে । কিন্তু, আদতে আপনি বউ পেটান না । এটা আপনার নীতিবিরুদ্ধ । সুতরাং, এমতাবস্তায় আপনাকে এরকম প্রশ্ন করাই উচিত না । এটা লজিকাল ফ্যালাসির মধ্যে পড়ে যায় । ঠিক সেরকম স্রষ্টাকে ঘিরেও এরকম প্রশ্ন থাকা উচিত নয় । কারণ, এই প্রশ্নটি নিজেই নিজের আত্মবিরোধী ।

নীল রঙের স্বাদ কেমন, বা ৯ সংখ্যাটির ওজন কত মিলিগ্রাম, এরকম প্রশ্ন যেমন লজিকাল ফ্যালাসি এবং এই ধরনের প্রশ্ন যেমন থাকা উচিত নয়, তেমনি ‘স্রষ্টা’ এমনকিছু বানাতে পারবে কিনা যেটা স্রষ্টা উঠাতে পারবে না । এটাও একটা লজিকাল ফ্যালাসি । কু-যুক্তি । এরকম প্রশ্ন থাকা উচিত নয় ।

সেদিন লোকটি খুব শকড হলেন । ভেবেছিলেন হয়তো এই প্রশ্নটি শুনেই ডিগবাজি খাবে । কিন্তু বেচারাকে এরকম ধোলাই করবে বুঝতে পারেনি । সেদিন উনার চেহারাটা হয়েছিল দেখার মত । বউ পেটানোর লজিকটা মনে হয় উনার খুব গায়ে লেগেছে ।

প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ – সম্প্রতি সময়ে সবচাইতে বেশী আলোচিত বইয়ের একটি। বইটির সকল লেখনী পড়তে নিন্মের লিঙ্ক সমূহে ভিজিট করুনঃ

রিলেটিভিটির গল্প

A letter to David –Jessus wasn’t myth & he exited

একটি ডিএনএ’র জবানবন্দী

চ্যালেঞ্জ রইল